অদক্ষ মন্ত্রীদের চালিয়ে নিতে সাত উপদেষ্টা ?

সাত উপদেষ্টা

প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় কাজ করছেন সাত উপদেষ্টা। এর আগে কোনো সরকারেই এত উপদেষ্টা দেখা যায়নি। কোনো উপদেষ্টাকে এত সরব থাকতেও দেখা যায়নি। উপদেষ্টাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিও নেই। কিন্তু বিধান (রুলস অব বিজনেস) পাল্টে সরকার  সাত উপদেষ্টা নিযুক্ত করেছে। এমনকি রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজেও তারা অংশগ্রহণ করছেন। উপদেষ্টা নিয়োগের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই চলছে নানা বিতর্ক। বিরোধী দলগুলোতে তো বটেই, এমনকি সরকারি দলেও রয়েছে উপদেষ্টাদের কার্যক্রম ও ক্ষমতার অনুশীলন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ-বিক্ষোভ। অভিযোগ রয়েছে তারাই চালাচ্ছেন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী, সচিব শুধু রুটিন ওয়ার্ক করছেন। মহাজোট সরকারে কেন এত উপদেষ্টা? কী তাদের কাজ? তারা কি সরকার ও জনগণের আদৌ কোনো কাজে লাগছেন? না কি একদিকে সরকারকে নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিতর্কিত করছেন, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উস্কে দিচ্ছেন? সাত উপদেষ্টার কার্যক্রম এবং সরকার ও জনমনে তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া অনুসন্ধান করে লিখেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন

ঘটনা ১ : ৮ মার্চ ২০১২। স্থান জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলবিহীন জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের ব্যর্থতা নিয়ে কঠোর সমালোচনামুখর হয়ে উঠলেন। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনায় বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য, রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রæতি দিয়েছেনÑ ভোলায় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে। কিন্তু সরকারের তিন বছর পার হয়ে গেছে। এখনো কাজ শুরু হয়নি। সরকারি দল করি, এ জন্য সরকারকে কিছু বলতে পারি না। কিন্তু এলাকায় গেলে মানুষ নানা প্রশ্ন করে। বিদ্যুৎ, গ্যাস সমস্যা নিয়ে জনগণ জানতে চায়। এ বিষয়ে জনগণের প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না।’ এক উপদেষ্টার দিকে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করে তিনি আরো বললেন, ‘আমি আগেও বলেছি, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় কে চালায়? বিদ্যৎ উপদেষ্টাকে কৈফিয়ত দিতে হয় না। অথচ তার কথার বাইরে কিছুই হয় না।’

ঘটনা ২ : সরকারি দলের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। ৮ মার্চ সংসদ অধিবেশনে তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সকালে বিদ্যুৎ ছিল না। পানি তুলতে না পেরে বাথরুম করতে পারিনি। গোসল করাও হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করেছেন। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এই বিদ্যুৎ কোথায় যায়? উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। কারণ ওনার কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

ঘটনা ৩ : ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননও বিক্ষুব্ধ সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার কর্মকাণ্ডে। তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট, শুল্ক কাঠামো, টিপাইমুখ বাঁধসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের উপদেষ্টারা এমনভাবে কথা বলেন, শুনে মনে হয় তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা নন, তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপদেষ্টা। উপদেষ্টা নামের সাবেক আমলারা বালখিল্যতা করছেন। তাদের কথা শুনে জনমনে হতাশা সৃষ্টি হয়।’

ঘটনা ৪ : জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। তিনিও সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে। ফেনী অভিমুখে লংমার্চের সময় বিভিন্ন পথসভায় তিনি সরকারের উপদেষ্টাদের যোগ্যতা ও বিচক্ষণতায় কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট মাসুল ও টিপাইমুখ বাঁধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যখন সরকারের উপদেষ্টারা বক্তব্য রাখেন তখন প্রশ্ন জাগে এরা কার উপদেষ্টা? এসব উপদেষ্টা বাংলাদেশের, না ভারতের মানুষ। তারা বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বলেন না। তারা বলেন ভারতের ¯^ার্থের কথা। এসব উপদেষ্টা কোথা থেকে এসেছেন? এসব উপদেষ্টা আমাদের দরকার নেই।’

ওপরের ঘটনাগুলোতেই প্রতিফলিত হচ্ছে উপদেষ্টাদের গ্রহণযোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কে খোদ সরকারি দলের ও মহাজোটের বিভিন্ন রাজনীতিকের ধারণা। প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শদান ও মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি আনতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার সাতজন উপদেষ্টা নিয়োগ করা হলেও তাদের কার্যপরিধি ও কার্যক্ষমতা নিয়ে, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনবিচ্ছিন্নতা নিয়ে সর্বত্র প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও নানা বিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। এসব উপদেষ্টা সরকারের কাজে গতি আনা তো দূরে থাক বরং জগাখিচুড়ি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। যেসব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা আছেন সেসব মন্ত্রণালয়েরই অবস্থা এখন সঙ্কটাপন্ন। মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়া এসব উপদেষ্টার প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিরূপ মনোভাব আর উভয় পক্ষের অন্তর্দ্বদ্ব-সংঘাতের বিষয়টি গোপন থাকছে না। অনির্বাচিত, জনগণের কাছে দায়বদ্ধহীন, জবাবদিহিমুক্ত সাবেক আমলা বা সমগোত্রীয় ব্যক্তি এসব উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মন্ত্রীদের মতবিরোধ গত প্রায় সাড়ে তিন বছরে প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। সংবিধানবহির্ভূত এসব উপদেষ্টার দায়িত্ব ও ক্ষমতার কোনো সীমারেখা না থাকায় তারা মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর কাজে হস্তক্ষেপ করে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কথায় মন্ত্রণালয় চলছে। সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন উপদেষ্টারা। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলে মন্ত্রীরাও এদের জবাবদিহিতা ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো কিছু বলতে পারছেন না।

উপদেষ্টাদের নিয়োগ ও নির্বাহী কাজে অংশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকলেও তারা রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজে অংশ নিচ্ছেন নিয়মিত। সাংবিধানিক অধিকার না থাকলেও তাদের অ¬নভিপ্রেত হস্তক্ষেপ নিয়ে মন্ত্রীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। উপদেষ্টাদের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও। তারা বলছেন, সংবিধান যেখানে মন্ত্রীকেই মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে সেখানে মন্ত্রণালয়ের কাজে উপদেষ্টার ভূমিকা কী? তাদের নিয়োগ দিয়েই বা সরকার কতটুকু লাভবান হচ্ছে? তাদের অবস্থানইবা কোথায়? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। উপদেষ্টাদের কার্যকলাপ দেখে প্রায়শই মনে হয় তারা মন্ত্রীদের ওপরে। যদিও তাদের সাংবিধানিক পদের কোনো ভিত্তি নেই।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন ডা. এসএ মালেক। তিনি অবশ্য কোনো মন্ত্রণালয়ে খবরদারি করেননি। তার কার্যক্রম নিয়ে তেমন একটা প্রশ্নও দেখা দেয়নি। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর হারিছ চৌধুরী হন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব। তিনি রাজনৈতিক উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। তিনি এ পদকে ক্ষমতা ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। হাওয়া ভবনের সঙ্গে যোগসাজশে দেশ পরিচালনার নতুন কিন্তু বাজে রেকর্ড তৈরি করেন। হাওয়া ভবন ও হারিছ চৌধুরীই এ সময় প্রশাসন পরিচালনা করেন। এ সময় আরো পাঁচ উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের কর্মকাণ্ড জনগণ তেমন জানতে পারেনি। তারা প্রশাসনে খবরদারিতে লিপ্ত ছিলেন না।

২০০৮ সালে নির্বাচনে মহাজোট ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাতজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। এরা হলেন- জনপ্রশাসন উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মে. জে. (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরাসরি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কোনো উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা ও পরামর্শ দিতে এ সাতজনকে নিয়োগ দেন। এ সাত উপদেষ্টার হাতে ন্যস্ত করা হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে কয়েকটি দফতরও বণ্টন করা হয়। এ দায়িত্ব বণ্টনের পর উপদেষ্টা ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বিপরীত মেরুর বাসিন্দা বনে যান। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, শিক্ষা, জ্বালানি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

দ্বদ্বস্থল : শিক্ষা মন্ত্রণালয়

সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিন আহমেদের মধ্যে দ্বদ্ব এবং সমণ্নয়হীনতা এত চরমে পৌঁছে যে, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তাদের কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেন ¯^য়ং প্রধানমন্ত্রী। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে উপদেষ্টার সম্পর্কের অবনতি ঘটে ২০১০ সালে। এ অবস্থার পরিবর্তন এখনো হয়নি। বরং শিক্ষামন্ত্রীর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আরো সঙ্কুচিত হয়েছে। বদলি, পদোন্নতি ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন-সংক্রান্ত সব কাজই এখন চলছে উপদেষ্টার নেতৃত্বে। এতে মন্ত্রী অনেকটা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছেন। মন্ত্রী-উপদেষ্টার সমš^য়হীনতার সুযোগে বেড়ে গেছে তদবির বাণিজ্য। উপদেষ্টা নিজে আওয়ামীপন্থী শিক্ষাবিদ হওয়ায় এবং শিক্ষামন্ত্রী বাম ঘরানার রাজনৈতিক দল থেকে আগত বিধায় সরকারের রাজনৈতিক আস্থা তুলনামূলকভাবে উপদেষ্টার ওপর অনেক বেশি। এছাড়া নেতাকর্মীরাও উপদেষ্টার সঙ্গেই বেশি ¯^াচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ হলো, তিনি তার সাবেক দলের অনুসারীদের পদোন্নতি, পোস্টিং বেশি দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বামপন্থীদের প্রতি বিশেষ দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে। মন্ত্রী-উপদেষ্টার এ রকম টানাপড়েনে সিদ্ধান্তগ্রহণ ও বাস্তবায়নে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

অদক্ষ মন্ত্রীদের চালিয়ে নিতে

সাত উপদেষ্টা

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিন উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছিল। আর বিএনপি সরকারের সময় পাঁচ উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। এবারই সর্বোচ্চ সাত উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে। সংসদীয় ব্যবস্থায় উপদেষ্টা নিয়োগের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই। কিন্তু গত কয়েকটি সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নামে সরকারে উপদেষ্টা নিয়োগ হয়েছে। উপদেষ্টারা রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজে অংশ নেয়ায় সংসদীয় সরকারের ধরন বিকৃত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, অধিকাংশ নতুন রাজনীতিকদের নিয়ে এবারের মন্ত্রিপরিষদ সাজানো হয়েছে। অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নতুনদের নিয়ে সাজানো মন্ত্রিসভাকে অধিকতর কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের তদারক ও পরিচালনায় সহায়তার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। তবে সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলের বাঘা বাঘা নেতা সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় প্রধানমন্ত্রী কারো ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। তাই অপেক্ষাকৃত তরুণ ও অদক্ষ নেতাদের নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেছেন এবং এটিকে সক্রিয় রাখার জন্য তাদের ওপর উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। অর্থাৎ সিনিয়র নেতাদের কর্মদক্ষতার পরিপূরক হিসেবে উপদেষ্টাদের কর্মদক্ষতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

দ্বদ্বস্থল : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

জনপ্রশাসন চালাচ্ছেন উপদেষ্টা সাবেক সচিব এইচটি ইমাম। প্রভাবশালী এই উপদেষ্টা ওয়ান-ইলেভেনের পর মহাজোটের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান হয়ে লাইমলাইটে আসেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বপালনরত অবস্থায় স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তিনি খোন্দকার মোশতাক আহমদ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। যে কারণে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী তাকে সহজভাবে নেয়নি। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে তিনি আবার আলোচনায় উঠে আসেন। এবং সরকারের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন। অভিযোগ মহাজোট সরকার গঠনের পর তার নির্দেশেই জনপ্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী এই উপদেষ্টা নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ঘিরে দলের কাছেই বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। যে কারণে  সরকারের ওপর প্রশাসনে ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে।

কথিত আছে, সেনা নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে প্রভাব বিস্তার করে আছেন প্রধানমন্ত্রীর সামরিক বিষয়ক উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) তারেক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি ক্ষমতাবান একজনের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে সেনা প্রশাসনে একক ক্ষমতা দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় তার নির্দেশেই পরিচালিত হয়ে থাকে।

মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বৈত শাসনের অবস্থা সৃষ্টি

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, কোনো কোনো উপদেষ্টার খবরদারির কারণে মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বৈত শাসনের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থাকার পরও উপদেষ্টা কাজ করছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যাত্রা শুরু হয় একজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টার মাধ্যমে। শুরু থেকে এ মন্ত্রণালয়ের কাজে এক ধরনের বিশৃক্সখল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের কাজ নিয়ে উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ও মন্ত্রীর মধ্যে বিশেষ করে নিয়োগ-বদলি ও অন্য বিষয় নিয়ে মতবিরোধ ছিল। এক পর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের বহু বিষয়ে উপদেষ্টার হস্তক্ষেপের কারণে কাজ করতে পারছেন না বলে মন্ত্রী নালিশ করেন। এদিকে গত ১৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ওএসডি করে। ২১ ডিসেম্বর মন্ত্রী ওই কর্মকর্তার বদলি বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রাখার জন্য অনানুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র দিয়েছেন সংস্থাপন সচিবকে। আবার একই দিনে প্রতিমন্ত্রী ওই কর্মকর্তাকে ড্যাবের নেতা জাহিদ হোসেনের আশীর্বাদপুষ্ট উল্লেখ করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের আদেশ বহাল রাখতে সচিবকে আরেকটি অনানুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র দেন। ওই কর্মকর্তা ড্যাবের চাহিদাপত্র অনুযায়ী বিএনপি সরকারের সময় স্বাস্থ্য ক্যাডার থেকে প্রশাসনে এসেছিলেন। তার কারণেই বিশ্বব্যাংকের দেয়া হতদরিদ্র মানুষের পথ্য কেনার ৪৫০ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে বলে প্রতিমন্ত্রীর পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চিকিৎসক, নার্স নিয়োগ-বদলি নিয়ে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) একদিকে আর উপদেষ্টা-প্রতিমন্ত্রী ও বিএমএ অন্যদিকে অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সাধারণ কর্মকর্তাদের কাজ করতে হচ্ছে নাজুক এক পরিস্থিতিতে। মন্ত্রী এক কথা বললে উল্টোটা বলেন প্রতিমন্ত্রী, না হয় উপদেষ্টা। ওয়ান-ইলেভেনের সময় এই উপদেষ্টা কারাবন্দি শেখ হাসিনার চোখের ডাক্তার হিসেবে, পরে কানের বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার চোখ ও কানের সমস্যা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে তিনি সকলের নজরে আসেন। তখন থেকেই তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়

এ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন একজন উপদেষ্টা এবং একজন প্রতিমন্ত্রী ও দুজন সচিব। এখানে নির্বাহী কর্তৃত্ব মূলত উপদেষ্টার হাতে। প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদের তেমন কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সাবেক আমলা ড. তৌফিক-ই এলাহী বীরবিক্রম বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত দেন, সেসবই বাস্তবায়ন করে থাকেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী এই উপদেষ্টা যতটা না দেশের ¯^ার্থের জন্য তৎপর তার চেয়ে বেশি তৎপর বিদেশিদের খুশি করতে। বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ে তিনি যেসব কাজ করেছেন তা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই সন্তুষ্ট নন। কুইক রেন্টালের নামে যা করা হচ্ছে তার সঙ্গে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই একমত নন। যে কারণে জাতীয় সংসদে তার বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরোধিতা করে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য রেখেছেন।

উপদেষ্টাদের কার কী কাজ

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সাত উপদেষ্টার মধ্যে এইচটি ইমামকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কার্যাবলীর সমণ্নয়কারী ও সংস্থাপন মন্ত্রণালয়সহ আটটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে কাজ করেন তিনি। সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির সব কিছুই হচ্ছে এইচটি ইমামের ইশারায়। রেকর্ডসংখ্যক মেধাবী কর্মকর্তাকে ওএসডি, প্রকৃত মেধাবীদের বাদ দিয়ে কম মেধাবীদের দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি প্রদানের ঘটনা ঘটিয়ে সরকারকে বিতর্কিত করার পেছনে একজন উপদেষ্টার হাত রয়েছে বলে সরকারের একটি অংশ মনে করছে।

এ ছাড়া সাবেক সচিব ড. মসিউর রহমানকে ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান সমš^য়কারীসহ ছয়টি বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মোদাচ্ছের আলীকে স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ পাঁচটি বিষয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আলাউদ্দিন আহমেদকে শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়নসহ চারটি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি ও জোট আমলে চাকরিচ্যুতদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সাবেক সচিব তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গওহর রিজভীকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ চারটি বিষয়, শেখ রেহানার দেবর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকীকে প্রতিরক্ষা বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হলেও সরকারের নির্বাহীমূলক বিভিন্ন কাজে তাদের অংশগ্রহণের মাত্রা এতই বেশি যে, গত পৌনে তিন বছরে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রায় সব বৈঠকে তারা উপস্থিত থেকেছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, মন্ত্রিসভায় যেহেতু অনেক গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাই যারা গোপনীয়তার শপথ নেননি, তাদের উপস্থিত থাকা অযৌক্তিক।

মন্ত্রী বড় না উপদেষ্টা

এ অবস্থায় মন্ত্রী বড় না উপদেষ্টা- এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উপদেষ্টাদের অতিমাত্রায় খবরদারিই এ ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংবিধান যেখানে মন্ত্রীকেই মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে অনেক মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন উপদেষ্টারা। মন্ত্রীরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছেন। কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের ধারণা, মন্ত্রীদের অদক্ষতার সুযোগে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন উপদেষ্টারা, বড় বড় নিয়োগ বদলি হচ্ছে তাদের হাতে। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এসব ব্যাপারে কিছু জানতেও পারেন না। যেমন বিমানমন্ত্রী সারা দিন সচিবালয়ের কাজকর্ম করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে টেলিভিশনের খবরে জানতে পারেন, তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বদলি করে সেখানে নতুন একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার মন্ত্রণালয়ের বদলির ঘটনা, অথচ তিনি কিছুই জানতে পারলেন না! সঙ্গত কারণেই তিনি ফোন করে সচিবকে। সচিবও এ ব্যাপারে তার অজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, তিনিও টেলিভিশনেই বিষয়টি জানতে পেরেছেন। মন্ত্রী পর দিন সকালেই ছুটে যান প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী তখন তাকে জানান, তিনি বিষয়টি অবগত আছেন। তাকে জানিয়ে উপদেষ্টা এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।

সম্প্রতি ভারতকে দেয়া ট্রনজিট সুবিধা থেকে অর্থ আদায় প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী এবং অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা দুধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ভারতকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট দেয়ার পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য প্রথম থেকেই বলা হচ্ছিল, ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশ মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জনে সক্ষম হবে। এমন বলা হয়েছিল, ট্রানজিট বাবদ আয় থেকে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে পরিণত করা যাবে। যখন জানা গেল ট্রানজিট থেকে শুল্ক বা ফি আদায় আন্তর্জাতিক নীতিবিরুদ্ধ, তখনও অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত বললেন, ট্রানজিট বাবদ একটা কিছু পাওয়া যাবেই। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান আপত্তি তুললেন। ট্রানজিট বাবদ ভারতের কাছ থেকে তিনি কিছুই নিতে নারাজ। কিছু নেয়াটা হবে তার ভাষায় ‘অভদ্রতা’। তার ভাষায় বাংলাদেশ এখন সভ্য দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত। ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে কিছু নিলে বাংলাদেশ অসভ্য দেশে পরিণত হবে। এমন অভদ্রতা আমরা করতে পারি না।

এরপর অর্থমন্ত্রী মুহিত এ বিষয়ে আর কোনো বক্তব্য দেননি। কারণ উপদেষ্টার বক্তব্যের পর মন্ত্রীর আর কিছু বলার সুযোগ ছিল না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তি হয়েও মন্ত্রী চূড়ান্ত কথা বলার অধিকার রাখেন না। এমনই বেহাল অবস্থা চলতি সংসদীয় গণতন্ত্রের। এর আগেও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সময় উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও মন্ত্রী মুহিত পরস্পরবিরোধী কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত যখন শেয়ারবাজারে টাকা হারানো হতভাগ্য মানুষদের প্রতি মৃদু ভাষায় সহানুভূতির প্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন তখন মসিউর রহমান অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বলেন, ‘ওদের প্রতি কোনো সহানুভূতি নয়। ওরা সব ফাটকাবাজ। যে টাকা ওরা শেয়ারে খাটিয়েছে, সেসব টাকা ওদের অবৈধ পন্থায় উপার্জন করা।’ এরপর থেকে অর্থমন্ত্রীও উপদেষ্টার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের কাজেই উপদেষ্টারা ইদানীং খবরদারি শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে তারা এটা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের এই অযাচিত হস্তক্ষেপে মন্ত্রী-সচিবরা ¯^াধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এর ফলে নতুন করে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

সাক্ষাৎকার

হাসানুল হক ইনু, এমপি, সভাপতি, জাসদ

প্রধানমন্ত্রীর কতিপয় উপদেষ্টার কথাবার্তা ও মন্তব্য দেশের মানুষের মনে যেমন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তেমনি তাদের ক্ষুব্ধ ও হতাশও করেছে। সীমান্তে বাংলাদেশি ট্রানজিট, তিস্তায় পানি বণ্টন, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি ইস্যুতে এসব উপদেষ্টার বক্তব্যে তাদের নাগরিকত্ব ও দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উপদেষ্টাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে ভারতের কোনো মন্ত্রী বা বিএসএফপ্রধান বক্তব্য দিচ্ছেন। ট্রানজিট প্রশ্নে দেখা গেছে, ট্রানজিট পেতে ভারতের যতটা আগ্রহ তার চেয়ে ট্রানজিট দিতে আমাদের উপদেষ্টারা আগ্রহ অনেক বেশি দেখিয়েছেন। ভারতের মন্ত্রীরা ট্রানজিটে মাসুল দিতে চাইলেও আমাদের এক উপদেষ্টা মাসুল ছাড়াই ট্রানজিট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই উপদেষ্টারা কার স্বার্থ দেখছেন বাংলাদেশের, না ভারতের। তারা যদি দেশের স্বার্থ না দেখেন তাহলে ওই  পদে থেকে কাজ করা উচিত  নয়।

রাশেদ খান মেনন, এমপি, সভাপতি, ওয়ার্কার্স পার্টি

উপদেষ্টারা কতটা যোগ্য  ও দক্ষ তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাদের দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উপদেষ্টারা তাদের কাজের মাধ্যমে যতটা না মন্ত্রণালয়ে গতিশীলতা সৃষ্টি করেছেন তারচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি  করেছেন। অনেক উপদেষ্টাই বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেন। তাদের আচরণ দেখে মনে হয় ভারতীয় স্বার্থরক্ষায় তারা নিরলসভাবে কাজ করছেন। আমি মনে করি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর অনির্বাচিতদের খবরদারি করার সুযোগ দেয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কারণ বিপদে উপদেষ্টাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ড. কামাল হোসেন, সভাপতি, গণফোরাম

প্রধানমন্ত্রী তার  কাজের সুবিধার জন্য সাত উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। এত বেশি উপদেষ্টা এর আগে দেখা যায়নি। উপদেষ্টারা রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজে অংশগ্রহণ করছেন। যেটা আগে দেখা যায়নি। সাত উপদেষ্টাই সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এই প্রভাব বিস্তার সরকারের জন্য ইতিবাচক কিছু বয়ে আনছে না। উপদেষ্টাদের কর্মকাণ্ডে জনগণ খুশি নয়। সরকার ও সরকারি দলে উপদেষ্টা গ্রহণযোগ্যতা লোপ পেয়েছে। সংবিধানে এ জাতীয় কোনো পদে নেই। মন্ত্রণালয়ের

ড. শাহদিন মালিক, বিশিষ্ট আইনজীবী

উপদেষ্টারা হলেন অনির্বাচিত, জনগণের কাছে দায়বদ্ধহীন এবং সব ধরনের জবাদিহিতামুক্ত। সংবিধানে এ ধরনের কোনো পদ নেই। আমার জানা মতে কোনো বিধিও নেই। সন্দেহ দূর করতে কোন বিধি বা নীতিমালার ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ বা দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এবং বেতনভাতার কী সুবিধা দেয়া হচ্ছে তা স্পষ্ট করে বলা সরকারের দায়িত্ব। কারণ উপদেষ্টাদের বেতনভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় জনগণের প্রদত্ত কর থেকে। সংসদীয় ব্যবস্থায় জবাবদিহি সরকারের বড় সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবিধানে যেহেতু উপদেষ্টা নিয়োগের কোনো বিধান নেই, তাই এটা এড়িয়ে চলাই সরকারের জন্য মঙ্গলজনক।

ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, চেয়ারম্যান, বিকল্পধারা বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সাত উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে  না। উপদেষ্টারা সরকারের কাজে গতিশীলতা আনতে পারছেন না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে জগাখিচুড়ি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে। যেসব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা আছেন সেসব মন্ত্রণালয়ের অবস্থা বেশি খারাপ। উপদেষ্টাদের ভাবসাব দেখে মনে হয় তারা মন্ত্রীর  ওপরে। এটা ঠিক নয়, তাদের পদের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। উপদেষ্টাদের হুকুমদারি ও খবরদারি মন্ত্রণালয়ের কাজ স্বাভাবিকভাবে চলার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করছে।

ড. অলি আহমদ, এমপি, সভাপতি, এলডিপি

উপদেষ্টাদের ছেলেমানুষিকতা দেখে দেশের মানুষ হাসাহাসি করে। ভারতকে ট্রানজিট দেয়া ও টিপাইমুখ বাঁধ প্রশ্নে উপদেষ্টাদের বক্তব্যে দেশের মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। উপদেষ্টাদের বক্তব্যে ও কাজে জবাবদিহি না থাকায় তারা দেশের ¯^ার্থবিরোধী কথা প্রকাশ্যেই বলতে পারেন। অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, জ্বালানি উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা কোন পরিচয় বহন করছে? তাদের প্রভাব এত বেশি যে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না। উপদেষ্টাদের কথায় আমার প্রশ্ন জাগে এসব উপদেষ্টা বাংলাদেশের, না ভারতের নাগরিক।

http://www.shaptahik-2000.com/?p=1261

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: