লোভী আর অসৎ মানুষগুলো বারবার মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে

লোভের আগুনে
লাশের মিছিল আর কত ?

 

সংলাপ ॥

লোভী  মানুষের কাছে দুটি বৃহৎ প্রান্তর পূর্ণ সম্পদ থাকলেও সে ঐরূপ আর এক প্রান্তর পূর্ণ সম্পদের জন্য সর্বদা চিন্তা ভাবনা ও কৌশল উদ্ভাবনে রত থাকে। মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছুই লোভী মানুষের পেট পূর্ণ করতে পারে না। গার্মেন্ট মালিকদের লোভের আগুন যে কত ভয়াবহ হতে পারে, আরেকবার নতুন করে তা প্রমাণিত হয়েছে। গত শনিবার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১১২ জনে উন্নীত হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১২৫ জনের বেশি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। নিহতদের প্রায় সবাই প্রাণ হারিয়েছেন আগুনে পুড়ে। আগুন লাগার সময় কলাপসিবল গেটে তালা থাকায় হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা। কতটা নিষ্ঠুর ও বর্বর হলে আগুন লাগা কারখানার গেটে তালা লাগিয়ে দেয়া যায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। মুনাফার লোভ কি মানুষের জীবনকেও তুচ্ছ করে দেয়? লোভাতুর মালিকের কাছে কি শ্রমিকের জীবনের চেয়েও মুনাফা বড় হয়ে উঠে? লোভে কি মানুষ হারিয়ে ফেলে মানবিক মূল্যবোধও?

নিশ্চিন্তপুরে যা ঘটেছে তাকে দুর্ঘটনা বলা যায় না কিছুতেই। দুর্ঘটনা দৈবাৎ ঘটে; যার ওপর মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কারখানায় আগুন কোন দৈব ঘটনা নয়। এ ঘটনা মনুষ্যসৃষ্ট। মানুষ আগুন লাগার পরিবেশ তৈরি করে দেয় বলেই আগুন লাগে। দৈবাৎ আগুন লাগলেও তা নেভানোর পদ্ধতি মানুষের জানা আছে। কিন্তু সে পথ যারা বন্ধ করে দেয়, অগ্নিকাণ্ডের দায় তাদের উপরই বর্তায়। নিশ্চিন্তপুরে যারা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার মতো প্রশস্ত পথ নেই জেনেও ৯ তলা কারখানা ভবনটি বানিয়েছে, যারা এ ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অবশ্যই তারা দায়ী।

১৯৬৫ সালের কারখানা আইন মোতাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গার্মেন্ট কারখানায় কী কী থাকতে হবে এর সুনির্দিষ্ট একটি ছক দেয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে – সব কারখানার ছাদ সম্পূর্ণ খোলা থাকবে। নিচ থেকে ছাদে ওঠার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ছাদে ওঠার দরজা সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে হবে। কারখানায় যাতায়াতের পথ, বিকল্প সিঁড়ি ও জরুরি গেট খোলা রাখতে হবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিধান অনুযায়ী, কারখানার প্রতি তলায় কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও শুকনো রাসায়নিক গুঁড়া সংরক্ষিত অবস্থায় রাখতে হবে। বিকল্প সিঁড়িপথ কমপক্ষে ৪২ ইঞ্চি প্রশস্ত ও সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি কোণে রাখতে হবে। প্রতি তলায় কমপক্ষে দুটি অগ্নিনিরোধক পয়েন্ট থাকতে হবে এবং প্রতি পয়েন্টে ২০০৪ লিটার পানি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ড্রাম ও চারটি বালতি রাখতে হবে। ধোঁয়া নির্ণয়ক যন্ত্র ও হোস রিল থাকতে হবে।  দুটি মেশিনের মাঝখানে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কারখানার ফ্লোরে কাপড়সহ সব ধরনের দাহ্যসামগ্রী বড় লটে স্তূপ করা যাবে না। শর্টসার্কিট এড়ানোর জন্য কারখানাগুলো নিয়মিত নিজেদের পানি, স্যুয়ারেজ লাইন ও বৈদ্যুতিক লাইন পরীক্ষা করবে। কারখানাগুলোকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে শ্রমিকদের নিয়ে নিয়মিত মহড়া চালাতে হবে। যতক্ষণ কারখানা চালু থাকবে, ততক্ষণ কারখানার অগ্নি মহড়া কর্মীরা ফ্লোরে টহল দেবেন।

বিধি-বিধান থাকলেও এসব বিধি-বিধানের তোয়াক্কা করেন না গার্মেন্ট মালিকরা। শ্রমিকদের বশে ও শাসনে রাখবার জন্য সরকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ বানিয়েছে। শ্রমিকদের দমন করা ব্যতীত এদের যেন অন্য কোন কাজ নেই। কারখানা মালিকরা কারখানা আইন মেনে চলছে কি না এ বিষয়ে তদারকি করার কেউ নেই বলেই মালিকরা আইন অমান্য করতে পারছে।  মালিকরা তো মুনাফার লোভে অন্ধ হয়ে আইন ভঙ্গ করতেই চাইবে। মুনাফা ব্যতীত যে তাদের আর কোন লক্ষ্য নেই।  মালিকদের চিন্তা – যত কম জায়গায় যত বেশি শ্রমিককে কাজ করানো যাবে ততবেশি মুনাফা লুটা যাবে। এদের কাছে শ্রমিকের প্রাণের কোন মূল্য নেই। তাই একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে আসা শ্রমিকরা প্রায়ই বাড়ি ফিরছেন লাশ হয়ে। মালিকদের লোভ আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে কিছুতেই থামছে না এমন দুর্ঘটনা। শ্রমিকদের সাথে আগুনে পুড়ে যদি মালিকদের কেউ মারা যেতো তাহলে হয়তো আগুন আর ধরত না।

গত ৩০ বছরে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কী হয়নি? শ্রমিকের রক্ত চুষে নেয়া, নারী শ্রমিককে ভোগ করা, ধর্ষণ করা, খুন করা, পুড়িয়ে মারা, পায়ে দলে মারা, পিষে মারা, ছাঁটাই করে মারা, জেলে ভরা, হাত-পা গুঁড়ো করে দেয়া, এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া, ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলা- ইত্যাদি সবই হয়েছে এবং এসবই হয়েছে ওই তথাকথিত বৈদেশিক মুদ্রার লোভে।

যখনই বড় কোন ঘটনা ঘটে তখনই গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। পরে তার আর কোন ধারাবাহিকতা থাকে না। অনেকক্ষেত্রে তদন্তের রিপোর্টও আলোর মুখ দেখে না। বড় দুর্ঘটনার পর পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ নিহতদের কিছু আর্থিক সাহায্য দেয়। এবার শ্রমিকের জীবনের দাম ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। হায়রে জীবন! বলার অপেক্ষা রাখে না, শনিবারের ঘটনায় গোটা বাংলাদেশ শোকার্ত। কিন্তু এই কান্না, এই শোক কি ঠেকাতে পারবে এরকম শোকাবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি? জানা কথা, বরাবরের মতো এবারও মামলা হবে, তদন্ত হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হবে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু সে দৃষ্টান্ত স্থাপিত  হয় না। হয় না বলেই লোভী আর অসৎ মানুষগুলো বারবার মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। কিন্তু এ পাশবিক খেলা আর কতদিন চলবে? লোভের আগুনে আর কত স্বপ্ন পুড়ে ছাই হবে? বারবার এরকম ঘটনা ঘটতে থাকবে, আর আমরা কেবল শোক আর উদ্বেগ প্রকাশ করেই যাবো? এর কি কোনো প্রতিকার হবে না?

সূত্রঃ http://www.bartamansanglap.com/firstpage.html

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: