জীবন আর সুখ দুটি শব্দই তো গভীর সমুদ্রের মতো বিশাল একটা কিছু

সুখ ভাবনা

সাগর চৌধুরী

‘আমি কি সুখী’?-প্রশ্নটি জীবনচলার পথে প্রায়ই আমাদের মনে উঁকি দেয়। ব্যস্ত জীবনে ব্যস্ত মনে এর উত্তর কি কখনো কেউ খুঁজে পেয়েছে? পাবেই বা কী করে? প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও এর উত্তর তো সরল অঙ্কের মতো এক এবং অভিন্ন নয়। আর উত্তর খুঁজে পাওয়ার মতো আমাদের অবসরটাই বা কোথায়? সবাই তো জীবনযুদ্ধের সম্মুখ সেনা। এতটুকু বিশ্রাম নেয়ার সময় কারো নেই। আর এ যুদ্ধ তো আমরণ। মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যেন এক যুদ্ধে অবতীর্ণ। মায়ের পেটের অভ্যন্তরেই তো ছিল সুখ, ছিল শান্তি আর ছিল নিরাপত্তা। জন্মলাভের শুরুতেই কান্নার শিঙা বাজিয়ে আমরা যুদ্ধ শুরু করি। প্রথমে যুদ্ধ হয় নতুন এক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার, তারপর বেড়ে ওঠার। যুদ্ধের প্রতিটি ধাপ কতই না কঠিন! তবু পেরিয়ে যেতে হয় একের পর এক সব বাধা, সব বিপত্তি।
সেদিনের শিশু যখন তার শিশুত্ব শেষ করে তাকায় কৈশোরের দিকে, তখন সে ভাবে কৈশোরেই বুঝি তার সব সুখ। এরপর সময় পেরিয়ে সে যখন কৈশোরে পা রাখে, তখনো যুদ্ধ শেষ হয় না। তাকে আরো জানতে হবে, শিখতে হবে, বেড়ে উঠতে হবে। যৌবনকে কাছে পেতে তার কতই না চেষ্টা, কতই না যুদ্ধ। সময় যেন যেতেই চায় না। একদিন সে হাজির হয় যৌবনের দোরগোড়ায়। সাহসী সৈনিকের মতো খড়গ উঁচিয়ে এগিয়ে চলে নতুন উদ্যমে। জয় করতে চায় সব বাধা, বিপত্তি ও চ্যালেঞ্জকে। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যুদ্ধ। নিজ পায়ে দাঁড়ানোর যুদ্ধ।
 
সময়ে সময়ে ক্লান্ত মনে তাকিয়ে থাকে সে সামনের পানে। ওই তো সীমান্ত, যেখানে তার দৌড় শেষ হবে। কিন্তু জীবন দৌড় তো আর ম্যারাথন দৌড় নয় যে, ২৭ মাইল পরেই লাল ফিতা ছুঁয়ে সমাপ্ত হবে সব। এ যে অনন্তকালের দৌড়। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় সে নিজেকে আবিষ্কার করে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে। চারদিকে তাকিয়ে বীরের মতো হুংকার করে ওঠে সে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে মনে করে সে। কিন্তু সামনে তাকিয়ে কিছুটা হতাশ হয়, তাকে তো আরো এগোতে হবে, অনেকটাই। আবারো শুরু হয় জীবন-দৌড়। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের অজান্তেই এক সময় সে হাজির হয় লাল ফিতার অনেকটা কাছাকাছি। পেছন ফিরে তাকিয়ে সে দেখে ফেলে আসা পথটিকে, স্মৃতির পাতায়। সত্যিই কি সে প্রৌঢ়ত্বে এসে গেছে! এবার সে আবারো হতাশ হয়। মন মানতে চায় না। ফিরে যেতে ইচ্ছা করে যৌবনে, কৈশোরে এবং শৈশবে। কিন্তু তা কী করে হয়! লাল ফিতা তো এখনো ছোঁয়া হয়নি। তাই অনেক কষ্টে এগোতে হয় তাকে জীবনটাকে সঙ্গে নিয়ে। এবার সে বড়ই ক্লান্ত। দীর্ঘ দৌড়ের পর তার নানা অসুবিধা। ভাঙা গাড়ির মতো এগিয়ে চলা। তবু চলছে এটাই সান্ত্বনা। একেবারে থেমে যেতেও কেন জানি ভয় হয়। তাই দৌড়ের কোনো বিকল্প খুঁজে পায় না সে। এ দৌড় যেন থামছে না। মাঝে মাঝে আবারো সেই প্রশ্ন- আমি কি সুখী? বাকি সব সাথীর অনেক সুখী মনে হয়। মনে হয় কত সুখেই, কত স্বাচ্ছন্দ্যেই ওরা দৌড়ে চলেছে। তবে আমি এত ক্লান্ত কেন? আমি কি তবে অসুখী? এবারে অঙ্কের মতো কোনো উত্তর খোঁজা যাবে না।

তবু উত্তরটা কেন যেন স্বচ্ছ মনে হচ্ছে না। স্বচ্ছ মনে হবেই বা কেন? জীবন আর সুখ দুটি শব্দই তো গভীর সমুদ্রের মতো বিশাল একটা কিছু। আর সুখ জিনিসটা মাপার কোনো যন্ত্র তো আজও আবিষ্কার হয়নি, হয়তো হবেও না কোনো দিন। পুরো জিনিসটাই তো মনের ব্যাপার। আর মানুষের মন তো অদ্ভুত একটা জিনিস। পারিপার্শ্বিকতা, পরিস্থিতি আর সময়ের সঙ্গে তার নানারূপ। তাই চিরন্তন সুখ আর চিরন্তন সুখী বলে কোনো জিনিসকে খোঁজা ঠিক হবে না। কখনো তাই নিজেকে খুব সুখী মনে হলেই দেখা যায় এমন এক ঘটনা বা এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হলো যে, সেই একই মানুষ আবার নিজেকে সুখের বাইরে আবিষ্কার করল। সুখ আর দুঃখ তাই যেন একই পথের দুটি পাশ। সমান্তরালেই তাদের এগিয়ে চলা। পৃথিবীতে দুঃখ না থাকলে হয়তো সুখের তৃপ্তিটা আমরা কেউ উপলব্ধি করতে পারতাম না। সেই হিসেবে দুঃখের গুরুত্বও কম নয়। এ যেন আলো আর অন্ধকারের খেলা। আলোর গুরুত্ব অন্ধকারেই আর অন্ধকারের গুরুত্বও আলোতেই।

সুখ আর দুঃখের গুরুত্ব যা-ই হোক না কেন, মানুষ মাত্রেই সুখের অন্বেষণে ব্যস্ত। আর এই ব্যস্ততার মধ্যে সুখ সম্পর্কে নিজের ধারণা স্বচ্ছ না হলে সুখের কাছে যাওয়া কি সম্ভব? ব্যক্তিজীবনে আমরা সবাই হন্যে হয়ে সুখকে কাছে পেতে চাই। তবে অস্বচ্ছ ও আপেক্ষিক এবং মনসম্পর্কিত এই সুখ সম্পর্কে আপাত স্বচ্ছ একটা ধারণা বোধহয় আমাদের থাকা দরকার। তা না হলে সুখের পেছনে দৌড়ানোটা বোধহয় অরণ্যে রোদনের মতোই ব্যাপার হবে। অনেক দিন হলো আমি নিজের মধ্যে সুখের এক সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছি। যা দিয়ে আমার কিছুটা কাজ হয়েছে। নিজেকে এখন আর তেমন দুঃখী মনে হয় না। তিনটি প্রশ্নের উত্তরে আমি সুখী কি না তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

এক. আমি যা খাচ্ছি তার সঠিক স্বাদ কি আমি পাচ্ছি? উত্তর যদি হয় হ্যাঁ, তবে নিজেকে সুখী ভাবতে হবে। ভেবে দেখুন তো সেই সব মানুষের কথা, যাদের মুখের স্বাদ সৃষ্টিকর্তা তুলে নিয়েছেন। তাদের থেকে আপনি কি অনেক বেশি সুখী নন?

দুই. আপনি যখন ঘুমাতে চান, তখন কি ঘুমাতে পারেন? হ্যাঁ হলে অবশ্যই আপনি সুখী। ক্লান্ত শরীর ও মন নিয়ে বিছানায় শুয়ে প্রহর গুনছেন। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। শুধু ছটফট করছেন। আর বিনিদ্র রজনী পার করছেন। তখনই বুঝবেন ঘুমের গুরুত্ব। ঘুম যেন পৃথিবীতে স্বর্গসুখেরই এক স্বাদ। তাই ঠিকমতো ঘুমাতে পারলে পরের দিনটি হয় নির্মল, কর্মক্ষমতা থাকে প্রখর এবং মন ও মেজাজ থাকে ভালো। তাই তো সঠিকভাবে ঘুমাতে পারাটা সুখেরই বিষয়।

তিন. পৃথিবীতে সত্যিকার বন্ধু হিসেবে আপনার কি একজন কেউ আছে? হতে পারে সে আপনার বাবা, মা, ভাই, বোন বা স্বামী-স্ত্রী বা অন্য কেউ। যার কাছে আপনি আপনার দুঃখ অকপটে আর নিঃসংকোচে প্রকাশ করতে পারেন। যদি সংখ্যায় একজনও কেউ থাকে এমন বন্ধু, তাহলে আপনি সুখী ভাবতে পারেন নিজেকে। আর এই তিন প্রশ্নের প্রতিটিই যদি আপনার উত্তর হয় হ্যাঁ, হ্যাঁ এবং হ্যাঁ, তাহলে সত্যিই আপনি সুখী। তবে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে কেউ কেউ সন্দিহান হতে পারেন। আর হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বন্ধু অনেকেরই একের অধিক হতে পারে। কিন্তু দেখা যাবে কারোর সঙ্গেই মনের দুঃখ সবটুকু শেয়ার করা যাচ্ছে না। আবার মানুষের কিছু কথা থাকে যা সে কারোর সঙ্গেই ঠিকমতো শেয়ার করতে পারে না বা করতে চায় না।

নিতান্তই গোপনীয় কিছু ব্যাপার। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু বা বন্ধুত্বের পরিবর্তনও ঘটতে পারে। আজ যাকে সবচেয়ে প্রিয় বা বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবা হচ্ছে, সে-ই হয়তো কিছুদিন পর প্রিয় বন্ধু নাও থাকতে পারে। মনের মিল বা বন্ধুত্ব ঘটতে সময় বেশি লাগলেও বন্ধুত্বে বা মনের  অমিল ঘটতে কিন্তু দেখা যায় বেশি সময় লাগে না। সে যা-ই হোক, বন্ধু বিনে মানুষ বাঁচতে পারে না। মানুষ সুখী হতে পারে না। শুধু মানুষ কেন, একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে পৃথিবীর সব প্রাণীই বন্ধুবৎসল। একই খাঁচায় বন্দি দুই হিংস্র প্রাণীর মধ্যেও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। হয়তো বা বেঁচে থাকার তাগিদেই। আর মানুষ তো সামাজিক জীব। মানুষ বন্ধু ছাড়া বাঁচবে কী করে! সুখ তো আরো পরের কথা। লক্ষ করলে দেখা যায়, উপরের তিনটি প্রশ্নের সঙ্গেই মানসিক ব্যাপারটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মনই যেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। গাড়ির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে যেমন স্টিয়ারিং হুইলের গুরুত্ব, মনও তেমনি মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই আমরা যদি আমাদের নিজ নিজ মনকে সঠিক পথে চালনা করতে পারি, তাহলে হয়তো বা দুঃখের বোঝাভার কমিয়ে আমরা সুখের কাছাকাছি থাকতে পারব। না পাওয়ার দুঃখ ভুলে আমরা যা পেয়েছি, যদি সেই সুখে মত্ত থাকি তাহলে সবাই আমরা বেশি বেশি সুখী হতে পারতাম।

আমাদের একটা বড় দোষ অন্যের সুখকে বড় করে দেখা। অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করতে যাওয়ায় আমাদের গলতি রয়েছে। তুলনা করা ভালো তবে তার দিক সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। একটা কথা আছে, ‘তুমি তোমার নিচের দিকে তাকাও।’ নিচে তাকাতে শিখলে আমরা বুঝব কত উপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি অথচ এই দৃষ্টিই যদি একবার ঊর্ধ্বমুখী করে ফেলি, তাহলে না পাওয়ার দুঃখ আমাদের ধীরে ধীরে ছেয়ে ফেলবে। তাই আমাদের সব অর্জনকেই বড় করে দেখতে হবে। সব ব্যর্থতা আর না পাওয়াকে গৌণ ভেবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সুখ, দুঃখ, পাওয়া আর না-পাওয়ার কোনো বিষয় নয়-এটা ধনী-গরিবেরও কোনো বিষয় নয়। প্রকৃত বিষয়টিই হচ্ছে মানসিক। পাওয়ার আনন্দকে বড় করে দেখা, আর না-পাওয়ার বেদনাকে উপশম, মন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই মনই সুখের কেন্দ্রস্থল বা রুট।

সেই রুটের সঠিক পরিচর্যায় আমাদের যত্নশীল হতে হবে। এই পরিচর্যার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক শিক্ষার। শিক্ষা বলতে এখানে শুধু পুঁথিগত শিক্ষার কথা বলছি না। শিখতে হবে আমাদের প্রকৃতি, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে। মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই একটাই জীবন পেয়েছি। আর যে সময় আমরা প্রতিটি মুহূর্তে পার করছি তা আমাদের জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না। তাই নিজেকে সুখী করার, সুখী ভাবার জন্য এখনই কাজ করতে হবে। বেশি কিছু পাওয়ার আশায় বর্তমানকে আমরা যেন অবহেলা করে কাটিয়ে না দিই। অতীত তো গেছেই। তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মধ্যে বর্তমানই যেন একমাত্র সম্বল। তাই উচিত হবে অতীতের দুঃখকে বড় করে না দেখা, আর ভবিষ্যতের সুখের জন্য সুন্দর বর্তমানকে পুরোপুরি জলাঞ্জলি না দেয়া। সময়কে সঙ্গে নিয়ে চলুন, মনকে সঠিক নিয়ন্ত্রণ করুন, দেখবেন জীবনটা অর্থবহ মনে হবে। নিজেকে অনেক সুখী মনে হবে।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: