শিশুর অটিজম এবং আমরা

স্বাস্থ্য: শিশুর অটিজম এবং আমরা
ডা. আহমেদ হেলাল ছোটন

পত্রপত্রিকা এবং ইন্টারনেটসহ ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার কল্যাণে ‘অটিজম’ সবার কাছে মোটামুটি একটি পরিচিত শব্দ। ২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী অটিজম সচেতনতা দিবসও পালন করা হয়। অটিজম নিয়ে আমাদের দেশে তো বটেই, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও রয়েছে বেশকিছু বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা। কোনও কোনও ‘বিশেষজ্ঞ’ মহলের ধারণা, অটিজম কোনওভাবেই মানসিক সমস্যা নয়, এটা স্নায়ুগত সমস্যা। তাই এর চিকিৎসা করবে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা। আবার কারও মতে, এটা কেবল মানসিক বিকাশের সমস্যা তাই মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাই পারেন এর উপযুক্ত চিকিৎসা করতে। কেউ আবার বলেন, এটা শিশুদের সমস্যা, সুতরাং এর জন্য দরকার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। আর আরেক মহলের দাবি, অটিজম কোনও রোগ বা সমস্যাই নয়Ñ এটা চিকিৎসক ও এনজিওদের বাণিজ্যিক ও পেশাগত স্বার্থ হাসিল করার একটি ইস্যু।
প্রকৃতপক্ষে কেবল একজন স্নায়ুরোগবিদ বা একজন মনোবিদ বা একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের একার পক্ষে অটিজমের সার্বিক চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে কোনও চিকিৎসকের সাহায্য না নিয়ে কেবল সভা-সেমিনার করে অটিস্টিক শিশুদের জন্য কার্যকর কোনও ব্যবস্থাও গ্রহণ করা অসম্ভব। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী ও সমন্বিত চিকিৎসাসেবা ।

অটিজম কী
অটিজম হচ্ছে শিশুদের বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ এবং আচরণের সমস্যা। আমাদের আশপাশে এমন কিছু শিশু দেখে থাকি, যারা নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকে, সামাজিকভাবে আর দশটা শিশুর মতো বেড়ে ওঠে না। অটিজম এক ধরনের রোগ আর যেসব শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয় তাদের বলা হয় অটিস্টিক শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত সব রোগের তালিকাসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘ইন্টারন্যাশনাল কাসিফিকেশন অব ডিজিজে’ শিশুদের অটিজমকে ‘এফ-৮৪.০’ হিসাবে কোডিং করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে বেশিরভাগ েেত্র শিশুর বয়স ৩ বছর হওয়ার আগেই অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। বিশ্বের প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে ০.৬ থেকে ১৫ জন অটিজমে আক্রান্ত হয়। মেয়েশিশুদের তুলনায় ছেলেশিশুদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় চার গুণ বেশি। সম্প্রতি বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট পরিচালিত এক কমিউনিটি সার্ভেতে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর হার শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি হাজারে প্রায় ৮ জন।

অটিজমের কারণ
অটিজম কেন হয় তার সুস্পষ্ট কারণ এখনও আবিষ্কার হয়নি। তবে এ রোগের ওপর জেনেটিক প্রভাব রয়েছে। সাধারণ যেকোনও শিশুর চেয়ে যাদের ভাই বা বোনের অটিজম আছে তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৫০ গুণ বেশি। ধারণা করা হয় ক্রোমোজম নম্বর ৭য়-এর অস্বাভাবিকতার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে। অটিজম আছে এমন শিশুদের মধ্যে ২৫ শতাংশের খিঁচুনি থাকতে পারে।

অটিস্টিক শিশুর সমস্যা সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধা
# অটিজম আছে এমন শিশুর েেত্র দেখা যায়Ñ স্বাভাবিক একটি শিশু যেভাবে বেড়ে ওঠে, যেভাবে সামাজিক সম্পর্কগুলোর সঙ্গে ধীরে ধীরে যোগাযোগ তৈরি করে সে তা করতে পারে না।
# বাবা-মা বা প্রিয়জনের চোখে চোখ রাখতে, মুখভঙ্গি ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজের চাওয়া বা না-চাওয়া বোঝাতে সে অপারগ হয়।
# সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে নাÑ অমিশুক প্রবণতা থাকে।
# কোনও ধরনের আনন্দদায়ক বস্তু বা বিষয় সে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয় না, যেমনÑ স্বাভাবিক একটি শিশু কোনও খেলনা হাতে পেলে সেটার দিকে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিন্তু অটিস্টিক শিশুর েেত্র এ ধরনের কোনও খেলনার প্রতি তার নিজস্ব কিছুটা আগ্রহ থাকলেও সেটা নিয়ে তার কোনও উচ্ছ্বাস থাকে না।
# শারীরিক আদর, চুমু দেওয়া, চেপে ধরে কোলে নেওয়াটা তারা মোটেই পছন্দ করে না।

যোগাযোগের সমস্যা
# আশপাশের পরিবেশ ও মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতা কমে যায়, দেখা যায় ২ থেকে ৩ বছর বয়সে স্বাভাবিক শিশুরা যেসব শব্দ উচ্চারণ করতে পারে সমবয়সী অটিজম আছে এমন শিশুরা তা পারে না। তবে মনে রাখতে হবে যে কেবল কথা শিখতে দেরি হওয়া মানেই কিন্তু অটিজম নয়।
# কোনও েেত্র শিশুটি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হয়তো পারে, কিন্তু একটি বাক্য শুরু করতে তার অস্বাভাবিক রকম দেরি হয় অথবা বাক্য শুরু করার পর তা শেষ করতে পারে না।
# কখনওবা দেখা যায় একই শব্দ সে বারবার উচ্চারণ করে যাচ্ছে। অটিজম আছে এমন শিশুকে যদি প্রশ্ন করা হয় ‘তুমি কি ঘুমাবে?’ Ñএ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে প্রশ্নটিই আবার উচ্চারণ করেÑ ‘তুমি কি ঘুমাবে?’
# ৩ বছরের কম বয়সী শিশুরা তার বয়সের উপযোগী নানা রকম খেলা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেরাই তৈরি করে খেলে, কিন্তু অটিস্টিক শিশুরা এ রকমটি করে না।

আচরণের অস্বাভাবিকতা
# একই আচরণ বারবার সে করতে থাকে। হয়তো হাত দোলাতে থাকে বা আঙুল নাড়াতে থাকে।
#আওয়াজ পছন্দ করে না।
# তারা রুটিন মেনে চলতে ভালবাসে। দৈনন্দিন কোনও রুটিনের গড়বড় হলে তারা মন খারাপ করে।
# কোনও কারণ ছাড়াই দেখা যায় এরা হঠাৎ করে রেগে ওঠে বা ভীত হয়ে যায়।

পরিচর্যা ও চিকিৎসাসেবা
অটিজম রয়েছে এমন শিশুদের মধ্যে ১০-২০ শতাংশ শিশু চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে মোটামুটি সুস্থ হয়ে ওঠে, এবং সাধারণ স্কুলে স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে পড়ালেখা করতে পারে। আরও ১০-২০ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে পড়ালেখা করতে পারে না, তারা বাসায় থাকে বা তাদের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত স্কুল ও বিশেষ প্রশিণের; বিশেষায়িত স্কুলে পড়ে, ভাষাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিণ গ্রহণ করে তারা সমাজে মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থান করে নেয়। কিন্তু বাদবাকি প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু যাদের অটিজম আছে, সব ধরনের সহায়তা পাওয়ার পরও স্বাধীনভাবে, এককভাবে জীবন অতিবাহিত করতে পারে নাÑ তাদের জন্য প্রয়োজন হয় দীর্ঘদিনেরÑ প্রায় সারা জীবনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরতা। বিশেষ আবাসনে, বিশেষ নার্সিং কেয়ারের প্রয়োজন হয় তাদের।
তিনটি বিষয়ের ওপর ল্য রেখে শিশুর অটিজমের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়Ñ
# প্রথমত, অস্বাভাবিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য শিশুর বাবা-মাকে প্রয়োজনীয় প্রশিণ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা বাড়িতে শিশুর আচরণগত পরিবর্তন করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। শিশুর অনাকাক্সিত আচরণের দিকে মনোযোগ দেবেন না, কাক্সিত আচরণের জন্য তাকে উৎসাহিত করুন।
# দ্বিতীয়ত, বিশেষায়িত স্কুলের মাধ্যমে এ ধরনের শিশুকে একদিকে যেমন প্রথাগত শিা দেওয়া হয় তেমনি ভবিষ্যতে তার জন্য উপযোগী যেকোনও পেশাগত প্রশিণ দেওয়া হয়। বিশেষায়িত স্কুলের পাশাপাশি বাড়িতেও শিশুকে সামাজিক রীতিনীতি শেখানোর চেষ্টা করুন, সামাজিক
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন। শিশুর সঙ্গে নিজেরা সময় কাটান, খেলা করুন এবং সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে উৎসাহিত করুন।
# তৃতীয়ত, শিশুর ভাষা শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দিন। ছোট ছোট শব্দ দিয়ে তার ভাষার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করুন। তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট করে কথা বলুন। প্রয়োজনে তাকে ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে সাহায্য করুন এবং ইশারার তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করুন।
রোগলণ অনুযায়ী কিছু ওষুধ প্রদান ও সাইকোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারেÑ তবে তা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
অটিজম রয়েছে এমন শিশুর বাবা-মায়ের জন্য প্রয়োজন বিশেষ সেবা-পরামর্শ। তারা যেন তাদের এ শিশুটিকে নিজেদের বোঝা মনে না করেন। অযথা শিশুর অটিজমকে লুকিয়ে না রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও বিশেষায়িত স্কুলের সাহায্য গ্রহণ করেন সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখন বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ ধরনের শিশুকে নিয়ে প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছে। এই একটু পিছিয়ে পড়া শিশুদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে দরকার সবার সচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ।
Posted by সাপ্তাহিক ২০০০ | বিবিধ | বৃহস্পতিবার 1 এপ্রিল 2010 11:16 অপরাহ্ন ১৮ চৈত্র ১৪১৬

Visit us on FaceBook

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to শিশুর অটিজম এবং আমরা

  1. পিংব্যাকঃ অটিজম একটি মনোবিকাশ সমস্যা Autism in Bangladesh « Ekush's Blog | একুশ নিউজ মিডিয়া । লিটল বাংলাদেশ । লস এঞ্জেলেস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: