আমেরিকান ড্রীম, রাশিয়ান ড্রীম, ও বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যা

আমেরিকান ড্রীম, রাশিয়ান ড্রীম, ও বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যা
ড. আবু এন. এম. ওয়াহিদ


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, “চেইজিং অ্যামেরিকান ড্রীম” বলে একটি জনপ্রিয় শ্লোগান আছে। শ্লোগানটি ১৯৩১ সালে সর্ব প্রথম উচ্চারণ করেন, জেম্‌স ট্রাস্লো এ্যাডাম্‌স নামের একজন বিখ্যাত মার্কিন লেখক ও ঐতিহাসিক। এই শ্লোগানের উৎস খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র – যার দ্বিতীয় বাক্যে রয়েছে সকল নাগরিকের “জীবন, স্বাধীনতা, ও সুখ – সমৃদ্ধি প্রয়াসের” নিশ্চয়তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, সুখ ও সমৃদ্ধির একটি প্রচলিত মাপকাঠি হলো, “বাড়ীর মালিকানা” যার দ্বারা মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, ছোট হউক, বড় হউক, যে পরিবারের একটা নিজস্ব বাড়ী আছে, তার “অ্যামেরিকান ড্রীম” সফল হয়েছে বলে ধরা হয়। বর্তমানে আমেরিকায় ৬৯ শতাংশ পরিবার নিজস্ব বাড়ীতে থাকে। উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিসংখ্যানের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে কম “বাড়ীর মালিকানা” জার্মানীতে (৪২ শতাংশ) এবং সবচেয়ে বেশি স্পেনে (৮৫ শতাংশ)।

রাশিয়ান অর্থনীতির মোট দেশজ আয় (জি.ডি.পি.) ১.৬৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যা কীনা আমেরিকার (১৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রায় আট ভাগের এক ভাগ। এছাড়া, রাশিয়ানরা অ্যামেরিকানদের তুলনায় অনেক গরীবও বটে। অ্যামেরিকানদের গড় মাথাপিছু বার্ষিক আয় যেখানে ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার, সেখানে রাশিয়ানদের মাত্র ১২ হাজার মার্কিন ডলার। বিশ বছর আগে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে রাশিয়া যখন আলাদা দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো অনেকটাই দূর্বল ও নাজুক। টি.ভি. র পর্দায় দেখেছি, একটা সামান্য রুটির জন্য শত শত রাশিয়ান ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে। রাশিয়াকে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চাত্য দেশের কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাততে হয়েছিলো। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ১৯৯০ এর গোড়ার দিকে, মার্কিন কংগ্রেসে “রাশিয়ান সাহায্য বিলের” উপর বিতর্ক করতে গিয়ে, জনৈক কংগ্রেসম্যান অত্যন্ত তাচ্ছিল্লের সাথে বলেছিলেন, “বাংলাদেশও যেখানে তার নাগরিকদের দু’বেলা খাবার যোগাতে পারে, সেখানে রাশিয়ানরা পারছে না।”

তারপর দীর্ঘ বিশ বছর পার হয়ে গেছে। পুতিনের শক্ত ও সঠিক নেতৃত্ব, বিশ্ব ব্যাপী তেল-গ্যাসের চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধি, এবং রাশিয়ানদের পরিশ্রমের ফলে, আজকের রাশিয়া আর বিশ বছর আগের রাশিয়া এক নয়। বর্তমানে পৃথিবীর ৫টি দ্রুততম প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের মধ্যে রাশিয়া অন্যতম। বাকী চারটি দেশ হলো – চীন, ভারত, ব্রাজিল, ও ম্যাক্সিকো। বর্তমানে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “চেইজিং অ্যামেরিকান ড্রীম” এর মত, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেডভেদেভ ২০০৭ সালে “রাশিয়ান ড্রীম” নামে এক নতুন শ্লোগান তুলেন। মেডভেদেভের শ্লোগানেরও অর্থ একই। তিনিও প্রতিটি রাশিয়ান পরিবারকে ছোট হলেও একটি করে বাড়ী উপহার দিতে চান। তবে মেডভেদেভের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য “অ্যামেরিকান ড্রীম” থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্লুমবার্গ বিজনেস উইক রিপোর্ট অনুযায়ী, সাড়ে চৌদ্দ কোটি রাশিয়ানদের ৭৭ শতাংশ অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটে থাকেন। বাকি ২৩ শতাংশ থাকেন ব্যক্তিগত মালিকানায় আলাদা বাড়ীতে।

রাশিয়ান সমাজ ও অর্থনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ও সমস্যা হলো তার জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির নিম্নগামী গতি। বর্তমানে রাশিয়ার জনসংখ্যা প্রতি বছর কমছে ০.১০৫৬২ শতাংশ হারে; অর্থাৎ প্রতি বছর প্রতি হাজারে রাশিয়ায় মানুষ কমছে ১ জন করে। অন্যভাবে বলতে গেলে গোটা রাশিয়ার জনসংখ্যা প্রতি বছর ১ লক্ষ ৫০ হাজার করে হ্রাস পাচ্ছে। রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি আসছে মূলতঃ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন ও তার রপ্তানি থেকে। জনসংখ্যার নিম্নগতির কারণে আভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রাশিয়াতে একেবারেই ক্ষীণ। সম্পূর্ণভাবে বহির্বিশ্বের উপর নির্ভর করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা রাশিয়ার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার। এক দিকে জন্ম হারের কমতির ফলে স্কুল কলেজে ছাত্র-ছাত্রী সংকট এবং কল কারখানায় শ্রমিক সমস্যা মারাত্বক আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে, বৃদ্ধ ও অবসরপ্রাপ্ত জনসংখ্যার পরিমান আনুপাতিক হারে বেড়ে গেছে। বিপুল পরিমান এধরণের জনসংখ্যার ভরণ পোষণ ও দেখ ভাল করা রাষ্ট্রের পক্ষে বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি তথা শ্রমশক্তির নিয়মিত ও বর্ধিত যোগান রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কৌশল।

রাশিয়ার জনসংখ্যায় ইতি বাচক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য মেদভেদেভ “রাশিয়ান ড্রীমকে” কাজে লাগাতে চান। তার মতে, যত বেশি রাশিয়ানকে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের করে নিজস্ব মালিকানায় আলাদা আলাদা বাড়ীতে তুলে দেওয়া যাবে, ততই তারা সন্তান উৎপাদনে উৎসাহ বোধ করবেন। এবং রশিয়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। “রাশিয়ান ড্রীম” প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মেদভেদেভ সৃষ্টি করেছেন, “ফেডারেল ফান্ড ফর দি প্রমোশন অফ হাউজিং কনস্ট্রাক্‌শন ডেভোলাপমেন্ট” (এফ.এফ.পি.এইচ.সি.ডি.) এবং রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অধিগ্রহণ করেছেন ২৫ লক্ষ একর জমি। এফ.এফ.পি.এইচ.সি.ডি.’র ডিরেক্টার আলেকজান্ডার ব্র্যাভারম্যান সম্প্রতি ব্লু মবার্গ বিজনেস ইউকের সাথে এক সাক্ষাৎকারে আশা প্রকাশ করছেন, রাশিয়াতে এ বছর এই প্রজেক্টের অধীনে ১ কোটি ৪০ লক্ষ বর্গ মিটার আয়তনের বাড়ী তৈরি হবে। আর দু’ হাজার বার সাল নাগাদ এর পরিমান গিয়ে দাঁড়াবে ২ কোটি বর্গ মিটারে – যার ফলে ৩০ শতাংশ জনসংখ্যার “রাশীয়ান ড্রীম” সফল হবে। সম্প্রতি সেইন্ট পিটারসবার্গের নিকটে এধরণের একটি প্রজেক্ট উদ্বোধন করতে গিয়ে, রাশিয়ার প্রধান মন্ত্রী ভ­্লাদিমির পুতিন বলেছেন, “নতুন বাড়ীর মালিকানা রাশিয়ানদের অধিক পরিমানে শিশু জন্ম দানে উদ্বুদ্ধ করবে”।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার চিত্র রাশিয়ার ঠিক বিপরীত। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫০ লক্ষ এবং এর প্রবৃদ্ধির হার ১.৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রতি হাজারে বাড়ছে ১৩ জন করে। এই হিসেবে সারা দেশে প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ২১ লক্ষ ৪৫ হাজার করে। এভাবে বাড়তে থাকলে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা সহজেই ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, এবং দেশে – বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমান শ্রম বাজার সম্প্রসারণ করতে না পারলে, বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা মারাত্বক ভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

গত দু’ দশক ধরে বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা মোটামোটি সফলতার সাথে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ইদানীং এর কার্য্যকারিতা অনেকটা কমে আসছে। তাই শুধু মাত্র গতানুগতিক পরিবার পরিকল্পনার উপর ভরসা করে বসে থাকা বাংলাদেশ সরকারের জন্য মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাশিয়ার জনসংখ্যা সমস্যা আমাদের উল্টো। রাশিয়াতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পুতিন – মেদভেদেভ জনগনকে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সরিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় আলাদা আলাদা বাড়ীতে তুলে দিচ্ছেন। তার বিপরীতে বাংলাদেশে জনসংখ্যা কমানোর জন্য, গ্রামের মানুষজনকে নিজ নিজ বাড়ী থেকে তুলে এনে হাই রাইজ বিল্ডিংএ দু’রুমের অ্যাপার্টমেন্ট উঠিয়ে দেওয়া উচিৎ। এতে এক দিকে কৃষি আবাদের জন্য বিপুল পরিমান জমি সাশ্রয় হবে, আর অন্য দিকে “রাশিয়ান ড্রীম” এর উল্টো ফল অর্থাৎ সহজে কার্যকর ভাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। তবে উল্টো “রাশিয়ান ড্রীম” প্রজেক্টে ব্যাপক ভাবে হাত দেওয়ার আগে, কোনো একটি বিশেষ গ্রামে একটি পাইলট প্রজেক্ট করে দেখা উচিৎ “রাশিয়ান ড্রীম” এর উল্টো ফল সে গ্রামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উপর কী রকমের প্রভাব ফেলে। অচিরে এধরণের একটি পাইলট প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এন.জি.ও. ব্র্যাকের প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান রইলো।

লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক – টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি; এডিটর – জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: