বিশ্বের ৭ম বৃহৎ শ্রমশক্তি বাংলাদেশে


বিশ্বের ৭ম বৃহৎ শ্রমশক্তি বাংলাদেশে 

ইসমাইল আলী
Bangladesh’s growing workforce supports key export industries and generates remittances that contribute a significant amount to the economy. In 2010, Bangladesh was ranked as the 7th manpower exporting country and migrant workers remitted nearly US$ 11.6 billion in FY 2011. Bangladesh has also emerged as an exporting power house and the country’s growth in Ready Made Garments and Knitwear exports has been impressive. Link:

কিছু দিন আগেও বহির্বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে খুব একটা খবর নিত না। গরিব দেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ, অধিক জনসংখ্যার দেশ। যারা বাংলাদেশের এ রকম ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন, তারাই এখন বলছেন, বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। এখানে আছে বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রমশক্তির ভাণ্ডার। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টালিজেন্স ইউনিটের (সিআইএ) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শ্রমশক্তির আকারের বিচারে বিশ্বের ২২৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী দিনগুলোয় সেসব দেশই অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে যাবে, যার শ্রমশক্তি ও ভোক্তার আকার যত বড়। পশ্চিমের দেশগুলো সে কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের নেতৃত্ব হারাবে এবং এশিয়ার দেশগুলো এগিয়ে যাবে। এখন প্রয়োজন মোটিভেশন এবং শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে উত্পাদনশীলতা কয়েক গুণ বাড়ানো।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শ্রমশক্তি রয়েছে চীনে। বর্তমানে দেশটির শ্রমশক্তি ৮১ কোটি ৬২ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে ভারত। দেশটির শ্রমশক্তি ৪৮ কোটি ৭৬ লাখ। আর তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাদের শ্রমশক্তির পরিমাণ ২২ কোটি ৮১ লাখ। ১৫ কোটি ৩৪ লাখ শ্রমশক্তি নিয়ে চতুর্থ স্থানে যুক্তরাষ্ট্র, ১১ কোটি ৭০ লাখ শ্রমশক্তি নিয়ে পঞ্চম স্থানে ইন্দোনেশিয়া ও ১০ কোটি ৪৩ লাখ শ্রমশক্তি নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ব্রাজিল। ৭ কোটি ৫৪ লাখ ২০ হাজার শ্রমশক্তি নিয়ে ৭ম অবস্থানে বাংলাদেশ। শীর্ষ ১০-এর মধ্যে এরপর রয়েছে যথাক্রমে রাশিয়া, জাপান ও পাকিস্তান।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, শ্রমশক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানের অন্যতম। কারণ এর জনসংখ্যা বেশি এবং শ্রমশক্তির মধ্যে নির্ভরশীলতার হার হ্রাস পাওয়া। তবে শ্রমশক্তির দিক থেকে বৃহৎ শক্তি হলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশই বেকার। এ ছাড়া ন্যূনতম মজুরি, কাজের নিশ্চয়তা, শিক্ষার সুযোগ, চিকিত্সা সুব্যবস্থা না থাকায় শ্রমশক্তির বড় একটা অংশ সবসময় দেশ ত্যাগে আগ্রহী থাকে। তাই এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি দেয়া জরুরি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘বাংলাদেশের বেশির ভাগ শ্রমিক অদক্ষ। কারণ তাদের দক্ষতার জন্য যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দরকার, তা তাদের নেই। শ্রমিকের দক্ষতার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে এটির সুযোগ কম। যেটুকু সুযোগ আছে তা আবার মানসম্পন্ন নয়। তা ছাড়া মানবসম্পদের দক্ষতা অনেক বেশি বিশেষায়িত হয়ে পড়েছে। দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদাও বেশি। তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে না পারায় দেশে তাদের ধরে রাখতে পারছি না।’
অদক্ষ শ্রমিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্বপ্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দক্ষ মানবসম্পদেরও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু আমাদের তার অভাব রয়েছে।’
তবে সিআইয়ের প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিন্নতা রয়েছে। বিবিএসের তথ্যমতে, বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ-২০১০ অনুসারে বাংলাদেশে শ্রমশক্তির পরিমাণ ৫ কোটি ৬৭ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৩ কোটি ৯৫ লাখ ও নারী ১ কোটি ৭২ লাখ। তবে মোট শ্রমশক্তির বেশির ভাগই গ্রামে বাস করে। শহরের শ্রমশক্তির পরিমাণ ১ কোটি ৩৩ লাখ আর গ্রামের ৪ কোটি ৩৪ লাখ।
জনসংখ্যা বেশি হওয়া, মোট জনসংখ্যার মধ্যে কর্মক্ষম (১৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে) জনগোষ্ঠী বাড়া, নির্ভরশীল (১৫ বছরের নিচে ও ৬৫ বছরের ওপরে) জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমা, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়া শ্রমশক্তি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ২০০৫-০৬ সালের তুলনায় ২০১০-এ শ্রমশক্তি ২ কোটি ৯ লাখ বেড়েছে। এর মধ্যে তরুণ শ্রমশক্তি বেড়েছে ১ কোটি ৩১ লাখ। তরুণ শ্রমশক্তির উল্লেখ্যযোগ্য বৃদ্ধি মোট শ্রমশক্তি বৃদ্ধিরও অন্যতম কারণ।
শ্রমশক্তি জরিপ-২০১০ অনুসারে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যায় কর্মক্ষমের হার বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী শ্রমশক্তির অন্তর্ভুক্ত। ২০০৫-০৬ সালের জরিপ অনুসারে তা ছিল ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া বর্তমানে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ২০১০ সালের জরিপ অনুসারে নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ ৩৬ শতাংশ, ২০০৫-০৬ প্রতিবেদনে যা ছিল ২৯ দশমিক ২ শতাংশ।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব রীতি ইব্রাহিম বলেন, বাংলাদেশে শ্রমশক্তি বাড়ছে। এর মূল কারণ এ দেশে নির্ভরশীলতার হার কমছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। এমনকি কয়েকটি সামাজিক সূচকে ভারতের চেয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এগুলোর সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশ শ্রমশক্তির দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিবিএসের হিসাবে মোট কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৪১ লাখ। এর মধ্যে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আর মাত্র ১২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। মোট কর্মজীবীর মধ্যে অবৈতনিক পারিবারিক সহযোগীর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ; কৃষি, বনজ ও মত্স্য খাতে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৫৭ লাখ ও দিনমজুরের সংখ্যা ১ কোটি ৬ লাখ। সব মিলিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ৬৮ লাখ। বিভিন্ন পেশার কর্মজীবীদের মধ্যে কৃষি খাতে ৪৭ দশমিক ৩ ও অকৃষি খাতে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে।
শ্রম অধিদফতরের শ্রম বিভাগের পরিচালক আবু সাইদ মো. খুরশীদুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিশ্বে শ্রমশক্তির দিক থেকে ৭ম অবস্থানে থাকলেও আমাদের দেশের শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। ফলে শ্রমশক্তির ফলদায়ক ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদফতর, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কাজ করছে। দেশী-বিদেশী উদ্যোগে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও কাজ করছে। তবে এখনো লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিক্ষা, চিকিত্সা, প্রশিক্ষণসহ অনেক ধরনের কাজ করতে হবে।’
এদিকে দেশে কর্মে নিয়োজিতদের মধ্যে মজুরি অনেক কম। মোট শ্রমশক্তির ৪২ দশমিক ৮ শতাংশের সাপ্তাহিক আয় ৫০১ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে। ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশের সাপ্তাহিক আয় ১ হাজার ১ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। মাসিক আয়ের দিক থেকে ১১ দশমিক ৬ শতাংশের আয় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৯৯৯ টাকার মধ্যে। ১১ দশমিক ৮ শতাংশের মাসিক আয় ৮ হাজার থেকে ৮ হাজার ৯৯৯ টাকার মধ্যে। আর ২১ শতাংশের আয় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ৪৯৯ টাকার মধ্যে।
 
২০১০ সালের তথ্যনুসারে, মোট শ্রমশক্তির ২৬ লাখ বা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেকার। গত পাঁচ বছরে বেকারের হার কিছুটা বেড়েছে। ২০০৫-০৬ সালের হিসাব অনুসারে, বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এদিকে মোট শহর অঞ্চলে বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ৫ ও গ্রামে ৪ শতাংশ। আর মোট শ্রমশক্তির ৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী ও ৪ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ বেকার। মোট শ্রমশক্তির মধ্যে শহর অঞ্চলে পুরুষ ও নারীর বেকারত্বের হার যথাক্রমে ৫ দশমিক ৭ ও ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আর গ্রাম অঞ্চলে এ হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৬ ও ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছেই/মুসলিম আইনে তালাকের অধিকার


বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছেই

অন্যপক্ষ : ১৬/০৪/২০১২

অন্যপক্ষ ডেস্ক : ঢাকা সিটি করপোরেশনের আইন ও সালিসি বোর্ড থেকে বিয়ে-বিচ্ছেদ সম্পর্কিত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০০৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত এদেশে তালাক নোটিশের সংখ্যা ছিল সর্বমোট ২,৬২৭টি। এর মধ্যে ১,৭৬৪টি তালাক দেয়ার ঘটনা ঘটেছে মেয়ে পক্ষ থেকে। আর পুরুষের পক্ষ থেকে তালাকের সংখ্যা ছিল ৮৬৩টি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘অভ্যন্তরীণ বাৎসরিক পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন’ (২০০৯) এর কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তাদের মোট ১২৪টি বৈঠকের মধ্যে তালাক সংক্রান্ত ঘটনার সংখ্যা ছিল মোট ১৫টি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে বিয়ে-বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে এবং এর পেছনে নানাবিধ কারণ থাকলেও মূল কারণ হিসেবে তারা দেখছেন যৌতুককে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে তালাকের মূল কারণ হচ্ছে যৌতুক। বেসরকারি সংগঠন ম্যাস লাইন মিডিয়ার (এমএমসি) নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক তথ্যকেন্দ্রের ২০০৫ সালের জরিপে দেখা যায়, এ সময় যৌতুকের কারণে সবচেয়ে বেশি তালাকের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৫ সালে এ ধরনের ১২৩৫টি ঘটনা জরিপে চিহ্নিত করা হয়। তাই দেখা যাচ্ছে, তালাকের ঘটনা বৃদ্ধির দিকে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার আইনজীবী সারা তানজীনা ইভা বলেন, নিম্নবিত্তদের মধ্যে বেশিরভাগই যৌতুকের কারণে বিচ্ছেদ হচ্ছে। যৌতুকের কারণে নারীরা শারীরিকভাবে নির্যাতিত হন এবং স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মালেকা বেগমের মতে, সমাজে নানা বঞ্চনা ও বৈষম্য নেতিবাচকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন হতে দেয় না এবং পুরুষকে আধিপত্য দেয়, আর তখনি সম্পর্ক বিচ্ছেদ হতে বাধ্য হয়।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের আইন অফিসার এম এস করিম খান বিয়ে-বিচ্ছেদ বৃদ্ধির পেছনে কারণ হিসেবে মনে করেন স্বামী/স্ত্রীর পারস্পরিক সন্দেহপ্রবণতা এবং পরকীয়া প্রেমকে। মিরপুর এলাকায় বসবাসরত চাকরিজীবী মোঃ সাইফুল ইসলামের (৪২) বিয়ে হয় বার বছর আগে। সাইফুল ইসলামের স্ত্রী চাকরি করতেন। তাদের ঘরে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। একসময় তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য একটি ছেলের সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে তার স্ত্রী তাকে তালাক দেয় ও তার সন্তানকে ফেলে অন্য আরেকটি ছেলেকে বিয়ে করে বিদেশে চলে যান। বর্তমানে সাইফুল ইসলাম তার একমাত্র কন্যাকে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার আইনজীবী মনে করেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী একজন নারী বর্তমানে আর নির্যাতন সহ্য করে সংসার করছেন না, তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন এবং এর ফলে সমাজে বিয়ে-বিচ্ছেদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসবাসরত মলয়া (৩৬) জাতিসংঘে চাকরি করছেন। বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন যে তার স্বামী সন্তান ধারণে অক্ষম। ফলে তিনি বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটান।

অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাকছুদা আখতার জানান, বর্তমান সময়ে বিয়ে-বিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার একটা অন্যতম কারণ হলো টিনএজ ছেলেমেদের নিজে নিজে বিয়ে করা। দুই. পরে পরিবার বিয়ের বিষয়টি না মেনে নেয়ার কারণে বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটছে। অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের বিয়ে সম্পর্কে ধারণাও খুব কম থাকে বলে তিনি জানান। মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর গ্রামের মেয়ে রিতা (২৭)। তিনি নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তার পরিবারের কানে এই বিষয়টি গেলে তাকে তার পরিবার নিয়ে আসে এবং আদালতের মাধ্যমে তাদের বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটায়। সন্তান না হওয়ার কারণেও সমাজে বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটছে। উত্তর শাহজাহানপুর এলাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন রাজিয়া বেগম (৩৬)। তিনি বিয়ের পর মাত্র তিন বছর সংসার করেছেন। তিনি নিঃসন্তান থাকায় তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তাদের বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটে। এছাড়া সন্তানের মত না নিয়ে বিয়ে দেয়ার ফলেও সমাজে বিয়ে-বিচ্ছেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের অধিকাংশ বাল্যবিবাহ ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন বিয়ের শেষ পরিণতি হচ্ছে বিয়ে-বিচ্ছেদ। বাল্যবিবাহ ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন বিয়ের কারণে দেশের হাজারো নারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত, দরিদ্র পরিবারগুলোতে এই প্রবণতা অনেক বেশি। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত দুটি সীমিত আকারের জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হয় না। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে রেজিস্ট্রেশনের সুফল সম্পর্কে মানুষ জানে না এবং নারীদের ভেতর আগ্রহের অভাব। রেজিস্ট্রেশনবিহীন বিয়ে সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, মৌখিক বিয়ে বা মৌখিক তালাকের কোনোটিই বৈধ নয়। বিয়ে ও তালাকের ক্ষেত্রে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়ে-বিচ্ছেদের সময় নারীর মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে পুরুষের একক ইচ্ছায় বিয়ে-বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। অর্থাৎ বিচ্ছেদকে নারীর ওপর একটি নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বদরুন নাহার বলেন, বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন এদেশে খুব বেশি কার্যকর নয়। সাধারণ জনগণের জন্য আইন তৈরি করা হলেও জনগণই এটি জানে কম। শিক্ষিত গোষ্ঠী এই আইন সম্পর্কে কিছুটা জানলেও অশিক্ষিতরা একেবারেই জানে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বিয়ে-বিচ্ছেদ আইনের সচেতনতা প্রসঙ্গে বলেন, যেহেতু নারীরা বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন সম্পর্কে সচেতন নয়। সেক্ষেত্রে এই আইন সম্পর্কে প্রচারণা চালানো উচিত রেডিওতে, মসজিদে মসজিদে এবং ইমামদের মাধ্যমে। বিয়ে-বিচ্ছেদের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারীরা। একজন পুরুষ বিচ্ছেদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার করছেন। অন্যদিকে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই তা পারছে না। কেননা তাদের সন্তান ভরণপোষণের মতো বড় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। মগবাজার নয়াটোলা এলাকার একটি বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করেন ৪০ বছর বয়সী নারী বাতাসি। ২০ বছর সংসার করার পর তার স্বামী যৌতুকের কারণে তাকে তালাক দেয়। তার দুটি সন্তান রয়েছে। সন্তানের দিকে তাকিয়ে তিনি আর বিয়ে করেননি বলে জানান। এভাবে শুধু বাতাসি নয় অনেক নারী আছেন, যারা বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পরে দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা চিন্তাও করেন না। খুব কষ্টে তারা জীবনযাপন করেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইনজীবী মাকছুদা আখতার এ প্রসঙ্গে বলেন, বিয়ে-বিচ্ছেদের ফলে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যেমন হিন্দু নারীরা দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারছে না, নারীরা পরিবার ও সমাজের চোখে হেয় হচ্ছে, এমনকি মুসলিম নারীদের আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ থাকলেও তারা বিয়ে করছে না, মানসিকভাবে তারা অসহায় হয়ে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোসাঃ মালেকা পারভীন বলেন, বিয়ে-বিচ্ছেদের ফলে নারী/পুরুষের বিষন্নতা, হতাশা, চাপমূলক অবস্থা এমনকি একাকীত্ব আসতে পারে। সেক্ষেত্রে বিচ্ছেদ হওয়া একজন নারী/পুরুষের জন্য প্রয়োজন হয় পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা। মালেকা পারভীন মনে করেন, মানসিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে কাউন্সেলিং, যা কিনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ আরো অনেক সংস্থা দিয়ে থাকে। বিচ্ছেদ হওয়া নারীরা সেখান থেকে এই সংক্রান্ত পরামর্শ নিয়ে তাদের মানসিক সমস্যাগুলো দূর করতে পারেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইনজীবী মাকছুদা আখতারের মতে, বিয়ে-বিচ্ছেদের কারণে শুধুমাত্র নারীর মানসিক সমস্যা হচ্ছে তা নয় এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি শিশুরা।

অভিযোগ রয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিয়ে-বিচ্ছেদ বন্ধ করার লক্ষ্যে কোনো কাজ করে না। কিন্তু বিচ্ছেদ হওয়া নারীদের জন্য বেশ কিছু কাজ করে থাকে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বদরুন নাহার বলেন, যে সমস্ত নারীর বিচ্ছেদ নিয়ে ঝামেলা চলে তাদের সরকার আইনি সহায়তা কেন্দ্র-এর মাধ্যমে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে। বিচ্ছেদ হওয়া নারীদের সরকার নিজস্ব খরচে ছয় মাস রাখে, তাদের মোহরানা আদায় করতে সহায়তা করে এবং শিশুসহ ভরণপোষণের জন্য ছয় মাস দায়িত্ব নিয়ে থাকে। এছাড়া সরকার বিচ্ছেদ হওয়া নারীদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা, বিধবাভাতা, ‘নির্যাতিত, দুস্থ মহিলা ও শিশুকল্যাণ তহবিল’ নামক ফান্ড কর্তৃক আর্থিক সহায়তা, ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে সহযোগিতা করে থাকে। ভবিষ্যতেও এই সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের আরো চিন্তাভাবনা আছে বলে তিনি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মালেকা বেগমের মতে, নারী ও পুরুষ সকলের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ন্যায়ের পক্ষে পদক্ষেপ নেয়ার মধ্য দিয়ে এবং সমাজকে বদলানোর মধ্য দিয়ে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বদরুন নাহার মনে করেন, বিয়ে-বিচ্ছেদ সমস্যা সমাজ থেকে ততোক্ষণ পর্যন্ত দূর করা সম্ভব হবে না যতোক্ষণ না পারিবারিক বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা যাবে, স্বামী-স্ত্রীর ভেতরকার বোধ জাগ্রত করা যাবে, সর্র্বোপরি পারিবারিক বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করা যাবে। তথ্যসূত্র : বিডিএনএল ডট নেট
—————————————————————————————————————————–

মুসলিম আইনে তালাকের অধিকার


 

সাইদ ও লোপার বিয়ের দুই বছর পর সাইদ লোপাকে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। লোপা তার বাবার বাড়িতে ফিরে আসে। বিয়ের পর থেকেই সাইদ ও তার বাবা-মা লোপাকে শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করত। কারণ বিয়ের সময় লোপার বাবা যে যৌতুক দিতে চেয়েছিল টাকার অভাবে তার সব দিতে পারে নাই। বিয়ের সময় লোপার বাবা সাইদকে বলেছিল যে, আমন মৌসুমের পর সাইদকে তাদের দাবী মত টাকা ও মটর সাইকেল কিনে দিবে। কিন্তু গত দুই বছর আমনের ফলন কম হওয়ায় লোপার বাবা সাইদকে শুধু টাকা দিতে পারেন। মটর সাইকেল কিনে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। লোপার বাবার বাড়িতে ফিরে আসায় তার বাবা-মা চিন্তায় পড়েন। এর কয়েক দিন পরেই সাইদ লোপাকে তালাকের নোটিশ পাঠায়। লোপা কি করবে বুঝতে পারে না। প্রচন্ড অসহায়বোধ করে। বিয়ের আগে সে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিল, তাই আইন সম্পর্কে তার কিছু ধারণা আছে। একদিন সে তার বাবার সাথে উকিলের কাছে যায় পরামর্শের জন্য। উকিল তাকে তালাকের অধিকার সম্পর্কে তথ্য জানান।

উকিল : মুসলিম আইন অনুযায়ী বিয়ে একটি চুক্তি। এই চুক্তি যে কোন পক্ষ রদ বা ভঙ্গ করতে পারেন। বিয়ের মাধ্যমে স্থাপিত সম্পর্ককে আইনগত উপায়ে ভেঙ্গে দেয়াকে তালাক বা বিয়ে বিচ্ছেদ বলে। স্বামী বা স্ত্রীর যে কোন একজনের ইচ্ছাতেও (শর্তাধীন) বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। কিন্তু তোমার স্বামী তোমাকে যৌতুকের জন্য তালাক দিয়েছে যা অন্যায়।

লোপা : তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী/স্ত্রীর অধিকার কি সমান ?

উকিল : বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটাতে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সমান নয়। এক্ষেত্রে স্বামীর ক্ষমতা বা  অধিকারই বেশি।

লোপা : স্বামী বা স্ত্রী কিভাবে তালাক দিতে পারে ?

উকিল : স্বামী-স্ত্রী নিম্নলিখিত উপায়ে তালাক দিতে পারেন:

  • স্বামী কর্তৃক তালাক (স্বামী আইনের নিয়ম মেনে যে কোন সময় স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন।)
  • স্ত্রী কর্তৃক তালাক (স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দিয়ে থাকেন অর্থাৎ তালাক-ই-তৌফিজের মাধ্যমে স্ত্রী কর্তৃক তালাক)
  • পারষ্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তালাক (খুলা বা মুবারত পদ্ধতিতে তালাক)
  • আদালতের মাধ্যমে তালাক।

লোপা : স্বামী কিভাবে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন ?

উকিল : একজন মুসলিম পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ মস্তিস্কের পুরুষ যে কোন সময় স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। কিন্তু সে মুখে বা লিখে যেভাবে তালাক দিক না কেন তালাক সাথে সাথে কার্যকর হবে না। ব্যাখ্যা: ১ 

লোপা : স্ত্রী কি স্বামীকে তালাক দিতে পারে ?

উকিল : একজন স্ত্র্রী যখন ইচ্ছা তখন স্বামীকে তালাক দিতে পারেন না। মুসলিম আইনে স্বামীকে তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রী সীমিত অধিকার ভোগ করেন। নিম্নলিখিত যে কোন উপায়ে একজন স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারেন:


   
ছবির স্বত্ত্ব:
  বারসিক

 

ক. স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে

খ. তালাক-ই-তৌফিজ-এর মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে

গ. খুলা’র মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে, এছাড়া

ঘ. স্বামী-স্ত্রী দুজনই মুবারতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। ব্যাখ্যা: ২

লোপা : হিল্লা বিয়ে কি ?

উকিল : প্রাচীন সমাজে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয়ে গেলে তারা আবার বিয়ে করতে চাইলে মধ্যবর্তীসময়ে স্ত্রীকে আরেকটি বিয়ে করতে হত। এই দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাক্তি (স্বামী) স্ত্রীকে তালাক দিলে বা মারা গেলে স্ত্রী পুনরায় প্রথম স্বামীকে বিয়ে করতে পারত। এই মধ্যবর্তীকালীন বিয়েকে ‘হিল্লা’ বিয়ে বলে। তবে বর্তমানে হিল্লা বিয়েকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যাখ্যা: ৩ 

লোপা : বিয়ে-বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের কি কোন দায়িত্ব আছে ?

উকিল : বিয়ে-বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে ডেকে সালিশের ব্যবস্থা করতে পারেন। ব্যাখ্যা: ৪

লোপা : এক্ষেত্রে কাজী কি দায়িত্ব পালন করতে পারেন ?

উকিল : কাজীর দায়িত্বগুলো হলো :

  • জন্ম ও বিবাহের মতো তালাকও রেজিষ্ট্রি করতে হয়।
  • নিকাহ নিবন্ধক কাজী তার এখতিয়ারভূক্ত এলাকার মধ্যে আবেদনপত্রের ভিত্তিতে তালাক রেজিষ্ট্রি করবেন।
  • তালাক রেজিস্ট্রির জন্য নিকাহ নিবন্ধক ২০০ টাকা ফি নিবেন (এই ফি সময়ে সময়ে সরকারী প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিবর্তন করা হয়)।
  • যে ব্যক্তি তালাক কার্যকর করেছে সে রেজিস্ট্রির জন্য আবেদন করবে এবং ফি দেবে।
  • উক্ত দুই পক্ষের মধ্যে সত্যি তালাক কার্যকর হয়েছিল কিনা তা নিকাহ নিবন্ধক পরীক্ষা করে দেখবেন।

লোপা : মুসলিম পারিবারিক আইনে তালাক সম্পর্কে কি বলা হয়েছে ?

উকিল : মুসলিম আইনে বিয়ে একটি চুক্তি, তাই এ চুক্তি নানা কারণে সমাপ্ত বা ভংগ করা যায়। মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের চুক্তি ভেঙ্গে বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব। ব্যাখ্যা: ৫

উকিল : তোমার বিয়ে কি রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল ?

লোপা : হ্যাঁ।

উকিল : তাহলে তুমি বুদ্ধিমানের কাজ করেছ। তালাক হলে তুমি তোমার দেনমোহর পাওয়ার আবেদন করতে পারবে।

সাইদ তালাক বহাল রাখার কারণে লোপা ও সাইদের বিয়েটা টেকে না। তবে তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রিশন হওয়ার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের পর লোপা সাইদের কাছ থেকে দেনমোহর ও ভরণপোষণ পান।

 
 

সচরাচর জিজ্ঞাসা 

প্রশ্ন ১. মুখে মুখে তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে কি ?

উত্তর. না, ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিষ্টেশন আইন অনুযায়ী কাজীর মাধ্যমে তালাক দিতে হবে এবং তালাকের নোটিশ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনকে পাঠাতে হবে।

প্রশ্ন ২. স্বামী কতৃর্ক স্ত্রীকে নোটিশ প্রদান ছাড়া তালাক দিলে তালাক কি কার্যকর হবে ?

উত্তর. হ্যাঁ, তালাক কার্যকর হবে, তবে নোটিশ প্রদান না করায় স্বামীর ১ বছরের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড হবে।

প্রশ্ন ৩.স্বামী কি স্ত্রীকে কোন কারণ ছাড়াই তালাক দিতে পারেন ?

উত্তর. হ্যাঁ, স্বামী-স্ত্রীকে কোন প্রকার কারণ ছাড়াই তালাক দিতে পারেন।

৪. স্ত্রী কি স্বামীকে কোন কারণ ছাড়া তালাক দিতে পারেন ?

উত্তর. না, আইনে উল্লেখিত কারণ ছাড়া স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারেন না।

৫. গর্ভাবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দিলে তালাক কি কার্যকর হয় ?

উত্তর. না, গর্ভাবস্থায় তালাক দিলে তালাক কার্যকর হয় না। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ প্রদান করে ৯০দিন পর তালাক কার্যকর করতে হয়।

৬. বিচ্ছেদপ্রাপ্ত/ তালাকপ্রাপ্ত স্বামী- স্ত্রী কি পুনরায় ঘর সংসার করতে পারেন? 

উত্তর. ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৭ (৬) ধারা অনুসারে তালাকের মাধ্যমে কোন বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে, বিচ্ছেদপ্রাপ্ত/ তালাকপ্রাপ্ত স্বামী-স্ত্রী পুনরায় একত্রে ঘর- সংসার করতে চাইলে নতুন করে নিয়ম অনুসারে বিয়ে করতে হবে; তবে পুনর্বিবাহ করে ঘর-সংসার করায় আইনতঃ কোন বাধা নেই।

 তথ্যসূত্র 

  1. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১।
  2. মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিষ্টেশন আইন, ১৯৭৪।
  3. মুসলিম পারিবারিক আইন, পৃষ্ঠা নং ৩2, পারিবারিক আইনে বাংলাদেশের নারী, প্রথম প্রকাশ: জুন-১৯৯৭, আইন ও সালিশ কেন্দ্র।
  4. এ্যাডভোকেট, আলী, সালমা, বিয়ে, বিচ্ছেদ ও স্ত্রীর তালাকের অধিকার, পৃষ্ঠা নং ১, নারী ও আইন, চতুর্থ সংস্করণ: ডিসেম্বর ১৯৯৩, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি।
  5. চৌধুরী, শামিমা, নিবন্ধ-তালাক: নারী বিরোধী লোকাচার, উন্নয়ন পদক্ষেপ, দ্বাদশ বর্ষ, নবম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০০৬।

 
 

 
 

মুসলিম আইনে তালাকের অধিকার : ব্যাখ্যা

ব্যাখা: ১ 


  
১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারা অনুযায়ী যে ব্যক্তি তালাক দিবেন তিনি লিখিত ভাবে তালাকের নোটিশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌরসভার চেয়ারম্যান/সিটি কর্পোরেশন বরাবরে ও স্ত্রীর কাছে একটি নোটিশ পাঠাবেন।

  • নোটিশ না পাঠালে ১ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হবে।
  • নোটিশ পাবার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান/মেয়র শালিসী পরিষদ গঠন করবেন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা করবেন।
  • শালিসী পরিষদ উভয়কে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতি ৩০ দিনে ১টি নোটিশ করে মোট ৩টি নোটিশ প্রদান করবেন। এর মধ্যে স্বামী নোটিশ প্রত্যাহার না করলে তালাক কার্যকর হবে। স্বামীকতৃর্ক নোটিশ প্রত্যাহার করলে তালাক কার্যকর হবে না।
  • তালাক প্রদানের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে তালাক কার্যকর হবে না। তবে সন্তান প্রসব হওয়ার পর পর্যন্ত নোটিশ বহাল রাখলে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে। কিন্তু এর মধ্যে স্বামী নোটিশ প্রত্যাহার করলে তালাক কার্যকর হবে না।
  • ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে অধ্যাদেশের কোথাও নোটিশ প্রধান না করলে তালাক হবে না একথা উল্লেখ নাই। তবে স্বামী শাস্তি পাবেন।
  • তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী যখন ইচ্ছা তখন একতরফাভাবে তালাক দিতে পারেন। তাকে তালাকের কারণ দেখাতে হয়না। কেন স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিলেন তা স্ত্রী জানতে চাইতে পারেন না। এটি স্বামীর একতরফা ক্ষমতা।

ব্যাখা: ২

ক. আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ 

১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচেছদ আইন অনুযায়ী একজন স্ত্রী কি কি কারণে স্বামীর বিরুদ্ধে  আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন তা সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ আছেঃ

  1. চার বৎসর যাবৎ স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে বা কোন খোঁজ খবর না রাখলে।
  2. দুই বৎসর ধরে স্ত্রীর খোরপোষ প্রদানে স্বামী অবহেলা করলে বা ব্যর্থ হলে।      
  3. স্বামী ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে।
  4. স্বামী ৭ বছর বা তার চেয়ে বেশী সময়ের জন্য কারাদন্ডে দন্ডিত হলে।
  5. স্বামী কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তিন বছর ধরে তার দাম্পত্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে।
  6. বিয়ের সময় স্বামী পুরুষত্বহীন থাকলে এবং তা মামলা দায়ের করার সময় পর্যন্ত বজায় থাকলে।
  7. স্বামী দুই বৎসর ধরে অপ্রকৃতিস্থ থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্থ বা মারাত্মক যৌনরোগে আক্রান্ত থাকলে।
  8. আঠারো বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগে অর্থাৎ নাবালিকা অবস্থায় স্ত্রীর বিয়ে হয়ে থাকলে এবং উনিশ বৎসর হওয়ার আগেই স্ত্রী বিয়ে অস্বীকার করলে। তবে এক্ষেত্রে স্বামীর সাথে দাম্পত্য মিলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে এরকম মামলা দায়ের করা যাবে না।
  9. নিম্নলিখিত যে কোন অর্থে স্বামী স্ত্রীর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করলে-                                             

  ক. স্বামী যদি স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে থাকেন;    

  খ. স্বামী খারাপ চরিত্রের মেয়েদের সাথে মেলামেশা করলে কিংবা নৈতিকতা বর্জিত জীবন যাপন করলে;

  গ. স্ত্রীকে জোর পূর্বক নৈতিকতাবিহীন জীবন-যাপনের জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করলে;          

  ঘ. স্ত্রীর অমতে তার সম্পত্তি হস্তান্তর করলে কিংবা স্ত্রীকে তার সম্পত্তির ওপর বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা দিলে; 

  ঙ. স্ত্রীকে তার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে বাধা প্রদান করলে।  

 চ. যদি স্বামীর একাধিক স্ত্রী থেকে থাকে এবং পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুসারে স্বামী তাদের সাথে সমান ব্যবহার   না করলে।

১০. মুসলিম আইনে স্বীকৃত অন্য যে কোন যুক্তিসংগত কারণের উপরও স্ত্রী আদালতে তালাকের অনুমতির জন্য মামলা করতে পারেন।

 
 

আদালত বিয়ে বিচ্ছেদের ডিক্রি দিলে ডিক্রির একটা সত্যায়িত কপি আদালতের মাধ্যমে চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাতে হবে। চেয়ারম্যান নোটিশটিকে তালাকের নোটিশ হিসেবে গণ্য করে উভয় পক্ষকে নোটিশ প্রদান করবেন। চেয়ারম্যান যেদিন নোটিশ পাবেন তার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে।

খ. তালাক-ই-তৌফিজ-

‘কাবিন নামা’র ১৮ নং কলামে স্বামী কতৃর্ক স্ত্রীকে বিয়ে বিচ্ছেদের ক্ষমতা দেয়াকে ‘তালাক-ই-তৌফিজ’ বলে। এই ‘তালাক-ই-তৌফিজের’ ক্ষমতা দেয়া থাকলে স্ত্রী আদালতের আশ্রয় ছাড়াই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। এক্ষেত্রে স্বামীর মতোই স্ত্রী তালাকের নোটিশ চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাবেন ও এক কপি স্বামীর কাছে পাঠাবেন। নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে।

গ. খুলা- 

খুলা তালাক হলো স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর দাম্পত্য অধিকার থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রস্তাব। এক্ষেত্রে স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে স্বামীকে বিচ্ছেদের বিষয়ে রাজী করানোর চেষ্টা করবেন। স্বামী রাজী থাকলে এভাবে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। বিচ্ছেদের উদ্যোগ অবশ্যই স্ত্রীর কাছ থেকে হতে হবে।

ঘ. মুবারত- 

স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে বিয়ে-বিচ্ছেদ সম্পন্ন হলে তাকে মুবারত বলে। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদের ইচ্ছাদি পারস্পারিক হয় তখন একপক্ষ প্রস্তাব করে এবং চুক্তির মাধ্যমে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। যিনি বিয়ে বিচ্ছেদের প্রস্তাব দিবেন তিনিই নোটিশ পাঠাবেন।

ব্যাখা: ৩

◊      ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে হিল্লা বিয়েকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

  • ১৯৬১ সালের আইনে তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে হিল্লা বিয়ের দরকার হয় না।
  • তবে পর পর ৩ বার তালাক হলে তৃতীয় বারের পর স্বামী ১ম স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে স্ত্রীকে আরেকটি বিয়ে দিয়ে তারপর সেই বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে প্রথম স্বামী স্ত্রীকে আবার বিয়ে করতে পারবেন।

ব্যাখা: ৪

বিয়ে-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হলো ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুসারে যে নোটিশ তাকে দেয়া হয় তা পাবার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে ডেকে সলিশের ব্যবস্থা  করা । সালিশে পুনর্মিলনের একটি সম্ভাবনা থাকে বলে এখানে চেয়ারম্যান ও সালিশী পরিষদের ভূমিকা অপরিসীম।

ব্যাখা: ৫

◊         তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন ও স্ত্রী কর্তৃক শর্ত সাপেক্ষে তালাকের অধিকার প্রদানসহ মুসলিম পরিবারের পারিবারিক সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৩৯ সালে মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন এবং ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ আইন জারি করা হয়।

  •  বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে এই আইনকে পরিমার্জন ও গ্রহণযোগ্য করা হয়।
  •  ১৯৭৪ সালে মুসলিম বিবাহ তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন প্রণীত হয়। মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর বৈধ স্বত্ত্ব-স্বার্থ নির্ধারণ করে স্ব স্ব স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন একত্রীকরণ ও সংশোধন করে এটি প্রণয়ণ করা হয়।
  •  এরপর বিবাহ-তালাক বিধিমালা রেজিস্ট্রেশন ১৯৭৫ সালে জারি করা হয়।
  • বিবাহ- বিচ্ছেদ, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি পারিবারিক বিষয়াদির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ প্রণীত হয়।

ঢাকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিষ


ঢাকার বাতাসে বিষ

বুধবার প্রতিবেদন ঢাকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিষ। বাতাসের দূষণ এতটাই মাত্রাতিরিক্ত যে, সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বছরে কয়েক হাজার মানুষ মারা যায় এ দূষণের কারণে। এছাড়াও লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন শ্বাসজনিত রোগে ভোগে। জাতীয় পর্যায়ে রাজধানীর বাতাস দূষণের বোঝাটি এতটাই ব্যাপক যে প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প পরিমাণের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর এটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি সমাপ্ত বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বায়ু দূষণ দেশের মৃত্যুহার এবং মানুষের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেওয়ার একটি বড় কারণ।

ঢাকার বায়ু দূষণের মাত্রা সম্প্রতি এতটাই বেড়েছে যে, বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইডসহ নানা দূষিত উপাদানের কারণে মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে শিশুরা শ্বাসনালী সংক্রান্ত নানা সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ু দূষণের কারণে ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি রক্তশূন্যতাও দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা শিশুদের একটা বড় অংশ শ্বাস-প্রশ্বাস সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসকরা বলছেন, দূষিত বায়ুর কারণে শিশুরা এলার্জি, অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত রোগ এতটাই প্রকট যে, তা ডায়রিয়ার প্রকোপকেও ছাড়িয়ে গেছে। দূষিত বাতাসের মাধ্যমে ফুসফুসে সিসা ও অদৃশ্য বস্ত্তকণা ঢুকে নিউমোনিয়া ও রক্তস্বল্পতা দেখা দিচ্ছে। তবে তারা বলছেন, এসব রোগ আগেও ছিল। আর ১০ বছরে তা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। তাছাড়া, আগে সামান্য পরিচর্যায় এসব রোগ ভালো হলেও এখন শিশুদের বয়স্কদের মতো দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

শনিবার ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহিঃবিভাগে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের দীর্ঘ লাইন- যাদের একটি বড় অংশই শ্বাসজনিত রোগী। কথা হয় চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সুমা আক্তারের (১৩) পিতা সিদ্দিক মোল্লার সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় এক মাস ধরে সুমা মাঝে মাঝে মাথায় ব্যথা অনুভব করছে। বিশেষ করে স্কুল থেকে ফেরার পর মাথা ব্যথাটা বেশি অনুভব করে। বর্তমানে যন্ত্রণা অনেক বেশি হয়েছে। তাই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। লিপি মন্ডলের বয়স মাত্র সাত বছর। কিন্তু এই বয়সেই তার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হয়। বিশেষ করে রাতে লিপির শ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। লিপির মা নমিতা মন্ডল বলেন, আমাদের বংশে কারো শ্বাসকষ্ট রোগ নেই। তারপরও কী কারণে আমার মেয়ের এ রোগ হলো তা বুঝতে পারছি না। রক্তশূন্যতায় ভোগা সিহাবের (৭) মা নূরু-উন-নাহার জানান, শিহাবের বাবা রিকশা চালায়। দীর্ঘদিন ধরে সে রক্তশূন্যতায় ভুগছে। বর্তমানে একই সঙ্গে তার শ্বাসকষ্ট রোগ হয়েছে। শুধু সুমা, লিপি, সিহাব ও মিম নয় ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের প্রতি সাতজনের চারজনই অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত।

একই চিত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে। এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষের একটা বড় অংশ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসাসেবা নিতে আসা শিশুদের একটা বড় অংশ শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত। তসলিমা আক্তারের (১০) মা জাহানারা বেগম জানান, তার মেয়ের রাতে প্রচন্ড কাশি হয়। একই সঙ্গে তসলিমার শ্বাস-প্রশ্বাসেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। রেজাউল করিমের (৭) পিতা করিম উদ্দিন বলেন, রেজাউলের প্রায় সময়ই মাথা ব্যথা করে। কাশিও হয়। তবে কাশির সঙ্গে কোনো কফ নেই। আর মাঝে মাঝে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।  কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন হচ্ছে বলে তিনি জানান। সেকেন্দারের (৯) পিতা এনামূল হক জানান, গত সপ্তাহে একবার এনামুলকে ডাক্তার দেখানো হয়। ওষুধ খাওয়ানোর পর শ্বাসকষ্ট কিছুটা কম হয়েছে। তবে এখনো রাতে মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দেয়। ফারহানা আক্তারের (৪) পিতা স্বপন মোল্লা জানান, জন্মের সময় থেকে তার অ্যাজমার সমস্যা ছিল বলে ডাক্তার জানিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থের অভাবে তিনি মেয়েকে ভালো চিকিৎসা করাতে পারেননি। বর্তমানে তার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

ইবনে সিনা হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে তাদের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের শতকরা প্রায় ১১ ভাগ রোগীই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছে। এক সপ্তাহে ইবনে সিনার ধানমন্ডি শাখার জরুরি বিভাগে ১৯৫ জন চিকিৎসা নিয়েছে। যাদের মধ্যে ২৩ জনই ব্রঙ্কিয়ালে আক্রান্ত। এছাড়া একই কারণে হাসপাতালটিতে গত এক সপ্তাহে ২৬ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি ফারুক রেজার (৬) পিতা রফিক রেজা জানান, শুক্রবার ও শনিবার তিনি ছেলেকে নিয়ে বই মেলায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে ফারুকের কাশি হয়। শ্বাস নিতে সামান্য কষ্টও হচ্ছিল। পরে সমস্যা আরো বেড়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। তামান্না জাহান রোজির (৪) মা রোকেয়া আক্তার বলেন, রোজির জন্মের পর থেকেই এমন সমস্যা। সামান্য ঠান্ডা লাগলেই শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়। তাই মেয়েকে সবসময় সাবধানে রাখি। কিন্তু বর্তমানে কোনো কারণ ছাড়াই সমস্যা লেগেই থাকছে। হালিমা আক্তার জ্যোস্নার (১৩) মা হাসিনা আক্তার বলেন, শীতের শুরুতে জ্যোস্নার সামান্য সর্দি-কাশি হয়। এটা জন্মের পর থেকেই হচ্ছে। তবে দুই-এক সপ্তাহ পর সাধারণত ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এ বছর পুরো শীতকাল জ্যোস্না সর্দি-কাশিতে ভুগেছে। আর বর্তমানে তার শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। তাই হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।

এ ব্যাপারে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২ (মহিলা ও শিশু) অধ্যাপক তাহমিনা বেগম বলেন, বায়ু দূষণের কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে অক্সিজেনের সঙ্গে বিষাক্ত সিসা প্রবেশ করছে। ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মক হারে কমে যাচ্ছে। তাই সামান্য কারণেই তারা সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে তা শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা বা নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে। শহরে বায়ু দূষণের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে এসব এলাকায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, আমার ২২ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি আগের থেকে এখন শিশুরা এসব রোগে প্রায় তিনগুণ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও সহকারী অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, বায়ু দূষণের কারণে সাধারণত শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালাপোড়া করা, নিউমোনিয়া, রক্তদূষণ, চর্মরোগ হয়ে থাকে। বর্তমানে ঢাকার বাতাসে সিসা ও অদৃশ্য বস্ত্তকণার হার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যাওয়ায় শিশুরা এলার্জি, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাবসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের একটা বড় অংশ শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা জাতীয় রোগে আক্রান্ত। তিনি জানান, প্রতিনিয়ত এমন শিশুর সংখ্যা বাড়ছে।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ওয়াদুদ গনি বলেন, বর্তমানে যেসব শিশু চিকিৎসাসেবা নিতে আসছে তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ ব্রঙ্কিয়াল রোগে ভুগছে। আগেও শিশুদের এসব সমস্যা দেখা যেত। সে সময় পরিচর্যা আর সামান্য চিকিৎসা নিলে সাধারণত ভালো হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে সমস্যাটা পূর্ণবয়স্কদের মতো করে দেখা দিচ্ছে। তাদের দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে।

শ্বাসজনিত রোগের কারণ ও প্রকোপ যে কতটা প্রকট তার প্রমাণ মিলে পরিবেশ বিভাগের তথ্য থেকেও। পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ব্যাপক জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজধানী ঢাকার বায়ু দূষণের মাত্রা যদি বর্তমান পর্যায় থেকে শতকরা ২০ ভাগও কমিয়ে আনা যায় তাহলে বছরে কম করে হলেও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে মারা যায় এমন ১২০০ থেকে ৩৫০০ মৃত্যু ঠেকানো যায়। এছাড়াও প্রতি বছর কম করে হলেও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৮ থেকে ১০ কোটি কমে আসত।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত বাংলাদেশ সরকারের ‘নির্মল বাতাস ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্পের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বায়ু দূষণের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে রাস্তায় ব্যাপক সংখ্যক গাড়ি ও আশপাশের ইটের ভাটা থেকে উৎসারিত ধোঁয়াশা, রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি ও দালানকোঠা নির্মাণ কাজ থেকে উৎসারিত দৃশ্য ও অদৃশ্য কণা, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক কারখানার বর্জ্য ইত্যাদি। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই বায়ু দূষণ সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারলে সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যয় বছরে ১৭ কোটি থেকে ৫০ কোটি ডলার সাশ্রয় করা যেত।

পরিবেশ অধিদফতরের সূত্রে ঢাকার একটি দৈনিকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে কম করেও ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ধূলিকণা ভেসে বেড়াচ্ছে। সবচেয়ে শঙ্কার ব্যাপার সহনীয় মাত্রার চেয়ে এই পরিমাণ কম করেও পাঁচগুণ বেশি। ঢাকার বাতাসে সাধারণ ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো হচ্ছে সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ওজোন, হাইড্রোজেন সালফাইড, বিভিন্ন ধরনের সালফেট ও নাইট্রেট এবং দ্রবীভূত বিভিন্ন জৈব পদার্থ ইত্যাদি। এর সঙ্গে রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি সংক্রান্ত বিষাক্ত ধাতব যৌগ। এসব ধাতব পদার্থের মধ্যে রয়েছে সীসা, পারদ, ম্যাংগানিজ, আর্সেনিক, নিকেল ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে বেঞ্জিন, ফরমালেডেহাইড, পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইল, ডক্সিন ও অন্যান্য অদ্রবীভূত জৈব যৌগ।

বাতাসে এসব বিষাক্ত পদার্থ এত পরিমাণেই ভেসে বেড়াচ্ছে যে, ঢাকাকে তা একটি ভাগাড়ে পরিণত করেছে। ঢাকার বাতাস যে কতটা বিষাক্ত ও দূষিত তার প্রমাণ পাওয়া যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত একটি সমীক্ষা থেকে। এই সমীক্ষার ফলাফল দিয়ে তারা যে এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ২০১২ তৈরি করেছে, সে অনুযায়ী বিশ্বের মোট ১৩২টি দূষণ আক্রান্ত নগরীর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ৩১তম।

বাংলাদেশ পরিবেশ বিভাগের পরিমাপে, মাত্রা অনুযায়ী প্রতি কিউবিক মিটার বাতাসে ২.৫ মাইক্রনের ৬৫ মাইক্রোগ্রাম ও ১০ মাইক্রনের ১৫০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সহনীয়। কিন্তু এই বিভাগের পরিমাপে শীত ঋতুতে এই মাত্রা ২৭৪ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০০৮ সালে ঢাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ছিল গড়ে ৩৩৯ দশমিক ২৩ মাইক্রোগ্রাম, ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২৮ দশমিক ১৩ মাইক্রোগ্রাম এবং ২০১০ ও ২০১১ সালে পর্যায়ক্রমে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটারে ৫৩৮ দশমিক ২০ ও ৬২৮ দশমিক ১২ মাইক্রোগ্রামে। একইভাবে বেড়েছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন যৌগসহ সব ধরনের দৃশ্য ও অদৃশ্য কণা।

পরিবেশ বিভাগের মতে, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাতাসে বিভিন্ন ধরনের কণার পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণে কম থাকে। কিন্তু নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এর পরিমাণ ভয়াবহ আকারে বেড়ে যায়। এ সময় এই পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ৪৬৩ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এই দূষণের মাত্রা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বায়ু দূষণের শিকার বলে পরিচিত দুটি শহর মেক্সিকো ও মুম্বাইয়ের বায়ু দূষণের মাত্রা হলো প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ৩৮৩ ও ৩৬০ মাইক্রোগ্রাম।

বায়ু দূষণের প্রধান কারণ হচ্ছে অটোমোবাইল, ইটের ভাটা, শিল্পবর্জ্য, যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা নির্মাণ ও রাসায়নিক কারখানা, অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো (সড়ক, গৃহ) নির্মাণ কাজ, মেরামত, নাগরিকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনীহা ইত্যাদি। ২০০২ সালের আগে গ্যাসোলিন দিয়ে গাড়ি চালানো, পুরনো গাড়ি বিশেষ করে টু স্ট্রোক অটোরিকশা বাতিল করায় ও সিএনজি দিয়ে গাড়ি চালানোর ব্যবস্থা করায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু পরিবেশ বিভাগের তথ্য মতে, নতুন করে ডিজেল চালিত পুরনো গাড়ি, ইটের ভাটা ও অবকাঠামো (গৃহ ও রাস্তাঘাট) নির্মাণ নিয়ন্ত্রণহীন বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন আবাসিক এলাকাসহ যত্রতত্র গজিয়ে গাড়ি মেরামত ও রড সিমেন্টের দোকান। নগরজীবনে প্রতিদিনের পারিবারিক ও গৃহস্থালী কাজের বর্জ্য নিষ্কাষণ ব্যবস্থার অসচেতনতাও দুষণের বড় কারণ। এরই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড়ের চিত্রে।

যেহেতু বায়ু দূষণের কারণগুলো চিহ্নিত, তাই এর মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজন উদ্যোগের। এর দায় সরকারের।
http://budhbar.com/?p=7771

একজন ইলিয়াস ও একটি বিজয়


একজন ইলিয়াস ও একটি বিজয়

রওনাক সালাম

Los Angeles, April 25, 2012

তুমি এখন কি ভাবছ ইলিয়াস?­
কি চিন্তাধারায় আবর্তিত তোমার মন?

তুমি এখন কি ভাবছ ইলিয়াস?
বাংলাদেশের পরাজয় না কি একটি মুক্তাংগন ?

৭১’এর বাংলাদেশ যে এখণ আবার আক্ক্রান্ত রাহুর কবলে!
কি ভয়ানক করাল তার গ্রাস!
এই গ্রহনে যে সব জালিয়ে-পুড়িয়ে একাকার, তাইনা ইলিয়াস?

ঘরে ঘরে গুম খুণ, হত্তা, আর বক্তব্বের টুটি চিপে ধরার কি এক ভয়ংকর খেলায়
ওরা মেতে গেছে,
-এখন কি হবে ইলিয়াস??
তুমিই পারো, বোধকরি তোমাকেই মহাশান্তির জণক এতদিন পরে
নিরধারন করলেন—ইলিয়াস
একদার সুজলা-সুফ লা বাংলাদেশকে হানাদারদের কবল
থেকে রক্ষার জন্ন
এগিয়ে আসো ইলিয়াস, হারকিউলিসের (Hercules) মত প্রবল শক্তিতে এসো,
কোরনা সারেন্ডার…

জীবনের বিনিময়ে হবে? …তবে তাই হোক

তবু হোক জয় বাংলার ষোল কোটী আপামর জনকণ্ঠের
শত মায়ের দোয়া তোমার জয় ধ্বনি হয়ে বাজুক…

—এইবার জেগেছে, ইলিয়াস জেগেছে, এইবার দুঃশাসন তুমি থেমে যাও—-

রুনি-সাগরের ভাসমান রুহু বেহেশত থেকে বলে উঠুক…
সাবাস ইলিয়াস, বাঃলার জয় তো তোমারই জয়।

——————————————————————-
ইলিয়াস আলী এবং আমাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতা
ড· ফে র দৌ স আ হ ম দ কো রে শী

ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জিকে পিল্লাই বছর দুই আগে তার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এক সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘ওভ রহঃবষষরমবহপব ভধরষং, ধিৎ রং ষড়ংঃ’- গোয়েন্দারা ব্যর্থ হলে যুদ্ধে পরাজয় অবধারিত। বিএনপির তর“ণ নেতা ইলিয়াস আলী এখনও নিখোঁজ। ১৭ এপ্রিল রাতে বনানীতে নিজ বাড়ির কাছেই অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তার গাড়ি থামিয়ে তাকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তাকে আর পাওয়া যা”েছ না। তিনি জীবিত আছেন কিনা- সে প্রশ্ন এখন সবার মনে।

ইলিয়াস আলী জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এমপি হয়েছেন। জাতীয়তাবাদী দলের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক। সাম্প্রতিককালে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ করে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে সক্রিয় ও আলোচিত রাজনীতিকদের অন্যতম। এমন একজন ব্যক্তিকে কে বা কারা এভাবে তুলে নিয়ে গেল, তুলে নিয়ে যাওয়ার এতদিন পরও তার কোন খোঁজখবর করা গেল না, এটা দেশে-বিদেশে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।

ইলিয়াস আলীর স্বজনদের জন্য বিষয়টি কতটা বিপর্যয়কর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের সান্ত্বনা দেয়ার কোন ভাষা নেই। কি‘ দেশের সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গন এ ঘটনায় হতবিহ্বল। আতংক ও অসহায়ত্ব ফুটে উঠছে সবার মনে। তাহলে তো কেউই নিরাপদ নয়! এ অসহায়ত্ব আরও তীব্র হ”েছ এজন্য যে, আমাদের আইন-শৃংখলার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সং’া সাম্প্রতিককালের অনেক চাঞ্চল্যকর অপহরণ ও খুনের ঘটনার মতো এ ঘটনারও কোন কূলকিনারা করতে পারছে না।

সরকারের তরফ থেকে বলা হ”েছ, ইলিয়াসকে উদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চলছে। সব ক’টি গোয়েন্দা সং’া, র্যাব এবং পুলিশ সর্বশক্তি নিয়ে কাজে নেমেছে। কি‘ ইলিয়াসকে কারা তুলে নিয়েছে, কেন নিয়েছে, তাকে আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা, এসব প্রশ্নের কোন উত্তর মিলছে না।
পনেরো কোটি মানুষের একটি সমস্যাসংকুল দেশের অি’র সামাজিক-রাজনৈতিক পরিি’তিতে নানা কারণে নানা ধরনের সংঘাতের উদ্‌ভব ঘটতে পারে। সংঘাতের জের ধরে কিছু অনাসৃষ্টি ঘটা বিচিত্র কিছু নয়। তবে সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সং’াসমূহ পরিি’তি মোকাবেলায় সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে, অপরাধী শনাক্ত হবে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাবে, এটাই প্রত্যাশিত। এটাই রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের ‘সামাজিক চুক্তি’ বা ঝড়পরধষ পড়হঃৎধপঃ; যা আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি।

দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিককালে আমাদের রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন সব বক্তব্য আসছে, যা এ ‘সামাজিক চুক্তি’ অস্বীকার করার শামিল। সাংবাদিক দম্পতির হত্যার পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন, ‘কারও বেডর“ম পাহারা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের নয়।’ ভালো কথা। ইলিয়াস আলীকে তো বেডর“ম থেকে তুলে নেয়া হয়নি। নগরীর কেন্দ্র’লের রাজপথ থেকেই তুলে নেয়া হয়েছে। এবার প্রধানমন্ত্রী কী বলবেন? তিনি বললেন, ‘বিএনপি নিজেরাই ইলিয়াসকে লুকিয়ে রেখেছে!’

ধরে নেয়া যাক, ব্যাপারটা সে রকমই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে খবর থাকতে পারে, বিএনপি কিছু একটা চক্রান্তমূলক কাজ করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। সে রকম সম্্‌ভাবনা একেবারে উড়িয়েও দেয়া যায় না। রাজনীতিতে তা বিচিত্র কিছু নয়। কি‘ তাহলে তো উচিত হবে ইলিয়াসকে চটজলদি জনসমক্ষে হাজির করা। সেক্ষেত্রে বিএনপির মুখে এমন চুনকালি লাগবে যে, আগামী নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আর কোন দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না। এমন লোভনীয় সুযোগ তিনি নি”েছন না কেন?

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও বলেছেন, ‘শিগগিরই ইলিয়াসকে জীবিত উদ্ধার করে জনসমক্ষে হাজির করা হবে।’ তার এ কথা থেকে অনেকে মনে করছেন ইলিয়াসকে কারা তুলে নিয়েছে এবং তিনি কোথায় আছেন কর্তৃপক্ষ তা জানে এবং তাকে উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে। এ লেখাটি কাগজে বের হওয়ার আগেই ইলিয়াস ফিরে আসুক। প্রধানমন্ত্রী এবং সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য সঠিক প্রমাণিত হোক। ইলিয়াস আলীর পরিবারের নির্ঘুম দিন-রাত্রির অবসান হোক। দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সেটাই প্রত্যাশা।

দুই
তবে ইলিয়াস আলী ফিরে এলেও সারা দেশের মানুষের মনে সাম্প্রতিককালে যে ভয়-বিহ্বলতা দানা বেঁধেছে তা দূর হবে না। গত এক বছরে এ রাজধানীতে এবং সারাদেশে আরও অনেক ‘খুন’ ও ‘গুম’-এর ঘটনা ঘটেছে, যার কূলকিনারা হয়নি। এটা যেন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিডিয়ার সামনে সরকার এবং আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর অতি-উৎসাহী উপি’তি থাকলেও এ ধরনের ঘটনাবলীর রহস্য উঞ্ছঘাটিত হ”েছ না। সে জন্য বিরোধী পক্ষ সরকার, পুলিশ ও গোয়েন্দা সং’াগুলোর সমালোচনায় মুখর। বিক্ষোভ-সমাবেশ, হরতাল, ভাংচুর চলছে দেশজুড়ে।

সরকারের ৫ বছরের মেয়াদ পূর্তির আর বেশি দেরি নেই। তারা আবার ক্ষমতায় আসতে চান। কি‘ জনমতের বাতাস অনুকূলে নয়। সেজন্য তাদের অি’রতা ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টাও সেই সঙ্গে বাড়ছে। আর তা করতে গিয়ে নানাবিধ বাড়াবাড়ি পরিি’তি আরও শোচনীয় করে তুলছে। যতই দিন যা”েছ, সরকার পক্ষ যেন মরিয়া হয়ে উঠছে।

অভাবের সংসারে পরিবারের কর্তা হওয়ার বিড়ম্বনা ভয়ংকর। তেমনি সীমিত সম্পদে সমস্যার পাহাড় উপড়ে ফেলার প্রতিশ্র“তি দিয়ে ক্ষমতায় বসাটা বাঘের পিঠে চড়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ। যতক্ষণ সম্্‌ভব পিঠের উপরেই থাকতে হবে। নামলেই বিপদ। বাঘের পেটে যাওয়ার শংকা। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে এ পর্যন্ত একবারও কোন দল দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হয়নি। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য হাজারও রকমের অনিয়ম করেও কোন লাভ হয়নি। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্্‌ভাবনা খুব একটা নেই। (চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা পৌর-কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয়কে অনেকে তারই আলামত মনে করছেন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ’গিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই বাস্তবতা আরও প্রকট হয়েছে।)

এ পটভূমিতে অন্য অনেক ঘটনার মতো ইলিয়াসের গুম হওয়া, সাগর-র“নীর হত্যাকাণ্ড এবং রেল মন্ত্রণালয়ের ঘুষ কেলেংকারির মতো ঘটনার রহস্য উঞ্ছঘাটনে আমাদের আইন-শৃংখলা বাহিনী বিশেষ করে গোয়েন্দা সং’াগুলোর ব্যর্থতা রীতিমতো হতাশাব্যঞ্জক।

এখানেই আবার পিল্লাইয়ের কাছে ফিরে যেতে হবে। ভারতের এযাবৎকালের স্বরাষ্ট্র সচিবদের মধ্যে তাকে সবচেয়ে জাঁদরেল ও সুদক্ষ মনে করা হয়। স্বরাষ্ট্র সচিব থাকাকালে তাকে ভারতের ‘তৃতীয় ক্ষমতাধর’ ব্যক্তি আখ্যা দেয়া হয়েছিল। ওপরে উদ্ধৃত তার বক্তব্যটি অবশ্য একেবারে নতুন কিছু নয়। একে আপ্তবাক্যও বলা যেতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্র“র অব’ান এবং পারিপার্শ্বিকতা বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সঠিক না হলে বিপর্যয় তো অনিবার্য হবেই। রাষ্ট্র পরিচালনা এবং যুদ্ধ পরিচালনা প্রায় সমার্থক। আর সেজন্যই রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সং’াগুলো সঠিকভাবে কাজ না করলে কিংবা করতে না পারলে রাষ্ট্র পরিচালনার যুদ্ধে পরাজয় এড়ানো অসম্্‌ভব।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে যেসব লোমহর্ষক ও অভিনব হত্যা-গুম, খুন-ডাকাতি-ধর্ষণ, ঘুষ-দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। বিশেষ করে গত এক বছরে শতাধিক ব্যক্তির ‘গুম’ হওয়ার রহস্য উঞ্ছঘাটিত হয়নি। প্রতিটি ঘটনা নিয়েই দেশজুড়ে হৈচৈ হয়েছে, মিডিয়ায় দিনের পর দিন নানাবিধ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। থানা-পুলিশ থেকে তদন্তভার অর্পিত হয়েছে গোয়েন্দা সং’ার ওপর। একাধিক গোয়েন্দা সং’ার জোর তৎপরতার কথা শোনা গেছে। কি‘ শেষ পর্যন্ত যে তিমিরে সেই তিমিরেই। অর্থাৎ আমাদের গোয়েন্দারা অপরাধী শনাক্ত করতে পারছেন না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধের ‘মোটিভ’ বা কারণ উঞ্ছঘাটনেও তারা সক্ষম হ”েছন না।

কেন এমন হ”েছ? এটা কি আমাদের ইন্টেলিজেন্সের ই”ছাকৃত গাফিলতি? নাকি আমাদের ‘ইনটেলিজেন্স’ তার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে? আমাদের গোয়েন্দা সং’াগুলো কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে? নাকি তারা কাজ করার উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলেছেন? যদি তাই হয়ে থাকে তা যে কারণেই হয়ে থাকুক না কেন, তাহলে তো আবারও পিল্লাইয়ের কথারই প্রতিধ্বনি করতে হবেঃ

তিন
রাজনীতিক ইলিয়াস আলীর ‘গুম’ ও সাংবাদিক সাগর-র“নীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাম্প্রতিককালের দুটি অতি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। দুটি ঘটনাই ঘটেছে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায়। উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের উ”চপর্যায় থেকে শুর“ করে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা, বাদ-প্রতিবাদ চলছে। মিডিয়ায় নানা সংবাদ, সংবাদ বিশ্লেষণ ও মন্তব্য প্রচারিত হ”েছ দিনের পর দিন। প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন, অনশন হ”েছ। লাগাতার হরতালে জনজীবন বিপর্যস্ত। কি‘ কোন ‘ক্লু’ বের হয়ে আসছে না।
ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার পেছনে মিডিয়ায় নানা ধরনের কথাবার্তা হ”েছ। লোকমুখে নানা গুজবও ডালপালা বিস্তার করছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হ”েছঃ
০ ইলিয়াস টিপাইমুখ বাঁধ ইসুøতে লংমার্চ আয়োজনে এবং আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা পালন করে মহলবিশেষের রোষানলে পড়েছেন, সেজন্যই তাকে এ পরিণতি বরণ করতে হয়েছে;
০ বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়েছেন তিনি;
০ একটি বিদেশী গোয়েন্দা সং’া বাংলাদেশের রাজনীতি তাদের অনুকূলে রাখার জন্য দেশের ১০০ রাজনীতিক, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সরিয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছে, এটা তারই অংশ;
০ বিএনপি বা সরকারবিরোধী কোন গ্র“প আন্দোলন চাঙ্গা করার জন্য একটা ইসুø তৈরি করেছে;
০ রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের ঘুষ কেলেংকারি ফাঁস হওয়ার পেছনে ইলিয়াসের ড্রাইভারের একটা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল, সেই ড্রাইভারকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনার সূত্রপাত;
০ ব্যক্তিগত কোন শত্র“তার জের ধরেই এ ঘটনা ইত্যাদি।

প্রকৃত রহস্য উঞ্ছঘাটিত না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের ঘুড়ি ওড়ানো চলতেই থাকবে। সরকারের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে ইলিয়াসকে গুম করা হয়েছে, যেমনটি বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হ”েছ, তা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোন নির্বাচিত সরকার, যে সরকার আবার নির্বাচিত হতে চায়, এমন কাজ করতে পারে, তা চিন্তার অতীত। কোন বিদেশী সং’া বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণভার হাতে নেয়ার জন্য দেশের রাজনীতির মাঠ থেকে তাদের অপছন্দের রাজনীতিকদের সরিয়ে দেয়া শুর“ করেছে, তেমন চিন্তাও আমরা করতে চাই না।

এক্ষেত্রে ভাবনার বিষয় হ”েছ এই, আমাদের গোয়েন্দা সং’াগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না। এটা গোটা জাতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য চরম দুশ্চিন্তার বিষয়। ক্ষমতাসীন সরকারের জন্যও। কারণ রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে তারা পদে পদে জবাবদিহিতা ও সমালোচনার সম্মুখীন হবেন। তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্রমাগত আরও প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে।

অনেকে মনে করছেন সরকারের বিভিন্ন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সং’াগুলোর ভেতর এখন এক ধরনের হতাশা ও লক্ষ্যহীনতা বিরাজ করছে। মাত্রাতিরিক্ত রাজনৈতিক চাপ, উ”চপর্যায় থেকে দৈনন্দিন হস্তক্ষেপ, এমনকি বিদেশী পরামর্শের বাড়াবাড়ি এসব সং’ার সদস্যদের নৈতিক মনোবল ভেঙে দি”েছ।
সাম্প্রতিককালে এমন কিছু ঘটনাও ঘটেছে যার বিরূপ ও সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ায় এখন এসব সং’ার অনেকে আর ঝঁুকি নিয়ে কোন কাজ করতে চাইছেন না। রাজনৈতিক সরকারের নির্দেশ আক্ষরিকভাবে পালন করা তাদের কর্তব্য, কি‘ তেমন নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সাম্প্রতিককালে অনেক উ”চপদ’ পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন। এক সরকারের আমলে ওপরের নির্দেশে কাজ করতে গিয়ে পরবর্তী সরকারের আমলে অনেককে চরম হয়রানির সম্মুখীন হতে হ”েছ। এক্ষেত্রে কথিত ‘দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা’র বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। কাজটি ভালো কী মন্দ, উচিত কী অনুচিত, সে বিতর্ক থাক। কি‘ মন্দকাজ হলে তার চূড়ান্ত দায়-দায়িত্ব কার সে বিষয়টি স্পষ্ট না করে তখনকার সময়ের গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের যেভাবে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি দিয়ে হেন’া করা হয়েছে, তাতে ওই ব্যক্তিদের যতটা অপমান করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি সমগ্র পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের অবমাননা করা হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে আমাদের পুলিশ, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীর নিয়মানুবর্তিতা ও রাজনৈতিক সরকারের প্রতি আনুগত্যে চিড় ধরিয়ে দিয়েছে।

আমাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতা সে রকম একটা পরিি’তির পরিণতি কিনা, তা বর্তমানের শাসকশ্রেণী ও ভবিষ্যতের ক্ষমতা-প্রত্যাশী উভয় মহলকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
ড· ফেরদৌস আহমদ কোরেশীঃ রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি গবেষক

অটিজম একটি মনোবিকাশ সমস্যা Autism in Bangladesh


অটিজম একটি মনোবিকাশ সমস্যা
More:
স্বাস্থ্য: শিশুর অটিজম এবং আমরা: লিঙ্ক/


দেশের শতকরা ১০ ভাগ মানুষ প্রতিবন্ধিতার শিকার। এর মধ্যে ১ শতাংশ অটিজম আক্রান্ত। এ হিসেবে দেশে প্রায় দেড় লাখ অটিস্টক শিশু রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য ও কমিউনিক্রাবল ডিডিজ কন্ট্রোলের বরাত দিয়ে আমেরিকায় কর্মরত শিশু মনোবিজ্ঞানী ড:এম হক জানান, বিশ্বে ১ শতাংশ অটিটিস্ট শিশু।

 অটিজম কি?
অটিজম কোন সাধারণ রোগ নয়। এটি শিশুদের একটি মনোবিকাশগত জটিলতা যার ফলে সাধারণত ৩টি সমস্যা দেখা
দেয়া। যেগুলো হচ্ছে- প্রথমতঃ মৌখিক কিংবা অন্য কোনো প্রকার যোগাযোগ সমস্যা, দ্বিতীয়তঃ সমাজিক বিকাশগত সমস্যা, তৃতীয়তঃ খুব সীমাবদ্ধ ও গণ্ডিবদ্ধ জীবন-যাপন ও চিন্তা-ভাবনা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এছাড়া অতি চাঞ্চল্য (Hiper Activity), জেদী ও আক্রমণাত্মক আচরণ (Aggressiveness), অহেতুক ভয়ভীতি, খিচুনী ইত্যাদি ও থাকতে পারে।

অটিজম রোগটি কবে অবিষ্কৃত হয়েছে ?

১৯৪৩ সালে জন হপকিনস হাসপাতালের ডাঃ লিও কান্নের এবং প্রায় একই সময়ে জার্মান বিজ্ঞানী ডাঃ হ্যান্স এসপারজার রোগটি সম্বন্ধে বিস্তারিত জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন। তার আগে রোগটি থাকলেও এসম্বন্ধে তেমন কোন ধারণা ছিল না। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে এই রোগটি নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে।Ekush-Autism

রোগটি কোন্‌ বয়সে এবং কিভাবে সনাক্ত করা যায়?

সাধারণত শিশুর বয়স ১৮ মাস থেকে ৩ বছর এবং মধ্যে এই রোগ দ্ব্যর্থহীনভাবে সনাক্ত করা সম্ভব হয়। এখানে উল্লেখ্য যে যত দ্রুত রোগটি সনাক্ত করা যায়, শিশুর জন্য ততই মঙ্গল। সাধারণত নিন্মলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর মাধ্যমে অটিষ্টিক রোগটি সনাক্তকরণ সম্ভবঃ এদের ভাষার বিকাশ হতে বিলম্ব হয়। (এক বছর বয়সে অর্থবহ অঙ্গভঙ্গি, ১৬ মাস বয়সে একটি শব্দ এবং ২ বছর বয়সে ২ শব্দের বাক্য বলতে পারে না)। এই রোগে আক্রান্ত শিশু সমবয়সী কিংবা অন্যান্যদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। এরা নাম ধরে ডাকলে ও সাড়া দেয় না এবং আপন মনে থাকতে পছন্দ করে। এরা অন্যদের চোখের দিকে তাকায় না। অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসে না কিংবা আদর করলেও ততটা সাড়া দেয় না। একই কথা পুনঃরাবৃত্তি করে এবং একই কাজ বার বার করতে পছন্দ করে। এদের কাজ-কর্ম এবং সক্রিয়তা সীমিত ও গণ্ডিবদ্ধ। পরিবেশ এবং আশেপাশের কোন পরিবর্তন খুব অপছন্দ করে। এরা কখনো কখনো অতি সক্রিয় আবার কখনো কখনো খুব কম সক্রিয় হয়। অতিসক্রিয়তা থেকে কখনো কখনো খিচুনী হতে পারে।

সাধারণত দোলনা/রকিং চেয়ার বা এই জাতীয় পুনঃরাবৃত্তিমূলক খেলা পছন্দ করে। সাধারণত খেলনা দিয়ে কোন গঠনমূলক খেলা খেলতে পারে না অথবা কোন বিশেষ খেলনার প্রতি অত্যধিক মোহ দেখা যায়। কখনো মনে হতে পারে যে এরা কানে শুনতে পায় না। এরা মাকে বা অন্য কোন প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে না এবং তাদের কেউ ধরলেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না অথবা অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এরা কখনো আত্মপীড়ন করে এবং মনে হয় তাতে সে তেমন কষ্ট পায় না। কোন বিশেষ কিছুর প্রতি অত্যাধিক আকর্ষণ থাকে যেমন- কাগজ ছেঁড়া, পানি, তরল পদার্থ দিয়ে খেলা, চাল, ডাল দানাদার কিছু দিয়ে খেলা ইত্যাদি। সাধারণত কল্পনাপ্রসূত খেলা খেলতে পারে না। কোন বিশেষ সংবেদন-এর প্রতি অস্বাভাবিক আচরণ করে যেমন আলোতে চোখ বন্ধ করা, শব্দ শুনলে কানে হাত দেয়া, দুর্গন্ধে কোন প্রতিক্রিয়া না করা, স্বাদ ও স্পর্শে তেমন কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ না করা ইত্যাদি।Ekush-Autism

কি কারণে অটিজম রাগটি হতে পারে?

এখনো পর্যন্ত অটিজম কেন হয় তার সঠিক কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। মনেবিকাশের প্রতিবন্ধকতার কারণ হিসাবে মস্তিস্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিস্কের অস্বাভাবিক গঠন, বংশগতির অস্বাভাবিকতা, এমন কি বিভিন্ন টিকা প্রয়োগ থেকে এই রোগ হতে পারে বলা হলেও নির্দিষ্ট করে কিছু এখনো জানা সম্ভব হয়নি। জন্ম পরবর্তীêকালের কোন জটিলতা কিংবা শিশুর প্রতি অমনোযোগিতার ফলে এই রোগের সৃষ্টি হয় না। কাজেই কোন বাবা মা ও আত্মীয়-স্বজন নিজেদের দোষী ভাবা অথবা বাবা-মাকে দায়ী করার কোন যৌক্তিকতা নেই।

অটিজম রোগটির প্রাদুর্ভাব কেমন?

বর্তমানে পৃথিবীতে অটিজম রোগটি প্রায় মহামারীর পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ একে এইচআইভি এইডস এর সাথে তুলনা করেছেন। আমাদের দেশে সঠিক তথ্য না থাকলেও গড়ে প্রতি হাজারে ১০ থেকে ২০টি শিশু এই রোগে আক্রান্ত বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। উন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গেছে।

অটিজম রোগটির কি কোন চিকিৎসা আছে?

অটিজম সারিয়ে তোলার জন্য কোন প্রকার জাদুকরী চিকিৎসা এখনও পর্যন্ত অবিষ্কৃত হয়নি। এরূপ পরামর্শে বিভ্রান্ত হওয়া বোকামী। তবে নিজেদের সম্পূর্ণ অসহায় মনে করাও সঠিক নয়। কেননা বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, পিতা-মাতা ও আপনজনদের শ্রম ও যত্ন এবং এই রোগের সাথে সংশিস্নষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহায়ক দলের একত্রে কার্যক্রমে শিশুর বিকাশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হলেও একটি শিশুকে স্বাধীন জীবন-যাপন করার মত পর্যায় আনা সম্ভব হয়। আর এজন্য যা করণীয় তা হচ্ছেঃ এ ধরনের শিশুর বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুটিকে সার্বক্ষনিক সহায়তা প্রদান। কিছু ঔষধপত্র প্রয়োগ যা তার অন্যান্য শারীরিক অসুবিধা দূরীকরণে সহায়তা করে। দ্রুততার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া যা শিশুটির ভাষা বিকাশ, সামাজিক বিকাশ, স্বাবলম্বিতার বিকাশ, বিশেষ দক্ষতার বিকাশ এবং অন্যান্য স্বকীয়তা অর্জনে সহায়তা করবে। সামাজিক স্বীকৃতি এবং সকলের সহযোগিতা এই ধরনের শিশুর বিকাশের জন্য খুবই জরুরী। সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ এখনো এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানে না। কাজেই সহযোগিতার বিষয়টি একান্তই অবান্তর।

অটিষ্টিক শিশুরা কি প্রতিবন্ধী?

অটিষ্টিক শিশুরা কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী হয়। এই ধরনের শিশুদের তাই বিশেষ প্রয়োজন সম্পন্ন শিশু বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন বলা হয়। যথাযথভাবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তারা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে বিধায় এদের প্রতিবন্ধী আখ্যায়িত করা সঠিক নয়।

অটিষ্টিক শিশুদের বিভিন্ন পর্যায় কি কি ?

সাধারণত অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ৪টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। বয়সের সাথে নয় বরং প্রতিটি শিশুর সামর্থেøর উপর তার পর্যায় নির্ভর করে।

পর্যায়গুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

প্রথম পর্যায়ঃ আত্মকেন্দ্রিক স্তরঃ এই পর্যায়ে শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক থেকে এবং আপন মনে একাকী খেলতে পছন্দ করে। এরা সাধারণত কোন আদেশ-নিষেধ অথবা নির্দেশ বুঝতে পারে না ও পালন করে না।

দ্বিতীয় পর্যায়ঃ অনুরোধকারী স্তরঃ এই পর্যায়ের শিশুরা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে খুব কাছের লোকদের সাথে অল্প সময়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করে এবং তাদের চাহিদা পূরণ করার জন্য অনুরোধ করে।

তৃতীয় পর্যায়ঃ যোগাযোগ শুরুকারী স্তরঃ এই পর্যায়ের শিশুরা কিছু প্রচলিত শব্দ বুঝতে পারে এবং অতি পরিচিত মানুষের সাথে অল্প সময়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তারা ছোটখাট আদেশ-নির্দেশ পালন করতে পারে।

চতুর্থ পর্যায়ঃ সহযোগী স্তরঃ এই পর্যায়ের শিশুরা পরিচিত সমবয়সী শিশুদের সাথে অল্প সময়ের জন্য খেলা করে। ভাষায় দক্ষতা একটু ভালো এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়।

অটিষ্টিক শিশুদের প্রশিক্ষণ প্রদানের উপায় কি?

উন্নত এবং উন্নয়নশীল অনেক দেশে অটিষ্টিক শিশুদের প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে। বর্তমানে আমাদের দেশেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এই ধরনের শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তবে মানসম্পন্ন তেমন কোন প্রতিষ্ঠান এখনও পর্যন্ত গড়ে উঠেনি একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। পৃথিবীর অনেক দেশে এই শিশুদের জন্য পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত এই ধরনের শিশুদের বাবা-মায়েরা পরিচালনা করে থাকেন। কাজেই এই ধরনের শিশুদের সময়ক্ষেপণ না করে সনাক্ত হবার সাথে সাথে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো অত্যন্ত জরুরী। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর উচিত কত দ্রুত শিশুটিকে এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উন্নত করা যায় সেজন্য সচেষ্ট হওয়া। এছাড়া বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং পরিচর্যাকারীদের শিশুটিকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো প্রশিক্ষণ দিতে হবেঃ

*************************
ডাঃ মারুফা আহমেদ
লেঃ কর্ণেল মোঃ তোফায়েল আহমেদ, পিএসসি
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ মার্চ ২০০৮

অটিজম বিস্তারিত

অটিজম একটি জন্মগত সমস্যা , মায়ের গর্ভে মস্তিস্কের বৃদ্ধি বা পূর্নতা লাভ বাধাগ্রস্থ হলে শিশুদের অটিজম দেখা দেয়। সাধারনত অটিষ্টিক শিশুদের বুদ্ধিমত্তা খুবই কম থাকে। কিছু কিছু অটিষ্টিক শিশু গনিত, সংগীত বা ছবি আকায় অত্যন্ত পরদর্শী হয়। প্রতি হাজারে ২/১ জন অটিষ্টিক শিশু জন্মগ্রহন করে।

অটিজমের কারন সম্পর্কে এখনও কোন নির্দ্দিষ্ট বিষয় চিন্হিত করা যায়নি। ধারনা করা হয় জেনেটিক কারনে অটিজম হয়ে থাকে। এছাড়াও ধারনা করা হয়
খাদ্যাভাস
পরিপাক তন্ত্র্রের সমস্যা
পারদ এর বিষক্রিয়া
ভিটামিন এর অভাব
গর্ভাবস্থায় মায়ের হাম হওয়া
শিশুদের দেয়া MMR ভ্যাকসিনের কারনে অটিজম হয়
কিন্তু এগুলির কোনটাই প্রমানিত নয়। অটিজমের কারন চিন্হিত করার জন্য গবেষনা এখনও চলছে।
ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে অটিজম হবার সম্ভবনা মেয়ে শিশুদের ৩ থেকে ৪ গুন বেশী।

সাধারনত শিশুর ১৮ মাস থেকে ২ বছর বয়সের সময় থেকে বাবা মা বুঝতে পারেন যে শিশুটি স্বাভাবিক নয়। অটিজম আক্রান্ত শিশু ,
অটিষ্টিক শিশুর খিচুনি হতে পারে

অন্যদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না ( বন্ধুত্ব হয় না, একত্রে খেলে না, চুপচাপ থাকে, চোখে চোখ রাখে না, জড় বস্তুকে মানুষের মত মনে করে, ভালোবাসা বোঝে না )

স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারে না ( স্বল্প কথা জানে, ইশারায় কথা বলতে পছন্দ করে,শ্বদ উল্টোপাল্টা ভাবে বলে যেমন আমি পানি খাব না বলে বলতে পারে পানি আমি খাব,আযথা গুনগুন করে )

চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তার অসংগত ধারনা থাকে

শিশুটি আলো, শ্বদ, স্পর্স, ঘ্রান বা স্বাদের ক্ষেত্রে অতি সংবেদনশীল থাকে ( যেমন সে অনেক কাপড় পরতে চায়না সংবেদনশীল ত্বকের কারনে )

সকল কাজ বা বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিকতা থাকে। দৈনিক কাজের রুটিন বদল হলে খুবই উত্তেজিত হয়।

বার বার একই কাজ করতে থাকে।

যে কোন একটি খেলনা বা জিনিসের প্রতি প্রবল আকর্ষন থাকে এবং সেটি সব সময় সাথে রাখে।

শিশুটি ভয় পায় না ( হঠাৎ শব্দ হলে চমকায় না )

অনেক সময় স্বাভাবিক শব্দেই উত্তেজিত হয়।

জিনিস পত্র চাটতে ভালোবাসে।

এবং অন্যদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না।

অটিজম নির্নয় বা ডায়াগনোসিস করার জন্য ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করে থাকেন, নিচের লক্ষন গুলি পেলে শিশুকে পরীক্ষা করানো প্রয়েজন,

যদি শিশু ১২ মাস বয়সেও কথা বলতে না পারে
যদি শিশু ১২ মাস বয়সেও ইশারা করতে ( বাই বাই বা টা টা ) না পারে।
যদি শিশু ১৮ মাস বয়সেও মাত্র একটি দুটি শব্দ বলতে পারে।
যদি শিশু ২ বছর বয়সে বার বার একই শব্দ উচ্চারন করতে থাকে।

অটিজম পরীক্ষা কোন টেষ্টের মাধ্যমে কারা হয় না। রোগের লক্ষন দেখে ডাক্তার অটিজম নির্নয় করেন। এই রেগ চিন্হিত করার জন্য অটিজমে বিশেষঙ্গ ডাক্তার প্রয়োজন।

এখন পর্যন্ত অটিজমের কোন চিকিৎসা আবিস্কার হয়নি। বিশেষ ভাবে অটিজম আক্রান্ত শিশুর যত্ন নিতে হয়। এক্ষেত্রে এপ্লায়েড বিহেভিয়র এনালিসিস বা একজনের তত্বাবধায়নে একজন অটিষ্টিক শিশুকে স্বাভাবিক ব্যাবহার শেখানো হয়।
অটিষ্টিক শিশুকে অনেক ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ খেতে হয় যেগুলি তার মানসিক স্হিতিশীলতা বজায় রাখে।
ধারনা করা হয় জিলেটিন মুক্ত খাবার ( যে সব খাবারে জিলেটিন নেই )অটিষ্টিক শিশুকে ভাল রাখে।

অটিষ্টিক শিশুকে সম্পূর্ন সুস্থতা দেয়া এখন পর্যন্ত সম্ভব নয়। তবে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে তাকে সস্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত করা সম্ভব।

http://prothom-aloblog.com/posts/16/48681

More:
https://ekush.wordpress.com/2011/08/23/caring-for-an-autistic-child/
অটিস্টিক শিশুরাও সমাজে ভুমিকা রাখতে পারেঃ বান সুন তায়েক

Global retailers press Dhaka on unionist’s murder


Global retailers press Dhaka on unionist’s murder

Wednesday, Apr 25, 2012

DHAKA – Top global retail associations have demanded a swift and impartial probe into the murder of a prominent Bangladeshi trade unionist in the garment sector, a statement showed Wednesday.

Police discovered the badly injured body of 40-year-old Aminul Islam dumped by the roadside northwest of Dhaka on April 6, leading his supporters to point the finger at Bangladesh’s security forces.

He disappeared in Ashulia, the country’s main textile hub just outside the capital where he led a top union that organised protests to increase the wages of the three million workers in the sector.

In a joint letter to the Bangladesh Prime Minister, a copy of which was obtained by AFP, the retail organisations demanded a “comprehensive, impartial, and swift investigation” into the death.

“We are deeply concerned about this incident,” said the buyers, who represent the US, Canadian, and European apparel, retail, licensing, and footwear industries.

“The apparent circumstances leading up to and surrounding Mr Islam’s death could be perceived to be part of a deliberate campaign to repress efforts to raise and address issues related to unsatisfactory working conditions.”

The groups, including the US-based National Retail Federation and the EU’s Foreign Trade Association, said they were “committed to sourcing and/or licensing consumer products in a responsible manner that respects human and worker rights.”

Islam was one of the organisers of demonstrations in 2006 and 2010 that forced the country’s 5,000 factories to raise salaries.

His group, Bangladesh Center for Workers Solidarity, immediately blamed the security agencies for his abduction. He was detained once before, in 2010, but escaped after being taken to a remote northern district.

Bangladesh is the world’s second-largest apparel exporter with overseas sales of more than $19 billion in 2011. Europe and North America account for nearly 90 per cent of the country’s textile shipments.

In recent weeks, Islam had been helping 8,000 workers of Shanta Group, a leading garment manufacturer based outside Dhaka, push for trade union rights and benefits. The factory supplies leading US clothing stores.

কে জানে গণতন্ত্রই এক দিন গুম হয়ে যায় নাকি এ দেশে!


গুম হয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্র?
 

  

আসিফ নজরুল:

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 
 

রোববারের পত্রিকা পড়ার পর আরও চিন্তিত হয়ে আছি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, গুম ও নিখোঁজের কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। তাঁর এই সাহসী বক্তব্যের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ; কিন্তু তিনি যা বলেছেন, তা উদ্বেগজনকও। এই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় যখন আমরা মিজানুর রহমান খানের লেখায় পাই গুমের একটি ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবে থাকা একজন সেনাসদস্যের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ।

বাংলাদেশে বহু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‌্যাব জড়িত ছিল। এ ধরনের ঘটনা বানানো হলেও র‌্যাবের একটি কৈফিয়ত থাকে। লাশ উদ্ধার হয় বলে তার ময়নাতদন্ত, সৎকার এবং ভবিষ্যতে বিচারের একটি সম্ভাবনা থাকে। গুমের ক্ষেত্রে এসব কিছুই থাকে না; থাকে না এমনকি ‘মৃত’ মানুষের জন্য প্রার্থনা করার সুযোগটুকু। এই পৈশাচিক অপরাধকে তাই নিকৃষ্টতম অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আইন ও নৈতিকতা—উভয় বিচারে। পৃথিবীর ইতিহাস বলে, যে দেশের সরকার যত বেশি ফ্যাসিস্ট, সেখানে তত বেশি গুমের ঘটনা ঘটে। কম্পুচিয়া, ভিয়েতনাম, কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া, জিম্বাবুয়ের মতো দেশে এসব ঘটনা প্রায়ই ঘটত একসময়। ইলিয়াসের নিখোঁজের ঘটনা আবারও এই প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে যে আমরা কি সেদিকে যাচ্ছি? নাকি এরই মধ্যে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছি, যেখানে জনগণের নিরাপত্তার বড় শত্রু স্বয়ং রাষ্ট্র!

অতীতের বিশাল বর্ণনা বাকি রাখি। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনাই চরম অস্বস্তির জন্ম দেয় আমাদের মনে। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের পর এর তদন্ত তদারকির দায়িত্ব স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও নিয়েছেন—এ কথা বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে। পুলিশের আইজি হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর বলেছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তদারকির দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই পুলিশি তদন্তের ফলাফল উচ্চ আদালতের ভাষায় কেমন করে তাহলে ‘জিরো’ হয়ে যায়! কেন এই তদন্তের দায়িত্ব অবশেষে দিতে হয় র‌্যাবকে, যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই রয়েছে তদন্ত ‘গুম’ করার বা সাজানোর অভিযোগ! এ দেশের ইতিহাসে বিদেশি কূটনীতিকের খুন হওয়ার কোনো নজির ছিল না। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পর রাজধানীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় খুন হন একজন পদস্থ সৌদি কূটনীতিক। কেন প্রায় দুই মাস পরও এমন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর খুনের তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই? কেন দেশকাঁপানো এমন দুটো ঘটনায় একজনকে আজও গ্রেপ্তার করতে পারল না পুলিশ? মিডিয়ার এত জিজ্ঞাসা সত্ত্বেও কোথায় গায়েব হয়ে গেল সুরঞ্জিতের ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা, যার কারণে উদ্ঘাটিত হয়নি সেই গাড়িচালক আলী আজম?

সবশেষে কেমন করে রাজধানীর সবচেয়ে প্রটেকটেড একটি রাস্তা থেকে উধাও হলেন বিরোধী দলের একজন প্রথম সারির নেতা? এ ঘটনার পর বিএনপি, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাদের সাবধানে চলাফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোতে। বড় রাজনীতিবিদদের গানম্যান আছে, সঙ্গী-সাথি আছে, খবর নেওয়ার নেটওয়ার্ক আছে। তাঁরা সাবধানে থাকতে হয়তো সমর্থ। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী হবে? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বেডরুমে নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। আবার আমরা দেখছি, রাজপথ থেকেও উধাও হয়ে যেতে পারে কোনো মানুষ। আইন-আদালত কোথাও নিষ্পত্তি হচ্ছে না কারও দায়দায়িত্ব!

এ পরিস্থিতি, বিশেষ করে সরকারের সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণকারীদের জন্য অশনিসংকেত। এ পরিস্থিতি মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকারের জন্য ভয়ংকর। এ পরিস্থিতি কখনোই গণতন্ত্র নয়, বরং গণতন্ত্রের মোড়কে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের ইঙ্গিতবাহী।

২.
প্রত্যক্ষদর্শীর জবানিতে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যে বর্ণনা আমরা পেয়েছি, তাতে এটি সন্দেহ করার কারণ রয়েছে, সরকারের কোনো সংস্থার লোকেরা ইলিয়াসকে তুলে নিয়ে গেছে। যে নিখুঁত পরিকল্পনায় তাঁর গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে নেমে আসতে বাধ্য করা হয়, যেভাবে সেখানে মাইক্রোবাসে তাঁকে তোলা হয় এবং ঘটনাস্থলে সাইরেন বাজানো যানের যে বর্ণনা আমরা পাই, তাতে এ ধারণা যে কারও জন্মাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ইলিয়াস লুকিয়ে থাকতে পারেন আন্দোলনের ইস্যু তৈরি করার জন্য। সোহরাব হাসান তাঁর লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন কতটা অবাস্তব এটি। আমি মনে করি, যে সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দলীয়করণ আর ভারত-তোষণের অভিযোগের পাহাড় জমছে, তার বিরুদ্ধে আন্দালনের আর কোনো নতুন ইস্যুর প্রয়োজন নেই; বরং খতিয়ে দেখলে মনে হবে ইলিয়াসকে উধাও করার ঘটনার পেছনে সরকারেরই মোটিভ থাকতে পারে। প্রথমত, বিএনপি অভিযোগ করেছে, রেল মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ-বাণিজ্যের দুর্নীতি হাতেনাতে ধরা পড়ার পর তা আড়াল করার জন্য ইলিয়াসকে গুম করা হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, তোলপাড় করা সুরঞ্জিতকেন্দ্রিক এ দুর্নীতির ঘটনা আসলেই অনেকটা আড়াল পড়ে গেছে ইলিয়াস গুম হওয়ার ঘটনায়। দ্বিতীয়ত, বিএনপির একজন নেতা টিপাইমুখবিরোধী আন্দোলনে সম্প্রতি ইলিয়াসের সোচ্চার ভূমিকাকেও আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তৃতীয়ত, আন্দোলনের মাঠ সচল রাখার ক্ষেত্রে ইলিয়াসের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ইলিয়াসের মতো একজন সুপরিচিত নেতা গুম হয়ে গেলে মাঠপর্যায়ে, বিশেষ করে সিলেট বিভাগে সরকারবিরোধী আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি এটি বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীকে আতঙ্কিত এবং আন্দোলনবিমুখও করে তুলতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এর আগে বিএনপির প্রায় দুই ডজন নেতাসহ শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। কারও ক্ষেত্রেই তদন্তের কোনো সুরাহা হয়নি। দুই বছরে সরকার আমাদের কিছুই জানাতে পারেনি যে চৌধুরী আলম কোথায়, তাঁকে কে উধাও করেছে, তিনি মারা গেলে তাঁর লাশ কোথায়?

সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব যেকোনো নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। কোনো মানুষ উধাও বা খুন হলে দোষীদের গ্রেপ্তার করা এবং বিচারের জন্য সোপর্দ করা। সরকার যদি এটি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দুটো অনুসিদ্ধান্তই কেবল নেওয়া সম্ভব। এক. সরকার নিজে তা করেছে বলে বিচার করতে অনিচ্ছুক। দুই. সরকার অপরাধী শনাক্ত করতে বা অপরাধটির বিচার করতে অক্ষম বা অসমর্থ। যদি এর একটিও সত্যি হয়, তাহলে সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার কোথায় থাকে? মানুষের নিরাপত্তা ও জীবন যদি রাষ্ট্রযন্ত্র কেড়ে নেয় বা তা কেড়ে নেওয়া মেনে নেয়, তাহলে সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর আইনের শাসন কোথায় থাকে?

৩.
আমাদের কিছু উদ্বেগ এখনো দূর হয়ে যেতে পারে ইলিয়াস জীবিত অবস্থায় ফেরত এলে। কিন্তু তিনি কি বেঁচে আছেন এখনো? আমি জানি, যাঁরা প্রকৃত রাজনীতিক, যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাঁরা মনেপ্রাণে চাইবেন তিনি বেঁচে থাকুন। আওয়ামী লীগের মতো সুদীর্ঘকালের গণতান্ত্রিক দলে এমন বহু নেতা-কর্মী আছেন, যাঁরা ইলিয়াসের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। তাঁর অন্তর্ধানের প্রথম দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কথাবার্তায় তাঁদের উদ্বিগ্ন ও বিব্রত মনে হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কিছু দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্যের পর আওয়ামী লীগের দু-একজন নেতাকে তাঁর মতো করে কথা বলতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন, ইলিয়াসকে খালেদা জিয়াই লুকিয়ে থাকতে বলে নাটক সাজিয়েছেন, তাঁকে ভুল প্রমাণ করার জন্য নিশ্চয়ই পুলিশ-গোয়েন্দা কাজ করবে না। অন্য বহু তদন্তের মতো সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে এটিও ঝুলিয়ে দেওয়া হতে পারে তাই। সরকারের কাজের যা প্যাটার্ন, এ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আরও ভয়াবহ কোনো ঘটনাও হয়তো ঘটানো হতে পারে বাংলাদেশে।

আমি জানি, দেশজুড়ে গুজব আছে ইলিয়াসকে ফেরত দেওয়া হতে পারে জীবিতাবস্থায়। কিন্তু এটি বিশ্বাস করা কষ্টকর। যেখানে কোনো তদন্তের আগে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে এটি বিরোধী দলের নেত্রীর সাজানো নাটক, সেখানে ইলিয়াস এমন একটি বিবরণ নিজে থেকে দিতে রাজি হলেই কেবল তাঁকে জীবিত ফেরত দেওয়া সম্ভব। নিজের জীবন রক্ষার্থে এবং সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে ইলিয়াস হয়তো সাময়িকভাবে রাজি হতে পারেন এতে। কিন্তু তাতে এই হীন অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা রক্ষা পাবে, প্রকৃত ঘটনা নিয়ে কুৎসিত কাদা ছোড়াছুড়ি অব্যাহত থাকবে, দেশবাসী আরও বিভ্রান্তিতে পড়বে।

আমরা তবু চাই, ইলিয়াস ফেরত আসুন। কারণ, শাহ্দীন মালিকের গতকালের অসাধারণ লেখা থেকেই বলছি, ‘এভাবে চলতে থাকলে দেশে রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের আকাল পড়বে। বহাল তবিয়তে থাকবে শুধু র‌্যাব।’

যত দূর মনে করতে পারি, প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে র‌্যাবের দিকে ইঙ্গিত করে বিরোধী দলকে বলছেন, আপনাদের সৃষ্টি করা বাহিনীই আপনাদের খাবে! বিএনপির কি এখন বোধোদয় হচ্ছে, কী ভয়ংকর আগুন নিয়ে খেলেছিল তারা র‌্যাবের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করে? আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি বুঝতে পারছেন, আপনার আমলে গুম-সংস্কৃতি বিস্তার হওয়ায় কোন দাবানল তৈরি হচ্ছে দেশে? গুম হওয়া যদি স্বাভাবিক হয়ে পড়ে, তাহলে কে জানে গণতন্ত্রই এক দিন গুম হয়ে যায় নাকি এ দেশে!

আমরা সত্যিই আশঙ্কিত!

পাদটীকা: এই লেখা যখন লিখছি, দেশে তখন হরতাল চলছে বিরোধী দলের আহ্বানে। হরতালের দিন এবং আগের দিন সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দুজন, আহত হয়েছেন অনেকে, বেশ কিছু যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। আমরা হরতালের অধিকারে বিশ্বাসী, কিন্তু হরতালে নিহত-আহত হওয়ার ঘটনা আর ধ্বংসযজ্ঞ এই অধিকারের আওতায় পড়ে না। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

 
 

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[সূত্রঃ প্রথম আলো, ২৩/০৪/১২]

%d bloggers like this: