সুরের ইন্দ্রজালে বাঁধা চারটি রাত

সুরের ইন্দ্রজালে বাঁধা চারটি রাত

খোলা আকাশ, কুয়াশার বাড়াবাড়ি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি মুগ্ধতার শক্তি যেন কিছুতেই টলাতে পারে না। এ যেন এক অন্য ঢাকা। আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এশিয়া মহাদেশের স্মরণকালের সবচেয়ে বড় শাস্ত্রীয় সংগীত উত্সব নিয়ে লিখেছেন
তরিকুর রহমান সজীবhttps://i2.wp.com/www.thedailystar.net/photo/2012/11/09/2012-11-09__cul07.jpg

অগ্রহায়ণের বাতাসে শীতের রেশ। সপ্তাহখানেক হলো শীতটা যান্ত্রিক এই ঢাকা শহরেও উঁকিঝুঁকি দিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা আর রাত্রিগুলো তাই অনেকটাই প্রথম শীতের আমেজ নিয়ে কেটে যাচ্ছিল। এর মাঝেই বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আর আইটিসি এসআরএ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ তো বটেই, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরের। একদিন নয়, দুই দিন নয়, চার চার দিন ধরে চলবে আয়োজন। তাও আবার প্রথম দুই দিনের আয়োজন চলবে সারা রাত ধরে। এই উপলক্ষেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের সময়ের সব বড় বড় রথী-মহারথীদের আগমন ঘটেছে আমাদের এই ঢাকা শহরে। এমন অভাবনীয় আয়োজনে কি আর সামিল না হওয়া যায়? সুরের এমন মধুময় আয়োজনে ঠিক মৌ-লোভীদের মতোই হামলে পড়ার জন্য মুখিয়েছিলাম অনুষ্ঠানের ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই।

ইচ্ছা ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একদম শুরু থেকেই উপস্থিত থেকে পুরো আয়োজনটা নিবিষ্ট মনে উপভোগ করা। অফিসের ঝামেলায় শেষ পর্যন্ত আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা ধরা হলো না। অফিসের কাজ সেরে রাস্তার জ্যাম পেরিয়ে যখন ঢুকলাম আর্মি স্টেডিয়ামের চৌহদ্দিতে, ততক্ষণে মঞ্চে সানাইয়ের সুরে উত্সবের আমেজ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। অনুষ্ঠানের শুরু থেকে থাকতে না পেরে যে মন খারাপটা ছিল, মুহূর্তেই তা উধাও ওস্তাদ আলী আহমেদ হোসেন খাঁর সানাইয়ের মুর্চ্ছনায়। সন্ধ্যার রাগ হংসধ্বনিতে তখন কেবল আলাপ শুরু করেছেন ওস্তাদ আলী আহমেদ হোসেন খাঁ। আর সানাইয়ের সেই সুরে গোটা স্টেডিয়ামে তখন পিনপতন নিরবতা। আলাপ শেষ করে মধ্যলয় আর দ্রুত তিনতালের পৌনে এক ঘণ্টার পরিবেশনা যখন শেষ করলেন, মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল আয়োজন প্রাঙ্গণ। মনের ভেতর কেবল মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা। শুরুতেই এমন অসাধারণ একটি পরিবেশনা যেন গোটা আয়োজনের সূচনালগ্নকে করে রাখল স্মরণীয়। আমাদের মতো যাদের সংগীতের জ্ঞানটা কম, সানাইয়ের সুরে তাদের মনের ভেতরটা যেন পূর্ণ হয়ে গেল। একে একে মঞ্চে এলেন ওমকার দাদারকার, ওস্তাদ শহীদ পারভেজ আর পণ্ডিত তেজেন্দ্র এন মজুমদার। ওমকার দাদারকারের কণ্ঠ আর শহীদ পারভেজের সেতারে আর্মি স্টেডিয়াম তখন রূপ নিয়েছে সুর সাগরের। আর সেই সাগরে আমরা যেন ভেসে চলেছি দূর থেকে দূরে। এরপর আবার কিছুটা ভিন্ন আমেজ নিয়ে মঞ্চে ওড়িশি নৃত্য নিয়ে এলেন বিদূষী সুজাতা মুখপাত্র। তার সবশেষের পরিবেশন ছিল বনমালি দাস রচিত শ্রী কৃষ্ণ লীলার অংশবিশেষ। নাচের মুদ্রাতেই রাক্ষস বধের পুরো অংশটি মুগ্ধ হয়ে দেখেছে দর্শকরা।

এরপর খানিকটা বিরতি। এতক্ষণ ধরে স্টেডিয়ামে এলেও এসেই বসে পড়াতে আর আশপাশটা ঘুরে দেখা হয়নি। এবারে একটু সুযোগ পেলাম চারপাশটা ঘুরে দেখার। ঘুরতে গিয়েই দেখলাম, সত্যিকার অর্থেই এক বিশাল আয়োজন করে বসেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আর আইটিসি এসআরএ। স্টেডিয়ামের ভেতরে বিশাল এক মঞ্চ আর তার সামনে সুবিশাল দর্শক সারি। দর্শক সারির ডান-বাম পাশে কিছুটা দূরে দূরেই বসানো প্রজেক্টর পর্দা। আর মঞ্চের ঠিক উল্টো পাশে স্টেডিয়ামের গ্যালারির উপরে বসানো একটি এলইডি টেলিভিশন। পর্দা আর টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে পুরো অনুষ্ঠান। দর্শক সারির পেছনের দিকে এলেই রয়েছে বড় ধরনের একটি ডিসপ্লে। ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতের যে ইতিহাস, তাকে যারা নিজেদের অসামান্য মেধা দিয়ে সমৃদ্ধ করে রেখেছেন, তাদের সবার ছবি আর পরিচিতি আকৃষ্ট করেছে উপস্থিত সবাইকেই। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতেই চোখে পড়ল খাবারের দোকান। আর যে দিকেই তাকাই—শুধু মানুষ। তার মধ্যে আবার বেশিরভাগই তরুণ প্রজন্মের। শাস্ত্রীয় সংগীতের এই আয়োজনে তরুণদের এমন স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি কি প্রত্যাশিত ছিল?
https://i1.wp.com/ittefaq.com.bd/admin/news_images/2012/12/04/image_1100.gif
বিরতির পর ওয়াসিম আহমেদ খান শুরু করলেন রাগ চন্দ্রকোষ দিয়ে। সোয়া একটা পার করে দিয়ে মঞ্চে উঠলেন ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান। মধ্যরাতের রাগ ঝিঞ্ঝিট দিয়ে বরাবরের মতোই আরেকবার আসর মাতিয়ে গেলেন তিনি। আর এরপর ধ্রুপদ শিল্পী পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর রাগ যোগ দিয়ে মুগ্ধ করেন দর্শকদের। সরোদের আরেকটি পরিবেশনা নিয়ে পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদারও মধ্যরাতটিকে করে রাখলেন স্মরণীয়। প্রথমদিনের সর্বশেষ পরিবেশনায় ছিলেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। অজয় চক্রবর্তীর খেয়ালের খুব বেশি রেকর্ড নেই বলে শাস্ত্রীয় সংগীতের কোনো আসরে অজয় চক্রবর্তীর পরিবেশনা মানেই সংগীতপ্রেমীদের জন্য বিশেষ কিছু। এই আসরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশাল এই আয়োজনকে স্মরণীয় করে রাখতে অজয় চক্রবর্তী তার পরিবেশনার জন্য নিজেই নতুন একটি বান্দিশ লিখেছেন ওইদিন রাতেই। ভোরের দিকে মঞ্চে ওঠা অজয় চক্রবর্তী তার পরিবেশনার জন্য বেছে নিলেন রাগ আহির-ললিত। আর তাতে তার স্বরচিত বান্দিশটি ছিল এমন, ‘জাগে সাভেরা, চাহো জিসে পাঞ্ছি মাচায়ে শোর/ রাতভর গুণীজন গায়ে বাজায়ে/ আজ আনন্দময় ভোর’।
https://i1.wp.com/www.thedailystar.net/photo/2012/12/04/2012-12-04__art01.jpg
দ্বিতীয় রাতের পরিবেশনায় মূল আকর্ষণ ছিলেন ওস্তাদ রশীদ খান আর পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা। আসর মাতানো বলতে যা বুঝায়, তার প্রমাণ দিয়ে গেলেন এই দুইজন। আগের রাতে সব শিল্পীই একটিমাত্র পরিবেশনার সুযোগই পেয়েছেন। ব্যতিক্রমটি দেখালেন রশীদ খান। রাগ পুরিয়া কল্যাণে বিলম্বিত একতাল ও দ্রুত তিনতালে প্রায় দেড় ঘণ্টা খেয়াল গেয়েই দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। তবে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে এরপর তিনি গেয়ে ওঠেন ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খানের বিখ্যাত ঠুমরি ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’।-পণ্ডিতরা তাকে সময়ের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এবং মেধাবী বলে কেন অভিহিত করেন, সেটা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন তার দুইটি পরিবেশনাতেই। পণ্ডিত শিবকুমার শর্মাও রাতের সর্বশেষ পরিবেশনায় তার সন্তুরের সুমিষ্ট আওয়াজে মোহিত করে রেখেছিলেন এক ঘণ্টারও বেশি সময়। তবে এর মাঝখানে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর মেয়ে কৌশিকি দেশীকান মাতিয়ে গেছেন আসর। রাগ বসন্তমুখারীতে বাবার এবং ওস্তাদের লেখা বান্দিশের পর মিশ্র পাহাড়িতে ঠুমরি ‘রাঙ্গি শাড়ি, গুলাবি চুনারিয়া’ গেয়ে সুরের আবেশে বিহ্বল করে গেছেন উপস্থিত দর্শকদের।

তৃতীয় দিনের আয়োজনে আরশাদ আলী খান, শশাঙ্ক মাকতেদার, আবির হোসেন, প্রিয়াঙ্কা গোপের মতো তরুণ এবং প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের পাশাপাশি ছিলেন বিদূষী গিরিজা দেবী। আর কত্থক নৃত্য নিয়ে উপস্থিত ছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি পণ্ডিত বিরজু মহারাজ। নাচ, গান আর নৃত্যের ছন্দে-তালে এদিনও মুখরিত ছিল আর্মি স্টেডিয়াম। আবিষ্ট ছিলেন দর্শক-শ্রোতা। শেষ দিনেও বাঁশি, সেতারের সুরে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শকরা। তার সাথে ব্রজেশ্বর মুখোপাধ্যায়, বিদূষী অরুণা সায়েরাম, পণ্ডিত রাজন মিশ্র, পণ্ডিত সজন মিশ্র তাদের কণ্ঠের জাদুতে মাতিয়েছেন আসর। সাথে সর্বশেষ পরিবেশনায় পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া তার বাঁশির সুরে মোহিত করেছেন দর্শকদের। সবমিলিয়ে গোটা আয়োজন শেষ হয় এক অন্যরকম আবেশ নিয়ে। সুরের মধুতে চারদিন ধরে কেবল পূর্ণই হয়নি হূদয়, উপচে পড়েছে আনাচে-কানাচে। আর এই রেশ থেকে যাবে দীর্ঘ সময় ধরে। এবারে অপেক্ষার পালা, আবার কবে এমন মধুরেণু লাভের সুযোগ এসে দাঁড়াবে দুয়ারে।
My wonderful experience about Classical Music Festival 2012
12-13 February 2012, National Museum Auditorium, Dhaka
http://www.facebook.com/media/set/?set=a.10151255131636897.489797.826936896&type=1&l=ab8aa40cb7
http://www.facebook.com/media/set/?set=a.10151255131636897.489797.826936896&type=1&l=ab8aa40cb7
source: http://ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMTJfMDRfMTJfMV85XzFfMTEwMA==
http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=259765

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s