টিফা (Trade and Investment Framwork Agreement বা TIFA)

জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখেই হোক টিকফা
রাশিদুল ইসলাম নাহিদ

টিকফা চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি হচ্ছে অনেক দিন আগ থেকে। তবে আগে এর নাম ছিল টিফা (Trade and Investment Framwork Agreement বা TIFA)। ১৩টি ধারা ও ১৯টি প্রস্তাবনাসংবলিত চুক্তিটির প্রথম খসড়া প্রণয়ন করা হয় ২০০২ সালে। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে চুক্তির খসড়াটিতে সংশোধন আনা হয়। চুক্তিটির খসড়া প্রণয়নের পর থেকেই দেশের নানা মহল থেকে এর সমালোচনা ও বিরোধিতা করা হয়। ফলে আজ অবধি এ চুক্তি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ওই সমালোচনা ও বিরোধিতা সামাল দেয়ার প্রয়াসে টিফার সঙ্গে সহযোগিতা শব্দটি যোগ করা হয়।

টিকফা চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও নাছোড়বান্দা। বুশ, ওবামা সবার আমলেই বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের টিকফা স্বাক্ষরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। আগে বলা হয়েছিল, টিকফা স্বাক্ষরিত না হলে দুই দেশের সহযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ক্রমাগত চাপাচাপি করেও বাংলাদেশকে রাজি করাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাভারে ভবনধসের ঘটনায় অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু তাদের জন্য এনে দিয়েছে মোক্ষম সুযোগ। বলা হলো, এ ঘটনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ যে জিএসপি সুবিধা পেয়ে আসছে তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজিনা পরোক্ষভাবে বলেই দিলেন টিকফা স্বাক্ষর না হলে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বাতিল করা হবে। আর এ ভয় থেকেই আমাদের রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা জিএসপি রক্ষায় টিকফা স্বাক্ষরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অথচ বিশেষজ্ঞরা এ চুক্তি না করার ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন।

টিকফা চুক্তির মাধ্যমে উদারীকরণ, মুক্তবাজার, ব্যক্তি খাতের অবাধ আন্তর্জাতিক প্রবাহ, পুঁজি বিনিয়োগ, বাজার সংরক্ষণ নীতি পরিহার, মুনাফা স্থানান্তরের অবাধ গ্যারান্টি ও মেধাস্বত্ব আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ দেশের অর্থনীতিকে মূলত ‘পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের’ কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলার একটি ব্যবস্থাপত্র বাস্তবায়ন করতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ আমাদের নীতিনির্ধারকরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলছেন, টিকফা স্বাক্ষর হলে তেমন অসুবিধা হবে না বরং যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বাড়বে এবং বেশি বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু চুক্তির কাঠামো সে কথা বলে না।

বরং চুক্তিটি কার্যকর হলে দেশের সেবা খাতগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির দখলে চলে যাবে। এতে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দেশীয় কোম্পানিগুলোর স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। অবাধ মুনাফা অর্জনের জন্য বিদেশী কোম্পানিগুলো সেবা যেমন— টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুত্, গ্যাস, পানি, চিকিত্সা, শিক্ষা, বন্দর প্রভৃতি ও পণ্যের দাম বাড়বে।

টিকফা চুক্তিতে উল্লেখ আছে— ১৯৮৬ সালে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি। সে চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিশেষ সুবিধা পাবে, তাদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির ওপর কর থাকবে না এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়া হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে এ চুক্তির ফলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোনো পক্ষ ব্যর্থ হলে অন্য পক্ষকে সহযোগিতা দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিটি হলে মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতির আশঙ্কা থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
টিফা চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মেধাস্বত্ব আইন মানতে বাধ্য করছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। টিকফা চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে ২০১৬ সালের আগেই মেধাস্বত্ব আইন মেনে চলতে হবে। চুক্তির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাণিজ্য-সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার (TRIPS), অন্যান্য প্রচলিত মেধাস্বত্ব আইনের যথাযথ এবং কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থাত্ মেধাস্বত্ব প্রতিষ্ঠা পেলে তা আমাদের দেশকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই দেশকে সফটওয়্যার লাইসেন্স ফি বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা (৬০ কোটি ডলার) ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পকেও ব্র্যান্ড নামে ব্যবহূত এ দেশে তৈরি অ্যাকসেসরিজের জন্য সংশ্লিষ্ট মার্কিন কোম্পানিকে রয়্যালিটি দিতে হবে।

বাংলাদেশকে টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র এত তত্পর হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তৃতীয় বিশ্বের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ মাঝে মধ্যেই পেয়ে থাকে। এসব স্থানে মার্কিন স্বার্থের বিরোধিতা করার সুযোগ থেকে বাংলাদেশকে বিরত রাখাটা টিকফা চুক্তির অন্যতম লুক্কায়িত এজেন্ডা বলে ধারণা। টিকফা চুক্তির খসড়ায় ১৮ নম্বর প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ একত্রে ‘দোহা ডেভেলপমেন্ট এজন্ডোর’ সফল বাস্তবায়নে সহযোগিতামূলক প্রয়াস শক্তিশালী করবে। এ চুক্তির ফলে বহুপক্ষীয়ভাবে যেকোনো বিরোধ
নিরসনের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ।

টিকফা চুক্তিতে বলা হয়েছে, শ্রম আইন পরিপালন করতে হবে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে এবং পরিবেশের মান বজায় রাখার পাশাপাশি সুশাসনের বিষয়টিও এ চুক্তির অধীনে কার্যকর করা হবে। প্রকৃতপক্ষে টিকফার প্রস্তাবনায় মানবাধিকার, শ্রমের মান ও শ্রমজীবীদের অধিকার এবং পরিবেশগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তার লক্ষ্য শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; বরং এগুলোকে ব্যবহারপূর্বক যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
বলা হচ্ছে, এ চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ কয়েক গুণ বাড়বে। সেসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়বে বাংলাদেশী পণ্য রফতানিও। এ রকম চুক্তি নাকি পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, ইরাক, উরুগুয়েসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর করেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কোন দেশের সঙ্গে এ চুক্তি করা হবে— সেটা নির্ভর করে করপোরেট স্বার্থ আর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র কেবল মুনাফা অর্জনের জন্যই একটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করে না বরং এর মাধ্যমে একটি দেশকে নিজ প্রভাব বলয়ে নিয়ে এসে ওই অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বৃদ্ধির চেষ্টা করে। যেমন উরুগুয়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ওই অঞ্চলের ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরানো হয়েছে।
মূলত জিএসপি রক্ষার কথা বলে আমাদের সরকার টিকফা চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী রফতানি পণ্য পোশাকশিল্পের জন্য কোনো জিএসপি সুবিধা দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকৃত ৯৭ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা দেয়া হলেও বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পণ্য তার আওতার বাইরে থাকায় আর্থিকভাবে তেমন লাভবান হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানিতে প্রধান বাধা হচ্ছে শুল্ক বাধা। বাংলাদেশী পোশাক রফতানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৫.৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, অন্যদিকে চীন পরিশোধ করে মাত্র ৩ শতাংশ। তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের লোভ দেখিয়ে এ চুক্তি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র অথচ চুক্তিতে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা নেই। টিকফা চুক্তির খসড়ায় পণ্য ও পুঁজির চলাচলকে অবাধ করার কথা বলা হলেও শ্রমশক্তির অবাধ যাতায়াতের সুবিধার কথা কিছুই রাখা হয়নি।
উল্লিখিত প্রস্তাবনাগুলোর আলোকে টিকফা স্বাক্ষর হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যাওয়া আর সম্ভব হবে না বরং তাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবে বাংলাদেশ। এ কারণে টিকফা চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়া করে অগ্রসর না হয়ে জনগণের সামনে চুক্তির রূপরেখা তুলে ধরা চাই। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে ও চুক্তির ধারা-উপধারায় জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো বিন্যস্ত করার দিকে মনোযোগ দেয়া আবশ্যক।

লেখক: শিক্ষার্থী
nahidir09@gmail.com
সূত্রঃ বনিকবার্তা

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s