‘দি গডফাদার’ : অ্যাল পাচিনো

জীবন্ত এক কিংবদন্তী: অ্যাল পাচিনো

আব্দুল্লাহ জায়েদ
২৫ এপ্রিল ২০১২, এই দিনেই হলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী অভিনেতাদের একজন- অ্যাল পাচিনো পা দিলেন জীবনের ৭২ তম বছরে। বর্ষীয়ান এই অভিনেতার জন্মদিনে তার জীবনের গল্প নিয়েই সাজানো হয়েছে এবারের ফিচার। লিখেছেন আব্দুল্লাহ জায়েদ।

অভিনয় জীবনের রঙ্গীন পর্দায় তার অভিষেক ১৯৬৯ সালের ‘মি. নাটালি’ মুভিটিতে ছোট্ট একটি চরিত্র দিয়ে। এরপর দর্শক আর সমালোচক উভয়ের মন কাড়েন পর্দা কাঁপানো হলিউডি গ্যাংস্টার মুভি ‘দি গডফাদার’-এর মাইকেল করলিওনি চরিত্রটিতে অভিনয় করে। এরপর ‘স্কারফেস, ডগ ডে আফটারনুন, ডিক ট্রেসির মতো একের পর এক হিট মুভিতে অভিনয় করে কিংবদন্তীর খাতায় নিজের নামটি পাকাপোক্তভাবে লিখিয়ে নেন তিনি। অস্কার আর গোল্ডেন গ্লোবের মতো অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন তিনি একাধিকবার। নাম লিখিয়েছেন পরিচালকের খাতায়, মঞ্চেও পড়েছে তার পদধূলী। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হলিউডের পর্দা কাঁপানো এই অভিনেতা আর কেউই নন বরং স্বয়ং ‘দি গডফাদার’ আলফ্রেড জেমস পাচিনো, যাকে সবাই চেনেন অ্যাল পাচিনো নামে।

গডফাদার সিনেমাটির গল্পের সঙ্গে বাস্তব জীবনের অ্যাল পাচিনোর ছিল অনেক মিল। ইটালিয়ান-আমেরিকান বংশোদ্ভ’ত পাচিনোর জন্ম নিউ ইয়র্কের ইস্ট হার্লেম-এ। কিন্ত তার নানা-নানী এসেছিলেন সিসিলির সেই করলিয়ন থেকে। ছোটবেলাতে বন্ধুদের মাঝে তার প্রচলিত ডাক নামটি ছিল ‘সনি’। পাচিনোর বাবা ছিলেন সালভাতোর পাচিনো এবং মা রোজ। পাচিনোর বয়স যখন মাত্র দুই তখনই আলাদা হয়ে যান তার বাবা মা। এরপর সেই সিসিলিয়ান নানা নানীর কাছে থেকেই বড় হয়ে ওঠে ছোট্ট ‘সনি’।

পাচিনো পড়াশোনা করেন ফিওরিলিও এইচ লাগুয়ের্ডা হাই স্কুল এ। প্রথমে একজন বাস্কেটবল খেলোয়ার হতে চাইলেও মাত্র ১৭  বছর বয়সেই বন্ধুমহলে ‘দ্যা অ্যাক্টর’ ডাক নাম পাওয়া অ্যাল পাচিনো স্কুল ছাড়েন অভিনয়ের নেশায়। ছেলের এমন স্বিদ্ধান্তে যারপরনাই আশাহত হন মা রোজ পাচিনো। শেষ পর্যত মা’র সাথে ঝগড়া করে ঘড় ছাড়েন অজানার পথে।

টিনএজ বয়সেই মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন তিনি। কিন্তু কিশোর পাচিনোর অভিনয় প্রতিভাকে বুঝি ঠিক সময়ে উপলব্ধি করতে না পেরেই ‘একে দিয়ে হবে না’ বলেই ফিরিয়ে দিয়েছিল নিউ ইয়র্কের অ্যাক্টর্স স্টুডিও। এরপরও আশাহত না হয়ে অভিনয়ের পেছেনে লেগে ছিলেন তিনি, আর অভিনেতা হওয়ার সেই আশা বুকে নিয়েই তিনি যোগ দেন হারবার্ট বারগফ স্টুডিওতে। সেখানেই তার পরিচয় অভিনয়ের শিক্ষক চার্লি লগটনের সাথে। এই লগটনই ছিলেন পাচিনোর অভিনয় গুরু, আর সময়ের সাথে সাথে গুরু শিষ্য সম্পর্ক ছাড়িয়ে পাচিনোর সব থেকে কাছের বন্ধু হিসেবেও যায়গা করে নেন চার্লি লগটন। এ সময়টায় অ্যাল পাচিনো স্বপ্নের পথে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলেও পথটি ছিল বন্ধূর। অভিনয় করবেন বলে ঘড় ছাড়া পাচিনো অনেক রাতই পার করেছেন কোন এক জনশূন্য থিয়েটার বা বন্ধুর বাসায় ঘুমিয়ে। এমনও রাত গেছে পথেই রাতটি কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। অনেকদিনই কাটিয়ে দিয়েছেন না খেয়ে। এতো কষ্টের পরও নিজের ভালোবাসা অভিনয়কে কখনোই ছাড়েননি অ্যাল পাচিনো। সিসিলিয়ান বলেই বুঝি প্রতিজ্ঞাটি ছিল ইস্পাত কঠিন।

কিংবদন্তীসম এই অভিনেতার জনপ্রিয়তা হলিউডী মুভিগুলো দিয়ে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরলেও শুরুটা কিন্তু মঞ্চেই। টানা চার বছর হারবার্ট বারগফ স্টুডিওতে কাটানোর পর আবার নিউ ইয়র্কেও পেশাদারী অভিনেতাদেও সংগঠন অ্যাক্টর্স স্টুডিওতে অডিশন দেন পাচিনো। আর এবার সেখানে সহজেই টিকে যান তিনি। অ্যাক্টর্স স্টুডিওতেই নিজ অভিনয় জীবনের দ্বিতীয় গুরু অ্যাক্টিং কোচ লি স্টার্সবার্গ এর স্বংস্পর্শে এসে মেথড অ্যাক্টিং শেখেন অ্যাল। নিজ অভিনয় জীবনে এই দুই গুরুর অবদান যে কতোটা তা বার বার বলেছেন বর্ষীয়ান এই অভিনেতা। শুধু তাই নয় ‘দি গডফাদার’ ট্রিলজির দ্বিতীয় মুভিতে অভিনয় গুরু লি স্টার্সবার্গেও সঙ্গেও অভিনয় করলেন তিনি। আর অভিনয় জীবনের শুরুতে যে অ্যাক্টর্স স্টুডিও ফিরিয়ে দিয়েছিল সেই স্টুডিওর একজন কো-প্রেসিন্ডেন্টও এখন তিনি।

১৯৬৭ সালের বড় একটা সময় অ্যাল পাচিনো বস্টনের চার্লস প্লেহাউসে ক্লিফোর্ড অডেট এর ‘অ্যাওয়েক এন্ড সিং’ এবং জন ক্লড ভ্যান ইটালির ‘আমেরিকা, র্হুরাহ’ মতো মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। এখানেই পরিচয় হয় অভিনেত্রী জিল ক্লেবার্গের সাথে। আর পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই প্রেম। এরপর দুজন মিলে একসাথে নিউ ইয়র্কে ফেরেন পাচিনো-ক্লেবার্গ জুটি। ১৯৬৮ তে ইসরাইল হরোভিটজ এর মঞ্চনাটক ‘দি ইনডিয়ান ওয়ান্টস দি ব্রঙ্কস’ এ অভিনয় করে ওবেরয় অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন পাচিনো। আর এতে পাচিনোর অনবদ্য অভিনয় দেখে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন পেশাদার আর্টিস্ট ম্যানেজার মার্ক ব্রেগম্যান যে স্বেচ্ছায় পাচিনোর ম্যানেজারের গুরু দায়িত্বটি কাধে তুলে নেন তিনি। আর এই ব্রেগম্যান এর কথায়ই গডফাদার, সারপিকো এবং ডগ ডে আফাটানুন মুভিগুলোতে অভিনয়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন পাচিনো। ১৯৬৯ সালে ব্রডওয়ে অভিষেকেই ডন পিটারসন এর ‘দাস এ টাইগার ওয়্যার এ নেকটাই’ মঞ্চনাটকে অভিনয় করে মঞ্চের অস্কার বলে খ্যাত ‘টোনি অ্যাওয়ার্ড’ জেতেন তিনি। পরের বছরও মঞ্চে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আবারও ‘টোনি অ্যাওয়ার্ড’ জিতে নেন ‘রিচার্ড থ্রি আর ‘দ্যা বেসিক ট্রেনিং অফ পাবলো হামেল’-এ অভিনয় করে। এরপর টানা ত্রিশ বছর ধরে মঞ্চে তার উপস্থিতি আর সাফল্য হয়ে ওঠে যেকোন সমসাময়িক অভিনেতার জন্য ঈর্ষণীয়।

ষাটের দশক এর শেষ দিকে আর সত্তর এর শুরুতে মঞ্চ কাঁপানো অভিনয় দিয়ে সমালোচক আর দর্শক উভয়ের মন জয় করলেও আর্থিক কষ্টের কারণে তখনো দিনগুজরান মুশকিল ছিলো তার জন্য। কিন্তু সবকিছুই বদলে যায় ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ব্লকবাস্টার মাফিয়া মুভি দি গডফাদার এ মাইকেল করলিওনি চরিত্রে অভিনয় করে। মাইকেল চরিত্রটির জন্য অ্যাল পাচিনোর প্রতিদ্বন্দী ছিলেন রবার্ট রেডফোর্ড, ওয়ারেন বেটি আর রবার্ট ডি নিরোর মতো ‘হেভি ক্যালিবার’ তারকারা। কিন্তু ভ্যাগদেবীর আশীর্বাদ আর প্রতিভার জোরে সবাইকে পিছনে ফেলে পরিচালক কপোলার দৃষ্টি কেড়ে নেন তুলনামূলকভাবে নতুন মুখ অ্যাল পাচিনো। আর এর পরের টুকু যেন স্বর্ণাক্ষরে লেখা ইতিহাস। মাইকেল চরিত্রটির জন্য অস্কারে শ্রেষ্ঠ সহঅভিনেতার পুরস্কারটির জন্য নমিনেশন পান। কিন্তু শ্রেষ্ঠ অভিনেতার চরিত্রে নমিনেশন পাওয়া মার্লোন ব্র্যান্ডোর থেকেও বেশি সময় পর্দায় উপস্থিতির পরও ঐ ক্যাটাগরিতে নমিনেশন না পাওয়ায় ক্ষুদ্ধ হয়ে সেবারের অস্কার বয়কটই করেছিলেন অ্যাল পাচিনো। মজার ব্যাপার হচ্ছে মার্লোন ব্র্যান্ডোও বয়কট করেছিলেন সেবারের অস্কার, তবে সেটি ভিন্ন কারণে।

Source: http://glitz.bdnews24.com/details.php?catry=12&showns=1975

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: