বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নজর শেয়ারবাজারে

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নজর শেয়ারবাজারে
এম সাইফুল

 
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নজর পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারে। সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেস (এসএএফই), গোল্ডম্যান স্যাক্স, অরিওস ফাউন্ডেশন মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে কিছু বিনিয়োগ এসেছে বলে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া শেয়ারবাজারের তথ্য প্রকাশ করে এমন প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ, ডাউ জোনস, স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’স (এসঅ্যান্ডপি) বাংলাদেশে কাজের বিষয়ে উত্সাহ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ২০১০ সালে বেশকিছু মাইলফলক অতিক্রম করে। এক বছরে শেয়ারবাজারে নানা অর্জন দেখে এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নজর পড়েছে। ২০১০ সালে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১৯ লাখ থেকে বেড়ে ৩২ লাখে পৌঁছে। এ ছাড়া দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মাত্র পাঁচ মাসে বাজার মূলধন বেড়েছিল ১০০ শতাংশ। সূচকও বেড়েছিল প্রায় শতভাগ। ২০১০ সালে বিশ্বে যে কটি স্টক এক্সচেঞ্জে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার মধ্যে ডিএসই একটি।
জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকার শেয়ারবাজারে এ ফান্ড বিনিয়োগ করা হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকায় ২০ কোটি ডলার (১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করবে অরিওস ক্যাপিটাল লিমিটেড।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়া ফান্ড গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরা। তবে এ মুহূর্তে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে এইমস অব বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রস্তাবিত বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইয়াওয়ার সায়ীদ বলেন, ফান্ডটি গঠনের উদ্যোগ ভালো। তবে এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে যেভাবে ধস নামছে, তাতে সেপ্টেম্বরের আগে এ মিউচুয়াল ফান্ড গঠন সম্ভব হবে না। এটি গঠন করতে এ বছরও লেগে যেতে পারে।
ইয়াওয়ার সায়ীদ আরও বলেন, বিশ্বজুড়েই শেয়ারবাজারে মন্দা। আমাদের দেশ যদিও অন্যান্য দেশ যেমন আমেরিকা, ইউরোপের সঙ্গে সেভাবে জড়িত নয়, তার পরও বিশ্ব অর্থনীতির বাইরে আমরা নই। ফলে কিছুটা প্রভাব আমাদের বাজারে পড়বেই। তাই ফান্ডটির জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
 
অরিওস ক্যাপিটাল বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে বিনিয়োগকারী একটি প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম। ২০০১ সালে কমওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (সিডিসি) গ্রুপ ও নন-ফান্ডের যৌথ উদ্যোগে এ প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়। অরিওস ইন্ডিয়া ফান্ড ২-এর ১৫ শতাংশ শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা হবে।
অরিওস বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ৫০টি উদীয়মান অর্থনীতিতে ১৩০ কোটি ডলারের মতো বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে আফ্রিকায় প্রায় অর্ধেক, এশিয়ায় ৩৫ শতাংশ, বাকিটুকু লাতিন আমেরিকায় রয়েছে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সভাপতি ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ দক্ষিণ এশিয়া ফান্ড সম্পর্কে বণিক বার্তাকে বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এ ধরনের আরও ফান্ড আসা উচিত। তবে আমাদের দেশে বিদেশী বিনিয়োগের ওপর কিছু সমস্যা রয়েছে। যেমন এখান থেকে কেউ টাকাকে ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন না। এ ধরনের ফান্ড হলেও এ দেশের কেউ অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। কিন্তু বিদেশীরা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ফান্ড গঠিত হলে এ দেশের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগও বাড়বে। এ জন্য বাংলাদেশ থেকে অরিওসের সঙ্গে কিছু সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান যোগাযোগও করেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেয় এসএএফই। ‘সার্ক মিউচুয়াল ফান্ড’ নামে চলতি বছরই এর চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। সম্প্রতি নেপালে অনুষ্ঠিত সার্কভুক্ত দেশের স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সংগঠনের নির্বাহীদের সভায় নীতিগতভাবে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ৭ জুলাই নেপালের কাঠমান্ডুতে এসএএফইর নির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ বছরের আগস্টে দুবাইয়ে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে এটি চূড়ান্ত হবে বলে নিশ্চিত করেছেন এসএএফইর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও সিএসই সভাপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ।
জানা গেছে, দুবাইয়ে অনুষ্ঠেয় নির্বাহী কমিটির সভায় ফান্ডের আকার নির্ধারণ করা হবে। এ মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্টি ও কাস্টোডিয়ান সব দেশ থেকেই যৌথভাবে হবে। এ ছাড়া সার্ক মিউচুয়াল ফান্ড থেকে এসব দেশের শেয়ারবাজারে তারল্য সরবরাহ করা হবে। যদি এ ধরনের একটি ফান্ড থাকত, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ধসের পর এত তারল্য সংকট হতো না। এসব বিষয় চিন্তা করেই এ ফান্ডের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে এসএএফই জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জানান।
সার্ক মিউচুয়াল ফান্ড প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে অ্যালায়েন্স ক্যাপিটাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়ালি-উল-মারূফ মতিন বলেন, এ ধরনের ফান্ড গঠিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের শেয়ারবাজারের সম্পৃক্ততা বাড়বে। আমরা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো একে স্বাগত জানাই। নতুন নতুন ফান্ড এলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়বে।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিকভাবে শেয়ারবাজারের গবেষণা ও তথ্য প্রচার করছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্লুমবার্গ সর্বপ্রথম বাংলাদেশে আসে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে এর মাধ্যমে শেয়ারবাজার সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে। ব্লুমবার্গের মাধ্যমে ১৫০টি দেশের আড়াই লাখ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও দেড় লাখ সম্পদ ব্যবস্থাপকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয় দেশের শেয়ারবাজার। প্রতি মুহূর্তে বিশ্বের যেকোনো দেশের শেয়ারবাজার, অর্থনীতিসহ নানা তথ্য এখন ব্লুমবার্গের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।
এরপর আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডাও জোনস বাংলাদেশে আসে। প্রতিষ্ঠানটি শিগগিরই বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের জন্য আলাদা সূচক তৈরি করবে। ‘বাংলাদেশ ইনডেক্স’ নামে এ সূচক আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শিত হবে ডাও জোনস ওয়েবসাইটে।
এ বছরের প্রথম দিকে ডাও জোনসের পরিচালক আরিফ সুলতান বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) তত্কালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খন্দকারের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তিনি ওই বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সূচক নিয়ে যৌথভাবে এ সূচক তৈরি করা হবে।
এ প্রতিষ্ঠানটি সারা বিশ্বের উল্লেখযোগ্য শেয়ারবাজারের সূচক তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তাদের সূচকের গ্রহণযোগ্যতাও ভালো। ডাও জোনস সিঙ্গাপুর থেকেই তাদের বাংলাদেশ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
সর্বশেষ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আরেক প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সূচক নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশে এসে তারা এ আগ্রহের কথা জানান। গত ২২ জুলাই এসইসির নতুন চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন নিউইয়র্ক থেকে আসা এসঅ্যান্ডপির ব্যবস্থাপক রবার্ট সটেটকো ও মুম্বাই থেকে আসা কোয়েল ঘোষ।
দেশের শেয়ারবাজারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রসঙ্গে ডিএসই সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক বিনিয়োগকারী এখানে আসতে চাইছেন। এটি শেয়ারবাজারের জন্য সুখবর। আমাদের দেশে বিদেশ থেকে এসে অনেকেই বিনিয়োগ করতে চান। কেউ কেউ করছেনও। আমরা শিগগিরই ডিএসইতে অনলাইন লেনদেন চালু করছি। এতে দেশের বাইরে থেকেও শেয়ারবাজারে লেনদেন করা যাবে। দেশের বাইরে থেকে কেউ বিনিয়োগ করতে চাইলে তারা ওই সব খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের দেয়া তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, গত বছর দেশের শেয়ারবাজারে বেশ কিছু মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অনেক বিনিয়োগকারী দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। গত বছর শেয়ারবাজারে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা ধরে রাখা যায়নি। বছরের শেষ দিকে ভয়াবহ একটি ধস নেমেছিল। ফলে গত বছরের সব অর্জন ম্লান হয়ে গেছে।
আবু আহমেদ আরও বলেন, নতুন শেয়ার সরবরাহ করতে পারলে গত বছরের ভয়াবহ ওই ধস ঠেকানো যেত। শেয়ার সংকটের মধ্যেই এখানে প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে। এতে বাজার অতিমূল্যায়িত হয়েছিল। সরকার, এসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট সবাই যদি শেয়ার সরবরাহের দিকে নজর দিত, তাহলে বাজারের ওই প্রবৃদ্ধি বজায় থাকত।
এ ব্যাপারে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাংলাদেশে আসে, তাহলে সবাই উপকৃত হবেন। দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়লে দেশেরও ভালো।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: