একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধে প্রতিযোগিতা আইন হচ্ছে

একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধে প্রতিযোগিতা আইন হচ্ছে

সাকিব তনু 

বাজারে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য বন্ধ করতে সরকার ‘কমপিটিশন ল’ বা প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বাজারে সুষম প্রতিযোগিতা বজায় রাখার স্বার্থেই আইনটি করা হচ্ছে। আইনটি কার্যকর হলে বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠানের একক কর্তৃত্ব থাকবে না এবং সিন্ডিকেট চর্চা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রণীত এ আইনের খসড়া এরই মধ্যে মন্ত্রিসভা কমিটিতে নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। পরে সেটি ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনসহকারে ফেরত আসার পর তা সংসদে উত্থাপন করা হবে। আর সংসদে পাস হলেই আইনটি কার্যকর হবে। আইনটি পাস হলে সরকার একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করবে, যে কমিশন বাজার ম্যানিপুলেশন প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাজারকে প্রভাবিত করতে পারবে না।
 
প্রস্তাবিত এ আইন বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ক্যাবিনেট থেকে আইনটির জন্য নীতিগত অনুমোদন পেয়েছি। এটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে আছে। ভেটিং শেষে আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই আইনটি সংসদে উঠবে। বাজারে যেন সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে এ জন্যই আইনটি করা হচ্ছে। কেউ যেন বাজারে অশুভ প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে ক্ষেত্রে আইনটি ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
 
অবশ্য ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ মনে করেন, দেশে এমন আইনের প্রয়োজন নেই। এদেরই একজন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, এমনিতেই ব্যবসায়ীরা সুলভ মূল্যে পণ্য বিক্রয় করছেন। ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক ধর্ম কম দামে পণ্য বিক্রি করে মুনাফা নিশ্চিত করা। সরকার উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে পারে। এ জন্য আইন করার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, আমরা যেসব খাতে ব্যবসা করি, সেখানে একচেটিয়া মুনাফা করার কোনো সুযোগ নেই; বিদ্যুত্, গ্যাস এসব খাতে এ সুযোগ আছে।
 
সম্প্রতি বাজারে চিনি ও ভোজ্যতেল নিয়ে যে কারসাজির ঘটনা ঘটে, এ ধরনের একটি আইন কার্যকর থাকলে তা ঘটত না বলে মনে করেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া প্রতিযোগিতা আইন থাকলে কোনো চক্র হঠাৎ করে কোনো পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতেও পারবে না।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে, এমন অনুশীলন বা চর্চা নির্মূল করাই হবে এ আইনের অধীনে গঠিত কমিশনের দায়িত্ব। এ ছাড়া প্রতিযোগিতা উত্সাহিত করা, প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে কমিশন।
 
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সিনিয়র গবেষক ফেলো খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, দেশে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও সুষম প্রতিযোগিতার জন্য একটি বিধানের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা অনেক সময় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। কিন্তু সেসব অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য একটি নিয়মের প্রয়োজন পড়ে। প্রতিযোগিতা আইন পাস হলে সেসব অভিযোগ যাচাই করা সহজ হবে। দেশের বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও সঠিক মূল্য নির্ধারণের জন্য এ আইনটি খুবই জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
 
প্রস্তাবিত আইনের অধীনে গঠিত কমিশন ‘কার্টেলের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। আইনে বলা হয়েছে, ‘কার্টেল’ মানে হলো ‘কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিগোষ্ঠীর প্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন চুক্তির মাধ্যমে কোনো পণ্য বা সেবার বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য পণ্যের উত্পাদন, পরিবেশন, বিক্রি, মূল্য বা লেনদেন অথবা কোনো প্রকার সেবা সীমিতকরণসহ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা বা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গ্রহণ করা।’ এ জাতীয় উদ্যোগ বা কার্টেলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে কমিশন। পাশাপাশি বাজারে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না। আইনে বলা হয়েছে, কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার ওই অবস্থানের অপব্যবহার করতে পারবে না।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, কমিশন কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে স্বপ্রণোদিতভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা বিরুদ্ধ চুক্তি, কর্তৃত্বময় অবস্থান এবং এ জাতীয় চর্চার তদন্ত করবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জোটবদ্ধতা, জোটবদ্ধতার কারণ ও শর্ত তদন্ত করবে কমিশন এবং এটা অনুমোদন বা নামঞ্জুর সংক্রান্ত বিষয়গুলোও নির্ধারণ করবে তারা।
 
কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কৌশল বা চর্চা যদি কমিশনের কাছে প্রতিযোগিতা বিরুদ্ধ বলে মনে হয় সেক্ষেত্রে কমিশন ওই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করতে পারবে। কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারবে।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো চুক্তি অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার বা জোটবদ্ধতা যদি বাজারে প্রতিযোগিতার ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলে, সেক্ষেত্রে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কমিশন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে শুনানির সময় প্রদান করে তদন্ত পরিচালনার আগেই তা মীমাংসা করতে পারবে।
প্রস্তাবিত এ আইন বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি কাজী ফারুক বলেন, এ আইনটি হবে মূলত বিক্রেতাদের জন্য। বিক্রেতারা চাইলেই হঠাত্ করে কোনো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করতে পারবে না। মূল্যবৃদ্ধি করতে হলে তাদের কমিশনে যেতে হবে। এদেশে পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ানো হয় তাতে এরকম একটি আইন থাকলে সেটা করা আর সম্ভব হবে না। আইনটি কার্যকর হলে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই উপকৃত হবে। তিনি বলেন, আইনটি পাস হওয়ার পর যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তবে সংশোধনীর জন্য দাবি তুলব।
 
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, দেশে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বাড়া-কমার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ দেশের ৯৫ শতাংশ পণ্যই আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশে পণ্যের মূল্য ওঠা-নামা করে। আমদানিকারক ও উত্পাদনকারীরা যে দামে পণ্য দেয় আমরা সে দামেই বিক্রি করি। দেশে আইন করে তো আর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। যেসব পণ্য দেশে উত্পাদিত হয় সেসব খাতকে সরকারের পক্ষ থেকে উত্সাহ দেয়া উচিত। তিনি জানান, দেশে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ও আমদানির কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই, এ কারণেই মাঝে মাঝে সংকট সৃষ্টি হয়।
 
সিপিডির খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পাবলিক ইউটিলিটিগুলোকে (গ্যাস, পানি ও বিদ্যুত্) যেন এ আইনের বাইরে রাখা হয়। বাজারে যারা অসম প্রতিযোগিতা করবে এ আইনে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে সবার আগে আইনটি কার্যকরের জন্য একটা ভালো প্রস্তুতি প্রয়োজন। আইনটি ভালোভাবে কাজ করলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি আরও বিকশিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
 
এদিকে দেশবন্ধু সুগার মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা এরকম একটা আইন চাচ্ছি। তাই সরকার এ আইন করতে যাচ্ছে। এ আইন পাস হলে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হবে। আর ব্যবসায়ীরাও বিভিন্ন অপবাদ থেকে রক্ষা পাবেন। অবশ্য এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান।
 
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আইন মন্ত্রণালয় ছেড়ে দিলে এই সপ্তাহেই আইনটি আমরা সংসদে পাঠাব। আর তা না হলে নভেম্বরে শীতকালীন অধিবেশনে তোলা হবে। দেশের বাস্তবতায় আইনটি খুবই জরুরি। প্রতিযোগিতা আইন পাস হলে ব্যবসায়ীরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে না।
 

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: