স্বপ্ন দেখানো সেরা দেশী ১০ ব্র্যান্ড

স্বপ্ন দেখানো সেরা দেশী ১০ ব্র্যান্ড

সাইফুল হাসান ও ইসমাইল আলী 

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে— এ রকম একটি বিজ্ঞাপন গত শতকে এ দেশের টিভিতে প্রচারিত হতো। অনেকেই এটাকে স্রেফ বিজ্ঞাপনের চটকদার কথা হিসেবেই নিয়েছিলেন, হয়তো সেটাই সত্যি। কিন্তু দেশ যে সত্যি সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছে, সে অন্তর্জ্ঞান সবার কাছে স্পষ্ট না হলেও কিছু ব্যক্তি বা উদ্যোক্তা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, সময় তাদের কাঁধে দায়িত্ব দিয়েছে ‘বন্যা-খরা-প্রাকৃতিক’ দুর্যোগের এ দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। তাদের পরিশ্রম, উদ্যোগী মানসিকতার জন্যই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ১১ উদীয়মান অর্থনীতির একটি দেশ।
এ অগ্রযাত্রার সূচনা হয়েছিল সেই সময়, যখন দেশের অর্থনীতির বড় অংশই ছিল বিদেশি ঋণনির্ভর। শিল্প-কারখানা যা ছিল, তার অধিকাংশই সরকারি মালিকানাধীন, অব্যবস্থাপনা আর লোকসানে সয়লাব। কর্মসংস্থানের বেশিরভাগই কৃষি খাতে। সে অবস্থা থেকে অনেকটা দৃষ্টির আড়ালেই দেশের অর্থনীতি ও জীবন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। আটপৌরে বাঙালি স্বনির্ভর হতে চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ পুরো দেশটাই বদলে দিতে চেয়েছেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বানানোর স্বপ্ন দেখেছেন। আর অনেক নতুন নতুন উদ্যোক্তা তাদের দেখানো পথে হেঁটেছেন।
ধীরে ধীরে সেদিনের সেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই আজ শিল্পপতিতে পরিণত হয়েছেন। বিদেশি পণ্যের মিছিল থেকে তারা স্বতন্ত্রতা দিয়েছেন নিজেদের তৈরি পণ্যে। শুরুতে যে সবাই সফলতা পেয়েছিলেন, এমন নয়। কিন্তু তাদের উদ্যোগী মানসিকতার কাছে সাফল্য শেষ পর্যন্ত এসে ধরা দিতে বাধ্য হয়েছে। পণ্য উত্পাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন তারা। এ ধারায় আজ দেশেই তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের পণ্য। বাংলাদেশে এখন এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা বিশ্বমানের পণ্য তৈরি করছে, বৈশ্বিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
এসব প্রতিষ্ঠান ও শিল্প উদ্যোক্তার চোখেই এ দেশের অর্থনীতি নতুন পথে চলতে শিখেছে, যারা পুরো বাজার ও বিপণন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছেন। এরাই ‘শাইনিং বাংলাদেশ’-এর রূপকার, যাদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস লেখা কখনোই সম্ভব হবে না। মূলত এসব ব্র্যান্ড ও কোম্পানি নিয়েই বণিক বার্তার এ আয়োজন।
বাংলাদেশকে বিশ্বে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করিয়েছে যে প্রতিষ্ঠানটি, তার নাম স্কয়ার। দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে, পাশাপাশি খাদ্য ও প্রশাসন খাতেও আশাতীত সাফল্য দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসই স্কয়ারকে স্বতন্ত্র স্থানে বসিয়েছে। পোশাককে কেবল পরিধেয় বস্ত্রের জায়গায় না রেখে এ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আলিঙ্গন করে নিজস্ব ধাঁচের ফ্যাশনেবল পোশাক সৃষ্টিতে আড়ং অদ্বিতীয়। নিপুণের হাত ধরে এ উদ্যোগ শুরু হলেও ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরির বিচারে আড়ংয়ের অবস্থান শীর্ষে। চামড়াজাত পণ্যে বিশ্বে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় দিয়েছে ‘এপেক্স’। দেশে বোতলজাত পানির ধারণা প্রবর্তন করে জনরুচি ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এনেছে পারটেক্স গ্রুপের ‘মাম’। আসবাবের প্রচলিত ধারণা ভেঙে আরও ব্যবহারিক ও দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনে উপস্থাপনে একক কৃতিত্ব অটবির। বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধি রহিমআফরোজ। এ প্রতিষ্ঠানটির মধ্য দিয়ে বিশ্ব এখন অন্য এক বাংলাদেশকে চেনে। সিমেন্টের বাজারে বহুজাতিক কোম্পানির একচেটিয়াত্ব ভেঙে ভোক্তা আস্থা অর্জন করেছে শাহ সিমেন্ট। কাগুজে রুমাল বা টিস্যুর বাজারে বিদেশি কোম্পানিকে সরিয়ে আজ অপ্রতিদ্বন্দ্বী বসুন্ধরা টিস্যু। কাচ ও কাচপণ্যে বিদেশনির্ভরতা শূন্যের কোঠায় ঠেলে দিয়ে বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে নাসির গ্লাস। ইলেক্ট্রনিক পণ্যে অনেক নামি বহুজাতিক কোম্পানিকে সরিয়ে দেশের মানুষের হূদয় জয় করেছে ‘ওয়ালটন’।
নামের মতোই তুখোড় ও পারদর্শী স্কয়ার

দেশের সেরা ব্র্যান্ড হিসেবে প্রথমেই চলে আসবে স্কয়ারের নাম। এ নামের শাব্দিক অর্থ ‘চতুস্কোণ’, আরেক অর্থে পারদর্শী, তুখোড়। স্কয়ার নাম রাখার ক্ষেত্রে এই দুটি অর্থই ব্যবহার করা হয়েছে। ‘৪৭-এর দেশ ভাগের পর এক প্রতিকূল পরিবেশে পাবনার ৩২ বছরের এক যুবক স্বপ্ন দেখেছিলেন ভিন্ন এক ব্যবসায়িক উদ্যোগের। ১৯৫৮ সালে চার বন্ধু মিলে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের পাবনা জেলার ছোট্ট গ্রাম আতাইকুলায় গড়ে তোলেন ‘স্কয়ার ফার্মা’। যাত্রাটা সেই থেকেই অগ্রযাত্রায় পরিণত হয়েছে। স্কয়ারের চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরীর স্মৃতিচারণ থেকে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়, ‘আমরা চার বন্ধু মিলে এ কোম্পানিটি খুলেছিলাম, তাই এর নাম স্কয়ার রাখা হয়েছে। তা ছাড়া এর মাধ্যমে নির্ভুলতা ও উপযুক্ততাও বোঝায়।’
৮৫ বছর বয়সী এই মানুষটিকে বেসরকারি খাতের অভিভাবকও বলা যায়, দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী হিসেবে যার রয়েছে দেশব্যাপী সুনাম। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে তিনি অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছেন। মূলত ওষুধ (ফার্মাসিউটিক্যাল) দিয়ে স্কয়ারের যাত্রা শুরু। ২৭ বছর ধরে এ খাতের নেতৃত্বও তাদের হাতেই। ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এরপর স্কয়ার যেখানেই হাত দিয়েছে সেখানেই সাফল্য এসেছে। ব্র্যান্ড হিসেবে স্কয়ারের এই সাফল্যের পেছনে অন্যতম কারণটি হচ্ছে বাজার এবং ক্রেতাদের প্রতি অঙ্গীকার। অন্তত স্কয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তা-ই মনে করেন।
বর্তমানে স্কয়ার গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আর সম্পদের পরিমাণ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত বছর শুধু ওষুধেই তাদের টার্নওভার ছিল ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কাজ করছেন ২৮ হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা। ওষুধের বাইরে প্রসাধনী, ভোগ্যপণ্য, টেক্সটাইল এবং মিডিয়ায় তাদের বিনিয়োগ আছে। স্কয়ারের এই দীর্ঘ যাত্রায় স্যামসন এইচ চৌধুরীর পাশাপাশি এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার সন্তান তপন চৌধুরী।
স্কয়ারের সাফল্য বিষয়ে কিছু দিন আগেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী বণিক বার্তাকে জানিয়েছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি ছিল তা অনেকটা ভাঙতে পেরেছে স্কয়ার। দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা-বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছে আমাদের সব পণ্য। ফলে প্রতিষ্ঠানটি শুধু পরিবারের সম্পদ নয়, দেশের সম্পদে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই স্কয়ার শত বছর বেঁচে থাকবে এবং দেশের মানুষের সম্মান ও ভালোবাসায় টিকে থাকবে।’ তিনি জানান, শুধু ব্যবসায়িক টার্নওভার নয়, সম্মানের বিচারেও স্কয়ার দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি।
স্যামসন এইচ চৌধুরী শুধু স্কয়ার ফার্মা গড়েই থেমে থাকেননি। নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানের তালিকা অনেক দীর্ঘ করে তুলেছেন। একের পর এক গড়ে তোলেন স্কয়ার টয়লেট্রিজ, স্কয়ার কনজ্যুমার প্রোডাক্টস, স্কয়ার স্পিনিং, স্কয়ার টেক্সটাইল, স্কয়ার হসপিটাল, স্কয়ার নিট ফেব্রিক্স, স্কয়ার ইনফরমেটিকস, স্কয়ার সিকিউরিটিজ এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
 
১৯৮৫ সাল থেকে স্কয়ার বাংলাদেশের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবস্থান করছে। গত বছর স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। ১৯৮৭ সাল থেকে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য রফতানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রায় ৪৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে তাদের ওষুধ। জানা গেছে, আরও প্রায় ২৫টি দেশে রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
 
১৯৫৮ সালে যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯১ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৯৫ সালে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। এ বিষয়ে তপন চৌধুরী বলেন, ‘স্কয়ারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর জন্যই আমরা পুঁজিবাজারে প্রবেশ করেছি। কার্যকরী মূলধন ছাড়া আমাদের আর কোনো ব্যাংক ঋণ নেই। এ জন্য স্কয়ারের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক বেশি।’
স্কয়ারের এই সাফল্যের অজস্র স্বীকৃতি ও পুরস্কারও পেয়েছেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। সরকারের কাছ থেকে মর্যাদা পেয়েছেন বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ‘সিআইপি’ হিসেবে। বাংলাদেশের আমেরিকান চেম্বার ১৯৯৮ সালে স্যামসন এইচ চৌধুরীকে ‘বিজনেস এক্সিকিউটিভ অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০০ সালে পেয়েছেন ‘ডিএইচএল-ডেইলি স্টার বিজনেসম্যান অব দ্য ইয়ার’। এ ছাড়া রফতানিতে অবদান রাখার জন্য ১৯৯৭ সালে ‘ন্যাশনাল এক্সপোর্ট ট্রফি’ লাভ করে স্কয়ার ফার্মা। আর ২০০৭ সালে সার্কভুক্ত দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে ‘অ্যাচিভার অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিলেন্স’ হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করে।
স্কয়ার সম্পর্কে আইবিএ শিক্ষক ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রুপ হিসেবে নিশ্চয় স্কয়ার দেশের শীর্ষ ব্র্যান্ডের একটি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের পণ্য ব্র্যান্ডিংয়েও অনেক বিনিয়োগ করছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পণ্য বাজারের শীর্ষ পণ্য নয়। যদিও স্কয়ার নামটার প্রতি অনেক মানুষের আস্থা-ভালোবাসা আছে।
ব্র্যান্ড ফোরামের শরীফুল ইসলাম বলেন, স্কয়ার একটি করপোরেট ব্র্যান্ড। তাদের প্রতি মানুষের আস্থা সব সময় আলাদা করে চোখে পড়ে, যার প্রতিফলন স্কয়ারের প্রতিটি উপ ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। এখন স্কয়ার ব্র্যান্ড হিসেবে যত স্ট্রং হবে তত বেশি পুনর্বিনিয়োগ করতে পারবে। বিশ্বে এটা প্রমাণিত যে, যত শক্তিশালী ব্র্যান্ড, দীর্ঘ মেয়াদে সে তত ভালো কোম্পানি। স্কয়ারও এ দেশের তেমন একটি কোম্পানি।
দেশী পোশাকের ঠিকানা ‘আড়ং’
বাংলা শব্দ ‘আড়ং’-এর অর্থ গ্রাম্যমেলা বা বাজার। গ্রামের সাধারণ মানুষের তৈরি পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন ও বিক্রির যেমন সুযোগ করে দেয় গ্রাম্যমেলা, আড়ংও তেমনি একই কাজটি করে। মূলত দেশীয় হস্তশিল্প সংগ্রহ করে সেগুলো প্রদর্শন ও বিক্রি করার ধারণা থেকেই আড়ংয়ের যাত্রা শুরু। যদিও আড়ং এখন আর শুধু গ্রাম্যমেলার মতো ছোট কোনো পরিসরে আটকে নেই, পরিণত হয়েছে বহুমুখী ও বিশাল প্রতিষ্ঠানে। আড়ংয়ের যেসব পণ্য পাওয়া যায় তার মূল সরবরাহ আসে গ্রামীণ মহিলাদের কাছ থেকে। মূলত দরিদ্র্য অসহায় মহিলাদের জীবন বদলে সহায়তা দিতেই আড়ংয়ের জন্ম। দেশের সেই ঐতিহ্যবাহী পণ্য রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরছে তারা। ‘আড়ং’ নামটিই এখন আস্থা, গুণগতমানের প্রতীক।
 
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ১৯৭৬ সালে মানিকগঞ্জে নারীদের শাড়ি তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে। পাশাপাশি এই নারীদের তৈরি শাড়ি রাজধানীতে বিক্রির উদ্যোগ নেয় তারা। এ উদ্যোগ থেকেই ১৯৭৮ সালে জন্ম আড়ংয়ের। লোগো হিসেবে বেছে নেয়া হয় একটি ময়ূরের প্রতিকৃতি। এতে ব্যবহার করা হয় কমলা রঙ। কারণ কমলা হচ্ছে শক্তি বা তেজদীপ্ততার প্রতীক। বিপণন কৌশল, ডিজাইন বা ভাবমূর্তি তৈরিতে শুরু থেকেই সেই তেজদীপ্ততা দেখিয়ে আসছে আড়ং।
আড়ংয়ের পরিচালক তামারা আবেদ বণিক বার্তাকে জানান, আড়ং আজ শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারণ আমরা গ্রাহকদের কাছে যে অঙ্গীকার করেছিলাম তা সব সময় রক্ষা করে এসেছি। আড়ং যখন যাত্রা শুরু করে তখন বাংলাদেশে একদরের দোকান কমই ছিল। আড়ংই সম্ভবত প্রথম এবং যৌক্তিক দামের নির্দিষ্ট মূল্যের দোকান। পাশাপাশি শুরু থেকেই আমরা ডিজাইন এবং মানের দিকে নজর রেখেছি এবং তা ধরেও রেখেছি। এ কারণেই আড়ং কারুশিল্পের সব থেকে বড় ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তথ্য মতে, শুরুর দিকে আড়ং জামদানি এবং ব্লক প্রিন্টের সিল্ক শাড়ি, নকশিকাঁথা, পাট পণ্য, মৃত্পণ্য, রুপার অলঙ্কার, চামড়াজাত পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করত। কিন্তু আড়ংকে মানুষ চিনেছে নকশিকাঁথা, পাজামা-পাঞ্জাবি আর শাড়ির কারণে। অর্থাত্ আড়ংয়ের পরিচিতি এসেছে পোশাক দিয়ে।
 
আড়ং জানিয়েছে, প্রথমে তারা শুধু পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের জন্য পোশাক তৈরি করত। আর এখন একশ’র বেশি ফ্যাশন ও লাইফ স্টাইল সংশ্লিষ্ট পণ্য রয়েছে তাদের। এর মধ্যে গহনা, জুতা, কার্পেট, পাটের বিভিন্ন সামগ্রী, হোম কেয়ার পণ্যসামগ্রী, মোমবাতি, শোপিস অন্যতম। পাশাপাশি বিভিন্ন রকম খাদ্যদ্রব্য ও প্রসাধনী সামগ্রীও তৈরি শুরু করেছে তারা। খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে দুধ, জুস, দই, মাখন ও মধু। আর প্রসাধনীর মধ্যে রয়েছে শ্যাম্পু, সাবান, তেল, ফেসওয়াশ ইত্যাদি। আর হোম কেয়ারে রয়েছে ১৭ রকমের পণ্য।
জানা গেছে, আড়ংই প্রথম দেশে ফ্যাশন শো, প্রদর্শনী ও অন্যান্য প্রচারমুখী কার্যক্রমের আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরির চেষ্টা করে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে আড়ং নামটি ক্রমেই দেশে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। আড়ংই প্রথম প্রতিষ্ঠিত মডেলদের দিয়ে বিজ্ঞাপন নির্মাণ শুরু করে এবং এখনো বিপণন কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে পথিকৃত হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। এ কারণেই ঈদ বা পূজা-পার্বণের মতো উত্সবে শহুরে ফ্যাশন সচেতন তরুণ-তরুণী কিংবা বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছে অগ্রাধিকার পায় আড়ংয়ের পোশাক।
তামারা আবেদ বলেন, আড়ং সব সময় মিশন বা লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে। ৩২ বছর ধরে দেশীয় পণ্য বিক্রি করেছে। বিদেশী কোনো পণ্য আমরা কখনো বিক্রি করিনি। কারুশিল্পের উন্নয়নে কাজ করেছি। দেশীয়ভাবে এত কিছু করা যেতে পারে সেটা একসময় এ দেশে কেউই বিশ্বাস করত না। এখন মানুষের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস এসেছে। দেশ-বিদেশে সবাই আমাদের কাজকে প্রশংসা করছে। এগুলোই মূলত আমাদের শক্তি, প্রেরণার উত্স।
 
বিদেশীদের কাছে আড়ং অনেক সমাদৃত। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ভাবমূর্তি এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো অতিথি বাংলাদেশে এলে তারা আড়ংয়ে যাবেনই এটা খুব সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
 
বর্তমানে আড়ংয়ের আউটলেটের সংখ্যা ১১। এর মধ্যে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আড়ং সেন্টারসহ ঢাকায় ছয়টি, চট্টগ্রামে দুটি, সিলেট ও খুলনায় একটি করে এবং লন্ডনে রয়েছে একটি আউটলেট।
 
জনপ্রিয়তার কারণে অনেকেই আড়ংকে দেশী ‘পোশাকের মক্কা’ বলে মনে করে থাকেন। ২০০৯ সালে আড়ং ব্র্যান্ড ফোরামের সৌখিন ক্যাটাগরিতে ‘সেরা ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘মোস্ট ইফেক্টিভ বিলবোর্ড অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ এ তাদের যাত্রার ৩০ বছর পালন করেছে।
আড়ংয়ের লক্ষ্য এখন বিশ্বব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। এ বিষয়ে তামারা আবেদ বলেন, আমাদের পরবর্তী লেভেলে যেতে হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক লেভেলে যাওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার সেটা আমাদের নেই। আমর চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে বাংলাদেশের।’
 
আড়ং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে বর্তমানে ৬৫ হাজার কর্মী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, যার ৮৫ শতাংশ নারী। এ ছাড়াও ৩ হাজার ডিজাইনার আড়ংয়ের জন্য পোশাকের ডিজাইন করে। দেশের প্রায় ২ হাজার গ্রামে আড়ংয়ের ১৩টি প্রোডাকশন সেন্টার ও ৬০০টি সাব সেন্টার আছে। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এছাড়া আড়ংয়ের মাধ্যমে ২৫ হাজার স্বাধীন সমিতি এবং পারিবারিক কর্মীদের তৈরি পণ্য বাজারজাত হয়।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি চায় ওয়ালটন
বছর পাঁচেক আগের কথা, ইলেক্ট্রনিক পণ্যের ক্ষেত্রে বিদেশী পণ্যের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না এ দেশের মানুষের। এই নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। শুধু পণ্য তৈরি করেই বসে থাকেনি, ওয়ালটন এখন দেশের বাজারে বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। অন্যদিকে দামের ক্ষেত্রে মানুষের সাধ আর সাধ্যের সমন্বয়ও করছে তারা। পাশাপাশি বিশ্বমানের পণ্য তৈরি ও আগ্রাসী বিপণন কৌশলের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের প্রথম সারিতে উঠে এসেছে ওয়ালটন। এখন তাদের স্বপ্ন গাড়ি বানানো এবং সে পথে যাত্রাও শুরু করেছে তারা।
 
ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম আশরাফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের পণ্য হিসেবেই ওয়ালটন তার ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করেছে এবং মানুষ এটা গ্রহণ করেছে। দেশের একমাত্র রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার প্রস্তুত এবং রফতানিকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওয়ালটন ধীরে ধীরে তার ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে।
শুধু দেশের বাজারেই সেরা হতে চায় না ওয়ালটন। বরং এই নামটিকে বিশ্ব ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
 
আশরাফুল আলম বলেন, ‘ওয়ালটনের পণ্যের গুণগত মান আরও বাড়াতে জাপান ও আমেরিকার দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছি আমরা। আমাদের লক্ষ্য ২০১৩ সালের মধ্যে ৫০টি দেশে পণ্য রফতানি এবং ২০১৫ সালের মধ্যে ইলেকট্রনিক্স ক্যাটাগরিতে বিশ্বের সেরা ১০ ব্র্যান্ডের একটি হওয়া। আগামী বছর থেকে ওয়ালটন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাবে।’
 
ওয়ালটনকে এখন নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবিও বলা যায়। কেননা, প্রতিষ্ঠানটি তার বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশকে তুলে ধরছে। ‘ওয়ালটন আমাদের পণ্য’ শুধু এই স্লোগানেই বাজার কাঁপাচ্ছে তারা। টিভি, ফ্রিজ, মোটরবাইক, এলইডি ল্যাম্প, জেনারেটর, মাইক্রো ওয়েভ ওভেন, আয়রন, মোবাইল হ্যান্ডসেট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) তৈরি করছে তারা।
 
এরই মধ্যে ফ্রিজ বাজারে শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছে ওয়ালটন। গত বছর পর্যন্ত ফ্রিজের বাজারে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই দুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত সব ব্র্যান্ডকে ছাড়িয়ে গেছে ওয়ালটন ফ্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য মতে, গত বছর ফ্রিজের বাজারের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ছিল ওয়ালটনের দখলে। আর এ বছর কমপক্ষে ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়ালটনের।
বর্তমানে সারা দেশে ওয়ালটনের ১১৪টি শোরুম, ৩৩টি সার্ভিস সেন্টার এবং ৭০০ জন ডিলার রয়েছেন। তবে প্রতিটি থানায় ওয়ালটনের শোরুমসহ সার্ভিস সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
টেলিভিশনের বাজারেও দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর বাইরে মোটরবাইক, মোবাইল সেট, ডিভিডি প্লেয়ারসহ ইলেকট্রনিক্সের তাবত্ ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন তারা সাধারণ টেলিভিশনের পাশাপাশি এলসিডি, এলইডি টেলিভিশনও তৈরি করছে।
 
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য মতে, ১৯৭৭ সালে আরবি গ্রুপ যাত্রা শুরু করে। তবে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের বাজারে ওয়ালটনের আগমন অনেক পরে। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুরে নিজস্ব কারখানা স্থাপন করে আর উত্পাদন শুরু করে ২০০৮ সালে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার ২৫৫ কোটি টাকা।
শুধু দেশেই নয়, ওয়ালটন ২০১০ সাল থেকে বিদেশেও পণ্য রফতানি শুরু করে। বর্তমানে মিয়ানমার, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, দুবাই, সিঙ্গাপুর, সুদান, দক্ষিণ আফ্রিকায় ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য রফতানি করছে। এ ছাড়া চলতি বছরেই আফ্রিকার মহাদেশের আরও ১০টি দেশে পণ্য রফতানি করতে যাচ্ছে।
ওয়ালটনের সিনিয়র উপ-পরিচালক উদয় হাকিম বণিক বার্তাকে জানান, ‘ওয়ালটন তার পণ্যকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চায়। ওয়ালটন স্বপ্ন দেখে দেশে নতুন প্রযুক্তি আনার এবং নতুন নতুন শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠার।’
উদয় হাকিম জানান, ওয়ালটন আগামী বছর জাপানি প্রযুক্তিতে মোটরবাইকের ইঞ্জিন তৈরির কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের মধ্যে গাড়ি, ফ্রিজের কম্প্রেসার, মোবাইল হ্যান্ডসেট, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ তৈরির কারখানাসহ আরও বেশ কয়েকটি কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে ওয়ালটন।
আসবাবে নান্দনিকতায় অটবি
অটবি দেশের আসবাব শিল্পে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আসবাব বিষয়ে মানুষের ভাবনাকেই বদলে দিয়েছে তারা। আধুনিকতা-আভিজাত্য আর নান্দনিকতার প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় ঘর কিংবা অফিস সাজাতে অটবিই মানুষের প্রথম পছন্দ। দেশে যদিও এখন মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রচুর আসবাবপত্র আমদানি হয় কিন্তু অটবির চাহিদা এবং এর প্রতি মানুষের আগ্রহকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি কেউ। বরং অটবি নিজেই এখন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চলেছে।
 
এ বিষয়ে অটবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিমেষ কুণ্ডু বণিক বার্তাকে বলেন, ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে পণ্যের প্রচারণায় যা বলা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। আমরা পণ্যের গুণগত মানের ব্যাপারে ক্রেতাদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং তা সবসময়ই রক্ষা করে আসছি। এর পাশাপাশি নতুন নতুন ডিজাইন ও ক্রেতাদের চাহিদার প্রতি সন্মান জানিয়ে আসবাবপত্র তৈরি করছে অটবি। যে কারণে ক্রেতারা অটবির প্রতি আস্থায় অবিচল থাকছেন। আর এ আস্থা ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত ব্র্যান্ড হিসেবে উন্নতি ও সমৃদ্ধির চেষ্টা করে যাচ্ছে অটবি। ক্রেতাদের প্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে অটবি জেলার গণ্ডি পেরিয়ে উপজেলা শহরগুলোতেও জায়গা করে নিয়েছে। অথচ অটবির যাত্রাটা ছিল খুবই সাদামাটা। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১৯৭৫ সালে এর সূচনা করেন প্রয়াত শিল্পী নিতুন কুণ্ডু। নিজের মেধা মনন দিয়ে অটবিকে আলাদা মাত্রা দিতে পেরেছিলেন তিনি। যে কারণে মাত্র দুই দশকেই দেশের শীর্ষ ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে অটবি। মূলত নিতুন কুণ্ডুর ছোঁয়া পেয়েই আসবাবপত্র শিল্প নান্দনিকতা খুঁজে পায়। নিত্যনতুন ডিজাইনের সঙ্গে শিল্পের মিশেলে অটবিকে নতুনভাবে তুলে ধরেন তিনি।
 
দেশের করপোরেট আসবাব বাজারের ৭৫ শতাংশই অটবির নিয়ন্ত্রণে। প্রতিষ্ঠানটি গৃহস্থালী, রান্নাঘর, অফিস ও হাসপাতালে ব্যবহার হয় এমন সব ধরনের আসবাব তৈরি করে। ২০০৮ সালের নভেম্বরে থেকে দেশের বাইরে প্রথম পা রাখে অটবি।
মূলত দেশীয় সাফল্যের অনুপ্রেরণা থেকেই কলকাতার সল্টলেকে মানি স্কয়ার নামের অভিজাত শপিং সেন্টারে নিজস্ব আউটলেটে ব্যবসা শুরু করে তারা। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, বিপণন কার্যক্রমের শুরুতে অটবির লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মতো বিদেশের বাজারেও অটবিকে ব্র্যান্ড হিসাবে সুপরিচিত এবং প্রতিষ্ঠা করা, যাতে রিবক, এডিডাস, নাইকি কিংবা লিভাইসের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে অটবিকে চিনতে পারে ভারতের মানুষ। সে চেষ্টায় আপাতত সফল। ভারতে অটবির আসবাবপত্রের চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। দুই বছরেরও কম সময়ে ‘ব্র্যান্ডিং’ প্রতিযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গের বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে তারা। ফলে মানি স্কয়ারে বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের অটবির নাম। অনিমেষ কুণ্ডু বলেন, ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা দিয়ে অটবির বিদেশ যাত্রা শুরু হয়। এর পর কলকাতা হয়ে এখন ভারতের বিভিন্ন শহরে ২৫টি আউটলেট রয়েছে অটবির। ভারতের বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড হিসেবে জায়গা করে নেয়া অনেক কঠিন ছিল। কিন্তু অটবি প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের ব্র্যান্ড যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যোগ্যতার সঙ্গে লড়তে জানে, জায়গা করে নিতে জানে। ভারতে অটবির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য মতে, মাত্র দেড় বছরের মধ্যে অটবি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘ব্র্যান্ডেড আসবাবপত্র’ বাজারের পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিজেদের আয়ত্তে নিতে পেরেছ। দ্বিতীয় আউটলেটটি করা হয়েছে কলকাতার আরেক ব্যস্ততম এলাকা লাইডেন স্ট্রিটে। আউটলেট দুটির পাশাপাশি কলকাতা ও এর আশপাশের রাজ্যগুলোতে ২৫ জন ডিলার নিয়োগ করেছে অটবি। যাদের মাধ্যমে বাংলাদেশী এই ব্র্যান্ডের আসবাবপত্র পৌঁছে যাচ্ছে মিজোরাম, সিকিম, আসাম, মণিপুরসহ বেশ কিছু রাজ্যে। দেশে প্রতিষ্ঠানটির ১৮টি শোরুম ও ৫০০ ডিলার রয়েছে।
জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি ভারতেও অটবির আসবাবপত্রের চাহিদা বাড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই চলতি বছরের মধ্যেই কলকাতায় আরও চারটি আউটলেট করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে বিপণন কার্যক্রম শুরু হবে। এ ছাড়া দিল্লি, মুম্বাই ও ব্যাঙ্গালুরুতে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায় অটবি।
 
দেশের ব্র্যান্ড বিদেশেও দাপটের সঙ্গে জায়গা করে নিচ্ছে এ বিষয়ে অনিমেষ কুণ্ডু বলেন, বিদেশে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে শক্তিশালীভাবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে সীমাহীন গৌরববোধ করেছি। প্রথমদিকে আমাদের আসবাবপত্র দেখে অনেকে মনে করত, এগুলো মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের তৈরি। এখন সবাই জানে অটবি বাংলাদেশের ব্র্যান্ড। এ অনভূতি জীবনের সব সফলতাকে ছাপিয়ে যায়। স্বপ্ন দেখছি, ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেবে বাংলাদেশের অটবি।
প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, মানুষের আস্থা আর ভালোবাসাই তাদের এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। ব্র্যান্ড হিসেবে এর প্রতিদান দিতে তাই সব সময় সচেষ্ট। অটবির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে এশিয়ার শীর্ষ তিন ব্র্যান্ডের একটিতে পরিণত হওয়া। অটবি যে স্বপ্ন দেখাচ্ছে, সেই স্বপ্নে বিমোহিত হতে দোষ কী?
অসম্ভবকে সম্ভব করেছে নাসির গ্লাস
দশ বছর আগেও থাই বা মালয়েশিয়ান গ্লাসের ভিড়ে দেশীয় কোনো গ্লাস (কাচ) কোম্পানি জায়গা করে নেবে— এটা অনেকটাই অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল। কিন্তু সেই কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়ে দেশের মাথা উঁচু করেছে নাসির গ্লাস। নাসিরের গ্লাস এখন পৌঁছে গেছে মানুষের ঘরে ঘরে। দেশ ছেড়ে বিদেশী ক্রেতাদেরও মন জয় করেছে নাসির গ্লাস।
‘নাসির গ্লাসে জীবনের প্রতিচ্ছবি’— এই স্লোগানে ২০০৫ সালের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা। এর পরের ইতিহাস স্বপ্নের, বিপ্লবের আর সাফল্যের। মাত্র ৬ বছরের মধ্যে আমদানি নির্ভর কাচ শিল্পকে দেশীয় শিল্প নির্ভর করে তোলে নাসির। এই কৃতিত্বের কিছুটা অবশ্য পিএইচপিরও। কিন্তু সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে নাসির।
 
এই ব্র্যান্ডটির প্রতি মানুষের আগ্রহ সম্পর্কে নাসির গ্রুপের বাণিজ্যিক শাখার মহাব্যবস্থাপক মো. আবু সাইদ বণিক বার্তাকে বলেন, এর অন্যতম কারণ হলো গুণগত মান, যা বিশ্বমানের। আর মানের জন্য নাসির গ্লাস ক্রেতাদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছে। পাশাপাশি শুধু মানের কারণেই বিদেশী গ্লাসকে বাজার থেকে হটিয়ে শীর্ষে এসেছে আমাদের কোম্পানি।
ব্র্যান্ড তৈরিতে শুরু থেকেই নজর দেয়ায় এদিক থেকেও জনগণের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিলেছে বলেও জানান তিনি।
 
জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করে নাসির গ্লাস রফতানি শুরু হয় ২০০৮ সাল থেকে। বর্তমানে ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনিতে নাসিরের গ্লাস রফতানি হচ্ছে। আবু সাইদ জানালেন, প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যত লক্ষ্য এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাজার।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, নাসির গ্লাস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ডিসিএস এবং পিএলসি সফটওয়্যারসহ সম্পূর্ণ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তাদের সব রকমের কারিগরি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চীনের সিটিআইসি (চায়না ট্রিয়াম্প ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি) থেকে আমদানি করা হয়েছে।
 
আবু সাইদ বলেন, নাসির গ্লাস এমন একটি ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে মানুষ প্রতিষ্ঠানের নামের ওপর অনায়াসে আস্থা রাখতে পারে। শুধু দেশেই নয় বিদেশেও ব্র্যান্ড হিসেবে নাসির গ্লাস প্রতিষ্ঠিত।
 
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, নাসির গ্লাস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড আধুনিক প্রযুক্তির ২৫০ টিডিপি গ্লাস তৈরি করে থাকে। এ প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। যেমন- ওরি ড্রেসিংপ্লান্ট, ব্যাচপ্লান্ট, গ্লাস মেল্টিং ফারনেসি, টিনবাথ, এনেলিং লেহর, কাটিং সপ, হাইড্রোজেন এবং নাইট্রোজেন প্লান্টস, সার্কুলেটিং ওয়াটার স্টেশন, কমপ্রেস্ট এয়ার স্টেশন, পাওয়ার জেনারেটর স্টেশন, ক্যাচিং প্লান্ট, টেম্পারিং প্লান্ট, ওয়ার্ক ল্যাব, লাইব্রেরি ইত্যাদি।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, নাসির গ্লাস রফতানি বাজারের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য রিফ্লেকটিভ গ্লাস, ফ্লোট গ্লাস, টেম্পার গ্লাস ও আয়না তৈরি করে থাকে। আর রঙের মধ্যে রয়েছে— স্বচ্ছ, কফি, ডার্ক গ্রে, ওশেন ব্লু এবং গ্রিন ইত্যাদি। আর সাধারণত ছোট, মাঝারি ও বড় এই তিন আকারের গ্লাস তৈরি করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। তবে নির্ধারিত সাইজের বাইরেও ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী গ্লাস সরবরাহ করে থাকে।
নাসির গ্লাস ২৭,০০০ এমটি ফটোগ্লাস তৈরি করছে। শেড হিসেবে ব্যবহার করা হয় স্বচ্ছ, কফি, ব্রোঞ্জ (লাইট ও ডিপ), ডার্ক গ্রে, ওশেন ব্লু এবং গ্রিন। আর টেম্পার্ড শেড হিসেবে কিয়ার, টাইন্ট, কোটেট (১৫৪,৫৬০এম২/এএনইউএম) ব্যবহূত হয়। নাসির গ্লাসের আয়নার থিকনেস রেঞ্জ ৩ মিলিমিটার থেকে ১২ মিলিমিটার। জানা গেছে, ২ মিলিমিটার পুরু গ্লাসও তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে নাসির গ্লাসের।
 
এ মুহূর্তে নাসির গ্লাস বাজারের শীর্ষে এবং তাদের বার্ষিক উত্পাদন ক্ষমতা ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। দেশের চাহিদার প্রায় ৪৮ শতাংশই উত্পাদন করে নাসির গ্লাস।
 
প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যত লক্ষ্য সম্পর্কে আবু সাইদ জানান, নাসির গ্লাসের লক্ষ্য হচ্ছে, দেশের বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি বিদেশের বাজার সম্প্রসারণ করা। তিনি বলেন, রফতানি অব্যাহত রাখার জন্য বর্তমানের চেয়ে তিনগুণ বেশি উত্পাদন ক্ষমতার আরেকটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নাসির গ্লাসের রয়েছে।
নাসির গ্লাস ২০০৯ সালের এইচএসবিসির ঐতিহ্য ও উদীয়মান ক্যাটাগরিতে সেরা রফতানিকারকের পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়া ২০১০ সালে প্রাইম ব্যাংকের ‘দ্য বেস্ট কাস্টমার অ্যান্ড দ্য বেস্ট এন্টারপ্রেনিওরশিপ’ পুরস্কার লাভ করে।
শিল্প খাতে দেশের অহঙ্কার শাহ সিমেন্ট
‘জন্ম সৃষ্টির লক্ষ্যে’— ২০০২ সালে এই স্লোগান নিয়ে যাত্রা করে আবুল খায়ের গ্রুপের শাহ সিমেন্ট। শিল্প খাতে বাংলাদেশের অহঙ্কার করার মতো ব্র্যান্ড হচ্ছে শাহ সিমেন্ট। ব্র্যান্ডটি মানুষের এতটাই আস্থা অর্জন করেছে যে, মাত্র সাড়ে ৮ বছরে বাজার অংশীদারিত্বে তারাই সেরা। যদিও দেশের সিমেন্টের বাজারে বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বেশ কিছু ব্র্যান্ড প্রতিযোগিতা করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— জার্মানের হাইডেলবার্গ, সুইজারল্যান্ডের হোলসিম, ফ্রান্সের লাফার্জ, হংকংয়ের সানসাইন গ্রুপের সেভেন সার্কেল। এসব বিদেশী কোম্পানিকে পেছনে ফেলে কয়েক বছর ধরে বাজারের শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে শাহ সিমেন্ট। গুণগত মানের দিক থেকে সেরা বলে টানা ৭৬ মাস বুয়েট টেস্টে প্রথম অবস্থানে ছিল এই সিমেন্ট।
বাংলাদেশ সিমেন্ট উত্পাদনকারী সমিতির তথ্যমতে, বর্তমানে উত্পাদনের পরিমাণ এবং উত্পাদন ক্ষমতা উভয় দিক থেকে শাহ সিমেন্ট প্রথম অবস্থানে। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উত্পাদন ক্ষমতা ছিল ৭ হাজার ৫০০ টন। ২০১২ সালে উত্পাদন ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ৫০০ টন। এত অল্প সময়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে হটিয়ে বাজারের নেতৃত্ব নেয়া সহজ কাজ নয়। শাহ সিমেন্ট সেই অসাধ্য সাধন করেছে এক দশকেরও কম সময়ে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কৌশল অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের যৌথ উদ্যোগে ‘বিজনেস কেস স্টাডি বুক’-এ স্থান পাচ্ছে শাহ সিমেন্ট। বইটিতে বিশ্বের বিপণন গুরু বলে পরিচিত ফিলিপ কটলার শাহ সিমেন্টের ধারাবাহিক ব্যবসায়িক সাফল্য তুলে ধরতে এ উদ্যোগ নিয়েছেন। ফিলিপ কটলারের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সময় এ বিষয়ে শাহ সিমেন্টের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। এর আগে ‘শাহ সিমেন্ট’ দেশে উত্পাদিত সেরা সিমেন্ট হিসেবে ব্র্যান্ড ফোরাম পুরস্কারও পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে না চাওয়ায় এই ব্র্যান্ডের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
ক্রিস্টাল ক্লিয়ার
‘পিওর ট্রাস্টেড টেস্ট’, বোতলজাত পানি ‘মাম’র স্লোগান এটা।
আর বিজ্ঞাপনে স্লোগান হচ্ছে, ইটস কাম ন্যাচারালি। মাম ব্র্যান্ডটির সঙ্গে এ দুটি স্লোগানই মানানসই। বোতলজাত পানির কথা মনে হলে প্রথম যে নামটি মনে আসে তা হলো মাম, পানির প্রতিশব্দ। বোতলজাত পানির প্রচলন দেশে প্রথম শুরু হয় বহুজাতিক কোম্পানি ডানকানের হাতে। কিন্তু বোতলজাত পানির বাজার তৈরি করে মাম। ক্রেতাদের মতে, মাম ব্র্যান্ডটাই এমন যে, পানি কেনার ক্ষেত্রে সবার আগে এ নামটিই প্রথম মনে আসে। একভাবে বলাও যায়, এ দেশের মানুষকে বোতলজাত পানি খেতে শিখিয়েছে মাম। 
মাম নামটা কীভাবে হলো, সেটা অনেকেরই আগ্রহের বিষয়। এ বিষয়ে পারটেক্স স্টার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বণিক বার্তাকে বলেন, বাচ্চারা যখন প্রথম কথা বলে, তখন ‘মাম’, ‘মাম’ বলতে থাকে। আমার এক ভাইয়ের বাচ্চা পানি দেখলেই মাম মাম করে চিত্কার করত। মূলত ওইখান থেকেই মাম নামটা নেয়া। নামটা যখন চূড়ান্ত করা হয়, তখনই আমরা নিশ্চিত ছিলাম এটি একটি সফল ব্র্যান্ড হতে যাচ্ছে। বোতলের নকশাটা আমি করেছিলাম। পরে এটা জার্মানি থেকে করে আনা হয়।
 
বিক্রির দিক থেকে ফ্রেশ শীর্ষে থাকলেও বোতলজাত পানির বাজারে ব্র্যান্ড ভ্যালুর দিক থেকে এগিয়ে মাম। এমনকি গুণগত মানের দিক থেকেও তারা অনেক এগিয়ে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি। মাম সব সময় দাবি করে তাদের পানি ক্রিস্টাল ক্লিয়ার (স্ফটিক স্বচ্ছ)। বাজারে ১২ ব্র্যান্ডের পানি পাওয়া গেলেও একমাত্র তারাই ব্র্যান্ড মূল্যে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে।
আজিজ আল কায়সার বলেন, আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে পারটেক্স বেভারেজ (কোমল পানীয়) ব্যবসা শুরু করে। অর্থাত্ আরসি কোলা করছিলাম। তো এটা করতে গিয়ে দেখলাম এমনিতেই পানি পরিশোধন করতে হচ্ছে। তখন আমরা ভাবলাম আরসি কোলা একটি বিদেশী ব্র্যান্ড। কিন্তু এর জন্য পরিশোধিত পানি থেকে স্থানীয় একটা ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারি। তাছাড়া সে সময় আমরা বুঝতে পেরেছিলাম কয়েক বছরের মধ্যেই বোতলজাত পানির চাহিদা তৈরি হবে। এই ভাবনা থেকেই ‘মাম’ বাজারে আসে এবং স্থানীয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
 
আজিজ আল কায়সার জানান, তিনি এখন আর মাম দেখেন না, ফলে এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও কিছুই বলতে পারবেন না। এ বিষয়ে পারটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবেল আজিজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও, তাকে পাওয়া যায়নি। পানির বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বোতলজাত পানির বাজার প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মামের বাজার অংশীদারিত্ব ২৫ শতাংশেরও বেশি। পারটেক্স বেভারেজের ব্র্যান্ড ম্যানেজার নাহিদ ইউসুফ বণিক বার্তাকে বলেন, মামের পানি ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। তাই ৫০০ মিলি বোতলের দাম অন্য কোম্পানির চেয়ে দুই টাকা বেশি হওয়া সত্ত্বেও মানুষ মামের পানিই বেশি কিনে।
৫০০ মিলি ছাড়াও দেড় লিটার ও পাঁচ লিটারেরও বোতল রয়েছে। জানা গেছে, দেড় ও পাঁচ লিটারের বোতলের জোগান বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটির কারখানা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া চলতি বছর জাপানে পানি রফতানি করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে বসুন্ধরার ‘কাগুজে রুমাল’
দেশে একসময় শহর কিংবা গ্রাম সব জায়গার মানুষের কাছে গামছা ও রুমালের প্রচুর চাহিদা ছিল। কিন্তু কাগজের রুমাল বা টিস্যু এই চাহিদার অনেকটাই দখল করে নিয়েছে। শহর ছাড়িয়ে টিস্যু পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত গ্রামেও। কাগুজে এই রুমাল এখন সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। টিস্যু এখন সব শ্রেণীর মানুষের কাছে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যার মূল অবদান বসুন্ধরা টিস্যুর। তাই এ টিস্যুর মধ্যে সেরা ব্র্যান্ডটির নাম বসুন্ধরা।
অথচ বসুন্ধরা টিস্যুর যাত্রা ১৯৯৬ সালে। মূলত তখন থেকেই দেশে টিস্যুর ব্যবহার বাড়তে থাকে। যদিও বাংলাদেশে মানুষ টিস্যু ব্যবহার করতে শিখেছে বসুন্ধরার হাত ধরে, এমন একটি কথা চালু আছে। এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু দেশের মোট টিস্যু বাজারের ৮০ শতাংশের বেশি মালিকানা বসুন্ধরা টিস্যুর।
চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে টিস্যুর ধরনও। বর্তমানে বসুন্ধরা ফেসিয়াল টিস্যু, ওয়েট (ভেজা) টিস্যু, টয়লেট টিস্যু, কিচেন টাওয়েল, ক্লিনিক্যাল বেডশিট নানা রকমের টিস্যু বাজারজাত করেছে। এ ছাড়া বসুন্ধরা পরিবেশবান্ধব গ্রিনটিস্যু নামে এক ধরনের টিস্যুর প্রচলন করে।
যদিও এ দেশের মানুষ টিস্যু চিনেছে কল্লোল গ্রুপের মাধ্যমে। ১৯৮০ সালে তার প্রথম টিস্যু আমদানি করে। এই টিস্যুর নাম ফে। আন্তর্জাতিক এই ব্র্যান্ডটি শুরুর দিকে দামি হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যবহার হতো। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অভিজাত শ্রেণীকেও টিস্যু সরবরাহ করা শুরু করে। বসুন্ধরা বাজারে আসার আগে পর্যন্ত পুরো বাজারে ফে’র ছিল একচেটিয়া আধিপত্য। বসুন্ধরা বাজারে আসার পর দেশের মানুষ দেশীয় এই ব্র্যান্ডটি লুফে নেয়।
 
বছর দশেক আগেও টিস্যুর ব্যবহার শুধু অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আর এখন এর ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, বাংলাদেশের মানুষ বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার টিস্যু ব্যবহার করছে। টিস্যু বাজারের আকার প্রায় ১২০ কোটি টাকার। প্রতি বছর টিস্যু ব্যবহারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ। এ মুহূর্তে দেশে পাঁচটি কোম্পানি টিস্যু বাজারজাত করছে। কিন্তু চাহিদার দিক থেকে ও বিক্রির দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে বসুন্ধরা টিস্যু।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গুণগত মানের দিক থেকে বসুন্ধরার টিস্যুই সেরা। ফলে এর চাহিদাও সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে বসুন্ধরা টিস্যু ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ এবং তুরস্কে সামান্য পরিমাণে রফতানি হচ্ছে। ব্র্যান্ড হিসেবে বসুন্ধরা এতটাই এগিয়ে যে, প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বীকার করছে টিস্যুর সেরা ব্র্যান্ডটির নাম বসুন্ধরা।
যোগাযোগ করা হলে বসুন্ধরা গ্রুপের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার টিআইএম লতিফুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আমরা টিস্যু দিতে পেরেছি। প্যাকেট টিস্যু, পকেট টিস্যু, কিচেন, টয়লেটসহ নানা ধরনের টিস্যু আমরা বানাচ্ছি। অর্থাত্ মানুষ যা চাচ্ছে, আমরা তাই সরবরাহ করছি। ফলে ক্রেতারা বসুন্ধরাকে রিসিভ করছে। এখন আমরা রফতানির জন্য বাজার খুঁজছি। টিস্যু প্যাকেটে প্রতি ৩ মাস পরপর পরিবর্তন আনছি। মূলত টিস্যুর প্রতি বসুন্ধরার অঙ্গীকারই একে শীর্ষ ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
সাফল্যের শীর্ষ ছোঁয়া এপেক্স
শীর্ষে উঠে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঠিক দুই দশক আগে যাত্রা শুরু করে দেশের আরেক শীর্ষ ব্র্যান্ড এপেক্স। এপেক্স ইংরেজি শব্দ, যার অর্থ শীর্ষবিন্দু। কোম্পানির এই নামের দর্শন হচ্ছে, যে ব্যবসা-ই তারা করুন না কেন লক্ষ্য তাদের শীর্ষে পৌঁছানো।
নামের মতোই প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করেছে। দেশের জুতার বাজারে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে এপেক্স। ২০১০ সালে বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এপেক্সের আয় বেড়েছে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। ব্র্যান্ড হিসেবে এপেক্স এখন বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত নাম। অথচ কয়েক বছর আগেও জুতা-স্যান্ডেল মানেই ছিল বাটা। এমন একটি বহুজাতিক ব্র্যান্ডকে পেছনে ফেলে নেতৃত্ব নেয়া সহজ কোনো কাজ নয়। সেই অসাধ্যই সাধন করেছে এপেক্স। স্থানীয় বাজারে মোট বিক্রয় কেন্দ্রের দিক থেকে এখন পর্যন্ত বাটা এগিয়ে থাকলেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারে অনেক এগিয়ে এপেক্স। বিদেশেও এপেক্স এখন অন্যতম পরিচিত বাংলাদেশী ব্র্যান্ড। জুতা রফতানিতে প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের শীর্ষে।
 
এপেক্স এডেলকির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ব্র্যান্ড তৈরি না করে কোনো জিনিস বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেতার আস্থা অর্জনের কোনো উপায় নেই। কারণ একটা ভালো মানের পণ্যই বিক্রেতার দাম চাওয়ার অধিকার তৈরি করে। অর্থাত্ আপনি শুধু ভালো পণ্যই দিচ্ছেন না সেই সঙ্গে গ্রাহকের আস্থাকেও সম্মান করছেন। ক্রেতার-বিক্রেতার বিশ্বাসের এ জায়গা তৈরি হলেই কেবল বলা যায়, পণ্যটি একটি ভালো ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, এপেক্সের জন্ম ১৯৯০ সালে। তখন এর নাম ছিল এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড। তবে ২০০৬ সালে ইতালির অন্যতম বৃহত্ ফুটওয়্যার কোম্পানি লা নুওভা এডেলকি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হলে নাম হয় এপেক্স এডেলকি ফুটওয়্যার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত কয়েক হাজারেরও বেশি ডিজাইনের জুতা তৈরি করেছে।
 
গত বছর এপেক্স রফতানির জন্য দৈনিক ১৫ হাজার জোড়া ও স্থানীয় বাজারের জন্য দৈনিক ৫ হাজার জোড়া জুতা উত্পাদন করেছে। বর্তমানে তাদের আয়ের ৮০ শতাংশই আসে রফতানি থেকে। তবে অভ্যন্তরীণ বাজারে এখনো বাটাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। স্থানীয় বাজারের ৬ শতাংশ শেয়ার এপেক্সের।
ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে মোট জুতার দুই-তৃতীয়াংশই রফতানি করে এপেক্স। প্রতিষ্ঠানটির জুতা জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ছাড়াও জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়ে থাকে। শুরুর দিকে অভ্যন্তরীণ বাজারের দিকে নজর না দিলেও, বিগত কয়েক বছরে স্থানীয় বাজারে মনোনিবেশ করেছে এপেক্স। দেশে তাদের আউটলেট আছে ১৪৬টি, গ্যালারি এপেক্স নামেই যা পরিচিত। এর বাইরে ১৫৬ জন ডিলারের মাধ্যমে তারা জুতা বাজারজাত করে। প্রতি বছর ৩০টি করে আউটলেট বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে চামড়াজাত পণ্য উত্পাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটির।
এপেক্সের আজকের অবস্থান নিয়ে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, এটা একটি প্রক্রিয়া। বিশ্ববাজারে যদি তাকান তাহলে দেখবেন, হাজার হাজার কোম্পানি চেষ্টা করছে, কিন্তু শুধু নাইকি ব্র্যান্ড হিসেবে সফল হয়েছে। একদিনে এত বড় ব্র্যান্ড হয়ে ওঠেনি। এপেক্সও ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা অর্জন করছে। ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে মানসিকতা বদলাতে হবে। অল্প সময়ে অনেক টাকা হয়তো আয় করা যায়, কিন্তু ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় না। তিনি জানান, ব্র্যান্ড একদিনে গড়ে ওঠে না। এ দেশে ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনায় সমস্যা আছে। ব্র্যান্ড তৈরির মতো দক্ষ মানুষের অভাব রয়েছে। এপেক্স ও বাটার ২০১০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৬ সালে এপেক্সের জুতা বিক্রি থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল ২৯৪ কোটি টাকা। ২০১০ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯৬ কোটি টাকার বেশি। শুধু তাই নয়, এপেক্সের বার্ষিক আয়ও বাটার চেয়ে বেশি। ২০১০ সালে বাটার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল ৫৬৬ কোটি টাকা।
এদিকে ২০১১ সালের অর্ধবার্ষিক অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর প্রথম ছয় মাসে এপেক্সের লেনদেন হয়েছে ছিল ৩৯৬ কোটি টাকা। আর বাটার ২৭৬ কোটি টাকা।
 
এপেক্সের সাফল্য সম্পর্কে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘এটা সহজে আসেনি। শুরু থেকেই এপেক্সের অঙ্গীকার ছিল ক্রেতাদের মানসম্পন্ন পণ্য দিয়ে ধরে রাখতে হবে। এটা ক্রেতার অধিকার। ইদানীং এ বিষয়ে বেশ সচেতনতা বেড়েছে। ক্রেতা পছন্দ করার জন্য অনেক রকমের পণ্য চায়। ক্রেতার প্রতি অঙ্গীকার, বিশ্বমানের পণ্য এবং পছন্দ করার সুযোগ দিলে ক্রেতা আপনার সঙ্গে থাকবে। মূল কথা হচ্ছে, ক্রেতারাই শিখিয়েছেন বাজারে মনোপলির সুযোগ নেই। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আপনাকে ব্র্যান্ড মূল্য তৈরি করতে হবে।’
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকদের রুচিরও পরিবর্তন হয়েছে। টিভি, ইন্টারনেটের বদৌলতে ক্রেতারা এখন বিশ্ববাজার সম্পর্কে সচেতন। বনানী, বান্দরবান বা বগুড়া সব জায়গার ক্রেতাই সচেতন। বিভিন্ন মাধ্যমে বিশ্ব ফ্যাশনের হাল হকিকত তারা জানছেন, বুঝতে পারছেন। সুতরাং ক্রেতাকে ঠকানোর কোনো সুযোগ নেই। ব্র্যান্ড তৈরির মাধ্যমে ক্রেতার আস্থা অর্জন ছাড়া আর কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদের বাজারে টিকে থাকার পথ নেই।
 
এদিকে ২০১০ সালে এপেক্স সম্ভাবনাময় ক্যাটাগরিতে ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘এইচএসবিসি’ শ্রেষ্ঠ রফতানিকারক পুরস্কার লাভ করেছে। এপেক্সের আর্থিক বিবরণ বলছে, এই ব্র্যান্ডটি প্রতি দিন নিজেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বড় বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামবে।
রহিমআফরোজ: বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধি
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল করপোরেট ব্র্যান্ডগুলোর একটি রহিমআফরোজ। তাদের তৈরি আইপিএস প্রথম থেকেই দেশের বাজারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এর পরই আছে তাদের তৈরি ব্যাটারি লুকাস। চীনের মতো দেশে বাংলাদেশী ব্যাটারি রফতানি খুব কঠিন কাজ হলেও, সেই কাজটিই সাফল্যের সঙ্গে করে চলেছে রহিমআফরোজ। শুধু চীনই নয়, বিশ্বের বেশ কয়েকটি বাজারে প্রতিষ্ঠানের তৈরি ব্যাটারি অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে।
 
ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের এ সাফল্য প্রসঙ্গে রহিমআফরোজের পরিচালক নিয়াজ রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, রহিমআফরোজ তার নামের ওপর ক্রেতাদের বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছে। ব্র্যান্ড হিসেবে এর পণ্যের প্রতিও মানুষের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। বিদেশে রহিমআফরোজের জয়যাত্রা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই গর্বের।
তিনি বলেন, ‘দেশে আন্তর্জাতিক মানে পণ্য বা ব্র্যান্ড তৈরি হলে বিদেশী ব্র্যান্ডের পেছনে কেউ অহেতুক টাকা খরচ করে না। মানের কারণে সবাই দেশী ব্র্যান্ড কিনতে উত্সাহী হয়, ‘দেশের টাকা বিদেশে চলে যাওয়ার হার কমে আসে। আবার বিদেশে আমাদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা পেলে বৈদেশিক মুদ্রাও দেশে আসে। রহিমআফরোজকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করতে চাই।’
রহিমআফরোজের প্রতিষ্ঠাতা এসি আবদুর রহিম ১৯৪৮ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আসেন। সেখানে গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদারি দিয়ে পেশাগত জীবন শুরু করেন। এরপর ঢাকায় আসেন ১৯৫৮ সালে। প্রথম যখন ‘লুকাস’ ব্যাটারির ফ্যাক্টরি করার চেষ্টা চলছিল, তখন এতে সহায়তা করেন তিনি। ওই সময় দেশে এত আধুনিক ব্যাটারি ফ্যাক্টরি ছিল না। ব্রিটিশরা যখন লুকাস ব্যাটারি তৈরি করত, তখন তিনি এর পরিবেশক ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে ব্যবসার কোনো সম্ভাবনা না দেখে ব্যাটারি কারখানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশরা। এসি আবদুর রহিম তখন ‘লুকাস’ কিনে নেন।
 
রহিমআফরোজ সূত্রে জানা যায়, এ ব্র্যান্ডের নামকরণ নিয়ে আছে মজার ঘটনা। আফরোজ রহিম হলো এসি আবদুর রহিমের বড় সন্তান। রহিম যেহেতু পারিবারিক নাম, তাই এর সঙ্গে আফরোজ যোগ করে ‘রহিমআফরোজ’ নামে কোম্পানির নিবন্ধন নেয়া হয় ১৯৫৪ সালে। নিবন্ধনের সময় আফরোজের সঙ্গে আরেকটা ও (০) বসিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই থেকে এটা অঋজঙঙত হয়ে গেছে। আর কোম্পানির নাম হয়ে গেছে জঅঐওগঅঋজঙঙত। এটা হলো প্রোডাক্ট অব এ মিসটেক। কিন্তু এখন এটাই কোম্পানির নাম।
১৯৯৬ সালের দিকে নেপালে ব্যাটারি রফতানি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও সে সময় নেপাল ছিল ভারতের বাজার। নেপালের সঙ্গে সরাসরি কোনো সড়ক যোগাযোগ না থাকায় আকাশ পথে শুরু হয় এ রফতানি। এখানেও ভারতীয় ব্যাটারির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সফলতা পায় রহিমআফরোজ। এর পরপরই ভারতের বাজারে ব্যাটারি পাঠাতে শুরু করেন তারা। কিন্তু এন্টি ডাম্পিং মামলা করে রফতানি আটকে দেয় ভারত। শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়। মামলায় জয়ী হয় রহিমআফরোজ। এরপর দিল্লি, বিহার, মাদ্রাজসহ সারা ভারতে রফতানি হতে থাকে বাংলাদেশের ব্যাটারি।
 
লুকাসের মতোই আইপিএস হচ্ছে রহিমআফরোজের আরেকটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। আগে সারা বিশ্ব খুঁজলে আইপিএস পাওয়া যেত না। এটা তাত্ক্ষণিক বিদ্যুত্ ব্যবস্থা। রহিমআফরোজ কর্মকর্তারা জানান, রহিমআফরোজের ব্যাটারির কারণে ভারতসহ বিশ্বের ৫০টি দেশ বাংলাদেশকে চেনে। আজকে রহিম আফরোজের ব্যাটারি আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ লাতিন আমেরিকায় যাচ্ছে। এ ব্যাটারি দিয়ে বিশ্ব বাংলাদেশকে চিনছে। ক্রিকেটের জন্য যেমন বাংলাদেশকে চিনছে।
রহিমআফরোজ প্রধানত তিনটি বিস্তৃত ক্ষেত্রে ব্যবসা করে থাকে। ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে— গাড়ির যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও রিটেল চেইন। প্রতিষ্ঠানটি গাড়ির টায়ার, ব্যাটারি, লুব্রিকেন্ট, জরুরি পাওয়ার প্রোডাক্ট, ডিজেল ও গ্যাসচালিত জেনারেটর, আলোকসজ্জা পণ্য, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, সোলার সিস্টেম, প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে শক্তি সমস্যার সমাধান এবং বিদ্যুত্ পরিবাহী যন্ত্রাংশ উত্পাদন ও বাজারজাত করে থাকে।
 
রহিমআফরোজ বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারিজাতীয় পণ্য উত্পাদন ও বাজারজাত করে থাকে। এর মধ্যে আছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, মোটরসাইকেল, গৃহে ব্যবহারের উপযোগী ছোট ব্যাটারি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার্য ব্যাটারি, আইপিএস এবং ইউপিএস ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ। তাদের প্রস্তুতকৃত লুকাস ও স্পার্ক ব্যাটারি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে ভোল্টা, ওপটাস ও ডেল্টা ব্যাটারিও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
 
বাংলাদেশের প্রথম চেইন শপ ‘আগোরা’র মালিকানাও রহিমআফরোজের। ২০০১ সালে চালু হওয়ায় ‘আগোরা’র মাধ্যমে রহিমআফরোজ নাগরিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে।
রহিমআফরোজের নবায়নযোগ্য এনার্জি বিভাগ দেশের সৌরবিদ্যুেসবা প্রদান করে যাচ্ছে। রিনিউঅ্যাবল এনার্জি লিমিটেডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অনুন্নত গ্রামীণ এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম বিতরণ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ পর্যন্ত ৫২ হাজারেরও বেশি সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) সরবরাহ করেছে। ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে রহিমআফরোজ সারা দেশে সৌরবিদুত্ সুবিধা পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছে। যেখানে গ্রাহকরা মাসিক মাত্র ৭ ডলারের বিনিময়ে এ সুবিধা পাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি তাদের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রুরাল সার্ভিস ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় সৌরবিদ্যুত্ সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছে। সারা দেশে সৌরবিদ্যুত্ সুবিধা পৌঁছে দেয়ার প্রচেষ্টার জন্য প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালে ম্যাকগরো-হিল প্লাট গ্লোবাল এনার্জি পুরস্কার ও ২০০৬ সালে গ্লোবাল অ্যাসডিন পুরস্কার লাভ করে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি সিএনজির জন্য জ্বালানি সরবরাহ, কনর্ভাসন সেন্টার ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা প্রদান করে। পুরনো টায়ার নবায়ন করার পাশাপাশি শিরিষ কাপড় ও কাগজ উত্পাদন এবং বাজারজাতও করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। যৌথ প্রচেষ্টা হিসেবে গ্রুপটি মেট্রনেট বাংলাদেশ লিমিটেড (এমবিএল) নামে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা চালু করে। বর্তমানে এ গ্রুপের চেয়ারম্যান আফরোজ রহিম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ রহিম।
রহিমআফরোজ গ্রুপ গ্রিন এনার্জির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তারা দেশেই সোলার প্যানেল উত্পাদন শুরু করবে। অদূর ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও সোলার প্যানেল রফতানি করতে চান তারা। ২০১৫ সালের মধ্যে তাদের বার্ষিক টার্নওভার ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে রহিমআফরোজ।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: