দলীয়করণে উচ্চ আদালতে সংকট

দলীয়করণে উচ্চ আদালতে সংকট

আমীর খসরু ● হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে একজন বিচারকের এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিএনপি সমর্থিত কয়েকজন আইনজীবীর হট্টগোল, বিশৃঙ্খলা এবং এর জের ধরে সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশি মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনায় পুরো উচ্চ আদালতে এক অস্থির পরিস্থিতি চলছে। এই অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি একদিনে হয়নি, উচ্চতর আদালত এবং এর নানাবিধ কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে অনেকদিন ধরেই। এছাড়া উচ্চতর আদালতকে লক্ষ্য করে যে রাজনৈতিক কটাক্ষের ফুলঝুড়ি সাম্প্রতিককালে আমরা লক্ষ্য করছি, তা ইতিপূর্বে কখনো শোনা যায়নি। আদালতের একটি বেঞ্চে বিচারকাজ চলাকালীন সময়ের অনাকাঙ্ক্ষিত ওই ঘটনায় সিনিয়র আইনজীবীরা যেমন উদ্বিগ্ন তেমনি উদ্বিগ্ন সচেতন জনসমাজ। কারণ রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের মধ্যে একটি হচ্ছে বিচার বিভাগ। সংকীর্ণ দলীয়করণসহ নানামুখী অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডের ফলে এখন ঐ দুটো বিভাগের সঙ্গীনদশা। বিচার বিভাগও সে পথেই এগুচ্ছে বলে অনেকে বলছেন। তাছাড়া সরকার নিজেই যখন এই পরিস্থিতিতে একটি পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তখন অবস্থা কতোটা ভয়াবহ হতে পারে বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন যেকোনো মানুষই তা উপলব্ধি করতে পারছেন।

গণতন্ত্রের দাবিতে এবং স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদ সরকারকে পতনে বাধ্য করার জন্য তৎকালীন সময়ে আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। এরই অংশ হিসেবে তখন আইনজীবীগণ দলমত নির্বিশেষে তখনকার প্রধান বিচারপতির এজলাস বর্জন করেছিলেন। স্বভাবতই এটা প্রত্যাশিত ছিল যে, ’৯০-এর সামরিক স্বৈরশাসকের বিদায়ের পরে রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলো আরো জনমুখী ও গণতন্ত্রপরায়ণ অবস্থান নিয়ে সচল, সজীব হবে। কিন্তু এর বদলে দলবিভক্তি এবং এর ফলে দলীয়করণ একদিকে যেমন আইনজীবীদের বিভক্ত করেছে, তেমনি বিচারক থেকে রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তার নিয়োগ পর্যন্ত এর ক্ষতিকর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হতে থাকে।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন বিচারপতি কেএম হাসানসহ কয়েকজন বিচারপতির জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের পরে উচ্চতর আদালতে উত্তপ্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়। ওই সরকারের সময়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোঃ নাসিমের নির্দেশে বস্তি উচ্ছেদ করা হচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে আইন ও শালিস কেন্দ্র একটি রিট আবেদন দায়ের করেছিল। এই রিটের পক্ষে আদালতে ড. কামাল হোসেন মূল আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করছিলেন। এই রিটের বিরুদ্ধে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণ এবং ড. কামাল হোসেনের বাড়ির সামনে রাতারাতি বস্তি বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়েও তখন সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকার এতে ক্ষান্ত না হয়ে উত্তপ্ত বাক্যবর্ষণ করে যাচ্ছিল উচ্চতর আদালতের বিরুদ্ধে।

২০০৬ সালে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির কামরার দরজায় পদাঘাত করে ভাঙচুর চালায়। ভাঙচুর চালায় অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে এবং গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয় তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রীর। প্রধান বিচারপতির কক্ষ ভাংচুরের ঘটনায় অভিযুক্ত একজন আইনজীবী বর্তমান সরকারের সময়ে এসে বিচারকও হয়েছেন। ঐ সময় সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। তবে গ্রেফতারের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগ এবং শপথ বাক্য পাঠ নিয়েও জটিলতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের একাধিক ঘটনা ঘটে। তবে বিএনপি সরকারের সময়েও এমন ঘটনা ঘটেছে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে ছিল সোচ্চার।

তবে এ কথাও বলে নেওয়া উচিত, বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালতের বেঞ্চে এ বছর যে পন্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছে তাও প্রত্যাশিত নয়। প্রতিবাদের ভাষা এবং প্রতিবাদের প্রকাশ ভিন্নভাবে হওয়াটাই ছিল প্রত্যাশিত।

যদিও যতই দিন যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তম্ভে ততোই রাজনৈতিক দুঃখজনক বিভাজন এবং দলীয়করণ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। আইনজীবীরাই এখন উচ্চ আদালতের ‘কোন কোর্ট কোন দলের পক্ষে’, তা প্রকাশে বয়ান করে চলেছেন। এ পরিস্থিতি আসলেই কাম্য ছিল না।

সাম্প্রতিককালে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। উচ্চতর আদালতের এই রায় বিদ্যমান রাজনীতিতে সংঘাত, বিভেদ এবং বিবাদকে আরো উসকে দিয়েছে।

সর্বশেষ যে ঘটনাটি নিয়ে এখন উচ্চতর আদালত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুরু হয়েছে একজন বিচারকের একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে। সংবিধান ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হবে – এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং দু’জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত ওই বেঞ্চে এর শুনানি চলতে থাকে। এ শুনানিকালে ওই বেঞ্চের একজন বিচারক বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে একটি মন্তব্য করেন। এই মন্তব্যের কোনো প্রয়োজন ছিল কিনা – এ প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি, বিশেষত খালেদা জিয়ার বক্তব্য যখন আদালতের বিচার্য্য ছিল না। এটা ধরে নেওয়া যায়, সংশ্লিষ্ট বিচারপতির দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই এমন মন্তব্য এসেছে। এই বিচারপতি বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদকে আদালতে ডেকে নিয়ে ‘নির্বোধ, অজ্ঞসহ’ এমন ভাষায় ভৎর্সনা করেছিলেন যা এ দেশের অনেক সচেতন মানুষই আশা করেনি এবং অনেকেই মর্মাহতও হন।

দলীয়করণ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিচারিক সক্রিয়তার নামে বিচার বিভাগে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দলনিরপেক্ষ সিনিয়র আইনজীবীগণ প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনাক্রমে ব্যবস্থা নিতেন। এখন তীব্র দলীয়করণের কারণে সেটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। সরকার যখন একটি শক্ত পক্ষ হিসেবে দাঁড়ায় তখন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে বাধ্য।

কিন্তু এ অবস্থা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। আইনজীবীদের দলীয়করণের মাত্রা বাড়বে যদি বিচার বিভাগের দলীয়করণ বন্ধ না হয়। বিচার বিভাগ স্বাধীন করার বদলে এখন বিচার বিভাগে দলীয়করণের মাত্রা দিনে দিনে বাড়ছে।

এই পরিস্থিতি কোনোক্রমেই দেশের গণতান্ত্রিক প্রথা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না। এ কথাটি প্রধানত সরকারকেই বুঝতে হবে।

Published On 11-08-2011
Link: http://budhbar.com/?p=6031

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: