শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই।

গণমুখী বঙ্গবন্ধু ও তার অর্থনৈতিক চিন্তাধারা

ড. আতিউর রহমান

ছোটবেলা থেকেই তিনি খুবই অধিকারসচেতন ছিলেন। স্কুলে পড়তে থাকা অবস্থায়ও তিনি অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই যে অধিকার আদায়ের যাত্রা শুরু করলেন আর পেছন ফিরে তাকাননি। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনকে মদদ দেয়ার জন্য জেলে যাওয়া, জেলে থেকেও ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা, চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টকে জয়যুক্ত করা, পাকিস্তান গণপরিষদের কৃষক-শ্রমিক-সংখ্যালঘুদের তথা বাঙালিদের পক্ষ নিয়ে বারবার সোচ্চার হওয়া এবং অবশেষে বাঙালির একচ্ছত্র নেতা হওয়ার প্রক্রিয়াটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনি মানবিক। যেমন প্রতিকূল, তেমনি আনন্দঘন। তেমনি সাফল্যের ও গৌরবেরও। একই সঙ্গে বীরত্বেরও। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তার সোচ্চার হওয়ার ধরন থেকেই বোঝা যায়, তিনি কতটা গণমুখী ছিলেন। 
১৯৫৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান গণপরিষদে করাচিকে ফেডারেল রাজধানী করা এবং গভর্নরের বেতন ৬ হাজার রুপিতে নির্ধারণ করায় তিনি গর্জে ওঠেন। প্রশ্ন তোলেন যেখানে একজন পিয়নের বেতন মাত্র ৫০ রুপি, সে দেশে কী করে গভর্নর এত বেতন দেয়া যায়। পূর্ববঙ্গের জনগণকে ধোঁকা না দেয়ার জন্য সেদিন তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। অনির্বাচিত গভর্নর-জেনারেলের হাতে অসীম ক্ষমতা প্রদানের তিনি বিরোধিতা করেন ১৯৫৫ সালের ১ অক্টোবর অধিবেশনে। সংসদের দৈনন্দিন কর্মসূচি বাংলায় ছাপানোর দাবি তোলেন ১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারির অধিবেশনে। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের দাবি করেন ওই বছরেরই ১৪ ফেব্রুয়ারির অধিবেশনে। এসব বক্তৃতায় তিনি বারবার সাম্যের কথা বলেন, গরিবদের ওপর জুলুম বন্ধ করতে বলেন এবং ইসলামের দোহাই দিয়ে শোষণ না করতে বলেন।
 
এরপরের ইতিহাস মোটামুটি সবারই জানা। আটান্ন সালে সামরিক শাসন জারির পরপরই শেখ মুজিবের ওপর নেমে আসে জেল-জুলুম। কিন্তু কোনো কিছুই তাকে তার গণমুখী কর্মপ্রক্রিয়া থামাতে পারেনি বরং বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তির প্রশ্নে তিনি আরও আপসহীন হতে থাকেন। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে লাহোরে তিনি বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফা ঘোষণা করেন। এরপর তিনি মুখোমুখি হন আরও হয়রানির। কিন্তু ‘কোনো হুমকিই বাংলার মানুষকে ৬ দফা দাবি থেকে নিবৃত করতে পারবে না’ বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের সমাপনী অনুষ্ঠানে।
 
আগরতলা মামলার সূত্র ধরে গণজাগরণের কথা আমরা সবাই জানি। এ গণজাগরণেই ভেসে যায় আইয়ুব খান, মোনেম খানরা। আর জনগণের মনে স্থায়ী আসন গেঁড়ে বসেন শেখ মুজিব। দ্রুতই হয়ে যান তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’। ‘৭০-এর নির্বাচনের প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। একদিকে যেমন তিনি বুঝতে পারলেন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বাঙালি কতটা অসহায় ও পাকিস্তান সরকার কতটা নির্বিকার, অন্যদিকে অনুভব করলেন, গরিব-দুঃখী মানুষগুলোর কী কষ্ট। তাই তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য চাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনার কিছু কিছু তিনি প্রকাশ করলেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে পাকিস্তান টেলিভিশনে দেয়া তার প্রাক-নির্বাচনী ভাষণে। সেদিনের ভাষণে তিনি এমন সব বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন, যেসবের সঙ্গে গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সরাসরি যোগ ছিল। তিনি শুরুতেই একচেটিয়াবাদ ও কার্টেলের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন। বললেন, ভূমি সংস্কার না করার ফলে অসহায় দরিদ্র কৃষকদের অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। ৯০ লাখ শ্রমজীবী মানুষ বেকার। পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ এক চিত্র। গ্রামাঞ্চলে প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থার খবর জানালেন। আর বললেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে তিনি কী কী করবেন। বৈষম্য দূর করবেন। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে তুলবেন। সমবায়কে সমর্থন দেবেন। কৃষিব্যবস্থার সংস্কার করবেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দেবেন। গ্রামে গ্রামে বিজলি বাতি দেবেন। শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করবেন। নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য বাসগৃহ নির্মাণ করবেন। প্রতি ইউনিয়নে পল্লী চিকিত্সা কেন্দ্র খুলবেন। অর্থনীতির সর্ব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সবকিছুর পুনর্বিন্যাস করবেন। নয়া মজুরি-কাঠামো তৈরি করবেন। জনগণের সরকার কায়েম করবেন।
 
মূলত সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা এমন স্পষ্ট করে বলার কারণেই নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জিতেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের নিপীড়নবাদী রাষ্ট্র তাকে ক্ষমতায় যেতে দেয়নি। নানা ষড়যন্ত্র শুরু হলো। জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকেও বন্ধ করা হলো। শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৭ মার্চে তার ভাষণের মাধ্যমে দিলেন মুক্তির ডাক। স্বাধীনতার ডাক। প্রস্তুতি নিল পুরো জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য। সুযোগ্য সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে ৩৫ দফা নির্দেশের মাধ্যমে বাংলাদেশের বেসামরিক নির্বাচিত সরকার পরিচালনার মহড়া দিলেন। প্রশাসন, পুলিশ, অর্থপ্রতিষ্ঠান সবাই তার ডাকে সাড়া দিল। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার সাধ পেলেন। কিন্তু তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাদের ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২৫ মার্চ রাতে শুরু করে নির্মম হামলা। এ পরিস্থিতিতে তিনি ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করলেন। পরপরই তিনি বন্দি হলেন। শুরু হলো তারই নির্দেশমতো মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালির শ্রেষ্ঠ সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত।
 
দেশ স্বাধীন হলো। ‘৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে এলেন। শুরু করলেন ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে’ যাত্রা। এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন— সোনার বাংলা গড়ার। অঙ্গীকার অনুযায়ী চমত্কার একটি সংবিধান দিলেন মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী আর্থসামাজিক মুক্তির অঙ্গীকার লেখা আছে ওই সংবিধানের পাতায় পাতায়। জাতিকে উপহার দিলেন প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যার মূল লক্ষ্য ছিল সম্পদের সামাজিকীকরণ। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত শ্রেষ্ঠ বাঙালি মেধার সম্মিলন ঘটালেন তিনি পরিকল্পনা কমিশনে। যাত্রাতেই বললেন, ‘আমাদের চাষীরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণী এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে’ (২৬ মার্চ, ১৯৭২-এর টিভি ভাষণ)। বললেন, ‘সম্পদের বণ্টন-ব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে।’ শুধু কথা নয়, কাজেও তিনি তার এ চিন্তার প্রতিফলন ঘটালেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, কৃষকদের কৃষি-উপকরণ সরবরাহের লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ, শিল্পের জাতীয়করণ প্রভৃতি অর্থনৈতিক নীতি সংস্কারের সূচনা করে তিনি সাধারণের প্রতি তার পক্ষপাতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন।
 
এসব নীতির সার্থক রূপায়ণ সম্ভব হয়েছে সে কথা আমি বলব না। তবে এ ধাঁচের নীতি গ্রহণের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা কিন্তু পরিষ্কার। এভাবেই তিনি নিজে স্বপ্ন দেখলেন ও জাতিকে দেখালেন। বললেন, ‘শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই। সে বাংলার আগামী দিনের মায়েরা হাসবে, শিশুরা খেলবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলব।’ এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি রাত-দিন পরিশ্রম করেছেন। বিধ্বস্ত এক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছেন। কপর্দকহীন রাজকোষ নিয়ে যাত্রা করেও তিনি হাল ছাড়েননি। নিরন্তর চেষ্টা করেছেন দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচনের। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির এ স্বপ্ন আজীবন তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ১৯৭২ সালের ৯ মে রাজশাহীতে এক বক্তৃতায় তার এ স্বপ্নের কথাই তুলে ধরেছিলেন: ‘আপনারা জানেন, জীবনে আমি কোনো দিন মিথ্যা ওয়াদা করি না।… আমি কী চাই? আমি চাই আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক।’
 
১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে তিনি সভাপতি হিসেবে তার শেষ ভাষণে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। সেদিন তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আজ বাংলার নিভৃত কোণে আমার এক কর্মী পড়ে আছে, যার জামা নেই, কাপড় নেই। তারা আমার কাছে আসে না। আপনাদের অনেকেই এখানে। কিন্তু আমি যদি চর কুকরিমুকরি যাই আমার ওই ধরনের কর্মীকে আমি দেখি। এদের সঙ্গে আমার রক্তের সম্বন্ধ। আজো আমি দেখি, তার পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি। আজও দেখি সেই ছেঁড়া পায়জামা, ছেঁড়া শার্ট, পায়ে জুতা নেই। বাংলাদেশে আমার এ ধরনের লাখ লাখ কর্মী পড়ে আছে।’ এরপর তিনি মোক্ষম কথাটি বললেন: ‘আমি যদি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারি, আমি যদি দেখি বাংলার মানুষ দুঃখী আর যদি দেখি বাংলার মানুষ পেট ভরে খায় নাই, তাহলে আমি শান্তিতে মরতে পারব না— পারব না— পারব না।’ কৃষক-শ্রমিকদের তিনি খুবই শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের ভাষণে বলেছিলেন: ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুররা করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ।’ বঙ্গবন্ধুর এমন অসংখ্য কথা আছে, যা থেকে প্রমাণ মেলে তিনি এ দেশের কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানুষকে, দেশকে কতটাই না ভালোবাসতেন। কাছ থেকে যারা তাকে দেখেছেন, তারা বলেন যে, ‘৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় তিনি জায়নামাজে বসে বসে কাঁদতেন। নিজে রুটি খেতেন। আর সেই মহত্প্রাণ মানুষটিকেই ঘাতকরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পনেরোই আগস্ট শেষ রাতে। একজন মানুষকে নয়, একটি ধারাকে তারা শেষ করতে চেয়েছিল। একটি আদর্শের ধারাকে। খানিকটা হলেও দুর্বৃত্তদের সেই আশা পূরণও হয়েছিল।
 
দীর্ঘদিন পর তার অনুসারীদের জনগণ ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। সুযোগ এসেছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতার ভেতরে সীমাবদ্ধ না রেখে তার আদর্শকে সমুন্নত রাখার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করার ও নীতি সংস্কার করে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু সেই সুযোগের পুরোপুরি ব্যবহার তারা করতে পেরেছেন— এমন কথা বলা যাবে না। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এবং ‘অগ্নিকন্যা’ মতিয়া চৌধুরী বাংলাদেশের কৃষক ও হতদরিদ্রদের উন্নয়নে কম চেষ্টা করেননি। ‘৯৮-এর বন্যার পর কৃষক বাঁচাতে তারা যে নিজেদের মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন, সে কথা আমরা সবাই জানি। তাদের এ প্রচেষ্টার কারণেই বন্যা সত্ত্বেও কোনো মানুষ না খেয়ে তখন মারা যায়নি। তাদের শাসনামলে কৃষির প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল গড়ে পাঁচ শতাংশেরও বেশি। এর সুপ্রভাব খাদ্যমূল্যের ওপর পড়েছিল। তাই মূল্যস্ফীতি নিম্ন পর্যায়ে স্থিতিশীল ছিল। এতকিছুর পরও দেশে দারিদ্র্যের মাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়েই রয়ে গেছে।
 
পরবর্তী সময়ে যে সরকার আসে, তারা কৃষকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ কমিয়ে ফেলে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ কৃষক সমাজ কী সঙ্কটেই না পড়েছে। এ দুঃখজনক বাস্তবতা সত্ত্বেও আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ তৈরির প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়াতে পারি না। তাই দারিদ্র্যকে উন্নয়নের পয়লা নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে স্বদেশী চিন্তা ও চেতনায় বলীয়ান হয়ে, সম্মিলিত সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দল-মত নির্বিশেষে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে সম্ভাবনাময় এক বাংলাদেশ তৈরির লক্ষ্যে। একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান অথবা স্থাপনার মধ্যে আমরা তাই বঙ্গবন্ধুকে সীমিত করার পক্ষে নই।
 
২০১২ সালে তার জন্ম শতবার্ষিকী আমরা পালন করতে চাই উন্নত ও সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশে। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে থাকবে না দারিদ্র্য, বঞ্চনা, নারী নির্যাতন, সহিংসতা, রাজনৈতিক হানাহানি। নবসহস্রাব্দের শুরুতেই আমরা উজ্জ্বল এক বাংলাদেশের অধিবাসী হতে চাই। পুরো জাতিকেই একসঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে আমাদের। বিচ্ছিন্নভাবে এগোনোর চেষ্টা না করাই ভালো। বঙ্গবন্ধুর মনোবল, বাংলাদেশের জন্য তার ভালোবাসা, সাধারণ মানুষের জন্য তার কল্যাণচিন্তাই হবে আগামী দিনের এ অগ্রযাত্রার অন্যতম পাথেয়। সেজন্য তার চিন্তার আলোকে আমাদের ধ্যান করতে হবে, বিচার করতে হবে। পরীক্ষা করতে হবে। চিদ্বৃত্তিকে সচেষ্ট করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই আরও বড় করতে হবে একুশ শতকের বাংলাদেশকে। শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রসারে আরও বেশি তত্পর হতে হবে আমাদের। বঙ্গবন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে সংসদে) তার কর্মীদের: ‘দুঃখের বিষয় আজ শুধু আমরা বলি, আমরা কী পেলাম। তোমরা কী পেয়েছো? তোমরা পেয়েছো শিক্ষার আলো, যে শিক্ষা পেয়েছো বাংলার জনগণের টাকায়। তুমি কী ফেরত দিয়েছো বাংলার দুঃখী মানুষকে, যে দুঃখী না খেয়ে মরে যায়? যে মানুষের কাপড় নাই, যে মানুষ বন্ধু খুঁজে পায় না, যার বস্ত্র নাই, শার্ট নাই, বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত দেখা যায়, তাকে আজকে তোমরা কী দিয়েছো? এ প্রশ্ন আজ এখন জেগে গেছে।’
বঙ্গবন্ধুর এ প্রশ্ন আজো বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একুশ শতকের বাংলাদেশকে এসব মৌল প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হবে। আমাদের পরিকল্পনা, জননীতিতে ও গণমাধ্যমে এসব প্রশ্নের প্রতিফলন পড়তে হবে। হালে অভিজন ও অভাজনদের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি যেভাবে দুই দিকে এগিয়ে চলেছে, তাতে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। স্বাধীনতার মর্মকথার সঙ্গে এ বৈষম্যপ্রবণতার কোনো মিল নেই। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও উচ্চারণের সঙ্গেও তা মেলে না।
 
গণতন্ত্রবিহীন বিষণ্ন এক সময় বাংলাদেশকে আবার জাঁপটে ধরেছিল। সাধারণ মানুষের খাদ্যাভাব ও নিরাপত্তাহীনতাসহ সার্বিক অর্থনৈতিক দুর্গতি বেড়েই চলেছিল। এমন দুঃসময়ে তার অর্থনৈতিক মুক্তির কথা আরও গভীরভাবে মনে পড়ছিল। আমাদের আগামী দিনের চলার পথে তার কল্যাণধর্মী আর্থসামাজিক চিন্তা-চেতনাকে পাথেয় করার কথাই বেশি করে ভাবছিলাম। এরপর দিনবদলের এক নয়া পালা শুরু হয়েছে। পরিবর্তিত এই সময়েও তার হূদয় নিংড়ানো দেশপ্রেমের কথা বারবার স্মরণে আনতে হবে। অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে তার চিন্তাকে সর্বজনের সাথী করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে তার এসব কালজয়ী জনকল্যাণমুখী ভাবনার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে। সর্বশেষ নির্বাচনের সময় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের যে অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রমাণ মিলেছে, তাতেই আশাবাদী হতে ইচ্ছা করে।
 
মুক্তিযুদ্ধের মৌল আকাঙ্ক্ষা পূরণের সংগ্রামে যে তাদের সঙ্গে পাওয়া যাবে, সে ইঙ্গিত তারা খুবই স্পষ্টভাবে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের আলোকে নতুন করে বাংলাদেশ গড়তে পারলে নিশ্চয় তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাও অনেকাংশেই পূরণ করা সম্ভব হবে।
 
লেখক: গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই।

  1. Hrithkomol says:

    আহা! প্রাণ ফেটে যায়। ‘ড’-বিসর্গ আতিউর রহমান সাহেবের মর্মস্পর্শি ‘ছোটদের শেখ মুজিব’ রচনার বয়ানে। নেতা জায়নামাজে বসে কাঁদতেন! আতিউর রহমান সাহেব না দেখলে লিখবেন কেন! নেতা রুটি খেতেন, বিদেশি দামি তামাক্কু-পাইপ ছেড়ে দিয়ে পাতার আবার দেশি পাতার-বিড়ি ধরেছিলেন, মার্সিডিজ চড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন, লাগাতার জনপ্রিয়তা পতনের মুখে নেতা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে কোন অগণতান্ত্রিক নির্মমতার আশ্রয় নেননি, রক্ষিবাহিনী কোন খুন-গুমের ঘটনা ঘটায়নি কিংবা তিনি বহুদলীয় ব্যবস্থার কবর দিয়ে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন জারিও করেননি; এটা তার মর মহানপ্রাণ মানূষ করতেই পারে না। সব গুজব! ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে প্রায় দেড় মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল (যে শোকে নেতা কাঁদতেন ও রুটি খেতেন), সেই দুর্ভিক্ষের মধেই নেতা রাষ্ট্রের অর্থে নিজের জন্য বুলেটপ্রুফ নয়া গাড়ি অর্ডার করেছিলেন – এটা কি সত্য হতে পারে? বিশেষ করে নেতা যখন প্রায়ই বলতেন ‘আমি মৃত্যুকে পরোয়া করি না!
    বাই দ্য ওয়ে, ১৯৭১ সনে ৩ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কথা হরে দরে প্রচারিত হয়, কিন্তু ১৯৭৪-এ দেড় মিলয়নের মরার কথা কবার শোনা যায়? ব্রাভো আতিউর রহমান, ক্ষমতার চেয়ে সেক্সি কিছু যে জগতে নেই তা বুঝতে কি মিশেল ফকোর দরকার পড়ে? আতিউরের মত রহমানরেই যথেষ্ঠ। অতএব, আতিউর তুমি তোমার প্রভুর কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: