মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ


রামজে বারোউদ • স্বেচ্ছাচারীদের চ্যালেঞ্জ করা, পুরনো কাঠামো ধ্বংস করা এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য কর্মপন্থা উদ্ভাবনের কাজে আরবদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যর্থ নীতি, ভুল ধারণা ও আত্মস্বার্থে অবিচল রয়েছে। আরবরা নিজেদের মধ্যে অনেক বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে, কিন্তু এ বিষয়ে খুব কম লোকই ভিন্ন মত পোষণ করে যে, এখন পিছনে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। মুবারক ও বেন আলীর মতো স্বেচ্ছাচারীদের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করে, তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জসহ নতুন সকাল। এ এলাকায় গণতন্ত্র, সুশীল সমাজ ও নাগরিকত্ব বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আরবের যেসব বুদ্ধিজীবী এখনো সন্ত্রাসবাদ ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বাগাড়ম্বর করে তাদের ওয়াশিংটন ভিত্তিক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী কাজে লাগিয়েছে অথবা তাদের মধ্যে এমন কিছু বেপরোয়া লোক আছে যারা মিথ্যার বেসাতি বিক্রেতা রুপার্ট মারডকের ফক্স নিউজে উপস্থিত হন।

একটা কথা সহজে অনুমেয় – আরব বিশ্বের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। হোসনি মুবারক যখন মিসরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখনকার অবস্থার সঙ্গে এখনকার অবস্থার মিল নেই। একদল ‘আরব মধ্যস্থতাকারীর’ পরিচালনায় মুবারকের প্রধান দায়িত্ব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির প্রতিফলন ঘটানো। ব্যাপারটা ছিল যেন তা মিসরের জাতীয় স্বার্থের জন্যও একটা জরুরি বিষয়। ইতোমধ্যে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ পরস্পরবিরোধী অবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে ভালো কাজে কৃতিত্ব লাভের জন্য তিনি বেপরোয়া ছিলেন – তিনি এখনো আরব প্রতিরোধের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০০১ সালের শেষ দিকে আফগানিস্তান দখল করে তখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কথাটা আরব সংস্কৃতিতে আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত করা হয়। সাধারণ আরববাসীদের এমন বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বাধ্য করা হয় যা তাদের কাছে গুরুত্বহীন ছিল, অথচ সেই বিষয়টিই এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়।

আরব নারী-পুরুষ সবাইকে অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়, এমনকি তাদের আশাশূন্য করা হয়। তাদের শুধু ওসামা বিন লাদেন, আল কায়েদা ও অন্যান্য বিষয়ে জনমত জরিপের উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ এসব বিষয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও অবমাননার জন্য দায়ী কোনো বিষয় ছিল না।

আরব স্বেচ্ছচারীরা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদ্ধ সংস্কারকে গ্রহণ করে। ইয়েমেনের আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ‘আল কায়েদাকে পরাজিত’ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক শত্রুভাবাপন্নভাবে দখল অথবা নিজেকেই ক্ষতিকর একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে যে কোনো একটা পথ বেছে নিতে হয়। তিনি শেষোক্ত বিকল্পটি বেছে নেন এবং এমন ভূমিকার ফলাফল হাতে হাতেই পেয়ে যান। ইয়েমেনী জনগণ রাস্তায় নেমে আসে – তারা দাবি করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের। সালেহ অনুগত বাহিনী ও রিপাবলিকান গার্ডদের পাঠান হঠাৎ বেড়ে যাওয়া আল কায়েদা যোদ্ধাদের এবং নিরস্ত্র গণতন্ত্রকামী লোকদের একসঙ্গে হত্যা করার জন্য। সরাসরি ও কঠোর এ কাজকে তুলনা করা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অকথিত দরকষাকষির অাঁতাত, তোমাদের খারাপ লোকদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করব যতক্ষণ আমি নিজেকে ধ্বংস করতে পারব এমন ভাবনার সঙ্গে।

লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো কাজে লাগান। তার শাসনামলে প্রতিনিয়ত জোর দেওয়া হয়েছে যে, বিরোধী দলগুলোর সদস্যদের মধ্যে আল কায়েদা আছে। এসব কথা পশ্চিমা গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। পাশ্চাত্যকে শান্ত করার জন্য গাদ্দাফি এমন বেপরোয়া হয়ে যান যে, তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ফিলিস্তিনি ‘চরমপন্থীদের’ বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব স্বৈরশাসকরা যে ভাষায় কথা বলেন তা নির্যাতনের ভাষা কোষে খুঁজে পাওয়া যায় না এবং এটা একটা বিস্ময়কর বিষয়। অপরদিকে সাধারণ আরব জনগণ তাদের দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো ফিরে পাওয়ার আশায় উদ্বেলিত ছিল। আল কায়েদা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণনা অনুযায়ী আরব জনগণ ঐক্যবদ্ধ নয়, অন্য কিছু বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ যা পশ্চিমা ভাষ্যকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অংশীদারিত্বমূলক ইতিহাস, ধর্ম, ভাষা ও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ঐক্য ছাড়াও তাদের মধ্যে আছে নির্যাতন, বিচ্ছিন্নতা, অন্যায় ও অসাম্যের এক সাধারণ অভিজ্ঞতা।

২০০৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের তৃতীয় আরব উন্নয়ন রিপোর্টে বলা হয় যে, আধুনিক আরব রাষ্ট্রে ‘নির্বাহী প্রক্রিয়ার ধরন একটা কৃষ্ণ গহবরের মতো, যা এর আশপাশের সামাজিক পরিবেশকে এমনভাবে গঠন করে যে, তা থেকে কিছু এগিয়ে যায় না এবং যা থেকে কিছু পালিয়ে যেতে পারে না।’ আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য ২০০৯ সালটা খুব ভালো ছিল না। ওই সময় এ ধরনের রিপোর্টের পঞ্চম খন্ডে বলা হয়, ‘মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে আশা করা হয়। অথচ বেশ কয়েকটা আরব দেশে দেখা গেছে, তা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সনদ ও জাতীয় শাসনতান্ত্রিক ধারাগুলোর প্রতি হুমকিস্বরূপ।’ মে’তে টাইম ম্যাগাজিন ‘হাউ দ্য এরাব স্প্রিং মেড বিন লাদেন অ্যান আফটারথট’ শিরোনামে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে। আরব বিপ্লবের সম্মিলিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে ওই রিপোর্টে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, মিসরের তাহরির স্কোয়ারে ওসামা বিন লাদেনের প্রশংসা করে কোনো ব্যানার দেখা যায়নি। তিউনিসিয়া, লিবিয়া বা এমনকি ইয়েমেনেও সরকারবিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে তার ডেপুটি আয়মান আল জাওয়াহিরির কোনো ছবি দেখা যায়নি।’

সত্যের এই প্রকাশ পশ্চিমা মিডিয়ায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হলেও তাকে মোটামুটিভাবে বলা যায় একটা প্রতারণা। আসল কথা হলো, আল কায়েদা মডেল কখনো আরব সমাজের মূলধারায় প্রতিফলিত হয়নি। আরব বিপ্লব আল কায়েদা সম্পর্কে আরব সমাজের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেনি। কারণ ওই ধারণা সমগ্র আরব সমাজের ধারণার খুবই সামান্য একটা অংশ মাত্র। যা হোক, এসব বিপ্লব আরবদের সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ধারণাকে এখনো সত্যিকারভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি।

জগবি ইন্টারন্যাশনাল জুলাইয়ে এরাব অ্যাটিচিউড ২০১১ প্রকাশ করে। এতে ছয়টি আরব রাষ্ট্রের এমন ধারণা প্রকাশ পায় যা এতে আরবদের মধ্যে বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা শতকরা ১০ ভাগ কমে যাওয়ার কথাও রয়েছে। ২০০৯ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ওবামা যখন তার বিখ্যাত ভাষণ দেন তখন অনেক আরব মনে করে যে, কোনো কোনো অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-আরব অগ্রাধিকার চূড়ান্তভাবে এসে মিলেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কোনো অনুকূল দিকে পরিচালিত না হওয়ায় আরবরা অনুধাবন করে, মার্কিন নীতিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েই আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধ, ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন এবং তাদের পুরনো মিত্র অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ আরব শাসক ও অভিজাতদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। আরবরা আবিষ্কার করেছে অথবা পুনরায় আবিষ্কার করেছে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কোনো মিল নেই, বরং ওই দুই ধারা আসলে সাংঘর্ষিক পর্যায়ে আছে।

এটা খুবই স্বাভাবিক, মধ্যপ্রাচ্যের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট স্বার্থ ও লক্ষ্যে তার নীতি পরিচালিত করবে। কিন্তু আসলে যা হচ্ছে তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের জন্য অধিকাংশ আরব দেশের আশা আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আরব স্বৈরাচারী শাসকদের সহায়তায় ওয়াশিংটনের অস্পষ্ট ও বিভ্রান্ত নীতি আরব জাতিগুলোর জন্য অকথিত ক্ষতি ডেকে এনেছে। লাখ লাখ সাধারণ আরব যাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অগ্রাধিকারকে পুরোপুরি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে এবং এখন আরব জনগণ দেখাচ্ছে যে, তারা ওই বাস্তবতা গ্রহণে আর রাজি নয়।

ইন্টারনেট থেকে ভাষান্তর [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: