আয়ের তুলনায় সঞ্চয়ের হার গত চার বছরের মধ্যে এখন সবচেয়ে কম।

সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে সাধারণ মানুষ

কাওসার রহমান

আয়ের তুলনায় সঞ্চয়ের হার গত চার বছরের মধ্যে এখন সবচেয়ে কম। মূল্যস্ফীতি গত প্রায় এক বছর ধরে দুই অঙ্কের কোঠায় রয়েছে। ফলে আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করছে। উচ্চবিত্তদের তুলনায় মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে বেশি জর্জরিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। নিম্নবিত্তদের অবস্থা তো আরো খারাপ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১০-১১ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের ১৯ দশমিক ৬ ভাগ ছিল মোট দেশজ সঞ্চয়। আর জিডিপির অনুপাতে সঞ্চয়ের হার ছিল ২০০৯-২০১০ সালে ২০ দশমিক ১০ শতাংশ, ২০০৮-২০০৯ সালে ছিল ২০ দশমিক ১০ শতাংশ এবং ২০০৭-২০০৮ সালে ছিল ২০ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিবছরই সঞ্চয় কমছে।

মূল্যস্ফীতি গত প্রায় এক বছর ধরে দুই অঙ্কের কোঠায় রয়েছে। গত এক বছরে গড় মূল্যস্ফীতিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে এই মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশে যা গত ডিসেম্বর মাসে ছিল ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে পয়েন্ট টু পয়েন্টের হিসাবে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

এ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি গত ১৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়ে গেছে। জানুয়ারি মাসে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশে, যা গত ডিসেম্বর মাসেও ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে পয়েন্ট টু পয়েন্টের এ মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

গত এক বছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ। অথচ চলতি বাজেটে অর্থবছর শেষে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে রাখার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। তবে ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আভাস দিয়েছে, গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে রাখা কঠিন হবে। তবে তা ৯ শতাংশ হতে পারে। অথচ ২০০৯-১০ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ছিল ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সঞ্চয় কমে যাওয়ার প্রবণতা একদিনে হয়নি। এটি শুরু হয়েছে আরো আগে থেকে। যে কারণে সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি গত কয়েক বছর ধরে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। গত ২০১০-১১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৬৩ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল, সেখানে ২০১০-১১ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২ হাজার ৫৬ কোটি ৯০ লাখ টাকায়।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা মূল্যস্ফীতিকেই দায়ী করছেন। তারা বলছেন, আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করছে সাধারণ মানুয়। আর যারা এক সময় মাসের খরচ নির্বাহ করে কিছু করে সঞ্চয় করত, তারা এখন আর সঞ্চয় করতে পারছে না। উচ্চবিত্তদের তুলনায় মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে বেশি জর্জরিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। নিম্নবিত্তদের অবস্থা আরো খারাপ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অর্থাৎ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে গেছে’।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট জমার পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট জমা হয়েছে ২৬৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় একেবারেই কম। গত বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার।

একক মাস হিসেবেও ধীরে ধীরে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। যে পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে তার থেকে উত্তোলন হচ্ছে বেশি। এভাবে মানুষের সঞ্চয় কমতে থাকলে এ খাতে বিনিয়োগ একেবারেই কমে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসে ডাকঘর, ব্যাংক ও সঞ্চয় ব্যুরোর মাধ্যমে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা জমা হলেও একই সময় জমাকৃত মূল টাকা উত্তোলন হয়েছে ১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ জমার চেয়ে উত্তোলন বেশি হয়েছে ২৩৬ কোটি টাকা। এছাড়া একই সময় সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৮৪ কোটি টাকা। এ নিয়ে চলতি অর্থবছরে দ্বিতীয় মাসের মতো জমার চেয়ে উত্তোলন বেশি হলো। এর আগে গত নভেম্বর মাসে ১ হাজার ১১৩ কোটি টাকা জমার বিপরীতে উত্তোলন হয়েছিল ১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা কমে গেছে। তাছাড়া বৈদেশিক সহায়তার হার আগের বছরগুলোর তুলনায় কম এসেছে। এজন্য দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই সাধারণ মানুষের।’

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মনে হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষ। এ কারণেই চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে ৮৩ শতাংশ। মাসভিত্তিক হিসাবে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের চেয়ে টাকা উঠানোর প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এভাবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে কমতে থাকলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হবে সরকারকে। এতে করে ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। ফলে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে না।

এ প্রসঙ্গে তত্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমার পেছনে সুদের হার কম থাকাটা কিছুটা দায়ী। তবে  মূলত নিত্যপণ্যের উচ্চ দামের কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে দিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলো ভালো না হলে শুধু সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়িয়ে সঞ্চয়ের হার বাড়ানো যাবে না
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook 

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: