বুদ্ধি : ব্রেন, আইকিউ ও পরিবেশ -মোহিত কামাল


বুদ্ধি নিয়ে গবেষণার শেষ নেই বিজ্ঞানীদের।
বুদ্ধির নানা অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন গবেষকরা। সবার দৃষ্টিভঙ্গি এবং গবেষণার প্রেক্ষাপট এক নয়
Ñ মতামতেও রয়েছে ভিন্নতা। বুদ্ধি মূলত প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়ানির্ভর। চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে বুদ্ধির প্রকাশ ঘটে, সমৃদ্ধ হয় বুদ্ধির বিভিন্ন স্তর বা ধাপ।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেক শিশুই ইন্টারনেটে হান্ট করার সুযোগ পাচ্ছে। ষাটের দশকের একজন ব্যক্তির কেবল রেডিও প্রীতিকে এরা কী চোখে দেখবে? ইন্টারনেট প্রযুক্তির জয়জয়কারের স্রোতে রেডিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নতুন প্রজন্মের শিশুটির কাছে হাস্যকরই মনে হতে পারে। যদিও বর্তমানে এফএম রেডিও তরুণদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়।
যুগেযুগে বুদ্ধির প্রকাশভঙ্গিকে বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে
  দেখা হয়েছে, বিচার করা হয়েছে। গ্রিকসভ্যতায় বৃদ্ধির পরিমাপক ছিল ‘ধারাল বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা।’ লেখার ক্ষমতা যাদের বেশি ছিল, লেখারমাধ্যমে যারা সৃজনশীলতা দেখাতে পেরেছিলেন, চীনারা তাদেরই বুদ্ধিমান হিসেবে সম্মান করত। যারা শিকারে ক্ষিপ্রতা দেখাতে পারতেন, সাহসের সঙ্গে হিংস্রপাণীর সঙ্গে লড়াই করে জয় পেতেন, প্রাচীন আফ্রিকার বিভিন্নগোত্রে তারাই ছিল বুদ্ধিমান। ডিঙি নৌকা চালানোর  দক্ষতাই ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন গোত্রের মানুষের কাছে বুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। গার্ডনার নামক একজন গবেষক সঙ্গীতের পারদর্শিতা এবং খেলাধুলার দক্ষতাকে ক্ষুরধার বু্িদ্ধর উপাদান হিসেবে দেখেছেন।
তাহলে কি বলা যায় বুদ্ধি একক কোনো মনন ক্ষমতা নয়? বুদ্ধি কী অনেক গুণের সমাহার? উত্তর জানার জন্য আসুন, বুদ্ধির গ্রহণযোগ্য সজ্ঞার দিকে ফিরে তাকাই আমরা। ডেভিড ওয়েসলার বুদ্ধির টেস্ট নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। তার প্রণীত সজ্ঞা (১৯৫৮) এবং টেস্টগুলো সমান মর্যাদা পেয়ে আসছে এখনো।
 
ওয়েসলারের মতে ‘লক্ষ্য নির্ধারণ করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ করা, যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করা, সাফল্যজনকভাবে পরিবেশ উদ্ভূত সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান করে পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতাই হলো বুদ্ধি।
বুদ্ধির পরিমাপককে বলা হয় আইকিউ
আইকিউ =
 মনের বয়স ^ ১০০
  সত্যিকার বয়স 
মনের বয়স এবং সত্যিকার বয়স যদি সমান হয়, গড় আইকিউ হবে ১০০। মনের বয়স যখন সত্যিকার বয়স থেকে বেশি হয়, আইকিউয়ের গড় একশর ওপরে চলে যায়। আবার যখন মনের বয়স সত্যিকার বয়স থেকে কম থাকে তখন আইকিউ গড়মান থেকে কমে আসে। বলা হয়ে থাকে ১৫ বছরের পর আইকিউ আর বাড়ে না (ভরংয) ১৫-৩৫ বছর পর্যন্ত স্থিত থাকে। সহজে এ সময় পরিবর্তিত হয় না আইকিউ। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, জনগোষ্ঠীর ৯৫ শতাংশেরই আইকিউ থাকে ৭০-১৩০-এর মধ্যে। যাদের আইকিউ ১৩০-এর ঊর্ধ্বে তাদের বলা হয় সুপার জিনিয়াস বা (রহঃবষষবপঃঁধষষু মরভঃবফ ) বা আশীর্বাদপুষ্ট বুদ্ধিমান। এরা অবশ্যই প্রতিভাবান, চারপাশের অপর দশজন থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
সুপার জিনিয়াসদের নিয়ে প্রচলিত আছে নানা ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস। মনে করা হয়, এদের শরীর থাকে ক্ষীণকায়, সমাজের অন্যদের সঙ্গে ভালোভাবে
  মিশতে পারে না, পাগলাটে ধরনের ইত্যাদি।
কিন্তু ব্যাপারটি আসলেই উল্টো। গবেষণায় দেখা গেছে, সুপার জিনিয়াসরা দৈহিক দিক থেকে অনেক বেশি সুস্থ-সবল, স্মার্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এরা শিক্ষা, সামাজিকতা এবং আর্থিক দিক থেকেও সফল। নানা আঙ্গিক থেকে সুপার জিনিয়াসরা সমৃদ্ধ। যাদের আইকিউ বেশি, দ্রুততার সঙ্গেই তারা সঠিক সমাধান টানতে পারেন, যেকোনো সমস্যার গভীরে প্রবেশ করা তাদের পক্ষে সহজ। সমাধান পেতে অসুবিধা হয় না তাদের।

২.
আইকিউয়ের মানের ওপর ভিত্তি করে টারমান ও মেরিল বুদ্ধির নিম্নোক্ত ধাপগুলো নির্দিষ্ট করেছেন :
 
গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিশুদের (৫-১৭ বছর) ৩.৮%-এর আইকিউ ৭০-এর কম। এখানে বিশেষ করে মনে রাখতে হবে, মানসিক প্রতিবন্ধী মানেই মানসিক রোগ নয়। তবে দেখা গেছে, যাদের আইকিউ ৫০-এর কম তাদের কয়েক ধরনের মানসিক সমস্যা বেশি দেখা যায় : যেমন-অতিরিক্ত চঞ্চল্যতা, অটিজম, নিজেকে ক্ষতি করার প্রবণতা, মৃগীরোগ ইত্যাদি।
ব্রেন বা মস্তিষ্কে রয়েছে দুটি বলয় বা গোলার্ধ। বলয় দুটি একে অপরের সঙ্গে করপাস ক্যালোসাম দ্বারা সংযুক্ত। প্রতিটি বলয়ে রয়েছে কয়েকটি লোব : যেমন
Ñ ফ্রন্টাল, প্যারাইটাল, টেম্পোরাল, অক্সিপিটাল, লিম্বিক ও ইনসুলার লোব। এগুলোর মধ্যে ফ্রন্টাল লোবের সামনের অংশ ও লিম্বিক লোব বুদ্ধি, বিবেচনা ও স্মৃতিশক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
ব্রেনের বাইরের ‘সারফেস’ থাকে কুঁচকানো, ভাঁজ করা। এগুলোকে বলে জাইরাই। জাইরাইয়ের কারণে ব্রেনের আয়তন দৃশ্যমান আয়তনের চেয়ে অনেক বেশি। এই স্তর গ্রে ম্যাটার দ্বারা গঠিত। মানুষের গ্রে ম্যাটার প্রায় ২-৪ মিলিমিটার পুরু। আর ব্রেনের ভেতরের অংশ হোয়াইট ম্যাটার দ্বারা গঠিত। গ্রে ম্যাটার স্নায়ুকোষ (নিউরন)-এর মূল অংশ তথা সেলবডি দ্বারা গঠিত। গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে গ্রে ম্যাটার বা ভাঁজ করা জাইরাইয়ের পরিমাণ যত বেশি থাকে, আইকিউ-এর মান তত বেশি বাড়ে । মানুষের মতো এত বেশি পরু গ্রে ম্যাটার আর কোনো প্রাণীর ব্রেনে দেখা যায় না। এছাড়া মানুষের ফ্রন্টাল লোব অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি বিকাশলাভ করে। এটি বুদ্ধির লোব হিসেবে পরিচিত। এ কারণে মানবজাতি শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
 
মানব মস্তিষ্কে রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরন। প্রতিদিন ক্ষয় হয় প্রায় ২৫ লাখ নিউরন। মানুষের জন্মের পর নতুন কোনো নিউরন সৃষ্টি হয় না। তবে নতুন স্নায়ুসন্ধি সৃষ্টির মাধ্যমে স্নায়ুকোষ সমৃদ্ধ হয়, মানুষের চিন্তা ও বিচারবুদ্ধি অভিজ্ঞতার আলোকে ক্রমে ঐশ্বর্যময় হতে থাকে। একারণে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের মন লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের নিউরনের গহিনে। স্নায়ুতন্ত্রের অঙ্কুরোগদমের মধ্যদিয়ে ভ্র
ƒণের বিকাশ শুর হয় মাতৃগর্ভে। দেহের অন্যান্য অংশের চেয়ে মস্তিষ্ক দ্রুতগতিতে বিকাশ লাভ করে।  জন্মের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই পরিণত হয়ে যায় ব্রেন। গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে, স্নায়ুকোষগুলো ১২০ বছর বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু খুব কমসংখ্যক নিউরনই এত বছর টিকে থাকতে পারে। নানা কারণে স্নায়ুকোষ ক্ষয় হয়, বার্ধক্য চলে আসে। জাইরাইয়ের পরিমাণ কমে গেলে বুদ্ধি লোপ পেতে থাকে। কমে যায় স্মরণশক্তিও ।
বুদ্ধি কি ধারাল করা যায়?
বুদ্ধির-ব্যায়াম চর্চার মাধ্যমে ধারাল করা যায় বুদ্ধি। একই সঙ্গে প্রয়োজন রয়েছে সুস্থদেহ ও পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধ। পুষ্টিহীন ব্রেনে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।

৩.
বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, মস্তিষ্ক সচল ও সুস্থ রাখতে প্রয়োজন প্রতি মিনিটে প্রতি একশ গ্রাম ব্রেন টিস্যুতে পঞ্চান্ন মিলিলিটার রক্তের পরিবহন, পাঁচ দশমিক পাঁচ মিলিগ্রাম গ্লুকোজ এবং তিন দশমিক পাঁচ মিলিলিটার অক্সিজেন। সুতরাং ব্রেনে রক্ত প্রবাহ ও অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে প্রয়োজন দৈহিক ব্যায়াম। প্রতিদিন ভোর বেলায় খোলা আকাশে বিশুদ্ধ বাতাসে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস করা উচিত সবার। এভাবে হাঁটার মাধ্যমে ব্রেনে অক্সিজেনের প্রবাহ ঠিক রাখা সহজ হয়।
দেহের বিভিন্ন অংশে কোষে কোষে অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যায় রক্তের লোহিত কণিকা ।
যারা রক্তশূন্যতা রোগে ভোগেন তাদের রক্তে লৌহের পরিমাণ কম থাকে। লোহিত কণিকা তখন অক্সিজেন বহন করার ক্ষমতা হারাতে থাকে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বুদ্ধি।
রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত শিশুরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, নতুন তথ্য শিখতে পারে না। আমাদের দেশে শিশুদের রক্তশূন্যতার সাধারণ একটি কারণ হলো কৃমি। খুব সহজে এর চিকিৎসা সম্ভব। প্রয়োজনে নিয়মিত কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত শিশুকে। শিশুর রক্তশূন্যতারোধ করার এটি একটি উপায়। সুতরাং স্কুল হেলথ ইস্যুতে সামগ্রিকভাবে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। শিশুদের বুদ্ধির বিকাশ যেন সাধারণ একটি কারণে বিপদগ্রস্ত না হয়, খেয়াল রাখতে হবে।
 
বুদ্ধি বিকাশের জন্য বংশগতপ্রাপ্ত জিনের বৈশিষ্ট্যই সব নয়। পরিবেশের গুরুত্বও কম নয়। সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে উদ্দীপ্ত হয় শিশুর বুদ্ধি। পরে বিস্তারিত আলাপ করা হয়েছে এ বিষয়টি ।
আমাদের দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে রয়েছে আয়োডিনের ঘাটতি। আয়োডিনের অভাবে শিশুর বুদ্ধি হ্রাস পায়
Ñ আইকিউ কমে যায়। মানসিক প্রতিবন্ধীত্বের একটি বড় কারণ আয়োডিনের অভাব। এই অভাবটিও সহজে মোকাবিলা করা যায়।
অযত
œ অবহেলায় যেন কোনো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে না যায়, সতর্ক থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
ব্রিটেনের মনোগবেষক রাটারের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, পরিবেশের কারণে শিশুর আইকিউয়ের সংখ্যামান ২০ পর্যন্ত ওঠা-নামা করতে পারে। তাই সুন্দর পরিবেশ নির্মাণের জন্য সচেষ্ট হতে হবে সবাইকে।
 
বুদ্ধিদীপ্ত কাজের জন্য প্রয়োজন রয়েছে নিয়মিত ভালো ঘুমের। ভালো ঘুম হলে দেহ-মন সুস্থ থাকে। কাজে উদ্যম জাগে।
ভালো ঘুমের জন্য সুষনি শাক খাওয়া যেতে পারে। এ শাকে রয়েছে স্ন্গ্ধি ও নিদ্রাকর উপাদন। অনেকে মনে করেন, বাহ্মী শাকের
  রসও বুদ্ধিদীপ্তি বাড়িয়ে থাকে। 
প্রতিটি কাজে মনোযোগ থাকতে হবে। চোখ কান খোলা রেখে যা শেখা হয়, তার স্থায়িত্ব তত বেশি। চিন্তা-চেতনা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা তখন বাড়ে মনোযোগের কারণে। ব্রেন ম্যাটারের অ্যাসোসিয়েশন ফাইবারের রিফ্লেক্স ক্ষমতা ধারাল করা যায় এভাবে। ফলে বুদ্ধির ধার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

শিশুর বুদ্ধির বিকাশ 
মন ও বোধের বিকাশই বুদ্ধি বিকাশের মূল স্তম্ভ। মন হচ্ছে ব্রেনেরই অংশ যা চিন্তা-চেতনার সঙ্গে যুক্ত। ব্রেনের মাধ্যমেই আমরা কোনো কিছু শনাক্ত করতে পারি, জানতে এবং বুঝতে পারি জিনিসটি কী। যেকোনো ঘটনার পেছনের অন্তর্নিহিত কারণও উদঘাটন করতে পারি বুদ্ধি ব্যবহার করে।
 
জন্মের পরপরই শিশুর মন সক্রিয় হয়। শারীরিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার মনও বিকশিত হতে শুরু করে। কারণ তখন সে
Ñ
মানুষ সম্বন্ধে
  ধারণা লাভ করে।
বস্তু সম্পর্কে শেখে।
নতুন কৌশল আয়ত্তে আনে। দক্ষতা বাড়ে।
পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত করে।
অনেক তথ্য, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা লাভ করে।
মনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে ওঠে শিশু। শিশু কতটুকু বুদ্ধির অধিকারী হবে, নির্ভর করে দুটো প্রধান বিষয়ের ওপর :
পরিবেশ : বুদ্ধির আলোকে কীভাবে এগোচ্ছে শিশু, কীভাবে মেধার বিকাশ সাধিত হবে, মূলত নির্ভর করছে তার চারপাশের পরিবেশের ওপর।
পুরো শৈশবকালে জীব ও পরিবেশের ক্রমাগত পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপরই মনের নানা ধারার উত্তরণ ঘটে। কেবল জন্মগতভাবে প্রাপ্ত জিনের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। শিশুর বুদ্ধি বিকাশের জন্য পরিবেশের গুরুত্বও কম নয়। ঐশ্বর্যময় পরিবেশই নিশ্চিত করতে পারে শিশুটির জন্য বুদ্ধিদীপ্ত ভবিষ্যৎ।

৪.
বুদ্ধি বিকাশে যেভাবে উৎসাহিত করা যায় শিশুকে?
প্রথম বছরে শিশুটির মনের বিকাশের জন্য নানাভাবে সহায়তা করা যায়। যদি মা-বাবা :
শিশুটির সঙ্গে কথা বিনিময় করার চেষ্টা করেন।
শিশুটির সঙ্গে খেলাধুলায় শরিক হন।
এমন একটি স্থানে শিশুকে রাখেন যার পাশে কী ঘটছে না ঘটছে সে দেখতে পায়। এতে শিশুর আস্থা বাড়ে।
 
খেলনা এবং কৌতূহলোদ্দীপক কোনো কিছু শিশুকে দেওয়া উচিত, যা নেড়েচেড়ে দেখতে পারে, খুলতে পারে।
তাকে নতুন কৌশল শিখতে দেওয়া উচিত। যেমন
Ñ নিজ হাতে খেতে দেওয়া, ইত্যাদি।
প্রথম বছরের পর মনের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে যদি নিচের কাজগুলোর প্রতি উৎসাহিত করা হয় শিশুকে :
 
কথা বলতে দেওয়া।
নতুন কৌশল, যেমন নিজের পোশাক পরতে দেওয়া, ছবি আঁকার চর্চায় শিশুকে নিয়োজিত রাখা। ইচ্ছের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইচ্ছে জাগিয়ে রাখার কৌশল নির্ধারণ করা।
জানার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলা।
নতুন নতুন স্থানে শিশুকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া।
এমন খেলনা সরবরাহ করা যা স্পন্দিত করে তার চিন্তা ।
সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া।
পড়তে উৎসাহিত করে তোলা।

বুদ্ধি বিকাশে পরিবেশের ভূমিকা 
চারপাশের নানা বিষয় এবং উদ্দীপক বস্তু থেকে তথ্য আহরণ করে নবজাতকটি ধীরে ধীরে পরিবেশের ব্যাপারে সচেতন হতে থাকে। সাধারণত শিশুরা নতুনত্বের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়, ভিন্ন বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হতে, মেধার অদৃশ্য সুতোটিকে নিবিড়ভাবে জড়াতে চায়। এই প্রবৃত্তি থেকে সূচিত হয় বুদ্ধিবিকাশের সাবলীল ধারা। নতুন উদ্দীপক বস্তু আবিষ্কার কিংবা পরিচিত হওয়ার পথে যেন কোনোক্রমে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না হয়
Ñ সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের।
তিন মাস পর থেকেই শিশুটি এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোটখাটো বস্তু স্পর্শ করতে চায়, নড়াচাড়া করে মুখে পুরে দিতে চেষ্টা করে। আসলে তারা বস্তুর আকার, আকৃতি, ধরন বুজে নতুন তথ্য শেখা শুরু করে তখন। বুঝতে পারে বস্তুটি কেমন, কী ধরনের দেখতে , কিংবা ছুড়ে দিলে কী ধরনের শব্দ হয় ইত্যাদি। নতুন নতুন বস্তু থেকে এভাবেই শিশুটি প্রতিনিয়ত শিখতে থাকে, পূর্ণ করে তোলে মেধা।
যখন চলাফেরা কিংবা কথা বলতে শেখে তখন নতুন তথ্য অথবা নতুন জায়গা সম্পর্কে বার বার জানতে চাইবে, নতুন স্থানে যেতে চাইবে। আগ্রহ সৃষ্টিকারী পরিবেশের ব্যাপারে বার বার খুঁটিয়ে প্রশ্ন করবে। বিরক্তি প্রকাশ করা উচিত নয়। তার জানার আগ্রহ তীব্র করে তোলাই শ্রেয়। মা-বাবা হিসেবে শিশুর তথ্যের ভাণ্ডারটি সমৃদ্ধ করে তুলুন। তার বুদ্ধি বিকাশের চাবিটি আপনার হাতে। মনে করুন সন্তান নিয়ে শিশুপার্কে গেছেন
Ñ উড়ন্ত যানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। কৌশলে সংখ্যা সম্পর্কে তাকে দক্ষ করে তোলা যায়। 
প্রশ্ন করুন, বল তো মা, কটি উড়ন্ত যান আছে সামনে?
সে গুনতে থাকবে। যদি গুনতে সফল হয়, তবে আবার প্রশ্ন করুন, কটি লাল রঙের? কটি হলুদ কিংবা নীল রঙের?
অথবা মনে করুন স্কুল-বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। গাছের ফুলগুলো গুনতে বলুন। এক, দুই, তিন থেকে দশ পর্যন্ত গোনা হলে, উল্টো দিক থেকে গুনতে বলুন
Ñ দশ নয় আট এভাবে।
পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে বলা যাবে, শিশুটি রং এবং সংখ্যা সম্বন্ধে পারদর্শী হয়ে উঠবে, তার মনোসংযোগ বাড়বে, শেখার প্রতি উদ্দীপনা জাগবে। মেধা হবে ক্ষুরধার, স্মৃতি হবে স্থায়ী।
এভাবে বিভিন্ন খেলাচ্ছলেও তাকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া যায়।
দেখবেন আড়াই বছর বয়স থেকে শিশুটি প্রশ্ন করা শুরু করেছে, ‘কি’ ‘কে’।
 
তিন বছর বয়সে জানতে চাইবে, ‘কোথায়’।
চার বছরে প্রশ্ন করবে, ‘কেন’ কখন’ ‘কীভাবে’।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ সম্বন্ধে তাদের জানার পরিধিও বাড়বে, বাড়তে থাকবে লাগাতার প্রশ্নের ধারা ।

৫.
একসময় এমন একটি বয়সে পৌঁছে যাবে, যখন কখনো দেখেনি এমন মানুষ কিংবা জায়গা সম্বন্ধে বুঝতে পারবে। অতীতে কী ঘটেছিল, ভবিষ্যতে কী ঘটবে ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা করতে পারবে নিজস্ব বোধশক্তির নবতর যুগ সূচনা হওয়ার কারণে।
সন্তানকে জ্ঞান এবং বোধশক্তি বাড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহী করতে চান?
 
একটি বই তুলে দিন তার হাতে। এ ব্যাপারে তার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিন।
ছবির বই দিলে ছবির অন্তর্নিহিত ভাব বুঝিয়ে বলুন।
গল্প শোনাতে পারেন শিশুটিকে। প্রায়ই আমরা গল্প বলি। কিন্তু তার আছে কিনা খেয়াল করি না। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুটিকে সচেতনভাবে সুস্থির মনোযোগের মাধ্যমে কিছু শেখানো গেলে, তার স্মৃতিশক্তির ভিত হবে মজবুত, অবশ্যই সে ব্রিলিয়ান্ট হতে বাধ্য।
 
অনেক সময় বুদ্ধি বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে শিশুটির মনের চাহিদা থমকে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি সম্বন্ধে সজাগ থাকা উচিত।

বুদ্ধি বিকাশে যা অন্তরায় সৃষ্টি করে
কথা বলা এবং খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগা না পাওয়া।
নতুন কিছু করার ব্যাপারে বাধার সম্মুখীন হওয়া বা উৎসাহ হারিয়ে ফেলা।
যদি অবিরাম শিশুটির খুঁত ধরা হয়, বকাঝকা করা হয়।
কানে না শোনা।
ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া।
স্কুলে অনিয়মিত হওয়া বা প্রায় অনুপস্থিত থাকা।
আমরা সবাই চাই শিশুটি সুস্থ থাকুক, নির্বিঘে
œ বেড়ে উঠুক। চাই শিশুটি বুদ্ধিমান হোক।
সব চাওয়ার সফল রূপায়নের জন্য শিশুর চারপাশের প্রতি নজর রাখতে হবে বেশি
Ñ নিত্যনৈমেত্তিক খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর প্রতি যতœবান হয়ে শিশুকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারি আমরা।  

আইকিউ মান
বুদ্ধির অবস্থা
১৩০ ও ঊর্ধ্বে
সুপার জিনিয়াস বা আশীর্বাদপুষ্ট প্রতিভা
১২০-১২৯
বিশেষ উজ্জ্বল বুদ্ধি
১১১-১১৯
স্বাভাবিকের চেয়ে উজ্জ্বল বুদ্ধি
৯০-১১০
স্বাভাবিক বুদ্ধি
৮০-৮৯
অল্প বুদ্ধি
৭০-৭৯
সীমারেখা সম্পন্ন বুদ্ধি
৭০-এর নিচে
মানসিক প্রতিবন্ধী

সূত্রঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7419

Advertisements

স্ক্রিননির্ভর জীবন


স্ক্রিননির্ভর জীবন

  

সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে ফিরে আবার বসছেন টিভি স্ক্রিনের সামনে। রিমোটের নব ঘুরছে, একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোথাও মন বসছে না। বেডরুমের টিভিতে গৃহকর্ত্রী তখন বুঁদ হয়ে আছেন হিন্দি সিরিয়ালে। পাশের রুমে মেয়ের খোলা দরজায় চোখ রেখে দেখলেন কম্পিউটারে ফেসবুকে নিমগ্ন মেয়ে। ছোট ছেলেটি পড়ার টেবিলে বসেই ভিডিও গেমের বাটন টিপে যুদ্ধজয়ের ভার্চুয়াল নেশায় উত্তেজনায় কাঁপছে। একই ছাদের নিচে নানা স্ক্রিনে চোখ রেখে চার আপনজন হয়ে উঠেছেন চার পৃথিবীর বাসিন্দা। এক অদ্ভুত একা, নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছেন আপন আপন জগৎ। আমরা বাঁধা পড়ছি এক নতুন জীবনচক্রে। এক দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরের পৃথিবী। কখনো তা সুখ আনছে কখনো তা ডাকছে দুঃখ। কিন্তু এ থেকে যেন মুক্তি নেই। নিত্যদিনের জড়িয়ে যাওয়া এই নয়া পৃথিবীই যেন আমাদের নয়ানিয়তি। লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কাজ করেন। সকালে যখন অফিসে বের হন গাড়িতে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই জেনে নেন সেদিনের দৈনিক সংবাদের শিরোনাম। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে লম্বা সময় ধরে নিউজপ্রিন্টের সংবাদপত্র পাঠের ধকল আর সামলাতে হয় না তাকে। সংবাদ পাঠের মাঝেই দ্রুত নিজের পারসোনাল ই-মেইল চেক করে নেন। একবার উত্তরও দেন প্রয়োজনমতো মোবাইলের বাটন টিপে। মুঠোফোনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে ওঠে। এক মোবাইল ফোন কত কাজের সুবিধা দিচ্ছে। 
অফিসে পৌঁছেই ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখেন। আজকাল আর কাগজের বালাই নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনেই ব্যাংকিং জগতের গোটা দুনিয়ার খবর। প্রথম যখন পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তখনও টেবিলজুড়ে কাগজপত্র থাকত। দ্রুত কাগজের অফিস হারিয়ে গেল। ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের এসএমএস অ্যালার্ট বেজে ওঠে। মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের মেসেজ। আগামী সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে, তার খবর। ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন, দুই স্ক্রিনের এই চালাচালির মাঝেই দ্রুত অফিসের জরুরি মিটিংগুলো সারতে থাকেন। মিটিংয়ে থাকার সময় মুঠোফোন সাইলেন্স মুডে থাকে। মিটিং শেষে মুঠোফোন খুলে মেসেজ, মিসকলগুলোর দিকে তাকান। একটা নম্বর অচেনা মনে হয়। রিং করতেই ওপার থেকে তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয় আজ রাত সাড়ে আটটায় মেডিসিনের প্রফেসরের সঙ্গে তার অ্যাপয়েনমেন্টের কথা। ছেলেকে নিয়ে যাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিকনফার্ম করা হলো আজকের অ্যাপয়েনমেন্ট।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে কী লম্বা হয়ে গেল। দেশের খ্যাতনামা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র সেকশনে পড়ছে। দেখতে অনেকটা দাদার মতো হয়েছে। আজকাল ছেলের মুখের দিকে তাকালে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। কাজের ভিড়ে বাবার কথা মনেই পড়ে না। বাবা কি মিষ্টি আদর করতেন, আর প্রয়োজনে কি কড়া শাসন ছিল তার! নিজের ছেলের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা অন্যরকম। প্রায় বন্ধুর মতো। যদিও কর্মব্যস্ততার কারণে আস্তে আস্তে ছেলের সঙ্গে শেয়ার করার সময় কমে যাচ্ছে। ছেলে আর বাবা, দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে আলগোছে কাছে টেনে নেন নোটবুক। নোটবুকের টাচস্ক্রিনে দেখতে থাকেন নিজের বাবার ছবি। ফিরে আসতে থাকে স্মৃতি, শৈশব, ধূসর দিনের বহু উজ্জ্বল আনন্দঘন সময়ের কথা। একসময় দেখেন চোখের কোণে পানি জমেছে। একটু অবাক হয়েই পড়েন। আজ কি হলো? নোটবুক বন্ধ করে, মুঠোফোনে স্ত্রী এবং ছেলেকে মেসেজ পাঠান, আজ বিকেলে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েনমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাল্টা মেসেজ, ওকে, থ্যাংকস। মুচকি হাসতে থাকেন। বিয়ের আগে বছর দেড়েকের প্রেম ছিল। দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আজকাল দুজনের দেখা এবং কথা হয় যত, তার চেয়ে স্ক্রিনেই যোগাযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক এক এনজিওতে দ্রুত ওর উন্নতি হচ্ছে। ক্যারিয়ারের প্রতি যত
œবান স্ত্রী, আজকাল ট্রেনিং, সেমিনার এসব নিয়ে বিদেশেই থাকেন বেশি। দেশে থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রামে। খাবার টেবিলে মাঝেমধ্যে তাই ছেলেটি রসিকতা করে মাকে বলে, মা এ মাসে কদিন তুমি দেশে থাকবে? ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবার মতো মায়ের যোগাযোগের বড় মাধ্যমও হয়ে উঠছে মুঠোফোন, মেইল, স্কাইপিÑ হরেক রকম স্ক্রিন।

২.
যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো, এরকম এক জীবনের মধ্যে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে উঠতি মধ্যবিত্ত। ছোট সংসারের, কর্মব্যস্ত, বৈষয়িক উন্নতির প্রতি ধাবমান এই নয়াপ্রজন্ম বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ষাটের দশকীয় মূর্তি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠছেন। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ ভ্রমণ, অফিসনির্ভর জীবনের মাঝে পরিবার, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্ক্রিন। মুঠোফোন, আইফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক
Ñ এই ই-জগতের মাধ্যমেই পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে থাকছে নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এই নেটওয়ার্ক এখন বড় হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের যাদের সঙ্গে একসময় বছরে একবারও দেখা হতো না, চিঠি চালাচালি ঘটত না, এখন তাদের সঙ্গে চলছে নিত্য যোগাযোগ। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইয়াহু, জি-মেইলÑ কত নিত্য পথে প্রতিদিন জানা হয়ে যাচ্ছে সবার খবর। 
এটা শুধু উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনেই যে ঘটছে তা নয়। আমাদের সবার ঘরে, কোনো না কোনো কর্মে স্ক্রিনের উপস্থিতি নিত্য বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগের শক্তি আছে তারা তো বটেই, যাদের সেসব নেই তারাও ঘরের মধ্যে স্ক্রিনের চৌহদ্দিতে আটকে থাকছেন। টেলিভিশনের স্ক্রিন এখন তাদের জীবনের বড় অংশ। হিন্দি, বাংলা সিরিয়াল, কৌতুকের রিয়েলিটি শো, গানের প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস শো, নিউজ, প্রকৃতি হরেক রকম চ্যানেলের
  বহুবিচিত্র অনুষ্ঠান আমাদের ঘরের জীবনকে আটকে রেখেছে স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির সীমানায়।

৩.
রাজনীতি কি স্ক্রিনের বাইরে? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের ক্যামেরার সামনের হুড়োহুড়ি খেয়াল করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে নেতা হবার রাজনৈতিক ইঁদুর দৌড় এখন প্রবল। যারা আরেকটু সৌভাগ্যবান, যাদের সামাজিক যোগাযোগ আরেকটু গতিময়, তাদের জন্য রয়েছে টেলিভিশনের টকশো। বিরোধী দল গত চার বছরে যা করতে পারেনি, এক টকশোই তার চেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে সরকারি দলের ওপর। টেলিভিশন স্ক্রিনের মধ্যরাতের টকশো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিরক্ত করছে। মিডিয়ায় তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশও করেছেন। স্ক্রিনে জনগণ তাই দেখছে।
শুধু বুর্জোয়া রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়, আগে যারা সমাজ বদলের কথা ভাবতেন, সেই বামপন্থি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক কর্মীদের ভরসাও এখন স্ক্রিন। ফেসবুকে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কে কখন কোথায় কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে যাচ্ছেন। ছোট স্ক্রিনে বার্তা রাখছেন, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির।
 
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকের স্ক্রিন যে বড় শক্তি অর্জন করেছে, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত। বাংলাদেশেও তার স্বপ্নপ্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। স্ক্রিন যে কত শক্তিশালী, কখনো কখনো কত আত্মধ্বংসী তার প্রমাণ মিলেছে রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। এর উপাদান, প্রণোদনা, প্ররোচনা ঘটিয়েছে মোবাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা কোরান অবমাননার ছবি।

৪.
শিক্ষার্থীদের জীবনে স্ক্রিনের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে। আগে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে। এখন কম্পিউটার স্ক্রিনেই তা সারছে। জ্ঞানভাণ্ডার এখন গুগল আর ইন্টারনেটের স্ক্রিন চৌহদ্দিতে ঢুকে যাওয়ায় ম্যানুয়াল লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। শিশুরাও এখন আর মাঠে যায় না, খোলা আকাশের দেখা পায় না। মাঠ কমছে, আকাশ হারিয়ে গেছে বলেই হয়ত শিশুদের খেলার জগৎ আর স্বপ্নপৃথিবী হচ্ছে স্ক্রিন। ডোরেমন তাদের এক নয়া অ্যাডিকশনের নাম। কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন তাদের দিনরাত্রি কেড়ে নিচ্ছে। টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বসেই ভিডিও গেমসে তৈরি হচ্ছে তার স্বপ্নজগৎ। ফার্মভিল তাকে শেখাচ্ছে কল্পিত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির ফার্ম তৈরির কথা। স্পোর্টস রাইডে চড়ে সে চলে যাচ্ছে তার অনন্ত স্বপ্নের ভার্চুয়্যাল জগতে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি কম
  বলে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সেই সমস্যা সমাধান করতে আবার এগিয়ে আসছে স্ক্রিন। ভার্চুয়্যাল জগতে শিশুদের খেলাধুলা, ব্যায়াম নিয়ে আসছে এক্সবক্স। টিভির মনিটরে চোখ রেখে দুরন্ত সব অ্যাডভেঞ্চারে মাতছে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা।

৫.
স্ক্রিনের প্রভাব কি নেই তৃণমূলের জীবনে? যে কোনো বস্তি এলাকায় গেলে দেখা যাবে, ঘরে ঘরে চলছে টেলিভিশন, ভিডিও। মোবাইল ফোন তো সবার হাতে। গ্রামের ছোটবড় দোকানগুলো ছিল একসময় সামাজিক আড্ডার বড় কেন্দ্র। দোকান ঘিরে অবসর কাটত গল্প আড্ডায়। ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে চলত রাজনীতির উজির-নাজির মারা। এখন সে জায়গারও দখল নিয়েছে স্ক্রিন। ছোটবড় প্রায় প্রতিটি দোকানে ডিভিডি চলছে সর্বক্ষণ। যার যার পছন্দমতো বাংলা কিংবা হিন্দি ছায়াছবি কিংবা গানের ট্রেলর চলছে। দোকানঘরের সব ক্রেতা কিংবা অবসর কাটানো আড্ডাপ্রিয় মানুষের চোখ আর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে টিভির কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন।
স্ক্রিন আমাদের সব দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে রিয়েলিটি শো হয়ে ন্যুড জগতের তাবৎ জিনিস পেয়ে যাচ্ছি আমরা স্ক্রিনে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে স্থানান্তরের সহজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞানের জগৎ, সুশীল জগতের যেমন বিস্তার বাড়ছে, সহজগম্যতা ঘটছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে অপরাধপ্রবণতাও।
পর্নোগ্রাফির প্রসার থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নয়াজগতের আবির্ভাব এখন এই স্ক্রিনেই। বাংলাদেশেই কোরবানির গরু কেনা যাচ্ছে অনলাইনের ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই।

৬.
দেশে কি সুশাসন আসবে? দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এই শাসনগত প্রশ্নের সমাধানেও এগিয়ে এসেছে স্ক্রিন। কথা উঠেছে, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার। ই-টেন্ডারিংয়ের। এই ই-জগৎ এখন সুশাসনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান চলছে। অফিস-আদালত সর্বত্র ডিজিটালাইজেশন হবার কথা উঠছে। সর্বত্রই ই-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনদুনিয়ার পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক স্ক্রিন সাম্রাজ্য এখন আমাদের আরাধ্য। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন তাই আসলে স্ক্রিন দুনিয়ার নয়ারাজ প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

৭.
আমাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা, স্বপ্ন
Ñ সর্বত্রই স্ক্রিনের উপস্থিতি বড় হয়ে উঠছে। এর ভালো দিক যেমন আছে মন্দ দিকও তেমনি আছে। ঘরের কোণে রাতের পর রাত যে মেধাবী ছেলেটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছে আল-কায়েদার যোগসূত্রও। গ্লোবাল পৃথিবীর এই নয়া স্ক্রিনরাজ তাই এখন এক বড় বিপদের নামও। এর হাত ধরে আমরা যেমন আবিষ্কার করতে পারি জ্ঞানের সমুদ্র ঠিক তেমনি ডুবে যেতে পারি সন্ত্রাসের, পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগতেও। ছোট একটা স্ক্রিন যেমন আমাদের জীবনে আনতে পারে অনেক আনন্দের সংবাদ, ঠিক তেমনিই এই স্ক্রিনেই ভেসে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু স্ক্রিন থেকে মুক্তি নেই। আধুনিক দুনিয়ার এই নয়া আবিষ্কার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। পুঁজি আর বাণিজ্যের দুনিয়াবি সিন্ডিকেট তাতে দিয়েছে তা। কাজেই স্ক্রিন জগতেই এখন আমাদের নিত্যবাস।
এই ঈদে হরেক চ্যানেলে হাজার রকমের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চলছে। এই ছোট স্ক্রিনের নানান অনুষ্ঠান কেড়ে নেবে আমাদের ঈদজীবন। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের নব ঘুরিয়ে স্ক্রিনের মাহাত্ম্যেই হয়ত আমরা ভুলে যাব আমাদের সামাজিক আড্ডার কথা, আত্মীয় সম্মিলনের কথা। কিংবা হয়ত ফেসবুকে, মুঠোফোনে ঝালিয়ে নেব আমাদের আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব ।
সূত্র ঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7428

লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে


[প্রবাস প্রতিবেদন] তারেক রহমানের বিলেতের দিনকাল

  

ইসহাক কাজল লন্ডন থেকে

তারেক রহমান তথা তারেক জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই লন্ডনে বসবাস করছেন। তাকে নিয়ে বিলেতে বাঙালি কমিউনিটি এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাধারণ জনসমাজে কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটি তো বটেই, বাইরের সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় তাকে নিয়ে মানুষের ঔৎসুক্য আরও বেড়েছে। প্রায় ৫ বছর আগে বিলেতে এসে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার যে খরচ তার যোগান কোথা থেকে আসছে তাও এক রহস্য কমিউনিটির কাছে। বিশেষ করে তার রাজকীয় চলাফেরার খবর অনেকের কাছেই রয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন যেখানে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি করে দিন যাপন করেছেন, উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবী প্রচণ্ড অর্থকষ্টে জীবন কাটিয়েছেন বিদেশের মাটিতে, সেখানে তারেক রহমান বিনা আয়ে এমন রাজকীয়ভাবে লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে চলেন কীভাবে?
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান প্রথমে লন্ডনে আসেন ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে বাসা থেকে বের না হলেও মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন শপিং মলসহ বিনোদন কেন্দ্রে দেখেছেন অনেকে। এছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনে ওয়েলিংটন হসপিটালে কিংবা তার প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও অনেকের নজরে এসেছেন এই রহস্যময় রাজনীতিক নেতা। ক্ষমতা হারানোর পর নির্যাতনে তারেকের মেরুদণ্ডের ৬ ও ৯ নম্বর হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে এ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া কঠিন। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ের বিয়েতে তারেক রহমান জনপ্রকাশ্যে এলে তাকে ছড়ি হাতে দেখে ডাক্তারদের সেই কথাই মনে হয়েছে অনেকের।

লন্ডনে শুরুর সময়
২০০৮ সালে লন্ডনে আসার পর পর তারেক রহমান ছিলেন তৎকালীন যুক্তরাজ্য বিএনপির একচ্ছত্র নেতা কমর উদ্দিনের ছত্রছায়ায়। সেই সময় তারেক রহমান কমর উদ্দিনের এনফিল্ড টাউন ও সাউথ গেইট এই দুই এলাকার মাঝামাঝি এলাকায় এক বাসায় থাকতেন। কমর উদ্দিন লন্ডনে বাংলাদেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। কমর উদ্দিনের প্রায় বারোটির মতো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে লন্ডন ও বিভিন্ন শহরে। তারেক রহমান যে বাসায় ওঠেন কমর উদ্দিন সেই বাড়ি ক্রয় করেন ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিলাসবহুল এই বাড়ির মাসিক মর্টগেজ দিতে হতো ৩৩৫ পাউন্ড যা ক্রেডিট ক্রাঞ্চে কমে গিয়ে ২২০ পাউন্ডে নেমে আসে। তারেক রহমানকে এই মর্টগেজের টাকাও দিতে হয় না। উপরন্ত লন্ডনে তারেকের বাড়ির খরচও চালাতেন কমর উদ্দিন। লন্ডনে আসার পর কমর উদ্দিনের নিজের ব্যবহারকৃত জাগুয়ার গাড়িটি তারেককে দিয়ে দেন। মাসিক ৮০০ পাউন্ড বেতনে ড্রাইভার শরীফুল ইসলাম চাকরি পান। পরে তারেক নিজেও দুইটি গাড়ি কিনেন, ক্যাব্রিজ হিথ রোডের রূড থেকে। একটি হলো বিএম ডাব্লিউ সেভেন সিরিজ আরেকটি হচ্ছে অডি। এসময় তারেক রহমান প্রধানত বাসাতেই থাকতেন। মাঝে মধ্যে মেয়ে জাইমাকে স্কুল থেকে আনতে ড্রাইভারের সঙ্গে বের হতেন।
পাশাপাশি মাঝে মাঝে তার পরিবার নিয়ে বাসার গ্রোসারি কেনাকাটা করতেন পন্ডার্স এন্ডের টেসকো থেকে। কমর উদ্দিনের রেস্টুরেন্টের কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারীও তার কেনাকাটায় সাহায্য করতেন। প্রায় দিনই রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার প্রেরণ করা হতো। এছাড়াও প্রতিমাসে লেক সাইডের ব্লু ওয়াটার এবং সেন্ট্রাল লন্ডনের সেলফ্রিজেসে শপিং করতেন বলে জানা গেছে। যেতেন সেলফ্রিজেস এর হোম এক্সেসরিজেও। সেলফ্রিজ ও ব্লু ওয়াটার হচ্ছে ইউকের সবচাইতে বিলাসবহুল এবং ব্যয়বহুল শপিং মল। মিলিয়নিয়াররাই মূলত সেখানে কেনাকাটা করে থাকেন। তারেক প্রায়ই পুরো পরিবার নিয়ে উডগ্রীন সিনে ওয়ার্ল্ডে সিনেমা দেখতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আপ্টন পার্কের বলিনেও সিনেমা দেখতে আসতেন বলে জানা গেছে।

বর্তমান জীবন
কমর উদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তারেক রহমান থাকেন সারের কিংসটনে। এ এলাকার লোকাল অথরিটির তথ্য অনুযায়ী ৩-৪ বেডরুমের এক বাসার মাসিক ভাড়া ১২শ’ থেকে শুরু করে ৫ হাজার পাউন্ড। সি ব্যান্ডের বাসার জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স ১৪৭৪ পাউন্ড ৬৭ পেন্স। বিদ্যুৎ গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল ন্যূনতম ১৫০ পাউন্ড। তার পরিবারের ট্রান্সপোর্টেশন খরচ ন্যূনতম ১শ’ পাউন্ড। এছাড়া লন্ড্রি, পোশাক-আশাক, পত্রপত্রিকা এবং মোবাইল ও টেলিফোনসহ আরও প্রায় ৭-৮শ’ পাউন্ড খরচ হয়ই। সব মিলিয়ে ৪ হাজার পাউন্ডের নিচে তার মতো লাইফ স্টাইল চালানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। বিশেষত এই এলাকায় আরও রাঘব বোয়ালরা থাকেন। এই এলাকাতেই থেকে গেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। এখনো পাকিস্তানের সাবেক সেনা শাসক পারভেজ মোশাররফ বসবাস করছেন কিংসটনে।
এরই মধ্যে একবার তিনি ২০০৮-এ লন্ডনে এসে বার এট ল ডিগ্রি (ব্যারিস্টার) সম্পাদন করবেন বলে মনস্থির করেন। তবে তিনি সুবিধা করতে পারেনি। তারেক যেহেতু বাংলাদেশের গ্রাজুয়েট তাই লন্ডনে তাকে প্রথমে একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি এক্সেশন পাননি। সাউথ ব্যাঙ্ক ইউনিভারসিটি ও কুইন মেরী তারেককে সরাসরি রিজেক্ট করে দেয়। পরে তিনি জিডিএল করে শর্ট-কাটে বার এট ল করতে চেয়েও পারেননি।

নেই কোনো আয়ের উৎস
গত প্রায় ৫ বছর ধরে লন্ডন থাকলেও তারেক রহমান কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যেমন কোনো কাজে নিয়োজিত হতেও পারেন না। তাকে বাইরে দেখাও যায় না খুব একটা। স্ত্রী জুবাইদা গুলশান আরাও তেমন কোনো কাজ করেন না। উপরন্তু এক মেয়ের লেখাপড়ার খরচও রয়েছে। অতি সম্প্রতি ব্রিটেনে বসবাসের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তারেক রহমান। এর সুবাদে ব্রিটেনে অবাধে চলাচলের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে কোনো সরকারি অর্থায়ন বা বেনিফিট পাবেন না তারেক। দেশেও তার এবং তার মা বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা আছে। তারেকের ইনকামের একমাত্র স্বীকৃত উৎস হিসেবে ধরা যায় তার মা বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সংসদের বেতন। তবে তা দিয়ে লন্ডনে এই বিলাসী জীবনের একাংশও বহন করা সম্ভব কি না সন্দেহ।

মাথার উপর মামলার বোঝা 
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ তারেক রহমানের ওপর ঝুলছে ১৪টি মামলার খড়গ। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করা হলেও ২০০৯ সালে একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ৪টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। জীবনে আর রাজনীতি করবেন না এমন মুচলেকা দিয়ে তারেক রহমান চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে লন্ডন চলে আসার পর তা বাতিল করে বর্তমান সরকার। পরবর্তীতে বাংলাদেশে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পলাতক বিবেচনায় একাধিক মামলায় তারেক রহমানের জামিন বাতিল করে আদালত। এছাড়াও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে যে ২৫টি মামলা ঝুলছে সেগুলোর মধ্যে ২৩টি মামলাই তত্ত্বাবধায়ক আমলে দায়ের করা।

যুক্তরাজ্য নেতৃবৃন্দ যা বলেন
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও যুক্তরাজ্য বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির নেতৃবৃন্দের মতামত জানতে চাইলে তারা অনেক কথা বলেছেন।
 
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ বলেছেন, তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে আশ্রয় পেয়ে ছিলেন। লন্ডনে জীবনযাপনের ব্যয়ভার বহনের জন্য তাকে একটি হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি পর্যন্ত করতে হয়েছে। দারুণ অর্থকষ্টে একেবারে নিঃস্ব কপর্দকহীন অবস্থায় তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবীর কথা তো কারো অজানা নয়। ইদি আমিনকে সৌদি আরবে ঝাড়–দারের চাকরি করে জীবন নির্বাহ করতে হয়েছিল আর রেজা শাহ পাহলেবীর অবস্থাও খুবই করুণ ছিল। তারেক রহমান হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় অর্থসম্পদ
  নিজের করে নেয়া অনৈতিক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়ে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিকল্প ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকে ভিত্তি করে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। সেই অর্থ দিয়েই তারেক রহমান লন্ডনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থ পাচারের ঘটনাটি তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে। রাজনৈতিক পাওয়ার বা শক্তি বিক্রি করেই তারেক রহমান এই অঢেল অবৈধ অর্থ ও বিত্তের মালিক হয়েছেন। এই অপরাধের জন্য তারেক রহমানকে যেমন একদিন আইনের মুখোমুখি হতে হবে তেমনি বাংলাদেশের জনগণের আদালতেও একদিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই দিন বেশি দূরে নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্য যুবলীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে তারেক রহমানের বিলাসী জীবনযাপন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে সেনা শাসক জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক অঙ্গনে কেনাবেচার রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। স্বগর্বে তিনি ঘোষণা করেছিলেন রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি চর্চা কঠিন করে ছাড়বেন। সে ধারা অক্ষুণ
œ রেখে তারেক রহমান একই পথ অনুসরণ করেন। রাষ্ট্রীয় অর্থ সম্পদ লুটপাট করে সাহসী তারুণ্যের অহঙ্কারকে কেনাবেচার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে অনৈতিক রাজনীতি চর্চার সূচনা করেন। হাওয়া ভবনকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র করে তারেক-কোকো-মামুন এতিমের টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। লুটের সেই অর্থেই তাদের বিলাসী জীবনযাপন চলছে।
তিনি বলেন, তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি। তাই তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। লন্ডনে দীর্ঘদিন কী অবস্থায়, কোন ক্যাটাগরির ভিসায় তিনি আছেন তা জনগণের জানার অধিকার পর্যায়ে পড়ে। এখানে অবস্থানের ব্যয়ভার কীভাবে তিনি নির্বাহ করেন সে সত্যও প্রকাশ করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যেসব দুর্নীতি মামলা তার ওপর হয়েছে, সৎ সাহস থাকলে বাংলাদেশে গিয়ে সেগুলোর মোকাবেলা করা উচিত। সন্ত্রাসী চক্র আর দুর্নীতিবাজরা মিডিয়া থেকে বরাবরই নিরাপদ দূরত্বে থাকে। তারেক রহমান
  মিডিয়াকে ভয় করেন কেন? লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে একজন রাজনীতিক হিসেবে সে সত্য তার প্রকাশ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক এমএ মালিক বলেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির একজন সংগঠক ও কর্মী হিসেবে এ সত্য আমার অজানা নয় যে তারেক রহমান নিজের সকল ব্যয়ভার নিজেই বহন করে থাকেন। একটি কথা মনে রাখতে হবে তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। তার পিতা জিয়াউর রহমান দীর্ঘদিন সামরিক বাহিনীতে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। তাই তাকে কারও দয়া দাক্ষিণ্যের উপর ভরসা করে লন্ডনে বসবাস করতে হবে সে প্রশ্ন অবান্তর।
যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিয়া মনিরুল আলম এ ব্যাপারে কোনো প্রকার রাখঢাক না করে বলেন, তারেক রহমানের অবস্থা এত খারাপ নয় যে তার খাওয়াপরার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না। সিলেটি ভাষায় তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পোয়া। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন নিজের শক্তি ও সামর্থ্য।ে আজকের বাংলাদেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাতারে অনেকেই আছেন যারা আমাদের রেস্টুরেন্টে ভাত খেয়ে, থেকে লালিতপালিত হয়েছেন। অনেকের হাত খরচের অর্থ আমরা যুগিয়েছি। তারা এখন ক্ষমতার উচ্চশিখরে আছেন বলে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্রও নেই। দেখেও না দেখার ভান করেন। আর তারেক জিয়া আমাদের নেতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগামী দিনের বীর সেনানী তিনি যদি অর্থকষ্টে থাকেন তাহলে সে লজ্জা আমাদেরই। আমরা প্রাণ উজাড় করে শর্তহীনভাবে তাকে সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত। তিনি সুস্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে জাতির কাণ্ডারি হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করুন সে প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য সচিব ব্যারিস্টার এমএ সালাম বলেছেন, কিছু কিছু বিষয়ে রাজনীতি না এনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্যাতনে প্রায় পঙ্গু অবস্থায় উচ্চতর চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য তারেক রহমান লন্ডন এসেছিলেন। এখনো তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শেই লন্ডনে তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারেক রহমানের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে সে ব্যাপারে উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করা হবে। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা গুঁড়ে বালি। বিষয়টি তদন্ত করা তো দূরের কথা বর্তমান সরকার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর একটি মামলা দায়ের করে তার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে।

সূত্রঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7532

৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই


পোশাক শিল্পে আয় বেড়েছে ২ হাজার কোটি ডলার

বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা

রহিম শেখ ॥ ১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি আয় ছিল ১৫০ কোটি ডলার। দুই দশক পর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এই সময়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিধি বাড়লেও বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তার পরিধি। শনিবার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশ ও বিদেশে ফের আলোচনায় এসেছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি। পাশাপাশি উঠে এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস কারাখানার বিষয়টিও। তৈরি পোশাক গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন ১ হাজার কারখানা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সংগঠনগুলো বলছে, সাড়ে পাঁচ হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কারখানাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করা কারখানাগুলো। এদিকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

জানা যায়, পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স বলতে বোঝায় মূলত তিনটি বিষয় : প্রথমত, শ্রম আইন, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সর্বশেষ মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক। দেশে তৈরি পোশাক খাতে সাড়ে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান সচল। বিজিএমইএ দাবি করে, এর মধ্যে ১ হাজার প্রতিষ্ঠানের রয়েছে শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন কারখানা। অন্যদিকে বাংলাদেশ সোস্যাল কমপ্লায়েন্স ইনিশিয়েটিভের (বিএসসিআই) তথ্য অনুযায়ী দেশের মাত্র ৩০০-৫০০ কারখানা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন। অধিকাংশ কারখানাই অদক্ষ শ্রমিকসহ নানা অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। সূত্র মতে, এই মুহূর্তে দেশে সাব কন্ট্রাক্ট বা ছোট কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারখানাগুলোর সংখ্যা ১ হাজারের বেশি। এসব কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই নেই। শ্রম আইনের বিষয়ে এসব কারখানাগুলোর নেই কোন জানাশোনা। এছাড়া মালিক ও শ্রমিক সম্পর্কও খুব একটা ভাল নয়। এসব কারখানায় যেখানে নিরাপত্তাজনিত যন্ত্রাংশ রাখার কথা সেখানে ঠাঁই হয় কারখানার জেনারেটর কিংবা মেশিনারিজ যন্ত্রাংশ।

ক্রেতাদের বিভিন্ন সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে আছে শ্রমিকপ্রতি অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন ও অনুপস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে ক্রেতারা অবস্থার উন্নয়ন চান। তাঁরা এখন আরও বেশি রফতানি আদেশ দিতে চান। তবে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নিশ্চয়তা।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, একটি কারখানার কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন রাতারাতি হয় না। এ জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। ক্রেতাদের উচিত এ ধরনের চাপ না দিয়ে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

সূত্র মতে, বাংলাদেশের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা আছে এমন উল্লেখযোগ্য কারখানা হলো ব্যাবিলন গ্রুপ, ফকির এ্যাপারেলস, স্টারলিং ক্রিয়েশন, ডেকো, এনভয়, হা-মীম। তবে কমপ্লায়েন্স শব্দের আড়ালে গার্মেন্টস মালিকরা মুনাফা করছেন বলে জানান টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সব মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৫ হাজার গার্মেন্টস রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, মালিকরা এই কমপ্লায়েন্স শব্দটি ব্যবহার করে কোটি কোটি আয় করছেন। কারখানার যে ভবনে নিরাপত্তার যন্ত্রাংশ রাখতে হয় সেখানে রাখা হয় জেনারেটর, মেশিন ইতাদি যন্ত্রাংশ। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা মুনাফা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ভাবেন না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্প রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, দেশের অর্ধেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে নিরপাত্তা ব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তাজরীন ফ্যাশনসের শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর ‘বিব্রত’ হয়ে সব ধরনের রফতানিচুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিটেইলার প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। মঙ্গলবার ওয়ালমার্ট এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোন অনুমোদন ছাড়াই তাজরীন ফ্যাশনসকে পোশাক তৈরির কাজ দেয় (সাব-কনট্রাক্ট), যা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এ কারণেই তারা সব রফতানিচুক্তি বাতিল করেছে। এদিকে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হয়েছে আশুলিয়ার ইউনিটি ফ্যাশনের। জাপানের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিসেন এ কারখানা পরিদর্শন করে কাজের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি তুলে শর্ত দেয়। ক্রেতার এ শর্ত পূরণে নতুন করে বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় প্রতিষ্ঠানটি রফতানি আদেশ পায়নি।

এ ব্যাপারে ফকির এ্যাপারেলসের মহাব্যবস্থাপক দেবাশীষ কুমার সাহা বলেন, কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ বহু পুরনো। একসময় ক্রেতাদের চাহিদা ছিল, কারখানার সাইনবোর্ড থাকতে হবে। আর এ খাতের আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের এসব চাহিদাও বেড়েছে। এদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সঙ্গে গত সোমবার এক বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু জানিয়েছেন, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

সূত্রঃ

বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ


বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ

ডঃ কাজী নাসির উদ্দীন

সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে মার্কিন সমাজের আচার ব্যবহারের অনুপ্রবেশ বিশেষভাবে লক্ষ্যগোচর হচ্ছে গত কয়েক বছর যাবত অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে মা দিবস আর ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মার্কিনী প্রথায় ছেলেবন্ধু (বয়ফ্রেন্ড) ও মেয়েবন্ধু (গার্লফ্রেন্ড) গড়ে উঠছে এই রকম বন্ধুত্বের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না অচিরেই হয়তো শুনতে পাবো যে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই যুবক-যুবতীরা একই ছাদের নীচে বসবাস করছে ।

দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হিড়িক পড়ে গেছে এবং তরুণ-তরুণীরা বন্ধুত্বের দাবীতে বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে আর একে অপরকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে অপরিসীম আনন্দ উপভোগ করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেও এই মার্কিনী অনুকরণের বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন বাংলাদেশের গায়ক-গায়িকাদের গানের সঙ্গে নাচ যোগ করে দিতে হয় অর্থাৎ নেচে নেচে গান না গাইলে সে গান জনপ্রিয় হয় না বসে বসে গান গাওয়াটাতো এখন অতীতের ব্যাপারে পর্যবসিত হয়েছে আমাদের দেশের সংগীত শিল্পীরা চিরকাল গলা আর হৃদয়াবেগের মিশ্রণে মনের আকুলতা প্রকাশ করে এসেছে দেহকে সেখানে টেনে আনার কোন প্রয়োজন দেখা দেয় নি অবশ্য আমি এ ব্যাপারে সচেতন, যে কোন সংগীত চর্চায় গলা ও হৃদয়ের সঙ্গে দৈহিক অঙ্গভঙ্গী ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে, যেমন বাউল গান ও লালন গীতি কিনতু নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক গান যদি নেচে নেচে গাইতে হয়, তবে কেমন হয় ? পাঠকরাই বিবেচনা করুন এছাড়া দেশের তরুণীরা এখন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ আর ওড়না ছেড়ে দিয়ে বেপরোয়াভাবে শার্ট আর জিন্স-এর প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

বলা বাহুল্য যে সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্র উপরে তুলে ধরা হলো তা হুবহু মার্কিন সমাজ ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ মাত্র এক কথায় বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও সংস্কৃতি কেন এমন হলো ? পাশ্চাত্যে আরো অনেক দেশতো রয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, নেদারল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ড ভ্রমণ করার সুযোগ আমার হয়েছে সেই সমস্ত দেশে বসবাসকারী বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রাণান্তকর প্রয়াসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি আশ্চর্য্যরে ব্যাপার ঐ সমস্ত দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি কেবলমাত্র মার্কিনী সংস্কৃতি গ্রাস করে নিয়েছে বাংলাদেশকে আরো আশ্চর্য্যরে বিষয় এই যে পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি গ্রাস করে নিতে পারেনি উপরন্তু পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশে আমি মার্কিনী সংস্কৃতির প্রতি চরম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা লক্ষ্য করেছি জিব্রালটার প্রণালী পার হয়ে স্পেনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম স্পেন, ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা আমেরিকানদের রাখাল বালক (Cow Boy)হিসেবে অভিহিত করে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে বলা হয়ে থাকে আমেরিকানরা অসভ্য আর অসংস্কৃত সুতরাং হঠাৎ করে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের কাছে আমেরিকার সংস্কৃতি এতো প্রিয় হয়ে গেল কেন যে, এ বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

কোন একটি দুর্বল দেশকে যদি কোন একটি সবল দেশ চিরদিনের জন্যে অধীনস্থ করে রাখতে চায় তাহলে দুর্বল দেশটির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিন যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের উপনিবেশকে বহাল তবিয়তে রাখার জন্য এই ধ্বংস যজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছিলো নিজেদেরকে কিšতু জাগ্রত প্রহরীর মতো সে সমস্ত উপনিবেশের বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা তাদের উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির অপলাপ রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলো আর তারই ফলশ্রুতিতে সেই সমস্ত দেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো তাদের নিজ নিজ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের অবসান আজও ঘটেনি নতুন মুখোশ পরে সাহায্য সহযোগিতার অজুহাতে আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা দুর্বল দেশগুলোর উপর নিজেদের অধিকার চিরস্থায়ী করার জন্যে তৎপর হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে পেরেছে সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে একটি দেশকে দখল করা যায় সাময়িকভাবে কিনতু সে দেশটিকে জয় করা যায় না যতদিন পর্যন্ত না সে দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, গর্ব আর অহংকারকে চূর্ণ করা যায় ততদিন পর্যন্ত সে দেশের মানুষকে বশীভূত করা যায় না একটি জাতির গৌরব, গর্ব আর অহংকারকে ধ্বংস করতে হলে সর্বপ্রথম ধ্বংস করতে হবে সে জাতির সংস্কৃতিকে মহা ধ্বংসযজ্ঞে বর্তমানে আত্মনিয়োগ করেছে সাম্রাজ্যবাদীরা আর এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ কেন ? যেহেতু বাংলাদেশ হারিয়েছে তার আত্মমর্যাদা দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান দখল করে বাংলাদেশ সকল গৌরবকে দিয়েছে জলাঞ্জলি সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশকে জয় করার এই হচ্ছে মোক্ষম সময় এই পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলদেশকে রুখে দাঁড়াতে হবে যেমনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলো পৃথিবীর দিকে দিকে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন বিভিন্ন জাতি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে।

সংস্কৃতি চেতনা যাদের খুব প্রখর তাদের আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত বলিষ্ঠ এই রকম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতিকে অধীনস্থ করা কঠিন আমার নিজের দেশবাসীরাই যদি অতি আগ্রহের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীর অপসংস্কৃতির অনুকরণে উৎসাহী হয়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদীকে দোষ দিয়ে লাভ কি ? সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যটাতো দেশবাসীর সহায়তায় সহজেই হাসিল হয়ে যায় কিনতু কেন যে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এই মার্কিনী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশকে রুখে না দাঁড়িয়ে বরং স্বাগত জানালো সে বিষয়টা এবার একটু তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রে বিপরীত আকর্ষণ (Opposite attracts) করে বলে একটা তত্ত্ব আছে এর সারমর্ম এই যে তরুণ-তরুণীরা তার সম্পূর্ণ বিপরীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে বাংলাদেশ আমেরিকার সম্পূর্ণ বিপরীত ক্রান্তিতে অবস্থান করছে অর্থাৎ আমেরিকায় যখন দিন বাংলাদেশে তখন রাত আমেরিকা পৃথিবীর একটি মহাপরাক্রমশালী দেশ বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম দুর্বল দেশ আমেরিকা পৃথিবীর শীর্ষ স্থানীয় ধনী দেশ সমূহের তালিকাভুক্ত আর বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বিপরীত বটে, আর সে কারণেই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের আমেরিকার সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী খুবই স্বাভাবিক কিনতু এই স্বাভাবিক মানসিক অবস্থাটাকে দুর্বল পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে তত্ত্ব প্রকাশ পায় তার নাম হলো হীনমন্যতা বোধ ইংরেজীতে যাকে বলে Inferiority complex এই হীনমন্যতা বোধের শিকারে পরিণত হয়ে যারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মহান সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তারা শুধু নিজেদেরকেই অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে না, তারা সমগ্র জাতিকে দেউলিয়া করে দেশের স্বাধীনতাকে করে বিপন্ন। আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের জন্মলাভের জন্য ওরা নিজেরাও যথার্থভাবে দায়ী নয় আমাদের দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে দায়ী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি চেতনা, দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম গড়ে তুলতে বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন আমাদের দেশের দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থান্বেষী কর্ণধাররা তাদের নিজেদের আখের গোছানোর কাজে এবং বিদেশী প্রভুদের পদলেহনে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে দেশাত্মবোধের কোন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হননি ।

বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অনেকে আবার মার্কিন সংস্কৃতির অনুকরণের স্বপক্ষে তাদের মনের মধ্যে অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তারা বলেন, বিদেশী সংস্কৃতিতে যদি কোন ভালো জিনিস থাকে তবে তাকে গ্রহণ করতে দোষ কি ? এই প্রশ্নের জবাব হচ্ছে এই যে সংস্কৃতির সঙ্গে ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই একটি দেশের সংস্কৃতি বলতে সেই দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবন যাপন পদ্ধতিকে বুঝায় আমাদের সংস্কৃতির যে বিষয়টি আমরা সবচেয়ে ভালো মনে করি আমেরিকানরাতো সেটাকে গ্রহণ করে নিচ্ছে না তাহলে ওদের ভালো জিনিসটা আমাদের গ্রহণ করতে হবে কেন ? তাছাড়া আপাততঃ যাকে ভালো মনে হয় সংস্কৃতির অঙ্গনে তার উৎপত্তি ও বিকাশের কারণটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ মার্কিন মুল্লুকে মা দিবস ও বাবা দিবসের উদ্ভবের কারণ বিশ্লেষণ করা যাক আমেরিকায় সন্তান-সন্ততিরা তাদের ষোল (১৬) বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গৃহ ত্যাগ করে তারপর কালে ভদ্রে কখনো সখনো মা-বাবার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হয় সেই দেখা সাক্ষাতের জন্যে আবার আগে থেকেই দিনক্ষণ নির্ধারণ (appointment) করে নিতে হয় তাছাড়া আমেরিকার ছেলেমেয়েদের মা-বাবারা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে এক সঙ্গে এক বাড়িতে বসবাস করে না এই সমস্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদেরকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করার জন্যে বৎসরে একবার মা-বাবার খোঁজ খবর নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে সুতরাং আপাততঃ এটাকে একটা ভালো জিনিস মনে হলেও এর মূলে ভালো কিছুই নেই আমাদের সংস্কৃতিতে প্রতিটি দিনই মা-বাবার দিন প্রতিটি মূহুর্তে আমরা মা-বাবার সেবা করতে পারলে নিজেদেরকে ধন্য মনে করি এমন কি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় নিজেদের ঘর সংসার নিয়ে যখন আমরা আলাদাভাবে বসবাস করি তখনও মা-বাবা বেঁচে থাকলে আমরা যখন তখন মা-বাবার কাছে ছুটে যাই মা-বাবার কাছ থেকে আমাদের কোন অনুমতি নিতে হয় না আমাদেরকে একবার মায়ের বাড়ি আর একবার বাপের বাড়ি দৌড়াতে হয় না আমরা মা-বাবাকে এক সঙ্গে পাই সব সময় সুতরাং ঘটা করে আমেরিকার মতো বৎসরে একবার মা আর একবার বাবার সেবা করাটা বাংলাদেশের সভ্যতা ও সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যে কতো অবাস্তব তা সহজেই বোধগম্য ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর আগে আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর বাংলাদেশে বসবাস করি এখন আর ৩০ বছর যাবত আমি আমেরিকায় বসবাস করছি আমেরিকায় আসার পর এদেশের সংস্কৃতির তুলনায় আমাদের দেশের সংস্কৃতি যে কতো উন্নত, পরিশীলিত আর আমরা যে কি এক মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী তা আমার চোখে পড়ে দেশ থেকে বের না হলে দেশকে চেনা যায় না এটা শুধু আমার একার অভিমত নয় আমার মতো অনেকেই যারা কিছুদিন মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করেছেন তারা সবাই মার্কিনী সংস্কৃতির অন্তঃসারশূন্যতা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছেন আর তাদের নিজের বাংলাদেশে এই অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন অতি সম্প্রতি হলিউড থেকে প্রকাশিত ”একুশ” পত্রিকায় চাঁদ সুলতানা মাহবুব কামরুন-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ”ঘুরে এলাম কিছু সময় বা ঝটিকা সফর”-এ সেই দুঃখ এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ”একটা ব্যাপার খুব চোখে লাগলো, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ফ্রীডমে বিদেশকেও হার মানিয়েছে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মোহনা ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে” অন্যত্র ”নব্য সভ্যতার যুগে পুরাতন কালচার সব হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িতে ছেলেমেয়েরা সুরে বেসুরে ওদের ইচ্ছামতো গান গাচ্ছিলো আমি তখন একমনে খুঁজছিলাম আমার হারিয়ে যাওয়া পুরানো অতীতকে” বড়ই দুঃখের বিষয় সেই অতীত দ্রুত বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে কারণেই বোধ হয় প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অত প্রাণান্তকর প্রয়াস অথচ আমাদের প্রিয় দেশবাসী তরুণ-তরুণীরা নির্বিচারে বিদেশী অপসংস্কৃতিতে অবগাহন করে পরম পুলক অনুভব করছে এর চাইতে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে ? কবে কিভাবে আমাদের বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের অবসান ঘটবে ? কবে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কুঁড়ে ঘরে থেকেও শিল্পের বড়াই করতে শিখবে, কবে ওরা বুক ফুলিয়ে বলবে, ”নিক হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা” ? সে কথাই আজ ভাবছি।

একুশ পত্রিকা,

লস এঞ্জেলেস, জুলাই ৪ ২০০৭ ইস্যুঃ উপ-সম্পাদকীয়ঃ

লোভী আর অসৎ মানুষগুলো বারবার মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে


লোভের আগুনে
লাশের মিছিল আর কত ?

 

সংলাপ ॥

লোভী  মানুষের কাছে দুটি বৃহৎ প্রান্তর পূর্ণ সম্পদ থাকলেও সে ঐরূপ আর এক প্রান্তর পূর্ণ সম্পদের জন্য সর্বদা চিন্তা ভাবনা ও কৌশল উদ্ভাবনে রত থাকে। মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছুই লোভী মানুষের পেট পূর্ণ করতে পারে না। গার্মেন্ট মালিকদের লোভের আগুন যে কত ভয়াবহ হতে পারে, আরেকবার নতুন করে তা প্রমাণিত হয়েছে। গত শনিবার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১১২ জনে উন্নীত হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১২৫ জনের বেশি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। নিহতদের প্রায় সবাই প্রাণ হারিয়েছেন আগুনে পুড়ে। আগুন লাগার সময় কলাপসিবল গেটে তালা থাকায় হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা। কতটা নিষ্ঠুর ও বর্বর হলে আগুন লাগা কারখানার গেটে তালা লাগিয়ে দেয়া যায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। মুনাফার লোভ কি মানুষের জীবনকেও তুচ্ছ করে দেয়? লোভাতুর মালিকের কাছে কি শ্রমিকের জীবনের চেয়েও মুনাফা বড় হয়ে উঠে? লোভে কি মানুষ হারিয়ে ফেলে মানবিক মূল্যবোধও?

নিশ্চিন্তপুরে যা ঘটেছে তাকে দুর্ঘটনা বলা যায় না কিছুতেই। দুর্ঘটনা দৈবাৎ ঘটে; যার ওপর মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কারখানায় আগুন কোন দৈব ঘটনা নয়। এ ঘটনা মনুষ্যসৃষ্ট। মানুষ আগুন লাগার পরিবেশ তৈরি করে দেয় বলেই আগুন লাগে। দৈবাৎ আগুন লাগলেও তা নেভানোর পদ্ধতি মানুষের জানা আছে। কিন্তু সে পথ যারা বন্ধ করে দেয়, অগ্নিকাণ্ডের দায় তাদের উপরই বর্তায়। নিশ্চিন্তপুরে যারা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার মতো প্রশস্ত পথ নেই জেনেও ৯ তলা কারখানা ভবনটি বানিয়েছে, যারা এ ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অবশ্যই তারা দায়ী।

১৯৬৫ সালের কারখানা আইন মোতাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গার্মেন্ট কারখানায় কী কী থাকতে হবে এর সুনির্দিষ্ট একটি ছক দেয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে – সব কারখানার ছাদ সম্পূর্ণ খোলা থাকবে। নিচ থেকে ছাদে ওঠার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ছাদে ওঠার দরজা সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে হবে। কারখানায় যাতায়াতের পথ, বিকল্প সিঁড়ি ও জরুরি গেট খোলা রাখতে হবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিধান অনুযায়ী, কারখানার প্রতি তলায় কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও শুকনো রাসায়নিক গুঁড়া সংরক্ষিত অবস্থায় রাখতে হবে। বিকল্প সিঁড়িপথ কমপক্ষে ৪২ ইঞ্চি প্রশস্ত ও সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি কোণে রাখতে হবে। প্রতি তলায় কমপক্ষে দুটি অগ্নিনিরোধক পয়েন্ট থাকতে হবে এবং প্রতি পয়েন্টে ২০০৪ লিটার পানি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ড্রাম ও চারটি বালতি রাখতে হবে। ধোঁয়া নির্ণয়ক যন্ত্র ও হোস রিল থাকতে হবে।  দুটি মেশিনের মাঝখানে চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কারখানার ফ্লোরে কাপড়সহ সব ধরনের দাহ্যসামগ্রী বড় লটে স্তূপ করা যাবে না। শর্টসার্কিট এড়ানোর জন্য কারখানাগুলো নিয়মিত নিজেদের পানি, স্যুয়ারেজ লাইন ও বৈদ্যুতিক লাইন পরীক্ষা করবে। কারখানাগুলোকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে শ্রমিকদের নিয়ে নিয়মিত মহড়া চালাতে হবে। যতক্ষণ কারখানা চালু থাকবে, ততক্ষণ কারখানার অগ্নি মহড়া কর্মীরা ফ্লোরে টহল দেবেন।

বিধি-বিধান থাকলেও এসব বিধি-বিধানের তোয়াক্কা করেন না গার্মেন্ট মালিকরা। শ্রমিকদের বশে ও শাসনে রাখবার জন্য সরকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ বানিয়েছে। শ্রমিকদের দমন করা ব্যতীত এদের যেন অন্য কোন কাজ নেই। কারখানা মালিকরা কারখানা আইন মেনে চলছে কি না এ বিষয়ে তদারকি করার কেউ নেই বলেই মালিকরা আইন অমান্য করতে পারছে।  মালিকরা তো মুনাফার লোভে অন্ধ হয়ে আইন ভঙ্গ করতেই চাইবে। মুনাফা ব্যতীত যে তাদের আর কোন লক্ষ্য নেই।  মালিকদের চিন্তা – যত কম জায়গায় যত বেশি শ্রমিককে কাজ করানো যাবে ততবেশি মুনাফা লুটা যাবে। এদের কাছে শ্রমিকের প্রাণের কোন মূল্য নেই। তাই একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে আসা শ্রমিকরা প্রায়ই বাড়ি ফিরছেন লাশ হয়ে। মালিকদের লোভ আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে কিছুতেই থামছে না এমন দুর্ঘটনা। শ্রমিকদের সাথে আগুনে পুড়ে যদি মালিকদের কেউ মারা যেতো তাহলে হয়তো আগুন আর ধরত না।

গত ৩০ বছরে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কী হয়নি? শ্রমিকের রক্ত চুষে নেয়া, নারী শ্রমিককে ভোগ করা, ধর্ষণ করা, খুন করা, পুড়িয়ে মারা, পায়ে দলে মারা, পিষে মারা, ছাঁটাই করে মারা, জেলে ভরা, হাত-পা গুঁড়ো করে দেয়া, এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া, ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলা- ইত্যাদি সবই হয়েছে এবং এসবই হয়েছে ওই তথাকথিত বৈদেশিক মুদ্রার লোভে।

যখনই বড় কোন ঘটনা ঘটে তখনই গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। পরে তার আর কোন ধারাবাহিকতা থাকে না। অনেকক্ষেত্রে তদন্তের রিপোর্টও আলোর মুখ দেখে না। বড় দুর্ঘটনার পর পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ নিহতদের কিছু আর্থিক সাহায্য দেয়। এবার শ্রমিকের জীবনের দাম ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। হায়রে জীবন! বলার অপেক্ষা রাখে না, শনিবারের ঘটনায় গোটা বাংলাদেশ শোকার্ত। কিন্তু এই কান্না, এই শোক কি ঠেকাতে পারবে এরকম শোকাবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি? জানা কথা, বরাবরের মতো এবারও মামলা হবে, তদন্ত হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হবে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু সে দৃষ্টান্ত স্থাপিত  হয় না। হয় না বলেই লোভী আর অসৎ মানুষগুলো বারবার মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। কিন্তু এ পাশবিক খেলা আর কতদিন চলবে? লোভের আগুনে আর কত স্বপ্ন পুড়ে ছাই হবে? বারবার এরকম ঘটনা ঘটতে থাকবে, আর আমরা কেবল শোক আর উদ্বেগ প্রকাশ করেই যাবো? এর কি কোনো প্রতিকার হবে না?

সূত্রঃ http://www.bartamansanglap.com/firstpage.html

পোশাক শিল্পে আগুন: লস এঞ্জেলেসে বাদাম-এর শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভা


পোশাক শিল্পে আগুন, প্রবাসীদের শোকঃ নিহতদের প্রতি সহানুভূতি এবং সমবেদনা
লস এঞ্জেলেসে বাদাম-এর শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভা
লস এঞ্জেলেস, ২৭ নভেম্বর, একুশ নিউজ মিডিয়াঃ শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য অবিলম্বে সরকারকে নিরাপদ কার্যক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত শেষে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিরাপদ ভবনে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে বিল্ডিংকোড শক্তিশালী করে নিরাপত্তা পরিদর্শকদের আরও দায়িত্ববান হওয়া ও দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর অযোগ্যতার বিরুদ্ধে সরকারের পূর্নদৃষ্টি দেবার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন লস এঞ্জেলেসের প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশে ঘোষিত জাতীয় শোক দিবসে লস এঞ্জেলেসের প্রাণকেন্দ্র লিটল বাংলাদেশে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ ও প্রবাসীদের অবস্থান’ শীর্ষক আলোচনা ও শোকসভায় এসব কথা বলা হয়। সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভার্সিটি ইন আর্টস অ্যান্ড মিডিয়া (বাদাম)।

আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক লোকের প্রাণহানির ঘটনা ও চট্টগ্রামে উড়াল সেতু দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ডাইভার্সিটি ইন আর্টস এন্ড মিডিয়া (বাদাম) এক শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। বাদাম-এর আহবানে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, সাংবাদিক ও সাধারণ প্রবাসীরা এই সভায় যোগ দেন।

শোকসভায় কারখানার নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে ক্রেতা কোম্পানিগুলোর দায়বদ্বতা নিয়ে প্রবাসীরা তাদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। গত শনিবার সংঘটিত দেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে বৃহত্তম এবং ভয়াবহতম অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যাতে পোশাক শিল্পকে হুমকির মুখে না নিয়ে যায়, প্রবাসীরা এই ব্যাপারে সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করার নিমিত্তে দল-মত নির্বিশেষে একমত পোষণ করে।

সভায় মোবারক হোসেন বাবলু স্মারকলিপি পড়ে শোনান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অ্যাঞ্জেলিনোদের মাঝে সুচিন্তিত রূপরেখাসহ বক্তব্য দেন সিরাজুল ইসলাম খোকন, ফরিদ উ আহমেদ, সোহেল রহমান বাদল, মুশফিকুর চৌধুরী খসরু, এম হোসেন বাবু, ইসমাইল হোসেন, ড্যানী তৈয়ব, এম এ বাসিত, ডঃ জয়নাল আবেদিন, তৌফিক সোলেমান খান তুহিন, মোরশেদুল ইসলাম, আবু হানিফা, ডঃ মাহবুব হাসান, ফারহানা সাঈদ, মোঃ মুরাদ হোসেন, মুজিব সিদ্দিকী ও এম কে জামান।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে যেন কোন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না পড়ে তার প্রতি সতর্ক ও সচেতন দৃষ্টি দেবার জন্য সকলকে কাজ করে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান লস এঞ্জেলেসের রাজনৈতিক কর্মীরা। সভায় নিরাপত্তা পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর অযোগ্যতার অভিযোগ তুলে প্রবাসীরা বলেন, ব্যাক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে দেশের এই বৃহত্তর শিল্পকে বিশ্বের বুকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

This slideshow requires JavaScript.

বক্তারা জানান, কর্তৃপক্ষের অবহেলা যেমন বাঞ্ছনীয় নয়, তেমনি শ্রমিকদের ঘামের বিনিময়ে মুনাফার অংশ যেন শ্রমিকদের কল্যাণে সচেতনভাবে ব্যয় হয় তার প্রতি মালিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্বতা অস্বীকার করার সুযোগও নেই। দুর্ঘটনা যেন হত্যাকাণ্ডে পরিণত না হয় তার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান সচেতন প্রবাসীরা।

গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড ও চট্টগ্রামে উড়াল সেতু দুর্ঘটনায় নিহতদের সত্যিকারের পরিচয় সংগ্রহ করে সেই সকল দুস্থ পরিবারদের সরাসরি সাহায্য করার জন্য প্রবাসীরা একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে পোশাক শিল্প কারখানায় সংগঠিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবার ও পরিজনকে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়। এ ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য লাভ কামনা করা হয়।

আলোচনা ও শোকসভায় আরো যোগ দেন সাইফুল আনসারী চপল, জহির ইউ আহমেদ, আবদুল খালেক মিয়া, রেজাউল চৌধুরী, আব্দুল কে মিয়া, জামাল হোসেন, মতিউর রহমান মার্টিন, আলী তৈয়ব, কাজী নাজির হাসিব, রেজাউল চৌধুরী, জামাল হোসেন, মশিউর চৌধুরী, আখতার ভুঁইয়া প্রমুখ।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বাদাম-এর আহবায়ক জাহান হাসান। সহযোগিতায় ছিলেন পঙ্কজ দাস ও শফিউল ইসলাম বাবু।

%d bloggers like this: