বাংলাদেশের যাবতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে

আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য

ড. আবু এন. এম. ওয়াহিদ :: স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৪১ পেরিয়ে মাত্র ৪২এ পড়ল। এ সময় স্বাধীনতার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে যে কেউ হিসেব নিকাশ করতেই পারেন। এই বিচার-বিবেচনায় ইতিবাচক

এবং নেতিবাচক অনেক কিছুই অলোচনায় উঠে আসতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক। দেশে বিরাজিত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হতাশায় অন্যদের মত আমিও অনেক সময় দেশ ও দেশের ভবিষ্যত সম্মন্ধে শঙ্কিত হই, নেতিবাচক অনেক কিছুই বলে ফেলি, এবং মাঝেমধ্যে এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখিও করি, কাগজে ছাপাই, লোকজন পড়ে, প্রতিক্রিয়া জানায়, কোনো কোনো সময় বাহ্বাও কুড়াই।

তবে আজ বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। স্বাধীনতার ফসল স্বরূপ আর কিছু না হলেও বাংলাদেশ দুটো লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে। প্রথমত, প্রায় ১ কোটি পরিশ্রমি জনশক্তি আজ বিদেশের মাটিতে কর্মরত। প্রতি বছর তাঁরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মূদ্রা আয় করে দেশে পাঠাচ্ছেন।

এছাড়া বিরাট আকারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আজকাল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তৈরি পোশাক ছাড়াও আরো অনেক নন-ট্র্যাডিশনাল আইটেম দেশের বাইরে যাচ্ছে। রপ্তানি দ্রব্যের তালিকায় আছে বিভিন্ন ধরণের হিমায়িত মাছ, সামুদ্রিক শেল ফিশ, টিনজাত ফল, ফলের রস, তরি তরকারি, গুঁড়ো মসলা, কালিজিরা চাল, চিঁড়া-মুড়ি জাতীয় শুকনো খাবার, চা, চামড়া, চামড়াজাত দ্রব্য, পাট, পাটজাত দ্রব্য, কুটির ও হস্ত শিল্প জাত দ্রব্য সামগ্রী, সিরামিক টেবিল ওয়েয়ার ও সিরামিক প্রডাক্টস, সাবান, ব্যাটারি, বড়লেখার সুজানগরের আগর-আতর ও সুগন্ধী দ্রব্য, খেলনা, ঔষধ, কীটনাশক রাসায়নিক দ্রব্য, জুয়েলরি, ঘড়ি, নির্মাণ সামগ্রীর মধ্যে সিমেন্ট, পাথর, বালু, এমন কী ইটও ভারতের উত্তরপূর্ব অঞ্চলে রপ্তানি হয় বলে শুনেছি। ইদানীং স্ক্র্যাপ মেটাল ও তা থেকে তৈরি সমূদ্রগামী জাহাজও বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যাচ্ছে। আমেরিকার বাজারে যেসব বাংলাদেশি পণ্য নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি বা পাই তার বয়ানও আমার আজকের আলোচনায় উঠে আসবে।

প্রথমে বলছি বাংলাদেশীয় তৈরি পোশাক শিল্পের বিবর্তন ও তার সাফল্যের সংক্ষিপ্ত পটভূমি। ঊনিশ শ’ আশি সালের গোড়ার দিকে আমি কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র এমএ পাশ করে পিএইচডি শুরু করেছি। এমন সময় আমার বড় ভাইএর সুবাদে আমেরিকায় ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পেয়ে যাই। তার কিছুদিন পরই বস্টনের নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিতে অ্যাডমিশন সহ একটি টিচিং অ্যাসিস্টেন্টশিপের অফার আসে।

অফারটি পেয়ে আগপাছ না ভেবেই ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে সিদ্ধান্ত নিলাম ম্যানিটোবার পিএইচডি প্রোগ্রাম থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে প্রত্যাহার করে নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যোগ দেব পরবর্তী জানুয়ারিতে। উইনিপ্যাগ থেকে বস্টন যাওয়ার পথে নিউ ইয়র্কে বড়ভাইএর বাসায় ছিলাম দু-তিন সপ্তাহ। ওই সময় সেখানে দেখা হয়েছিল এক তরুণ বাংলাদেশি গারমেন্ট উদ্যোক্তার সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে তিনি সাহসের সাথে বেশ জোর দিয়ে একটি কথা বলেছিলেন যা আজও আমার মনে আছে। তাঁরই ভাষায়, ‘এবার ব্যবসা লাইনআপ করে গেলাম, ইনশাল্লাহ আগামী বছর এসে মাল্টিমিলিয়ন ডলারের কনট্র্যাক্ট সাইন করে যাব’। তখন ওই গারমেন্ট ব্যবসায়ীর চোখে-মুখে যে আত্মপ্রত্যয় এবং দৃঢ়তার ছাপ দেখেছিলাম তাতে তাঁর কথার বিশ্বাসযোগ্যতায় আমার মনে একটুও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দানা বাঁধতে পারেনি।

এরপর প্রায় দশ বছর কেটে যায়। ইতিমধ্যে জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে আমি ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের চার্লস্টন শহরে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছি। এমনি এক সময় ১৯৯০ সালের শেষ দিকে চার্লস্টনে প্রয়াত ড. মুশফেকুর রহমানের বাড়িতে দেখা হয় বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্টিত এবং সফল পোশাক শিল্পের উদ্যেক্তার সঙ্গে। তাঁর পুরো নাম কী তা জানা হয়নি, তবে সবাই তাঁকে জাকারিয়া স’ব বলে ডাকছিলেন।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত একটি বড় এবং সফল গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিক। তাঁর কোম্পানির নাম ছিল ‘জুয়েল গার্মেন্টস’। ওই দিন সবার মুখেই শুনছিলাম পোশাক শিল্পে জাকারিয়া সা’বের সফলতা ও তাঁর ধন দৌলতের কথা। ছেলেমেয়েদের আমেরিকায় পড়াবার জন্য তিনি ওহাইওর ডেইটনে রীতিমত আরেকটি সংসার পেতেছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে কিছুদিন পর ডেইটনে জাকারিয়া সা’বের বাসায়ও আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে তাঁর ছেলের নাম ছিল জুয়েল এবং মেয়ে দু’টির নাম ছিল নয়ন এবং নূপুর।

অন্য অনেক ব্যবসার সাথে আমার এক মামারও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে। তিনি ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে ঘন ঘন আমেরিকা আসেন। আসলেই দেখেন কোন কোন স্টোরসে তাঁর কোম্পানির তৈরি পোশাক রাখে এবং বিক্রি করে। এতে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ রকমের আত্মতৃপ্তি উপভোগ করেন। আমি এবং আমার স্ত্রী এখানকার ডিসকাউন্ট এবং স্পেশাল্টি স্টোরস সব জায়গাতেই যাই। কোনো সময় কেনা কাটা করতে, কোনো সময় উইন্ডো শপিংএ বা নিছক ঘোরাঘুরি করতে। কম বেশি প্রায় সব দোকানেই আমি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখতে দেখেছি। কোনো কোনো দোকান থেকে মাঝে মধ্যে কিনেছিও। ওয়াল মার্ট, কে-মার্ট, গ্যাপ, ওল্ড নেভী, মেসিজ, গুডিজ, টিজে ম্যাক্স, টার্গেট, সিয়ার্স, ডিলার্ডস, জেসি পেনি, বেল্ক, ডিজনি স্টোরসের র‌্যাকে বাংলাদেশের তৈরি বিভিন্ন জাতের পোশাক হরমামেশাই দেখা যায়।

 

swadesh Ekush News Media Jahan Hassan

Swadesh Restaurant, Los Angeles

বাংলাদেশের রপ্তানিজাত ননট্র্যাডিশনাল আইটেম রাখে আমেরিকার কার্লাইল অ্যান্ড কোম্পানি, বাথ অ্যান্ড বডি ওয়ার্কস, ওল্ড মিল পটারিজ, পটারি বার্ন, বেড বাথ অ্যান্ড বিওন্ড, ডলার ট্রি, ডলার জেনারেল স্টোরস, ইত্যাদি। বাংলাদেশের যাবতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এবার দিচ্ছি আমার দেখা আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি দ্রব্যের একটি খতিয়ান। কয়েক মাস আগে আমি এবং আমার স্ত্রী একদিন কাপড় কিনতে গিয়েছিলাম মোটামুটি নামি দামি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস – মেসিজে। আমার স্ত্রী মেয়েদের কাপড় দেখছিলেন। আমি উপর তালায় ঘোরাঘুরি করছিলাম ডমেস্টিক্স সেকশনে। হঠাত্ চোখে পড়ল বাংলাদেশের সিরামিক প্রডাক্টস।

ডিনার প্লেট, কারি বোল, ফুলদানি, পানির জার বা পিচার, সল্ট অ্যান্ড পেপার শেকার ইত্যাদি, ইত্যাদি। কেনার ইচ্ছে ছিল কিন্তু দাম দেখেই আমার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। একেকটি ডিনার প্লেটের দাম ৭০ ডলার, একেকটি মাঝারি আকারের কারি বোলের দাম ধরা হয়েছে ৪৫ ডলার করে। এক জোড়া সল্ট অ্যান্ড পেপার শেকারের দাম ৫০ ডলার। ফুলদানি ও পিচারের দামটা সঠিক মনে করতে পারছি না। প্রতিটি প্রডাক্টের কোয়ালিটি এবং ফিনিশিং দেখলাম খুবই উন্নত মানের। আইটেমগুলোর গায়ে ছাপায় লেখা, ‘প্রডাক্ট অফ বাংলাদেশ’ কিন্তু কোন কোম্পানির তৈরি অনেক চেষ্টা করেও তার হদিস বের করতে পারলাম না।

আরো দেখলাম আমেরিকান কাস্টমাররা উত্সাহভরে শেলফে রাখা বাংলাদেশি জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করছে, উল্টে পাল্টে দেখছে, প্রাইস স্টিকারের দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। হয়ত কিনবে, হয়তবা কিনবে না, তবে কেউ না কেউ তো অবশ্যই কিনবে, নতুবা মেসিজের মত দোকানের ফ্লোরে এগুলো স্থান করে নিতে পারত না। মেসিজের দুতালায় বাংলাদেশের সিরামিক টেবিল ওয়েয়ার দেখে আমার ও আমার স্ত্রীর কাছে সেদিন খুবই ভাল লেগেছিল।

তার কয়েক মাস পর মাত্র সেদিন আমি এবং আমার স্ত্রী গিয়েছিলাম অরগ্যানিক চেইন ফুড স্টোরস – ‘হোল ফুডসের’ দোকানে। হোল ফুডসে গ্রসারি সেরে রাস্তার ওপারে গেলাম তাদেরই সাবসিডিয়ারি বডি কেয়ারের দোকান ‘হোল বডি’ শপে। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম তাতে অভিভূত না হয়ে পারলাম না। অ্যান্ট্রেন্স দরজার সামনে একটি আয়লের মাথায় সেল্ফের নিচে মেঝেতে রাখা তাল পাতার তৈরি কিছু ফ্রুট বাস্কেট এবং লম্বা হাতলওয়ালা মেয়েদের হ্যান্ড ব্যাগ। দোকানে ঢোকার সময় আমার চোখে পড়েনি। বেরিয়ে আসার সময় আমার স্ত্রী আমাকে বললেন, ‘দেখ বাংলাদেশি প্রডাক্টস’।

আমি হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলাম। পড়ে দেখলাম ‘ব্লেসিং বাস্কেট’ নামে একটি এনজিও জিনিসগুলো তৈরি করেছে বাংলাদেশের কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া একটি কাগজে ‘ব্লেসিং বাস্কেট’ প্রজেক্টের ম্যানেজার মিসেস তেরেসা উইলসনের একটি মূল্যবান কোটেশন শোভা পাচ্ছে প্রতিটি দ্রব্যের গায়ে, পড়ে দেখলাম কাগজের লেভেলে লেখা আছে, ‘দেয়ার ইজ নো হিডেন অ্যাজেন্ডা। উই সিম্পলি ওয়ান্ট টু এন্ড পোভার্টি ফ্রম দি লাইভস অফ দৌজ হু উই সার্ভ’। অর্থাত, ‘আমাদের কোনো গোপন অভিসন্ধি নেই। আমরা যাদের সেবা দিচ্ছি, শুধু তাদের জীবন থেকে দারিদ্র দূর করতে চাই’।

যে সব হস্ত ও কুঠির শিল্পীরা বাস্কেট এবং ব্যাগগুলো তৈরি করেছেন তাঁদের নামও সেঁটে দেওয়া হয়েছে প্রডাক্টের গায়ে কাপড়ের লেভেলে। যাঁদের নাম আমি আজ এখানে লিখব তাঁরা যদি আমার এ লেখাটি পড়েন বা যে পড়েছে তার কাছে শোনতে পান তবে জানি না তাঁদের মনের অনুভূতি কেমন হবে, তবে তাঁদের নাম আজ গর্বভরে লিখতে পেরে আমি নিজেকে খ্বুই ভাগ্যবান মনে করছি।

 

বাংলাদেশের জনগণের কাছে হয়তবা তাঁরা দেশের লক্ষকোটি মা-বোনের মতই একেকজন গ্রাম্য বধু কিংবা বালিকা, কিন্তু আমার কাছে তাঁরা প্রত্যেকেই সুদূর আমেরিকায় একেক জন বাংলাদেশি অ্যাম্বেসেডার। নিজেদের সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে তাঁরা সগৌরবে দেশ মাতৃকা ও তার সুনামকে তুলে ধরেছেন। আমার এই কলামের মাধ্যমে আজ আমি বাংলাদেশের নাম না জানা অখ্যাত অজপাড়াগাঁয়ের এই শিল্পীদের জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন।

গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব শিল্পীর মন ও হাতের ছোঁয়া নিয়ে কয়েকটি ফ্রুট বাস্কেট এবং হ্যান্ড ব্যাগ আমেরিকার বাজারে সগর্বে বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করছে তারা হলেন, স্বর্ণ, পপি, সুচিত্রা, সুষমা, রীতা, ববিতা, এবং মেরি। তাঁদের হাতের তৈরি জিনিসগুলো আমি সেদিন দেখেছি হোল বডি শপের ফ্লোরে আজ হয়তবা সেগুলো শোভা পাচ্ছে কোনো মার্কিন পরিবারের বেডরুমে অথবা বসার ঘরে। বাংলাদেশের এই পরিশ্রমি মানুষগুলোর প্রতি আমেরিকা প্রবাসী প্রতিটি বাংলাদেশি অভিবাসীর পক্ষ থেকে আবারো জানাই আন্তরিক মোবারকবাদ।

লেখক: ড. আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: