বুদ্ধি : ব্রেন, আইকিউ ও পরিবেশ -মোহিত কামাল

বুদ্ধি নিয়ে গবেষণার শেষ নেই বিজ্ঞানীদের।
বুদ্ধির নানা অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন গবেষকরা। সবার দৃষ্টিভঙ্গি এবং গবেষণার প্রেক্ষাপট এক নয়
Ñ মতামতেও রয়েছে ভিন্নতা। বুদ্ধি মূলত প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়ানির্ভর। চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে বুদ্ধির প্রকাশ ঘটে, সমৃদ্ধ হয় বুদ্ধির বিভিন্ন স্তর বা ধাপ।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেক শিশুই ইন্টারনেটে হান্ট করার সুযোগ পাচ্ছে। ষাটের দশকের একজন ব্যক্তির কেবল রেডিও প্রীতিকে এরা কী চোখে দেখবে? ইন্টারনেট প্রযুক্তির জয়জয়কারের স্রোতে রেডিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নতুন প্রজন্মের শিশুটির কাছে হাস্যকরই মনে হতে পারে। যদিও বর্তমানে এফএম রেডিও তরুণদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়।
যুগেযুগে বুদ্ধির প্রকাশভঙ্গিকে বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে
  দেখা হয়েছে, বিচার করা হয়েছে। গ্রিকসভ্যতায় বৃদ্ধির পরিমাপক ছিল ‘ধারাল বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা।’ লেখার ক্ষমতা যাদের বেশি ছিল, লেখারমাধ্যমে যারা সৃজনশীলতা দেখাতে পেরেছিলেন, চীনারা তাদেরই বুদ্ধিমান হিসেবে সম্মান করত। যারা শিকারে ক্ষিপ্রতা দেখাতে পারতেন, সাহসের সঙ্গে হিংস্রপাণীর সঙ্গে লড়াই করে জয় পেতেন, প্রাচীন আফ্রিকার বিভিন্নগোত্রে তারাই ছিল বুদ্ধিমান। ডিঙি নৌকা চালানোর  দক্ষতাই ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন গোত্রের মানুষের কাছে বুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। গার্ডনার নামক একজন গবেষক সঙ্গীতের পারদর্শিতা এবং খেলাধুলার দক্ষতাকে ক্ষুরধার বু্িদ্ধর উপাদান হিসেবে দেখেছেন।
তাহলে কি বলা যায় বুদ্ধি একক কোনো মনন ক্ষমতা নয়? বুদ্ধি কী অনেক গুণের সমাহার? উত্তর জানার জন্য আসুন, বুদ্ধির গ্রহণযোগ্য সজ্ঞার দিকে ফিরে তাকাই আমরা। ডেভিড ওয়েসলার বুদ্ধির টেস্ট নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। তার প্রণীত সজ্ঞা (১৯৫৮) এবং টেস্টগুলো সমান মর্যাদা পেয়ে আসছে এখনো।
 
ওয়েসলারের মতে ‘লক্ষ্য নির্ধারণ করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ করা, যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করা, সাফল্যজনকভাবে পরিবেশ উদ্ভূত সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান করে পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতাই হলো বুদ্ধি।
বুদ্ধির পরিমাপককে বলা হয় আইকিউ
আইকিউ =
 মনের বয়স ^ ১০০
  সত্যিকার বয়স 
মনের বয়স এবং সত্যিকার বয়স যদি সমান হয়, গড় আইকিউ হবে ১০০। মনের বয়স যখন সত্যিকার বয়স থেকে বেশি হয়, আইকিউয়ের গড় একশর ওপরে চলে যায়। আবার যখন মনের বয়স সত্যিকার বয়স থেকে কম থাকে তখন আইকিউ গড়মান থেকে কমে আসে। বলা হয়ে থাকে ১৫ বছরের পর আইকিউ আর বাড়ে না (ভরংয) ১৫-৩৫ বছর পর্যন্ত স্থিত থাকে। সহজে এ সময় পরিবর্তিত হয় না আইকিউ। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, জনগোষ্ঠীর ৯৫ শতাংশেরই আইকিউ থাকে ৭০-১৩০-এর মধ্যে। যাদের আইকিউ ১৩০-এর ঊর্ধ্বে তাদের বলা হয় সুপার জিনিয়াস বা (রহঃবষষবপঃঁধষষু মরভঃবফ ) বা আশীর্বাদপুষ্ট বুদ্ধিমান। এরা অবশ্যই প্রতিভাবান, চারপাশের অপর দশজন থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
সুপার জিনিয়াসদের নিয়ে প্রচলিত আছে নানা ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস। মনে করা হয়, এদের শরীর থাকে ক্ষীণকায়, সমাজের অন্যদের সঙ্গে ভালোভাবে
  মিশতে পারে না, পাগলাটে ধরনের ইত্যাদি।
কিন্তু ব্যাপারটি আসলেই উল্টো। গবেষণায় দেখা গেছে, সুপার জিনিয়াসরা দৈহিক দিক থেকে অনেক বেশি সুস্থ-সবল, স্মার্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এরা শিক্ষা, সামাজিকতা এবং আর্থিক দিক থেকেও সফল। নানা আঙ্গিক থেকে সুপার জিনিয়াসরা সমৃদ্ধ। যাদের আইকিউ বেশি, দ্রুততার সঙ্গেই তারা সঠিক সমাধান টানতে পারেন, যেকোনো সমস্যার গভীরে প্রবেশ করা তাদের পক্ষে সহজ। সমাধান পেতে অসুবিধা হয় না তাদের।

২.
আইকিউয়ের মানের ওপর ভিত্তি করে টারমান ও মেরিল বুদ্ধির নিম্নোক্ত ধাপগুলো নির্দিষ্ট করেছেন :
 
গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিশুদের (৫-১৭ বছর) ৩.৮%-এর আইকিউ ৭০-এর কম। এখানে বিশেষ করে মনে রাখতে হবে, মানসিক প্রতিবন্ধী মানেই মানসিক রোগ নয়। তবে দেখা গেছে, যাদের আইকিউ ৫০-এর কম তাদের কয়েক ধরনের মানসিক সমস্যা বেশি দেখা যায় : যেমন-অতিরিক্ত চঞ্চল্যতা, অটিজম, নিজেকে ক্ষতি করার প্রবণতা, মৃগীরোগ ইত্যাদি।
ব্রেন বা মস্তিষ্কে রয়েছে দুটি বলয় বা গোলার্ধ। বলয় দুটি একে অপরের সঙ্গে করপাস ক্যালোসাম দ্বারা সংযুক্ত। প্রতিটি বলয়ে রয়েছে কয়েকটি লোব : যেমন
Ñ ফ্রন্টাল, প্যারাইটাল, টেম্পোরাল, অক্সিপিটাল, লিম্বিক ও ইনসুলার লোব। এগুলোর মধ্যে ফ্রন্টাল লোবের সামনের অংশ ও লিম্বিক লোব বুদ্ধি, বিবেচনা ও স্মৃতিশক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
ব্রেনের বাইরের ‘সারফেস’ থাকে কুঁচকানো, ভাঁজ করা। এগুলোকে বলে জাইরাই। জাইরাইয়ের কারণে ব্রেনের আয়তন দৃশ্যমান আয়তনের চেয়ে অনেক বেশি। এই স্তর গ্রে ম্যাটার দ্বারা গঠিত। মানুষের গ্রে ম্যাটার প্রায় ২-৪ মিলিমিটার পুরু। আর ব্রেনের ভেতরের অংশ হোয়াইট ম্যাটার দ্বারা গঠিত। গ্রে ম্যাটার স্নায়ুকোষ (নিউরন)-এর মূল অংশ তথা সেলবডি দ্বারা গঠিত। গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে গ্রে ম্যাটার বা ভাঁজ করা জাইরাইয়ের পরিমাণ যত বেশি থাকে, আইকিউ-এর মান তত বেশি বাড়ে । মানুষের মতো এত বেশি পরু গ্রে ম্যাটার আর কোনো প্রাণীর ব্রেনে দেখা যায় না। এছাড়া মানুষের ফ্রন্টাল লোব অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি বিকাশলাভ করে। এটি বুদ্ধির লোব হিসেবে পরিচিত। এ কারণে মানবজাতি শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
 
মানব মস্তিষ্কে রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরন। প্রতিদিন ক্ষয় হয় প্রায় ২৫ লাখ নিউরন। মানুষের জন্মের পর নতুন কোনো নিউরন সৃষ্টি হয় না। তবে নতুন স্নায়ুসন্ধি সৃষ্টির মাধ্যমে স্নায়ুকোষ সমৃদ্ধ হয়, মানুষের চিন্তা ও বিচারবুদ্ধি অভিজ্ঞতার আলোকে ক্রমে ঐশ্বর্যময় হতে থাকে। একারণে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের মন লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের নিউরনের গহিনে। স্নায়ুতন্ত্রের অঙ্কুরোগদমের মধ্যদিয়ে ভ্র
ƒণের বিকাশ শুর হয় মাতৃগর্ভে। দেহের অন্যান্য অংশের চেয়ে মস্তিষ্ক দ্রুতগতিতে বিকাশ লাভ করে।  জন্মের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই পরিণত হয়ে যায় ব্রেন। গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে, স্নায়ুকোষগুলো ১২০ বছর বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু খুব কমসংখ্যক নিউরনই এত বছর টিকে থাকতে পারে। নানা কারণে স্নায়ুকোষ ক্ষয় হয়, বার্ধক্য চলে আসে। জাইরাইয়ের পরিমাণ কমে গেলে বুদ্ধি লোপ পেতে থাকে। কমে যায় স্মরণশক্তিও ।
বুদ্ধি কি ধারাল করা যায়?
বুদ্ধির-ব্যায়াম চর্চার মাধ্যমে ধারাল করা যায় বুদ্ধি। একই সঙ্গে প্রয়োজন রয়েছে সুস্থদেহ ও পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধ। পুষ্টিহীন ব্রেনে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।

৩.
বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, মস্তিষ্ক সচল ও সুস্থ রাখতে প্রয়োজন প্রতি মিনিটে প্রতি একশ গ্রাম ব্রেন টিস্যুতে পঞ্চান্ন মিলিলিটার রক্তের পরিবহন, পাঁচ দশমিক পাঁচ মিলিগ্রাম গ্লুকোজ এবং তিন দশমিক পাঁচ মিলিলিটার অক্সিজেন। সুতরাং ব্রেনে রক্ত প্রবাহ ও অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে প্রয়োজন দৈহিক ব্যায়াম। প্রতিদিন ভোর বেলায় খোলা আকাশে বিশুদ্ধ বাতাসে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস করা উচিত সবার। এভাবে হাঁটার মাধ্যমে ব্রেনে অক্সিজেনের প্রবাহ ঠিক রাখা সহজ হয়।
দেহের বিভিন্ন অংশে কোষে কোষে অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যায় রক্তের লোহিত কণিকা ।
যারা রক্তশূন্যতা রোগে ভোগেন তাদের রক্তে লৌহের পরিমাণ কম থাকে। লোহিত কণিকা তখন অক্সিজেন বহন করার ক্ষমতা হারাতে থাকে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বুদ্ধি।
রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত শিশুরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, নতুন তথ্য শিখতে পারে না। আমাদের দেশে শিশুদের রক্তশূন্যতার সাধারণ একটি কারণ হলো কৃমি। খুব সহজে এর চিকিৎসা সম্ভব। প্রয়োজনে নিয়মিত কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত শিশুকে। শিশুর রক্তশূন্যতারোধ করার এটি একটি উপায়। সুতরাং স্কুল হেলথ ইস্যুতে সামগ্রিকভাবে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। শিশুদের বুদ্ধির বিকাশ যেন সাধারণ একটি কারণে বিপদগ্রস্ত না হয়, খেয়াল রাখতে হবে।
 
বুদ্ধি বিকাশের জন্য বংশগতপ্রাপ্ত জিনের বৈশিষ্ট্যই সব নয়। পরিবেশের গুরুত্বও কম নয়। সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে উদ্দীপ্ত হয় শিশুর বুদ্ধি। পরে বিস্তারিত আলাপ করা হয়েছে এ বিষয়টি ।
আমাদের দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে রয়েছে আয়োডিনের ঘাটতি। আয়োডিনের অভাবে শিশুর বুদ্ধি হ্রাস পায়
Ñ আইকিউ কমে যায়। মানসিক প্রতিবন্ধীত্বের একটি বড় কারণ আয়োডিনের অভাব। এই অভাবটিও সহজে মোকাবিলা করা যায়।
অযত
œ অবহেলায় যেন কোনো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে না যায়, সতর্ক থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
ব্রিটেনের মনোগবেষক রাটারের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, পরিবেশের কারণে শিশুর আইকিউয়ের সংখ্যামান ২০ পর্যন্ত ওঠা-নামা করতে পারে। তাই সুন্দর পরিবেশ নির্মাণের জন্য সচেষ্ট হতে হবে সবাইকে।
 
বুদ্ধিদীপ্ত কাজের জন্য প্রয়োজন রয়েছে নিয়মিত ভালো ঘুমের। ভালো ঘুম হলে দেহ-মন সুস্থ থাকে। কাজে উদ্যম জাগে।
ভালো ঘুমের জন্য সুষনি শাক খাওয়া যেতে পারে। এ শাকে রয়েছে স্ন্গ্ধি ও নিদ্রাকর উপাদন। অনেকে মনে করেন, বাহ্মী শাকের
  রসও বুদ্ধিদীপ্তি বাড়িয়ে থাকে। 
প্রতিটি কাজে মনোযোগ থাকতে হবে। চোখ কান খোলা রেখে যা শেখা হয়, তার স্থায়িত্ব তত বেশি। চিন্তা-চেতনা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা তখন বাড়ে মনোযোগের কারণে। ব্রেন ম্যাটারের অ্যাসোসিয়েশন ফাইবারের রিফ্লেক্স ক্ষমতা ধারাল করা যায় এভাবে। ফলে বুদ্ধির ধার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

শিশুর বুদ্ধির বিকাশ 
মন ও বোধের বিকাশই বুদ্ধি বিকাশের মূল স্তম্ভ। মন হচ্ছে ব্রেনেরই অংশ যা চিন্তা-চেতনার সঙ্গে যুক্ত। ব্রেনের মাধ্যমেই আমরা কোনো কিছু শনাক্ত করতে পারি, জানতে এবং বুঝতে পারি জিনিসটি কী। যেকোনো ঘটনার পেছনের অন্তর্নিহিত কারণও উদঘাটন করতে পারি বুদ্ধি ব্যবহার করে।
 
জন্মের পরপরই শিশুর মন সক্রিয় হয়। শারীরিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার মনও বিকশিত হতে শুরু করে। কারণ তখন সে
Ñ
মানুষ সম্বন্ধে
  ধারণা লাভ করে।
বস্তু সম্পর্কে শেখে।
নতুন কৌশল আয়ত্তে আনে। দক্ষতা বাড়ে।
পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত করে।
অনেক তথ্য, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা লাভ করে।
মনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে ওঠে শিশু। শিশু কতটুকু বুদ্ধির অধিকারী হবে, নির্ভর করে দুটো প্রধান বিষয়ের ওপর :
পরিবেশ : বুদ্ধির আলোকে কীভাবে এগোচ্ছে শিশু, কীভাবে মেধার বিকাশ সাধিত হবে, মূলত নির্ভর করছে তার চারপাশের পরিবেশের ওপর।
পুরো শৈশবকালে জীব ও পরিবেশের ক্রমাগত পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপরই মনের নানা ধারার উত্তরণ ঘটে। কেবল জন্মগতভাবে প্রাপ্ত জিনের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। শিশুর বুদ্ধি বিকাশের জন্য পরিবেশের গুরুত্বও কম নয়। ঐশ্বর্যময় পরিবেশই নিশ্চিত করতে পারে শিশুটির জন্য বুদ্ধিদীপ্ত ভবিষ্যৎ।

৪.
বুদ্ধি বিকাশে যেভাবে উৎসাহিত করা যায় শিশুকে?
প্রথম বছরে শিশুটির মনের বিকাশের জন্য নানাভাবে সহায়তা করা যায়। যদি মা-বাবা :
শিশুটির সঙ্গে কথা বিনিময় করার চেষ্টা করেন।
শিশুটির সঙ্গে খেলাধুলায় শরিক হন।
এমন একটি স্থানে শিশুকে রাখেন যার পাশে কী ঘটছে না ঘটছে সে দেখতে পায়। এতে শিশুর আস্থা বাড়ে।
 
খেলনা এবং কৌতূহলোদ্দীপক কোনো কিছু শিশুকে দেওয়া উচিত, যা নেড়েচেড়ে দেখতে পারে, খুলতে পারে।
তাকে নতুন কৌশল শিখতে দেওয়া উচিত। যেমন
Ñ নিজ হাতে খেতে দেওয়া, ইত্যাদি।
প্রথম বছরের পর মনের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে যদি নিচের কাজগুলোর প্রতি উৎসাহিত করা হয় শিশুকে :
 
কথা বলতে দেওয়া।
নতুন কৌশল, যেমন নিজের পোশাক পরতে দেওয়া, ছবি আঁকার চর্চায় শিশুকে নিয়োজিত রাখা। ইচ্ছের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইচ্ছে জাগিয়ে রাখার কৌশল নির্ধারণ করা।
জানার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলা।
নতুন নতুন স্থানে শিশুকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া।
এমন খেলনা সরবরাহ করা যা স্পন্দিত করে তার চিন্তা ।
সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া।
পড়তে উৎসাহিত করে তোলা।

বুদ্ধি বিকাশে পরিবেশের ভূমিকা 
চারপাশের নানা বিষয় এবং উদ্দীপক বস্তু থেকে তথ্য আহরণ করে নবজাতকটি ধীরে ধীরে পরিবেশের ব্যাপারে সচেতন হতে থাকে। সাধারণত শিশুরা নতুনত্বের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, ভিন্ন বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হতে, মেধার অদৃশ্য সুতোটিকে নিবিড়ভাবে জড়াতে চায়। এই প্রবৃত্তি থেকে সূচিত হয় বুদ্ধিবিকাশের সাবলীল ধারা। নতুন উদ্দীপক বস্তু আবিষ্কার কিংবা পরিচিত হওয়ার পথে যেন কোনোক্রমে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না হয়
Ñ সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের।
তিন মাস পর থেকেই শিশুটি এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোটখাটো বস্তু স্পর্শ করতে চায়, নড়াচাড়া করে মুখে পুরে দিতে চেষ্টা করে। আসলে তারা বস্তুর আকার, আকৃতি, ধরন বুজে নতুন তথ্য শেখা শুরু করে তখন। বুঝতে পারে বস্তুটি কেমন, কী ধরনের দেখতে , কিংবা ছুড়ে দিলে কী ধরনের শব্দ হয় ইত্যাদি। নতুন নতুন বস্তু থেকে এভাবেই শিশুটি প্রতিনিয়ত শিখতে থাকে, পূর্ণ করে তোলে মেধা।
যখন চলাফেরা কিংবা কথা বলতে শেখে তখন নতুন তথ্য অথবা নতুন জায়গা সম্পর্কে বার বার জানতে চাইবে, নতুন স্থানে যেতে চাইবে। আগ্রহ সৃষ্টিকারী পরিবেশের ব্যাপারে বার বার খুঁটিয়ে প্রশ্ন করবে। বিরক্তি প্রকাশ করা উচিত নয়। তার জানার আগ্রহ তীব্র করে তোলাই শ্রেয়। মা-বাবা হিসেবে শিশুর তথ্যের ভাণ্ডারটি সমৃদ্ধ করে তুলুন। তার বুদ্ধি বিকাশের চাবিটি আপনার হাতে। মনে করুন সন্তান নিয়ে শিশুপার্কে গেছেন
Ñ উড়ন্ত যানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। কৌশলে সংখ্যা সম্পর্কে তাকে দক্ষ করে তোলা যায়। 
প্রশ্ন করুন, বল তো মা, কটি উড়ন্ত যান আছে সামনে?
সে গুনতে থাকবে। যদি গুনতে সফল হয়, তবে আবার প্রশ্ন করুন, কটি লাল রঙের? কটি হলুদ কিংবা নীল রঙের?
অথবা মনে করুন স্কুল-বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। গাছের ফুলগুলো গুনতে বলুন। এক, দুই, তিন থেকে দশ পর্যন্ত গোনা হলে, উল্টো দিক থেকে গুনতে বলুন
Ñ দশ নয় আট এভাবে।
পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে বলা যাবে, শিশুটি রং এবং সংখ্যা সম্বন্ধে পারদর্শী হয়ে উঠবে, তার মনোসংযোগ বাড়বে, শেখার প্রতি উদ্দীপনা জাগবে। মেধা হবে ক্ষুরধার, স্মৃতি হবে স্থায়ী।
এভাবে বিভিন্ন খেলাচ্ছলেও তাকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া যায়।
দেখবেন আড়াই বছর বয়স থেকে শিশুটি প্রশ্ন করা শুরু করেছে, ‘কি’ ‘কে’।
 
তিন বছর বয়সে জানতে চাইবে, ‘কোথায়’।
চার বছরে প্রশ্ন করবে, ‘কেন’ কখন’ ‘কীভাবে’।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ সম্বন্ধে তাদের জানার পরিধিও বাড়বে, বাড়তে থাকবে লাগাতার প্রশ্নের ধারা ।

৫.
একসময় এমন একটি বয়সে পৌঁছে যাবে, যখন কখনো দেখেনি এমন মানুষ কিংবা জায়গা সম্বন্ধে বুঝতে পারবে। অতীতে কী ঘটেছিল, ভবিষ্যতে কী ঘটবে ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা করতে পারবে নিজস্ব বোধশক্তির নবতর যুগ সূচনা হওয়ার কারণে।
সন্তানকে জ্ঞান এবং বোধশক্তি বাড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহী করতে চান?
 
একটি বই তুলে দিন তার হাতে। এ ব্যাপারে তার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিন।
ছবির বই দিলে ছবির অন্তর্নিহিত ভাব বুঝিয়ে বলুন।
গল্প শোনাতে পারেন শিশুটিকে। প্রায়ই আমরা গল্প বলি। কিন্তু তার আছে কিনা খেয়াল করি না। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুটিকে সচেতনভাবে সুস্থির মনোযোগের মাধ্যমে কিছু শেখানো গেলে, তার স্মৃতিশক্তির ভিত হবে মজবুত, অবশ্যই সে ব্রিলিয়ান্ট হতে বাধ্য।
 
অনেক সময় বুদ্ধি বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে শিশুটির মনের চাহিদা থমকে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি সম্বন্ধে সজাগ থাকা উচিত।

বুদ্ধি বিকাশে যা অন্তরায় সৃষ্টি করে
কথা বলা এবং খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগা না পাওয়া।
নতুন কিছু করার ব্যাপারে বাধার সম্মুখীন হওয়া বা উৎসাহ হারিয়ে ফেলা।
যদি অবিরাম শিশুটির খুঁত ধরা হয়, বকাঝকা করা হয়।
কানে না শোনা।
ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া।
স্কুলে অনিয়মিত হওয়া বা প্রায় অনুপস্থিত থাকা।
আমরা সবাই চাই শিশুটি সুস্থ থাকুক, নির্বিঘে
œ বেড়ে উঠুক। চাই শিশুটি বুদ্ধিমান হোক।
সব চাওয়ার সফল রূপায়নের জন্য শিশুর চারপাশের প্রতি নজর রাখতে হবে বেশি
Ñ নিত্যনৈমেত্তিক খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর প্রতি যতœবান হয়ে শিশুকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারি আমরা।  

আইকিউ মান
বুদ্ধির অবস্থা
১৩০ ও ঊর্ধ্বে
সুপার জিনিয়াস বা আশীর্বাদপুষ্ট প্রতিভা
১২০-১২৯
বিশেষ উজ্জ্বল বুদ্ধি
১১১-১১৯
স্বাভাবিকের চেয়ে উজ্জ্বল বুদ্ধি
৯০-১১০
স্বাভাবিক বুদ্ধি
৮০-৮৯
অল্প বুদ্ধি
৭০-৭৯
সীমারেখা সম্পন্ন বুদ্ধি
৭০-এর নিচে
মানসিক প্রতিবন্ধী

সূত্রঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7419

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: