প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর্থিকভাবে..

বাতিল হচ্ছে এমএলএম ব্যবসার পিরামিড স্কিম

মহিউদ্দিন নিলয়
বাতিল হচ্ছে এমএলএম ব্যবসার পিরামিড স্কিম। এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রণালয় মনে করে, এতে দেশে এমএলএম ব্যবসার নামে প্রতারণা কমবে।
জানা গেছে, এরই মধ্যে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে শতাধিক এমএলএম কোম্পানির পিরামিড স্কিমে বিনিয়োগকারী ১ কোটিরও বেশি মানুষ পড়েছে প্রতারণার ফাঁদে।
পিরামিড স্কিম প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খসড়া নীতিমালা নিয়ে আমরা এরই মধ্যে আলোচনা করেছি। সবাই সেখানে পিরামিড স্কিম নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পিরামিড স্কিম বাতিল করেই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।’
এদিকে পিরামিড স্কিমের ফাঁদ পেতে এক বছরে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে এমএলএম কোম্পানিগুলো। তাদের দেখানো স্বপ্নে বিভোর হয়ে চাকরির বিকল্প পেশা হিসেবে প্রতি মাসে লাখ টাকা আয় করতে এমএলএম কোম্পানির পিরামিড স্কিমে বিনিয়োগ করেছেন অনেকেই। কয়েকটি এমএলএম কোম্পানির কার্যক্রম সরেজমিনে দেখে ও অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব তথ্য।
ইউনিপেটুইউ বাংলাদেশ লিমিটেড, স্পিক এশিয়া, টিভিআই এক্সপ্রেস, ম্যাকনম ইন্টারন্যাশনাল, এমওয়ে ইন্টারন্যাশনাল, বনভয়েজ ১০০০, প্যানাসিয়া গ্লোবাল নেটওয়ার্ক, ই-লিংকস গ্লোবাল, ওশান মার্কেটিংসহ সব এমএলএম কোম্পানিই পিরামিড স্কিম পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএলএম ব্যবসায় জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেব ‘পিরামিড স্কিম’ ব্যবহূত হয়ে আসছে। এতে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর্থিকভাবে। কারণ এ ব্যবসার ওপরের দিকে যিনি থাকেন অর্থাৎ যাকে দিয়ে ব্যবসার শুরু, তার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এমএলএম কোম্পানিগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন কাউকে তাদের ‘বিজনেস প্ল্যান’ দেখানোর সময় এমনটাই দাবি করেন তারা। আর বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার ইতিহাস থেকে এর সত্যতা মেলে পুরোপুরি। গ্লোবাল গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক (জিজিএন) দিয়ে শুরু হয়ে এ পর্যন্ত যত কোম্পানি এমএলএম ব্যবসা করেছে, তার সবগুলোতেই সফলতা পেয়েছেন শুরুর দিককার ব্যক্তিরা। আরও পরিষ্কার করে বললে যারা উদ্যোক্তা, তারাই লাভবান হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। প্রতিনিয়ত তাই কোটি মানুষের কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন পুঁজি করে কোটিপতি হচ্ছেন এমএলএম উদ্যোক্তারা।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, এমএলএম ব্যবসার পিরামিড স্কিম নিয়ে সারা বিশ্বেই অনেক অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দেশ এ স্কিমকে নিষিদ্ধও করেছে। বাংলাদেশেও এ সম্পর্কিত অভিযোগ বাড়ছে। সরকারের উচিত দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করে এ সম্পর্কে নজরদারি বাড়ানো।
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ব্রাজিল, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইরান, ইতালি, জাপান, নেপাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পিরামিড স্কিম নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার শুরু থেকেই চলে আসছে এটি। এমএলএম ব্যবসা সম্পর্কিত খসড়া নীতিমালায়ও এ সুযোগ রাখা হয়েছিল। জয়েন্ট স্টক রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফার্মসে রেজিস্ট্রেশন করে দেশে ব্যবসা করছে ৬২টি প্রতিষ্ঠান। এর বাইরেও অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমতি ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
জয়েন্ট স্টক রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফার্মসের রেজিস্ট্রার আহমেদুর রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি প্রতিষ্ঠান জন্মের অনুমোদন দেয়, কিন্তু পরিচালনার দায়দায়িত্ব বহন করে না। কোম্পানিগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের তদারকিতে পরিচালিত হয়। এখন এমএলএম কোম্পানির অনুমোদন বন্ধ রয়েছে, নীতিমালা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর এ বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
পিরামিড স্কিম নিয়ে বলা হয়, পৃথিবীর ৫০০ কোটি মানুষের সবাই যদি এমএলএম ব্যবসায় যুক্ত হয়, তাহলে ৪৫০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর ৫০ কোটি মানুষ এর সুবিধা ভোগ করবে। কারণ ধীরে ধীরে নিচের দিকের মানুষগুলোর লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ঢাকায় ১৫ জন লোক রয়েছেন এবং এরা সবাই এমএলএমের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমে একজন শুরু করে দুজনকে তার ডাউন লাইনে যুক্ত করবেন, দুজন আবার তার ডাউন লাইনে চারজনকে এবং সেই চারজন আটজনকে যুক্ত করবেন। তাহলে শেষের আটজন আর কাউকে যুক্ত করতে পারবেন না এবং কোনো কমিশনও পাবেন না। এ ক্ষেত্রে শতভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ৫৩ শতাংশ বিনিয়োগকারী। আবার শেষের আটজন যদি তাদের ডাউন লাইনে একজন করে যুক্ত করতে পারেন, তাহলেও তারা কিছুই পাবেন না। কারণ ডাউন লাইনের বাম ও ডান পাশে সবসময় ব্যালেন্স তৈরি করতে হবে। এভাবে ব্যালেন্সের অভাবে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
বাম ও ডান পাশ ব্যালেন্সের পদ্ধতিকে বলা হয় বাইনারি প্ল্যান। এর বাইরে ইউনিলেভেল প্ল্যান ও ম্যাট্রিক্স প্ল্যান থাকলেও বাংলাদেশের এমএলএম কোম্পানিগুলো বাইনারি পদ্ধতিতেই ব্যবসা পরিচালনা করছে। এটি এখানে জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমএলএম ব্যবসা বৈধতা পেলেও এর পিরামিড স্কিম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এমনকি গবেষকরা দাবি করেছেন, বৈধ এমএলএম ব্যবসায় কোথাও পিরামিড স্কিম ব্যবহার করা হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বণিক বার্তাকে বলেন, এমএলএম ব্যবসাকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই। তবে এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর প্রসারের ফলে মানুষের আয়ের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। আর যারা এখানে বিনিয়োগ করেন, তাদের কোনো নিশ্চয়তাও থাকে না। কম বিনিয়োগ করে বেশি আয়ের যে সুযোগ দেখানো হয়, এটিকে জুয়া বলা যায়। তাই যেকোনো এমএলএম ব্যবসাকেই সন্দেহের চোখে দেখা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশনের এ ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিরাট ঝুঁকি রয়েছে এ ধরনের ব্যবসায়। শেয়ারবাজারের মতো বড় ধরনের আর্থিক ধসের আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, যৌন ও রোগমুক্তির নামে এমএলএমের অধিকাংশ পণ্যই এরা বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে নিজস্ব ডিলারদের মাধ্যমে। এসব পণ্যের প্রচারপত্রে দেখা যায়, বিজ্ঞানসম্মত, চিকিত্সাশাস্ত্রে প্রমাণিত, বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক কর্তৃক মূল্যায়িত— এ ধরনের বক্তব্য জুড়ে দেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের সেই মুশকিল আসান, তন্ত্রমন্ত্র, কামরূপ কামাখ্যা, জাদুটোনা ও অলৌকিকতাই নতুন মোড়কে হাজির করা হচ্ছে।
এমএলএম কোম্পানিগুলো দাবি করছে, একটি পণ্য উত্পাদনের পর বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছে। ফলে তুলনামূলক বেশি দাম দিয়ে পণ্যটি ক্রেতাকে কিনতে হয়। কিন্তু এমএলএম ব্যবসার মূল লক্ষ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে ক্রেতার কাছে সরাসরি পণ্য পৌঁছে দেয়া। এতে উত্পাদনে যে খরচ পড়ে, ক্রেতা তার কাছাকাছি দামে পণ্যটি কিনতে পারেন। এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রচারণা সত্যি হলে তাদের পণ্যগুলো হওয়া উচিত নিত্যপ্রয়োজনীয়। কিন্তু এরা বাজারে আনছে এমন সব পণ্য, যার অধিকাংশই মানুষের তেমন কাজে লাগে না।

[ from: Bonik Barta ]

Visit us on FaceBook

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: