সহজ প্রতারণা এমএলএম
কাওসার রহমান

এমন একটি সময় ছিল যখন ক্রেতার প্রয়োজনেই বিক্রেতাকে খুঁজে বের করা হতো। বিক্রেতা তার পণ্যের বাজার গড়ে তোলার জন্য, বিক্রি বাড়ানোর জন্য নানাভাবে ক্রেতাকে আকর্ষণ করত। এ পদ্ধতিকেই তখন বলা হতো এমএলএম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং। সে হিসেবে এমএলএম পদ্ধতি অনেক আগের- কিন্তু পুরনো সেই এমএলএম-ই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে প্রতারণার নতুন ফাঁদ। নতুন নতুন নামে চটকদার বক্তব্য দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি এই প্রতারণার ফাঁদ পাতছে

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতিকে একটি অপ্রচলিত বাজারজাতকরণ পদ্ধতি বলা চলে। বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যসহ ব্যবসায়িক জগতে অ্যাপল, মাইক্রোসফট, ওয়ালমার্ট, টাটা, টয়োটা, স্যামসাং প্রভৃতি কোম্পানি প্রচলিত বাজারজাত পদ্ধতি অনুসরণ করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রথম যুগে মানুষের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি, খাদ্য প্রভৃতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়ে প্রচার না থাকলেও ক্রেতার নিজস্ব প্রয়োজনে বিক্রেতা খুঁজে বের করার মাধ্যমে বাজার পদ্ধতি সংগঠিত হতো। খাদ্য পুষ্টির পরিপূরক বিকল্প খাদ্য উপাদান, প্রসাধনী, ওজন বাড়ানো বা কমানো দ্রব্যাদি প্রভৃতি অপ্রচলিত দ্রব্য বাজারে এলে এগুলো বিক্রয়ের জন্য  দ্রব্যের গুণাগুণ, ব্যবহারের লাভ-ক্ষতি বেশি বেশি করে ক্রেতার সামনে উপস্থাপন করার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু তৎকালীন সংবাদপত্র, টিভি মিডিয়া, বিজ্ঞাপনী মাধ্যম, বিলবোর্ড-পোস্টারের উদ্ভাবনী অক্ষমতার কারণে দ্রব্যের গুণাগুণ প্রচারের বিকল্প পদ্ধতিসহ বাজারজাতকরণ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসে দাঁড়ায়। সে সময়ে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে সব ধরনের প্রচার পৌঁছাবার ব্যবস্থা ছিল না। সেখানে মানুষের মুখে প্রচারের মাধ্যমে বাজারজাতকরণের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। যেখানে কিছু ব্যক্তি কমিশনের বিনিময়ে দ্রব্যের ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও গুণাগুণ মুখে মুখে তার নিকটজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে প্রচার করে। দ্রব্যটি বিক্রয়ের জন্য তাকে নানাভাবে ক্রেতা আকর্ষণ করতে হয়। এ ধরনের মার্কেটিং পদ্ধতিকে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতি বলা হতো। কালক্রমে এ মার্কেটিং পদ্ধতির আরো নামকরণ হতে থাকেÑ যেমন ডাউনলাইন মার্কেটিং, ডিরেক্ট সেল মার্কেটিং, সেলুলার মার্কেটিং প্রভৃতি। সেই সময়কালে অপ্রচলিত দ্রব্য বাজারজাতকরণ কোম্পানি তাদের পণ্য বাজারজাতের প্রয়োজনে বিক্রেতা তথা ডিস্ট্রিবিউটর বা ক্রেতা তথা জনসাধারণকে আকৃষ্ট করার জন্য পিরামিড পদ্ধতি, অ্যারোপ্লেন গেম পদ্ধতি, ওয়ান টু ওয়ান পদ্ধতি, ডোর টু ডোর পদ্ধতি, অর্ডার অ্যান্ড ডেলিভারি পদ্ধতি প্রভৃতির প্রচলন করে।

এমএলএম-এর আভিধানিক সংজ্ঞা

বিজনেস ডাইরেক্টরি অনুযায়ী, এমএলএম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বলতে সেই মার্কেটিং পদ্ধতিকে বুঝাবে যেখানে কোনো কোম্পানির দ্রব্য বা সেবার কোনো ¯^াধীন প্রতিনিধি সরাসরি নিজে বিক্রয় করবে এবং সে নিজেই তার দল তৈরি করে প্রশিক্ষণের মাধামে অন্যান্য স¦াধীন বিক্রয় প্রতিনিধিদের দলভুক্ত করার মাধ্যমে বিক্রয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করবে। এ কারণে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে ডাউনলাইন মার্কেটিং  বা  সেলুলার মার্কেটিং বা ডিরেক্ট সেল মার্কেটিংও বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ ড. জন এমএল টেইলর ৪০০-এর বেশি এমএলএম কোম্পানি ও হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার ওপর ১৫ বছরের ধারাবাহিক গবেষণা ও পর্যালোচনা করে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা পিরামিড পদ্ধতি বা অ্যারোপ্লেন গেম সেলিং পদ্ধতি বা ডাউনলাইন মার্কেটিং পদ্ধতি থেকে ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মার্কেটিং পদ্ধতি বলেছেন। ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতিতে যেমন অর্ডার অ্যান্ড রিসিভ পদ্ধতি অনুযায়ী কোম্পানিকে ফোন করে বা ই-মেইল করে দ্রব্যের অর্ডার দিয়ে ঘরে বসে দ্রব্যটি পাওয়া যায়। ডোর টু ডোর পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট দ্রব্য নিয়ে মানুষের কাছে সরাসরি গিয়ে দ্রব্যের গুণাগুণ বর্ণনা করে বিক্রয় প্রতিনিধি ডোর টু ডোর দ্রব্য বিক্রয় করে। টেলিমার্কেটিং পদ্ধতিতে টেলিফোনে ক্রেতাকে দ্রব্য সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আকৃষ্ট করে বিক্রয় করা হয়। এ সব মার্কেটিং পদ্ধতি  আইনগতভাবে স¦ীকৃত। রাষ্ট্র বা জনগণ কারো এ ধরনের ব্যবসা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকে না। কিন্তু পিরামিড পদ্ধতি বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা ডাউনলাইন মার্কেটিং বা চেইন মার্কেটিংয়ে শেষের ক্রেতাদের শূন্য হাতে ফিরতে হয় বলে রাষ্ট্র ও জনগণের এ ধরনের মার্কেটিং নিয়ে এত আপত্তি।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের ইতিহাস

১৯৪১ সালে সর্বপ্রথম ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ভিটামিন কোম্পানি তাদের অপ্রচলিত ভিটামিন বাজারজাতকরণের জন্য মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির মার্কেটিং শুরু করে। সমসাময়িক অন্যান্য বিখ্যাত কোম্পানি যেমনÑ ফোর্ড, ক্যাটারপিলার প্রভৃতি, তারা এ ধরনের মার্কেটিং পদ্ধতির মাঝে কোনো উৎসাহ খুঁজে পায়নি। কেননা ক্রেতা তার প্রয়োজনেই যাচাই-বাছাই করে দ্রব্যটি কিনবে এ ব্যাপারে বড় বড় কোম্পানি আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু মানহীন অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর এই আত্মবিশ্বাস ছিল না।

বিশ্বে এ পর্যন্ত যত এমএলএম কোম্পানি দেখা যায় তাদের বেশিরভাগেরই  দ্রব্য হলো অপ্রচলিত দ্রব্য যেমনÑ খাদ্য পরিপূরক, বলবর্ধক, ওজনহ্রাসক, সৌন্দর্যবর্ধক প্রভৃতি। মূলত এ ধরনের অপ্রচলিত দ্রব্যের বাজারজাতের ক্ষেত্রে এই এমএলএম পদ্ধতির মার্কেটিং বেছে নেয়া হয়। অথবা বলা যায় এমএলএম ব্যবাসীয়রা এ ধরনের অপ্রচলিত তাদের ব্যবসার বিষয় হিসেবে বেছে নেয়। অপ্রচলিত দ্রব্য যেহেতু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নয়, তাই এ জাতীয় দ্রব্যের অনেক গুণাগুণ বর্ণনা করে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিশ্বাসকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে হয়।

অন্যদিকে অপ্রচলিত দ্রব্যের গুণাগুণ ও মূল্য যাচাই করার সুযোগ খুব একটা থাকে না। ফলে কোম্পানি তার বিক্রীত দ্রব্য ইচ্ছামতো মূল্যে বিক্রয় করে, যাতে বিক্রয় প্রতিনিধিকে খুশি করার মতো পরিমাণে লাভ ওই বিক্রীত দ্রব্য বিক্রয় করা থেকে কোম্পানিটি তুলে নিতে পারে।

বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত রাষ্ট্রে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা প্রথম যখন তার যাত্রা শুরু করে সে সময় এই ব্যবসা পদ্ধতিটি অপ্রচলিত হওয়ায় দেশের সরকার বা জনগণ এই ব্যবসার সম্পর্কে ভালো-মন্দ কিছু জানত না বা বুঝতে পারত না। পরবর্তী সময়ে জনগণ বারবার প্রতারিত হতে থাকলে রাষ্ট্র আইন করে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতি জনসাধারণের স¦ার্থবিরোধী না হওয়ায় রাষ্ট্রগুলো এ পদ্ধতির মার্কেটিংকে অনুমোদন দিয়েছে। যদিও ধূর্ত এমএলএম ব্যবসায়ীরা ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির মার্কেটিং  এবং মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে একই জিনিস বলার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে পদ্ধতি দুটির মাঝে সূ² পার্থক্য রয়েছে। ডাইরেক্ট সেলিং মার্কেটিংকে ওয়ান টু ওয়ান পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বলা হয়, যা মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের অন্যান্য পদ্ধতি যেমন পিরামিড পদ্ধতি, ডাউনলাইন পদ্ধতি, চেইন পদ্ধতির চেয়ে একেবারেই ভিন্নতর। মূলত মার্কেটিং পদ্ধতিগুলো এতই অপ্রচলিত যে, মার্কেটিংয়ের ওপর পড়াশোনা করা ব্যক্তি বা গবেষকদেরও অনেক সময় বিষয় দুটির পরিষ্কার পার্থক্য বুঝতে কষ্ট হয়। আর জনসাধারণ ও রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের জ্ঞানের ঘাটতির সুযোগ নেয় ধূর্ত এমএলএম ব্যবসায়ীরা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা-দুর্ঘটনার পর রাষ্ট্র ও জনগণ বুঝতে শিখে  এবং অতঃপর আইন করে এমএলএম ব্যবসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, পুর্তগাল, অস্ট্রিয়া, জাপান, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, নেপালসহ ৫২টি দেশে পিরামিড পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিং সরকারিভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে।  এমএলএম ব্যবসার বিভিন্ন প্রতারণার ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, সুইডেন প্রভৃতি দেশে এমএলএম কোম্পানির বিরুদ্ধে দেশগুলোর সরকার মামলা করেছে, কোম্পানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, জরিমানা আদায় করেছে। এমনকি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) তাদের ওয়েব পেইজে জনসাধারণকে এমএলএম কোম্পানির প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকার নির্দেশনামূলক হুশিয়ারি দিয়ে একটি পেইজ বরাদ্দ রেখেছে। চীনে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের প্রতারণার পর এমএলএম ব্যবসা বন্ধের দাবিতে ১৯৯৮ সালে জনরোষ থেকে চীনে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে চীন সরকার এমএলএম ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরির কাজ শুরু করে ও ২০০৫ সালে ডাইরেক্ট সেলিং আইন তৈরি করে। টেলিফোন বা ইন্টারনেটে অর্ডার দিয়ে হোম ডেলিভারি গ্রহণ, ডোর টু ডোর মার্কেটিং, টেলি মার্কেটিং, ডিট্টো মার্কেটিং প্রভৃতি পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে বৈধতা দেয়। আর অবৈধ ঘোষণা করে ডাউন সেলিং, চেইন সেলিং, পিরামিড পদ্ধতি প্রভৃতি মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে। বৈধ ঘোষণা করা ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির মার্কেটিংয়ে শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী ও সরকারি কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করতে পারবে না মর্মে আইন জারি করে।

বাংলাদেশে এমএলএম কোম্পানির ইতিহাস

১৯৯০ সাল থেকে নগদ অর্থ দিয়ে সদস্য হয়ে আবার অন্যকে সদস্য করার মাধ্যমে প্রাপ্ত কমিশন থেকে নিজের মূলধন তুলে নিয়ে পরবর্তী দীর্ঘ ধাপগুলোতে রীতিমতো কোটিপতি বনে যাওয়ার স¦প্ন দেখিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠে নগদ অর্থকে দ্রব্যের হিসেবে পিরামিড পদ্ধতির উদ্ভট এক মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসা। এর পর সরকার জনগণের স¦ার্থ রক্ষার্থে ও পরস্পর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ লাঘবে নগদ অর্থ দিয়ে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। ওই সময়ের ধূর্ত এমএলএম ব্যবসায়ীরা ভোল পাল্টে নগদ অর্থের স্থলে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত নিম্নমানের দ্রব্য, গাছ বিক্রয়, জমি বাড়ি বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানির সদস্য করা প্রভৃতি পদ্ধতি ব্যবহার করে। মূলত ওই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে একই রকমভাবে বর্তমানে এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু নগদ অর্থের বদলে গাছ  বা নিম্নমানের দ্রব্যের নাম বলা হয়। বিক্রীত দ্রব্য কোনো কাজে লাগুক বা না লাগুক, ক্রেতার ক্রয়কৃত গাছ আগামী ১০/২০ বছরে চোখে দেখা যাক বা না যাক লেনদেন হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কেউ আবার কল্পিত ব্যাংকে গচ্ছিত সোনা, কবরস্থান, বসবাসের জন্য জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট বিক্রয় করেছে এমএলএম পদ্ধতিতে। সবারই লক্ষ্য ছিল একটাই জনগণের কাছ থেকে নগদ অর্থ, আমানত, সঞ্চয়ের অর্থ সংগ্রহ। তাতে যে দ্রব্য, যে নামে, যে পদ্ধতির কথা বলতে পেরেছে, এমএলএম ব্যবসায়ীরা সেটাই করেছে। ক্রেতা হিসেবে জনসাধারণের কাছে কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার জন্য কোম্পানিগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবসার অংশীদার করেছে, চাকরি দিয়েছে বা বড় বড় ক্রীড়া অনুষ্ঠান বা কালচারাল ইভেন্ট স্পন্সর করেছে। জনসাধারণের কাছ থেকে প্রাপ্ত আমানত দিয়ে দেশ-বিদেশে কোম্পানির গুটিকতক ব্যক্তির নামে সম্পদ করা হয়েছে। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার  হয়েছে। আবার জনসাধারণ যখন তাদের আমানত ফেরত আনতে গেছে তখন কোম্পানিগুলো কিছুদিন পর অফিস বন্ধ করে গায়েব হয়ে গেছে।

অন্যদিকে ওয়েবপেজনির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্লিক ডটকম, সেল বাজার ডটকম প্রভৃতির মতো ইন্টারনেট ভিত্তিক ডাইরেক্ট সেলিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ডোর টু ডোর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমনÑ মার্কেট অ্যাকসেস, মার্কেট রিসার্চ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির অন্তর্গত ডাইরেক্ট সেলিং ব্যবসা (ডোর টু ডোর, অর্ডার অ্যান্ড সাপ্লাই) পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো ধরনের প্রতারণা ছাড়াই দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে এদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির নিজস¦ কোনো অপরাধ নেই। ব্যক্তিবিশেষে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির অন্তর্গত প্রতারণামূলক পদ্ধতি, বিভিন্ন নামে প্রকৃত অর্থে বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ পিরামিড পদ্ধতির ব্যবসা পরিচালনা করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করছে

দেশে দেশে পদক্ষেপ

মূলত উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো এমএলএম ব্যবসা জেঁকে বসে ১৯৬০ সাল থেকে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ১৯৯৫ সালের দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনসাধারণ বুঝতে পারে যে, তারা প্রতারিত হচ্ছে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোর দ্বারা। এরপর তুমুল আন্দোলন ও জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। অবশেষে ২০০০ সালের পর থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে এমএলএম ব্যবসা নিষিদ্ধ হতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার ¯^র্ণযুগ চলছে। নাম জানা না জানা অনেক এমএলএম কোম্পানি হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো যেভাবে লাখ লাখ লোকের প্রতারণার পর এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা তাদের দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশেও এরই মধ্যে লাখ লাখ মানুষ এমএলএম কোম্পনিগুলোর কাছে প্রতারিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন প্রভৃতি দেশের মতো গণরোষ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা হওয়ার পর মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির ব্যবসাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পূর্বে  কম ক্ষতিকে মেনে নিয়ে যত অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব মাল্টি লেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির ব্যবসাকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জনসাধারণের বিশ্বাসের সুযোগ ব্যবহার করে তাদের প্রতারিত হওয়ার  হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন।

২০০০ সালের পর থেকে সারা বিশ্বে ৫৩টি উন্নত রাষ্ট্রে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৮০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসার স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা হয়। এ সময়কালে উন্নত বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিবিদও এমএলএম ব্যবসার ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মানুষের প্রতারণা, মামলা ও হামলার মাধ্যমে শেষ হয় এমএলএম ব্যবসার স্বর্ণযুগ। এই সময়ের মধ্যে উন্নত বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান গ্রহণকারী এমএলএম কোম্পানিগুলো তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের নামে ওয়ার্ল্ড ফুটবল চ্যালেঞ্জ আয়োজন, আমেরিকান যুব সকার প্রতিযোগিতা আয়োজন, ফুটবল দল এফসি বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়া  সিএফ, স্যান্তোস এফসি, এফসি স্পরটেক মস্কো, মেক্সিকোর পুমা ও মান লুইস, ইসরায়েলের ম্যাককাবি, পোল্যান্ডের উইসলা কারলো ও ইতালির বোটাফাগো রেগাটাসের মতো দলের স্পন্সরশিপ নেয়। এভাবে তৎকালীন হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এমএলএম কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে বেছে বেছে এমন বিষয়ে অর্থ খরচ করতে থাকে যেখানে খরচ করলে সহজেই প্রচার পাওয়া যায়। এরপর ক্রেতা-ভোক্তা ও ডিস্ট্রিবিউটরদের এ নবাগত ব্যবসার ওপর বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপনের জন্য বলতে থাকে যেÑ আমাদের কোম্পানি আর দশটি বড় কোম্পনির মতো রাষ্ট্র দ্বারা স্বীকৃত ও গ্রহণ যোগ্য কোম্পানি, না হলে আমরা কীভাবে সরকারের ও সবার সামনে সরকারি ও বেসরকারি লোকদের নিয়ে এত বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারছি। এরপর ভোক্তা-ক্রেতা-ডিস্ট্রিবিউটররা কোম্পানির ওপর আস্থা অর্জন করে, একইভাবে এমএলএম কোম্পানিটি সমাজের ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে যায় ও তার ব্যবসার নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করে। কিন্তু এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০০ সালের পর সারা বিশ্বের প্রতারিত লাখ লাখ মানুষের জনরোষের কাছে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী ও সরকার মাথানত করত বাধ্য হয়েছে। ওই সব দেশে এমএলএম কোম্পানির প্রতারণামূলক ব্যবসাকে বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে।

যাকে নিয়ে এত ঘটনা

বাংলাদেশে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড, নিউওয়েসহ বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে বিভিন্ন ক্রীড়া অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে কোটি টাকা খরচ করে স্পন্সর প্রদান, কোটি টাকা খরচ করে বিপিএল, টি-২০ টুর্নামেন্ট আয়োজন, ভারতীয় চিত্রজগতের লোকদের এনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বড় মধ্যম ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে দেখা যায়। সরকারের উপদেষ্টা মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, উচ্চপদস্থ সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা, এসপি, ডিসিদের দিয়ে ওই সব অনুষ্ঠান উদ্বোধন করানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের কর্ণধার ও কর্মকর্তাদের ছবি তোলা আবার ওই ছবি জেলা, উপজেলাসহ সব স্থানের ডেসটিনির অফিসে বড় করে টাঙিয়ে রেখে ও ছবিগুলোর অ্যালবাম নবাগত আমানতকারী ক্রেতা-ভোক্তা-ডিস্ট্রিবিউটরদের দেখিয়ে বলা হয় যে, এত বড় বড় প্রভাবশালী মানুষ আমাদের কোম্পানির সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক ও কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুন্দর সুসজ্জিত অফিস, কোট-টাই পরা ভদ্রলোক, প্রাক্তন সেনাপ্রধান কোম্পানির প্রেসিডেন্ট আর রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্ততার ছবির প্রমাণ দেখিয়ে সাধারণ আমানতকারী-ক্রেতা-ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে কোম্পানিটি আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়। এভাবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে কোম্পানির সদস্য বানিয়েছে।

ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড কোম্পানি দাবি করে তাদের এমএলএম পদ্ধতি হলো- সার্কেল বা বৃত্ত পদ্ধতি, যেখানে একজন তার পাশের জনকে বিক্রয় করবে একটি পণ্য, সে আবার তার পাশের জনকে বিক্রয় করবে, এভাবে এক সময় প্রথম জনও ওই বৃত্তের সর্বশেষ জনের কাছ থেকে দ্রব্য কিনবে। কিন্তু অত্যন্ত বিস¥য়ের বিষয় সমগ্র পৃথিবীতে যে কটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি বিদ্যমান তারা কেউ এ ধরনের কোনো পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করে না বা এমন কোনো পদ্ধতির নামও তাদের জানা নেই। মূলত এ পদ্ধতিটি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন উদ্ভাবিত, যার  কোনো এমএলএম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা এমএলএম বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা কোনো ধরনের স¦ীকৃতি নেই। শুধু অখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিতে কথিত পিএইচডি করার সময় এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন তার পিএইচডির থিসিস হিসেবে এই নতুন উদ্ভাবিত পদ্ধতি জমা দিয়েছেন। ফলে এই পদ্ধতির এটুকু দাপ্তরিক স¦ীকৃতি তিনি দাবি করেন। অখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন তার পিএইচডি অর্থের বিনিময়ে সম্পন্ন করেছেন বলে জানা যায়। তার এই উদ্ভট আবিষ্কৃত পদ্ধতিকে ন্যূনতম দাপ্তরিক সস্বীকৃতির প্রয়াসে তার এই পিএইচডি করা। অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থের বিনিময়ে প্রাপ্ত পিএইচডির থিসিসের ফসল, একটি অস¦ীকৃত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির হাতে সোপর্দ করা হয়েছে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের ৫০ লাখ সদস্য ও তাদের আমানত। উপরন্তু তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকৃত অর্থে এটি একটি নিষিদ্ধ পিরামিড পদ্ধতি, যার শেষ পরিণতি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে নির্মম প্রতারণা।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রিয়া, ইতালি প্রভৃতি দেশসহ মোট ৫২টি দেশে পিরামিড পদ্ধতি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) নিষিদ্ধ থাকা সত্তে¡ও বাংলাদেশে গত ২০১১ সালে ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১১’ নামে একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়, ডাইরেক্ট সেল ব্যবসার সঙ্গে স¤পৃক্ত কোম্পনি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা, পরিবেশক ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের নেতৃত্বে নিউওয়েসহ বেশ কয়েকটি বড় বড় এমএলএম প্রতিষ্ঠান প্রভাব খাটিয়ে ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১১’-এর খসড়ায় ধারা ০৪ (সংজ্ঞা)-এর ১৩ নং-এ সরাসরি বিক্রয়ের সংজ্ঞায় পিরামিড সদৃশ বিক্রয় কার্যক্রমের মতো জনবিরোধী, ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে আইনগত ভিত্তি তৈরির মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রতারণার পথ প্রশস্ত করেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইটালি, সুইডেন, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, চীন,  জাপান, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ ৫২টি দেশে পিরামিড পদ্ধতি বা অন্য নামের আড়ালে পিরামিড পদ্ধতি (আপাতত অন্য পদ্ধতির নামে পরিচালিত) মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা নিষিদ্ধ রয়েছে।

ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডসহ মাল্টি লেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রভাব খাটিয়ে আইনটির খসড়ায় এমন অনেক আত্মঘাতী, জনবিরোধী অংশ রেখেছে। তারপরও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১১’-এর খসড়া নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ফলে ওই খসড়া আইনকে তারা পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরিতে প্রভাব খাটিয়ে বাধা সৃষ্টি করে যখন তারা দেখতে পায় যে এ আইনের তফসিল-২, ধারা-১৭তে ডাইরেক্ট সেল ব্যবসা নিষিদ্ধকরণের তালিকায় কতগুলো বিষয় রয়েছে। এগুলো হলো ১. অবস্থাগত বা অলীক পণ্য এবং সময়ের ধারাবাহিকতা বা পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিপণনযোগ্য হবে এমন পণ্য বা সেবা, ২. স্থাবর সম্পত্তি যেমন- গাছ, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান বা অফিস স্পেস ইত্যাদি, ৩. সমবায় পদ্ধতির খামার বা সমিতি বা ব্যবসা এবং ব্যাংক, বীমা, লিজিং কোম্পানি ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৪. কমিশন বা বোনাস হিসেবে কোনোরূপ শেয়ার ঋণপত্র ক্রয়-বিক্রয় এবং ৫. সব ধরনের সঞ্চয়পত্র, বোনাস স্ক্রিম, কিস্তির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বা সঞ্চয় বা বিলিবণ্টন ইত্যাদি।

ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড কোম্পানির অজনপ্রিয় নিম্নমানের কিছু ¯^াস্থ্য সম্পর্কিত পরিপূরক খাদ্য, ইলেক্ট্রনিক্স দ্রব্য ব্যতীত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসার দ্রব্য ও সেবাগুলোই হলো গাছ, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, সমবায় পদ্ধতির সমিতি ও বোনাস হিসেবে শেয়ার। এজন্য ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড যখন বুঝতে পারে যে, এ খসড়া আইন পরিপূর্ণ আইনে পরিণত হলে তাদের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। তখনই ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড তাদের প্রভাব খাটিয়ে আইনটির খসড়া থেকে পরিপূর্ণ আইনে রূপান্তরিত হতে নানাভাবে বাধা প্রদান করে।

ডেসটিনির বিরুদ্ধে অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা যায়, ডেসটিনি গ্রুপের অধীন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড বর্তমানে প্রতারণামূলকভাবে অভিনব ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন ও ভিজিলেন্স বিভাগের দুজন উপ-পরিচালক মোঃ জহির হোসেন ও রণজিৎ কুমার রায় ডেসিটিনি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড কাকরাইলের অফিসে তদন্ত কাজ পরিচালনা করেন। তারা তিনটি অভিযোগ সামনে রেখে তদন্ত করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অমান্য করে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি প্রকাশ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি চড়া সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে প্রতি মাসে কমপে ২০-২৫ কোটি টাকা মুনাফা করছে। দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছেÑ সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ৩৮ লাখ এজেন্টের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের কমিশন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে। তৃতীয় অভিযোগটি হচ্ছেÑ প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ১ হাজার ৪শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা করে বলা হয়, ডেসটিনি নামক কোম্পানিটি কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত এই তিন অভিযোগের পরিপ্রেিতেই তদন্ত কাজ পরিচালনা করে বেশকিছু সত্যতা পায় তদন্ত টিম।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ডেসটিনি অভিনব কায়দায় এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করে অযৌক্তিকভাবে উচ্চ হারে মূলধন বৃদ্ধি ও সংগৃহীত আমানত এবং মূলধনের অর্থ সুকৌশলে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে অন্যান্য কোম্পানিতে সরিয়ে নিচ্ছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০০৯ সালের পর থেকেই ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির চোখ ধাঁধানো মূলধন মুনাফা ও বিনিয়োগ চোখে পড়ে। আগের বছরের ৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা থেকে ২০০৯-১০ সালে কোম্পানির পুঁজি বেড়ে দাঁড়ায় ৩শ কোটি টাকায়। ২০১০-১১ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১২শ কোটি টাকায়। ২০০৯-১০ সাল থেকে ২০১০-১১ সালে ডেসটিনি মুনাফা করে ৩৫৪ শতাংশ। বিস্ময়কর ব্যাপার হলোÑ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথা থেকে এলো? 

ডেসটিনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

 জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুর্নীতি দমন কমিশন ডেসটিনি গ্রæপের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে। ইতিমধ্যে জাতীয় রাজ¯^ বোর্ড ডেসটিনির দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১শ কোটি টাকার কর ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে। এর মধ্যে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন ৭৩ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। আর ডেসটিনি মূল্য সংযোজন কর ফাঁকি দিয়েছে ৩২ কোটি টাকা। এ কারণে গ্রæপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৪ জন পরিচালকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এবং উভয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি চেয়েছে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেয়া এক চিঠিতে দুদক বলেছে, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অননুমোদিতভাবে ব্যাংকবহিভর্ত বিভিন্ন প্রকল্পের প্যাকেজ, এমএলএম পদ্ধতিতে দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ, অবৈধভাবে হস্তান্তর ও রূপান্তর করছে, যা মানি লন্ডারিং অপরাধ।

এছাড়া ডেসটিনি গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সমবায় আইন, কোম্পানি আইন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন এবং সিকিউরিটিজ আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, সমবায় অধিদফতর ও পুলিশ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তাদের দিয়ে এ কমিশন গঠিত হওয়ার কথা। তদন্ত কমিশন ডেসটিনি গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের আলাদা নিরীক্ষা করবে এবং সম্পদ ও দায়দেনা নিরূপণ করবে। এছাড়া মানি লন্ডারিং, অবৈধ ব্যাংকিং ও গ্রাহক প্রতারণা খতিয়ে দেখবে।

এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘ডেসটিনির বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রথম দফা তদন্তের পর পর্যায়ক্রমে আরো তদন্ত হবে।’

ইতিপূর্বে যুবক কর্মসংস্থান সোসাইটির ব্যাপারেও সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। দুই সদস্যের এ কমিশনের প্রধান হচ্ছেন সাবেক যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলাম। যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছেÑ ১৯৯৬ সালে যুবক প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে তারা বেআইনি ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলে সরকার তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এ সময়ে সংস্থাটি প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।

এর আগে ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশনের কাছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০১ জন আবেদন করেন। তাদের এ আবেদনের বিপরীতে টাকার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

ডেসটিনির প্রতারণার খবর ফাঁস হওয়ার ঠিক আগেই আরেকটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ইউনিপেটু অতি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেক কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ কোম্পানিতে টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সর্ব¯^ান্ত হয়েছে। আর মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এ কোম্পানির লোকজন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যদিও গ্রাহকদের অভিযোগ, ইউনিপেটু গ্রাহকদের আমানতের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা তছরুপ করেছে। খনি থেকে ¯^র্ণ উত্তোলনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগের কথা বলে এ কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে এ অর্থ তুলে নেয়। আর গ্রাহকদের লোভ দেখানো হয়, লগ্নিকৃত অর্থ বছরে দ্বিগুণ আকারে ফেরত দেয়া হবে।

ইতিমধ্যে পুলিশ ইউনিপেটুর কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করেছে। আর দুই উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাসহ নয় জনের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

দেশে ৭০ এমএলএম কোম্পানি

এমএলএম কোম্পানিগুলো পরিচালনায় কোনো আইন না থাকায় দেশে প্রায় ৭০টিরও বেশি কোম্পানি আমানত সংগ্রহসহ অদৃশ্যমান পণ্যের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে গ্রাহকদের প্রতারিত করছে। এসব এমএলএম কোম্পানির কার্যক্রমের বৈধতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লাইসেন্স ইস্যুর সময়ে ঘোষণা অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা হচ্ছে কি না, প্রকৃত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন আছে কি না, বর্তমান পরিচালিত ব্যবসার ধরন ও অনুমোদন আছে কি না অনুসন্ধান করা হবে।

বর্তমানে শুধু ডেসটিনি নয়, নিবন্ধনকৃত রয়েছে ৭০টি এমএলএম কোম্পানি। অনেক কোম্পানি ঘোষণার সময় বিভিন্ন ব্যবসার ধরনের কথা উল্লেখ করে জয়েন্ট স্টক কোম্পানির কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। নিবন্ধনকৃত এসব কোম্পানি কেমিক্যাল উৎপাদন, ইট বালু পাথরের ব্যবসা, বিমান পরিচালনা, গরু মোটাতাজা থেকে শুরু করে এমন কোনো ব্যবসা নেই যা তারা অন্তর্ভুক্ত করেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণ না করেই ওই কোম্পানিগুলো ব্যবসা পরিচালনা করছে।

এই ৭০ কোম্পানির মধ্যে ডেসটিনির রয়েছে ৭০ লাখ সদস্য। আর গ্লোবাল নিউওয়ে, রেডোনেক্সসহ বাকিগুলোর রয়েছে আরো ১০ লাখের মতো সদস্য। এই ৮০ লাখ সদস্যের পরিবারে যদি তিনজন করে সদস্যও হয় তাহলে এই কোম্পানিগুলোর শিকার দেশের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোম্পানি আইন-১৯৯৪ অনুয়ায়ী এমএলএম কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে কোম্পানি আইনের কয়েকটি ধারার মাধ্যমে। সেই ধারাগুলো হলো ১৯৩, ১৯৪, ১৯৫ ও ৩৯৭। এই মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এছাড়া জেনারেল ক্লোজেস অ্যাক্ট-এর ৬ ধারা মোতাবেক যে সংস্থা এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স দিয়েছে, প্রয়োজনে তা বাতিল, স্থগিত করতে পারবে। এতে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে। কারণ সেখান থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েই ব্যবসা করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ব্যবস্থা নেয়ার আগে দেখা হবে, বর্তমান নিবন্ধনকৃত এমএলএম কোম্পানি যে ব্যবসা করছে তার সঙ্গে লাইসেন্স নেয়ার সময় ঘোষিত ব্যবসার মিল আছে কি না, এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে কি না, কী কী ধরনের ব্যবসা করছে এসব বিষয়ে খতিয়ে দেখা হবে। ডেসটিনির মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে অবৈধ ব্যাংকিং করছে। কিন্তু ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। এছাড়া শেয়ার বেচাকেনা করা হচ্ছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে কি না, গাছ লাগাতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়া হয়েছে কি না এসব বিষয় অনুসন্ধান করা হবে।

আইন না থাকায় এমএলএম কোম্পানিগুলো উদ্যোক্তা মালিকদের ইচ্ছামতো পরিচালিত হচ্ছে। এতে অনেক কোম্পানি অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। সমবায় অধিদপ্তর থেকে একটি লাইসেন্স নিয়ে সরাসরি ব্যাংক ব্যবসায় প্রবেশ করছে। এতে গ্রাহকের টাকার কোনো নিরাপত্তা থাকছে না। এসব কারণে কোম্পানির কয়েকটি ধারা মতে এমএলএম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোম্পানি আইনের ১৯৩ ধারায় বলা আছে, যে কোনো ধরনের তথ্য চাওয়া হলে কোম্পানিগুলোকে তথ্য দিতে হবে। লাইসেন্স দেয়া কর্তৃপক্ষ যে কোনো তথ্য চাইতে পারে। ১৯৫ ধারায় বলা আছে শেয়ারের ক্ষেত্রে অবশ্য ১৫ জনের নিচে থাকতে হবে। এর বেশি গেলে অবশ্য প্রচলিত আইন অনুযায়ী পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে শেয়ার ছাড়তে হবে। ৩৯৭ ধারায় ফলস বা মিথ্যে স্টেটমেন্টের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

এমএলএম আইন ঝুলছে

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য খসড়া আইনটি গত ৭ মাস ধরে আটকে আছে। ডাইরেক্ট সেলিং এবং এমএলএম কোম্পানির ব্যবসায় ¯^চ্ছতা আনতে নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে অনুষ্ঠিত সভায় এ খসড়া চড়ান্ত করা হয়। এরপর একাধিকবার আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও রহস্যজনক কারণে সেটি আটকে যায়। সর্বশেষে গত মাসে এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনি গ্রুপ নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি দ্রুত এমএলএম আইন করার তাগিদ দেয়।

এরপর এটি মন্ত্রিপরিষদে উঠানো হয়। কিন্তু ওই সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ আইনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে বলেছে। ডাইরেক্ট সেল আইনে একটি অধিদপ্তর গঠনের কথা রয়েছে। ওই অধিদপ্তরে একজন চেয়ারম্যান থাকবেন। অধিদপ্তরের কাজ হবে এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স দেয়া, বাতিল করা, স্থগিত করা ও পুনর্বহাল করা। এমএলএম ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ হবে ওই অধিদপ্তরের মাধ্যমে।

কিন্তু ওই অধিদপ্তর গঠন করা যাবে না বলে আপত্তি জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাদের আপত্তি হলো, আইনের ধারা দিয়ে সাংবিধানিক সংস্থা সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয় না। এটি আগামীতে জটিলতা সৃষ্টি করবে। প্রয়োজন হলে অর্থ বিভাগের সুপারিশসহ সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। এই মতামত দিয়ে আইনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ফের ফেরত পাঠানো হয়। ফলে আইনটি পাসের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়।

সর্বশেষ তথ্য মতে, এমএলএম আইনের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় মতামত দিয়েছে। এরপর আইনটি সচিব কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আশা করছে, খুব শিগগিরই সচিব কমিটি থেকে সেটি অনুমোদন হয়ে আসবে।

এমএলএম কোম্পানিগুলো পরিচালনার জন্য শেয়ার বা অর্থ বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি না নেয়াসহ মোট ১৩টি ধারা রয়েছে খসড়া আইনে। চোখে দেখা যায় না এমন বায়বীয় পণ্য বিক্রি করতে পারবে না কোনো এমএলএম কোম্পানি। এমএলএম কোম্পানিকে দেশের ভেতর সুনির্দিষ্ট ঠিকানা থাকতে হবে। ঠিকানাবিহীন কোম্পানিকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এমএলএম ব্যবসার নামে পণ্য বাকি রেখে পরিবেশকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ বন্ধ, টাকার বিনিময়ে টাকা দেয়ার পদ্ধতি বাতিল, ঠিকানা ও কিস্তিবিহীন প্ল¬ট-ফ্ল্যাট বিক্রয়ের অর্থ গ্রহণ না করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এমএলএম খসড়া আইনে পিরামিড সদৃশ বিক্রয় কার্যক্রম, অলীক পণ্য, পর্যায়ক্রম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিক্রয়যোগ্য হবে এমন পণ্য ডাইরেক্ট সেলে ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইনের ব্যত্যয় ঘটলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ৩ থেকে ৫ বছরের জেল ও অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হবে। এ ব্যবসার পণ্য মোড়কে উৎপাদনের তারিখ, ওজন, পরিমাপ, মেয়াদ, খুচরা মূল্য লেখা বাধ্যতামূলক। ক্রেতাকে মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিয়ে প্রতারণা করলে ১ থেকে ৫ বছরের জেল এবং ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতির দ্বিগুণ অর্থদণ্ড দেয়া হবে। গায়ের মূল্য থেকে বেশি রাখা হলে ৬ মাস থেকে এক বছরের জেল এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া আইন অনুযায়ী, এসব কোম্পানিকে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।  অনুমোদিত মূলধনের ১০ শতাংশ জামানত রাখতে হবে। এসব কোম্পানিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন মেনে চলতে হবে। নতুন পরিবেশক হওয়াকালীন কোনো সার্ভিস চার্জ, ট্রেনিং ফি, সিকিউরিটি মানি গ্রহণ করতে পারবে না। এসব কোম্পানিকে ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার ব্যবহার, বিপণন পণ্যের গ্রাহক অসন্তোষের বিপরীতে মূল্য ফেরতের নিশ্চয়তা প্রদান, পণ্যের মান সম্পর্কে বিএসটিআই বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি অ্যান্ড ফার্মসকে যত শক্তিশালী করা হোক না কেন তারা এমএলএম কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারণ এমএলএম কোম্পানি ছাড়াও আরো হাজার হাজার কোম্পানি রয়েছে। সব ধরনের কোম্পানির রেজিস্টার হিসেবে কাজ করছে ওই সংস্থাটি। এছাড়া এমএলএম কোম্পানিগুলোর কাজ অন্যরকম এবং আমাদের দেশে নতুন। এ ধরনের কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগও অনেক বেশি। তাই এমএলএম কোম্পানিকে অন্যসব কোম্পানির মতো বিবেচনা করে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশে এমএলএম আইন রয়েছে। মালয়েশিয়ায় রয়েছে ডাইরেক্ট সেল অ্যাক্ট-১৯৯৩, যুক্তরাজ্যে রয়েছে ফেয়ার ট্রেড অ্যাক্ট, ভারতে প্রাইস চিস্ট অ্যান্ড মানি সার্কুলার স্কিম অ্যাক্ট-১৯৭৮, চীনে রয়েছে ডাইরেক্ট সেলিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যাক্ট এবং কানাডায় আছে কম্পিটিশন অ্যাক্ট।

শেষ কথা

বৈধ পদ্ধতির ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে (এমএলএম) বৈধতা দিয়ে পিরামিড পদ্ধতি বা অ্যারোপ্লেন পদ্ধতি বা বৃত্তাকার/হাতে হাত ধরা পদ্ধতি জাতীয় জন ক্ষতিকর পদ্ধতিকে অবৈধ করে দেশে ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

অস্পষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে স¦ীকৃত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতি ব্যবহার করে অপ্রচলিত কিছু দ্রব্য বাজারজাত করা চলতে পারে। কিন্তু আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে লাখ লাখ লোকের কোটি কোটি টাকা ঝুঁকির মুখে ফেলা যায় না। সমবায় আইনের অধীনে ক্ষুদ্র পুঁজির সমবায় সমিতির কার্যক্রমের মধ্যে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতি টেনে এনে সামগ্রিক অর্থ প্রক্রিয়ার সাইকেলকে হুমকির মুখে ঠেলে না দিয়ে আইন করে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোর যে কোনো সমবায় সমিতি গঠন, আমানত সংগ্রহসহ আর্থিক লেনদেন বন্ধে আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা  হলো- ১. ডাইরেক্ট সেলিং আইন-২০১১-এর খসড়া পুনর্বিবেচনা করে পিরামিড পদ্ধতির ডাইরেক্ট সেলিংসহ জনবিরোধী অংশগুলো আরো যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে আইন প্রণয়ন করা, ২. সমবায় আইনের অধীনে গঠিত মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আমানত সংগ্রহের সর্বোচ্চ সীমানা বেঁধে দিয়ে সমবায় সমিতিগুলো বল্গাহীন আমানত সংগ্রহ ও ওই আমানতের অব্যবস্থাপনা বন্ধ করা, ৩. তফসিলি ব্যাংক ব্যতীত অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন, আমানত সংগ্রহ, আমানতের অর্থ বিনিয়োগ পদ্ধতিসহ অর্থ সম্পর্কিত সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সমবায় অধিদপ্তরের সমন¦য়ে প্রণয়ন করা। শুধু মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি নয়, আইনের ফাঁক গলে কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানই যেন অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও আমানত সংগ্রহ করে সার্বিক ব্যাংকিং পদ্ধতিকে দুর্বল করার মাধ্যমে অর্থনীতির চাকাকে শ্লথ করতে না পারে ও লাখ লাখ মানুষকে সর্ব¯^ান্ত করতে না পারে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া, ৪. অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স¦রাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সমবায় অধিদপ্তর, তফসিলি ব্যাংক, দুদক, মানবাধিকার কমিশন, অর্থ বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয়, সংস্থা, অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন¦য়ে একটি ডাইরেক্ট আইন প্রণয়ন কমিটি করে ‘ডাইরেক্ট মার্কেটিং আইন-২০১১’-এর খসড়া আইনটি পুনরায় পর্যালোচনা করে আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা, ৫. সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের আগে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম, আর্থিক লেনদেন, বার্ষিক আয়-ব্যয় সরকারিভাবে তদারকি করে জনসাধারণের আমানতের অর্থ সুরক্ষা করা, ৬. রাষ্ট্র ও সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী, গণ্যমান্য ব্যক্তি যাদের দেখে জনসাধারণ বিশ্বাস ও আস্থা পায় তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা বা অন্য কোনোভাবে চাকরিতে যোগদান, আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান, ছবি তোলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে দায়িত্ববান হওয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, ৭. মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলোর বিক্রয় আইটেম/দ্রব্য হিসেবে আমদানিকৃত/উৎপাদিত দ্রব্যাদির মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আইন প্রণয়ন ও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা, ৮. মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলোর বাজারজাতকরণে কোনো ধরনের দ্রব্য বাজারজাত করতে পারবে বা পারবে না এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, ৯. দ্রব্যের বিপণনের বিজ্ঞাপনে মানহীন দ্রব্যকে অতিমূল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপনে চাকচিক্য আনা হয়। ফলে সাধারণ জনগণ ধোঁকায় পড়ে মানহীন ও বিপণন অযোগ্য দ্রব্য উচ্চমূল্যে ক্রয় করে প্রতারিত হয়। তাই দ্রব্য বিপণনে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আইন হওয়া প্রয়োজন এবং ১০. সাধারণ জনগণ কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান ও কী ধরনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করলে প্রতারিত হবে না এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ও সহজে বোধগম্য তথ্য দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বারংবার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করা।

প্রতারণায় মাল্টি লেভেল মার্কেটিং

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং প্রতারণা ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কোম্পানি এখন অবৈধ ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। এ ব্যবসার নীতিনির্ধারকরা জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তার সামান্য কিছু অংশ সদস্যদের ঋণ দিয়ে তহবিলের সিংহভাগ নানা খাতে ব্যবহার করছে। নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এ ব্যবসায় শ্রম ও সময় খাটাতে গিয়ে সর্বস্ব খুইয়েছে অনেকেই। মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ও এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ সুদ ও কমিশনে বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করায় ব্যাংকিং ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এলএমএম প্রতারণা নিয়ে অনুসন্ধান করে এই প্রতিবেদন লিখেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন

এমএলএম ব্যবসার নামে অসাধু চক্র প্রতারণার ফাঁদ পেতে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ বেকাররা এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। বেকারদের কর্মসংস্থান বা একটা আয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এ রকম প্রচার চালিয়েই এই প্রতারণা ব্যবসা চালানো হচ্ছে। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যায়, এ রকম বিশ্বাস থেকে ছাত্রছাত্রী, বেকার, টাউট-বাটপার থেকে শুরু করে দেশের নামিদামি পীর সাহেব পর্যন্ত এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন।

নব্বই দশকের পর থেকেই দেশে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসা আত্মপ্রকাশ করে। ‘৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিউওয়ে, জিজিএন, আইটিসিএল ডেসটিনি-২০০০ এ ব্যবসায় সাড়া ফেলে। প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় নিউওয়ে, জিজিএন, বিজনাস ডটকম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতারক কোম্পানির বিরুদ্ধে মিডিয়ায় একাধিক রিপোর্ট প্রকাশ পায়। ‘হুন্ডি কাজল’ যশোর-কুষ্টিয়ায় এ ব্যবসার নতুন রূপ দেয়। রাতারাতি টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্নে হাজার হাজার মানুষ হুন্ডি কাজলের কাছে অর্থ বিনিয়োগ করে। মাত্র ছয় মাসে দ্বিগুণ অর্থ পাওয়ার লোভে হাজার হাজার মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ‘দ্রুত বিনিয়োগ, দ্রুত আয়’ এই কনসেপ্টে মানুষ তার কাছে অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকে। এক সময় তার প্রতারণার খোলস খুলে যায়। কাজল গ্রেফতার হয়ে জেলে যায়। কিন্তু হাজার হাজার বিনিয়োগকারী পথে বসে যায়।

১৯৯৮ সালে ‘নিউওয়ে’ এ ধরনের প্রতারণার ব্যবসা খুলে বসে। অবশ্য তারা বড় ধরনের প্রতারণা করার আগেই মিডিয়ায় একাধিক রিপোর্ট প্রকাশ পায়। যে কারণে তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ২০০২ সালে বিজনাস ডটকম নামে অপর এমএলএম কোম্পানি প্রতারণা ব্যবসা খুলে বসে। নগরীর পান্থপথে তারা অফিস নিয়ে কাজ শুরু করে। কিন্তু পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশের পরই তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়।

ডেসটিনি-২০০০-এর যাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালের প্রথম দিকে। শুরুতে কোম্পানিতে জয়েনিং বা মেম্বারশিপ ছিল ২ হাজার ৭শ টাকা। এই টাকা নেয়া হতো ফরমের মাধ্যমে। চাল, ডাল, আটা, সাবান, তেল পর্যন্ত এই টাকায় সরবরাহ করা হতো।

শুরুতে প্রতারণাটা ছিল খুব সূ²। ধরার তেমন কেউ ছিল না। প্রথম যিনি জয়েন করবে তিনি একজন ডিস্ট্রিবিউটর। তিনি ২ জনকে জয়েন করাবেন। ওই ২ জন যখন বামে ২১ জন ডানে ২১ জন জয়েন করাবেন তখন তার টার্গেট পূর্ণ হবে। তখন তার কমিশন দেয়া হবে ১২ হাজার ৫শ টাকা। অথচ কোম্পানির লোকজন তার কাছ থেকে নিচ্ছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৭শ টাকা। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় ২০০০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। পরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরে তিন গুণ লাভ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সর্বশেষ তারা ট্রি-প্ল্যানটেশন প্রজেক্ট হাতে নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

ডেসটিনির অবৈধ ব্যাংকিংয়ের কারণে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে করে তদন্তে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজ¯^ বোর্ড। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, ডেসটিনি অর্থ প্রতারণা, দুর্নীতি ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায় এর আগে বিসিআই, আইটিসিএল, জিজিএন, যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) এবং সম্প্রতি ইউনিপেটুইউ যেভাবে লাখ লাখ মানুষকে নিঃ¯^ করেছে ডেসটিনির ভমিকাও একই হতে যাচ্ছে।

ডেসটিনিসহ প্রতারক এমএলএম কোম্পানির অপকর্ম সম্পর্কে গত ৬ ফেব্রæয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের দেশবাসীকে সতর্ক করে দেন। ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট বাগমারায় সংসদ সদস্য এনামুল হক ¯^রাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের উদ্দেশে ডেসটিনি ২০০০-এর প্রতারণামূলক কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। এর আগে ২০০৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ও ২৩ ডিসেম্বর ডেসটিনির প্রতারণা ও অবৈধ ব্যাংকিং খতিয়ে দেখার জন্য চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই চিঠি লালফিতায় বন্দি হয়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অল্প দিনে বড়লোক বানিয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়ে গণপ্রতারণার ফাঁদ পেতে কথিত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড শুধু দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই অর্থ হাতিয়ে নেয়নি, তাদের ফেলা ফাঁদে পা দেয় কাতার, দুবাই, কুয়েত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত শত শত প্রবাসীও।

আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণা

ইন্টারনেটভিত্তিক আউটসোর্সিং কাজকেও এখন এমএলএম ব্যবসায় রূপান্তর করেছে অসাধু চক্র। প্রায় ৭-৮টি কোম্পানি এ ব্যবসায় প্রতারণার ফাঁদ পেতে শত শত মানুষকে পথে বসিয়েছে। অন্যদিকে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সারাদেশে লাখ লাখ মানুষকে ঘরে বসে আয়ের ¯^প্ন দেখিয়ে তারা প্রতারণা করছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘পেইড টু ক্লিক’ করেই ডলার ‘ইনকাম’ বা আয়ের লোভনীয় ফাঁদ পেতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্কাইল্যান্সার অনলাইন অ্যাডক্লিক, বিডিএস ক্লিক সেন্টার, অনলাইন নেট টু ওয়ার্ক, বিডি অ্যাড ক্লিক, শেরাটন বিডি, ইপেল্যান্সার প্রমুখ। এরা মূলত এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে এন্ট্রি ফি বাবদ ১শ ইউএস ডলার নিয়ে থাকে। একজন সদস্য ১শ ইউএস ডলার দিলে তিনি অনলাইনে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় ঢুকে তাদের নির্ধারিত কিছু বিজ্ঞাপনে ক্লিক করেন। এভাবে একজন সদস্য প্রতিদিন ১শ ক্লিক করলে তার অ্যাকাউন্টে ১ ডলার জমা পড়ে। এই ডলারের হিসাব শুধু প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেখা যায়। ওই সদস্যের নিজের অনলাইন অ্যাকাউন্টে দেখা যায় না। ফলে নিবন্ধনের টাকা উঠাতে সদস্যরা নতুন সদস্য সংগ্রহে নেমে পড়েন। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী একজন সদস্য নতুন আরেকজন সদস্য সংগ্রহ করলে ১০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকেন।

আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারিত ভুক্তভোগী সোহেল, আবু জিহাদ, সুমনসহ একাধিক গ্রাহক সূত্রে জানা যায়, এটি ডিজিটাল কায়দার প্রতারণা। এ প্রসঙ্গে স্কাইল্যান্সারের এমডি সাইফুল ইসলামকে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে রাজি হননি। তার হিসাবরক্ষক আবু তাহের জানান, বাংলাদেশে তাদের গ্রাহক সংখ্যা দেড় লাখ। ‘আমরা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি সনদ, সমবায়ের সনদ ও ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছি।’ টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে রাজি হননি।

এমওয়ে করপোরেশন : ধর্মের নামে প্রতারণা

মাসে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এমওয়ে করপোরেশন।

স্বঘোষিত চরমোনাই পীর সৈয়দ রিদওয়ান বিন ইসহাক একটার পর একটা বিতর্কিত কাজ করে তোলপাড় সৃষ্টি করছেন। তিনি প্রতারণামূলক এমএলএম ব্যবসায়ও নেমেছেন। এমওয়ে করপোরেশন নামক একটি এমএলএম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ৬ মাসে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।

তিনি চরমোনাই পীরের সুনাম ব্যবহার করে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষিকা এমনকি চরমোনাই পীরের লাখ লাখ মুরিদকে ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ করেছেন। তাদের কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার করার নামেও প্রতারণা করছেন। এমওয়ে করপোরেশনের নিজস্ব কোনো হারবাল প্রডাক্ট না থাকলেও তিনি লতা হারবাল কোম্পানির প্রডাক্টকে নিজের কোম্পানির প্রডাক্ট হিসেবে বিপণন করছেন। এছাড়া কোম্পানির ব্রুসিয়ারে প্রায় ২০/২২টি অলীক প্রজেক্ট দেখিয়ে এসব প্রজেক্টের শেয়ার বিক্রি শুরু করেছেন। তার নামের সঙ্গে চরমোনাই পীরের সাইনবোর্ড থাকায় খুব সহজেই তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষকে প্রতারণা করছেন।

চট্টগ্রাম থেকে ২০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ভিসারেভ

এমএলএম কোম্পানি যুবক, ইউনিপেটু, রেভনেক্স, স্পিক এশিয়া, এমস্টার, গোল্ডেনট্রেডের মতো ভিসারেভ নামের আরেক হায় হায় কোম্পানির অস্তিত্ব মিলেছে চট্টগ্রামে। ১০ মাসে দ্বিগুণ লাভের বিভিন্ন লোভনীয় অফারে প্রলুব্ধ হয়ে হাজার হাজার গ্রাহক ভিসারেভে প্রায় ২শ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বলে জানা গেছে। ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে গ্রাহকরা এখন দিশেহারা। বিনিয়োগকৃত টাকার আসল ও লভ্যাংশ কোনোটিই ফেরত না দিয়ে এরই মধ্যে লাপাত্তা হয়ে গেছে এমএলএম প্রতিষ্ঠান ভিসারেভ।

ভিসারেভ প্রতি গ্রাহকের বিনিয়োগকৃত টাকা ১০ মাসে দ্বিগুণ দেয়ার বিভিন্ন লোভনীয় অফার দিয়ে চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার প্রায় ৮ হাজার গ্রাহকের কমপক্ষে ২শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এসব গ্রাহক সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার এবং সর্বোচ্চ কোটি টাকাও বিনিয়োগ করেছেন। ওই প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম এজেন্ট রবিউল হোসেন রবি কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তিনি গ্রাহকদের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখান বলেও কয়েকজন বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রাহকদের বিনিয়োগের টাকা আত্মসাৎ করে রবিউল হোসেন রবি এরই মধ্যে নগরীতে চিটাগাং ড্রিম প্রপার্টিজ লিমিটেড (সিডিপিএল) নামের একটি ডেভেলপার কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান, অ্যাকুমপ্লেসমেন্ট অ্যাসোসিয়েটের চেয়ারম্যানসহ কুয়াকাটায় সাউথ ওয়েভ রিয়েল এস্টেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪০ কাঠা জায়গা ক্রয়, প্রান্তিক প্রপার্টিজের নির্মাণাধীন একটি ফ্ল্যাট ক্রয়, মুরাদপুর ফুলকলি মিষ্টি বিতানের বিপরীতে নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট এবং মুরাদপুর ডাচ-বাংলা ব্যাংক সংলগ্ন মার্কেটে একটি বিশালাকার দোকানের মালিক বনেছেন।

রেভেনেক্সের প্রতারণা

রেভেনেক্স নামে আরেকটি কোম্পানির সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ছয় মাসে ২১৬ শতাংশ মুনাফা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জনসাধারণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ পর্যš— তিন লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে দেড়শ কোটি টাকা নিয়েছে তারা। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, বিনিয়োগকারীদের অর্থ তারা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা না নিয়ে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জমা নিচ্ছে। আবার কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেই গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেন মেটানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোম্পানিটির অস্বাভাবিক লেনদেনের ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে রেভেনেক্স নামক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বির”দ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

ব্যাংকে পরিচালিত হিসাবগুলো ফ্রিজ করা হয়েছে বলে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেন করা হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটির অফিস থেকে জানা যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সাধারণ জনগণকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে রেভেনেক্স তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ গ্রহণ করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে সুদসহ মূলধন মাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো এক সময় সাধারণ জনগণের বিনিয়োগকৃত অর্থ নিয়ে লাপাত্তা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেমনটি হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শক দল ৪ জানুয়ারি প্রাইম ব্যাংক, বনানী শাখা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, বনানী শাখা এবং বনানীতে রেভেনেক্স (বিডি) লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেনের বিষয়ে নানা অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরে একটি তদš— প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ঠিকানা পরিবর্তন করে বর্তমানে বাড়ি নং-৯, রোড নং-৪, ব্লক-এফ, বনানী, ঢাকায় ব্যবসা পরিচালনা করছে। অথচ হিসাব খোলার সময় ব্যাংকে প্রদত্ত ঠিকানা দেয়া হয়েছিল টাওয়ার হেমলেট, ১৬ কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ, বনানী, ঢাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার তাদের ঠিকানা পরিবর্তন করেছে, যা সন্দেহজনক। পরে ব্যাংকের কাছ থেকে প্রাপ্ত ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবসা পরিচালনা করতে দেখা যায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ‘সীমাš— মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। পরিদর্শন দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ তাদের সদস্যদের কাছ থেকে প্রতি ছয় মাসে মূল বিনিয়োগের ২১৬ শতাংশ ফেরতের শর্তে বিনিয়োগ গ্রহণ করে থাকে। পরিদর্শন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় তিন লাখ গ্রাহক ছিল এবং এসব গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইউনিপেটুইউ থেকে ইউনি মাল্টিপারপাস

প্রতারণার অভিযোগ থাকা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ইউনিপেটুইউর কর্মকর্তারা রাজধানীর খিলক্ষেতে নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে কার্যক্রম শুরু করেছেন। প্রতিষ্ঠানের নাম ইউনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড। ইউনিপেটুইউর গ্রাহকদের অভিযোগ, ইউনিপেটুইউর কর্মকর্তারা নতুনভাবে আবার প্রতারণার ফাঁদ পেতেছেন। ইউনিতে বিনিয়োগ করলে ইউনিপেটুইউতে পাওনা টাকার ৩৫ শতাংশ দেয়ার প্রলোভন দেয়া হচ্ছে। ইউনিপেটুইউ কার্যক্রম শুরু করেছিল ২০০৯ সালের অক্টোবরে। স্বর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগের আহŸানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৬ লাখ গ্রাহক এতে বিনিয়োগ করে।  প্রতিষ্ঠানটি বলেছিল, প্রতিমাসে মূলধন ও লভ্যাংশের ১০ শতাংশ করে ১০ মাসে গ্রাহকদের দ্বিগুণ টাকা দেয়া হবে। তবে বেশিরভাগ গ্রাহকই লভ্যাংশ দূরে থাক, মূলধনই পাননি। গত বছরের ৬ জুন ইউনিপেটুইউর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক হিসাবে থাকা ইউনিপেটুইউর ৪শ ২০ কোটি টাকা আদালতের নির্দেশে জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।  ইউনিপেটুইউর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সারাদেশে তিন শতাধিক মামলা করেন গ্রাহকরা। পরে ধানমন্ডির প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে দেন কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, ইউনি মাল্টিপারপাস ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয়। ইউনির পরিচালনা পর্ষদের অর্থ ব্যবস্থাপক এমএ তাহের, সহসভাপতি মেজর (অব.) এমএ জলিল ও সদস্যপদে আছেন মুনতাসির হোসেন। তাহের ইউনিপেটুইউর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, জলিল পরিচালক ও মুনতাসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ইউনির চেয়ারম্যান রফিকুল আলম ও সচিব নুরুজ্জামান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনি মাল্টিপারপাসের লাইট, সুপার ও প্রিমিয়ার নামে তিনটি প্রকল্প রয়েছে। বলা হচ্ছে, লাইটে ৪২ হাজার, সুপারে ১ লাখ ৫ হাজার এবং প্রিমিয়ারে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে ১৮ মাস সময়ে দ্বিগুণ দেয়া হবে। তবে লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ হিসেবে কাটা হবে।  তবে মেয়াদের আগে বিনিয়োগ ওঠানো যাবে না। ইউনিপের গ্রাহক মাহফুজুর রহমান বলেন, নতুন কোম্পানিতে বিনিয়োগের ৩৫ শতাংশ দেয়ার আশ্বাস আসলে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার ফাঁদ। আরেক গ্রাহক মোঃ সোহেল বলেন, এই ফাঁদে ইতিমধ্যে অনেকে পা দিয়েছেন। ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা গালিব খান বলেন, ‘ইউনি মাল্টিপারপাসের কর্মকর্তারা ইউনিপের কর্মকর্তা, তা জানলে নিবন্ধন দিতাম না।  ১৮ মাসে দ্বিগুণ দেয়ার আশ্বাস, রেজিস্টার্ড কার্যালয় ছাড়া কার্যালয় খোলা প্রভৃতি সমবায় আইনবিরোধী।’ তিনি বলেন, সেখানে পরিদর্শনের পর এ ব্যাপারে তদš— কমিটি করা হয়েছে।  সেখানে আইনবিরোধী কিছু হলে এবং ইউনিপের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে নিবন্ধন বাতিল করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন

ড. আকবর আলি খান – সাবেক উপদেষ্টা, তত্তাবধায়ক সরকার

আইনি দুর্বলতার কারণে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলো প্রতারণার ব্যবসা করে যাচ্ছে। এই প্রতারণা বন্ধ করতে হলে আইনকে শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে সমবায় আইনটি দুর্বল। এটা করা হয়েছিল সমবায়ের জন্য। তখন এটা মাথায় রেখে করা হয় যে, এগুলো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান হবে না। কিন্তু সমবায়ের ব্যানারে অনেক প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে যাচ্ছে, এটি বিপজ্জনক। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে ধরনের টেকনিক্যাল এক্সপার্টিজ দরকার তা সমবায় অধিদফতরের নেই। কাজেই এটা বাংলাদেশ ব্যাংকে ন্যস্ত করা দরকার অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে আলাদা সংস্থা করা যেতে পারে। এই প্রতারণা বাড়ার মূলে রয়েছে ঠিকমতো আইন নেই, আবার যা আছে তার প্রয়োগ নেই। যে কারণে প্রতারণা বেড়েই চলেছে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ – বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া দরকার। এই তদন্ত না হলে শেয়ারবাজারের মতো যে কোনো সময় শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যাবে। পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের প্রতারক প্রতিষ্ঠান মানুষের অর্থ নিয়ে পালিয়ে যেত।

কিছু দিন আগে যুবক একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এর আগে নিউওয়ে, বিজনাস ডট কম একই ধরনের প্রতারণা করেছে। এখন ডেসটিনি প্রতারণার ব্যবসা করছে। ডেসটিনি শুধু ব্যাংকিং আইনই লক্সঘন করেনি, তারা সমবায় সমিতি আইনও লক্সঘন করেছে। কমিশিন দিয়ে ব্যবসা করার কথা সমবায় আইনের কোথাও নেই। অথচ ডেসটিনি তা করছে। এদের সিস্টেম পিরামিডের মতো। ফলে নতুন যে সদস্য বিনিয়োগ করবে তার ক্ষতির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত এই প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

মন্ত্রীরা যা বলেন

আবুল মাল আবদুল মুহিত -অর্থমন্ত্রী

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণা ব্যবসা চলছে। জিজিএন, নিউওয়ে, যুবক, ডেসটিনি এরা সবাই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। প্রতারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে তদন্ত দল কাজ করছে। দুদক, রাজ¯^ বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক সবাই একযোগে কাজ করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে। আমার অবাক লাগে এরা দিনের পর দিন এভাবে মানুষকে ঠকাচ্ছে তারপরও এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন। প্রতারক কোম্পানির অনেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে আমি কোনো সুযোগ দেইনি। এমএলএম ব্যবসার নামে অধিকাংশ কোম্পানি ব্যাংকিং চালিয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই হতে পারে না। মানুষের অর্থ নিয়ে প্রতারণা চলতে দেয়া যায় না। সরকার প্রতারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

জি এম কাদের – বাণিজ্যমন্ত্রী

এমএলএম ব্যবসার নামে যারা প্রতারণা করেছে তারা যাতে তাদের সম্পদ হস্তান্তর না করতে পারে সে জন্য কমিশন গঠন করবে সরকার। সরকার শুধু কমিশন গঠন করেই ক্ষান্ত হবে না, এসব প্রতারক প্রতিষ্ঠান অর্থ পাচার বা হস্তান্তর করতে পারে সে জন্য আগে থেকেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ফ্রিজ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে। যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য যেভাবে কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবারেও প্রতারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এসব প্রতারকের বিরুদ্ধে অনেক আগেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। গত জোট সরকারের সময় ব্যাঙের ছাতার মতো মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছে। মূলত এখান থেকেই প্রতারণাটা শুরু হয়। আমরা নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তাভাবনা করছি। নতুন আইনের মাধ্যমে প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

প্রতারিত সোহেলের কাহিনী 

মেধাবী যুবক এম মিজানুর রহমান সোহেল ঢাকায় এসেছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। পড়াশোনা শেষ করে কোথাও ভালো চাকরির প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু ডেসটিনিতে নাম লেখিয়ে তার এখন পথে বসার উপক্রম। পড়ালেখাও তিনি শেষ করতে পারেননি। তার জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো এখন বিবর্ণ হয়ে গেছে। এমএলএম ব্যবসায় তিনি কীভাবে প্রতারিত হয়েছেন সেই কাহিনী বর্ণনা করেন তিনি।

ডেসটিনির সদস্য হয়ে কীভাবে প্রতারিত হলেন তার বিস্তারিত বর্ণনায় সোহেল বলেন, ২০০৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা কলেজে তিনি অনার্সে ভর্তি হন। ভর্তির পরপরই তার এক বন্ধু তাকে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের এমএলএম কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয়ের ¯^প্ন দেখায়। ওই কোম্পানিটির প্রশিক্ষণে জাদুর মতো চটকদার লোভনীয় কথায় তিনি ডেসটিনির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৬ সালের ৩১ আগস্ট ২৭৮তম স্টেটমেন্টে ডেসটিনির ঢাকা-৭ অফিসে তিনটি সেন্টার নিয়ে ডেসটিনির সদস্য হন। তার সেন্টারের সিআইডি নম্বরগুলো হচ্ছে ১১৫৪৮২০, ১১৫৪৮২১, ১১৫৪৮২২। ডেসটিনিতে সদস্য হওয়ার পর তার অফলাইন লিডাররা নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য তাকে নানাভাবে ব্যবহার করতে থাকেন। প্রথমে তাকে সপ্তাহে ছয় থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিলে মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করা যাবে বলে লোভ দেখান। পড়াশোনা ও চাকরির পাশাপাশি তিনি ডেসটিনিতে খণ্ডকালীন কাজ শুরু করেন। কিন্তু খণ্ডকালীন সময়ে তার প্রথম আট মাসে আয় হয় মাত্র ১৮শ টাকা। এরপর অফলাইন লিডাররা তাকে পরামর্শ দেন, চাকরিটা ছেড়ে পূর্ণ সময় দেয়ার এবং তাতে মাসে তার ৫০ হাজার টাকা আয় নিশ্চিত হবে। তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেন। কিন্তু রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম করেও তার ভাগ্য খোলেনি। বরং পুরো এক বছর সময় দিয়ে ধারদেনা করে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা খরচ করে ১২ হাজার টাকা আয় করেন। অফলাইন লিডাররা তাকে অভয় দিয়ে বলেন, সবারই প্রথম প্রথম বেশি সময় লাগে, কিন্তু জ্যাম ছেড়ে গেলে দেখবেন প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন।

এদিকে তার বাবা-মা বারবার ডেসটিনি করতে বারণ করলেও তাদের কথা অগ্রাহ্য করে তিনি মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করার প্রতিশ্রুতি দেন। এতে বাবা-মা তাকে টাকা পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেন। এদিকে চাকরি ছেড়ে দেয়ায় তিনি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কলেজের কয়েক বন্ধুর কাছ থেকে ঋণ করে ডেসটিনিতে প্রায় তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করে দুই বছরে সাত সাইকেল তথা প্রায় ৮৮ হাজার টাকা আয় করেন। ডেসটিনিতে এক ট্রেনিংয়ে অফলাইন লিডাররা বলেন, যারা পড়াশোনা করছেন তারা তো পড়াশোনা শেষ করে টাকাই আয় করবেন। সেই টাকা যদি এখনই আয় করতে পারেন, তাহলে পড়াশোনা করে কী হবে? বাংলাদেশে পড়াশোনার কি কোনো ভাত আছে? শিক্ষিত বেকাররা ক্রাইম করে। তাই আপাতত পড়াশোনা করে সময় নষ্ট না করে এখানে সিরিয়াসলি সময় দিলে মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করা অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে যাবে। তাদের কথামতো তিনি পড়াশোনাও বন্ধ করে দেন। সোহেল আরো বলেন, ডেসটিনির কোনো সদস্য যাতে ডেসটিনি ছাড়তে না পারে সে জন্য তারা নানা কৌশল গ্রহণ করে। প্রথমত অন্য সব আয় থেকে সদস্যদের সরে আসতে বাধ্য করে। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে তা খরচ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। যাতে করে ঋণের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ডেসটিনির কাজের গতি বৃদ্ধি পায়। এরপর পড়াশোনা বা শখের কোনো কাজ থাকলে সেখান থেকেও অব্যাহতির ব্যবস্থা করা হয়। যেন ডেসটিনিতে ফুলটাইম সময় দিতে বাধ্য হয়। বিয়ে না করে থাকলে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে ঘাড়ে সংসার চালানোর তাগিদ থেকেই ডেসটিনির কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

দুর্নীতির আখড়া সমবায় অধিদপ্তর

দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে জাতীয় সমবায় অধিদপ্তর। বিধিবিধান উপেক্ষা করে রাজনৈতিক চাপে চলছে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। অভিযোগ উঠেছে দলবাজ কিছু কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক ছায়া দিয়ে তাদের মাধ্যমে অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে। সমবায় সমিতি নিবন্ধন, অডিট, এরিয়া-অপারেশনস বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ বদলি, পদোন্নতি প্রভৃতি খাতে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি করে নতুন এক রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়েছে। কিছু কর্মকর্তা নিজেদের প্রধানমন্ত্রী, এলজিআরডিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একাš— লোক দাবি করে যা খুশি তাই করে যাচ্ছেন। অর্থের বিনিময়ে গণহারে সমবায় সমিতির প্রাথমিক নিবন্ধন প্রদান করে লাখ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করা হচ্ছে। দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে তদš—াধীন রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ওই সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাদের সমবায় অধিদপ্তর থেকে সরানো হয়নি। দেয়া হয়নি কোনো প্রকার বিভাগীয় শাস্তি।

নিয়োগ বাণিজ্য

সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাসে ৭ শতাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ওই নিয়োগে প্রায় ২৫ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে। পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক, অফিস সহকারী, টাইপিস্ট, ড্রাইভার ও পিয়ন পদে এই নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন অমিয় চট্টোপাধ্যায় (অতিরিক্ত নিবন্ধক) সভাপতি, মোমিনুল হক তালুকদার (সাবেক ডেপুটি রেজিস্ট্রার) সদস্য সচিব, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি-সহকারী সচিব সাহানা খানম, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহ-সচিব জসিম উদ্দিন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের দুজন কর্মকর্তা। কমিটিতে সাতজন কর্মকর্তা থাকলেও নিয়োগ কার্যক্রমের সব সিদ্ধান্ত দেন ওই দুজন। অভিযোগ উঠেছে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে ১০ লাখ থেকে সর্বনিম্ন ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ গ্রহণ করা হয়েছে। যে সব প্রার্থী তাদের নির্ধারিত উৎকোচ দিতে পেরেছে রিটার্ন পরীক্ষায় তাদের ৮০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর দিয়ে কৃতকার্য দেখানো হয়েছে। আর যারা উৎকোচ দেয়নি, লিখিত পরীক্ষায় তাদের ৩০/৪০ নম্বর দেয়া হয়েছে।

ক্যাডার প্রশাসনে নন-ক্যাডার

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিদপ্তরের ক্যাডার সার্ভিসের পদগুলো দলীয়করণ করে সেখানে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। এতে করে ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তারা দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনে গতিহীন হয়ে পড়েছেন। যেমন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধকের (প্রশাসন) পদটি ক্যাডারভুক্ত পদ, অথচ সেখানে একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে। এ রকম ৫/৬ জন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা দ্বারা ক্যাডার প্রশাসন পরিচালনা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানায়, সমবায় অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়টিতে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে বেশি। মাল্টিপারপাস সমিতি থেকে মাসহারা নিয়ে তাদের অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সমবায় আইনে বিধিগত ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এভাবে তারা জনগণ থেকে কোটি কোটি টাকা আমানত নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। এমনকি ওইসব মাল্টিপারপাস সমিতির কর্মকর্তাদের প্রতারণার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিভাগীয় সমবায় কর্মকর্তা প্রতুল কুমার সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি অর্থের বিনিময়ে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতিকে সারাদেশে শাখা খোলার অনুমোদন দিয়েছেন। এছাড়া জামায়াত নেতা মুজাহিদের বেয়াই ইসমাইল হোসেনকে ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতির নিবন্ধন দেয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা উৎকোচ নেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অনুমোদন ছাড়াই দেশব্যাপী শাখা খুলে ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস তাদের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে সমবায় আইনে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এর আগে যখন ডেসটিনিকে নিবন্ধন দেয়া হয় তখন ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন ইকবাল হোসেন। পরবর্তী সময়ে তার স্থলাভিষিক্ত হন আবুল হোসেন। বর্তমানে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন গালিব খান। এ প্রসঙ্গে গালিব খান জানান, বিভাগব্যাপী যেসব সমিতি পরিচালিত হচ্ছে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার দায়িত্ব বিভাগীয় কর্মকর্তার। এক্ষেত্রে ঢাকা জেলা কর্মকর্তার ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক সূত্রগুলো আরো জানায়, সমবায় অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রীয় একটি সমবায় ব্যাংক রয়েছে। এই ব্যাংকটিও ফান্ডের অভাবে মৃতপ্রায়। স¤প্রতি ব্যাংকটি সচল করার জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই ব্যাংকটিতে রাজনৈতিক কোটায় একজন সভাপতি নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ব্যাংকটি গতি ফিরে পায়নি।

গণহারে সমিতি নিবন্ধন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতীতে যারা ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা ছিলেন তারা অর্থের বিনিময়ে গণহারে সমবায় সমিতির নিবন্ধন দেয়ায় বর্তমানে কেবল ঢাকা জেলাতেই নিবন্ধিত সমিতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩শ, যা একেবারেই অস্বাভাবিক। এসব সমিতি নিবন্ধন দেয়ার পর যথাযথভাবে অডিট করা হয়নি। অডিটের নামে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে সমিতিগুলো সম্পর্কে ইতিবাচক রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। অডিট খাতেই প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অডিট বিভাগের কর্মকর্তারা।

সমবায় অধিদপ্তরে এক শ্রেণীর কর্মকর্তা নিজেদের সরকারি দলের লোক দাবি করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। নেতৃস্থানীয় ৫/৬ টি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতির সঙ্গে আঁতাত করে জনগণের আমানতের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছেন এরা। এসব মাল্টিপারপাস সমিতির কাছ থেকে তারা নিয়মিত মাসহারা নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উৎকোচ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সেগুলো হলো ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, ইউনিভার্সেল কো-অপারেটিভ সমিতি, অগ্রণী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, এমওয়ে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, ইউনিপে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সমবায় অধিদপ্তরে দুর্নীতি ছিল এটা সত্য। আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

http://www.shaptahik-2000.com/?p=1545

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: