ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের সাহসী ভুবন

ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের সাহসী ভুবন
Wall Street protesters urge students to boycott loan payments


অ্যামি গুডম্যান • মঙ্গলবার রাত ১টার পর আমাদের কাছে খবর এলো, নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকারীদের ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। আমি ‘ডেমোক্রেসিনাউ’ টিমের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে জুকুটি পার্কের দিকে দৌড়ালাম। এই পার্কটির নতুন নামকরণ হয়েছে লিবার্টি স্কয়ার বা স্বাধীনতা চত্বর। গিয়ে দেখি কয়েকশ’ দাঙ্গা পুলিশ ইতোমধ্যেই এলাকাটি ঘিরে ফেলেছে। দেখলাম, পুলিশ একদিকে তাঁবুগুলো ছিঁড়ে ফেলছে আর সিটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের জিনিসপত্রগুলো ময়লার ট্রাকে ছুড়ে মারছে। পুলিশ বেষ্টনির বাইরে পার্কের কেন্দ্রস্থলে ২০০ থেকে ৩০০ আন্দোলনকারীকে হাত বাঁধা অবস্থায় বসে থাকতে দেখলাম। কিছুতেই তারা দুই মাস ধরে দখল করে বসে থাকা জায়গাগুলো ছেড়ে যাবে না। তাদের সবাইকে এক এক করে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা যে ক’জন সংবাদকর্মী পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছতে পারলাম তাদের জুকুটি পার্ক সংলগ্ন রাস্তাগুলোর ওপর দাঁড়াতে দেওয়া হলো। তবে আমরা আমাদের ক্যামেরাগুলো চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সামনে দুটি পুলিশ বাস এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো যাতে আমরা ভেতরকার ছবি তুলতে না পারি। আমি আর আমার কয়েকজন সহকর্মী বাস দুটির ফাঁক গলিয়ে এবং ছেঁড়া তাঁবু আর স্লিপিং ব্যাগের স্তূপ পেরিয়ে পার্কের ভেতর ঢুকে পড়লাম। পুলিশ এতবড় একটা ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র মিডিয়ার কাছ থেকে প্রায় আড়ালই করে ফেলছিল।

একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বইয়ের একটি ভাঙা তাক আমার চোখে পড়ল। পার্কের বেশ কিছুটা ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলাম একটি বই পড়ে আছে। বইটির গায়ে ‘ওডব্লিউএসএল’ চিহ্ন সাঁটা ছিল যার মানে হচ্ছে বইটি অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট লাইব্রেরির। এটি এখন পিপলস লাইব্রেরি হিসেবেও পরিচিত। চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল এই লাইব্রেরিটি। সর্বশেষ তথ্য মতে, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দান করা ৫ হাজার বইয়ের একটি সংগ্রহ রয়েছে এটির। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা গণতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে যে বইটি আমার দৃষ্টিগোচর হলো সেটি পড়েছিল একটি আবর্জনার স্তূপের ওপর। বইটির নাম ‘ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ড রিভিজিটেড’। লেখক এলডাস হাকসলি।

রাত গভীর হতে থাকলে হাকসলির বইটি চোখে পড়ার মাহাত্ম্য স্পষ্ট লাগল। তার বিখ্যাত উপন্যাস ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ড লেখার ৩০ বছর পর ১৯৫৮ সালে হাকসলি এই বইটি লেখেন। মূল বইটিতে তিনি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানুষকে হ্যাভস এবং হ্যাভনটস এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। তার বর্ণিত দ্য ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ডের মানুষ আনন্দ, উন্মাদনা, বিজ্ঞাপন আর নেশা জাগানিয়া দ্রব্যাদির সাহচার্যে গা ভাসাবে। যাকে বলে প্রকৃত অর্থেই একটি ভোগবাদী জীবন। এই সমাজের নিচের স্তরের মানুষ ওপরের স্তরের অভিজাত কিছু মানুষকে সব ধরনের সেবা যুগিয়ে যাবে। তবে হাকসলির ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ড রিভিজিটেড বইটি কিন্তু উপন্যাসধর্মী রচনা নয়। এটিতে তিনি আধুনিক সমাজের একটি বিবর্ণ ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই বইটির এখানে একটি প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কারণ আমরা দেখেছি যে, বাণিজ্য এবং বিশ্বায়নের আধিপত্যকে বিরোধিতা করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। আন্দোলনকারীদের ক্যাম্প ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

হাকসলি তার বইতে লিখেছেন ‘প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এবং ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়ে গড়ে ওঠা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক বলতে বোঝায় পার্টির মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণই। সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং বেসামরিক আমলারা ওই মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের আজ্ঞাবাহী হয়ে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী একটি গণতন্ত্রে এই নিয়ন্ত্রণটি রয়েছে অধ্যাপক সি রাইট মিলসের ভাষায় পাওয়ার এলিটদের হাতে। হাকসলি বলছেন, এই পাওয়ার এলিট বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীটি দেশের লাখ লাখ মানুষকে তাদের কারখানা, অফিস এবং স্টোরগুলোতে কর্মে নিয়োজিত করে। অন্যদিকে নিজেদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী কেনার জন্য এই পাওয়ার এলিটরা আবার লাখ লাখ মানুষকে টাকা ধার দেয় এবং এর মাধ্যমে তাদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

তাছাড়া নিজেদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে প্রতিটি মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ-অনুভূতি এবং কর্মকান্ডকেও তারা বিপুল পরিমাণে প্রভাবিত করে থাকে। জুকুটি পার্কে পুলিশি হামলা চলার সময় পিপলস লাইব্রেরির কর্মী স্টিফেন বয়ার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গ্রেফতার এড়িয়ে এবং আক্রান্তদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পর তিনি বলছেন, পার্কে আমরা যেসব জিনিস জড়ো করেছিলাম তার সবই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এত সুন্দর একটি লাইব্রেরিও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। লাইব্রেরির সংগ্রহে থাকা ৫ হাজার বইও হারিয়ে গেছে। অনুদান হিসেবে পাওয়া আমাদের তাঁবুগুলোও ছিঁড়ে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের সব অর্জন এরা নস্যাৎ করে দিয়েছে।

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র মিচেল ব্লুমবার্গের অফিস থেকে পরে অবশ্য উপরে কিছু বই সাজিয়ে রাখা একটি টেবিলের ছবি প্রচার করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে যে, লাইব্রেরির বইগুলো সংরক্ষিত আছে। তবে পিপলস লাইব্রেরির টুইটারে বলা হয়েছে, কিছু বই অক্ষত আছে দেখে আমরা স্বস্তি বোধ করছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের অন্য বইগুলো কোথায়, আমাদের আচ্ছাদন আর বাক্সগুলোই বা কোথায়? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লাইব্রেরিকে এই আচ্ছাদনগুলো উপহার দিয়েছিলেন ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী বিখ্যাত রক অ্যান্ড রোল শিল্পী প্যাটি স্মিথ।

দখল অবস্থান নেওয়া আরো কিছু স্থানেও ইতোমধ্যেই হামলা চালানো হয়েছে। ওকল্যান্ডের মেয়র জ্যা কুয়ান বিবিসির কাছে স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ১৮টি নগরীর কর্তৃপক্ষেও সঙ্গে কথা বলেছেন। অন্য আরেকটি খবরে জানা গেছে, এফবিআই এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটিও পরিস্থিতি সম্পর্কে নগরীগুলোর কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার নিউইয়র্ক স্টেট আদালতের একজন বিচারক এই মর্মে রায় দিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের উৎখাত করার বিষয়টি বহালই থাকবে এবং তারা আর তাঁবু ও স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে জুকুটি পার্কে ফিরে যেতে পারবে না। এই রায় জারির পর সংবিধান বিশেষজ্ঞ একজন আইনজীবী আমাকে এই মর্মে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন, ‘মনে রাখবেন আন্দোলন কিন্তু এখন রাজপথে অবস্থান নিয়েছে। আদালতকে সব সময়ই শেষ সম্বল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।’ কিংবা প্যাট্টি স্মিথের বিখ্যাত সেই গান ‘জনগণই সর্বশক্তিমান’।

কমন ড্রিমস থেকে ভাষান্তর

আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না •

দুই মাস আগের ঘটনা। মাত্র ২০০ জন মানুষ আমরা তাঁবু গেড়ে বসলাম ওয়াল স্ট্রিটের দোরগোড়ায়। সেই থেকেই অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট একটি জাতীয় এবং এমনকি আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একই কায়দায় সারা আমেরিকায় এবং বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন শহর এবং নগরে দখল করে নেওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে। এখন এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিচ্ছে। ক্রমশ বাড়তে থাকা গণআন্দোলন আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, আমাদের গণতন্ত্র এবং আমাদের ভবিষ্যতের চেহারাটাই তাৎপর্যপূর্ণভাবে পাল্টে দিতে শুরু করেছে।

এই গণআন্দোলনকে প্রতিহত করতে পুলিশি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে আমরা কিন্তু এতটুকুও দমে যাইনি। আমাদের শক্তি এখন তুঙ্গে। আমাদের মনোবল অনমনীয়। ক্রমেই বাড়তে থাকা এই আন্দোলন কেবল একটি প্রতিবাদ মাত্র নয়, তার চেয়েও বড় কিছু। এটি দখল করে নেওয়ার চেয়েও বেশি কিছু এবং এটিকে কেবল একটি কৌশল হিসেবে দেখলেই চলবে না। শারীরিকভাবে যারা দখল কার্যে অংশ নিতে পেরেছেন এই আন্দোলনে ‘আমরা’ শব্দটি দিয়ে তাদের চেয়ে আরো বড় একটি পরিসরকে বোঝানো হয়েছে। এই আন্দোলনে যারা সহযোগিতা প্রদান করেছেন, যারা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবা যারা কোনো না কোনোভাবে নাগরিক সমাজের এই কর্মকান্ডে যুক্ত হয়েছেন তারা সবাই এই আন্দোলনের অংশ।

আমাদের জীবন বিপন্নকারী সংকটের মুহূর্তে আমরা যেমন সবাই একত্রে মিলে আমেরিকার অন্তর্নিহিত শক্তিকে আবিষ্কার করে সেই সংকট মোকাবিলা করি এবারের এ আন্দোলনও তারচেয়ে কম কিছু নয়। এমন একটি আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায় না। কিছু রাজনীতিক আমাদের হয়তো শারীরিকভাবে আমাদের অবস্থান থেকে সরিয়ে নিতে পারেন, গণজমায়েত ভেঙে দিতে পারেন। বলপ্রয়োগের এই প্রচেষ্টায় তারা হয়তো সফলও হবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমরা এখন একটি আদর্শিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ। আমাদের ভাবনার জায়গাটি অনেক বেশি শক্তিশালী। আমরা চাই, আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি আমাদের সেবা দেবে। কেবল ধনসম্পদ আর ক্ষমতাবানদের নয়, সেবা দেবে রাষ্ট্রের সব নাগরিককে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই চিন্তার সঙ্গে সব মানুষই সহমত পোষণ করে। কারণ আমাদের প্রতিনিধি পরিষদ কংগ্রেস ওয়াল স্ট্রিটের ঘটনা দেখেও না দেখার ভান করেছে, তারা ঘরে ঘরে জন্ম নেওয়া অসন্তোষ, প্রতিবেশীর হৃদয়ের আর্তনাদ, অর্থনৈতিক কারণে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কষ্টের কাহিনীকে অবজ্ঞা করেছে। আমরা একটি গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখি। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট এবং আমরা ৯৯%-এর আন্দোলনে সেই স্বপ্ন মূর্ত হতে শুরু করেছে।

১০০ মানুষ জেলে বসে আছেন। আজ সকালেই একজন বিচারক রায় দিয়েছেন যে, আমরা আমাদের জিনিসপত্র ফিরে পাওয়ার অধিকার রাখি, অধিকার রাখি আমাদের অবস্থানে ফিরে যাওয়ারও। তবে মেয়র ব্লুমবার্গ ঘোষণা দিয়েছেন, পার্কটি বন্ধই থাকবে। তাতে অবশ্য কিছুই আসে যায় না। আমরা আবারো রাস্তার দখল নেব। আমরা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানগুলো দখল করে নেব। সর্বত্র আমরা এ কাজ করব। কারণ আমরা জানি যে, আমাদের চিন্তাকে হত্যা করা যাবে না।

কমন ড্রিমস থেকে ভাষান্তর [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: