মারাত্মক বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত জনসেবা এবং হতাশা ও পুলিশের বর্বর আচরণের কারণে লন্ডনের বর্তমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে

বর্ণবাদ ও বৈষম্য লন্ডনের দাঙ্গার উৎস

 

বৃটেনে পুলিশের সঙ্গে প্রতিবাদী যুবকদের সংঘর্ষের পাশাপাশি দাঙ্গা, সহিংসতা ও লুটপাটও অব্যাহত রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পুলিশের গুলিতে মার্ক ডুগান নামে ২৯ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক নিহত হওয়ার প্রতিবাদে প্রথমে টটেনহাম অঞ্চলে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর অন্যান্য এলাকায়। বৃটিশ পুলিশ দাবি করেছে, একটি পুলিশ ফাঁড়ি বা চেক পোস্টের কাছে পুলিশের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করায় তার ওপর গুলি বর্ষণ করা হয়। কিন্তু টটেনহাম অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকরা বৃটিশ পুলিশের এই বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেছে, ডুগান বৃটিশ পুলিশের বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়েছে। হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ ওই পুলিশ ফাঁড়ি বা চেক পোস্টের সামনে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সেখানে প্রতিবাদীদের সাথে পুলিশের সবচেয়ে মারাত্মক সংঘর্ষ হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়ী ছাড়াও বেশ কয়েকটি বাস, কয়েকটি ভবন ও প্রাইভেট গাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ পর্যন্ত দাঙ্গা ও লুটপাটে জড়িত থাকার দায়ে অন্ততঃ চারশ’ জনকে আটক করা হয়েছে বলে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে।

বৃটিশ রাজনীতিবিদরা লন্ডনের নজিরবিহীন এ দাঙ্গা ও সহিংসতার ঘটনাকে সংগঠিত অপরাধ বললেও স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন- মারাত্মক বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত জনসেবা এবং হতাশা ও পুলিশের বর্বর আচরণের কারণে লন্ডনের বর্তমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। আসলে এতদিন ধরে যে ক্ষোভ ছাইচাপা আগুনের মত স্তিমিত ছিল তা একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে। বিশেষ করে সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থল টটেনহামের জনগণ বৃটেনের সবচেয়ে দারিদ্রপীড়িত ও বঞ্চিত এলাকা। এ অঞ্চলের জনগণই বৃটেনের অন্য যে কোনো অঞ্চলের বৃটিশ সরকার ও পুলিশের সবেচেয়ে বেশি বর্ণবৈষম্যের শিকার। বৃটিশ রাজনীতিবিদরা এসব জানেন বলেই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে এবং লন্ডনের মেয়র বোরিস জনসনের মত কর্মকর্তারা গ্রীষ্মকালীন ছুটি সংক্ষিপ্ত করে রাজধানীতে ফিরে এসেছেন। ক্যামেরন ইতালিতে গ্রীষ্মকালীন ছুটি উপভোগ করছিলেন।
লন্ডনের দর্শনীয় স্থানগুলোর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টটেনহামের প্রায় অর্ধেক জনগণই দরিদ্র। ১৯৮৫ সালেও এখানে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। ওই এলাকায় পুলিশের হামলার সময় একজন মহিলা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে সেবারের সেই বিদ্রোহ ও ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
বৃটেনের কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক ও সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিকদের সাথে দেশটির পুলিশের বর্ণবাদী আচরণ বহু বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। বৃটিশ পুলিশের মজ্জাগত এ ধরনের আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং পাশ্চাত্যের সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক বাস্তবতা বলে মেনে নিয়েছে। আর এ জন্যই বৃটিশ পুলিশের বর্বরতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে কোনো রিপোর্ট তারা প্রকাশ করে না। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বিশ্বের ছোটখাট কোনো দেশেও মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা যাদের দৃষ্টি এড়ায় না তারাই মুক্তি ও স্বাধীনতার দাবিদার দেশটির রাজধানীতেই মানবাধিকার লংঘনের এত বড় ঘটনাগুলো দেখতে পায় না!

বৃটেনের কৃষ্ণাঙ্গরা মূলতঃ মোহাজেরদের সন্তান বা মোহাজের। চামড়ার বিশেষ রং ও বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অভিবাসী এই নাগরিকরা শিক্ষা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্য অনেক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে এদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতাও বেশি। বৃটিশ সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দরিদ্র বা বঞ্চিত এই নাগরিকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে মাঝে মধ্যেই বিদ্রোহের আগুন তাদের মধ্যে প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে। বৃটিশ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক নিহত হওয়ার ঘটনা ক্ষোভের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিতে অগ্নুৎপাত শুরুর একটি উপলক্ষ্য মাত্র। সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এমন বৈষম্য এবং বঞ্চনা শুধু বৃটেনেই সীমিত নয়। প্রায় গোটা ইউরোপেই একই অবস্থা বিরাজ করছে।

লন্ডন দাঙ্গার মত দাঙ্গা ২০০৫ সালে ফ্রান্সের শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তিন সপ্তাহ ধরে চলা ওই বিদ্রোহে দশ হাজার গাড়ী ভস্মীভুত হয় এবং অগ্নিদগ্ধ হয়েছে অনেক বাজার ও ভবন। প্যারিসের উপকণ্ঠে ফরাসি পুলিশের হাতে দুই কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনাই ছিল ওই বিদ্রোহের উপলক্ষ্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ফ্রান্স পুনর্গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও মুসলিম ও কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী এবং তাদের সন্তানরা ফ্রান্সে চরম বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। মূল শহরগুলোতে তাদের থাকতে দেয়া হয়নি, বরং তাদের রাখা হয়েছে শহরতলীতে বা শহরের উপকণ্ঠে। এভাবে মূল ফরাসি সমাজ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। মোহাজিরদের সন্তানরা জন্ম থেকেই দেখছে বৈষম্য ও দারিদ্র। প্যারিসের উপকণ্ঠে ও ফ্রান্সের অন্য কয়েকটি বড় শহরে অভিবাসীদের একই পরিবারের কয়েক প্রজন্ম একটি ছোট্র এপার্টমেন্টে একের পর এক বসবাস করে আসছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্সে বিদেশী বংশদ্ভুত অভিবাসীদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতার হার বেশি এবং অনেক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে। আর এসব অপরাধ মোকাবেলার অজুহাতে ফরাসি সরকার মোহাজির ও তাদের বংশদ্ভুত নাগরিকদের বিরুদ্ধে কঠোরতম নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করেছে।

ফরাসি পুলিশের দৃষ্টিতে অভিবাসী বা মোহাজির ও তাদের বংশদ্ভুত সব ফরাসি নাগরিকই হয় অপরাধী অথবা সন্ত্রাসী যতক্ষণ না তারা সৎ বলে প্রমাণিত হচ্ছেন। ফরাসি সরকার ও পুলিশ বিভাগের এই নীতিতে উৎসাহ পেয়ে বর্ণবাদী গ্রুপগুলো প্রায়ই মোহাজির ও তাদের বংশদ্ভুত নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট দলটি অভিবাসী বা বিদেশী বিদ্বেষের নীতি গ্রহণ করা সত্ত্বেও দেশটিতে তাদের প্রভাব ব্যাপক মাত্রায় বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই দলটির নেতা ম্যারিন লোপেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের তালিকায় শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মত দেশগুলোতে অভিবাসী বা বিদেশী বিদ্বেষী দলগুলো সংসদে আসনের অধিকারী। এসবের মধ্যে কোনো কোনো দল জোট সরকারের শরিকও হয়েছে।

অভিবাসী বা মোহাজির ও তাদের বংশোদ্ভুত ইউরোপীয় নাগরিকদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি বর্ণবাদী আচরণও সহ্য করতে হচ্ছে। ইউরোপে উগ্র ডানপন্থা বা বর্ণবাদ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। বর্তমানে নরওয়ের মত শান্তির দ্বীপও উগ্র ডানপন্থার বিপদ থেকে মুক্ত নয়। ইউরোপের সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো গত এক দশকে তাদের সমাজকে উগ্রপন্থার দিকে টেনে নিতে সহায়তা করেছেন। এঞ্জেলা মার্কেল, সারকোজি ও ডেভিড ক্যামেরনের মত রাজনীতিবিদরা তাদের দেশে বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের এসব বক্তব্যে বর্ণবাদী ও উগ্র ডানপন্থীরা উৎসাহিত হয়েছে। এরা মনে করে অভিবাসীদের ইউরোপ ছাড়া উচিত অথবা নিজ ধর্ম, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ত্যাগ করা উচিত। বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটও বৃটেনসহ গোটা ইউরোপে উগ্র ডানপন্থা বা বর্ণবাদ বিস্তারে সহায়তা করছে। স্থানীয় বর্ণবাদীরা মনে করে অভিবাসীরা তাদের চাকরি হাতিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদের বেশির ভাগই খুবই কম বেতন ও সুবিধার বিনিময়ে চাকরি করেন এবং ওই বেতন ও সুবিধার শর্তে স্থানীয় ইউরোপীয়রা চাকরি করতে প্রস্তুত নয়।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: