রিয়েল এস্টেট ব্যবসা : আইন যা বলে

রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০

রিয়েল এস্টেট ব্যবসা : আইন যা বলে

ড. মো. ইকবাল করিম
শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি বাড়ি বা একটি ফ্ল্যাট। এই স্বপ্নটা কার না আছে। একসময় সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে এমন বাড়ি বা ফ্ল্যাটের খোঁজে নেমে পড়েন অনেকে। দ্বারস্থ হতে হয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের।
পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় এ দেশে জমির মূল্য অনেক বেশি। ইচ্ছা থাকলেও অনেকের পক্ষে জমি কেনা সম্ভব হয় না। আবার জমি কিনলেও বাড়ি করার সামর্থ্য থাকে না। এ কারণে রিয়েল এস্টেট কম্পানির কাছে যেতেই হয়। ফ্ল্যাট কিনতেও শরণাপন্ন হতে হয় কম্পানির।
যাঁরা রিয়েল এস্টেট কম্পানির দ্বারস্থ হন, তাঁদের নানা হয়রানি বা নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রণীত হয়েছে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও এর ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আইন। এটি রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ নামে পরিচিত।
২০১০ সালের ৫ অক্টোবর এ আইনটি প্রণীত হয়।

রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ফ্ল্যাটবাড়ি নির্মাণ নীতিমালা আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে। ৫(২)-এর উপধারা (১)-এ বলা হয়েছে, সারা দেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করতে হলেও সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। ধারা ৫-এর উপধারা ৪(ক)-এ বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের জন্য এ নিবন্ধন সনদ ইস্যু করবে সরকার। পাঁচ বছর পর পর নিবন্ধন সনদ নবায়ন করতে হবে।
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইনের ৬ ধারায় ভূমি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানের (ডেভেলপার) দায়দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। ৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রস্তুতকৃত প্রসপেক্টাসে রিয়েল এস্টেটের নিবন্ধন, এর নাম-ঠিকানা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত অনুমোদন নম্বরসহ স্মারক নম্বর ও তারিখ উল্লেখ করতে হবে।
৬(২) ধারায় বলা হয়েছে, ডেভেলপার কর্তৃক রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হস্তান্তর দলিল সম্পাদনের ক্ষমতা বা অধিকার প্রাপ্তির আগে রিয়েল এস্টেট ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে প্রচার করতে পারবে না। ৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো প্রকল্প সরকারের অনুমোদনের আগে ক্রেতার কাছে কোনো ডেভেলপার কোনো রিয়েল এস্টেট বিক্রয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে না। আবার ৬(৪) ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক ক্রেতাকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানাসংক্রান্ত দলিলপত্র দেখাতে হবে।
ফ্ল্যাট দখল ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, রিয়েল এস্টেটের সমুদয় মূল্য পরিশোধের পর ডেভেলপার অনূর্ধ্ব তিন মাসের মধ্যে ক্রেতাকে রিয়েল এস্টেটের দখল হস্তান্তর দলিল ও রেজিস্ট্রেশন কার্যাদি সম্পন্ন করে দেবে।
একই আইনের ১১(২)(ক) ধারায় বলা হয়েছে, রিয়েল এস্টেটের তৈরি ফ্ল্যাট আলো-বাতাস চলাচলের উপযোগী হতে হবে। ১১(২)(খ)-তে বলা আছে, রিয়েল এস্টেট হস্তান্তরের আগে সব ধরনের ইউটিলিটি সার্ভিস যেমন_পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগি্ননিরোধক ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংযোগ থাকতে হবে। ১১(২)(গ) ধরায় বলা আছে, রিয়েল এস্টেট হস্তান্তরের পর নির্মাণসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে মেরামতের প্রয়োজন হলে হস্তান্তরের তারিখ থেকে অনূ্যন দুই বছর পর্যন্ত ডেভেলপারের নিজ খরচে নির্মাণ ত্রুটি মেরামতে কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এ আইনের ১১(৩) ধারায় বলা আছে, পক্ষগণের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রত্যেক ডেভেলপারকে রিয়েল এস্টেট হস্তান্তরের এক বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
রিয়েল এস্টেট ক্রেতা এককালীন বা কিস্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ক্রেতাকে ১৪(২) ধারা মোতাবেক রেজিস্টার্ড ডাকযোগে অনূ্যন ৬০ দিনের আগে নোটিশ প্রদান ব্যতীত ক্রেতার বরাদ্দ বাতিল করা যাবে না। ১৪(৩)-এর উপধারা (২)-এ বর্ণিত আছে, বরাদ্দ বাতিলের ক্ষেত্রে ক্রেতার জমাকৃত অর্থ বরাদ্দ বাতিল আদেশের পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে প্রাপকের অপপড়ঁহঃ ঢ়ধুবব চেকের মাধ্যমে একত্রে প্রদান করতে হবে। আবার এ কথাও উল্লেখ আছে, ১৪(৪)-এর উপধারা (২)-এ বর্ণিত বিষয় অনুযায়ী কোনো ক্রেতা বিলম্বে কিস্তির অর্থ পরিশোধ করতে চাইলে দেয় কিস্তির ওপর বিলম্বিত সময়ের জন্য কিস্তির অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে সুদসহ কিস্তি পরিশোধ করতে পারবে। ১৪(৫) উপধারা (৪)-এ বলা আছে, তিনবার কিস্তির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব করলে ডেভেলপার ক্রেতার বরাদ্দ বাতিল করতে পারবে।
এই আইনে আরো বলা আছে, ‘ডেভেলপার নির্দিষ্ট সময়ে রিয়েল এস্টেট হস্তান্তরে ব্যর্থ হলে ১৫(১) ধারা অনুযায়ী ক্রেতার পরিশোধিত সমুদয় অর্থ ক্ষতিপূরণসহ ছয় মাসের মধ্যে অপপড়ঁহঃ ঢ়ধুবব চেকের মাধ্যমে ক্রেতাকে প্রদান করবে। ১৫(২) উপধারা (১)-এ বলা আছে, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ পক্ষগণের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে উল্লেখ না থাকলে পরিশোধিত সমুদয় অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হবে ও ডেভেলপার অনধিক ছয় মাসের মধ্যে অনূর্ধ্ব তিন কিস্তিতে ক্ষতিপূরণের অর্থসহ সমুদয় অর্থ পরিশোধ করবে। আবার কোনো কারণে ক্রেতা লিখিত আবেদনের মাধ্যমে ওই আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী ক্রেতার অনুকূলে প্রদত্ত বরাদ্দ বাতিলপূর্বক পরিশোধিত অর্থ ফেরত গ্রহণ করতে চাইলে ডেভেলপার আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ পরিশোধিত অর্থের ১০ শতাংশ টাকা কর্তনপূর্বক অবশিষ্ট টাকা ক্রেতাকে তিন মাসের মধ্যে এককালীন চেকের মাধ্যমে বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ফেরত দেবে। ১৮(১) ধারায় বলা আছে, ‘ঝঃঁপঃঁৎধষ ফবংরমহ, অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্লোরস্পেস ক্রয় বা বিক্রয়ের চুক্তিপত্র বা অষষড়ঃসবহঃ-পত্রে প্রস্তাবিত ভবনে যেসব ফিটিংস, ফিকশ্চার ইত্যাদি ব্যবহার করা হবে তার বিবরণী সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
এই আইনের ২৫ ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো ডেভেলপার ক্রেতার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুত নির্মাণ উপকরণের পরিবর্তে অবৈধভাবে বেশি লাভবান হওয়ার জন্য নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করলে বা যথাযথ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার না করলে তিন বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। আবার একই আইনের ২৭ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ডেভেলপার কোনো ভূমি মালিকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ক্রেতা বরাবর রিয়েল এস্টেটের বরাদ্দপত্র সম্পাদন করে তদানুযায়ী কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করে বা আংশিক কার্যক্রম গ্রহণ করে বিনা কারণে অবশিষ্ট কাজ অসম্পাদিত অবস্থায় ফেলে রাখে, তাহলে এর জন্য ভূমির মালিককে বা ক্রেতাকে কোনোরূপ আর্থিক সুবিধা প্রদান না করে, তবে এ আইনের অধীন একটি প্রতারণামূলক অপরাধ বলে গণ্য হবে। ওই অপরাধের জন্য ডেভেলপার অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন এবং এর ব্যবস্থাপনাসহ ফ্ল্যাটবাড়ি নির্মাণ আইনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে ক্রেতা ও ডেভেলপারের সম্পর্কের কথা। এর পরও ভুঁইফোড়ের মতো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো সাইনবোর্ড লাগিয়ে ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে যত্রতত্র।
আইনে আছে, অনুমোদন গ্রহণ ব্যতীত রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করলে কিংবা অননুমোদিত রিয়েল এস্টেট প্রকল্পের বিজ্ঞাপন প্রচার বা বিক্রয় করলে অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন আইন এবং ফ্ল্যাটবাড়ি নির্মাণ নীতিমালার ৫ ধারায় বলা হয়েছে, নিবন্ধন গ্রহণ না করে কোনো রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং এ অপরাধের জন্য দুই বছর কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে রাজউক আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে ক্রেতাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে এবং ডেভেলপাররা আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করলে, এ আইনে যা আছে তা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে ক্রেতাদের অনেক সমস্যা দূর হবে। বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাবে সাধারণ ক্রেতা।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: