পৃথিবীর মোট ভাষার অর্ধেক আজ হারিয়ে যেতে বসেছে

নৃ-জাতিগোষ্ঠীর শিল্প ও সংস্কৃতি

উপমহাদেশে নৃ-জাতিগোষ্ঠীর আবির্ভাব কবে ঘটেছিল তা সঠিক করে বলা মুশকিল। ইংরেজ শাসনামলে চা-বাগনে কাজ কিংবা রেললাইন বসানোর কাজ করতে করতে অনেক নৃ-জাতিগোষ্ঠী স্থায়ী আবাস গড়ে এ দেশে। সময়ের পরিক্রমায় তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি নৃ-গাষ্ঠীর মধ্যে শুধুমাত্র চাকমা ও মারমা বাদে ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চংগ্যা, চাক, বম, লুসাই, পাংখোয়া, খিয়াং ও খুমী সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতি খুবই সংকটের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে আদিমতম ভয়, বিস্ময়, বিধ্বংস ভীতি এবং লৌকিক-অলৌকিক বিশ্বাসের মাঝে সুন্দরবনে দূর অতীতে শেকড় গেড়েছে পুন্ড্র, পৌন্ড্র, ক্ষত্রিয় বা পৌদ শ্রেণীভুক্ত কৌম্য জীবনযাত্রার মানুষেরা। কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসা প্রান্তিক নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখেছেন আরেফীন করিম

শত প্রতিকূলতা আর ঝড় ঝঞ্ঝার মাঝেও বেঁচে ছিলেন বোয়া সিনিয়র। আন্দামান নিকোবরের গ্রেট আন্দামানিজ গোত্রের_প্রায় লক্ষাধিক বছরের প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠীর শেষ বংশধর এই ব্যক্তিটি সম্প্রতি মারা গেছেন। আর তার সাথে সাথেই যেমন বিলুপ্তি ঘটে বো’ ভাষার তেমনি কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়, একটি নৃ-জাতিগোষ্ঠীর সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাস। দুনিয়াজুড়ে এমনি ঘটনা পূর্বেও দেখা গেছে। দুঃখজনক ও বেদনাতুর এমনি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশেও। এদেশের ৪৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ভাষা আজ হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছে। এ কথা বললে বোধ করি অতু্যক্তি হবে না, যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসনের ফলে কোনো কোনো নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতি হুমকী তথা বিলুপ্তির পথে রয়েছে। বিশেষ করে উলেস্নখ করার বিষয় হলো, যে সংবিধানে সরকার আবার ফিরে যেতে যাচ্ছে, সেখানেও নৃ-জাতি গোষ্ঠীর মানুষের ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতি তথা সমধিকার সম্বন্ধে স্পষ্টত তেমন কোনো ধারা-উপধারা নেই। অন্যদিকে এদেশের সুধী সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল কর্তাব্যক্তিরা- যারা শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করেন তথা বাণী কপচান তারা যতটা আগ্রহী স্প্যানিশ, ফরাসি, লাতিন, গ্রিক, ইতালিয়ান, ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি’র শিল্প ও সংস্কৃতির সমকালীন ও ঐতিহ্যগত খোঁজখবর নিয়ে, আবার তারা ততটাই উদাসীন বাড়ির কাছের পড়শির শিল্প ও সংস্কৃতির বিষয়ে। মাঝে মাঝে অবশ্য সভা সেমিনারে তারা বক্তব্য রাখেন। তৃপ্তির ঢেঁকুর বলতে এতটুকুই। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এসব জাতি গোষ্ঠীর আছে নিজস্ব ঐতিহ্য-পুরাণ, কিংবদন্তি-রূপকথা, যা সমৃদ্ধ করতে পারে আমাদের সাংস্কৃতিক রুচিকে।

পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ৪৫টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১৫ লক্ষ। এ কথা দুঃখজনক হলেও সত্য_সংবিধানে তাদের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই_কিংবা অন্যভাবে বললে স্বীকৃতি নেই। আদমশুমারি-অনুসারে ১৯৯১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি নৃতাত্তি্বক জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে_চাকমা ২, ৩৯, ৪১৭ জন, মারমা ১,৪২,৩৩৪ জন, ত্রিপুরা ৫২,৯৪২ জন, ম্রো ২২,১৬৭ জন, তঞ্চংগ্যা ১৯,২২১ জন, বম ৬,৯৮৭ জন, পাংঘোয়া ৩,২২৭ জন, চাক ২,০০০ জন, ঘিয়াং ১৯৫০ জন, খুমী ১,২৪১ জন এবং লুসাই ৬৬২ জন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ৯টি জাতিসত্তার মোট জনসংখ্যা এক লক্ষেরও নিচে। ভাষা নিয়ে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, যে ভাষার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ লক্ষের নিচে তারা হারিয়ে যাবে বিলুপ্তি শব্দের মাঝে। পৃথিবীর মোট ভাষার অর্ধেক আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে হারিয়ে যাচ্ছে ১২টি ভাষা। পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী আসন করে নিচ্ছে।

সময়ে বন্দি কলরবের মাঝে কখনো কখনো খরা, বন্যা, গোর্কি, সুনামি, ভূমিকম্প, অগ্নু্যৎপাত, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, গণহত্যাজনিত দুর্ভোগ এবং অন্যান্য দুর্গতির জন্য হঠাৎ একটি ভাষাগোষ্ঠী লোপ পেয়ে যেতে পারে। ব্যাপক দেশত্যাগ কিংবা অন্যদেশ থেকে শরণার্থী বা অভিবাসীদের সংস্কৃতির বিড়ম্বনা বৃদ্ধি পেতে পারে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আগমনে-স্থানীয় সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ইউরোপে উপনিবেশ পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় প্রধান ভাষা ছিলো ২৫০টি। শত শত আঞ্চলিক ভাষার মাঝে বর্তমানে সেখানে ১৭টি নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বেঁচে রয়েছে। সাধারণত তার ধর্ম ও ভাষার সঙ্গে নিজের স্বরূপ নির্ণয় করে থাকে। একটি ভাষার মৃতু্য হলে একটি সংস্কৃতির মৃতু্য ঘটে। সংস্কৃতির বাহক হচ্ছে ভাষা। ভাষার মৃতু্য হলে সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সেই ভাষায় রচিত কাহিনী, গল্প, রূপকথা, কিংবদন্তি, ছড়া, কবিতা, গান, ইতিহাস, ঐতিহ্যসহ সবকিছু।

বাংলাদেশের সংবিধানে ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে উলেস্নখ করা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। দেশে বসবাসকারী অন্য কোনো সম্প্রদায়ের কথা এখানে উলেস্নখ করা হয়নি। অথচ বাংলা ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামেই রয়েছে ১১টি নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষা। অন্যদিকে কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বড়গুনায় বসবাস করে ‘রাখাইন’ সম্প্রদায়। তাদের রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা ‘বর্মী’। একই ভূখণ্ডে বসবাস করলেও নিজস্ব সংস্কৃতিকে তারা সঠিকভাবে উদযাপন করতে পারছে না। এখানে হুমকি শব্দটি ব্যবহার না করে বরং বলা যায়, করাল কালের রক্তচক্ষু। অথচ এ সকল আদিবাসী জাতিসত্তার রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আদিবাসীদের মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। সংবিধানের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ শীর্ষক শিরোনামে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।’ এখানে শুধুমাত্র জাতীয় ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির কথা উলেস্নখ করা হয়েছে। সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্বন্ধে তেমন কিছু বলা হয়নি। ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রণীত চুক্তির ২৭ ধারায় বলা হয়েছে ‘যদি কোনো দেশে আঞ্চলিক, ভাষাভিত্তিক বা ধমর্ীয় এমন জনগোষ্ঠী থাকে, যারা এই দেশে সংখ্যালগিষ্ঠ, তবে তাদের ক্ষেত্রে এই অধিকার অস্বীকার করা যাবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি উপভোগ, নিজস্ব ধর্ম অবলম্বন ও প্রচার এবং নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা যাবে না।’

১৯৯৫ সালের আদিবাসীদের অধিকারসমূহের খসড়া ঘোষণায় বলা হয়েছে যে, ‘সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধিতে বিভিন্ন জাতি যে অবদান রাখে তা মানবজাতির এক যৌথ অধিকার।’ ২০০১ সালের ইউনেস্কো জেনারেল কনফারেন্সের ৩১ তম অধিবেশনে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর একটি সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হয়। আবার ২০০২’এর ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৫৬/১৬২ নম্বর প্রস্তাবটি পাস করিয়ে ভরসা দেয় যে, জাতিসংঘ লক্ষণ ও সংরক্ষণের উপায় হিসেবে বহুভাষিতা অসুরণ করবে।’ এতোকিছুর পরও শুধুই হোঁচট খাচ্ছে নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতি। ইতিহাসের বিবর্তনে নানা সম্প্রদায়, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সম্মিলন ঘটেছে বাংলাদেশের অধীন ১৪৪৫ বর্গকিলোমিটার অধু্যষিত সুন্দর বনাঞ্চলে। দূর অতীতে পুন্ড্রু, পৌন্ড্র, ক্ষত্রিয় শ্রেণীভুক্ত কৌম জীবনযাত্রার মানুষের সংখ্যাধিক্য ছিলো এখানে। ক্রমে খাদ্যান্বেষণে, বসবাসের সন্ধানে, লুটপাটের লোভে, ধর্ম প্রচারের অজুহাতে এবং শাসন-শোষণের নিমিত্তে এখানে বসত গড়ে তোলে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, মগ-ফিরিঙ্গি ও নানা শ্রেণীর তফসিলি জাতি-উপজাতি। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বেদে-বাউল, ডগবানিয়া, মুণ্ডা বা বুনোরা। পাশাপাশি সমাজ বিন্যাস ঘটে উচ্চ ও নিম্ন বর্ণের হিন্দু, মুসলমান, রাজন্য, জোতদার, মহাজন, প্রান্তিক চাষি ও নানা পেশাভিত্তিক শ্রেণীর মানুষের। তারই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনের বিচিত্র সার্বভৌম পরিকাঠামোর ওপর গড়ে ওঠে মিশ্র লোকজীবনের সংস্কৃতি। আদব আদি মুণ্ডারা যে ভাষা, ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কারের সংস্কৃতি বয়ে এনেছিল, আজকের মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মাঝে তার ছিটেফোঁটা রয়েছে। আর হারিয়েছে তাদের আদিম স্বভাব, ভাষা, ধর্ম ও পূজা-পার্বণ। কালে কালে গ্রহণ করেছে হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি। সুন্দরবনে মুন্ডারা আজ পরিণত হয়েছে অপজাত সম্প্রদায়ে। তাদের দেখভাল করার যেমন কেউ নেই তেমনি সমাজেও তাদের অধিকার নেই। এক ভগবান তাদের উপাস্য হলেও হিন্দুদের সব পূজা-আর্চনায় তাদের করতে হয়। শুধু শীতকালের ‘শারোল পূজা’ই একমাত্র নিজস্ব কৃষ্টি হয়ে আজ বেঁচে রয়েছে মুণ্ডাদের মাঝে।

নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর সমঅধিকারই নয়, তাদের ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ আরো জোলালো ভাবে করা প্রয়োজন। শুধু রাষ্ট্রের একার এই দায়িত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের উপর এই কর্তব্য বর্তায়। আমরা কখনোই চাই না গ্রেট আন্দামানিজ গোত্রের ভাষা ‘বো’র ন্যায় কিংবা প্রতি বছর হারিয়ে যেতে বসা ১১টি নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষার মতো আমাদের নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা তথা শিল্প ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাক। শাশ্বত এক সত্য হয়ে এই সকল জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আরো বিকশিত হোক, বাঙালি সংস্কৃতির রুচিতে তারা আনুক নতুনত্ব এই প্রত্যাশা।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: