বিশ্বে হারবাল পণ্যের বাজার ৯ বিলিয়ন ডলারে

বিশ্বে হারবাল পণ্যের বাজার ৯ বিলিয়ন ডলারে

মোঃ আবদুস সালিম

বিশ্বে দিন দিন বাড়ছে বা বড় হচ্ছে হারবাল সামগ্রীর বাজার। কারণ মানুষ বিশেষ করে নারীদের মধ্যে বেড়েছে রূপ বা সৌন্দর্যচর্চা। আজকাল ভোক্তাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে প্রাকৃতিক ও জৈব প্রসাধন পণ্য। তারা মনে করেন, সৌন্দর্যচর্চায় এ পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নির্মল। ২০১১ সালে সারাবিশ্বে হারবাল প্রসাধন পণ্যের বিক্রি ৯ বিলিয়ন ডলার প্রাক্কলন করা হয়েছিল, যা করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান অরগানিক মনিটর। এর বাজার বেশি বাড়ছে ইউরোপ-আমেরিকা ও এশিয়ায়। ফলে বাজার দখলে হারবাল প্রসাধনী কোম্পানিগুলো রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতে বাজারে ভেজাল বা নিুমানের পণ্যের অনুপ্রবেশেরও আশংকা বাড়ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ফলে এর কমবেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানুষের শরীর-স্বাস্থ্যের ওপর।

২০১৫ সাল নাগাদ হারবাল প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবসা পৌঁছবে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে। এমন পূর্বাভাস দিয়েছে ‘গ্লোবাল মার্কেট ফর ন্যাচারাল অ্যান্ড অরগানিক পারসোনাল কেয়ার প্রোডাক্টস’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন। তবে ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে জড়িতরা বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা লেগেছে হারবাল প্রসাধন সামগ্রীর বাজারেও। তবে ব্যবসায়ীরা তা সামাল দিতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এতে অনেক দেশ সফলও হচ্ছে। যে কারণে তাদের ব্যবসাও বড় হচ্ছে। এ সংক্রান্ত নানা পিছুটান বা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলেই বাড়ছে প্রাকৃতিক ও জৈব প্রসাধন সামগ্রীর চাহিদা। এ ক্ষেত্রে বেশি এগিয়ে চলেছে পাশ্চাত্যের বাজার। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এসব সামগ্রী বা পণ্যের বিক্রি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেড়েছে বেশি। বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে প্রসাধন সামগ্রীর বাজারে হারবাল প্রসাধন সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ শতাংশ। তারা মনে করেন, এর বাজার আরও বড় হওয়া দরকার। কারণ, হারবাল প্রসাধন সংক্রান্ত প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে বিশ্ব। তবে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, অস্ট্রিয়া প্রভৃতি দেশে এর বাজার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এর অবশ্য কারণ আছে। এসব অঞ্চলে নির্মল ও স্বাস্থ্যসম্মত সৌন্দর্য সম্পর্কে বেড়েছে সচেতনতা। বাড়ছে বা উন্নত হচ্ছে এসব পণ্য বিক্রির কৌশলও। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ অনেক দেশই হারবাল পণ্য তৈরির অনেক ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছে। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য দেশও তা করার চেষ্টা করছে। অনেক দেশ সফলও হচ্ছে। এর মধ্যে ভারত অন্যতম। এর প্রমাণ ভারত অরগানিক পণ্যে অনেক এগিয়ে গেছে। এসব পণ্যের প্যাকেজিংয়ের মানও বেড়েছে। চালানো হচ্ছে এসব পণ্যের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। এদিকে সৌন্দর্যচর্চায় হারবালের চাহিদা ক্রমবর্ধমান হওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ বিক্রির টার্গেট নিয়েছে ড. হোসাকা ও রেনের ন্যায় নামকরা বা প্রিমিয়ার ব্র্যান্ডগুলো। হারবালের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করছে ফার্মেসি, সুপার মার্কেট এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোসহ আরও অনেক স্থানে। সাধারণ দোকানেও সারি সারি করে এসব সাজিয়ে রাখতে দেখা যায় বিক্রির জন্য।

বাজার বাড়ায় এখন হারবাল পণ্য তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছে বিশ্বখ্যাত প্রসাধন কোম্পানিগুলো। হারবাল প্রসাধন সামগ্রী জগতে প্রবেশ করেছে কোলগেট-পামওলিভ, ল’ওরিয়েলের মতো কোম্পানিগুলোও। সংশ্লিষ্টরা বলেন, এখন এর যে বর্তমান ভালো অবস্থা, তাতে বোঝা যায় হারবাল প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে আরও নতুন নতুন কোম্পানি আসবে। এখন এর বাজারে আরও বাড়বে প্রতিযোগিতা। তাতে মানসম্পন্ন পণ্য তৈরিতেও প্রতিযোগিতা বাড়বে। ব্যবসায়ীরা বলেন, এ ব্যবসা এখন খুবই সম্ভাবনাময়। সম্ভাবনাময় এ ব্যবসায় নতুন করে যোগ দিয়েছে কয়েকটি কোম্পানি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গার্নার, অ্যামরে প্যাসিফিক, হেস্কেল প্রভৃতি। এ কোম্পানিগুলো বাজারে ছেড়েছে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হারাল প্রসাধন সামগ্রী। এসব কোম্পানিও আগে বাজারে আসা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।

ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ প্রভৃতির মতো দেশও এগিয়ে যাচ্ছে হারবাল প্রসাধন সামগ্রীর রমরমা বাণিজ্যে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে এশিয়াও। এ অবস্থায় নামি-বেনামি বিভিন্ন কোম্পানি লোভনীয় এ বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। নিজেদের পণ্যকে শতভাগ রাসায়নিকমুক্ত দাবি করে এসব দেশের কোম্পানিগুলো। অবশ্য মোড়ক লাগানোর ক্ষেত্রে কমবেশি দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে নানা মহল থেকে। এতে ঠকছেন সাধারণ ক্রেতারা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এমন কথা শুনে অনেকেই ঝুঁকছেন হারবাল প্রসাধন সামগ্রীর দিকে। সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এ কারণে পণ্যের ভালো-মন্দ চিনতে বেশ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তা বা ক্রেতাদের। এ চিত্রটি উঠে আসে অরগানিক মনিটরের গবেষণা প্রতিবেদনে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত সে ধরনের মানদণ্ড গড়ে ওঠেনি, যা দ্বারা পণ্যের মান বিচার করা সহজ। সেই সুযোগে কিছু অসাধু বা নামসর্বস্ব কোম্পানি নিুমানের পণ্য কৌশলে গছিয়ে দিচ্ছে ক্রেতাদের। তাতে ক্রেতারা ঠকলেও ঠিকই অবৈধভাবে লাভবান হচ্ছে নামসর্বস্ব কোম্পানির লোকেরা। যা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে হারবাল বাজারকে। চটকদার নানা বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয় ক্রেতারা। বিশেষ করে এতে বেশি প্রভাবিত হন নারীরা। বলা হয়েছে, শরীরের রঙ ফর্সা বা উজ্জ্বল করার ক্রিম ও লোশনে থাকে ক্ষতিকর স্টেরয়েড, যা মানুষের শরীরের ভালোর চেয়ে মন্দই ডেকে আনে বেশি। অবশ্য এসব ব্যবহারে শরীরের রঙ দ্রুতপরিবর্তন করে। এটা দেখেই এর প্রতি ঝোঁকে মানুষ। এ সবের দামও রাখা হয় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, এতে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগেরও আশংকা থাকে। এমনও বলা হয়েছে, হারবাল পণ্যের পরিচয়ে বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রসাধনীতেই থাকে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ যা ব্যবহারের পর শরীরে দেখা দেয় নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

এক্ষেত্রে সরকারগুলোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। হারবাল পণ্যের সঙ্গে জড়িতরা জানান, প্রকৃত হারবাল ব্যবহারের গুণ অনেক। বলা হয়েছে, ব্র্যান্ডিং হারাল ক্রয় ও ব্যবহারে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় বড় হারবাল কোম্পানি নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তুলেছে স্কিন কেয়ার সেন্টার। তবে বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব পড়েছে হারবাল প্রসাধনীর কাঁচামালের বাজারেও। অর্থাৎ কাঁচামালের দাম বেড়েই চলেছে। যে কারণে অনেক কোম্পানি তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। কিছু কিছু দেশ জাফরান, শংকর পাউডার, মৌলি, মুলতানি মাটি ইত্যাদি কাঁচামাল আমদানি করে আমেরিকা, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশ থেকে। অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশে এ সবের চাষ বা উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। কমে গেছে এসবের মানও। অনেক দেশ তা সরবরাহ বা রফতানি করতে পারছে না চাহিদা অনুযায়ী। ফলে সমস্যায় পড়ে গেছে অনেক কোম্পানি। এর ওপর আবার রয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা মুসকের চাপ। অনেক দেশে এর মুসকের পরিমাণ ২০-২৫ শতাংশ। এতসব প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক দেশ নিজেরাই হারবাল পণ্যের উৎপাদন বা চাষের প্রতি মনোযোগী হয়েছে। ফলও পাচ্ছে ভালো। তাতে করে এর বাজার আরও বড় হবে। অনেক দেশে হাজার হাজার একর জুড়ে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন ঔষধি গাছের প্রকল্প। এসব প্রকল্পে থাকে শত শত জাতের ঔষধি গাছ। কিছু দেশ এসব গাছের চারা, বীজ ইত্যাদি সংগ্রহ করে অন্যান্য দেশ থেকে। নানা ধরনের গাছগাছড়ার পাতা, বাকল, শিকড়, রস ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের হারবাল প্রসাধন সামগ্রী। যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে ফেসপ্যাক। মুলতানি মাটি, উপটান, চন্দন, মহারানি নিম ইত্যাদির ফেসপ্যাক বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। আরও চাহিদা রয়েছে হেয়ারটনিক, হেয়ারপ্যাক, ম্যাসেজ অয়েল ইত্যাদির। হারবাল প্রসাধনী, ওষুধ ইত্যাদি বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় খাতে প্রচুর অর্থ যোগ করছে আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ অনেক দেশ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ সংক্রান্ত নানা সমস্যা বা জটিলতা দূর করতে দেশে দেশে গড়ে তোলা উচিত দক্ষ জনশক্তি তৈরির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ইন্সটিটিউট।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: