পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে

নগদ প্রণোদনা থেকে অভিবাসী শ্রমিকেরা বঞ্চিত কেন?

॥ ইকতেদার আহমেদ ॥

সরকার কিছু প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্যের রফতানিকে উৎসাহিত করতে রফতানিকারকদের পণ্যের প্রকারভেদে দেশীয় মুদ্রায় ৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা প্রদান করে থাকে। এ ছাড়া এসব পণ্যের শিল্পোদ্যোক্তারা সরকারের কাছ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস, কর অবকাশ, সুদ মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ প্রভৃতি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
বর্তমানে বিভিন্ন প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে, যা দেশীয় টাকার মূল্যমানে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকা। প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয়, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ভর্তুকি, স্বল্প সুদে ঋণ, কর অবকাশ, সুদ মওকুফ ও ঋণ পুনঃতফসিলীকরণে নগদ ও বৈদেশিক মুদ্রায় যে পরিমাণ অর্থের সংশ্লেষ থাকে; ওই অর্থ থেকে রফতানির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের বিয়োজন করলে দেখা যায় রফতানির মাধ্যমে প্রকৃত আয়ের পরিমাণ সামগ্রিক রফতানি আয় থেকে ৪০-৬০ শতাংশ কম।
অসাধু ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কিছু তথাকথিত শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারক ভুয়া ও জাল কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে কোনো প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্য রফতানি না করেও নগদ প্রণোদনা বাবদ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার শতাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সর্বমহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ অসাধু প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা দায়েরসহ বিভাগীয় ব্যবস’া নেয়া হলেও কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর দেখা যায় আইনের ফাঁক-ফোকর গড়িয়ে এ চক্রের হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। এ কারণে এ ধরনের প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়।
বিদেশে প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্য রফতানি করে যেসব শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারক দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে সরকারের কাছ থেকে পুরস্কারস্বরূপ নগদ সহায়তাপ্রাপ্ত হচ্ছেন, তারা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস’ানের বিবেচনায় বিত্তবান। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের নাগরিকত্বের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। তাদের অনেকেরই ওই সব দেশে ঘরবাড়ি রয়েছে এবং অনেকের স্ত্রীসমেত পুত্রকন্যা ওই সব দেশে স’ায়ীভাবে বসবাস করে লেখাপড়ায় নিয়োজিত আছেন। এসব বিত্তবানের নাগরিকত্ব অর্জনসহ বিদেশে সম্পদ আহরণ ও সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তার বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে এ দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে প্রেরণ করা হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন বিত্তবান শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারক রফতানির মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দেশের জন্য যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন তা বিদেশে তার পরিবারের লালনপালনের জন্য অবৈধ উপায়ে প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রার তুলনায় অনেক কম।
অনেক শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারকের ক্ষেত্রে দেখা যায় সরকারের কাছ থেকে নিজের পাওনা আদায়ের ব্যাপারে একেবারেই অনড়, কিন’ তার শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কারখানায় নিয়োজিত যেসব শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে তিনি বিত্তবানের কাতারে শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারক; তাদের ন্যায্য মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে তিনি অনীহ। দেশ ও সরকার একজন শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারককে এত কিছু দেয়ার পরও তিনি তুষ্ট নন। তার আরো চাই। এ চাইয়ের মধ্যে আছে তাকে রফতানিকারক হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে ক্রেস্ট প্রদান, বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘোষণা করে জেলা শহর ও বিমানবন্দরে সার্কিট হাউজ ও ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ প্রদান, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণের সময় সফরসঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণ, বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও জাতীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত বঙ্গভবনে আয়োজিত সংবর্ধনায় আমন্ত্রণ, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীর প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ প্রভৃতি।
শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারকেরা তাদের শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের জন্য সব সময় শ্রমিকদেরই দায়ী করে থাকেন। প্রাপ্ত অনুসন্ধানে জানা যায়, রফতানিমুখী বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরকার ঘোষিত বর্তমান নিম্নতম মজুরি বাজারমূল্যের চেয়ে অপ্রতুল হওয়া সত্ত্বেও শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা শ্রম আইন অনুযায়ী পরিশোধ করা হলে এবং তাদের কর্মক্ষেত্রে শ্রম আইনের বিধান যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হলে শ্রমিক অসন্তোষ থাকবে না বললেই চলে। কিন’ বাস্তব চিত্র বেশির ভাগ শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারকের ক্ষেত্রে একেবারেই উল্টো। দেখা যায় মাস শুরুর পর সপ্তাহ গড়িয়ে পাক্ষিক অন্তেও শ্রমিকদের মজুরি দেয়া হচ্ছে না। দৈনিক দুই ঘণ্টার স’লে ৫-৬ ঘণ্টা অধিককাল শ্রম দেয়ার পরও কোনো অধিক কাল মজুরি দেয়া হচ্ছে না। শিক্ষানবিস কাল সাফল্যজনকভাবে সমাপ্ত করার পরও চাকরিতে স’ায়ী নিয়োগ দিয়ে নিয়োগপত্র দেয়া হচ্ছে না। প্রাপ্য ছুটি থেকে শ্রমিককে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং সামান্য ভুলের কারণেই পাওনা টাকা পরিশোধ না করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি শ্রম আইনের বিধিবিধান প্রতিপালন করে সরকার ঘোষিত মজুরি নিয়মমাফিক পরিশোধ করা হলে কোনো শিল্পকারখানাতেই কোনো ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ থাকবে না।
একজন শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারক দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিনিময়ে সরকার থেকে নগদ প্রণোদনা হিসেবে যে অর্থ পেয়ে থাকেন তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে মূল অবদান যে শ্রমিকের, তারা কি নগদ প্রণোদনার কোনো অংশ পাচ্ছেন? না পেয়ে থাকলে এ ব্যাপারে শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারকের কি কোনো দায়দায়িত্ব নেই? এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা কেনই বা নিশ্চুপ?
বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তাদের বৃহদাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত। বিগত অর্থবছরে অভিবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা ১০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। এ ৭০ হাজার কোটি টাকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রেরণে যারা অবদান রেখেছেন, তারা হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়ায় নিয়োজিত শ্রমিক শ্রেণী। এসব দেশে কর্মরত শ্রমিকেরা বিদেশে কায়ক্লেশে জীবনযাপন করে তাদের মজুরি হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের বেশির ভাগই দেশে প্রেরণ করে থাকেন। তাদের প্রেরিত অর্থের প্রায় শত ভাগই দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত আয়। এ শ্রমিক লাখের মধ্যে একজনও খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে, যিনি বিত্তবান শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারকের মতো কোনো উন্নত দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন সে দেশে পরিবার-পরিজন পাঠিয়ে দিয়ে ভূসম্পত্তি অর্জনে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ ব্যয় করেছেন।
একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার সময় দেখা যায় সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে এসংক্রান্ত ঋণসুবিধার অনুপসি’তিতে তার জীবনধারণের শেষ অবলম্বনটুকু বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বিদেশে কর্মরত একজন শ্রমিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের মাধ্যমে যেভাবে দেশের অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে অবদান রাখছেন, তার বিনিময়ে একজন বিত্তবান শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারকের চেয়ে তিনি কি কিছু পাচ্ছেন? আর যদি কিছু না পেয়ে থাকেন তবে অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে যাদের এত অবদান, তাদের জন্য কি দেশের বা সরকারের কিছুই করার নেই?
আমাদের সন্নিকটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্র ভিয়েতনাম আমাদের পরে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শ্রমিকদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান দেয়ায় তাদের অর্থনীতির ভিত আমাদের চেয়ে অনেক সুদৃঢ়। ভিয়েতনামের একজন শ্রমিক বিদেশ থেকে ফেরার পর বিমানবন্দরে যখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছেন, তখন দেখা যায় আমাদের একজন শ্রমিক যার অবদানের কারণে দেশ এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে; কিভাবে বিমানবন্দরে শুল্ক কর্মকর্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস’ার কর্মকর্তাদের দ্বারা নাজেহাল ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
একজন বিত্তবান শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারককে নগদ প্রণোদনা দেয়া তেলা মাথায় তেল দেয়ার অনুরূপ। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে একজন শিল্পোদ্যোক্তা রফতানিকারকের চেয়ে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের অবদান অনেক বেশি। আমরা কেন আমাদের এ শ্রমিককে তার অবদান মূল্যায়ন করে নগদ প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছি; এর সঠিক জবাব দেয়ার সময় কি এখনো আসেনি?
লেখক : সাবেক জজ ও সাবেক রেজিস্ট্রার, সুপ্রিম কোর্ট
Email: iktederahmed@yahoo.com

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: