দুনিয়াজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অর্গানিক কৃষিপণ্য

অর্গানিক কৃষিপণ্য : ছয় হাজার কোটি ডলারের বাজারে নেই বাংলাদেশ
মীর মনিরুজ্জামান

দুনিয়াজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অর্গানিক কৃষিপণ্য। বাড়ছে এ পদ্ধতির চাষাবাদও। সত্তরের দশকের আগ পর্যন্ত অর্গানিক চাষেই নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে এ চাষাবাদ। এ দেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু অর্গানিক কৃষির জন্য উপযোগী হলেও অধিকাংশ কৃষক এখন মনে করেন, অর্গানিক চাষ আর লাভজনক নয়। এ পদ্ধতির চাষ বিলীন বলেই ৬ হাজার কোটি ডলারের অর্গানিক পণ্যের বাজারে নেই বাংলাদেশ।
ইউরোপীয় রিসার্চ প্রতিষ্ঠান এফআইবিএলের এক গবেষণায় দেখা যায়, গত এক দশকে অর্গানিক কৃষিপণ্যের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০০ শতাংশ। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী এ খাতের বাজার ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার, ২০০৯ সালে যা উন্নীত হয় ৫৪ বিলিয়ন ডলারে। ধারণা করা হচ্ছে বর্তমানে তা ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্গানিক পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্স। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এ বাজার ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ইউরোপে ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জার্মানিতে ৮ বিলিয়ন ও ফ্রান্সে ছিল ৪ বিলিয়ন ডলার।
কৃষিবিদদের মতে, সত্তরের দশকের আগে অর্গানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশের কৃষি। মূলত সত্তরের দশক থেকে জনসংখ্যা বাড়ার চাপে এ দেশে রাসায়নিক সারের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল শস্যের চাষাবাদ শুরু হয়। এরপর খুব দ্রুতই হারিয়ে যায় অর্গানিক পদ্ধতির আবাদ। সীমিত কৃষিজমি, অবকাঠামো সমস্যা, নীতিমালা ও তদারকির অভাবে এ পদ্ধতি এখন আর লাভজনক নয় বলে মনে করেন অধিকাংশ কৃষক।
জানা গেছে, ধান উত্পাদনে পৃথিবীর শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থাকলেও অর্গানিক ধান উত্পাদনে কোনো অবস্থান নেই দেশটির। ধানের পাশাপাশি পাট ও তুলার ক্ষেত্রেও একই অবস্থান। কেবল অর্গানিক চা উত্পাদনে কিছুটা এগিয়ে বাংলাদেশ।
২০০০ সালে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় জেমকন গ্রুপ শুরু করে দেশের প্রথম অর্গানিক চা বাগান। প্রতিষ্ঠানটির তেঁতুলিয়া ব্র্যান্ডের চা এখন লন্ডনের দামি সুপার শপ হ্যারডসে প্রিমিয়াম প্রাইসে বিক্রি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্গানিক সুপার শপ হোল ফুডের ১০০টি আউটলেটসহ নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও কুয়েতের বাজারেও বিক্রি হচ্ছে তেঁতুলিয়া চা। হোয়াইট, লেমন গ্রাস, মিন্ট, বেঙ্গল ব্রেকফাস্টসহ ৯টি ফ্লেভারে তেঁতুলিয়া চা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বাজারজাত করছে জেমকন গ্রুপ। চা নিলামের বাজারে গত ৫ বছর সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে এ অর্গানিক চা।
 
জেমকন গ্রুপের সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার আসমা-উল রুকসানা এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে ও বিদেশে অর্গানিক পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে অর্গানিক কৃষির সম্ভাবনাও অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাধা নেই। গুণগতমান বজায় রেখে পণ্য উত্পাদন করলেও এটি একটি লাভজনক পদ্ধতি।
জেমকন গ্রুপের পাশাপাশি প্রশিকা, প্রবর্তণাসহ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অর্গানিক পদ্ধতিতে অল্প কিছু সবজিজাতীয় পণ্য উত্পাদন করে। তবে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা, পাট, তুলা, ধানসহ সবজি চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলার পতিত জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বিশ্ববাজারে অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে বাংলাদেশ।
 
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আবদুল লতিফ এ ব্যাপারে বলেন, পাহাড়ি এলাকার পতিত জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার জন্য এলাকার জনগণকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ি এলাকার মানুষ জৈব সার ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। তারা জুম চাষেই অভ্যস্ত।
তিনি আরও বলেন, দেশে জমি কম কিন্তু মানুষ বেশি। এ কারণে অর্গানিক চাষাবাদেও নীতিমালা হচ্ছে না। তবে জৈব সার উত্পাদনের জন্য প্রকল্প রয়েছে। মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। প্রতিটি বাড়িতে যদি সব ধরনের আবর্জনা দিয়ে জৈব সার তৈরি করা হয়, তাহলে এ চাষাবাদ বৃদ্ধি পাবে।
জানা গেছে, এশিয়ার ৩৬ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষ হয়। প্রায় সাড়ে ৭ লাখ উত্পাদননকারী এর সঙ্গে জড়িত। এর বেশির ভাগই চীন ও ভারতে। চীনে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর ও ভারতে ১২ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষ হয়। ২০১১ সালে ইউরোপীয় জার্নাল অব সোস্যাল সাইন্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মাত্র ১ হাজার ১৬২ হেক্টর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়।
এ ব্যাপারে ফ্রেন্ডস ইন ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশের (এফআইভিডিবি) কনসালটেন্ট ও জৈব কৃষি পরামর্শক ড. শেখ তানভীর হোসেন বলেন, নীতিগত সমস্যার কারণে বাংলাদেশে অর্গানিক কৃষির বিকাশ হচ্ছে না। কৃষক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, অর্গানিক সনদ প্রদানকারী কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকা ও বাজারজাতকরণে সমস্যাসহ কৃষি জমির অভাবে এর বিস্তার নেই। তবে অর্গানিক কৃষি প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। জৈব সার উত্পাদন ও ধানক্ষেতে হাঁস পরিপালন এর একটি বড় দৃষ্টান্ত। কেঁচো কম্পোস্ট সারের সুনাম দেশের বাইরেও রয়েছে। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে ইউরোপে মতো অর্গানিক পদ্ধতিতেও বাংলাদেশে অধিক ফলন সম্ভব।
 
অর্গানিক চাষাবাদে বিশ্বের শীর্ষে ইউরোপ। মোট অর্গানিক চাষের ২৫ শতাংশ হয় এ মহাদেশে। ৯৩ লাখ হেক্টর জমির এ চাষাবাদে আড়াই লাখেরও বেশি ফার্ম জড়িত। স্পেনে ১৩ লাখ, ইতালিতে ১১ লাখ ও জার্মানিতে সাড়ে ৯ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষ হয়। ইউরোপের পাশাপাশি এ পদ্ধতির চাষাবাদে এগিয়ে যাচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকাও। এ অঞ্চলে প্রায় ৮৬ লাখ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতিতে চাষ হয়। পৃথিবীর মোট অর্গানিক কৃষি জমির ২৩ শতাংশই রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকায়। আর্জেন্টিনায় ৪৪ লাখ ও ব্রাজিলের ১৮ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ হয়। আফ্রিকায় ১০ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়। প্রায় ৫ লাখ কৃষক এর সঙ্গে জড়িত। উগান্ডা বছরে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ডলারের অর্গানিক পণ্য রফতানি করে।

সূত্রঃ বণিক বার্তা রিপোর্ট

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: