নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ছাড়াও কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে..

সীমান্ত হাট: বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র

ধীরাজ কুমার নাথ

বাংলাদেশের বালিয়ামারী সীমান্ত এবং ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কালাইরচর সীমান্ত এলাকায় হাট বসেছে। গত ২৩ জুলাই যৌথভাবে উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান এবং ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মা। উপস্থিত ছিলেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ড. মুকুল সাংঘমা। এ সীমান্ত হাটটি মেঘালয়ের রাজধানী তুরা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ও কুড়িগ্রাম জেলার জিঞ্জিরাম নদীর কাছে অবস্থিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার কাছে ‘তুরা’ নাম ও স্থানটি অনেক সুপরিচিত, পাহাড়ঘেরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের অন্যতম কেন্দ্রস্থল হিসেবে। যেমন— ত্রিপুরার মেলাঘর, শিলংয়ের ডাউকি, কোচবিহারের দীনহাটা, পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর ইত্যাদি মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক পরিচিত স্থান, অবারিত বিচরণক্ষেত্র। 
সাধারণ মানুষের উত্পাদিত পণ্য ও আকর্ষণীয় দ্রব্যের বেচাকেনা স্থানের কাহিনী। ভারতের কালাইরচর এবং বাংলাদেশের রাজীবপুরের মানুষের মিলনমেলা হচ্ছে এ হাট। এ হাটে যেতে প্রত্যেক দেশের ৩০০ লোক পাস পাবে, মোট ৬০০ লোক হাটে যেতে পারবে। হাট বসবে প্রতি বুধবার, সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে চলবে বিকেল ৪টা অবধি। তবে শীতকালে বিকেল ৩টায় হাট বন্ধ হয়ে যাবে। ভারতীয় ও বাংলাদেশী টাকায় লেনদেন চলবে। তবে বেশি কিছু পণ্য বেচাকেনা হবে না, মাত্র ১০টি কৃষিপণ্য ও প্রায় ৪৭টি অন্যান্য সামগ্রী বিনিময় হবে। দোকানপাটও খুব বেশি নয়, মাত্র ২৫টি দোকান এ পর্যন্ত অনুমতি পেয়েছে।
 
বাংলাদেশের মেলামাইন সামগ্রীর খুব চাহিদা এ হাটে। এ ছাড়া চানাচুর, চিপস, সিমেন্ট, আসবাবপত্র, কৃষিপণ্যও প্রধান আর্কষণ। রৌমারী অঞ্চলের আনারস, লেবু ও অন্যান্য ফল, শাকসবজির অনেক কদর। ভারতের গোলমরিচ, আদা, রসুন ইত্যাদি বেচাকেনা হবে। হিসাব হচ্ছে, এ বিনিময় বাণিজ্যের কারণে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার লেনদেন হবে। বিষয়টি একেবারে তুচ্ছ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়।
 
উদ্বোধনী দিবসে মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংঘা জানান, পূর্ব পাকিস্তান আমলে কীভাবে এ বাণিজ্য চলেছিল, যা তিনি শৈশবে দেখেছেন। মোহাম্মদ আলী সরকার মুক্তিযুদ্ধকালে এ অঞ্চলে তার বিচরণের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিলেন। যাদুরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বঙ্গবাসী বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়েছিলেন। গারো, কোচ, হাজং উপজাতি ও আদিবাসীরা নাচ-গানে আনন্দে ভরিয়ে তুলেছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে। অপর একটি সীমান্ত হাট চালু হবে আগামীতে সুনামগঞ্জের লাউঘর ও পূর্ব খাসিয়া পাহাড়ের বালাট সীমান্তে। সীমান্ত হাট এবং সীমান্ত এলাকায় এ জাতীয় পণ্যের ব্যবসা বাংলাদেশে একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে নতুন করে আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে।
সীমান্ত বাণিজ্য প্রচলিত আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে সীমান্ত বাণিজ্য পরিচালনার জন্য ডিপার্টমেন্ট অব বর্ডার ট্রেড নামক একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ১৯৯৬ সালে। মিয়ানমার-চীন (মিউস, লিসা), মিয়ানমার-থাইল্যান্ড (তাসিলেক, কাউথং), মিয়ানমার-ভারত (তামু), মিয়ানমার-বাংলাদেশ (মুংগডুউ) সহ বিভিন্ন স্থানে সীমান্ত বাণিজ্য পরিচালনা, সহায়তা দান, নিরাপত্তা বিধান প্রভৃতি বিবিধ দায়িত্ব এ বিভাগ পরিচালনা করে। এসব সীমান্ত পথে মিয়ানমারের কয়েক হাজার মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়ে থাকে। সীমান্ত বাণিজ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
 
সীমান্ত হাট ও সীমান্তে পণ্য বিনিময় অর্থনৈতিক একটি কর্মকাণ্ড ছাড়াও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে সম্প্রীতির মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকতে পারে; কিন্তু বাণিজ্য বন্ধ নেই। রাজনীতির কারণে বাণিজ্যকে জিম্মি করা অথবা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে খুব কম দেশই আগ্রহী।
লক্ষণীয় যে, প্রায় প্রত্যেক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে সীমান্ত বাণিজ্য চলে, তবে যখন বাণিজ্য নির্ধারিত এবং নিয়মতান্ত্রিক পথে চলতে বাধাগ্রস্ত হয় তখন খুঁজে ফেরে চোরাচালান ও দুর্বৃত্তায়নের দুর্গম পথ। তাই প্রায় সব দেশের সরকার চায় বাণিজ্যকে আপন গতিতে চলার উত্সাহ দিতে, নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাণিজ্যকে পরিচালনা করতে।
 
লক্ষ্য করা যায় যে, বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যেও সীমান্ত বাণিজ্য চলে অনুমোদিত পথে, চিহ্নিত ও সরকার নির্ধারিত হাট-বাজারকে কেন্দ্র করে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে প্রায় যুদ্ধকালীন অবস্থা বিরাজ করেছে, কিন্তু সীমান্ত বাণিজ্য অব্যাহত আছে। নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ছাড়াও কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। তবে উত্তর আমেরিকা মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (NAFTA) আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য সব বাণিজ্যিক বাধা ও শুল্ক হার প্রতিরোধ করে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং ২০০৮ সালে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ব্যবসা করেছে।
 
সিঙ্গাপুরের অধিবাসীরা মালয়েশিয়ার জহুর এবং ইন্দোনেশিয়ার বাটুম এলাকায় যাতায়াত করছে। তবে সিঙ্গাপুরের কোনো গাড়ি অন্যত্র ছেড়ে যেতে হলে সিঙ্গাপুর থেকে গাড়ি ভর্তি তেল নিয়ে যেতে হবে। বিশ্বব্যাপী সীমান্ত বাণিজ্যের এ রকম বহু উদাহরণ আছে।
 
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে, কিন্তু তা সফল হয়নি। তখন সীমান্ত বাণিজ্যের যে ধারণা করা হয়েছিল তার সঙ্গে বর্তমান পদ্ধতির বেশ কিছু ব্যতিক্রম আছে। বর্তমানে কালাইরচর ও জিঞ্জিরাম নদীর তীরে যে হাট বসেছে তা হচ্ছে সীমান্ত বাণিজ্যের এক নবতর সংযোজন। এ জাতীয় হাটের প্রয়োজনীয়তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল আছে, যার মধ্যে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং দহগ্রাম, আঙ্গরপোতাসহ ৫১টি বাংলাদেশের ছিটমহল ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত। যেখানে ভূমির পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ১১০ একর। এসব ছিটমহলবাসীর দুর্ভাগ্যের সীমা-পরিসীমা নেই। এ জাতীয় কিছু সীমান্ত হাট তাদের উত্পাদিত পণ্যের বেচাকেনায় সামান্য অবদান রাখতে সাহায্য করতে পারে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কালে, সেপ্টেম্বরে শহীদ কামরুজ্জামানের একান্ত সচিব হিসেবে দহগ্রামের জনগণের সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। দহগ্রামের এক যুবক দুঃখ করে আমায় বলেছিল, তারা ঢাকায় একটি চিঠি দিতে গেলে ভারতীয় শহর মেখলিগঞ্জে যেতে হয়। ধরা পড়লে মার খেতে হয়। ছিটমহলবাসীর মার খাওয়ার দুঃখ ৪০ বছরেও শেষ হয়নি।
১৯৫৮ সালের নুন নেহেরু চুক্তি, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি, ১৯৮২ সালের ৭ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এআর দোহা ও নরসীমা রাওয়ের বৈঠক ও ভারতীয় আদালতে কুলচিবাড়ির লোকদের মামলা, ১৯৯২ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার জন্য তিন বিঘা করিডোর দিয়ে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতার জনগণের চলাফেরার সুযোগ লাভ। এত সব ঘটনা ছিটমহলবাসীরা দেখতে দেখতে বৃদ্ধ হয়ে গেল। বাংলাদেশের সুধীসমাজ দেখেও না দেখার ভান করল। আবার ৩ জানুয়ারি ২০০৬ সালে শিবরাজ পাতিলের পানবাড়ি চৌকি পার হয়ে বিডিআরের সালাম গ্রহণ— সবই যেন গল্প। প্রচুর আশ্বাস আর বেদনার নিঃশ্বাসের মাঝে ছিটমহলবাসীর জীবন। ছিটমহলবাসীর দেশ আছে, কিন্তু স্বদেশকে তারা চিনতে পারেন না। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা এলেন কিছু দিন আগে, বললেন এবার সুরাহা হবে। তারপর পদার্পণ করলেন পি চিদাম্বরম, ৩০ জুলাই, ২০১১ সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা
(Coordinated Border Management Plan)বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হবে বলে। বললেন, সীমান্তে আর গোলাগুলি নয়। সত্যিই কি তাই?
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করিডোর আছে স্থলভাগে এবং জলভাগে। স্পেনের ছিটমহল সেয়ুটা ও মেলিল্লা শহর অবস্থান করছে মরক্কোয়। আর্জেন্টিনার দ্বীপ ইসলা, এপাইপসহ কয়েকটি ছোট দ্বীপ অবস্থান করছে প্যারাগুয়ের মধ্যে। তেমনি জার্মান শহর বুসিংগানের অবস্থান হচ্ছে উত্তর সুইজারল্যান্ডে। ছিটমহলের সমস্যা তারা সমাধান করেছে আন্তরিকতার সঙ্গে, জনগণের কথা ভেবে। মানবতা স্থান পেয়েছে রাষ্ট্রনায়কদের চিন্তায়, প্রাসাদ রাজনীতি নয়।
দু’একটি বিছিন্ন সীমান্ত হাট দিয়ে সীমান্তে বসবাসকারী জনগণের জীবনে শান্তি আনা যাবে না। সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করতে হলে অথবা সীমান্তে হিংস্রতা প্রতিরোধসহ চোরাচালানিদের তীর্থক্ষেত্র থেকে উত্তরণ করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং যা হতে হবে জনকল্যাণমুখী। সীমান্ত হাটকে সম্প্রীতির ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত করতে হলে আরও অনেক বেশি কাজ করতে হবে।
 
পণ্যসামগ্রীর সংখ্যা যেমনভাবে অনেক বাড়াতে হবে, তেমনিভাবে আরও অধিকসংখ্যক লোকের চলাচলের সুযোগ দিতে হবে। তবে এ সুযোগ ও শুভ উদ্যোগের যেন কোনোভাবে অপব্যবহার না হয় এবং জনগণের আর্থ-সামাজিক কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে এ লক্ষ্যে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যেমন মিয়ানমার একটি সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। জেলা প্রশাসনকে সার্বিক ক্ষমতা দিয়ে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিলে এ উদ্যোগ আরও অর্থবহ হতে পারে।
 
লেখক: সাবেক সচিব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা [from: Bonik Barta]

Visit us on FaceBook

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: