সাধারণ মানুষের অপমৃত্যু ও নীরব কান্না

সাধারণ মানুষের অপমৃত্যু ও নীরব কান্না
আতাউস সামাদ
গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শুরু। সিলেটে থাকতাম আমরা। ছবির মতো ছিল সিলেট শহর তখন। একদিন দেখি স্কুল, রাস্তা, পাড়া সবখানেই মানুষের মুখে মেঘের ছায়া। শোকাতুর সবাই। একটি স্কুলছাত্রী বাসের ধাক্কায় মারা গেছে মুরারীচাঁদ কলেজের কাছাকাছি। তাতে শহরের সবাই হতভম্ব ও দুঃখভারাক্রান্ত। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা সিলেটের অধিবাসীদের মুখে মুখে ছিল বহুদিন। মেধাবী ও প্রাণচঞ্চল মেয়েটির স্মরণে ঢাকার একটি মাসিক পত্রিকায় একপাতা লেখা বেরিয়েছিল। পত্রিকাটি সিলেট শহরের মানুষের হাতে হাতে ঘুরেছে। আমাদের পরিবারের কেউই মেয়েটিকে দেখিনি। তার পরিবারের সঙ্গে আমাদের বাড়ির কারও পরিচয় ছিল না। অথচ তখন মেয়েটির অকাল মৃত্যুর কথা এত শুনেছি যে, আজও তার নাম মনে আছে। রাকা।

সেই সময়টা এমন ছিল যে, সবাই সবার জন্য একটা টান অনুভব করতো। বিশেষ করে দুঃসময়ে। কর্তব্যবোধের প্রতি আনুগত্যও ছিল। তাই দুঃখজনক বা খারাপ কিছু হলে সমাজের অনেকেই উঠে বসতেন। তাঁরা বলতেন, একটা কিছু করতে হবে। গত ষাটের দশকের শুরুতে যখন দৈনিক খবরের কাগজে নিয়মিত কাজ শুরু করি, তখন দেখতাম একটি সড়ক দুর্ঘটনা বা লঞ্চডুবি হলে দেশের সব পত্রিকাজগত্ ঝাঁপিয়ে পড়তো শুধু সেই অঘটনের খবর দিতেই নয়—কেন দুর্ঘটনা হলো, কেন কেউ মারা গেলেন, এখন তাঁর পরিবারের কী হবে, এরকম দুর্ঘটনা বন্ধ করতে এখনই কী কী করতে হবে, কেন এতদিন এসব করা হয় নাই, এখন কবে হবে—এসব খুঁজে বের করতো। সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় লেখা তো হতোই, পাঠকদের চিঠিও আসতো অনেক। শেষপর্যন্ত সরকারকে কিছু একটা করতে হতো। আমার মনে হয়, তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে সে সময়কার পাকিস্তানের সেনাশাসক আইয়ুব খানের অত্যাচার, প্রতিবাদীদের দলে দলে জেলে পাঠানো এবং এই অঞ্চলের প্রতি সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য চলতে থাকায় তখন এসবের প্রতিবাদ করতে এবং সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে জনগণকে রাজনৈতিক প্রতিবাদ নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয় যে, অন্যান্য নৃশংসতা থেকে সমাজকে বাঁচানোর প্রশ্নটির দিকে নজর কমে যায়। এমন নয় যে, এসবের কথা উঠতো না। তবে তখন প্রায়ই উত্তর দেওয়া হতো, একবার রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন ফয়সালা হয়ে গেলে, জনগণ নিজেদের হাতে ক্ষমতা পেলে সেই গণতন্ত্র সুশাসন নিশ্চিত করবে আর তার ফলে এসব সমস্যার সমাধান অবধারিতভাবেই হয়ে যাবে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সেই প্রতিশ্রুতির ভগ্নাংশও রক্ষিত হয় নাই। তার ফলে দেশের সাধারণ মানুষের অপমৃত্যু হচ্ছে রোজই। আর আমরা কেঁদেই চলেছি, তবে নীরবে।

দুই
গত পরশু (শনিবার) আমাদের দেশের খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ, সাংবাদিক ও আলোকচিত্র (চলচ্চিত্র) শিল্পী আশফাক মুনীর মিশুক এবং তাঁদের তিনজন সহকর্মী মানিকগঞ্জে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন; একই দিনে পাবনার এক বাস দুর্ঘটনায় মারা গেছেন আরও পাঁচ জন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। আবারও সবাই হতভম্ব হয়েছেন। ফের কান্নার রোল পড়েছে। আমি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলাম। মিশুক তখন ওই বিভাগের অনার্স কোর্সের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। একটু খেয়ালি ধরনের ছিল। তাই তার দিকে বিশেষ নজর রাখতে হতো। পরে দূর থেকে দেখেছি, আশফাক মুনীর মিশুক কর্মক্ষেত্রে তার প্রতিভার ছোঁয়া দিচ্ছে এবং পেশাগত সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ফটোগ্রাফি শাখা ও ল্যাব প্রতিষ্ঠায় তার অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। একুশে টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠালগ্নে ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের নেতৃত্বে আধুনিক টিভি সাংবাদিকতার নতুন ধারাটিকে বলিষ্ঠ করতেও তাঁর অবদান অনেক। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদকে অনেকেই এক ডাকে চেনেন। বাংলাদেশেও প্রামাণ্যচিত্র তৈরী করে বেঁচে থাকা যায় সেকথা প্রমাণ করেছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়নি আমার। কিন্তু এদেশের আরও অনেক মানুষের মতো আমিও তাঁর কাছে ঋণী তাঁর তৈরি ‘মুক্তির গান’ ছবিটির জন্য। সেই সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক আমেরিকানের বাড়ি থেকে তাঁর তোলা মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য সব ফিল্ম থেকে মুক্তির গানের জন্য প্রামাণ্য ফুটেজগুলো সংগ্রহ করে এমন এক ছবি তৈরি করেছিলেন তিনি, যা আমাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সাড়ে ছয় কোটি মানুষ বাংলাদেশে নৃশংস পাকিস্তানি সেনাদের হাতে অবরুদ্ধ ছিল, আমি তাদের মধ্যে নগণ্য একজন। সীমান্তের ওপারে বা মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরগুলোতে কী হচ্ছে, তা দেখিনি আমি। তবে আমরা অনেকেই দেশের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি। তারেক মাসুদের তৈরি মুক্তির গান শুধু গানে গানেই আমাদের উদ্বেলিত করেনি, আমাদের না দেখা জগত্টাকে দেখিয়েছে এবং সারাদেশে স্বাধীনতার বাতাসে এক নতুন প্রবাহ সৃষ্টি করেছে। দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে এদের শেষ সম্মান জানাচ্ছি।

তিন
গত পরশু বিকাল হওয়ার আগেই জানা গেল, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন তারেক মাসুদ, আশফাক মুনীর মিশুক ও তাদের তিন সহকর্মীর মর্মান্তিক ও অকালমৃত্যুতে। গত ২৩ জুলাই মিরসরাইয়ে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার একটিতে ৪৪ স্কুলছাত্রসহ ৪৯ জন নিহত হওয়ার পরও এঁরা শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন। তারপর ক্রম অনুসারে প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা ও পরে প্রধানমন্ত্রী মিরসরাই যান। সেখানে তাঁরা জনসভা করেন এবং নিহতদের পরিবারগুলোকে অর্থসাহায্য দেন। তারপর? তারপর অবস্থা যা ছিল তা-ই। সব সড়কে বিশৃঙ্খলা। সেখানে দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা হচ্ছেই। আর তাতে রোজই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন। আমার দেশ পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে, এখন বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে ৮৩ জন করে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি চলতে দেওয়া কোনো সরকারের জন্যই আদৌ গৌরবের বিষয় নয় আর জনগণের জন্য নয় নিরাপদ। আচ্ছা, জনগণের কথা না হয় জাহান্নামে গেল। কিন্তু সরকার দখল করে যারা বলেন, আমরা জনগণের জন্য এই করেছি, সেই করেছি, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছি আর দেশের রাস্তাঘাট সোনা দিয়ে এই মুড়ে দিলাম বলে, তাঁরা কী বলবেন এসব ব্যাপারে? আর কিছু বললেই-বা কী! যা বলবেন, তার শতকরা দশভাগও তো সত্যিকথা হবে না। চলতি ভাষায় যাকে বলে ‘মিথ্যা আশ্বাস’, তা-ই।

চার
অল্প কয়েকদিন আগে বেসরকারি টেলিভিশনের খবরে দেখলাম, মিরসরাই দুর্ঘটনায় যে মালবাহী ট্রাকে গাদাগাদি করে ছাত্ররা উঠেছিল এবং যেটা রাস্তা থেকে পানিতে উল্টে পড়ায় এতজনের মৃত্যু হয়, সেই বাহনটি যিনি চালাচ্ছিলেন তিনি ধরা পড়েছেন। তিনি টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই সাংবাদিকদের বললেন, উল্টোদিক থেকে আসা আরেকটি যন্ত্রচালিত বাহনকে পথ পার হওয়ার জন্য জায়গা করে দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর ট্রাকটিকে রাস্তার বাম কিনারে নিয়ে যান। আর সে সময় তাঁর বাহনের সামনের বাম চাকার নিচের মাটি ধসে যায় এবং ট্রাকটি উল্টে পানিভর্তি খাদে পড়ে যায়। ট্রাকচালকের কথা সত্যি হলে অর্থ দাঁড়াবে এই যে, আলোচ্য রাস্তাটি যথেষ্ট প্রশস্ত নয়, আর রাস্তাটিও ভালো নয়; কারণ তার পাকা অংশের পাশে যে মাটির অংশ আছে তা দুর্বল অথবা ভাঙা। এসব অংশ খুলে খুলে পড়ে। মিরসরাই দুর্ঘটনার কারণ বের করতে একটি কমিটি হয়েছিল। ধৃত ট্রাকচালকের বিবৃতির পর সেই কমিটি দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর বক্তব্যের সত্যাসত্য যাচাই করতে পারেন। তাঁর কথা সঠিক প্রমাণিত হলে আমাদের দেশের সড়ক তৈরি ও মেরামতের বিষয়টির এমন কিছু দিক উন্মোচিত হবে, যা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ থাকবে।
পাঁচ
তবে এসব বিষয়ে কেউ চিন্তা করুক আর না করুক, কঠিন বাস্তবতা ইতোমধ্যেই প্রকাশ করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও ক্রিমিন্যাল নেগলিজেন্সের কথা। গত আড়াই বছর ধরে বর্তমান সরকার প্রতিনিয়ত শোনাচ্ছে এমন একেকটা প্রকল্পের কথা, যেগুলো করতে খরচ হবে কমপক্ষে হাজার কোটি টাকা। আবার প্রকল্প অনুমোদিত হতে না হতে এই ব্যয়ের হিসাব দাঁড়ায় কয়েক হাজার কোটি টাকায়। জনগণ এখন জানেন যে, এসব আসলে অবৈধ ঘুষ আর কমিশন-বাণিজ্য করার প্রকল্প। বিদ্যুত্ খাতে সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে নতুন বিদ্যুেকন্দ্র বসানোর কাজ ফেলে রেখে তড়িঘড়ি করে বিনাটেন্ডারে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রেন্টাল আর কুইক রেন্টাল ব্যবস্থায় বিদ্যুত্ উত্পাদক যন্ত্র আমদানি করা হয়েছে। এজন্য সরকারকে অর্থাত্ দেশবাসীকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে ওইসব ব্যবসায়ীদের। আর এ ব্যাপারে যাতে কেউ দুর্নীতি হয়েছে বলে তদন্ত দাবি করতে না পারে, সেজন্য ইনডেমনিটি আইন পাস করা হয়েছে। যোগাযোগ খাতেও দুর্নীতি চেপে বসেছে এবং কমিশন-বাণিজ্যই এখন শয়নে-স্বপনের ধ্যান হয়ে গেছে। জনসাধারণের মধ্যে এমন ধারণা ব্যাপকভাবে উপস্থিত। আর হবে না কেন?

দেশে যে মহাসড়ক আর সড়কগুলো তৈরি আছে, যেগুলো দিয়ে লাখ লাখ লোক যাতায়াত করতেন, সেগুলো ভালো অবস্থায় সংরক্ষণ ও নিয়মিত মেরামত করার কাজ হয়নি কেন গত আড়াই বছরে? এসব রাস্তার ভাঙা বা অন্য কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ যে মেরামত হচ্ছে না, দেশজুড়ে সড়কগুলোতে যে বড় বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে আর সেজন্য চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং লম্বা সময়ের জন্য যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, সেকথা আজ অন্তত বছরখানেক ধরে ভুক্তভোগীরা বলছিলেন। এই সমস্যা নিয়ে বহু মাস ধরে দিনের পর দিন সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি সরকারপন্থী পত্রিকা ও টেলিভিশনেও। অন্যগুলোতে তো বটেই। এখনকার সরকারি লোকজন আর তাঁদের তোষামোদকারী চটকদার নামধারী কথিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পণ্ডিত কর্তাব্যক্তিরা তো বাংলাদেশকে কখনও সিঙ্গাপুর আবার কখনও সুইজারল্যান্ডের মতো সমৃদ্ধিশালী বানানোর জাদু বিপণন করেছেন গত আড়াই বছর। কিন্তু সেই ‘মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার’ কথাটির মতো ‘হবি তো সিঙ্গাপুর, না হলে সুইজারল্যান্ড’ করার দেশটি থেকে যে তাঁদের স্নেহধন্য সরকারটি তৈরি রাস্তাঘাটও ধ্বংস ও গায়েব করে দিচ্ছে, কারোর চলাচলেরই যে ব্যবস্থা রাখছে না, দয়া করে সেই কথাটা তো মুখ খুলে বলেন না একবারও। কেন? যদি সরকারি কেউ তাঁদেরকে আমাদেরই মতো অসভ্য বলে বসে, সেই ভয়ে নাকি সদয় দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবেন সেই আতঙ্কে। আর সুশীল সমাজের যেসব সংগঠন সুশাসনের জন্য গড়ে প্রতি সপ্তাহে একটি করে সভা করেন, তাদের মুখেও তো জনদুর্ভোগ নিয়ে কোনো কথা শুনি না। তাঁরা সরকার, জাতীয় সংসদ, নির্বাচন কমিশন নিয়ে সদা ব্যস্ত কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান কাদের জন্য? এগুলো চলে কার পয়সায়? দয়া করে মাঝেসাঝে তাদের দুর্ভোগের কথাও না হয় সুনির্দিষ্ট করে বললেনই। আর সেটা শুধু জনগণের স্বার্থেই নয়, ওইসব সুশীল ঘরানার ভদ্রলোকদের জন্যও বটে। কারণ, আজ যদি রাস্তাঘাট ভাঙতে ভাঙতে চলাচলের ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে উচ্চফলনশীল ধানের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ পাম্প—এগুলো পরিবহনের খরচ আকাশ ছুঁবে। একই রকমভাবে দূরের মোকাম থেকে ঢাকায় চাল পরিবহনের খরচও বাড়বে। তখন এখানে চাল কিনতে হবে, হতে পারে এখনকার তিনগুণ দামে। তখন তাঁদেরও জীবনযাত্রার ব্যয় নিদারুণ কষ্টকর হিসেবেই দেখা দেবে। মোটকথা, বৃহত্তর জনস্বার্থে যখন কথা বলছেনই তখন জনগণের স্বার্থেই তাদের ‘ক্ষুদ্রতর’ স্বার্থের কিন্তু একেবারে অবিলম্বে প্রয়োজনের কথা বলুনই না।

ছয়
আমার এই সামান্য কথাগুলো যদি ফালতু বা প্রলাপ বলে মনে হয়, তাহলে অনুরোধ করবো বেসরকারি চ্যানেল এনটিভিতে এখন সড়ক দুর্ঘটনা ও ভাঙা রাস্তা নিয়ে যে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রচার হচ্ছে, সেটির শনিবার প্রদর্শিত অংশটি সংগ্রহ করে দেখে নিতে। ওই প্রতিবেদনে দেখা গেল ভাঙা রাস্তার দুর্ভোগ, খারাপ রাস্তার জন্য ভয়ঙ্করসব প্রাত্যহিক দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর খবর জেনেও দরিদ্র মানুষেরা ট্রাকে চড়ে লম্বা পথ পাড়ি দিচ্ছেন। প্রতিবেদক তাঁদের কাছে জানতে চান, এভাবে যাতায়াত করছেন কেন তাঁরা? তাঁদের উত্তর—যেখানে তাঁদের জন্য কাজ আছে অথবা যেখানে গিয়ে কাজ করতে হবে সেখানে পৌঁছাতে হবে তো! আর দুর্ঘটনা? সেটা কপালের ব্যাপার। ট্রাকচালককে প্রতিবেদক প্রশ্ন করেন, তিনি কেন মালবাহী যানে মানুষ পরিবহন করছেন। ট্রাকচালকের উত্তরের প্রথম কথা ছিল, ‘এই লোকগুলো (তাঁর বাহনের যাত্রীরা) কাজে যেতে না পারলে খাবে কী! তাহলে তো এঁরা বাঁচবে না, সেজন্য এঁদের নিই।’ উত্তরের দ্বিতীয় অংশ, এঁরা গরিব মানুষ, ট্রাকে তাঁরা যে ভাড়া নেন তা বাসের ভাড়ার চেয়ে অনেক কম। এই ভাড়াটা তাঁদের সাধ্যের মধ্যে। আমার কথা হলো, ট্রাকে যাতায়াতকারী এই মানুষগুলোই খাদ্য ফলায়, রাস্তা তৈরি করে, ইমারত বানিয়ে দেয়। সড়কগুলো ভালো থাকলে ধনীদের, মন্ত্রীদের ও অফিসারদের দামি গাড়িগুলো যেমন ভালো থাকবে, তেমনি সমাজের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় এই শ্রমিক মানুষরাও তুলনামূলকভাবে সহজে চলাচল করতে পারবেন। সরকারকে একথাগুলো বললে আপনার আমার সবারই স্বার্থরক্ষা হয়। আর কেন রাস্তা সহজেই ভাঙে সে বিষয়ে টিআইবি কী বলে? কিছু বললে হয় না?

সবশেষে বিখ্যাত চিত্রাভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের কাছে আবেদন, ‘আপনি নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন নিয়ে পথে পথে ঘুরে মানুষের নিরাপত্তা চাইছেন আপনার স্ত্রী ১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাবার পর ১৮ বছর ধরে। কোনো সরকার আপনার কথা শুনেছেন বলে মনে হয় না। এখন পরিবহন শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করবো আপনাকে। আপনি সরাসরি এঁদের বোঝানোর চেষ্টা করুন নিয়মকানুন মেনে চলতে এবং কেন সেটা তাদের স্বার্থেই যাবে।’ ওপরতলার লোকগুলো পাষাণ, স্বার্থপর বা ক্রিমিন্যাল হয়ে গেলে ওদিক থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ১৫/০৮/১১]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: