৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই

পোশাক শিল্পে আয় বেড়েছে ২ হাজার কোটি ডলার

বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা

রহিম শেখ ॥ ১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি আয় ছিল ১৫০ কোটি ডলার। দুই দশক পর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এই সময়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিধি বাড়লেও বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তার পরিধি। শনিবার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশ ও বিদেশে ফের আলোচনায় এসেছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি। পাশাপাশি উঠে এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস কারাখানার বিষয়টিও। তৈরি পোশাক গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন ১ হাজার কারখানা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সংগঠনগুলো বলছে, সাড়ে পাঁচ হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কারখানাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করা কারখানাগুলো। এদিকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

জানা যায়, পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স বলতে বোঝায় মূলত তিনটি বিষয় : প্রথমত, শ্রম আইন, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সর্বশেষ মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক। দেশে তৈরি পোশাক খাতে সাড়ে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান সচল। বিজিএমইএ দাবি করে, এর মধ্যে ১ হাজার প্রতিষ্ঠানের রয়েছে শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন কারখানা। অন্যদিকে বাংলাদেশ সোস্যাল কমপ্লায়েন্স ইনিশিয়েটিভের (বিএসসিআই) তথ্য অনুযায়ী দেশের মাত্র ৩০০-৫০০ কারখানা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন। অধিকাংশ কারখানাই অদক্ষ শ্রমিকসহ নানা অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। সূত্র মতে, এই মুহূর্তে দেশে সাব কন্ট্রাক্ট বা ছোট কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারখানাগুলোর সংখ্যা ১ হাজারের বেশি। এসব কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই নেই। শ্রম আইনের বিষয়ে এসব কারখানাগুলোর নেই কোন জানাশোনা। এছাড়া মালিক ও শ্রমিক সম্পর্কও খুব একটা ভাল নয়। এসব কারখানায় যেখানে নিরাপত্তাজনিত যন্ত্রাংশ রাখার কথা সেখানে ঠাঁই হয় কারখানার জেনারেটর কিংবা মেশিনারিজ যন্ত্রাংশ।

ক্রেতাদের বিভিন্ন সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে আছে শ্রমিকপ্রতি অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন ও অনুপস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে ক্রেতারা অবস্থার উন্নয়ন চান। তাঁরা এখন আরও বেশি রফতানি আদেশ দিতে চান। তবে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নিশ্চয়তা।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, একটি কারখানার কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন রাতারাতি হয় না। এ জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। ক্রেতাদের উচিত এ ধরনের চাপ না দিয়ে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

সূত্র মতে, বাংলাদেশের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা আছে এমন উল্লেখযোগ্য কারখানা হলো ব্যাবিলন গ্রুপ, ফকির এ্যাপারেলস, স্টারলিং ক্রিয়েশন, ডেকো, এনভয়, হা-মীম। তবে কমপ্লায়েন্স শব্দের আড়ালে গার্মেন্টস মালিকরা মুনাফা করছেন বলে জানান টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সব মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৫ হাজার গার্মেন্টস রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, মালিকরা এই কমপ্লায়েন্স শব্দটি ব্যবহার করে কোটি কোটি আয় করছেন। কারখানার যে ভবনে নিরাপত্তার যন্ত্রাংশ রাখতে হয় সেখানে রাখা হয় জেনারেটর, মেশিন ইতাদি যন্ত্রাংশ। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা মুনাফা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ভাবেন না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্প রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, দেশের অর্ধেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে নিরপাত্তা ব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তাজরীন ফ্যাশনসের শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর ‘বিব্রত’ হয়ে সব ধরনের রফতানিচুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিটেইলার প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। মঙ্গলবার ওয়ালমার্ট এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোন অনুমোদন ছাড়াই তাজরীন ফ্যাশনসকে পোশাক তৈরির কাজ দেয় (সাব-কনট্রাক্ট), যা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এ কারণেই তারা সব রফতানিচুক্তি বাতিল করেছে। এদিকে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হয়েছে আশুলিয়ার ইউনিটি ফ্যাশনের। জাপানের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিসেন এ কারখানা পরিদর্শন করে কাজের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি তুলে শর্ত দেয়। ক্রেতার এ শর্ত পূরণে নতুন করে বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় প্রতিষ্ঠানটি রফতানি আদেশ পায়নি।

এ ব্যাপারে ফকির এ্যাপারেলসের মহাব্যবস্থাপক দেবাশীষ কুমার সাহা বলেন, কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ বহু পুরনো। একসময় ক্রেতাদের চাহিদা ছিল, কারখানার সাইনবোর্ড থাকতে হবে। আর এ খাতের আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের এসব চাহিদাও বেড়েছে। এদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সঙ্গে গত সোমবার এক বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু জানিয়েছেন, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

সূত্রঃ

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: