গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ: আমার শংকা


গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ: আমার শংকা

(প্রথম অংশ )
ড. মুহাম্মদ ইউনূস

     

 

খবরটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আমার মত দেশের অনেকের, বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক গরীব মহিলাদেরও নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ১৫মে, ২০১২ তারিখে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ক নানা বিষয়ে সুপারিশ দেবার জন্য চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন (কমিশন অব ইনকোয়ারি) করে দিয়েছে। কমিশনকে তিনমাস সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করার জন্য।

এই তদন্ত কমিশন গঠন করে আমরা একটা রেকর্ড স্থাপন করলাম। নোবেল পুরস্কারের একশ’ দশ বছরের ইতিহাসে মোট বিশটি নোবেল জয়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এশিয়ার একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের উপর তদন্ত কমিশন বসিয়ে। আমাদের ইতিহাসে এটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের উপর তদন্ত কমিশন কেন?
সৃজনশীল যে কর্মপদ্ধতি এবং নতুন ধরনের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সৃষ্টি করে গ্রামীণ ব্যাংক গরীবের কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃতি পেলো সে কর্মপদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা ও ফলাফলে সরকার সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলেই কি তদন্ত কমিশন গঠন? অথবা, গ্রামীণ ব্যাংক কি বড় রকমের কোনো অঘটন ঘটিয়েছে যার জন্য তদন্ত কমিশন বসাতে হয়েছে? গ্রামীণ ব্যাংক এমন কী জনগুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যে তার উপর তদন্ত চালাতে হবে। এ পর্যন্ত যত তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে সেগুলি বড় রকমের অঘটন ঘটার পর মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগার কারণে সরকার তদন্তকমিশন গঠন করে তার তদন্ত করেছে। তদন্ত কমিশন গঠণের আইনটাও এ ধরনের পরিস্থিতিকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল।

এই কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যে গ্রামীণ ব্যাংকের জন্ম থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মেয়াদকাল পর্যালোচনা করে তারা সুপারিশ/মতামত দেবে। এই মেয়াদের আগাগোড়া আমি প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করে এসেছি। ২০১০ সাল পরবর্তী সময়টাকে কমিশনের বিবেচনার বাইরে রাখার কারণ বুঝতে পারলাম না। ২০১০ সালের পর কি গ্রামীণ ব্যাংকের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে?

তদন্ত কমিশনের কাছে সাধারণত চাওয়া হয় ঘটনা-উত্তর বিষয়ের কারণ ও সমাধান। এই তদন্ত কমিশনের কাছে চাওয়া হয়েছে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকে তার সুবিস্তৃত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানের মৌলিক বিষয়গুলির ভালমন্দ যাচাই করে ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের দায়িত্ব। মাত্র তিনমাস সময়ের মধ্যে স্বল্প লোকবল নিয়ে এই বিশাল দায়িত্ব পালন করা তদন্ত কমিশনের জন্য একটা কঠিন কাজ হবে। সময় স্বল্পতার কারণে কমিশন যদি ভুল পরামর্শ দিয়ে ফেলে তার পরিণতি বাংলাদেশের গরীব মানুষের জন্য মর্মান্তিকও হতে পারে।

এই ধরনের কাজ সাধারণত সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সেরা গবেষকদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেয়া হয়। যাঁরা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, পরিচালনা করেছেন, যাঁরা প্রতিষ্ঠানের উপকারভোগী, যাঁরা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচিত তাঁদের সবার সঙ্গে পরামর্শ করে বহু যুক্তিতর্ক দিয়ে পরিচালনা পর্ষদের বিবেচনার জন্য এই প্রতিবেদন পেশ করা হয়। ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য অংশগুলি প্রতিষ্ঠানের চলমান প্রক্রিয়াকে ব্যাহত না-করে যত্নের ধাপে ধাপে প্রয়োগ করা হয়।
এই তদন্ত কমিশনের সময়সীমা দেখে মনে হতে পারে ছুরি-কাঁচি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে কাজে নামা ছাড়া তাদের গতি নেই।
 

 

গ্রামীণ কোম্পানি
কমিশনের কার্যপরিধিতে গ্রামীণ নামের কোম্পানিগুলি নিয়ে সরকারের অনেক প্রশ্ন। প্রশ্নগুলি পড়লে মনে হয় হয়তো সরকারের ধারণা যে কোম্পানিগুলো গ্রামীণ
  ব্যাংকের মালিকানায় সৃষ্টি হয়েছে, অথচ কোম্পানিগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রনে নেই। আমি বহুবার বলেছি, এইসব প্রশ্নের উত্তর জানা খুবই সহজ। একটা  আন্তর্জাতিক মানের অডিট ফার্মকে গ্রামীণ ব্যাংকের আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস বের করতে দিলে তারা সব কথা বের করে নিয়ে আসবে। এর জন্য পুরাদস্তুর তদন্ত কমিশন বসানোর দরকার কি? গ্রামীণ ব্যাংক এসব কোনো কোম্পানির মালিক কিনা, গ্রামীণ ব্যাংক এগুলি প্রতিষ্ঠা করেছে কিনা এটা দেখার জন্য এত বড় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দরকার কি?

আমি নিজের উদ্যোগে বহু প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছি। আমার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলির নামের সঙ্গে আমি ‘গ্রামীণ’ নাম ব্যবহার করে এসেছি। এই প্রতিষ্ঠানগুলির বেশীর ভাগই হলো ‘মুনাফার জন্য নয়’ এমন প্রতিষ্ঠান। আইন অনুসারে এদের কোনো ‘মালিক’ নেই। কোম্পানি আইনের সেকশন ২৮ দিয়ে বেশীর ভাগ কোম্পানিগুলি সৃষ্ট। এগুলিতে শেয়ার বিক্রি করার ব্যবস্থা থাকে না (নন-স্টক), এগুলি থেকে কেউ মুনাফা পায় না, যেহেতু কারো এতে মালিকানা নেই, এবং এগুলি স্পন্সরদের ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দ্বারা সীমিত, অর্থাৎ কোম্পানি দায় দেনা শোধ করতে না পারলে স্পন্সররা ব্যক্তিগতভাবে তাদের দেয়া গ্যারান্টি পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। কাজেই এমন প্রতিষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা থাকারও প্রশ্ন আসে না। আর কিছু আছে মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান। মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানগুলির মালিক হচ্ছে এক বা একাধিক ‘মুনাফার জন্য নয়’ এমন প্রতিষ্ঠান। এখানেও গ্রামীণ  ব্যাংকের মালিকানা থাকার কোন অবকাশ নেই।

গ্রামীণ ব্যাংক নিজে কোন প্রতিষ্ঠান করেনি কারণ গ্রামীণ ব্যাংকের আইনে কোনো প্রতিষ্ঠান গঠনের কোন ক্ষমতা ব্যাংককে দেয়া হয়নি।

এই প্রতিষ্ঠানগুলি সৃষ্টিরও কারণ আছে। গরীবদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ঋণ ছাড়াও আরো অনেক সমস্যার সঙ্গে মুখোমুখি হতে হয়। শিক্ষার সমস্যা (গ্রামীণ শিক্ষা), স্বাস্থ্যের সমস্যা (গ্রামীণ কল্যাণ), মার্কেটিং এর সমস্যা (গ্রামীণ চেক), কৃষির সমস্যা (গ্রামীণ কৃষি), মৎস্য ও পশুপালন সমস্যা (গ্রামীণ মৎস্য), প্রযুক্তির সমস্যা (গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কমুনিকেশান্স), বীমার সমস্যা (গ্রামীণ ব্যবসা বিকাশ) বিদ্যুতের সমস্যা, চুলার সমস্যা (গ্রামীণ শক্তি), ইত্যাদি। প্রতিটি সমস্যার মোকাবেলার জন্য একটি করে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছি। যখনি সমস্যার মুখোমুখি হতে চেয়েছি তার সমাধানের জন্য একটা পৃথক কোম্পানি সৃষ্টি করেছি। এমনভাবে করেছি যাতে কোম্পানি নিজের আয়ে নিজে চলতে পারে।  পরমুখাপেক্ষি হয়ে যেন কোম্পানিকে থাকতে না হয়। একটি কোম্পানির পতন হলে সে-যেন আর পাঁচটি কোম্পানিকে টেনে নিচে নামিয়ে ফেলতে না-পারে। প্রতিটি কোম্পানিই উদ্ভাবনমূলক কোম্পানি। আগে কোনদিন কাজ করা হয়নি এমনভাবে, নতুন ভঙ্গীতে, নতুন কনসেপ্ট দিয়ে সমস্যার সমাধান পাওয়ার চেষ্টা করেছি। এদের মধ্যে অনেকগুলি কোম্পানি পৃথিবীতে দৃষ্টান্তমূলক কোম্পানি হিসেবে ইতিমধ্যেই দাঁড়াতে পেরেছে। গ্রামীণ টেলিকমের মাধ্যমে গ্রামীণ ফোনের মোবাইল ফোন গরীব মহিলাদের হাতে পৌঁছানোর কনসেপ্ট সারা পৃথিবীর টেলিকম জগতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর সৃষ্টি করেছে। গ্রামীণ শক্তি সৌর শক্তির মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ শক্তির মাধ্যমে এবছরই ১০ লক্ষ গ্রামীণ পরিবারে সৌরবিদ্যুৎ পৌছানো সম্পন্ন হবে। দৈনিক গড়ে এক হাজার নতুন পরিবারে সৌরশক্তি স্থাপন করছে এই কোম্পানি। এই কোম্পানিগুলিতে কারো ব্যক্তিগত মালিকানা নেই। এগুলি হলো ”ট্রাস্টের” মত প্রতিষ্ঠান। মানুষের মঙ্গলের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। কারো জন্য মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে এইসব কোম্পানি সৃষ্টি করা হয়নি। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।
গ্রামীণ বা অন্য কোন নামের কোন প্রতিষ্ঠানে আমার কোন শেয়ার বা মালিকানা নেই। গ্রামীণ ব্যাংকেও আমার কোন শেয়ার নেই। কাজেই কোন কোম্পানির কোন মুনাফার অংশ আমার কাছে আসার কোন সুযোগ কখনো ছিল না, আজও নেই। কোন গ্রামীণ কোম্পানির বোর্ড মিটিং-এ উপস্থিতি বা পরিচালনার জন্য আমি কোন সম্মানী ব ভাতা কোন সময় নেইনি।

কমিশনের কার্যপরিধির আরেকটি বিষয় হলোঃ ‘গ্রামীণ’ প্রতিষ্ঠানগুলির মালিকানার উত্তরাধিকার সম্পর্কিত আইন কানুনগুলি খতিয়ে দেখা। (What are the succession rules for ownership and management of these institution). মজার কথা হলো এর প্রত্যেকটি কোম্পানিই কোম্পানি আইনে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। নিবন্ধনকৃত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকেই তার পরিচালনা পরিষদের গঠন ও পুনর্গঠনের নিয়মাবলী সুনির্দিষ্ট করা থাকে। শেয়ারের উত্তরাধিকার কিভাবে নির্ধারণ করবে সেটার জন্য দেশের প্রচলিত আইনই ত যথেষ্ট হবার কথা। বাবার শেয়ার ছেলেমেয়েরা পাবে- এরকমই ত হয়। তাছাড়া গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলিতে যখন শেয়ারের বালাই নেই সেখানে মালিকানার উত্তরাধিকার কিভাবে প্রাসঙ্গিক হবে, কিংবা অর্থবহ হবে, সেটাও বুঝতে পারছি না। একেবারে তদন্ত কমিশন বসিয়ে এখন মালিকানার উত্তরাধিকার আইন সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা  করার প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াতে এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের মনে ভুল চিন্তা জেগে উঠা কি অন্যায় হবে?

তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধি দেখলে মনে হবে গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ  নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে সরকারের মধ্যে প্রচুর আগ্রহ। একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানার উত্তরাধিকার (এমন কি সে প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমালিক যদি থেকেও থাকে) তা নিয়ে সরকারকে কেন এত চিন্তিত হতে হলো যে তার জন্য একটা তদন্ত কমিশনকে দায়িত্ব দিতে হলো সেটা সহজে বোধগম্য হচ্ছে না। মালিকানার যেসম্পর্ক এগুলির প্রতিষ্ঠালগ্নে ছিল না, যেসম্পর্ক এখনও নেই, বাংলাদেশ ব্যাংকের বহু বছর ধরে করে যাওয়া অডিট রিপোর্টেও কোনো দিন যার উল্লেখ করা হয়নি, আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের মেয়াদেও যার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন জাগেনি, সেই সম্পর্ক উদঘাটনের জন্য পুরো দস্তুর একটি তদন্ত কমিশন বসানোতে অবাক লাগারই কথা। বিশেষ করে যে কমিশনের কর্মপদ্ধতি এবং সুপারিশসমূহ দেশে এবং বিদেশে বহুলভাবে এবং বহুদিন ধরে আলোচিত হতে থাকবে।

পটভূমি
গ্রামীণ ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। চট্রগ্রামের জোবরা গ্রামে। ৮৫৬ টাকা নিজের পকেট থেকে ঋণ দিয়ে। এরপর আমি জামানতকারী হয়ে জনতা ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে ঋণ দেয়া শুরু করলাম। ১৯৭৮ সালে কৃষি ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব আনিসুজ্জামানের সহযোগিতায় এটাকে রূপান্তরিত করা হলো কৃষি ব্যাংকের একটি প্রকল্প হিসেবে। আমার প্রস্তাব গ্রহণ করে তিনি আমার তত্ত্বাবধায়নে পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ শাখা প্রতিষ্ঠা করে দিলেন জোবরা গ্রামে। নাম দেয়া হলো ‘কৃষি ব্যাংক, পরীক্ষামূলক গ্রামীণ
  শাখা’। এর পরের বছর ১৯৭৯ সালে এটা আরো বৃহত্তর আকার ধারণ করলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্ণর জনাব গঙ্গোপাধ্যায়ের আগ্রহে, ও আমার প্রস্তাবে। কৃষি ব্যাংকের প্রকল্প থেকে এবার হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকল্প। পুরো টাংগাইল জেলা জুড়ে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হলো। সকল রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক এই প্রকল্পের অংশীদার হলো। প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় করলাম টাংগাইল জেলায়। এজন্যে আমি আকুর টাকুর পাড়ায় বসবাস শুরু করি। এই প্রকল্প পরিচালনার জন্য। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত টাংগাইলের আকুর টাকুর পাড়াতেই কাটালাম। এই প্রকল্প পাঁচ জেলায় সম্প্রসারিত হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে আমার অমত সত্ত্বেও প্রধান কার্যালয় ঢাকায় শ্যামলীতে স্থানান্তরিত করলাম। ১৯৮৩ সালে আমার প্রস্তাবে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিতের উৎসাহে এবং রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদের সমর্থনে ‘গ্রামীণ  ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩’ প্রণয়ন ও জারী করা হয়। গ্রামীণ  ব্যাংক প্রকল্প এবার ‘গ্রামীণ ব্যাংকে’ রূপান্তরিত হলো।  নতুন আইন কাঠামোতে ব্যাংকের মালিকানা বিন্যাস নিয়ে আমি ঘোরতর আপত্তি তুললাম। এতে সরকারের মালিকানা রাখা হয়েছে ৬০%। অর্থাৎ এটাকে সরকারী ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমি এই কাঠামো নিয়ে অগ্রসর হতে নারাজ হলাম। মাননীয় অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করলেন যে তিনি শিগগিরই মালিকানা পাল্টে দিয়ে একে বেসরকারী ব্যাংক বানিয়ে দেবেন। কিন্তু সে কাজটি করার সুযোগ তিনি পেলেন না। তিনি এর আগে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে চলে গেলেন। তাঁর উত্তরসূরি জনাব সায়ীদুজ্জামান সে কাজটি করে দিলেন ৮ জুলাই ১৯৮৬ সালে। মালিকানা বিন্যাস পরিবর্তন করে অধ্যাদেশ সংশোধন করে দিলেন। এবার মালিকানা হলো ৭৫% গ্রামীণ  ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতাদের, ২৫% সরকারের। এই অনুসারে বোর্ডের গঠন ও পরিবর্তন হলো। বোর্ডে ৯ জন ঋণগ্রহীতাদের প্রতিনিধি, ৩ জন সরকারের, পদাধিকার বলে থাকবেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ৩১শে জুলাই ১৯৯০ সালে আরেকটি সংশোধন হলো। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেবে পরিচালনা পর্ষদ- সরকার নয়। ১৯৯০ সাল থেকে এপর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংক এভাবেই চলে আসছে। বর্তমানে ঋণগ্রহীতাদের শেয়ারের অংশ ৯৭ শতাংশ। সরকার ৩ শতাংশ।

সরকারের শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে চলে আসার কারণে হচ্ছে সরকার শুরুতে যে মূলধন দিয়েছিল তার পরিমাণ আর কখনো বাড়ায়নি। এদিকে ঋণগ্রহীতাদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। তাঁরা প্রত্যেকে শেয়ার কিনেছেন। প্রতি শেয়ারের মূল্য ১০০ টাকা। একজন ঋণগ্রহীতার সঞ্চয়ী হিসাবে টাকার পরিমাণ ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেলে তিনি ১০০ টাকা দিয়ে একটা শেয়ার কিনতে পারেন এবং তিনি কিনেনও। ফলে ঋণগ্রহীতাদের শেয়ারের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এই কারণেই তাদের শেয়ারের পরিমাণ ৯৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদি মূলধনের পরিমাণ না বাড়ায়, আর ঋণগ্রহীতাদের শেয়ারের পরিমাণ যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তবে সরকারের শেয়ারের আনুপাতিক অংশ ক্রমান্বয়ে আরো কমে যেতে থাকবে।

৮৫৬ টাকা দিয়ে যে উদ্যোগের শুরু হয়েছিল এখন সে ব্যাংক ৮৪ লাখ ঋণগ্রহীতাকে বছরে বারো হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। ঋণগ্রহীতাদের নিজস্ব সঞ্চয়ী তহবিলে এই মুহূর্তে জমা আছে সাত হাজার কোটি টাকা। গরীব মহিলারা নিজস্ব সঞ্চয়ী আমানতে সাত হাজার কোটি টাকা জমা রেখেছে শুধু তাই নয়, এটাকার পরিমাণ ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। তাদের নিজস্ব পেনশন ফান্ড আছে। তাদের ছেলেমেয়েদেরকে পৌনে তিনশ’ কোটি টাকা শিক্ষা ঋণ দিয়েছে উচ্চ শিক্ষার জন্য।  প্রতি বছর আরো শিক্ষাঋণ দিয়ে চলেছে।  

১৯৯০ সালের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় সংশোধনগুলি করে ব্যাংকের মালিকানা ঋণগ্রহীতাদের হাতে তুলে দেওয়ার কারণে এবং সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পরিচালনা পর্ষদের হাতে ন্যস্ত করার কারণেই গ্রামীণ ব্যাংক একটি মজবুত ও সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পেরেছে।

গ্রামীণ ব্যাংককে অনেকে  অন্যান্য ব্যাংকের মত মনে করেন বলে এর সম্বন্ধে ভুল সিদ্ধান্তে চলে আসেন। তারা মনে করেন এই ব্যাংকের একমাত্র বৈশিষ্ট হচ্ছে যে তারা ছোট অংকের টাকা ঋণ দেয়। তা মোটেই নয়। এটা পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক যা বিন্দুমাত্র জামানত না নিয়ে চলে। এতে কোন জমাজমির দলিল লাগে না। এই ব্যাংক তার সেবা মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছে দেয়। প্রতি সপ্তায় তার দোর গোড়ায় গিয়ে তার কাছ থেকে ঋণের কিস্তি নিয়ে আসে। কাউকে ব্যাংকের অফিসে এসে টাকা জমা দিতে হয় না। একটা ঋণ শোধ হলে আবার ঋণ নিতে কোন সময় লাগে না। ঋণগ্রহীতা মারা গেলে কিংবা তার স্বামী মারা গেলে অবশিষ্ট ঋণ আর পরিশোধ করতে হয় না। অথচ আবার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ঋণ নিতে পারেন। ঋণগ্রহীতা ইন্তেকাল করলে জানাজার জন্য অনুদান পায়। শাখার ম্যানেজারকে জানাজায় উপস্থিত থাকতে হয়। সকল ঋণগ্রহীতার ছেলেমেয়েদের শিক্ষা ঋণ দেয়া হয়। প্রত্যেক ঋণগ্রহীতা নিজেই ব্যাংকের মালিক। এটা জগতের মূল ব্যাংকিং কর্মপদ্ধতির একেবারে উল্টা কর্মপদ্ধতি।  এজন্যই গ্রামীণ ব্যাংক গরীব মহিলাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যেতে পেরেছে। এজন্যই এই ব্যাংকের এত গুরুত্ব।

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে তদন্ত কমিশনের করণীয়
তদন্ত কমিশনের যে কার্যপরিধি দেয়া হয়েছে তাতে শংকা জাগে যে সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের আইন কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে চায়। কমিশনের কার্যপরিধিতে আছে:
ক. ব্যাংকের শুরু থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মেয়াদে এর কর্মক্ষমতা, দুর্বলতা এবং এর সামনে প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিহ্নিত করা।
খ. ব্যাংকের সুশাসন, বিশেষ করে ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ প্রদান করা।
গ. গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা বিন্যাস, বোর্ড প্রতিনিধিত্ব, বোর্ড সদস্যদের যোগ্যতা নির্ধারণ সম্পর্কে তাদের মতামত দেয়া।

কর্মদক্ষতা, দুর্বলতা যাচাই করার মাপকাঠি কী হবে?
কার্যপরিধির যে অংশে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মদক্ষতা, দুর্বলতা ও প্রতিবন্ধকতা যাচাই করার কথা বলা হয়েছে সে সম্বন্ধে কয়েকটি প্রশ্ন সবার মনে জাগবে। কমিশন কোন মাপকাঠিতে এই বিচার করবে? তারা কি ঋণ আদায়ের হার, সুদের হার, ব্যাংকের লাভ-লোকসান, কর্মী প্রতি কতজন ঋণগ্রহীতা দেখাশোনার দায়িত্ব, এম.আই.এস, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক দক্ষতা, কর্মচারীদের সুযোগ সুবিধা, অর্থ সংস্থান, বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি, কতজন দরিদ্র মহিলার কাছে ঋণ সুবিধা নিয়ে যেতে পেরেছে, তাদের মধ্যে কত পরিমাণ সঞ্চয় সৃষ্টি করতে পেরেছে এগুলি বিচার করবে, নাকি অন্য কোনো মাপকাঠি নিয়ে আসবে? তারা কার সঙ্গে তুলনা করে তাদের মতামত স্থির করবে? তারা কি কাল্পনিক একটি যোগ্যতা স্থির করে তার সঙ্গে বিচার করে দেখবে, নাকি বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে গ্রামীণ ব্যাংকের অবস্থান নির্ণয় করবে। নাকি তারা গ্রামীণ
  ব্যাংক যেহেতু একটি ব্যাংক সেকারণে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করে দেখবে- যেমন, কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, বা কোনো আন্তর্জাতিক ব্যাংক।

বাস্তবতার নিরিখে যাচাই না করে মনগড়া একটা মতামত দিতে গেলে কমিশনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এটা তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর গ্রামীণ ব্যাংক অডিট ও পরিদর্শন করে। এ জন্য কেনুদ্রীয় ব্যাংকে এর একটি সুনির্দিষ্ট বিভাগ আছে। বহু বছর ধরে ক্রমাগতভাবে তারা এ কাজ করে আসছে। তাদের কাছে গ্রামীণ
  ব্যাংকের ভাল মন্দ সব খবর জমা আছে। তাদের নিষ্ঠাবান দক্ষ কর্মকর্তারা বহু বছর ধরে প্রতিবছর শাখায় শাখায় গিয়ে, প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অনুসন্ধান চালিয়ে এমন কোনো চাঞ্চল্যকর খবর তুলে ধরেনি যে যার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক বেকায়দায় পড়ে গেছে। তারা প্রতিবছর যেসব বিষয়ে আপত্তি তোলেন গ্রামীণ  ব্যাংক তার ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করতে পেরেছে। তারা বছরের পর বছর জানিয়ে এসেছে যে তাদের কাছে গ্রামীণ  ব্যাংকের ব্যাপারে অনিষ্পত্তিকৃত কোন বিষয় অবশিষ্ট নেই।

একবার বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি তুলেছিল।

২০০০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট টিম আমার অবসর গ্রহণ করার বয়সসীমা নিয়ে প্রশ্ন উথ্থাপন করে। আমরা বুঝালাম যে গ্রামীণ ব্যাংকের নিজস্ব নিয়ম নীতিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য কোন বয়সসীমা নির্ধারণ করা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক জানালো যে আপনারা আপনাদের সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে আসুন আমরা পরীক্ষা করে দেখব। কাগজপত্র দেয়ার পর তারা একটা যৌথ সভার ব্যবস্থা করল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩ জন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ৩ জন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এ বিষয়ে বৈঠক করলেন জানুয়ারী ১৫, ২০০১ সালে। এ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল যে গ্রামীণ ব্যাংক কয়েকটি দলিলের কপি সরবরাহ করলে তাদের আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। গ্রামীণ ব্যাংক তা সরবরাহ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন এই আপত্তিটি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গ্রহণ করে  তখন আমার বয়স ৬১ বছর ৬ মাস। আমার বয়স ৬০ পার হলেও সকল কাগজপত্র পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে ঘটনা-উত্তর অনুমোদন নেবার আর প্রয়োজন আছে বলে মনে করেনি। পরবর্তী বছরসমূহের অডিট প্রতিবেদনে অনিষ্পত্তিকৃত বিষয়সমূহের মধ্যেও আর কোন দিন এই বয়সসীমার প্রশ্নটি আর তোলেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক যথাসময়ে প্রশ্নটি তুলেছিল। আমরা আমাদের ব্যাখ্যা দিয়েছি। তারা তাতে সন্তুষ্ট হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়াও গ্রামীণ ব্যাংক জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত নিয়মিতভাবে প্রতি বছর দেশের সব চাইতে খ্যাতনামা দুইটি অডিট ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষিত হয়ে এসেছে। তাঁরা আমাদের হিসাবপত্র এবং ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মানের বলে বরাবর আমাদেরকে লিখিতভাবে জানিয়ে এসেছেন।

গ্রামীণ ব্যাংকের সুশাসন, বিশেষ করে ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ চাওয়া হয়েছে তদন্ত কমিশনের কাছে।

এত বছর পর, এত অডিট রিপোর্টের পর, এত গবেষণার পর, এত পুরস্কারের পর, এত সম্মান লাভের পর, গ্রামীণ  ব্যাংক নিয়ে হঠাৎ সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার প্রশ্ন উঠাতে আমার মত অনেক মানুষ নিশ্চয়ই বিচলিত বোধ করবে- বিশেষত আমাদের মত দেশে, যেখানে এই গুণাবলীগুলির অনুপস্থিতি নিয়ে বিচারে বসলে যারা অনায়াসে তালিকার শীর্ষস্থানগুলি দখল করে রাখবে তাদের ব্যাপারে, কোন তদন্ত কমিশন গঠন না করে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি সরকারের এই আগ্রহ অনেককে বিস্মিত করেছে। কমিশনের কার্যপরিধি যেভাবে লেখা হয়েছে সাদা চোখে সেভাবে পড়লেই চলবে, নাকি অন্য কোনো বিশেষ চশমা দিয়ে পড়তে হবে, সেটা নিয়েও অনেক পাঠক দোটানায় পড়তে পারেন।

যে চারজন সম্মানিত ব্যক্তিকে নিয়ে এই কমিশন গঠন করা হয়েছে তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে বলে আমার মত অনেকে মনে করতে পারেন। তাঁরা যদি ক্ষুদ্র-ঋণ জগতের সঙ্গে পরিচিত না-হন তাহলে সমস্যাটা তাঁদের জন্য আরো জটিল হয়ে পড়বে।

ক্ষুদ্রঋণের জন্ম বাংলাদেশে হলেও এই কর্মকাণ্ড এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীতে ধনী দরিদ্র এমন কোনো দেশ নেই যেখানে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চলছে না। এর ফলে সারা পৃথিবী জুড়ে এ ক্ষেত্রে বহু বিশেষজ্ঞের জন্ম হয়েছে। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিষয়ে ডিপার্টমেন্ট সৃষ্টি হয়েছে, বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয়েছে। বহু ভাষায় বহু প্রকাশনা একে কেনুদ্র করে প্রকাশিত হয়। বহু অধ্যাপক  অধ্যাপনা করেন। এই কর্মসূচি পরিচালনা করে পৃথিবীজুড়ে বহুজন খ্যাতি অর্জন করেছেন। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচীতে বাংলাদেশ অন্যান্য অনেক দেশ থেকে এগিয়ে। এদেশে ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনা করে পৃথিবী জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন এমন অনেক ব্যক্তিত্ব এখানে আছেন। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে দেশে বিদেশে অনেক গবেষণা হয়েছে, গবেষণা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে, অনেক জার্নালে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের উপর নজরদারি করার দায়িত্ব পালন করে। তাছাড়া ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিসমূহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পৃথক রাষ্ট্রীয় সংস্থা মাইক্রোফাইনান্স রেগুলেটরি অথরিটি রয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলিতে অর্থ সরবরাহ করার জন্য বহু বছরের মূল্যবান অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান পি,কে,এস,এফ রয়েছে। এত গবেষক, এত প্রশাসক, এত বিশেষজ্ঞ থাকতে এই চারজনের উপর এতবড় দায়িত্ব কেন চাপানো হলো এটা বুঝা বড় কষ্টকর।
সরকার কমিশনের সামনে যেসব বিষয় উপস্থাপন করেছেন তাতে একটা দুশ্চিন্তা মনে জাগে যে, সরকার হয়তো চাইছেন গ্রামীণ ব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্বল’ এটা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তাকে বলুক। কারণ সরকার চাইছে গ্রামীণ ব্যাংক যেভাবে চলছে সেভাবে না-চলুক। সরকারের নিজস্ব চিন্তা অনুসারে চলুক। সরকারের চিন্তাটা এই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আনার একটা ব্যবস্থা করার সুযোগ হোক।

বর্তমান আইনে সে সুযোগ নেই। কারণ বর্তমান আইন অনুসারে এটা মালিকদের সিদ্ধান্তে চলে। সরকারের সিদ্ধান্তে চলতে হলে তার মালিকানা বিন্যাস পরিবর্তন করা দরকার। সরকার হয়তো আশা করছেন যে, কমিশন এরকম একটা সুপারিশ তাঁদেরকে দেবে। মালিকানা পরিবর্তন হলে বোর্ড পরিবর্তন হবে। তার ফলে সবকিছুর পরিবর্তন হবে।

মালিকানা পরিবর্তন না করেও সরকার এমনভাবে আইন সংশোধন করতে পারে যে বোর্ডের সর্বময় ক্ষমতা আর থাকবে না। বোর্ড যেমনি আছে তেমনি থাকবে, কিন্তু সকল ব্যাপারে তাকে সরকারের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।

কার্যপরিধি পড়ে এধরনের শংকা মনে জাগে। আমি আশা করবো যে আমার এই সকল শংকা সম্পূর্ণ অমূলক প্রমাণিত হবে। তবু সময় থাকতে শংকাগুলি সবার সামনে নিয়ে আসা উচিত মনে করে বিষয়গুলি তুলে ধরছি।

২৩শে এপ্রিল, ২০১২ তারিখে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের লিখিত বক্তব্যে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি এবং হবেও না’। এই পরিস্কার বক্তব্যে আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু এর মাত্র কয়েকদিন পর জারীকৃত তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধি দেখে আবার শংকাটি বিপুলভাবে চাড়া দিয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা
গ্রামীণ ব্যাংকের শুরু থেকে অল্প অল্প সঞ্চয় জমিয়ে গরীব মহিলারা গ্রামীণ
  ব্যাংকের শেয়ার কিনেছে। এ ব্যাংক তাদের নিজস্ব ব্যাংক জেনে তারা এটাকে মজবুত রাখার জন্য প্রতিদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে। আজ তাদের মালিকানা নিয়ে তদন্ত কমিশনের কাছে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ায় গরীব মহিলারা শংকিত বোধ করবেন। একটা বড় নির্দয় প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে কমিশনের সামনে। কমিশন কী জবাব দেয় তা যেমন ৮৪ লক্ষ গরীব মহিলা শেয়ার মালিকরা লক্ষ্য করবেন, তেমনি দেশবাসীও লক্ষ্য করবেন। নারীর ক্ষমতায়নে আগ্রহী পৃথিবীর সকল মানুষ গভীর আগ্রহ নিয়ে এই উত্তরের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

পরিচালনা পর্ষদে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারনের ব্যাপারেও কমিশনের সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। এটাও একটা দুর্ভাগ্যজনক প্রশ্ন। তাঁরা গ্রামীণ  ব্যাংকের মালিক-এটাই তাঁদের একমাত্র যোগ্যতা। গরীব মালিকদের মধ্যে সরকার একটা উচ্চবণের্র শ্রেণী তৈরীর কথা চিন্তা করছেন না তো? গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই নিরক্ষর মহিলা । গ্রামীণ  ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যাঁরা এপর্যন্ত নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তাঁদের নেতৃত্ব দানের গুণাবলী নিয়ে কারো মনে কখনো কোনো প্রশ্ন জাগেনি। গ্রামীণ  ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বরাবরই দেশের গুণী ব্যক্তিরা চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। যেমন: প্রফেসর ইকবাল মাহমুদ, প্রফেসর রেহমান সোবহান, ড. আকবর আলী খান, প্রফেসর কায়সার হোসেন, জনাব তবারক হোসেন। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এঁদের কেউ বলবেন না যে মহিলাদের প্রতিনিধিরা যোগ্যতার মাপকাঠিতে কোনো অংশে খাটো ছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংকের সকল মহিলাদের এবং সকল সদস্যের পক্ষ থেকে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং গৌরব নিয়ে এঁদেরই একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের পিরগাছা গ্রামের তসলিমা বেগম সমস্ত পৃথিবীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে অসলোতে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের সকল মহিলার মনে প্রচন্ড অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তিনি নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানে সুন্দর বাংলায় পুরস্কার গ্রহণোত্তর ভাষণ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের টেলিভিশনে তা সরাসরি প্রচার করা হয়েছিল। আমার মনে হয় তাঁর ভাষণ শুনে বাংলাদেশের মহিলাদের রক্তে যে শিহরণ জেগেছিল সেই শিহরণ আজো জেগে আছে। এখন কি এই তসলিমাদের হারিয়ে যাবার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তদন্ত কমিশনকে? সরকারের মনে কী আছে- সবাই এটা জানতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এটা একটা মস্ত বড় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ: আমার শংকা

( দ্বিতীয় অংশ )
ড. মুহাম্মদ ইউনূস

     

 দ্বিতীয় অংশ

গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে
১৯৮৩ সালের ২রা অক্টোবর টাংগাইলের জামুর্কী হাই স্কুলের মাঠে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্পের মহিলা সমাবেশে গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের জন্ম মুহূর্তে এই সমাবেশে বক্তৃতা করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মহোদয় এবং টাংগাইলের ঋণগ্রহীতা মহিলারা, সরকারী
  কর্মকর্তারা নয়।

এই ব্যাংক গরীব মহিলার ব্যাংক এব্যাপারে কোনো আপস কখনো হয়নি। এই ব্যাংক জোবরা গ্রাম থেকে শুরু করে আকুর টাকুর পাড়া, শ্যামলী হয়ে মিরপুরে পৌঁছার পথে তার এই মূল আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হয়নি।

গরীব মহিলাদেরকে মালিকানা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বময় ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবার অর্থ হবে গ্রামীণ ব্যাংককে তার মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেয়া। যেকোনো রকম ব্যাখ্যা সৃষ্টি করে এরকম একটা পদক্ষেপ নেবার অর্থ হবে গ্রামীণ  ব্যাংককে অন্য আরেক ধরনের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা। যে আইন, যে ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যে কর্মপদ্ধতিকে কেনুদ্র করে গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানসমূহের অন্যতম হতে পেরেছে, সেই বিশ্বজয়ী ফরমুলাকে অবশ্যই অপরিবর্তিত রাখতে হবে।

এই প্রতিষ্ঠান নিজের টাকায় চলে। গ্রামীণ ব্যাংক না সরকারের কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়, না কোনো দাতা সংস্থা থেকে টাকা নেয়। এই প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং জগতে একটা বিশাল মাত্রার সংযোজন করেছে। পৃথিবীর অসংখ্য ব্যাংকার এই ব্যাংক সম্বন্ধে জানতে সব সময় আগ্রহী থাকে। সারা দুনিয়ার মানুষ এর দিকে বিস্ময় এবং সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখে। এই ব্যাংক এদেশের জন্য পৃথিবীতে একটা স্থায়ী সম্মানের আসন তৈরী করে দিয়েছে। এর প্রতি আমাদের সরকার একটু সদয় হবে, ভাবনা চিন্তা করে কাজ করবে এটাই আমরা সবাই আশা করবো। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে একটা জাতীয় ঐকমত্য থাকা দরকার। কারণ এটা আমাদের জাতীয় গৌরবের প্রতিষ্ঠান।
গ্রামীণ ব্যাংকের হাজার হাজার কর্মী এবং লক্ষ লক্ষ ঋণগ্রহীতার ৩৫ বছরের সাধনার ফসলকে অতি দ্রুততার সঙ্গে উপলদ্ধি করে এই তদন্ত কমিশন এমন সব সুপারিশ তৈরী করবে যা এই প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করবে, দুর্বল করবে না, বিপদগ্রস্থ করবে না- মনে এরকম আস্থা জাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।
  

আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, গ্রামীণ ব্যাংকের আইন কাঠামোর পরিবর্তন করে সরকারের ভূমিকা এতে বাড়ানো হলে গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে। গ্রামীণ ব্যাংকে হাত না-দিয়ে সরকার এরকম আরেকটি বা একাধিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করুক তাতে কারো আপত্তি হবে বলে মনে হয় না। এটা কোনো রাজনৈতিক আদশের্র ব্যাপার নয়। গ্রামীণ ব্যাংককে বর্তমান মালিকানায় বর্তমান আইন কাঠামোতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এটা নিঃসন্দেহে একটা সুন্দর বিকল্প হতে পারে।
     

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি বিশাল সম্মানের কারণে পৃথিবীর অজানা অচেনা দেশে বহু প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় ”গ্রামীণ” নাম ধারণ করেছে। তারা বাংলাদেশকে চেনে এই বাংলা শব্দের মাধ্যমে। তারা জানেও না ‘গ্রামীণ’ শব্দের অর্থ কি। বাংলাদেশ থেকে পাওয়া এই শব্দটি তাদের কাছে একটা স্বপ্নের নাম। বিশাল একটা সম্ভাবনার নাম।
সরকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে গ্রামীণ ব্যাংক কোন পথে অগ্রসর হবে সেটা আঁচ করতেই মনে ভয় ধরে। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ম শৃংখলার ব্যাংক। সরকারী প্রতিষ্ঠানে পরিনত হলে নানারকম সংঘাত এর ভেতর দ্রুত প্রবেশ করার সম্ভাবনা দেখা দেবে। গ্রামীণ ব্যাংকের ২৪ হাজার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের প্রায় প্রত্যেককে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার নগদ টাকা নিয়ে রোজ একা একা গ্রামের রাস্তায় চলাফেরা করতে হয়। সে টাকার কতটুকু ব্যাংকের কাছে জমা হবে, আর কত টাকা মাঝখানে হাওয়া হয়ে যাবে সেটা নিয়েও মাথায় চিন্তা আসবে। ঘুষ দিয়ে ঋণ পাওয়া, ঘুষ দিয়ে পোস্টিং পাওয়া, পদোন্নতি পাওয়া, জোর যার মুলুক তার ধরনের পরিস্থিতি ক্রমাগত দৈনন্দিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এইগুলি সবই দুঃস্বপ্ন। স্বপ্ন যেমন বাস্তব হবার সম্ভাবনা থাকে, দুঃস্বপ্নও সেরকম বাস্তবে রূপান্তরিত হতে পারে। এটা যাতে না-হতে পারে তার জন্য আমাদের এখন বিশেষ উদ্যোগ দরকার।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের অব্যবস্থা, দুর্নীতি নিয়ে এত লেখালেখি, এত গবেষণা হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত সেগুলি বেসরকারী মালিকানায় দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল অতীতে। এখন গ্রামীণ ব্যাংককে সরকারী নিয়ন্ত্রনে নেবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে মনে প্রচন্ড ভয় ধরেছে।

মিরপুরের প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের (বৈঠক) ‘কেনুদ্র’ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের সকলেই সর্বত্র একই শৃংখলার সূত্রে গাঁথা, একই নিয়মানুবর্তিতায় এরা আবর্তিত হয়। সরকারী মেজাজের হাওয়া যদি একবার লাগে গ্রামীণ ব্যাংকের এতদিনের অর্জন ফুৎকারে মিলিয়ে যেতে বেশী সময় লাগবে না। ঐক্য-কর্ম-শৃংখলার মন্ত্রে দীক্ষিত গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৪ লক্ষ ঋণগ্রহীতা তাদের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে বিশ্বের হূদয়কে জয় করেছে। তাদের কাছ থেকে মালিকানা ও পরিচালনা পরিষদে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছেঁটে দিলেই কি সব সমস্যার অবসান ঘটবে? সরকার কি ৮৪ লক্ষ পরিবারকে বুঝাতে পারবে কেন ঋণগ্রহীতারা তাদের নিজের অর্থে, নিজের শ্রমে গড়া প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হলো?

দেশের মানুষ বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাংকের গরীব মহিলা মালিকরা, নিশ্চয়ই চাইবেন না যে তাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের এই পরিণতি হোক। গ্রামীণ  ব্যাংকের সদস্যের ছেলে মেয়েরা, বিশেষ করে যারা শিক্ষাঋণ নিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ও অন্যান্য পেশাজীবী হয়ে উঠেছে তারা, নিশ্চয়ই চাইবে না যে তাদের মায়ের ব্যাংক সরকারের নিয়ন্ত্রনে কিংবা মালিকানায় চলে যাক। কারণ তারা নিজেরাই এখন দলে দলে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ”নতুন উদ্যোক্তা” ঋণ নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে নেমে পড়ছে। দেশের সবাই মিলে যদি আমরা সরকারকে বুঝাতে পারি যে গ্রামীণ  ব্যাংকের আইন কাঠামো পরিবর্তন দেশের জন্য, গরীবদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না তাহলে একে ঠেকানো যাবে। কিন্তু আমাদেরকে আমাদের শংকাগুলি প্রকাশ করে সরকারকে বুঝাতে হবে। বুঝাতে হবে যে এটা কারো জন্য মঙ্গলজনক ত হবেই না, বরং ভয়ংকর পরিনতি বয়ে আনবে। গ্রামীণ  ব্যাংক পৃথিবীব্যপী বাংলাদেশের একটা ব্রান্ড-নেইম। এটার কোনো ক্ষতি হোক এমন কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে।

দেশবাসী হিসেবে আপনি রাজনৈতিকভাবে যে দলেরই হোন, পেশাগতভাবে যে পেশারই হোন, যে বয়সীই হোন, যেকোন অবস্থাতেই থাকুন আমরা একযোগে সরকারকে বুঝাবার চেষ্টা করতে পারি যে গ্রামীণ  ব্যাংকের আইন কাঠামো পরিবর্তন করা মোটেই সঠিক কাজ হবে না। একাজ থেকে সরকারকে বিরত করার জন্য যে যেভাবে পারি সেভাবে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি। নারীর ক্ষমতায়নে, বিশেষ করে গরীব মানুষের ক্ষমতায়নে, যারা বিশ্বাসী তাদেরকে এব্যাপারে সোচ্চার হতে অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি আমার এই লেখাটি ছাপিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের সকল শাখায় পাঠাচ্ছি যাতে ঋণগ্রহীতা মালিকরা তাঁদের মালিকানা রক্ষা করার জন্য তাঁরাও স্থানীয় গণ্যমান্যদের মাধ্যমে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাতে পারেন।

 আমাদের সবাইকে মিলে গ্রামীণ ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংক গরীব মহিলাদের মালিকানায় যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেভাবে পরিচালিত হতে থাকুক, গরীব মহিলাদের সেবায় অব্যাহত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাক, এটা আমদেরকে সুদৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। আমার মনে যে শংকা জেগেছে সে-শংকা যদি আপনার মনেও জেগে থাকে আপনিও সরকারকে এপথ থেকে সরে আসার পরামর্শ দিন।


# ড. মুহাম্মদ ইউনূস : গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা

লস এঞ্জেলেসে বৈশাখী মেলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও জাহান হাসান ২০০৯

সূত্রঃ

http://www.real-timenews.com/details.php?id=47327&p=1&s=6
http://www.real-timenews.com/details.php?id=47328&p=1&s=6


 

Advertisements

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ কাতার


২৭ ফেব্রুয়ারি ॥ : বিশ্বের সব শক্তিধর ও প্রভাবশালী দেশকে পেছনে ফেলে সবচেয়ে ধনী দেশ হওয়ার সম্মান পেল কাতার। যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ফোর্বস বিশ্বের ১৮২টি দেশে সমীক্ষা চালিয়ে ধনবান দেশের যে তালিকা তৈরি করে তাতে প্রথমে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১৭ লাখ জনসংখ্যার এই দেশ। তেল ভান্ডার আর প্রাকৃতিক গ্যাসের সৌজন্যেই কাতারের ভাগ্যে এই সম্মান জুটল। কাতারের মাথাপিছু আয় ৮৮ হাজার ২২২ মার্কিন ডলার (প্রায় ৭৪ লাখ টাকা)।

দেশের লোকের ক্রয়ক্ষমতা, জিডিপি, মাথাপিছু আয় এইসব বিষয়ের উপর চুলচেরা বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি করেছে ফোর্বস। কাতার বিশ্ব অর্থনীতিতে বেশ কয়েক বছর ধরেই সামনের সারিতে আছে।

বিশ্বের ধনবান শিল্পপতিদের অনেকের বাস এই দেশে। দেশের রাজধানী দোহায় আকাশচুম্বি বাড়িগুলো তো সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর কাতার এখন ২০২০ অলিম্পিকের আয়োজক হওয়ার দৌড়ে আছে। এতেও বোঝা যায় অর্থনৈতিক ভীত কতটা শক্ত রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই দেশের।

কাতারের পরেই ধনবান দেশের এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে ইউরোপের ছোট্ট দেশ লুক্সেমবার্গ, মাথাপিছু আয় ৮১ হাজার ৪৬৬ ডলার। তৃতীয় স্থানে এশিয়ার সিঙ্গাপুর, মাথাপিছু আয় ৫৬ হাজার ৬৯৪ ডলার। তালিকায় প্রথম ১০ নম্বরে এরপর রয়েছে যথাক্রমে নরওয়ে (মাথাপিছু আয় ৫১,৯৫৯ ডলার), ব্রুনাই (৪৮,৩৩৩), সংযুক্ত আরব আমিরাত (৪৭,৪৩৯), যুক্তরাষ্ট্র (৪৬,৮৬০), হংকং (৪৫,৯৪৪), সুইজারল্যান্ড (৪৩,৯৫০) ও নেদারল্যান্ডস (৪০,৯৭৩)। তালিকায় একেবারে শেষের দিকে আফ্রিকার দারিদ্রক্লিষ্ট দেশ লাইবেরিয়া, বুরুন্ডি ও কঙ্গো।

কাতার পারস্য উপসাগরের একটি দেশ। এটি আরব উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে উত্তর দিকে প্রসারিত কাতার উপদ্বীপে অবস্থিত। কাতারের দক্ষিণে সৌদি আরব, এবং এর পশ্চিমে দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন অবস্থিত। আরব উপদ্বীপের মত কাতারও একটি উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরু এলাকা। এখানে ভূ-পৃষ্ঠস্থ কোন জলাশয় নেই এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের সংখ্যাও যৎসামান্য। বেশির ভাগ লোক শহরে, বিশেষত রাজধানী দোহা শহরে বাস করে। দেশটিতে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ আছে। এই প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে দেশটির অর্থনীতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯শ শতকের শেষভাগ থেকে আল-থানি গোত্রের লোকেরা কাতার অঞ্চলটিকে একটি আমিরাত হিসেবে শাসন করে আসছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ১৯৭১ সালে এটি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্তও এটি একটি তুলনামূলকভাবে দরিদ্র দেশ ছিল। ঐ সময় দেশটিতে পেট্রোলিয়ামের মজুদ আবিষ্কৃত হয় এবং এগুলি উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের হিসেবে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলির একটি।

কাতারের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। কাতারের আমীর হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান।হামাদ বিন খালিফা আল সানি ১৯৯৫ সাল থেকে দেশটির বর্তমান আমীর। হামাদ ইবন জাবার আল সানি ২০০৭ সাল থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী।

আরবি ভাষা কাতারের সরকারী ভাষা। এখানকার প্রায় ৫৬% লোক আরবি ভাষাতে কথা বলেন। প্রায় এক-চতুর্থাংশ লোক ফার্সি ভাষায় কথা বলেন। বাকীরা উর্দু ভাষা,ভারতীয় উপমহাদেশেরফিলিপিন দ্বীপপুঞ্জের অন্যান্য ভাষাতে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক কাজকর্মে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার ২০ সুন্দরী লেখিকা


দক্ষিণ এশিয়ার ২০ সুন্দরী লেখিকা

ফাতিমা ভুট্টো
ফাতিমা ভুট্টোর বাড়ি পাকিস্তানে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নাতনি, বেনজির ভুট্টোর ভাতিজি তিনি। বয়স সবে ২৬। ইতিমধ্যে তিনি ‘হুইস্পার্স অব দ্য ডেজার্ট’ নামে একটি কবিতা সংকলন এবং ‘সঙ অব ব্লাড অ্যান্ড সোর্ড’ নামে একটি আ
Íজৈবনিক বই লিখেছেন। তবে এই লেখালেখির সীমানা পেরিয়ে, লেখক পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন অনেকের হƒদয়ের দেবী।

মণিকা আলী
মণিকা আলী তার প্রথম উপন্যাস ব্রিক লেন দিয়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি পান। এই বইটি ২০০৩ সালে ম্যান বুকার পুরস্কারের সংপ্তি তালিকায় ছিল। মণিকা আলীর বয়স ৪০ বছর। দুই সন্তানের মা। ব্রিক লেন ছাড়াও তিনি তিনটি বই লিখেছেন। আলী বাংলাদেশি বাবা আর ইংরেজ মায়ের গর্ভে মণিকা আলীর জ
š§ ঢাকায়। তবে জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ইংল্যান্ডে। ব্রিক লেন বইটিতে বাংলাদেশি সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে।

ঝুম্পা লাহিড়ি
ইংল্যান্ডে বাঙালি অভিবাসী পরিবারে তার জ
š§। তবে জš§র মাত্র তিন বছর বয়সেই মা-বাবার সঙ্গে আমেরিকা পাড়ি জমান। তার প্রথম বই ‘ইন্টারপ্রেটার অব ম্যালাডিজ’। ছোটগল্পের সংকলন এটি। বইটি ২০০০ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পায়। এরপর তিনি আরও একটি ছোটগল্পের বই প্রকাশ করে। পরে উপন্যাসের দিকে যান। তার প্রথম উপন্যাস হলো ‘দ্য নেমসেক’। এই উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা বানানো হয়েছে।

কামিলা শামসী
কামিলা শামসীর জ
š§ পাকিস্তানের করাচিতে। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সিটি বাই দ্য সি’ লিখেন। এই বইয়ের জন্য ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার পান। ত্রিশ পেরোনো আকর্ষণীয় সৌন্দর্যের অধিকারী এই লেখিকার ৪টি বই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় নিয়মিতভাবে বই আলোচনা এবং কলাম লিখে থাকেন।

মীনাক্ষী রেড্ডি মাধবন
ঘরভর্তি লোকের মধ্যে থেকে মীনাক্ষী
 রেড্ডি মাধবনকে খুঁজে পাওয়া কোনো ব্যাপারই না! কারণ, তার জ্বলজ্বলে সৌন্দর্যই আপনাকে চিনিয়ে দেবে তাকে। ২০ পেরোনো প্রাণবন্ত এই লেখক ও ব্লগার জানেন, কী করে সবার মাঝে নিজের উপস্থিতির দীপ্তি ছড়িয়ে দিতে হয়। মীনাক্ষী এ পর্যন্ত দুটি বই লিখেছেন। একটি আত্মজৈবনিক ভঙ্গির রচনা ‘ইউ আর হেয়ার’। অন্যটি হলো ‘কনফেশনস অব অ্যা লিস্টম্যানিয়াক’।

তাহমিমা আনাম
তসলিমা নাসরিনের পর বাংলাদেশের নতুন সেনসেশন হলেন তাহমিমা আনাম। ৩৫ বছর বয়সী তাহমিমা আনাম সমৃদ্ধ সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের ভেতর থেকেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেছেন। তার বাবা মাহ্ফুজ আনাম বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক। তার দাদা আবুল মনসুর আহমদ একজন খ্যাতিমান লেখক এবং রাজনীতিক ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে উপজীব্য করে তাহমিমা আনাম তার প্রথম উপন্যাস ‘গোল্ডেন এইজ’ লেখেন। এটার সিকুয়েল হিসেবে তিনি তার দ্বিতীয় বই ‘দ্য গুড মুসলিম’ লিখেছেন। তাহমিমা আনামের জ
š§ ঢাকায়। বাবার চাকরিসূত্রে প্যারিস, নিউইয়র্ক সিটি এবং ব্যাংককে বেড়ে উঠেছেন।

আনজুম হাসান
আনজুম হাসান ভারতের কবি ও ঔপন্যাসিক। ‘লুনাটিক ইন মাই হেড’ নামের প্রথম উপন্যাস দিয়েই তিনি সবার মনোযোগ কাড়েন। নব্বই দশকের প্রথমার্ধে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি স্টেশনকে ঘিরে গড়ে ওঠা উপন্যাসটি অদ্ভুত সুন্দর। এই বইটি ক্রসওয়ার্ড বুক পুরস্কারের সংপ্তি তালিকায় ছিল। তার দ্বিতীয় বই হলো ‘নেটি’। ২০০৮ সালে এটাও ম্যান এশিয়ান লিটারারি পুরস্কার তালিকায় ছিল।

মঞ্জুশ্রী থাপা
২০০৫ সালে ফেব্র”য়ারি মাসে যেদিন কাঠমান্ডুতে ক্যু সংগঠিত হয়, তার সপ্তাহ খানেক আগে তার প্রথম বই ‘ফরগেটস কাঠমান্ডু: অ্যান এলিজি ফর ডেমোক্রেসি’ প্রকাশিত হয়। নেপাল কীভাবে ভুল পথে চলছে, সেটাকে উপজীব্য করে কিছুটা স্মৃতি থেকে, কিছুটা ইতিহাসাশ্রয়ী হয়ে, সংবাদভঙ্গিমায় বইটি লেখা হয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে লেখার কারণে থাপা নেপাল ছাড়েন। ২০০৬ সালে তার বইটি লেট্রি ইউলিসিস পুরস্কারের সংপ্তি তালিকায় স্থান পায়। ৪৩ বছর বয়সী মঞ্জুশ্রী থাপা এ পর্যন্ত ছয়টি বই লিখেছেন।

তিশানি দোশী
তিশানির মা ওয়েলশ আর বাবা গুজরাটি। চেন্নাইয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি হার্পারস অ্যান্ড কুইন ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপন বিভাগের চাকরি নেন। এরপর তিনি ভারতে ফিরে এসে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী নাচের কোরিওগ্রাফি
Ñচন্দ্রলেখার পরিচিতির উদ্যোগ নেন। তখনই তিনি নাচকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন। ৩৫ বছর বয়সী এই কবি, লেখক ও নৃত্যশিল্পীর প্রথম কবিতার বই ‘কান্ট্রিজ অব দ্য বডি’ ফরওয়ার্ড পুরস্কার পায়। তিনি ‘দ্য প্লেজার সেকারস’ নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন।

মৃদুলা কোশি
২০০৯ সালে মৃদুলা কোশির প্রথম ছোটগল্পের বই ‘ইফ ইট ইজ সুইট’ শক্তি বাট পুরস্কার লাভ করে। একই বছর বইটি ভোডাফোন ক্রসওয়ার্ড বুক অ্যাওয়ার্ডের সংপ্তি তালিকায় স্থান পায়। ৪৩ বছর বয়সী এই দিল্লিতে বাস করেন। তিনি নানা ধরনের চাকরি করেছেন। এর মধ্যে বিশ্বখ্যাত খাবার ব্র্যান্ড কেএফসির ক্যাশিয়ার থেকে শুরু করে ফ্যাশন শোর ব্যাকস্ট্রেজ ড্রেসার পদও আছে।

ইরা ত্রিবেদী
২০০৫ সালে তিনি যখন মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন, তখনই জানতেন তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘হোয়াট উড ইউ ডু টু সেভ ওয়ার্ল্ড’-এর বীজ বপন করলেন। এরপরে ত্রিবেদী আরও দুটি বেস্টসেলার বই ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান লাভ স্টোরি’ এবং ‘দেয়ার ইজ নো লাভ অন ওয়াল স্ট্রিট’ লিখেন। তিনি লেখালেখির সময়টুকু বাদে ‘ইয়োগা’ প্রশিণ দিয়ে থাকেন।

অমরিতা ত্রিপাঠী
দুনিয়ার তাবৎ বইয়ের ফ্যাপে এ পর্যন্ত যত লেখকের পরিচিতি ছাপা হয়েছে, তার মধ্যে মুখশ্রী বোধ হয় অমরিতা ত্রিপাঠীর। তিনি লেখালেখির পাশাপাশি সিএনএন-আইবিএন চ্যানেলে উপস্থাপনার কাজ করে থাকেন। একটি নিউজ চ্যানেলের স্বাস্থ্য এবং বইবিষয়ক সম্পাদক তিনি। তার প্রথম উপন্যাস ‘ব্রোকেন নিউজস’ বইতে অমরিতা গ্ল্যামার দুনিয়া এবং সেখানকার সত্যিকারের চিত্র উ
š§াচন করেছেন।

কে এই রাষ্ট্রদূত মাজিদা রফিকুন্নেসা?


কে এই রাষ্ট্রদূত মাজিদা রফিকুন্নেসা?

জব্বার হোসেন:
ফিলিপাইনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাজিদা রফিকুন্নেসার কেলেঙ্কারি এখন বাংলাদেশে মুখরোচক গল্পের জ
š§ দিচ্ছে। আপন স্বামী, বোন ও কন্যাকে চাকরি দিয়েছেন মিশনে গড়ে প্রায় বাংলাদেশি টাকায় ৫০,০০০ টাকা স্কেলে। কন্যা নওমী মান্নানের চাকরির ফাইলে লিখেছেন; নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার এক বছরের মধ্যে কোনোভাবেই চাকরি ছেড়ে যেতে পারবেন না।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, দূতাবাসের অলিখিত টেলিফোন অপারেটর তার স্বামী ড. আবদুল মান্নান মিয়া। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা এখন দুঃসহ জীবন যাপন করছেন বলে জানা যায়। তার আপন ছোট বোন মাকসুদা শফিউনেসা দীর্ঘদিন ধরে বড় বোনের সঙ্গেই থাকছেন। এই প্রথমবার দূতাবাসের লোভনীয় চাকরিতে যোগ দিলেন। নওমী মান্নান মাত্র এ লেভেল শেষ করলেও পড়াশোনার ইতি টানতে মাধ্য হয়েছেন।
রাষ্ট্রদূত মাজিদা নানা রকম অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়ে পড়েছেন। অতিরিক্ত ভিসা ফি আদায় এখন দূতাবাসের নিয়মিত ঘটনা। জাতীয় দিবস, জাতীয় শোক দিবস এখন আর উদ্যাপিত হয় না। এ বাবদ ছাড়কৃত সকল অর্থই তার পকেটে যায়, অথচ নিজেকে শেখ রেহানার সহপাঠী পরিচয় দিতে ভোলেন না।

(শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে হেয় করতেই তিনি লেখালেখি করে থাকেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। খালাতো-চাচাতো ভাইকে একসঙ্গে ‘খাচাতো’ বলার পক্ষে তিনি। তার দুই ননদের বিয়ে হয়েছে একই পরিবারে। তাদের সন্তানদের কটাক্ষ করে তিনি ‘খাচাতো ভাই’ বলে থাকেন। নিজের স্বামীর পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন)

জানা গেছে, এর আগে মালয়েশিয়া ও তুরস্কে থাকাকালেও তিনি দুর্নীতিতে জড়িয়েছিলেন। ডিসিপি (ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল) থাকাকালে তার একটি কনটেইনার কেলেঙ্কারির আজও সন্তোষজনক নিষ্পত্তি হয়নি। ওপর মহলকে ম্যানেজ করে তিনি নিজের পক্ষে রায় আদায় করে নিয়েছিলেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়।
তিনি মাঝে মাঝে লেখালেখি করেন। বেশ কটি নিুশ্রেণীর চটি বই লিখেছেন তিনি। শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে হেয় করতেই তিনি লেখালেখি করে থাকেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। খালাতো-চাচাতো ভাইকে একসঙ্গে ‘খাচাতো’ বলার পক্ষে তিনি।
তার দুই ননদের বিয়ে হয়েছে একই পরিবারে। তাদের সন্তানদের কটাক্ষ করে তিনি ‘খাচাতো ভাই’ বলে থাকেন। নিজের স্বামীর পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন।
বেশ কিছুদিন ধরে জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিকগুলো তার কেলেঙ্কারি নিয়ে মুখর হলেও এখন পর্যন্ত মাজিদা রফিকুন্নেসার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত না হওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে জানা গেছে।

‘সংবাদপত্রে বিনিয়োগ বিত্তবানদের জন্য আজ এক আকর্ষণীয় মৃগয়া’


‘সংবাদপত্রে বিনিয়োগ বিত্তবানদের জন্য আজ এক আকর্ষণীয় মৃগয়া’

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আলোচনা

বিচারপতি মু. হাবিুবর রহমান
আজ ঋণখেলাপি ও ভূমিদস্যু থেকে শুরু সামরিক-বেসামরিক নানা গোয়েন্দা সংস্থার অর্থ-সহায়তায় সংবাদপত্র প্রকাশনার অভিযোগ শোনা যায়। সংবাদপত্রে বিনিয়োগ বিত্তবানদের জন্য আজ এক আকর্ষণীয় মৃগয়া। সেই মৃগয়ার শিকারি অনেক সময় আশুপ্রাপ্তি, চমকসৃষ্টি কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ছাপার অক্ষরে কিছু প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত জার্নালিজম ট্রেনিং এন্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (যাত্রী), ইউনেসকো, বিসিডিজেসি ও বিএনএনআরসি কর্তৃক আয়োজিত “সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত” বিষয়ে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এ কথা বলেন।
বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেন, সংবাদপত্র আজ এক বড় বিনিয়োগক্ষেত্র। এখানে কেনাবেচা হয়। টাকার খেলাও হয়। হুমকিতে অনেক সময় পাতা নড়ে। সাংবাদিকদের যেমন কর্তৃপক্ষ খুশি রাখতে চায়, তেমনি সাংবাদিকেরাও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক রক্ষা করতে চায়। তেমন খাসলত হলে একটি সংবাদপত্র একেবারে আশ্রিত বা পোষ্য হতে পারে।
তিনি বলেন, আজ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে অনেক সময় মালিকের স্বাধীনতা মনে হয়। তবে সেই স্বাধীনতা আপেক্ষিক ও সীমিত। পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে একটি সংবাদপত্র বেশি দিন চলবে না। তথ্যাশ্রয়ী ও সত্যাশ্রয়ী সাংবাদিকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি। সাংবাদিকদের ন্যায্য পাওনাগন্ডা পেতে সারাক্ষণ তাদের উচ্চকিত থাকতে হয়। তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও বিভক্তি প্রসঙ্গে বলেন, কাক নির্যাতিত হলে সহকর্মী কাকেরা তার সমর্থনে চিৎকার করে। সাংবাদিক নির্যাতিত হলে তার স্বীয় গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছ থেকে অনেক সময় কাকসদৃশ ব্যবহার পায় না। সেই নিয়ে দুঃখ বা মাতম না করে নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানোই তিনি শ্রেয়তর মনে করেন।
বিসিডিজেসির প্রেসিডেন্ট নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, আজকের বাস্তবতায় সাংবাদিকতা নানা ভাগে বিভক্ত। এই বিভক্তি মালিকানা, বেতন-ভাতা ও ঢাকা ও ছোট শহরের সাংবাদিকতাসহ বহু ধারায় বিভক্ত। প্রতিদিনের সাংবাদিকতায় আজ অন্যতম অনুষঙ্গ অবদার সাংবাদিকতা। রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে আবদারের সংখ্যা বেড়েছে। এই আবদারের সাংবাদিকতা স্বাধীন সাংবাদিকতায় এক নতুন প্রতিবন্ধকতা। প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, প্রতিটি সংবাদপত্র স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। যাতে করে একজন সাংবাদিক সহজেই বুঝতে পারেন, তার প্রতিষ্ঠান কী নীতিমালা অনুসরণ করে। প্রতিটি সাংবাদিকদের উচিত তাদের সম্পদের বিবরণী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া। এতে করে সাংবাদিকেরা সহজেই অন্যদের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন।
ইউনেসকোর অফিস ইনচার্জ কিচি ওয়েসু বলেন, ইউনেসকো ভাব ও বাক্ প্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্য অধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। স্বাধীন ও বহুমাত্রিক গণমাধ্যম বিকাশ ইউনেসকোর অন্যতম কাজের ক্ষেত্র। আগামী দিনে সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়নে ইউনেসকো কাজ করতে চাই। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব শাবান মাহমুদ বলেন, সাংবাদিকদের বিভক্তি এমন প্রকট আকার ধারণ করে যে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা উভয় সংকট পড়ছি।
অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস সাংবাদিকতার পেশাগত উৎকর্ষের জন্য প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একাত্তর টেলিভিশনের হেড অব নিউজ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে বিভত্তি দূর করে মানসম্মত সাংবাদিকতা চর্চা নিশ্চিত করা গেছে। গণমাধ্যম আগামী দিনে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে। যাত্রীর উপদেষ্টা জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী বলেন, সাংবাদিকতা সেবাধমী পেশা; এটা ব্যবসাধর্মী হলো তা আদর্শচ্যুত হয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ইশফাক এলাহী চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও যাত্রীর প্রধান নির্বাহী জামিল আহমেদ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়।

অদক্ষ মন্ত্রীদের চালিয়ে নিতে সাত উপদেষ্টা ?


সাত উপদেষ্টা

প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় কাজ করছেন সাত উপদেষ্টা। এর আগে কোনো সরকারেই এত উপদেষ্টা দেখা যায়নি। কোনো উপদেষ্টাকে এত সরব থাকতেও দেখা যায়নি। উপদেষ্টাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিও নেই। কিন্তু বিধান (রুলস অব বিজনেস) পাল্টে সরকার  সাত উপদেষ্টা নিযুক্ত করেছে। এমনকি রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজেও তারা অংশগ্রহণ করছেন। উপদেষ্টা নিয়োগের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই চলছে নানা বিতর্ক। বিরোধী দলগুলোতে তো বটেই, এমনকি সরকারি দলেও রয়েছে উপদেষ্টাদের কার্যক্রম ও ক্ষমতার অনুশীলন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ-বিক্ষোভ। অভিযোগ রয়েছে তারাই চালাচ্ছেন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী, সচিব শুধু রুটিন ওয়ার্ক করছেন। মহাজোট সরকারে কেন এত উপদেষ্টা? কী তাদের কাজ? তারা কি সরকার ও জনগণের আদৌ কোনো কাজে লাগছেন? না কি একদিকে সরকারকে নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিতর্কিত করছেন, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উস্কে দিচ্ছেন? সাত উপদেষ্টার কার্যক্রম এবং সরকার ও জনমনে তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া অনুসন্ধান করে লিখেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন

ঘটনা ১ : ৮ মার্চ ২০১২। স্থান জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলবিহীন জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের ব্যর্থতা নিয়ে কঠোর সমালোচনামুখর হয়ে উঠলেন। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনায় বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য, রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রæতি দিয়েছেনÑ ভোলায় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে। কিন্তু সরকারের তিন বছর পার হয়ে গেছে। এখনো কাজ শুরু হয়নি। সরকারি দল করি, এ জন্য সরকারকে কিছু বলতে পারি না। কিন্তু এলাকায় গেলে মানুষ নানা প্রশ্ন করে। বিদ্যুৎ, গ্যাস সমস্যা নিয়ে জনগণ জানতে চায়। এ বিষয়ে জনগণের প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না।’ এক উপদেষ্টার দিকে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করে তিনি আরো বললেন, ‘আমি আগেও বলেছি, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় কে চালায়? বিদ্যৎ উপদেষ্টাকে কৈফিয়ত দিতে হয় না। অথচ তার কথার বাইরে কিছুই হয় না।’

ঘটনা ২ : সরকারি দলের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। ৮ মার্চ সংসদ অধিবেশনে তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সকালে বিদ্যুৎ ছিল না। পানি তুলতে না পেরে বাথরুম করতে পারিনি। গোসল করাও হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করেছেন। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এই বিদ্যুৎ কোথায় যায়? উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। কারণ ওনার কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

ঘটনা ৩ : ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননও বিক্ষুব্ধ সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার কর্মকাণ্ডে। তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট, শুল্ক কাঠামো, টিপাইমুখ বাঁধসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের উপদেষ্টারা এমনভাবে কথা বলেন, শুনে মনে হয় তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা নন, তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপদেষ্টা। উপদেষ্টা নামের সাবেক আমলারা বালখিল্যতা করছেন। তাদের কথা শুনে জনমনে হতাশা সৃষ্টি হয়।’

ঘটনা ৪ : জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। তিনিও সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে। ফেনী অভিমুখে লংমার্চের সময় বিভিন্ন পথসভায় তিনি সরকারের উপদেষ্টাদের যোগ্যতা ও বিচক্ষণতায় কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট মাসুল ও টিপাইমুখ বাঁধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যখন সরকারের উপদেষ্টারা বক্তব্য রাখেন তখন প্রশ্ন জাগে এরা কার উপদেষ্টা? এসব উপদেষ্টা বাংলাদেশের, না ভারতের মানুষ। তারা বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বলেন না। তারা বলেন ভারতের ¯^ার্থের কথা। এসব উপদেষ্টা কোথা থেকে এসেছেন? এসব উপদেষ্টা আমাদের দরকার নেই।’

ওপরের ঘটনাগুলোতেই প্রতিফলিত হচ্ছে উপদেষ্টাদের গ্রহণযোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পর্কে খোদ সরকারি দলের ও মহাজোটের বিভিন্ন রাজনীতিকের ধারণা। প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শদান ও মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি আনতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার সাতজন উপদেষ্টা নিয়োগ করা হলেও তাদের কার্যপরিধি ও কার্যক্ষমতা নিয়ে, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনবিচ্ছিন্নতা নিয়ে সর্বত্র প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও নানা বিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। এসব উপদেষ্টা সরকারের কাজে গতি আনা তো দূরে থাক বরং জগাখিচুড়ি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। যেসব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা আছেন সেসব মন্ত্রণালয়েরই অবস্থা এখন সঙ্কটাপন্ন। মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়া এসব উপদেষ্টার প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিরূপ মনোভাব আর উভয় পক্ষের অন্তর্দ্বদ্ব-সংঘাতের বিষয়টি গোপন থাকছে না। অনির্বাচিত, জনগণের কাছে দায়বদ্ধহীন, জবাবদিহিমুক্ত সাবেক আমলা বা সমগোত্রীয় ব্যক্তি এসব উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মন্ত্রীদের মতবিরোধ গত প্রায় সাড়ে তিন বছরে প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। সংবিধানবহির্ভূত এসব উপদেষ্টার দায়িত্ব ও ক্ষমতার কোনো সীমারেখা না থাকায় তারা মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর কাজে হস্তক্ষেপ করে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কথায় মন্ত্রণালয় চলছে। সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন উপদেষ্টারা। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলে মন্ত্রীরাও এদের জবাবদিহিতা ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো কিছু বলতে পারছেন না।

উপদেষ্টাদের নিয়োগ ও নির্বাহী কাজে অংশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকলেও তারা রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজে অংশ নিচ্ছেন নিয়মিত। সাংবিধানিক অধিকার না থাকলেও তাদের অ¬নভিপ্রেত হস্তক্ষেপ নিয়ে মন্ত্রীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। উপদেষ্টাদের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও। তারা বলছেন, সংবিধান যেখানে মন্ত্রীকেই মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে সেখানে মন্ত্রণালয়ের কাজে উপদেষ্টার ভূমিকা কী? তাদের নিয়োগ দিয়েই বা সরকার কতটুকু লাভবান হচ্ছে? তাদের অবস্থানইবা কোথায়? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। উপদেষ্টাদের কার্যকলাপ দেখে প্রায়শই মনে হয় তারা মন্ত্রীদের ওপরে। যদিও তাদের সাংবিধানিক পদের কোনো ভিত্তি নেই।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন ডা. এসএ মালেক। তিনি অবশ্য কোনো মন্ত্রণালয়ে খবরদারি করেননি। তার কার্যক্রম নিয়ে তেমন একটা প্রশ্নও দেখা দেয়নি। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর হারিছ চৌধুরী হন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব। তিনি রাজনৈতিক উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। তিনি এ পদকে ক্ষমতা ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। হাওয়া ভবনের সঙ্গে যোগসাজশে দেশ পরিচালনার নতুন কিন্তু বাজে রেকর্ড তৈরি করেন। হাওয়া ভবন ও হারিছ চৌধুরীই এ সময় প্রশাসন পরিচালনা করেন। এ সময় আরো পাঁচ উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের কর্মকাণ্ড জনগণ তেমন জানতে পারেনি। তারা প্রশাসনে খবরদারিতে লিপ্ত ছিলেন না।

২০০৮ সালে নির্বাচনে মহাজোট ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাতজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। এরা হলেন- জনপ্রশাসন উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মে. জে. (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরাসরি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কোনো উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা ও পরামর্শ দিতে এ সাতজনকে নিয়োগ দেন। এ সাত উপদেষ্টার হাতে ন্যস্ত করা হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে কয়েকটি দফতরও বণ্টন করা হয়। এ দায়িত্ব বণ্টনের পর উপদেষ্টা ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বিপরীত মেরুর বাসিন্দা বনে যান। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, শিক্ষা, জ্বালানি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

দ্বদ্বস্থল : শিক্ষা মন্ত্রণালয়

সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিন আহমেদের মধ্যে দ্বদ্ব এবং সমণ্নয়হীনতা এত চরমে পৌঁছে যে, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তাদের কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেন ¯^য়ং প্রধানমন্ত্রী। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে উপদেষ্টার সম্পর্কের অবনতি ঘটে ২০১০ সালে। এ অবস্থার পরিবর্তন এখনো হয়নি। বরং শিক্ষামন্ত্রীর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আরো সঙ্কুচিত হয়েছে। বদলি, পদোন্নতি ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন-সংক্রান্ত সব কাজই এখন চলছে উপদেষ্টার নেতৃত্বে। এতে মন্ত্রী অনেকটা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছেন। মন্ত্রী-উপদেষ্টার সমš^য়হীনতার সুযোগে বেড়ে গেছে তদবির বাণিজ্য। উপদেষ্টা নিজে আওয়ামীপন্থী শিক্ষাবিদ হওয়ায় এবং শিক্ষামন্ত্রী বাম ঘরানার রাজনৈতিক দল থেকে আগত বিধায় সরকারের রাজনৈতিক আস্থা তুলনামূলকভাবে উপদেষ্টার ওপর অনেক বেশি। এছাড়া নেতাকর্মীরাও উপদেষ্টার সঙ্গেই বেশি ¯^াচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ হলো, তিনি তার সাবেক দলের অনুসারীদের পদোন্নতি, পোস্টিং বেশি দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বামপন্থীদের প্রতি বিশেষ দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে। মন্ত্রী-উপদেষ্টার এ রকম টানাপড়েনে সিদ্ধান্তগ্রহণ ও বাস্তবায়নে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

অদক্ষ মন্ত্রীদের চালিয়ে নিতে

সাত উপদেষ্টা

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিন উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছিল। আর বিএনপি সরকারের সময় পাঁচ উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। এবারই সর্বোচ্চ সাত উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে। সংসদীয় ব্যবস্থায় উপদেষ্টা নিয়োগের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই। কিন্তু গত কয়েকটি সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নামে সরকারে উপদেষ্টা নিয়োগ হয়েছে। উপদেষ্টারা রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজে অংশ নেয়ায় সংসদীয় সরকারের ধরন বিকৃত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, অধিকাংশ নতুন রাজনীতিকদের নিয়ে এবারের মন্ত্রিপরিষদ সাজানো হয়েছে। অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নতুনদের নিয়ে সাজানো মন্ত্রিসভাকে অধিকতর কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের তদারক ও পরিচালনায় সহায়তার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। তবে সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলের বাঘা বাঘা নেতা সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় প্রধানমন্ত্রী কারো ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। তাই অপেক্ষাকৃত তরুণ ও অদক্ষ নেতাদের নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেছেন এবং এটিকে সক্রিয় রাখার জন্য তাদের ওপর উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। অর্থাৎ সিনিয়র নেতাদের কর্মদক্ষতার পরিপূরক হিসেবে উপদেষ্টাদের কর্মদক্ষতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

দ্বদ্বস্থল : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

জনপ্রশাসন চালাচ্ছেন উপদেষ্টা সাবেক সচিব এইচটি ইমাম। প্রভাবশালী এই উপদেষ্টা ওয়ান-ইলেভেনের পর মহাজোটের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান হয়ে লাইমলাইটে আসেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বপালনরত অবস্থায় স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তিনি খোন্দকার মোশতাক আহমদ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। যে কারণে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী তাকে সহজভাবে নেয়নি। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে তিনি আবার আলোচনায় উঠে আসেন। এবং সরকারের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন। অভিযোগ মহাজোট সরকার গঠনের পর তার নির্দেশেই জনপ্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী এই উপদেষ্টা নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ঘিরে দলের কাছেই বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। যে কারণে  সরকারের ওপর প্রশাসনে ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে।

কথিত আছে, সেনা নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে প্রভাব বিস্তার করে আছেন প্রধানমন্ত্রীর সামরিক বিষয়ক উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) তারেক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি ক্ষমতাবান একজনের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে সেনা প্রশাসনে একক ক্ষমতা দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় তার নির্দেশেই পরিচালিত হয়ে থাকে।

মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বৈত শাসনের অবস্থা সৃষ্টি

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, কোনো কোনো উপদেষ্টার খবরদারির কারণে মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্বৈত শাসনের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থাকার পরও উপদেষ্টা কাজ করছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যাত্রা শুরু হয় একজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টার মাধ্যমে। শুরু থেকে এ মন্ত্রণালয়ের কাজে এক ধরনের বিশৃক্সখল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের কাজ নিয়ে উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ও মন্ত্রীর মধ্যে বিশেষ করে নিয়োগ-বদলি ও অন্য বিষয় নিয়ে মতবিরোধ ছিল। এক পর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের বহু বিষয়ে উপদেষ্টার হস্তক্ষেপের কারণে কাজ করতে পারছেন না বলে মন্ত্রী নালিশ করেন। এদিকে গত ১৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ওএসডি করে। ২১ ডিসেম্বর মন্ত্রী ওই কর্মকর্তার বদলি বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রাখার জন্য অনানুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র দিয়েছেন সংস্থাপন সচিবকে। আবার একই দিনে প্রতিমন্ত্রী ওই কর্মকর্তাকে ড্যাবের নেতা জাহিদ হোসেনের আশীর্বাদপুষ্ট উল্লেখ করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের আদেশ বহাল রাখতে সচিবকে আরেকটি অনানুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র দেন। ওই কর্মকর্তা ড্যাবের চাহিদাপত্র অনুযায়ী বিএনপি সরকারের সময় স্বাস্থ্য ক্যাডার থেকে প্রশাসনে এসেছিলেন। তার কারণেই বিশ্বব্যাংকের দেয়া হতদরিদ্র মানুষের পথ্য কেনার ৪৫০ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে বলে প্রতিমন্ত্রীর পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চিকিৎসক, নার্স নিয়োগ-বদলি নিয়ে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) একদিকে আর উপদেষ্টা-প্রতিমন্ত্রী ও বিএমএ অন্যদিকে অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সাধারণ কর্মকর্তাদের কাজ করতে হচ্ছে নাজুক এক পরিস্থিতিতে। মন্ত্রী এক কথা বললে উল্টোটা বলেন প্রতিমন্ত্রী, না হয় উপদেষ্টা। ওয়ান-ইলেভেনের সময় এই উপদেষ্টা কারাবন্দি শেখ হাসিনার চোখের ডাক্তার হিসেবে, পরে কানের বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার চোখ ও কানের সমস্যা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে তিনি সকলের নজরে আসেন। তখন থেকেই তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়

এ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন একজন উপদেষ্টা এবং একজন প্রতিমন্ত্রী ও দুজন সচিব। এখানে নির্বাহী কর্তৃত্ব মূলত উপদেষ্টার হাতে। প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদের তেমন কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সাবেক আমলা ড. তৌফিক-ই এলাহী বীরবিক্রম বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত দেন, সেসবই বাস্তবায়ন করে থাকেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী এই উপদেষ্টা যতটা না দেশের ¯^ার্থের জন্য তৎপর তার চেয়ে বেশি তৎপর বিদেশিদের খুশি করতে। বিদ্যুৎ সেক্টর নিয়ে তিনি যেসব কাজ করেছেন তা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই সন্তুষ্ট নন। কুইক রেন্টালের নামে যা করা হচ্ছে তার সঙ্গে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই একমত নন। যে কারণে জাতীয় সংসদে তার বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরোধিতা করে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য রেখেছেন।

উপদেষ্টাদের কার কী কাজ

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সাত উপদেষ্টার মধ্যে এইচটি ইমামকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কার্যাবলীর সমণ্নয়কারী ও সংস্থাপন মন্ত্রণালয়সহ আটটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে কাজ করেন তিনি। সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির সব কিছুই হচ্ছে এইচটি ইমামের ইশারায়। রেকর্ডসংখ্যক মেধাবী কর্মকর্তাকে ওএসডি, প্রকৃত মেধাবীদের বাদ দিয়ে কম মেধাবীদের দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি প্রদানের ঘটনা ঘটিয়ে সরকারকে বিতর্কিত করার পেছনে একজন উপদেষ্টার হাত রয়েছে বলে সরকারের একটি অংশ মনে করছে।

এ ছাড়া সাবেক সচিব ড. মসিউর রহমানকে ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান সমš^য়কারীসহ ছয়টি বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মোদাচ্ছের আলীকে স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ পাঁচটি বিষয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আলাউদ্দিন আহমেদকে শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়নসহ চারটি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি ও জোট আমলে চাকরিচ্যুতদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সাবেক সচিব তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গওহর রিজভীকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ চারটি বিষয়, শেখ রেহানার দেবর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকীকে প্রতিরক্ষা বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হলেও সরকারের নির্বাহীমূলক বিভিন্ন কাজে তাদের অংশগ্রহণের মাত্রা এতই বেশি যে, গত পৌনে তিন বছরে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রায় সব বৈঠকে তারা উপস্থিত থেকেছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, মন্ত্রিসভায় যেহেতু অনেক গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাই যারা গোপনীয়তার শপথ নেননি, তাদের উপস্থিত থাকা অযৌক্তিক।

মন্ত্রী বড় না উপদেষ্টা

এ অবস্থায় মন্ত্রী বড় না উপদেষ্টা- এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উপদেষ্টাদের অতিমাত্রায় খবরদারিই এ ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংবিধান যেখানে মন্ত্রীকেই মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে অনেক মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন উপদেষ্টারা। মন্ত্রীরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছেন। কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের ধারণা, মন্ত্রীদের অদক্ষতার সুযোগে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন উপদেষ্টারা, বড় বড় নিয়োগ বদলি হচ্ছে তাদের হাতে। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এসব ব্যাপারে কিছু জানতেও পারেন না। যেমন বিমানমন্ত্রী সারা দিন সচিবালয়ের কাজকর্ম করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে টেলিভিশনের খবরে জানতে পারেন, তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বদলি করে সেখানে নতুন একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার মন্ত্রণালয়ের বদলির ঘটনা, অথচ তিনি কিছুই জানতে পারলেন না! সঙ্গত কারণেই তিনি ফোন করে সচিবকে। সচিবও এ ব্যাপারে তার অজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, তিনিও টেলিভিশনেই বিষয়টি জানতে পেরেছেন। মন্ত্রী পর দিন সকালেই ছুটে যান প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী তখন তাকে জানান, তিনি বিষয়টি অবগত আছেন। তাকে জানিয়ে উপদেষ্টা এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।

সম্প্রতি ভারতকে দেয়া ট্রনজিট সুবিধা থেকে অর্থ আদায় প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী এবং অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা দুধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ভারতকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট দেয়ার পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য প্রথম থেকেই বলা হচ্ছিল, ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশ মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জনে সক্ষম হবে। এমন বলা হয়েছিল, ট্রানজিট বাবদ আয় থেকে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে পরিণত করা যাবে। যখন জানা গেল ট্রানজিট থেকে শুল্ক বা ফি আদায় আন্তর্জাতিক নীতিবিরুদ্ধ, তখনও অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত বললেন, ট্রানজিট বাবদ একটা কিছু পাওয়া যাবেই। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান আপত্তি তুললেন। ট্রানজিট বাবদ ভারতের কাছ থেকে তিনি কিছুই নিতে নারাজ। কিছু নেয়াটা হবে তার ভাষায় ‘অভদ্রতা’। তার ভাষায় বাংলাদেশ এখন সভ্য দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত। ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে কিছু নিলে বাংলাদেশ অসভ্য দেশে পরিণত হবে। এমন অভদ্রতা আমরা করতে পারি না।

এরপর অর্থমন্ত্রী মুহিত এ বিষয়ে আর কোনো বক্তব্য দেননি। কারণ উপদেষ্টার বক্তব্যের পর মন্ত্রীর আর কিছু বলার সুযোগ ছিল না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তি হয়েও মন্ত্রী চূড়ান্ত কথা বলার অধিকার রাখেন না। এমনই বেহাল অবস্থা চলতি সংসদীয় গণতন্ত্রের। এর আগেও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সময় উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও মন্ত্রী মুহিত পরস্পরবিরোধী কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত যখন শেয়ারবাজারে টাকা হারানো হতভাগ্য মানুষদের প্রতি মৃদু ভাষায় সহানুভূতির প্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন তখন মসিউর রহমান অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বলেন, ‘ওদের প্রতি কোনো সহানুভূতি নয়। ওরা সব ফাটকাবাজ। যে টাকা ওরা শেয়ারে খাটিয়েছে, সেসব টাকা ওদের অবৈধ পন্থায় উপার্জন করা।’ এরপর থেকে অর্থমন্ত্রীও উপদেষ্টার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের কাজেই উপদেষ্টারা ইদানীং খবরদারি শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে তারা এটা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের এই অযাচিত হস্তক্ষেপে মন্ত্রী-সচিবরা ¯^াধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এর ফলে নতুন করে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

সাক্ষাৎকার

হাসানুল হক ইনু, এমপি, সভাপতি, জাসদ

প্রধানমন্ত্রীর কতিপয় উপদেষ্টার কথাবার্তা ও মন্তব্য দেশের মানুষের মনে যেমন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তেমনি তাদের ক্ষুব্ধ ও হতাশও করেছে। সীমান্তে বাংলাদেশি ট্রানজিট, তিস্তায় পানি বণ্টন, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি ইস্যুতে এসব উপদেষ্টার বক্তব্যে তাদের নাগরিকত্ব ও দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উপদেষ্টাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে ভারতের কোনো মন্ত্রী বা বিএসএফপ্রধান বক্তব্য দিচ্ছেন। ট্রানজিট প্রশ্নে দেখা গেছে, ট্রানজিট পেতে ভারতের যতটা আগ্রহ তার চেয়ে ট্রানজিট দিতে আমাদের উপদেষ্টারা আগ্রহ অনেক বেশি দেখিয়েছেন। ভারতের মন্ত্রীরা ট্রানজিটে মাসুল দিতে চাইলেও আমাদের এক উপদেষ্টা মাসুল ছাড়াই ট্রানজিট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই উপদেষ্টারা কার স্বার্থ দেখছেন বাংলাদেশের, না ভারতের। তারা যদি দেশের স্বার্থ না দেখেন তাহলে ওই  পদে থেকে কাজ করা উচিত  নয়।

রাশেদ খান মেনন, এমপি, সভাপতি, ওয়ার্কার্স পার্টি

উপদেষ্টারা কতটা যোগ্য  ও দক্ষ তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাদের দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উপদেষ্টারা তাদের কাজের মাধ্যমে যতটা না মন্ত্রণালয়ে গতিশীলতা সৃষ্টি করেছেন তারচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি  করেছেন। অনেক উপদেষ্টাই বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেন। তাদের আচরণ দেখে মনে হয় ভারতীয় স্বার্থরক্ষায় তারা নিরলসভাবে কাজ করছেন। আমি মনে করি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর অনির্বাচিতদের খবরদারি করার সুযোগ দেয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কারণ বিপদে উপদেষ্টাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ড. কামাল হোসেন, সভাপতি, গণফোরাম

প্রধানমন্ত্রী তার  কাজের সুবিধার জন্য সাত উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। এত বেশি উপদেষ্টা এর আগে দেখা যায়নি। উপদেষ্টারা রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজে অংশগ্রহণ করছেন। যেটা আগে দেখা যায়নি। সাত উপদেষ্টাই সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এই প্রভাব বিস্তার সরকারের জন্য ইতিবাচক কিছু বয়ে আনছে না। উপদেষ্টাদের কর্মকাণ্ডে জনগণ খুশি নয়। সরকার ও সরকারি দলে উপদেষ্টা গ্রহণযোগ্যতা লোপ পেয়েছে। সংবিধানে এ জাতীয় কোনো পদে নেই। মন্ত্রণালয়ের

ড. শাহদিন মালিক, বিশিষ্ট আইনজীবী

উপদেষ্টারা হলেন অনির্বাচিত, জনগণের কাছে দায়বদ্ধহীন এবং সব ধরনের জবাদিহিতামুক্ত। সংবিধানে এ ধরনের কোনো পদ নেই। আমার জানা মতে কোনো বিধিও নেই। সন্দেহ দূর করতে কোন বিধি বা নীতিমালার ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ বা দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এবং বেতনভাতার কী সুবিধা দেয়া হচ্ছে তা স্পষ্ট করে বলা সরকারের দায়িত্ব। কারণ উপদেষ্টাদের বেতনভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় জনগণের প্রদত্ত কর থেকে। সংসদীয় ব্যবস্থায় জবাবদিহি সরকারের বড় সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবিধানে যেহেতু উপদেষ্টা নিয়োগের কোনো বিধান নেই, তাই এটা এড়িয়ে চলাই সরকারের জন্য মঙ্গলজনক।

ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, চেয়ারম্যান, বিকল্পধারা বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সাত উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে  না। উপদেষ্টারা সরকারের কাজে গতিশীলতা আনতে পারছেন না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে জগাখিচুড়ি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে। যেসব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা আছেন সেসব মন্ত্রণালয়ের অবস্থা বেশি খারাপ। উপদেষ্টাদের ভাবসাব দেখে মনে হয় তারা মন্ত্রীর  ওপরে। এটা ঠিক নয়, তাদের পদের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। উপদেষ্টাদের হুকুমদারি ও খবরদারি মন্ত্রণালয়ের কাজ স্বাভাবিকভাবে চলার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করছে।

ড. অলি আহমদ, এমপি, সভাপতি, এলডিপি

উপদেষ্টাদের ছেলেমানুষিকতা দেখে দেশের মানুষ হাসাহাসি করে। ভারতকে ট্রানজিট দেয়া ও টিপাইমুখ বাঁধ প্রশ্নে উপদেষ্টাদের বক্তব্যে দেশের মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। উপদেষ্টাদের বক্তব্যে ও কাজে জবাবদিহি না থাকায় তারা দেশের ¯^ার্থবিরোধী কথা প্রকাশ্যেই বলতে পারেন। অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, জ্বালানি উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা কোন পরিচয় বহন করছে? তাদের প্রভাব এত বেশি যে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না। উপদেষ্টাদের কথায় আমার প্রশ্ন জাগে এসব উপদেষ্টা বাংলাদেশের, না ভারতের নাগরিক।

http://www.shaptahik-2000.com/?p=1261


সহজ প্রতারণা এমএলএম
কাওসার রহমান

এমন একটি সময় ছিল যখন ক্রেতার প্রয়োজনেই বিক্রেতাকে খুঁজে বের করা হতো। বিক্রেতা তার পণ্যের বাজার গড়ে তোলার জন্য, বিক্রি বাড়ানোর জন্য নানাভাবে ক্রেতাকে আকর্ষণ করত। এ পদ্ধতিকেই তখন বলা হতো এমএলএম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং। সে হিসেবে এমএলএম পদ্ধতি অনেক আগের- কিন্তু পুরনো সেই এমএলএম-ই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে প্রতারণার নতুন ফাঁদ। নতুন নতুন নামে চটকদার বক্তব্য দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি এই প্রতারণার ফাঁদ পাতছে

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতিকে একটি অপ্রচলিত বাজারজাতকরণ পদ্ধতি বলা চলে। বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যসহ ব্যবসায়িক জগতে অ্যাপল, মাইক্রোসফট, ওয়ালমার্ট, টাটা, টয়োটা, স্যামসাং প্রভৃতি কোম্পানি প্রচলিত বাজারজাত পদ্ধতি অনুসরণ করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রথম যুগে মানুষের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি, খাদ্য প্রভৃতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়ে প্রচার না থাকলেও ক্রেতার নিজস্ব প্রয়োজনে বিক্রেতা খুঁজে বের করার মাধ্যমে বাজার পদ্ধতি সংগঠিত হতো। খাদ্য পুষ্টির পরিপূরক বিকল্প খাদ্য উপাদান, প্রসাধনী, ওজন বাড়ানো বা কমানো দ্রব্যাদি প্রভৃতি অপ্রচলিত দ্রব্য বাজারে এলে এগুলো বিক্রয়ের জন্য  দ্রব্যের গুণাগুণ, ব্যবহারের লাভ-ক্ষতি বেশি বেশি করে ক্রেতার সামনে উপস্থাপন করার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু তৎকালীন সংবাদপত্র, টিভি মিডিয়া, বিজ্ঞাপনী মাধ্যম, বিলবোর্ড-পোস্টারের উদ্ভাবনী অক্ষমতার কারণে দ্রব্যের গুণাগুণ প্রচারের বিকল্প পদ্ধতিসহ বাজারজাতকরণ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসে দাঁড়ায়। সে সময়ে দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে সব ধরনের প্রচার পৌঁছাবার ব্যবস্থা ছিল না। সেখানে মানুষের মুখে প্রচারের মাধ্যমে বাজারজাতকরণের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। যেখানে কিছু ব্যক্তি কমিশনের বিনিময়ে দ্রব্যের ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও গুণাগুণ মুখে মুখে তার নিকটজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে প্রচার করে। দ্রব্যটি বিক্রয়ের জন্য তাকে নানাভাবে ক্রেতা আকর্ষণ করতে হয়। এ ধরনের মার্কেটিং পদ্ধতিকে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতি বলা হতো। কালক্রমে এ মার্কেটিং পদ্ধতির আরো নামকরণ হতে থাকেÑ যেমন ডাউনলাইন মার্কেটিং, ডিরেক্ট সেল মার্কেটিং, সেলুলার মার্কেটিং প্রভৃতি। সেই সময়কালে অপ্রচলিত দ্রব্য বাজারজাতকরণ কোম্পানি তাদের পণ্য বাজারজাতের প্রয়োজনে বিক্রেতা তথা ডিস্ট্রিবিউটর বা ক্রেতা তথা জনসাধারণকে আকৃষ্ট করার জন্য পিরামিড পদ্ধতি, অ্যারোপ্লেন গেম পদ্ধতি, ওয়ান টু ওয়ান পদ্ধতি, ডোর টু ডোর পদ্ধতি, অর্ডার অ্যান্ড ডেলিভারি পদ্ধতি প্রভৃতির প্রচলন করে।

এমএলএম-এর আভিধানিক সংজ্ঞা

বিজনেস ডাইরেক্টরি অনুযায়ী, এমএলএম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বলতে সেই মার্কেটিং পদ্ধতিকে বুঝাবে যেখানে কোনো কোম্পানির দ্রব্য বা সেবার কোনো ¯^াধীন প্রতিনিধি সরাসরি নিজে বিক্রয় করবে এবং সে নিজেই তার দল তৈরি করে প্রশিক্ষণের মাধামে অন্যান্য স¦াধীন বিক্রয় প্রতিনিধিদের দলভুক্ত করার মাধ্যমে বিক্রয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করবে। এ কারণে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে ডাউনলাইন মার্কেটিং  বা  সেলুলার মার্কেটিং বা ডিরেক্ট সেল মার্কেটিংও বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ ড. জন এমএল টেইলর ৪০০-এর বেশি এমএলএম কোম্পানি ও হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার ওপর ১৫ বছরের ধারাবাহিক গবেষণা ও পর্যালোচনা করে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা পিরামিড পদ্ধতি বা অ্যারোপ্লেন গেম সেলিং পদ্ধতি বা ডাউনলাইন মার্কেটিং পদ্ধতি থেকে ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মার্কেটিং পদ্ধতি বলেছেন। ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতিতে যেমন অর্ডার অ্যান্ড রিসিভ পদ্ধতি অনুযায়ী কোম্পানিকে ফোন করে বা ই-মেইল করে দ্রব্যের অর্ডার দিয়ে ঘরে বসে দ্রব্যটি পাওয়া যায়। ডোর টু ডোর পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট দ্রব্য নিয়ে মানুষের কাছে সরাসরি গিয়ে দ্রব্যের গুণাগুণ বর্ণনা করে বিক্রয় প্রতিনিধি ডোর টু ডোর দ্রব্য বিক্রয় করে। টেলিমার্কেটিং পদ্ধতিতে টেলিফোনে ক্রেতাকে দ্রব্য সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আকৃষ্ট করে বিক্রয় করা হয়। এ সব মার্কেটিং পদ্ধতি  আইনগতভাবে স¦ীকৃত। রাষ্ট্র বা জনগণ কারো এ ধরনের ব্যবসা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকে না। কিন্তু পিরামিড পদ্ধতি বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা ডাউনলাইন মার্কেটিং বা চেইন মার্কেটিংয়ে শেষের ক্রেতাদের শূন্য হাতে ফিরতে হয় বলে রাষ্ট্র ও জনগণের এ ধরনের মার্কেটিং নিয়ে এত আপত্তি।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের ইতিহাস

১৯৪১ সালে সর্বপ্রথম ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ভিটামিন কোম্পানি তাদের অপ্রচলিত ভিটামিন বাজারজাতকরণের জন্য মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির মার্কেটিং শুরু করে। সমসাময়িক অন্যান্য বিখ্যাত কোম্পানি যেমনÑ ফোর্ড, ক্যাটারপিলার প্রভৃতি, তারা এ ধরনের মার্কেটিং পদ্ধতির মাঝে কোনো উৎসাহ খুঁজে পায়নি। কেননা ক্রেতা তার প্রয়োজনেই যাচাই-বাছাই করে দ্রব্যটি কিনবে এ ব্যাপারে বড় বড় কোম্পানি আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু মানহীন অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর এই আত্মবিশ্বাস ছিল না।

বিশ্বে এ পর্যন্ত যত এমএলএম কোম্পানি দেখা যায় তাদের বেশিরভাগেরই  দ্রব্য হলো অপ্রচলিত দ্রব্য যেমনÑ খাদ্য পরিপূরক, বলবর্ধক, ওজনহ্রাসক, সৌন্দর্যবর্ধক প্রভৃতি। মূলত এ ধরনের অপ্রচলিত দ্রব্যের বাজারজাতের ক্ষেত্রে এই এমএলএম পদ্ধতির মার্কেটিং বেছে নেয়া হয়। অথবা বলা যায় এমএলএম ব্যবাসীয়রা এ ধরনের অপ্রচলিত তাদের ব্যবসার বিষয় হিসেবে বেছে নেয়। অপ্রচলিত দ্রব্য যেহেতু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নয়, তাই এ জাতীয় দ্রব্যের অনেক গুণাগুণ বর্ণনা করে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিশ্বাসকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে হয়।

অন্যদিকে অপ্রচলিত দ্রব্যের গুণাগুণ ও মূল্য যাচাই করার সুযোগ খুব একটা থাকে না। ফলে কোম্পানি তার বিক্রীত দ্রব্য ইচ্ছামতো মূল্যে বিক্রয় করে, যাতে বিক্রয় প্রতিনিধিকে খুশি করার মতো পরিমাণে লাভ ওই বিক্রীত দ্রব্য বিক্রয় করা থেকে কোম্পানিটি তুলে নিতে পারে।

বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত রাষ্ট্রে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা প্রথম যখন তার যাত্রা শুরু করে সে সময় এই ব্যবসা পদ্ধতিটি অপ্রচলিত হওয়ায় দেশের সরকার বা জনগণ এই ব্যবসার সম্পর্কে ভালো-মন্দ কিছু জানত না বা বুঝতে পারত না। পরবর্তী সময়ে জনগণ বারবার প্রতারিত হতে থাকলে রাষ্ট্র আইন করে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতি জনসাধারণের স¦ার্থবিরোধী না হওয়ায় রাষ্ট্রগুলো এ পদ্ধতির মার্কেটিংকে অনুমোদন দিয়েছে। যদিও ধূর্ত এমএলএম ব্যবসায়ীরা ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির মার্কেটিং  এবং মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে একই জিনিস বলার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে পদ্ধতি দুটির মাঝে সূ² পার্থক্য রয়েছে। ডাইরেক্ট সেলিং মার্কেটিংকে ওয়ান টু ওয়ান পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বলা হয়, যা মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের অন্যান্য পদ্ধতি যেমন পিরামিড পদ্ধতি, ডাউনলাইন পদ্ধতি, চেইন পদ্ধতির চেয়ে একেবারেই ভিন্নতর। মূলত মার্কেটিং পদ্ধতিগুলো এতই অপ্রচলিত যে, মার্কেটিংয়ের ওপর পড়াশোনা করা ব্যক্তি বা গবেষকদেরও অনেক সময় বিষয় দুটির পরিষ্কার পার্থক্য বুঝতে কষ্ট হয়। আর জনসাধারণ ও রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের জ্ঞানের ঘাটতির সুযোগ নেয় ধূর্ত এমএলএম ব্যবসায়ীরা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা-দুর্ঘটনার পর রাষ্ট্র ও জনগণ বুঝতে শিখে  এবং অতঃপর আইন করে এমএলএম ব্যবসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, পুর্তগাল, অস্ট্রিয়া, জাপান, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, নেপালসহ ৫২টি দেশে পিরামিড পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিং সরকারিভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে।  এমএলএম ব্যবসার বিভিন্ন প্রতারণার ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, সুইডেন প্রভৃতি দেশে এমএলএম কোম্পানির বিরুদ্ধে দেশগুলোর সরকার মামলা করেছে, কোম্পানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, জরিমানা আদায় করেছে। এমনকি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) তাদের ওয়েব পেইজে জনসাধারণকে এমএলএম কোম্পানির প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকার নির্দেশনামূলক হুশিয়ারি দিয়ে একটি পেইজ বরাদ্দ রেখেছে। চীনে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের প্রতারণার পর এমএলএম ব্যবসা বন্ধের দাবিতে ১৯৯৮ সালে জনরোষ থেকে চীনে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে চীন সরকার এমএলএম ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরির কাজ শুরু করে ও ২০০৫ সালে ডাইরেক্ট সেলিং আইন তৈরি করে। টেলিফোন বা ইন্টারনেটে অর্ডার দিয়ে হোম ডেলিভারি গ্রহণ, ডোর টু ডোর মার্কেটিং, টেলি মার্কেটিং, ডিট্টো মার্কেটিং প্রভৃতি পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে বৈধতা দেয়। আর অবৈধ ঘোষণা করে ডাউন সেলিং, চেইন সেলিং, পিরামিড পদ্ধতি প্রভৃতি মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে। বৈধ ঘোষণা করা ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির মার্কেটিংয়ে শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী ও সরকারি কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করতে পারবে না মর্মে আইন জারি করে।

বাংলাদেশে এমএলএম কোম্পানির ইতিহাস

১৯৯০ সাল থেকে নগদ অর্থ দিয়ে সদস্য হয়ে আবার অন্যকে সদস্য করার মাধ্যমে প্রাপ্ত কমিশন থেকে নিজের মূলধন তুলে নিয়ে পরবর্তী দীর্ঘ ধাপগুলোতে রীতিমতো কোটিপতি বনে যাওয়ার স¦প্ন দেখিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠে নগদ অর্থকে দ্রব্যের হিসেবে পিরামিড পদ্ধতির উদ্ভট এক মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসা। এর পর সরকার জনগণের স¦ার্থ রক্ষার্থে ও পরস্পর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ লাঘবে নগদ অর্থ দিয়ে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। ওই সময়ের ধূর্ত এমএলএম ব্যবসায়ীরা ভোল পাল্টে নগদ অর্থের স্থলে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত নিম্নমানের দ্রব্য, গাছ বিক্রয়, জমি বাড়ি বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানির সদস্য করা প্রভৃতি পদ্ধতি ব্যবহার করে। মূলত ওই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে একই রকমভাবে বর্তমানে এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু নগদ অর্থের বদলে গাছ  বা নিম্নমানের দ্রব্যের নাম বলা হয়। বিক্রীত দ্রব্য কোনো কাজে লাগুক বা না লাগুক, ক্রেতার ক্রয়কৃত গাছ আগামী ১০/২০ বছরে চোখে দেখা যাক বা না যাক লেনদেন হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কেউ আবার কল্পিত ব্যাংকে গচ্ছিত সোনা, কবরস্থান, বসবাসের জন্য জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট বিক্রয় করেছে এমএলএম পদ্ধতিতে। সবারই লক্ষ্য ছিল একটাই জনগণের কাছ থেকে নগদ অর্থ, আমানত, সঞ্চয়ের অর্থ সংগ্রহ। তাতে যে দ্রব্য, যে নামে, যে পদ্ধতির কথা বলতে পেরেছে, এমএলএম ব্যবসায়ীরা সেটাই করেছে। ক্রেতা হিসেবে জনসাধারণের কাছে কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার জন্য কোম্পানিগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবসার অংশীদার করেছে, চাকরি দিয়েছে বা বড় বড় ক্রীড়া অনুষ্ঠান বা কালচারাল ইভেন্ট স্পন্সর করেছে। জনসাধারণের কাছ থেকে প্রাপ্ত আমানত দিয়ে দেশ-বিদেশে কোম্পানির গুটিকতক ব্যক্তির নামে সম্পদ করা হয়েছে। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার  হয়েছে। আবার জনসাধারণ যখন তাদের আমানত ফেরত আনতে গেছে তখন কোম্পানিগুলো কিছুদিন পর অফিস বন্ধ করে গায়েব হয়ে গেছে।

অন্যদিকে ওয়েবপেজনির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্লিক ডটকম, সেল বাজার ডটকম প্রভৃতির মতো ইন্টারনেট ভিত্তিক ডাইরেক্ট সেলিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ডোর টু ডোর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমনÑ মার্কেট অ্যাকসেস, মার্কেট রিসার্চ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির অন্তর্গত ডাইরেক্ট সেলিং ব্যবসা (ডোর টু ডোর, অর্ডার অ্যান্ড সাপ্লাই) পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো ধরনের প্রতারণা ছাড়াই দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে এদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির নিজস¦ কোনো অপরাধ নেই। ব্যক্তিবিশেষে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির অন্তর্গত প্রতারণামূলক পদ্ধতি, বিভিন্ন নামে প্রকৃত অর্থে বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ পিরামিড পদ্ধতির ব্যবসা পরিচালনা করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করছে

দেশে দেশে পদক্ষেপ

মূলত উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো এমএলএম ব্যবসা জেঁকে বসে ১৯৬০ সাল থেকে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ১৯৯৫ সালের দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনসাধারণ বুঝতে পারে যে, তারা প্রতারিত হচ্ছে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোর দ্বারা। এরপর তুমুল আন্দোলন ও জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। অবশেষে ২০০০ সালের পর থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে এমএলএম ব্যবসা নিষিদ্ধ হতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার ¯^র্ণযুগ চলছে। নাম জানা না জানা অনেক এমএলএম কোম্পানি হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো যেভাবে লাখ লাখ লোকের প্রতারণার পর এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা তাদের দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশেও এরই মধ্যে লাখ লাখ মানুষ এমএলএম কোম্পনিগুলোর কাছে প্রতারিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন প্রভৃতি দেশের মতো গণরোষ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা হওয়ার পর মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির ব্যবসাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পূর্বে  কম ক্ষতিকে মেনে নিয়ে যত অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব মাল্টি লেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির ব্যবসাকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জনসাধারণের বিশ্বাসের সুযোগ ব্যবহার করে তাদের প্রতারিত হওয়ার  হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন।

২০০০ সালের পর থেকে সারা বিশ্বে ৫৩টি উন্নত রাষ্ট্রে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৮০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসার স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা হয়। এ সময়কালে উন্নত বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিবিদও এমএলএম ব্যবসার ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মানুষের প্রতারণা, মামলা ও হামলার মাধ্যমে শেষ হয় এমএলএম ব্যবসার স্বর্ণযুগ। এই সময়ের মধ্যে উন্নত বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান গ্রহণকারী এমএলএম কোম্পানিগুলো তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের নামে ওয়ার্ল্ড ফুটবল চ্যালেঞ্জ আয়োজন, আমেরিকান যুব সকার প্রতিযোগিতা আয়োজন, ফুটবল দল এফসি বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়া  সিএফ, স্যান্তোস এফসি, এফসি স্পরটেক মস্কো, মেক্সিকোর পুমা ও মান লুইস, ইসরায়েলের ম্যাককাবি, পোল্যান্ডের উইসলা কারলো ও ইতালির বোটাফাগো রেগাটাসের মতো দলের স্পন্সরশিপ নেয়। এভাবে তৎকালীন হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এমএলএম কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে বেছে বেছে এমন বিষয়ে অর্থ খরচ করতে থাকে যেখানে খরচ করলে সহজেই প্রচার পাওয়া যায়। এরপর ক্রেতা-ভোক্তা ও ডিস্ট্রিবিউটরদের এ নবাগত ব্যবসার ওপর বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপনের জন্য বলতে থাকে যেÑ আমাদের কোম্পানি আর দশটি বড় কোম্পনির মতো রাষ্ট্র দ্বারা স্বীকৃত ও গ্রহণ যোগ্য কোম্পানি, না হলে আমরা কীভাবে সরকারের ও সবার সামনে সরকারি ও বেসরকারি লোকদের নিয়ে এত বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারছি। এরপর ভোক্তা-ক্রেতা-ডিস্ট্রিবিউটররা কোম্পানির ওপর আস্থা অর্জন করে, একইভাবে এমএলএম কোম্পানিটি সমাজের ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে যায় ও তার ব্যবসার নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করে। কিন্তু এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০০ সালের পর সারা বিশ্বের প্রতারিত লাখ লাখ মানুষের জনরোষের কাছে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী ও সরকার মাথানত করত বাধ্য হয়েছে। ওই সব দেশে এমএলএম কোম্পানির প্রতারণামূলক ব্যবসাকে বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে।

যাকে নিয়ে এত ঘটনা

বাংলাদেশে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড, নিউওয়েসহ বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে বিভিন্ন ক্রীড়া অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে কোটি টাকা খরচ করে স্পন্সর প্রদান, কোটি টাকা খরচ করে বিপিএল, টি-২০ টুর্নামেন্ট আয়োজন, ভারতীয় চিত্রজগতের লোকদের এনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বড় মধ্যম ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে দেখা যায়। সরকারের উপদেষ্টা মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, উচ্চপদস্থ সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা, এসপি, ডিসিদের দিয়ে ওই সব অনুষ্ঠান উদ্বোধন করানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের কর্ণধার ও কর্মকর্তাদের ছবি তোলা আবার ওই ছবি জেলা, উপজেলাসহ সব স্থানের ডেসটিনির অফিসে বড় করে টাঙিয়ে রেখে ও ছবিগুলোর অ্যালবাম নবাগত আমানতকারী ক্রেতা-ভোক্তা-ডিস্ট্রিবিউটরদের দেখিয়ে বলা হয় যে, এত বড় বড় প্রভাবশালী মানুষ আমাদের কোম্পানির সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক ও কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুন্দর সুসজ্জিত অফিস, কোট-টাই পরা ভদ্রলোক, প্রাক্তন সেনাপ্রধান কোম্পানির প্রেসিডেন্ট আর রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্ততার ছবির প্রমাণ দেখিয়ে সাধারণ আমানতকারী-ক্রেতা-ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে কোম্পানিটি আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়। এভাবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে কোম্পানির সদস্য বানিয়েছে।

ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড কোম্পানি দাবি করে তাদের এমএলএম পদ্ধতি হলো- সার্কেল বা বৃত্ত পদ্ধতি, যেখানে একজন তার পাশের জনকে বিক্রয় করবে একটি পণ্য, সে আবার তার পাশের জনকে বিক্রয় করবে, এভাবে এক সময় প্রথম জনও ওই বৃত্তের সর্বশেষ জনের কাছ থেকে দ্রব্য কিনবে। কিন্তু অত্যন্ত বিস¥য়ের বিষয় সমগ্র পৃথিবীতে যে কটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি বিদ্যমান তারা কেউ এ ধরনের কোনো পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করে না বা এমন কোনো পদ্ধতির নামও তাদের জানা নেই। মূলত এ পদ্ধতিটি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন উদ্ভাবিত, যার  কোনো এমএলএম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা এমএলএম বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা কোনো ধরনের স¦ীকৃতি নেই। শুধু অখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিতে কথিত পিএইচডি করার সময় এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন তার পিএইচডির থিসিস হিসেবে এই নতুন উদ্ভাবিত পদ্ধতি জমা দিয়েছেন। ফলে এই পদ্ধতির এটুকু দাপ্তরিক স¦ীকৃতি তিনি দাবি করেন। অখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন তার পিএইচডি অর্থের বিনিময়ে সম্পন্ন করেছেন বলে জানা যায়। তার এই উদ্ভট আবিষ্কৃত পদ্ধতিকে ন্যূনতম দাপ্তরিক সস্বীকৃতির প্রয়াসে তার এই পিএইচডি করা। অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থের বিনিময়ে প্রাপ্ত পিএইচডির থিসিসের ফসল, একটি অস¦ীকৃত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতির হাতে সোপর্দ করা হয়েছে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের ৫০ লাখ সদস্য ও তাদের আমানত। উপরন্তু তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকৃত অর্থে এটি একটি নিষিদ্ধ পিরামিড পদ্ধতি, যার শেষ পরিণতি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে নির্মম প্রতারণা।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রিয়া, ইতালি প্রভৃতি দেশসহ মোট ৫২টি দেশে পিরামিড পদ্ধতি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) নিষিদ্ধ থাকা সত্তে¡ও বাংলাদেশে গত ২০১১ সালে ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১১’ নামে একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়, ডাইরেক্ট সেল ব্যবসার সঙ্গে স¤পৃক্ত কোম্পনি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা, পরিবেশক ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের নেতৃত্বে নিউওয়েসহ বেশ কয়েকটি বড় বড় এমএলএম প্রতিষ্ঠান প্রভাব খাটিয়ে ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১১’-এর খসড়ায় ধারা ০৪ (সংজ্ঞা)-এর ১৩ নং-এ সরাসরি বিক্রয়ের সংজ্ঞায় পিরামিড সদৃশ বিক্রয় কার্যক্রমের মতো জনবিরোধী, ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে আইনগত ভিত্তি তৈরির মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রতারণার পথ প্রশস্ত করেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইটালি, সুইডেন, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, চীন,  জাপান, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ ৫২টি দেশে পিরামিড পদ্ধতি বা অন্য নামের আড়ালে পিরামিড পদ্ধতি (আপাতত অন্য পদ্ধতির নামে পরিচালিত) মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা নিষিদ্ধ রয়েছে।

ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডসহ মাল্টি লেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রভাব খাটিয়ে আইনটির খসড়ায় এমন অনেক আত্মঘাতী, জনবিরোধী অংশ রেখেছে। তারপরও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১১’-এর খসড়া নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ফলে ওই খসড়া আইনকে তারা পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরিতে প্রভাব খাটিয়ে বাধা সৃষ্টি করে যখন তারা দেখতে পায় যে এ আইনের তফসিল-২, ধারা-১৭তে ডাইরেক্ট সেল ব্যবসা নিষিদ্ধকরণের তালিকায় কতগুলো বিষয় রয়েছে। এগুলো হলো ১. অবস্থাগত বা অলীক পণ্য এবং সময়ের ধারাবাহিকতা বা পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিপণনযোগ্য হবে এমন পণ্য বা সেবা, ২. স্থাবর সম্পত্তি যেমন- গাছ, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান বা অফিস স্পেস ইত্যাদি, ৩. সমবায় পদ্ধতির খামার বা সমিতি বা ব্যবসা এবং ব্যাংক, বীমা, লিজিং কোম্পানি ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৪. কমিশন বা বোনাস হিসেবে কোনোরূপ শেয়ার ঋণপত্র ক্রয়-বিক্রয় এবং ৫. সব ধরনের সঞ্চয়পত্র, বোনাস স্ক্রিম, কিস্তির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বা সঞ্চয় বা বিলিবণ্টন ইত্যাদি।

ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড কোম্পানির অজনপ্রিয় নিম্নমানের কিছু ¯^াস্থ্য সম্পর্কিত পরিপূরক খাদ্য, ইলেক্ট্রনিক্স দ্রব্য ব্যতীত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসার দ্রব্য ও সেবাগুলোই হলো গাছ, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, সমবায় পদ্ধতির সমিতি ও বোনাস হিসেবে শেয়ার। এজন্য ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড যখন বুঝতে পারে যে, এ খসড়া আইন পরিপূর্ণ আইনে পরিণত হলে তাদের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। তখনই ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড তাদের প্রভাব খাটিয়ে আইনটির খসড়া থেকে পরিপূর্ণ আইনে রূপান্তরিত হতে নানাভাবে বাধা প্রদান করে।

ডেসটিনির বিরুদ্ধে অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা যায়, ডেসটিনি গ্রুপের অধীন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড বর্তমানে প্রতারণামূলকভাবে অভিনব ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন ও ভিজিলেন্স বিভাগের দুজন উপ-পরিচালক মোঃ জহির হোসেন ও রণজিৎ কুমার রায় ডেসিটিনি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড কাকরাইলের অফিসে তদন্ত কাজ পরিচালনা করেন। তারা তিনটি অভিযোগ সামনে রেখে তদন্ত করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অমান্য করে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি প্রকাশ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি চড়া সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে প্রতি মাসে কমপে ২০-২৫ কোটি টাকা মুনাফা করছে। দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছেÑ সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ৩৮ লাখ এজেন্টের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের কমিশন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে। তৃতীয় অভিযোগটি হচ্ছেÑ প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ১ হাজার ৪শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা করে বলা হয়, ডেসটিনি নামক কোম্পানিটি কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত এই তিন অভিযোগের পরিপ্রেিতেই তদন্ত কাজ পরিচালনা করে বেশকিছু সত্যতা পায় তদন্ত টিম।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ডেসটিনি অভিনব কায়দায় এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করে অযৌক্তিকভাবে উচ্চ হারে মূলধন বৃদ্ধি ও সংগৃহীত আমানত এবং মূলধনের অর্থ সুকৌশলে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে অন্যান্য কোম্পানিতে সরিয়ে নিচ্ছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০০৯ সালের পর থেকেই ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির চোখ ধাঁধানো মূলধন মুনাফা ও বিনিয়োগ চোখে পড়ে। আগের বছরের ৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা থেকে ২০০৯-১০ সালে কোম্পানির পুঁজি বেড়ে দাঁড়ায় ৩শ কোটি টাকায়। ২০১০-১১ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১২শ কোটি টাকায়। ২০০৯-১০ সাল থেকে ২০১০-১১ সালে ডেসটিনি মুনাফা করে ৩৫৪ শতাংশ। বিস্ময়কর ব্যাপার হলোÑ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথা থেকে এলো? 

ডেসটিনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

 জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুর্নীতি দমন কমিশন ডেসটিনি গ্রæপের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে। ইতিমধ্যে জাতীয় রাজ¯^ বোর্ড ডেসটিনির দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১শ কোটি টাকার কর ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে। এর মধ্যে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন ৭৩ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। আর ডেসটিনি মূল্য সংযোজন কর ফাঁকি দিয়েছে ৩২ কোটি টাকা। এ কারণে গ্রæপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৪ জন পরিচালকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এবং উভয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি চেয়েছে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেয়া এক চিঠিতে দুদক বলেছে, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অননুমোদিতভাবে ব্যাংকবহিভর্ত বিভিন্ন প্রকল্পের প্যাকেজ, এমএলএম পদ্ধতিতে দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ, অবৈধভাবে হস্তান্তর ও রূপান্তর করছে, যা মানি লন্ডারিং অপরাধ।

এছাড়া ডেসটিনি গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সমবায় আইন, কোম্পানি আইন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন এবং সিকিউরিটিজ আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, সমবায় অধিদফতর ও পুলিশ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তাদের দিয়ে এ কমিশন গঠিত হওয়ার কথা। তদন্ত কমিশন ডেসটিনি গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের আলাদা নিরীক্ষা করবে এবং সম্পদ ও দায়দেনা নিরূপণ করবে। এছাড়া মানি লন্ডারিং, অবৈধ ব্যাংকিং ও গ্রাহক প্রতারণা খতিয়ে দেখবে।

এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘ডেসটিনির বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রথম দফা তদন্তের পর পর্যায়ক্রমে আরো তদন্ত হবে।’

ইতিপূর্বে যুবক কর্মসংস্থান সোসাইটির ব্যাপারেও সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। দুই সদস্যের এ কমিশনের প্রধান হচ্ছেন সাবেক যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলাম। যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছেÑ ১৯৯৬ সালে যুবক প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে তারা বেআইনি ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলে সরকার তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এ সময়ে সংস্থাটি প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।

এর আগে ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশনের কাছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০১ জন আবেদন করেন। তাদের এ আবেদনের বিপরীতে টাকার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

ডেসটিনির প্রতারণার খবর ফাঁস হওয়ার ঠিক আগেই আরেকটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ইউনিপেটু অতি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেক কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ কোম্পানিতে টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সর্ব¯^ান্ত হয়েছে। আর মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এ কোম্পানির লোকজন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যদিও গ্রাহকদের অভিযোগ, ইউনিপেটু গ্রাহকদের আমানতের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা তছরুপ করেছে। খনি থেকে ¯^র্ণ উত্তোলনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগের কথা বলে এ কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে এ অর্থ তুলে নেয়। আর গ্রাহকদের লোভ দেখানো হয়, লগ্নিকৃত অর্থ বছরে দ্বিগুণ আকারে ফেরত দেয়া হবে।

ইতিমধ্যে পুলিশ ইউনিপেটুর কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করেছে। আর দুই উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাসহ নয় জনের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

দেশে ৭০ এমএলএম কোম্পানি

এমএলএম কোম্পানিগুলো পরিচালনায় কোনো আইন না থাকায় দেশে প্রায় ৭০টিরও বেশি কোম্পানি আমানত সংগ্রহসহ অদৃশ্যমান পণ্যের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে গ্রাহকদের প্রতারিত করছে। এসব এমএলএম কোম্পানির কার্যক্রমের বৈধতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লাইসেন্স ইস্যুর সময়ে ঘোষণা অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা হচ্ছে কি না, প্রকৃত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন আছে কি না, বর্তমান পরিচালিত ব্যবসার ধরন ও অনুমোদন আছে কি না অনুসন্ধান করা হবে।

বর্তমানে শুধু ডেসটিনি নয়, নিবন্ধনকৃত রয়েছে ৭০টি এমএলএম কোম্পানি। অনেক কোম্পানি ঘোষণার সময় বিভিন্ন ব্যবসার ধরনের কথা উল্লেখ করে জয়েন্ট স্টক কোম্পানির কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। নিবন্ধনকৃত এসব কোম্পানি কেমিক্যাল উৎপাদন, ইট বালু পাথরের ব্যবসা, বিমান পরিচালনা, গরু মোটাতাজা থেকে শুরু করে এমন কোনো ব্যবসা নেই যা তারা অন্তর্ভুক্ত করেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণ না করেই ওই কোম্পানিগুলো ব্যবসা পরিচালনা করছে।

এই ৭০ কোম্পানির মধ্যে ডেসটিনির রয়েছে ৭০ লাখ সদস্য। আর গ্লোবাল নিউওয়ে, রেডোনেক্সসহ বাকিগুলোর রয়েছে আরো ১০ লাখের মতো সদস্য। এই ৮০ লাখ সদস্যের পরিবারে যদি তিনজন করে সদস্যও হয় তাহলে এই কোম্পানিগুলোর শিকার দেশের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোম্পানি আইন-১৯৯৪ অনুয়ায়ী এমএলএম কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে কোম্পানি আইনের কয়েকটি ধারার মাধ্যমে। সেই ধারাগুলো হলো ১৯৩, ১৯৪, ১৯৫ ও ৩৯৭। এই মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এছাড়া জেনারেল ক্লোজেস অ্যাক্ট-এর ৬ ধারা মোতাবেক যে সংস্থা এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স দিয়েছে, প্রয়োজনে তা বাতিল, স্থগিত করতে পারবে। এতে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে। কারণ সেখান থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েই ব্যবসা করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ব্যবস্থা নেয়ার আগে দেখা হবে, বর্তমান নিবন্ধনকৃত এমএলএম কোম্পানি যে ব্যবসা করছে তার সঙ্গে লাইসেন্স নেয়ার সময় ঘোষিত ব্যবসার মিল আছে কি না, এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে কি না, কী কী ধরনের ব্যবসা করছে এসব বিষয়ে খতিয়ে দেখা হবে। ডেসটিনির মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে অবৈধ ব্যাংকিং করছে। কিন্তু ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। এছাড়া শেয়ার বেচাকেনা করা হচ্ছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে কি না, গাছ লাগাতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়া হয়েছে কি না এসব বিষয় অনুসন্ধান করা হবে।

আইন না থাকায় এমএলএম কোম্পানিগুলো উদ্যোক্তা মালিকদের ইচ্ছামতো পরিচালিত হচ্ছে। এতে অনেক কোম্পানি অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। সমবায় অধিদপ্তর থেকে একটি লাইসেন্স নিয়ে সরাসরি ব্যাংক ব্যবসায় প্রবেশ করছে। এতে গ্রাহকের টাকার কোনো নিরাপত্তা থাকছে না। এসব কারণে কোম্পানির কয়েকটি ধারা মতে এমএলএম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোম্পানি আইনের ১৯৩ ধারায় বলা আছে, যে কোনো ধরনের তথ্য চাওয়া হলে কোম্পানিগুলোকে তথ্য দিতে হবে। লাইসেন্স দেয়া কর্তৃপক্ষ যে কোনো তথ্য চাইতে পারে। ১৯৫ ধারায় বলা আছে শেয়ারের ক্ষেত্রে অবশ্য ১৫ জনের নিচে থাকতে হবে। এর বেশি গেলে অবশ্য প্রচলিত আইন অনুযায়ী পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে শেয়ার ছাড়তে হবে। ৩৯৭ ধারায় ফলস বা মিথ্যে স্টেটমেন্টের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

এমএলএম আইন ঝুলছে

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য খসড়া আইনটি গত ৭ মাস ধরে আটকে আছে। ডাইরেক্ট সেলিং এবং এমএলএম কোম্পানির ব্যবসায় ¯^চ্ছতা আনতে নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে অনুষ্ঠিত সভায় এ খসড়া চড়ান্ত করা হয়। এরপর একাধিকবার আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও রহস্যজনক কারণে সেটি আটকে যায়। সর্বশেষে গত মাসে এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনি গ্রুপ নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি দ্রুত এমএলএম আইন করার তাগিদ দেয়।

এরপর এটি মন্ত্রিপরিষদে উঠানো হয়। কিন্তু ওই সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ আইনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে বলেছে। ডাইরেক্ট সেল আইনে একটি অধিদপ্তর গঠনের কথা রয়েছে। ওই অধিদপ্তরে একজন চেয়ারম্যান থাকবেন। অধিদপ্তরের কাজ হবে এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স দেয়া, বাতিল করা, স্থগিত করা ও পুনর্বহাল করা। এমএলএম ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ হবে ওই অধিদপ্তরের মাধ্যমে।

কিন্তু ওই অধিদপ্তর গঠন করা যাবে না বলে আপত্তি জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাদের আপত্তি হলো, আইনের ধারা দিয়ে সাংবিধানিক সংস্থা সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয় না। এটি আগামীতে জটিলতা সৃষ্টি করবে। প্রয়োজন হলে অর্থ বিভাগের সুপারিশসহ সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। এই মতামত দিয়ে আইনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ফের ফেরত পাঠানো হয়। ফলে আইনটি পাসের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়।

সর্বশেষ তথ্য মতে, এমএলএম আইনের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় মতামত দিয়েছে। এরপর আইনটি সচিব কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আশা করছে, খুব শিগগিরই সচিব কমিটি থেকে সেটি অনুমোদন হয়ে আসবে।

এমএলএম কোম্পানিগুলো পরিচালনার জন্য শেয়ার বা অর্থ বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি না নেয়াসহ মোট ১৩টি ধারা রয়েছে খসড়া আইনে। চোখে দেখা যায় না এমন বায়বীয় পণ্য বিক্রি করতে পারবে না কোনো এমএলএম কোম্পানি। এমএলএম কোম্পানিকে দেশের ভেতর সুনির্দিষ্ট ঠিকানা থাকতে হবে। ঠিকানাবিহীন কোম্পানিকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এমএলএম ব্যবসার নামে পণ্য বাকি রেখে পরিবেশকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ বন্ধ, টাকার বিনিময়ে টাকা দেয়ার পদ্ধতি বাতিল, ঠিকানা ও কিস্তিবিহীন প্ল¬ট-ফ্ল্যাট বিক্রয়ের অর্থ গ্রহণ না করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এমএলএম খসড়া আইনে পিরামিড সদৃশ বিক্রয় কার্যক্রম, অলীক পণ্য, পর্যায়ক্রম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিক্রয়যোগ্য হবে এমন পণ্য ডাইরেক্ট সেলে ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইনের ব্যত্যয় ঘটলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ৩ থেকে ৫ বছরের জেল ও অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হবে। এ ব্যবসার পণ্য মোড়কে উৎপাদনের তারিখ, ওজন, পরিমাপ, মেয়াদ, খুচরা মূল্য লেখা বাধ্যতামূলক। ক্রেতাকে মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিয়ে প্রতারণা করলে ১ থেকে ৫ বছরের জেল এবং ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতির দ্বিগুণ অর্থদণ্ড দেয়া হবে। গায়ের মূল্য থেকে বেশি রাখা হলে ৬ মাস থেকে এক বছরের জেল এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া আইন অনুযায়ী, এসব কোম্পানিকে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।  অনুমোদিত মূলধনের ১০ শতাংশ জামানত রাখতে হবে। এসব কোম্পানিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন মেনে চলতে হবে। নতুন পরিবেশক হওয়াকালীন কোনো সার্ভিস চার্জ, ট্রেনিং ফি, সিকিউরিটি মানি গ্রহণ করতে পারবে না। এসব কোম্পানিকে ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার ব্যবহার, বিপণন পণ্যের গ্রাহক অসন্তোষের বিপরীতে মূল্য ফেরতের নিশ্চয়তা প্রদান, পণ্যের মান সম্পর্কে বিএসটিআই বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি অ্যান্ড ফার্মসকে যত শক্তিশালী করা হোক না কেন তারা এমএলএম কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারণ এমএলএম কোম্পানি ছাড়াও আরো হাজার হাজার কোম্পানি রয়েছে। সব ধরনের কোম্পানির রেজিস্টার হিসেবে কাজ করছে ওই সংস্থাটি। এছাড়া এমএলএম কোম্পানিগুলোর কাজ অন্যরকম এবং আমাদের দেশে নতুন। এ ধরনের কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগও অনেক বেশি। তাই এমএলএম কোম্পানিকে অন্যসব কোম্পানির মতো বিবেচনা করে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশে এমএলএম আইন রয়েছে। মালয়েশিয়ায় রয়েছে ডাইরেক্ট সেল অ্যাক্ট-১৯৯৩, যুক্তরাজ্যে রয়েছে ফেয়ার ট্রেড অ্যাক্ট, ভারতে প্রাইস চিস্ট অ্যান্ড মানি সার্কুলার স্কিম অ্যাক্ট-১৯৭৮, চীনে রয়েছে ডাইরেক্ট সেলিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যাক্ট এবং কানাডায় আছে কম্পিটিশন অ্যাক্ট।

শেষ কথা

বৈধ পদ্ধতির ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে (এমএলএম) বৈধতা দিয়ে পিরামিড পদ্ধতি বা অ্যারোপ্লেন পদ্ধতি বা বৃত্তাকার/হাতে হাত ধরা পদ্ধতি জাতীয় জন ক্ষতিকর পদ্ধতিকে অবৈধ করে দেশে ডাইরেক্ট সেলিং পদ্ধতির নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

অস্পষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে স¦ীকৃত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতি ব্যবহার করে অপ্রচলিত কিছু দ্রব্য বাজারজাত করা চলতে পারে। কিন্তু আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে লাখ লাখ লোকের কোটি কোটি টাকা ঝুঁকির মুখে ফেলা যায় না। সমবায় আইনের অধীনে ক্ষুদ্র পুঁজির সমবায় সমিতির কার্যক্রমের মধ্যে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতি টেনে এনে সামগ্রিক অর্থ প্রক্রিয়ার সাইকেলকে হুমকির মুখে ঠেলে না দিয়ে আইন করে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোর যে কোনো সমবায় সমিতি গঠন, আমানত সংগ্রহসহ আর্থিক লেনদেন বন্ধে আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা  হলো- ১. ডাইরেক্ট সেলিং আইন-২০১১-এর খসড়া পুনর্বিবেচনা করে পিরামিড পদ্ধতির ডাইরেক্ট সেলিংসহ জনবিরোধী অংশগুলো আরো যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে আইন প্রণয়ন করা, ২. সমবায় আইনের অধীনে গঠিত মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আমানত সংগ্রহের সর্বোচ্চ সীমানা বেঁধে দিয়ে সমবায় সমিতিগুলো বল্গাহীন আমানত সংগ্রহ ও ওই আমানতের অব্যবস্থাপনা বন্ধ করা, ৩. তফসিলি ব্যাংক ব্যতীত অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন, আমানত সংগ্রহ, আমানতের অর্থ বিনিয়োগ পদ্ধতিসহ অর্থ সম্পর্কিত সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সমবায় অধিদপ্তরের সমন¦য়ে প্রণয়ন করা। শুধু মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি নয়, আইনের ফাঁক গলে কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানই যেন অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও আমানত সংগ্রহ করে সার্বিক ব্যাংকিং পদ্ধতিকে দুর্বল করার মাধ্যমে অর্থনীতির চাকাকে শ্লথ করতে না পারে ও লাখ লাখ মানুষকে সর্ব¯^ান্ত করতে না পারে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া, ৪. অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স¦রাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সমবায় অধিদপ্তর, তফসিলি ব্যাংক, দুদক, মানবাধিকার কমিশন, অর্থ বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয়, সংস্থা, অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন¦য়ে একটি ডাইরেক্ট আইন প্রণয়ন কমিটি করে ‘ডাইরেক্ট মার্কেটিং আইন-২০১১’-এর খসড়া আইনটি পুনরায় পর্যালোচনা করে আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা, ৫. সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের আগে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম, আর্থিক লেনদেন, বার্ষিক আয়-ব্যয় সরকারিভাবে তদারকি করে জনসাধারণের আমানতের অর্থ সুরক্ষা করা, ৬. রাষ্ট্র ও সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী, গণ্যমান্য ব্যক্তি যাদের দেখে জনসাধারণ বিশ্বাস ও আস্থা পায় তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা বা অন্য কোনোভাবে চাকরিতে যোগদান, আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান, ছবি তোলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে দায়িত্ববান হওয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, ৭. মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলোর বিক্রয় আইটেম/দ্রব্য হিসেবে আমদানিকৃত/উৎপাদিত দ্রব্যাদির মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আইন প্রণয়ন ও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা, ৮. মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলোর বাজারজাতকরণে কোনো ধরনের দ্রব্য বাজারজাত করতে পারবে বা পারবে না এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, ৯. দ্রব্যের বিপণনের বিজ্ঞাপনে মানহীন দ্রব্যকে অতিমূল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপনে চাকচিক্য আনা হয়। ফলে সাধারণ জনগণ ধোঁকায় পড়ে মানহীন ও বিপণন অযোগ্য দ্রব্য উচ্চমূল্যে ক্রয় করে প্রতারিত হয়। তাই দ্রব্য বিপণনে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আইন হওয়া প্রয়োজন এবং ১০. সাধারণ জনগণ কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান ও কী ধরনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করলে প্রতারিত হবে না এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ও সহজে বোধগম্য তথ্য দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বারংবার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করা।

প্রতারণায় মাল্টি লেভেল মার্কেটিং

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং প্রতারণা ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কোম্পানি এখন অবৈধ ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। এ ব্যবসার নীতিনির্ধারকরা জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তার সামান্য কিছু অংশ সদস্যদের ঋণ দিয়ে তহবিলের সিংহভাগ নানা খাতে ব্যবহার করছে। নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এ ব্যবসায় শ্রম ও সময় খাটাতে গিয়ে সর্বস্ব খুইয়েছে অনেকেই। মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ও এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ সুদ ও কমিশনে বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করায় ব্যাংকিং ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এলএমএম প্রতারণা নিয়ে অনুসন্ধান করে এই প্রতিবেদন লিখেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন ও মোস্তাহিদ হোসেন

এমএলএম ব্যবসার নামে অসাধু চক্র প্রতারণার ফাঁদ পেতে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ বেকাররা এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। বেকারদের কর্মসংস্থান বা একটা আয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এ রকম প্রচার চালিয়েই এই প্রতারণা ব্যবসা চালানো হচ্ছে। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যায়, এ রকম বিশ্বাস থেকে ছাত্রছাত্রী, বেকার, টাউট-বাটপার থেকে শুরু করে দেশের নামিদামি পীর সাহেব পর্যন্ত এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন।

নব্বই দশকের পর থেকেই দেশে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসা আত্মপ্রকাশ করে। ‘৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিউওয়ে, জিজিএন, আইটিসিএল ডেসটিনি-২০০০ এ ব্যবসায় সাড়া ফেলে। প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় নিউওয়ে, জিজিএন, বিজনাস ডটকম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতারক কোম্পানির বিরুদ্ধে মিডিয়ায় একাধিক রিপোর্ট প্রকাশ পায়। ‘হুন্ডি কাজল’ যশোর-কুষ্টিয়ায় এ ব্যবসার নতুন রূপ দেয়। রাতারাতি টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্নে হাজার হাজার মানুষ হুন্ডি কাজলের কাছে অর্থ বিনিয়োগ করে। মাত্র ছয় মাসে দ্বিগুণ অর্থ পাওয়ার লোভে হাজার হাজার মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ‘দ্রুত বিনিয়োগ, দ্রুত আয়’ এই কনসেপ্টে মানুষ তার কাছে অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকে। এক সময় তার প্রতারণার খোলস খুলে যায়। কাজল গ্রেফতার হয়ে জেলে যায়। কিন্তু হাজার হাজার বিনিয়োগকারী পথে বসে যায়।

১৯৯৮ সালে ‘নিউওয়ে’ এ ধরনের প্রতারণার ব্যবসা খুলে বসে। অবশ্য তারা বড় ধরনের প্রতারণা করার আগেই মিডিয়ায় একাধিক রিপোর্ট প্রকাশ পায়। যে কারণে তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ২০০২ সালে বিজনাস ডটকম নামে অপর এমএলএম কোম্পানি প্রতারণা ব্যবসা খুলে বসে। নগরীর পান্থপথে তারা অফিস নিয়ে কাজ শুরু করে। কিন্তু পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশের পরই তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়।

ডেসটিনি-২০০০-এর যাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালের প্রথম দিকে। শুরুতে কোম্পানিতে জয়েনিং বা মেম্বারশিপ ছিল ২ হাজার ৭শ টাকা। এই টাকা নেয়া হতো ফরমের মাধ্যমে। চাল, ডাল, আটা, সাবান, তেল পর্যন্ত এই টাকায় সরবরাহ করা হতো।

শুরুতে প্রতারণাটা ছিল খুব সূ²। ধরার তেমন কেউ ছিল না। প্রথম যিনি জয়েন করবে তিনি একজন ডিস্ট্রিবিউটর। তিনি ২ জনকে জয়েন করাবেন। ওই ২ জন যখন বামে ২১ জন ডানে ২১ জন জয়েন করাবেন তখন তার টার্গেট পূর্ণ হবে। তখন তার কমিশন দেয়া হবে ১২ হাজার ৫শ টাকা। অথচ কোম্পানির লোকজন তার কাছ থেকে নিচ্ছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৭শ টাকা। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় ২০০০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। পরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরে তিন গুণ লাভ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সর্বশেষ তারা ট্রি-প্ল্যানটেশন প্রজেক্ট হাতে নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

ডেসটিনির অবৈধ ব্যাংকিংয়ের কারণে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে করে তদন্তে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজ¯^ বোর্ড। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, ডেসটিনি অর্থ প্রতারণা, দুর্নীতি ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায় এর আগে বিসিআই, আইটিসিএল, জিজিএন, যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) এবং সম্প্রতি ইউনিপেটুইউ যেভাবে লাখ লাখ মানুষকে নিঃ¯^ করেছে ডেসটিনির ভমিকাও একই হতে যাচ্ছে।

ডেসটিনিসহ প্রতারক এমএলএম কোম্পানির অপকর্ম সম্পর্কে গত ৬ ফেব্রæয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের দেশবাসীকে সতর্ক করে দেন। ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট বাগমারায় সংসদ সদস্য এনামুল হক ¯^রাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের উদ্দেশে ডেসটিনি ২০০০-এর প্রতারণামূলক কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। এর আগে ২০০৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ও ২৩ ডিসেম্বর ডেসটিনির প্রতারণা ও অবৈধ ব্যাংকিং খতিয়ে দেখার জন্য চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই চিঠি লালফিতায় বন্দি হয়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অল্প দিনে বড়লোক বানিয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়ে গণপ্রতারণার ফাঁদ পেতে কথিত মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড শুধু দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই অর্থ হাতিয়ে নেয়নি, তাদের ফেলা ফাঁদে পা দেয় কাতার, দুবাই, কুয়েত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত শত শত প্রবাসীও।

আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণা

ইন্টারনেটভিত্তিক আউটসোর্সিং কাজকেও এখন এমএলএম ব্যবসায় রূপান্তর করেছে অসাধু চক্র। প্রায় ৭-৮টি কোম্পানি এ ব্যবসায় প্রতারণার ফাঁদ পেতে শত শত মানুষকে পথে বসিয়েছে। অন্যদিকে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সারাদেশে লাখ লাখ মানুষকে ঘরে বসে আয়ের ¯^প্ন দেখিয়ে তারা প্রতারণা করছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘পেইড টু ক্লিক’ করেই ডলার ‘ইনকাম’ বা আয়ের লোভনীয় ফাঁদ পেতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্কাইল্যান্সার অনলাইন অ্যাডক্লিক, বিডিএস ক্লিক সেন্টার, অনলাইন নেট টু ওয়ার্ক, বিডি অ্যাড ক্লিক, শেরাটন বিডি, ইপেল্যান্সার প্রমুখ। এরা মূলত এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে এন্ট্রি ফি বাবদ ১শ ইউএস ডলার নিয়ে থাকে। একজন সদস্য ১শ ইউএস ডলার দিলে তিনি অনলাইনে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় ঢুকে তাদের নির্ধারিত কিছু বিজ্ঞাপনে ক্লিক করেন। এভাবে একজন সদস্য প্রতিদিন ১শ ক্লিক করলে তার অ্যাকাউন্টে ১ ডলার জমা পড়ে। এই ডলারের হিসাব শুধু প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেখা যায়। ওই সদস্যের নিজের অনলাইন অ্যাকাউন্টে দেখা যায় না। ফলে নিবন্ধনের টাকা উঠাতে সদস্যরা নতুন সদস্য সংগ্রহে নেমে পড়েন। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী একজন সদস্য নতুন আরেকজন সদস্য সংগ্রহ করলে ১০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকেন।

আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারিত ভুক্তভোগী সোহেল, আবু জিহাদ, সুমনসহ একাধিক গ্রাহক সূত্রে জানা যায়, এটি ডিজিটাল কায়দার প্রতারণা। এ প্রসঙ্গে স্কাইল্যান্সারের এমডি সাইফুল ইসলামকে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে রাজি হননি। তার হিসাবরক্ষক আবু তাহের জানান, বাংলাদেশে তাদের গ্রাহক সংখ্যা দেড় লাখ। ‘আমরা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি সনদ, সমবায়ের সনদ ও ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছি।’ টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে রাজি হননি।

এমওয়ে করপোরেশন : ধর্মের নামে প্রতারণা

মাসে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এমওয়ে করপোরেশন।

স্বঘোষিত চরমোনাই পীর সৈয়দ রিদওয়ান বিন ইসহাক একটার পর একটা বিতর্কিত কাজ করে তোলপাড় সৃষ্টি করছেন। তিনি প্রতারণামূলক এমএলএম ব্যবসায়ও নেমেছেন। এমওয়ে করপোরেশন নামক একটি এমএলএম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ৬ মাসে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।

তিনি চরমোনাই পীরের সুনাম ব্যবহার করে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষিকা এমনকি চরমোনাই পীরের লাখ লাখ মুরিদকে ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ করেছেন। তাদের কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার করার নামেও প্রতারণা করছেন। এমওয়ে করপোরেশনের নিজস্ব কোনো হারবাল প্রডাক্ট না থাকলেও তিনি লতা হারবাল কোম্পানির প্রডাক্টকে নিজের কোম্পানির প্রডাক্ট হিসেবে বিপণন করছেন। এছাড়া কোম্পানির ব্রুসিয়ারে প্রায় ২০/২২টি অলীক প্রজেক্ট দেখিয়ে এসব প্রজেক্টের শেয়ার বিক্রি শুরু করেছেন। তার নামের সঙ্গে চরমোনাই পীরের সাইনবোর্ড থাকায় খুব সহজেই তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষকে প্রতারণা করছেন।

চট্টগ্রাম থেকে ২০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ভিসারেভ

এমএলএম কোম্পানি যুবক, ইউনিপেটু, রেভনেক্স, স্পিক এশিয়া, এমস্টার, গোল্ডেনট্রেডের মতো ভিসারেভ নামের আরেক হায় হায় কোম্পানির অস্তিত্ব মিলেছে চট্টগ্রামে। ১০ মাসে দ্বিগুণ লাভের বিভিন্ন লোভনীয় অফারে প্রলুব্ধ হয়ে হাজার হাজার গ্রাহক ভিসারেভে প্রায় ২শ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বলে জানা গেছে। ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে গ্রাহকরা এখন দিশেহারা। বিনিয়োগকৃত টাকার আসল ও লভ্যাংশ কোনোটিই ফেরত না দিয়ে এরই মধ্যে লাপাত্তা হয়ে গেছে এমএলএম প্রতিষ্ঠান ভিসারেভ।

ভিসারেভ প্রতি গ্রাহকের বিনিয়োগকৃত টাকা ১০ মাসে দ্বিগুণ দেয়ার বিভিন্ন লোভনীয় অফার দিয়ে চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার প্রায় ৮ হাজার গ্রাহকের কমপক্ষে ২শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এসব গ্রাহক সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার এবং সর্বোচ্চ কোটি টাকাও বিনিয়োগ করেছেন। ওই প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম এজেন্ট রবিউল হোসেন রবি কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তিনি গ্রাহকদের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখান বলেও কয়েকজন বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রাহকদের বিনিয়োগের টাকা আত্মসাৎ করে রবিউল হোসেন রবি এরই মধ্যে নগরীতে চিটাগাং ড্রিম প্রপার্টিজ লিমিটেড (সিডিপিএল) নামের একটি ডেভেলপার কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান, অ্যাকুমপ্লেসমেন্ট অ্যাসোসিয়েটের চেয়ারম্যানসহ কুয়াকাটায় সাউথ ওয়েভ রিয়েল এস্টেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪০ কাঠা জায়গা ক্রয়, প্রান্তিক প্রপার্টিজের নির্মাণাধীন একটি ফ্ল্যাট ক্রয়, মুরাদপুর ফুলকলি মিষ্টি বিতানের বিপরীতে নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট এবং মুরাদপুর ডাচ-বাংলা ব্যাংক সংলগ্ন মার্কেটে একটি বিশালাকার দোকানের মালিক বনেছেন।

রেভেনেক্সের প্রতারণা

রেভেনেক্স নামে আরেকটি কোম্পানির সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ছয় মাসে ২১৬ শতাংশ মুনাফা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জনসাধারণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ পর্যš— তিন লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে দেড়শ কোটি টাকা নিয়েছে তারা। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, বিনিয়োগকারীদের অর্থ তারা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা না নিয়ে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জমা নিচ্ছে। আবার কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেই গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেন মেটানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোম্পানিটির অস্বাভাবিক লেনদেনের ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে রেভেনেক্স নামক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বির”দ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

ব্যাংকে পরিচালিত হিসাবগুলো ফ্রিজ করা হয়েছে বলে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেন করা হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটির অফিস থেকে জানা যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সাধারণ জনগণকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে রেভেনেক্স তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ গ্রহণ করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে সুদসহ মূলধন মাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো এক সময় সাধারণ জনগণের বিনিয়োগকৃত অর্থ নিয়ে লাপাত্তা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেমনটি হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শক দল ৪ জানুয়ারি প্রাইম ব্যাংক, বনানী শাখা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, বনানী শাখা এবং বনানীতে রেভেনেক্স (বিডি) লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেনের বিষয়ে নানা অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরে একটি তদš— প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ঠিকানা পরিবর্তন করে বর্তমানে বাড়ি নং-৯, রোড নং-৪, ব্লক-এফ, বনানী, ঢাকায় ব্যবসা পরিচালনা করছে। অথচ হিসাব খোলার সময় ব্যাংকে প্রদত্ত ঠিকানা দেয়া হয়েছিল টাওয়ার হেমলেট, ১৬ কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ, বনানী, ঢাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার তাদের ঠিকানা পরিবর্তন করেছে, যা সন্দেহজনক। পরে ব্যাংকের কাছ থেকে প্রাপ্ত ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবসা পরিচালনা করতে দেখা যায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ‘সীমাš— মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। পরিদর্শন দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ তাদের সদস্যদের কাছ থেকে প্রতি ছয় মাসে মূল বিনিয়োগের ২১৬ শতাংশ ফেরতের শর্তে বিনিয়োগ গ্রহণ করে থাকে। পরিদর্শন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় তিন লাখ গ্রাহক ছিল এবং এসব গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইউনিপেটুইউ থেকে ইউনি মাল্টিপারপাস

প্রতারণার অভিযোগ থাকা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ইউনিপেটুইউর কর্মকর্তারা রাজধানীর খিলক্ষেতে নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে কার্যক্রম শুরু করেছেন। প্রতিষ্ঠানের নাম ইউনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড। ইউনিপেটুইউর গ্রাহকদের অভিযোগ, ইউনিপেটুইউর কর্মকর্তারা নতুনভাবে আবার প্রতারণার ফাঁদ পেতেছেন। ইউনিতে বিনিয়োগ করলে ইউনিপেটুইউতে পাওনা টাকার ৩৫ শতাংশ দেয়ার প্রলোভন দেয়া হচ্ছে। ইউনিপেটুইউ কার্যক্রম শুরু করেছিল ২০০৯ সালের অক্টোবরে। স্বর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগের আহŸানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৬ লাখ গ্রাহক এতে বিনিয়োগ করে।  প্রতিষ্ঠানটি বলেছিল, প্রতিমাসে মূলধন ও লভ্যাংশের ১০ শতাংশ করে ১০ মাসে গ্রাহকদের দ্বিগুণ টাকা দেয়া হবে। তবে বেশিরভাগ গ্রাহকই লভ্যাংশ দূরে থাক, মূলধনই পাননি। গত বছরের ৬ জুন ইউনিপেটুইউর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক হিসাবে থাকা ইউনিপেটুইউর ৪শ ২০ কোটি টাকা আদালতের নির্দেশে জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।  ইউনিপেটুইউর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সারাদেশে তিন শতাধিক মামলা করেন গ্রাহকরা। পরে ধানমন্ডির প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে দেন কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, ইউনি মাল্টিপারপাস ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নেয়। ইউনির পরিচালনা পর্ষদের অর্থ ব্যবস্থাপক এমএ তাহের, সহসভাপতি মেজর (অব.) এমএ জলিল ও সদস্যপদে আছেন মুনতাসির হোসেন। তাহের ইউনিপেটুইউর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, জলিল পরিচালক ও মুনতাসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ইউনির চেয়ারম্যান রফিকুল আলম ও সচিব নুরুজ্জামান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনি মাল্টিপারপাসের লাইট, সুপার ও প্রিমিয়ার নামে তিনটি প্রকল্প রয়েছে। বলা হচ্ছে, লাইটে ৪২ হাজার, সুপারে ১ লাখ ৫ হাজার এবং প্রিমিয়ারে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে ১৮ মাস সময়ে দ্বিগুণ দেয়া হবে। তবে লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ হিসেবে কাটা হবে।  তবে মেয়াদের আগে বিনিয়োগ ওঠানো যাবে না। ইউনিপের গ্রাহক মাহফুজুর রহমান বলেন, নতুন কোম্পানিতে বিনিয়োগের ৩৫ শতাংশ দেয়ার আশ্বাস আসলে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার ফাঁদ। আরেক গ্রাহক মোঃ সোহেল বলেন, এই ফাঁদে ইতিমধ্যে অনেকে পা দিয়েছেন। ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা গালিব খান বলেন, ‘ইউনি মাল্টিপারপাসের কর্মকর্তারা ইউনিপের কর্মকর্তা, তা জানলে নিবন্ধন দিতাম না।  ১৮ মাসে দ্বিগুণ দেয়ার আশ্বাস, রেজিস্টার্ড কার্যালয় ছাড়া কার্যালয় খোলা প্রভৃতি সমবায় আইনবিরোধী।’ তিনি বলেন, সেখানে পরিদর্শনের পর এ ব্যাপারে তদš— কমিটি করা হয়েছে।  সেখানে আইনবিরোধী কিছু হলে এবং ইউনিপের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে নিবন্ধন বাতিল করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন

ড. আকবর আলি খান – সাবেক উপদেষ্টা, তত্তাবধায়ক সরকার

আইনি দুর্বলতার কারণে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলো প্রতারণার ব্যবসা করে যাচ্ছে। এই প্রতারণা বন্ধ করতে হলে আইনকে শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে সমবায় আইনটি দুর্বল। এটা করা হয়েছিল সমবায়ের জন্য। তখন এটা মাথায় রেখে করা হয় যে, এগুলো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান হবে না। কিন্তু সমবায়ের ব্যানারে অনেক প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে যাচ্ছে, এটি বিপজ্জনক। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে ধরনের টেকনিক্যাল এক্সপার্টিজ দরকার তা সমবায় অধিদফতরের নেই। কাজেই এটা বাংলাদেশ ব্যাংকে ন্যস্ত করা দরকার অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে আলাদা সংস্থা করা যেতে পারে। এই প্রতারণা বাড়ার মূলে রয়েছে ঠিকমতো আইন নেই, আবার যা আছে তার প্রয়োগ নেই। যে কারণে প্রতারণা বেড়েই চলেছে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ – বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া দরকার। এই তদন্ত না হলে শেয়ারবাজারের মতো যে কোনো সময় শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যাবে। পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের প্রতারক প্রতিষ্ঠান মানুষের অর্থ নিয়ে পালিয়ে যেত।

কিছু দিন আগে যুবক একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এর আগে নিউওয়ে, বিজনাস ডট কম একই ধরনের প্রতারণা করেছে। এখন ডেসটিনি প্রতারণার ব্যবসা করছে। ডেসটিনি শুধু ব্যাংকিং আইনই লক্সঘন করেনি, তারা সমবায় সমিতি আইনও লক্সঘন করেছে। কমিশিন দিয়ে ব্যবসা করার কথা সমবায় আইনের কোথাও নেই। অথচ ডেসটিনি তা করছে। এদের সিস্টেম পিরামিডের মতো। ফলে নতুন যে সদস্য বিনিয়োগ করবে তার ক্ষতির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত এই প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

মন্ত্রীরা যা বলেন

আবুল মাল আবদুল মুহিত -অর্থমন্ত্রী

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণা ব্যবসা চলছে। জিজিএন, নিউওয়ে, যুবক, ডেসটিনি এরা সবাই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। প্রতারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে তদন্ত দল কাজ করছে। দুদক, রাজ¯^ বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক সবাই একযোগে কাজ করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে। আমার অবাক লাগে এরা দিনের পর দিন এভাবে মানুষকে ঠকাচ্ছে তারপরও এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন। প্রতারক কোম্পানির অনেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে আমি কোনো সুযোগ দেইনি। এমএলএম ব্যবসার নামে অধিকাংশ কোম্পানি ব্যাংকিং চালিয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই হতে পারে না। মানুষের অর্থ নিয়ে প্রতারণা চলতে দেয়া যায় না। সরকার প্রতারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

জি এম কাদের – বাণিজ্যমন্ত্রী

এমএলএম ব্যবসার নামে যারা প্রতারণা করেছে তারা যাতে তাদের সম্পদ হস্তান্তর না করতে পারে সে জন্য কমিশন গঠন করবে সরকার। সরকার শুধু কমিশন গঠন করেই ক্ষান্ত হবে না, এসব প্রতারক প্রতিষ্ঠান অর্থ পাচার বা হস্তান্তর করতে পারে সে জন্য আগে থেকেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ফ্রিজ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে। যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য যেভাবে কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবারেও প্রতারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এসব প্রতারকের বিরুদ্ধে অনেক আগেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। গত জোট সরকারের সময় ব্যাঙের ছাতার মতো মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছে। মূলত এখান থেকেই প্রতারণাটা শুরু হয়। আমরা নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তাভাবনা করছি। নতুন আইনের মাধ্যমে প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

প্রতারিত সোহেলের কাহিনী 

মেধাবী যুবক এম মিজানুর রহমান সোহেল ঢাকায় এসেছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। পড়াশোনা শেষ করে কোথাও ভালো চাকরির প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু ডেসটিনিতে নাম লেখিয়ে তার এখন পথে বসার উপক্রম। পড়ালেখাও তিনি শেষ করতে পারেননি। তার জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো এখন বিবর্ণ হয়ে গেছে। এমএলএম ব্যবসায় তিনি কীভাবে প্রতারিত হয়েছেন সেই কাহিনী বর্ণনা করেন তিনি।

ডেসটিনির সদস্য হয়ে কীভাবে প্রতারিত হলেন তার বিস্তারিত বর্ণনায় সোহেল বলেন, ২০০৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা কলেজে তিনি অনার্সে ভর্তি হন। ভর্তির পরপরই তার এক বন্ধু তাকে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের এমএলএম কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয়ের ¯^প্ন দেখায়। ওই কোম্পানিটির প্রশিক্ষণে জাদুর মতো চটকদার লোভনীয় কথায় তিনি ডেসটিনির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৬ সালের ৩১ আগস্ট ২৭৮তম স্টেটমেন্টে ডেসটিনির ঢাকা-৭ অফিসে তিনটি সেন্টার নিয়ে ডেসটিনির সদস্য হন। তার সেন্টারের সিআইডি নম্বরগুলো হচ্ছে ১১৫৪৮২০, ১১৫৪৮২১, ১১৫৪৮২২। ডেসটিনিতে সদস্য হওয়ার পর তার অফলাইন লিডাররা নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য তাকে নানাভাবে ব্যবহার করতে থাকেন। প্রথমে তাকে সপ্তাহে ছয় থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিলে মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করা যাবে বলে লোভ দেখান। পড়াশোনা ও চাকরির পাশাপাশি তিনি ডেসটিনিতে খণ্ডকালীন কাজ শুরু করেন। কিন্তু খণ্ডকালীন সময়ে তার প্রথম আট মাসে আয় হয় মাত্র ১৮শ টাকা। এরপর অফলাইন লিডাররা তাকে পরামর্শ দেন, চাকরিটা ছেড়ে পূর্ণ সময় দেয়ার এবং তাতে মাসে তার ৫০ হাজার টাকা আয় নিশ্চিত হবে। তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেন। কিন্তু রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম করেও তার ভাগ্য খোলেনি। বরং পুরো এক বছর সময় দিয়ে ধারদেনা করে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা খরচ করে ১২ হাজার টাকা আয় করেন। অফলাইন লিডাররা তাকে অভয় দিয়ে বলেন, সবারই প্রথম প্রথম বেশি সময় লাগে, কিন্তু জ্যাম ছেড়ে গেলে দেখবেন প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন।

এদিকে তার বাবা-মা বারবার ডেসটিনি করতে বারণ করলেও তাদের কথা অগ্রাহ্য করে তিনি মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করার প্রতিশ্রুতি দেন। এতে বাবা-মা তাকে টাকা পয়সা দেয়া বন্ধ করে দেন। এদিকে চাকরি ছেড়ে দেয়ায় তিনি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কলেজের কয়েক বন্ধুর কাছ থেকে ঋণ করে ডেসটিনিতে প্রায় তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করে দুই বছরে সাত সাইকেল তথা প্রায় ৮৮ হাজার টাকা আয় করেন। ডেসটিনিতে এক ট্রেনিংয়ে অফলাইন লিডাররা বলেন, যারা পড়াশোনা করছেন তারা তো পড়াশোনা শেষ করে টাকাই আয় করবেন। সেই টাকা যদি এখনই আয় করতে পারেন, তাহলে পড়াশোনা করে কী হবে? বাংলাদেশে পড়াশোনার কি কোনো ভাত আছে? শিক্ষিত বেকাররা ক্রাইম করে। তাই আপাতত পড়াশোনা করে সময় নষ্ট না করে এখানে সিরিয়াসলি সময় দিলে মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করা অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে যাবে। তাদের কথামতো তিনি পড়াশোনাও বন্ধ করে দেন। সোহেল আরো বলেন, ডেসটিনির কোনো সদস্য যাতে ডেসটিনি ছাড়তে না পারে সে জন্য তারা নানা কৌশল গ্রহণ করে। প্রথমত অন্য সব আয় থেকে সদস্যদের সরে আসতে বাধ্য করে। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে তা খরচ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। যাতে করে ঋণের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ডেসটিনির কাজের গতি বৃদ্ধি পায়। এরপর পড়াশোনা বা শখের কোনো কাজ থাকলে সেখান থেকেও অব্যাহতির ব্যবস্থা করা হয়। যেন ডেসটিনিতে ফুলটাইম সময় দিতে বাধ্য হয়। বিয়ে না করে থাকলে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে ঘাড়ে সংসার চালানোর তাগিদ থেকেই ডেসটিনির কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

দুর্নীতির আখড়া সমবায় অধিদপ্তর

দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে জাতীয় সমবায় অধিদপ্তর। বিধিবিধান উপেক্ষা করে রাজনৈতিক চাপে চলছে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। অভিযোগ উঠেছে দলবাজ কিছু কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক ছায়া দিয়ে তাদের মাধ্যমে অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে। সমবায় সমিতি নিবন্ধন, অডিট, এরিয়া-অপারেশনস বৃদ্ধি, জনবল নিয়োগ বদলি, পদোন্নতি প্রভৃতি খাতে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি করে নতুন এক রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়েছে। কিছু কর্মকর্তা নিজেদের প্রধানমন্ত্রী, এলজিআরডিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একাš— লোক দাবি করে যা খুশি তাই করে যাচ্ছেন। অর্থের বিনিময়ে গণহারে সমবায় সমিতির প্রাথমিক নিবন্ধন প্রদান করে লাখ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করা হচ্ছে। দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে তদš—াধীন রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ওই সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাদের সমবায় অধিদপ্তর থেকে সরানো হয়নি। দেয়া হয়নি কোনো প্রকার বিভাগীয় শাস্তি।

নিয়োগ বাণিজ্য

সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাসে ৭ শতাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ওই নিয়োগে প্রায় ২৫ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে। পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক, অফিস সহকারী, টাইপিস্ট, ড্রাইভার ও পিয়ন পদে এই নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন অমিয় চট্টোপাধ্যায় (অতিরিক্ত নিবন্ধক) সভাপতি, মোমিনুল হক তালুকদার (সাবেক ডেপুটি রেজিস্ট্রার) সদস্য সচিব, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি-সহকারী সচিব সাহানা খানম, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহ-সচিব জসিম উদ্দিন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের দুজন কর্মকর্তা। কমিটিতে সাতজন কর্মকর্তা থাকলেও নিয়োগ কার্যক্রমের সব সিদ্ধান্ত দেন ওই দুজন। অভিযোগ উঠেছে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে ১০ লাখ থেকে সর্বনিম্ন ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ গ্রহণ করা হয়েছে। যে সব প্রার্থী তাদের নির্ধারিত উৎকোচ দিতে পেরেছে রিটার্ন পরীক্ষায় তাদের ৮০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর দিয়ে কৃতকার্য দেখানো হয়েছে। আর যারা উৎকোচ দেয়নি, লিখিত পরীক্ষায় তাদের ৩০/৪০ নম্বর দেয়া হয়েছে।

ক্যাডার প্রশাসনে নন-ক্যাডার

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিদপ্তরের ক্যাডার সার্ভিসের পদগুলো দলীয়করণ করে সেখানে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। এতে করে ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তারা দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনে গতিহীন হয়ে পড়েছেন। যেমন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধকের (প্রশাসন) পদটি ক্যাডারভুক্ত পদ, অথচ সেখানে একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে। এ রকম ৫/৬ জন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা দ্বারা ক্যাডার প্রশাসন পরিচালনা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানায়, সমবায় অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়টিতে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে বেশি। মাল্টিপারপাস সমিতি থেকে মাসহারা নিয়ে তাদের অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সমবায় আইনে বিধিগত ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এভাবে তারা জনগণ থেকে কোটি কোটি টাকা আমানত নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। এমনকি ওইসব মাল্টিপারপাস সমিতির কর্মকর্তাদের প্রতারণার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিভাগীয় সমবায় কর্মকর্তা প্রতুল কুমার সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি অর্থের বিনিময়ে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতিকে সারাদেশে শাখা খোলার অনুমোদন দিয়েছেন। এছাড়া জামায়াত নেতা মুজাহিদের বেয়াই ইসমাইল হোসেনকে ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতির নিবন্ধন দেয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা উৎকোচ নেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অনুমোদন ছাড়াই দেশব্যাপী শাখা খুলে ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস তাদের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে সমবায় আইনে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এর আগে যখন ডেসটিনিকে নিবন্ধন দেয়া হয় তখন ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন ইকবাল হোসেন। পরবর্তী সময়ে তার স্থলাভিষিক্ত হন আবুল হোসেন। বর্তমানে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন গালিব খান। এ প্রসঙ্গে গালিব খান জানান, বিভাগব্যাপী যেসব সমিতি পরিচালিত হচ্ছে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার দায়িত্ব বিভাগীয় কর্মকর্তার। এক্ষেত্রে ঢাকা জেলা কর্মকর্তার ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক সূত্রগুলো আরো জানায়, সমবায় অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রীয় একটি সমবায় ব্যাংক রয়েছে। এই ব্যাংকটিও ফান্ডের অভাবে মৃতপ্রায়। স¤প্রতি ব্যাংকটি সচল করার জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই ব্যাংকটিতে রাজনৈতিক কোটায় একজন সভাপতি নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ব্যাংকটি গতি ফিরে পায়নি।

গণহারে সমিতি নিবন্ধন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতীতে যারা ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা ছিলেন তারা অর্থের বিনিময়ে গণহারে সমবায় সমিতির নিবন্ধন দেয়ায় বর্তমানে কেবল ঢাকা জেলাতেই নিবন্ধিত সমিতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩শ, যা একেবারেই অস্বাভাবিক। এসব সমিতি নিবন্ধন দেয়ার পর যথাযথভাবে অডিট করা হয়নি। অডিটের নামে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে সমিতিগুলো সম্পর্কে ইতিবাচক রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। অডিট খাতেই প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অডিট বিভাগের কর্মকর্তারা।

সমবায় অধিদপ্তরে এক শ্রেণীর কর্মকর্তা নিজেদের সরকারি দলের লোক দাবি করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। নেতৃস্থানীয় ৫/৬ টি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতির সঙ্গে আঁতাত করে জনগণের আমানতের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছেন এরা। এসব মাল্টিপারপাস সমিতির কাছ থেকে তারা নিয়মিত মাসহারা নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উৎকোচ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সেগুলো হলো ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, ইউনিভার্সেল কো-অপারেটিভ সমিতি, অগ্রণী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, এমওয়ে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি, ইউনিপে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমিতি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সমবায় অধিদপ্তরে দুর্নীতি ছিল এটা সত্য। আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

http://www.shaptahik-2000.com/?p=1545

%d bloggers like this: