আতঙ্কিত ধনিকগোষ্ঠী

আতঙ্কিত ধনিকগোষ্ঠী

পল ক্রুগম্যান • গত ১৫ মে স্পেনের ‘ক্ষুদ্র জনতার আন্দোলনের’ রেশ ধরে ১৭ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা-ইউরোপ হয়ে আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। শনিবার বিশ্বের ৮২টি দেশের ৯শ’রও বেশি শহরে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভে শামিল হয়। পুঁজিবাদের সাম্প্রতিক প্রতিভূ করপোরেট ব্যবসায়ীদের লোভ-লালসা ও সীমাহীন লুটপাট, সে কারণে ধনী-দরিদ্রে্যর ব্যাপক বৈষম্য এবং এই লুটপাটের সহযোগী সরকারগুলোর ব্যয় সংকোচননীতি ও ধনীদের বেইল আউটের নামে কোটি কোটি ডলারের অর্থ সাহায্যের বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভ পরিচালিত হচ্ছে। পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণেই যে বর্তমান এই পরিস্থিতি এবং এই পরিস্থিতি যে মোকাবিলার শক্তিও সে ক্রমশই হারিয়ে ফেলছে তারই আভাস মিলছে এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। বিশ্বায়নের ধারায় মাত্র ১ শতাংশের লুটপাটের বিরুদ্ধে ৯৯ শতাংশের প্রতিবাদেরও বিশ্বায়ন ঘটছে, এরই নমুনা পাওয়া গেছে গত শনিবার। এরই বিশ্লেষণধর্মী দুটি লেখা প্রকাশ করা হলো এই বিক্ষোভের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ অনুধাবনের জন্য।

ওয়াল স্ট্রিট দখল করো আন্দোলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বদলে দেয় কিনা তা দেখতে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তথাপি ওয়ালস্ট্রিট, সাধারণভাবে অতি বিত্তবান এবং রাজনীতিবিদ ও পন্ডিত যারা মূলত অধিকাংশ অর্থবিত্তের মালিক এক শতাংশ মার্কিনিদেরই স্বার্থ রক্ষা করে থাকে তারা এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রলাপ বকতে শুরু করেছে। তাদের এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধরা পড়েছে। তারা বলছে, চরমপন্থীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে। যেমন এফডিআর ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকারীদের জাকুতি পার্কে সমবেত প্রতিবাদকারী না বলে ‘অর্থনৈতিক রাজানুগত্যবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

একটু দেখে নেওয়া যাক রিপাবলিকান রাজনীতিকরা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকা অহিংস এই আন্দোলনকে কীভাবে চিত্রিত করছে। একথা ঠিক যে, আন্দোলনকারীরা ইতোমধ্যেই পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। পুলিশও মাঝে মাঝে তাদের ওপর বেশিমাত্রায়ই চড়াও হয়েছে। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়নি যে, একে দাঙ্গা আখ্যায়িত করতে হবে। এসব ঘটনাকে কোনোভাবেই ২০০৯ সালের গ্রীষ্মে সংঘটিত টি পার্টির আন্দোলনের সঙ্গেও তুলনা করা যাবে না।

তারপর হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এরিক ক্যান্টর আন্দোলনকারীদের হুজুগে জনতা আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘এরা এক মার্কিনিকে আরেক মার্কিনির বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে।’ আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী মিট রমনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘শ্রেণী সংগ্রাম’ শুরুর অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে হারম্যান কেইন তাদের ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ বলে অভিহিত করেছেন। সিনেটর র‌্যান্ড পল আমার একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনিও কি জানি কি কারণে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা আই প্যাডগুলো ছিনিয়ে নেবে। কারণ তারা মনে করে, এগুলো ধনীদের প্রাপ্য নয়।

নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ নিজ যোগ্যতায়ই একজন ধনবান ব্যক্তি, আচার-আচরণেও সজ্জন এবং অপেক্ষাকৃত নমনীয় বলে পরিচিত। অথচ তিনিও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ এনেছেন যে, তারা নাকি এই নগরে বসবাসকারী লোকজনের চাকরি-বাকরি কেড়ে নিতে চায়। অথচ আন্দোলনের প্রকৃত লক্ষ্যের সঙ্গে এ জাতীয় অভিযোগের কোনো মিলই নেই।

আপনি যদি সিএনবিসিতে প্রচারিত আলাপ-আলোচনা শুনতেন তাহলে শুনতে পেতেন যে, সেখানে বলাবলি হচ্ছে ‘আন্দোলনকারীরা তাদের খেয়ালের পতাকা উড়িয়ে যায় যাক’, ‘আসলে তারা তো হচ্ছে লেনিনেরই দোসর’।

বর্তমান অবস্থাটি বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে যে, এই অবস্থানটি হচ্ছে বৃহত্তর একটি প্রেক্ষিতের উপসর্গমাত্র। আসল ব্যাপার হলো বিপুল অর্থ সম্পদের অধিকারী ধনাঢ্য মার্কিনিরা বিশেষ একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের জন্য সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে। আর যখনই কেউ তাদের এই সম্পদ সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন তোলে তখনই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, গত বছর প্রেসিডেন্ট ওবামা বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে মৃদু সমালোচনার সুরে কথা বলেছিলেন। আর তাতেই তারা ওবামার ওপর প্রচন্ড রকম ক্ষেপে যান। ওবামা ভলকার আইন নামে একটি আইনের অনুমোদন দিয়েছিলেন। তাতে বলা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্যের সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো কোনো রকম অনুমাননির্ভর বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে পারবে না। এই কারণেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংক মালিকরা ক্ষেপে গিয়ে ওবামার আচরণকে প্রায় সমাজতান্ত্রিক বলে অভিহিত করেছিলেন। আর তাদের প্রস্তাব মতো কর নীতিতে পরিবর্তন মেনে নেওয়ার পর দেখা গেল, তাদের কাউকে কাউকে খুব অল্প পরিমাণেই কর দিতে হচ্ছে। এই অবস্থাটিকে ব্ল্যাকস্টোন গ্রুপের চেয়ারম্যান স্টিফেন স্কেয়ার্জম্যান হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

অন্যদিকে এলিজাবেথ ওয়ারেনের মতো ভদ্র মহিলাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার মতো ঘটনাও থেমে নেই। এলিজাবেথ আর্থিক খাতের একজন সংস্কারক হিসেবে পরিচিত। তিনি বর্তমানে ম্যাসাচুসেট থেকে সিনেটর পদপ্রার্থী। কিছুদিন আগে তিনি একটি ইউটিউব ভিডিওচিত্রে ধনীদের ওপর বেশিমাত্রায় করারোপের পক্ষে কথা বলেছিলেন। তার বক্তব্যে এমন কোনো বিপ্লবাত্মক কথাবার্তা ছিল না। এমনকি অলিভার ওয়েন্ডেল হোমের সেই বিখ্যাত আপ্ত বাক্যের চেয়েও তার বক্তব্য কম ধারালো ছিল। অলিভার তো তার সেই বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমরা একটি সভ্য সমাজের উদ্দেশ্যেই কর প্রদান করে থাকি।’

কিন্তু মিস ওয়ারেনের বিরুদ্ধে সম্পদশালীদের পক্ষে ওকালতি করা মানুষজনের কথা শুনলে আপনার মনে হবে, মিস ওয়ারেনের রূপ ধরে বুঝিবা লিওন ট্রটস্কির দ্বিতীয় দফা মর্ত্যে আগমন ঘটেছে। জর্জ উইল তো বলেই বসলেন, ওয়ারেন একটি সমবায়ী এজেন্ডা নিয়েই এগুচ্ছেন এবং তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যক্তিতান্ত্রিকতা হচ্ছে এক ধরনের পৌরানিক দানব। আর রাশ লিমবাগ তাকে ‘পরগাছা’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘ওয়ারেন এমন একটি পরগাছা যে কিনা তাকে আশ্রয় দেওয়া গাছটিকেই ঘৃণা করে। যে গাছটির গায়ে জড়িয়ে থেকে সে তার জীবনের উপদান সংগ্রহ করছে সে গাছটিকেই সে আবার ধ্বংস করে দিতে চায়।’ সেখানে আসলে ঘটছেটা কী? উত্তর হলো- ওয়াল স্ট্রিটে আস্তানা গেঁড়ে থাকা বিশ্ব মোড়লরা বুঝে গেছেন, নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার পক্ষে নৈতিক কোনো শক্তি এখন আর তাদের অবশিষ্ট নেই। তারা কোনো জন গাল্ট নন, নন কোনো স্টিভ জবসও। তারা আসলে এক ধরনের আর্থিক ফেরিওয়ালা। অর্থের সব জটিল ফাঁদ পেতে নিজেরা বিপুল বিত্তবৈভব হাতিয়ে নিচ্ছেন। তাদের কর্মকান্ড মার্কিন জনগণের কোনো উপকারেই আসছে না। উপরন্তু, তাদের এসব ফন্দিফিকির আমাদের বড় ধরনের সংকটের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। যার ফলস্বরূপ লাখ লাখ কোটি কোটি মার্কিন নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে।

এতকিছুর পরও কোনো রকম ক্ষতিই তাদের গুনতে হচ্ছে না। তাদের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন জনগণের করের টাকায় বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের অবদান খুবই সামান্য। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ভোগ করছে। এখনো তারা সামনের দিকে থেকেই মজা লুটছে। আর পেছনে থাকা করদাতা জনগণ তাদের সবকিছুই হারাচ্ছে। তারা কর নীতিতে থেকে যাওয়া ফাঁকফোকড় গলিয়ে কর প্রদানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের রেয়াত পেয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাই দেখা যায় কোটি কোটি ডলার আয়-উপার্জনকারীদের চেয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর দেওয়া করের পরিমাণ বেশি।

তারা যে এ ধরনের বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে তা নিয়ে কোনো রকম উচ্চবাচ্য করা যাবে না। কেউ যদি করতে চায় এবং যত ভদ্র ভাষায়ই তা করা হোক না কেন, তাকে রক্ষক বা দৈত্য হিসেবে চিত্রিত করা হবে এবং মঞ্চ থেকে বিতাড়িত হবে সে। বস্ত্তত, একজন মানুষ যত বেশি পরিশীলিত ভাষায় এবং যুক্তিসঙ্গত উপায়ে তাদের সমালোচনা করবে সেও ঠিক তত বেশি পরিমাণেই দৈত্য হিসেবে আখ্যায়িত হবে। এলিজাবেথ ওয়ারেনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সুতরাং, প্রকৃতপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কে? অবশ্যই আন্দোলনকারীরা নয়, যারা কেবল তাদের বক্তব্যগুলো উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। নিজেদের কথাগুলো অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে চাইছে। আসল চরমপন্থী হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী, যারা তাদের বিপুল বিত্তবৈভব আহরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার যে কোনো কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতে চায়।

লেখক নোবেলজয়ী মার্কিনি অর্থনীতিবিদ [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: