যমুনা-বসুন্ধরার বন্ধুত্ব ভাঙছে?


যমুনা-বসুন্ধরার বন্ধুত্ব ভাঙছে?

 

দেশের শীর্ষ দুই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান যমুনা ও বসুন্ধরা গ্রুপের মধ্যে হঠাৎ করেই গড়ে উঠেছিল সখ্যতা। দীর্ঘদিনের সেই রেষারেষি, প্রতিযোগিতা এবং বিরোধিতার পর বন্ধুত্ব গড়ে উঠায় অবাক হয়েছিল সেই সময় অনেকেই। নিজেদের স্বার্থের প্রয়োজনেই যে এই বন্ধুত্ব এটা বুঝে নিয়েছিল সবাই। কিন্তু এখন আবার হঠাৎ করেই তাদের এই বন্ধুত্বে চিড় ধরতে যাচ্ছে। স্বার্থের কারণে গড়ে উঠা বন্ধত্ব এখন সেই একই কারণে ভাঙতে বসেছে। সরকারের একটি সিদ্ধান্তে নিজেদের অবস্থান নিয়ে এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। সেনা সদস্যদের আবাসনের জন্য যমুনা ও বসুন্ধরার মালিকানাধীন একটি যৌথ প্রকল্পের জমি নিয়ে দ্বিমত হওয়ায় দুই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মিত্রতায় এই ভাঙনের সুর বাজছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। আমাদের দেশের শীর্ষ দুই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হলো যমুনা ও বসুন্ধরা গ্রুপ। আবাসন ব্যবসায় বসুন্ধরার পদচারণা এবং প্রভাব দীর্ঘদিনের। সেই তুলনায় যমুনা গ্রুপ তুলনামূলকভাবে পরে এই ব্যবসায় প্রবেশ করেছে। তবে তাদের বিভিন্ন প্রকল্প দেখে বলা যেতে পারে বেশ আটঘাট বেঁধেই তারা এই সেক্টরে এসেছিল। কিন্তু নানা কারণে বিভিন্ন ঝামেলার মুখোমুখি হওয়ায়, এখনো এই ব্যবসায়ে তেমন উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করতে পারেনি এই শিল্প গ্রুপটি। সম্ভবত এ কারণেই নিজেদের পারস্পরিক প্রয়োজনে বিরোধী দু’টি শিল্প প্রতিষ্ঠান হাত মিলিয়েছিল।তার আগে বহুদিন পর্যন্ত এই দুই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার রেষারেষি ছিল প্রকাশ্য আলোচনার একটি বিষয়। ব্যবসায়িক কারণে এদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা একসময়ে তীব্র বিরোধিতায় রূপান্তরিত হতেও দেখা গেছে। ফলশ্রুতিতে যমুনা গ্রুপের পত্রিকা যুগান্তরে বসুন্ধরার নানা খবর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে সেই সময়। এক পর্যায়ে হঠাৎ করেই লেখালেখি বন্ধ হয়ে যায়। উল্টো ওই সময় একদিন দেখা গেলো, যমুনা গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক যুগান্তরে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে একটা সাপ্লিমেন্টও ছাপা হয়েছে। যাতে বসুন্ধরা চেয়ারম্যান এবং তার ছেলেদের ছবিসহ ইতিবাচক বক্তব্যও রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে সম্পর্কের উন্নতি হতে থাকে। এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় যমুনা-বসুন্ধরা হাউজিং প্রকল্প। কিন্তু সম্প্রতি সেনা সদস্যদের আবাসনের জন্য এই দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রকল্পের জমি দেয়া না দেয়ার ইস্যুতে তাদের মধ্যে আবারও নতুন করে বিরোধের সূত্রপাত ঘটছে।সেনা সদস্যদের জন্য আবাসন প্রকল্পসেনা আবাসন সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গত বছরের শুরুতে সেনাবাহিনী রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে আর্মি হাউজিং স্কিম (এএইচএস) নামে একটি নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়। নিজস্ব অর্থায়নে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য তাদের কর্মকর্তাদের জন্য সরকারের সম্মতি সাপেক্ষে এ প্রকল্পটির উদ্যোগ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য স্থানীয় কৃষিভূমি কেনার পরিকল্পনা নেয়া হয়। সড়ক, সেতু, উদ্যান, মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টারের মতো সব নাগরিক সুবিধা রেখে প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নেয়া হয়। প্রকল্পের আওতাভুক্ত সব সদস্য এ উদ্দেশ্যে মোটা অঙ্কের টাকা এএইচএসকে দেন এবং এ জন্য অনেক সেনা সদস্য ব্যাংক থেকে ঋণও নেন।প্রকল্পের শুরু থেকে বাজারমূল্যে জমি কেনার জন্য স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলোচনা চলতে থাকে। এ নিয়ে বিপরীতমুখী কথাও শোনা যায়। সেনা সদস্যদের পক্ষ থেকে বলা হয়, জমির মালিকদের প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম প্রস্তাব করা হয়। অন্যদিকে গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় জমির বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৭০ লাখ টাকা বিঘা। অথচ এ জমি তাদের কাছ থেকে ১৪/১৫ লাখ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। কিছু দালাল সেনাবাহিনীর নাম ভাঙিয়ে তাদের বাধ্য করে কম দামে জমি বিক্রি করতে। এইভাবে গ্রামবাসীদের মধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২৩ অক্টোবর ২০১০। এদিন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ও রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নে সেনা আবাসন প্রকল্পের (এএইচএস) জমি কেনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে।বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে জোর করে জমি কেনার অভিযোগ তুলে ওই দিন ভোর থেকে ৭/৮ হাজার এলাকাবাসী রূপগঞ্জ-ইছাপুরা সড়ক অবরোধ করে। তারা রাস্তার বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করে রাখে। গুলিতে একজন নিহত হওয়ার সংবাদকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা আর্মি অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির অফিস হিসেবে ব্যবহৃত সেনাক্যাম্পে হামলা চালায়। অবরুদ্ধ করে রাখে সেনা সদস্যদের। এভাবে চারটি ক্যাম্পে ২০/২৫ সেনাসদস্য ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন। অবশেষে তাদের সরিয়ে নিতে হয় হেলিকপ্টারে করে। এর পরই প্রত্যাহার করা হয় ক্যাম্প। ক্যাম্প প্রত্যাহারের পর বিক্ষুব্ধ লোকজন ক্যাম্প ভাংচুর করে লুটপাট চালায়। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিক্ষুব্ধ লোকজন ৭/৮টি বাস ভাংচুর করে ও সেনাবাহিনীর গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ভাবে এই সংঘর্ষ ব্যাপক হয়ে উঠে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি বর্ষণের ফলে বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয় এবং পরবর্তীকালে এদের একজন হাসপাতালে মারা যায়। পুরো ঘটনাটি সরকারকে যথেষ্ট বিব্রত করেছে। সেই সাথে ঘটনায় সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিরও যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে।গ্রামবাসীর সাথে সেনা সদস্যের এই তীব্র সংঘর্ষের পর স্বাভাবিকভাবেই সেখানে সেনা আবাসন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হুমকীর মুখে পড়ে যায়। ফলে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ওই প্রকল্প বাতিল হতে চলেছে। তবে রূপগঞ্জের প্রকল্পটির যাত্রা থেমে পড়লেও সেনা সদস্যদের আবাসনের প্রকল্পের কাজ থেমে নেই। বরং সরকার সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের এই ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে।সরকারের পদক্ষেপরপগঞ্জের অনভিপ্রেত ঘটনার প্রেক্ষিতে সেনা সদস্যেদের আবাসনের ওই প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত হয়ে গেলেও সরকার বসে নেই। বরং সরকারের তরফে চেষ্টা চলছে, সেনা সদস্যদের আবাসনের জন্য অন্যত্র জমি সংগ্রহের। এই প্রেক্ষিতেই সরকারের পক্ষ থেকে যমুনা-বসুন্ধরার যৌথ প্রকল্পের বারিধারা জোয়ার সাহারা প্রকল্পের জমি গ্রহণের কথা ভাবা হয়। শুধু ভাবাই নয়, ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খানের সাথে এই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিকের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল সকাল ১১টায় বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক শাহ আলমের সাথে প্রতিমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন। একই দিন ১২.৩০ এ তিনি বৈঠক করেন যমুনা গ্রুপের মালিক নুরুল ইসলাম বাবুলের সাথে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছে ওই জমি সেনা সদস্যদের আবাসনের প্রকল্পের জন্য ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিনিময়ে তাদেরকে নানা সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, যেহেতু যমুনা গ্রুপের মালিক এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পাননি, তার ব্যবস্থা করে দেয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি লোভনীয় প্রস্তাব। জানা গেছে, ওই প্রস্তাবে বসুন্ধরা চেয়ারম্যান আগেই মত দিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া প্রস্তাবটিতে শুধু ওই দিনই নয়, আরও আগেই গোপনে সরকারের কাছে মত দিয়ে এসেছেন শাহ আলম। কারণ, এটি তার জন্য বেশ সুবিধাজনক একটি প্রস্তাব। পক্ষান্তরে দ্বিমত রয়েছে নুরুল ইসলাম বাবুলের। তিনি এই প্রকল্পের জমিটি ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাবে রাজি হচ্ছেন না বলে জানা গেছে। কারণ, এর বিনিময়ে বেশ কিছু দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি লাভবান হবার সম্ভাবনা তেমন নেই বললেই চলে। অথচ প্রকল্পটির মালিকানা ছেড়ে দিলে ক্ষতি হবে তার অনেক বড়।বিরোধিতার সুর যৌথ প্রকল্পের জমি নিয়ে বসুন্ধরা চেয়ারম্যান শাহ আলমের সাথে নুরুল ইসলামের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে তাদের মধ্যকার চাপা থাকা বিরোধিতার সুরটি আবারও নতুন করে শোনা যাচ্ছে। জানা গেছে, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানের সাথে পরামর্শ না করেই শাহ আলম তাদের যৌথ প্রকল্পের জমিটি সেনা সদস্যদের আবাসনের জন্য সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে গেছেন। সূত্র জানায়, প্রতিমন্ত্রীর সাথে ২৮ এপ্রিলের বৈঠকের আগে থেকেই এ নিয়ে গোপনে বেশ কয়েকদফা আলোচনা হয়েছে- যেখানে বাবুলকে অংশ নিতে দেখা যায়নি। জমি প্রদানের ব্যাপারে শাহ আলমের এই অতি উৎসাহের পেছনে অবশ্য বেশ কিছু কারণও আছে। এই প্রকল্পটি যৌথ হলেও তাতে শাহ আলমের জমি আছে খুবই সামান্য। প্রায় সব জমিই নুরুল ইসলাম বাবুলের। কিন্তু তারপরও যুগান্তর চেয়ারম্যান যে এই প্রকল্পে তার সঙ্গে শাহ আলমের নামটি যুক্ত করে নিয়েছেন এর পেছনেও আছে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কারণ। বিগত সরকারের আমলে তো বটেই, এমনকি বর্তমান সরকারের কিছু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সাথে বিরোধে জড়িয়ে তিনি বেশ বেকায়দার মধ্যেই পড়ে গিয়েছেন। এই অবস্থায় শক্তিশালী বসুন্ধরা গ্রুপের সাথে যৌথ মালিকানার প্রকল্প হলে তাদের বন্ধুত্বটি একটি শক্ত ভিত্তি পাবে বলে মনে করেছিলেন নুরুল ইসলাম বাবুল। এছাড়া যৌথ প্রকল্প হলে তাতে প্রচার-প্রচারণা যেমন বাড়বে, ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি একটি বিষয় হিসেবে কাজ করবে। এই সব বিবেচনায়, এই প্রকল্পের অধিকাংশ জমি যমুনা গ্রুপের হলেও বসুন্ধরার নামটি এর সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এখন প্রকল্পটি এভাবে আহমদ আকবর সোবহান ওরফে শাহ আলম তার সাথে কোন পরামর্শ না করেই ছেড়ে দিতে রাজি হওয়ায় তিনিই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হাউজিং-এর ব্যবসায় এটিই যমুনা গ্রুপের অন্যতম বড় একটি সফল প্রকল্প। যদিও আশুলিয়ায় তারা প্রায় ১২শ’ বিঘা জমি সংগ্রহ করেছেন আরেকটি হাউজিং প্রকল্পের জন্য। কিন্তু জমিটি নিচু হওয়ার কারণে ড্যাপ-এর অনুমোদন পাচ্ছে না। ভবিষ্যতে পাবে কিনা তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। সে ক্ষেত্রে যমুনা-বসুন্ধরার এই যৌথ প্রকল্পটির জমিও যদি ছেড়ে দেয়া হয়, এই ব্যবসায় নুরুল ইসলাম বাবুল চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাছাড়া এমন হলে তার সামনে ব্যবসা করার মত উৎসাহব্যঞ্জক আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। অন্যদিকে ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় কয়েক হাজার লোকের কাছে তিনি প্লট বিক্রি করেছেন। ফলে এখানেও তিনি বেশ অসহায়। কারণ, ভবিষ্যতে এই ব্যবসা পরিচালনা করতে গেলে এটি তার ইমেজের জন্যও ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া যাদের কাছ থেকে প্লট বিক্রির কথা বলে টাকা নিয়েছেন তাদের কী হবে? এসব কারণে পূর্ত প্রতিমন্ত্রী বা সরকারের প্রস্তাবে তিনি রাজি হতে পারছেন না। অন্যদিকে শাহআলম রাজি হয়ে যাওয়াতে তিনি আরও বিপাকে পড়ে গেছেন। এক্ষেত্রে তিনি রাজি না হলে সরকারের সাথে তার সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে। এতে যমুনা ফিউচার পার্ক এবং যমুনা টিভির মত আরও বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে তিনি আরও অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারেন। জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের আগের দিন অর্থাৎ ২৭ এপ্রিল, বিষয়টি নিয়ে শাহ আলমের সাথে নুরুল ইসলাম বাবুলের বৈঠক হয়। সেখানে তিনি বসুন্ধরা চেয়ারম্যানকে এই যৌথ প্রকল্প থেকে সরে না যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু শাহ আলম এতে রাজি হননি। ফলে বাবুল অনেকটা বেকায়দায় পড়ে গেছেন। একেতো বিষয়টিতে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত। অন্যদিকে এটি সেনা অফিসারদের ব্যাপার হওয়ায়, এবং এর পক্ষে সরকারের অনুরোধ আসায় তিনি কোন দিকেই যেতে পারছেন না।শাহ আলমের প্রতিশোধবিষয়টিকে এখন নুরুল ইসলাম বাবুলের প্রতি শাহ আলমের প্রতিশোধ হিসেবেই বলতে শুরু করেছেন তাদের ঘনিষ্ঠরা। অতীতে যুগান্তরে বসুন্ধরা মালিকের এবং তার পুত্রদের কুকীর্তিসহ নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময় তিনি কিছু করতে পারেননি বাবুলকে। কারণ, তার হাতে কোন মিডিয়া ছিল না। ফলে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানকে তার বেশ তোয়াজ করে চলতে হত। কিন্তু এখন ব্যাপার স্বতন্ত্র। এখন শাহ আলমের নিজের হাতেই আছে দৈনিক, অনলাইন পত্রিকাসহ ৪টি মিডিয়া। তাছাড়া যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানের তুলনায় সরকারের বিভিন্ন মহলের সাথে রয়েছে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ফলে এখন তিনি বাবুলকে আর তেমন পাত্তা দিচ্ছেন না। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, অতীতে তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশ নিয়ে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিলেন। যা এতদিন আসলে তিনি নিজের ভেতর পুষে রেখেছিলেন। আর এখন সুযোগ পেয়ে তারই প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছেন। কারণ, তাদের এই যৌথ প্রকল্পটি ভেঙে গেলে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।এটি এই প্রস্তাবে তার রাজি হওয়ার পেছনে একটি অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করছেন বটে। কিন্তু এটি ছাড়াও প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পেছনে শাহ আলমের অন্য আরও বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। যেমন আগেই বলা হয়েছে, বারিধারার জোয়ার সাহারার এই প্রকল্পটিতে শাহ আলমের জমির পরিমাণ খুবই কম। তাই এখানকার জমি সেনা সদস্যদের জন্য দিলেও তার কোন ক্ষতি হবে না। বরং সব দিক থেকেই লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা। কারণ এর বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে বেশ কিছু সুবিধা তিনি আদায় করতে পারবেন। অননুমোদিত বেশ কয়েকটি প্রকল্পের অনুমোদন ছাড়াও তার এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মামলার ব্যাপারে দরকষাকষি করতে পারবেন। অন্যদিকে রূপগঞ্জে যেখানে এর আগে সেনা সদস্যদের আবাসনের প্রকল্পের কাজ চলছিল, ওইখানে বরং শাহ আলমের অনেক জমি আছে। নিজের হাউজিংয়ের জন্য ওখানে বেশ কিছু জমি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। সেখানে সেনা সদস্যদের আবাসন প্রকল্প হলে তার ওই সব জমি হাতছাড়া হয়ে যেত। যা এখন আর হচ্ছে না। এতসব লাভের পরও যে লাভ, তা হলো বলে বেড়াতে পারবেন, সেনা সদস্যদের আবাসনের জন্য তিনি জমি দিয়েছেন। যদিও এতে তার অংশ থাকছে খুবই কম। কিন্তু কেই বা তা আর খতিয়ে দেখছে?বিপাকে যমুনা গ্রুপকার্যত সব দিক দিয়ে বিপদে পড়েছেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল। একটার পর একটা ঝামেলা তার পেছনে লেগেই রয়েছে। বহুদিন ধরেই যমুনা ফিউচার পার্ক এবং যমুনা টিভি নিয়ে বেশ ঝামেলায় আছেন তিনি। সমস্ত প্রস্তুতি নেয়ার পরও তিনি তার যমুনা টিভি চালু করতে পারেননি। অন্যদিকে যমুনা ফিউচার পার্ক তার সারাজীবনের একটি স্বপ্ন। কিন্তু সেটিও চালু করতে পারছেন না। যমুনা ফিউচার পার্কের বর্ধিত অংশ নিয়ে রাজউকের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছেন।যমুনা ফিউচার পার্ককে এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিং মল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নুরুল ইসলাম বাবুল। এ জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে রাজউক তার বর্ধিত অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেয়। অবৈধ অংশটিকে রক্ষা করার অনেক চেষ্টা করেও তিনি শেষতক ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ওই অংশটির বেশ কিছুটা ভেঙে ফেলে রাজউক। যদিও ঢাকা শহরে এমন অন্তত আরো ৫ হাজার বিল্ডিং আছে যেগুলোতে অবৈধ বর্ধিত অংশ রয়েছে। কিন্তু সে সব ক্ষেত্রে এ ধরনের কঠোরতা দেখানো হয়নি। এমনকি বসুন্ধরা শপিংমলও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তৈরি করা হয়নি। এ জন্য রাজউকের পক্ষ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছিল বসুন্ধরাকে। কিন্তু বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ সেই চিঠিকে পাত্তাই দেয়নি। এ ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্য বাবুলের। তিনি একটার পর একটা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং ঝামেলায় পড়ে যাচ্ছেন। যে কারণে এখন পর্যন্ত তার স্বপ্নের যমুনা ফিউচার পার্কের যাত্রা শুরুই করতে পারলেন না। অন্যদিকে এখন প্রকল্পের জমি সেনা সদস্যদের হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব তার কাছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মত। তিনি না পারছেন প্রস্তাব গ্রহণ করতে। আবার না পারছেন ফিরিয়ে দিতে। আর এরকম একটি সংকট তার জন্য মূলত সৃষ্টি করেছেন তার এই সময়ের তথাকথিত বন্ধু শাহ আলম স্বয়ং। এর জের শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।- বিশেষ প্রতিবেদক

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: