শেয়ারবাজার নভিস বা আনাড়িদের জন্য নয়। শিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও সদা তত্পর লোকদের জন্যই এ বাজার..

শেয়ারবাজার আনাড়িকে শাস্তি দেয়

আবু আহমেদ 

সারা বিশ্বেই শেয়ারবাজার আনাড়ি কে শাস্তি দেয়। এসব নভিস যে অজ্ঞ তা নয়। হতে পারে এরাও শিক্ষিত, তবে শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রে শিক্ষিত নয়। শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার কতটুকু আছে, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, এই লাইনে শিক্ষা আছে কি না। এ লাইনে শিক্ষা মানে এই নয় যে, সবাই অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান বা ব্যবসায় প্রশাসনে এমবিএ হতে হবে। এত বড় ডিগ্রি না থাকলেও চলবে যদি বাজার ও ব্যবসা সম্পর্কে বেসিকগুলো জানা থাকে। বাকি ঘাটতিটা অভিজ্ঞতা দ্বারা পূরণ করা যায়। বড় শেয়ারবাজারগুলোয় পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা ও বাজার এবং ব্যবসা নিয়ে গবেষণা করার জন্য ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো নামকরা স্কুলের এমবিএ, সিএফএ, সিজিএ প্রভৃতি ডিগ্রি হোল্ডারকে নিয়োগ দেয়। করপোরেট সংস্থা বা কোম্পানির ফিন্যান্সিয়াল ডিরেক্টর পদেও এদের নিয়োগ দেয়া হয়। তাই তো বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর হাজার হাজার এমবিএ গ্র্যাজুয়েট উত্পাদন করছে এবং ডিগ্রি শেষে এমনকি মাঝপথেও বড় বেতনে এদের চাকরি হয়ে যাচ্ছে। হার্ভার্ডের এমবিএ বেকার আছে— এমনটি শোনা যায় না। ওই দেশের ওয়ালস্ট্রিট তথা শেয়ারবাজার ওই গ্র্যাজুয়েটদের বৃহত্তম নিয়োগদাতা। তবে এসব লাইনের আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও যে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ভালো করা যাবে না, এমন নয়। অন্য বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় চাকরি নিয়ে প্রবেশ করে কর্মজীবনে সফল হয়েছে, সে উদাহরণ অনেক আছে।
আসল কথা হলো, পেশাকে ভালোবাসা এবং অন্তর থেকে গ্রহণ করা। কাউকে জোর করে ডাক্তারি পড়ালে সে ডাক্তারি সনদ পাবে সত্য, তবে ভালো ডাক্তার হবে না। শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রেও ঝোঁক এবং নেশাই বড় কথা। এ ক্ষেত্রে নিজেকে সারাক্ষণ আধুনিক রাখতে হয়। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান প্রায়ই কমপক্ষে তিন মাস অন্তর আর্থিক বিবরণী দিচ্ছে। ওইসব বিবরণী পড়তে, বুঝতে ও জানতে হবে। এ ক্ষেত্রেও একটা কথা আছে, যে আগে তত্ত্ব জানবে, সে বাজারের সুযোগ অন্যদের থেকে আগে নিতে পারবে। শেয়ারের মূল্য বাড়ার মূল কারণ হলো, শেয়ারপ্রতি আয় এর পরিবর্তন। অন্য উপাদানগুলো হলো, শেয়ারপ্রতি সম্পদ, কোম্পানি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং যারা ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা পর্ষদে আছেন তাদের হাতে শেয়ারের ধারণ। শেয়ারমূল্য ম্যাক্রো অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি ৭-৮ শতাংশ হয়, তাহলে ধরে নেয়া যায় কোম্পানিগুলো তুলনামূলক বেশি আয় করবে। আর ৫-৬ শতাংশ হলে সে আয় কম হবে। সরকারের করনীতিও শেয়ারমূল্যকে প্রভাবিত করে। হঠাৎ করে করপোরেট আয়কর যদি বাড়তে দেয়া হয়, তাহলে শেয়ারের আয় কমে যাবে এবং বাজারে মূল্য পড়ে যেতে পারে। তবে কোনো কারণে যদি চাহিদা-সরবরাহের মধ্যে বড় রকমের মিসম্যাচ বা অসঙ্গতি ঘটে, তাহলেও শেয়ারের মূল্য হয় বাড়বে, না হয় পড়বে। ২০০৯-২০১০ এই দুই বছরে বাংলাদেশ শেয়ারবাজারে ৫০-৬০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল, মূলত হঠাৎ করে বাজারে শেয়ারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে। আবার এখন শেয়ারবাজার পড়েও যাচ্ছে চাহিদার ব্যাপক হ্রাসের কারণে।
বাংলাদেশে যে ব্যাপারটা ঘটেছে বা ঘটছে তা হলো, এখানে বেশিরভাগ নতুন বিনিয়োগকারী প্রবেশ করেছে এই বাজারকে না বুঝে এবং স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার জন্য। স্বল্প সময়ে ধনী হতে গিয়ে তারা শুধু মূলধন বৃদ্ধিজনিত লাভ বা ক্যাপিটাল গেইনসের পেছনে ছুটেছে এবং এটা করতে গিয়ে তারা বিনিয়োগকারী না হয়ে ‘শেয়ার ব্যবসায়ী’ হয়েছে। যত দিন বাজার একতরফাভাবে শুধু বেড়েছেই, তত দিনই তারা খুশি ছিল। কিন্তু বাজার যখন তীব্র গতিতে ব্যাকগিয়ারে চলতে শুরু করল, তখন তারা দিশেহারা হয়ে পড়ল। এসব নতুন অনভিজ্ঞ শেয়ার ক্রেতারা আবার ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনেছে। ফলে ধস যখন নামা শুরু করল, তখন অনেকে নিজেদের পুঁজিটুকুরও অংশ হারিয়ে সুদ-দায় পরিশোধ করতে বাধ্য হলো। এদের অনেকেই এখন বাজারছাড়া। ১৯৯৬-তেও এভাবে অনেকে বাজারছাড়া হয় এবং তদের কিছুসংখ্যক বাজারে ফেরত এসেছিল কেবল ২০০১-এর পর।
একেবারে বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ লোকেরাও শেয়ারবাজারে মার খায়। বর্তমানের অতি সফল বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটও অনেক ক্ষেত্রে অর্থ হারিয়েছেন। তবে তিনি অন্যদের থেকে অধিক সফলভাবে মানুষের অর্থকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি চলেন অতি সাদাসিধে, থাকেন স্বল্পমূল্যের বাড়িতে। আর বাফেট বলতেন, সবাই যখন শেয়ার কিনতে ভীত হতেন, তখন তিনি শেয়ার কিনতেন আর সবাই যখন শেয়ার কিনতে অতি উত্সাহ দেখাতেন; তখন তিনি শেয়ার বেচতেন। অতি বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক ছিলেন জন মাইনার্ড কিনস। তিনি শেয়ারবাজারের বড় খেলোয়াড় ছিলেন। তিনিও খেলতে গিয়ে হাজার হাজার পাউন্ড হারিয়েছিলেন। অবশ্য পরে তিনি হারানোর চেয়ে বেশি অর্থ জিতেছিলেন।
শেয়ারবাজারে হার-জিত আছেই। আপনার কোম্পানি যদি হঠাৎ করে নতুন খনি বা ব্যবসার সন্ধান পায়, তাহলে সে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বেড়ে যাবে। এই যে বাংলাদেশে তেল-গ্যাস মার্কিন কোম্পানিগুলো ব্যবসা করছে, এরা যদি নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র এ দেশে আবিষ্কার করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালস্ট্রিটে ওইসব কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। আর বিপি বা ব্রিটিশ পেট্রলিয়ামের মতো তেলক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্য দায়ী হয়ে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ যদি দিতে হয়, তাহলে বিপির শেয়ারমূল্য অবশ্যই পড়ে যাবে। সুতরাং যারাই এসব কোম্পানির শেয়ার কিনছে, তারা বড় ধরনের ঝুঁকিও নিচ্ছে। ঝুঁকি যেমন বড়, তেমনি লাভও বড়। নতুন লোক হাজারে হাজারে যখন শেয়ারবাজারে প্রবেশ করে, তখন বুঝতে হবে— বাজারের পরবর্তী সাইকেলে সুনামি নামবে। আর এই নতুনরা অবশ্যই এক দিন মার খাবে। সে জন্যই বলছিলাম, শেয়ারবাজার নভিস বা আনাড়িদের জন্য নয়। শিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও সদা তত্পর লোকদের জন্যই এ বাজার।
 
লেখক: অর্থনীতিবিদ

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: