১৫ আগস্টের বিদ্রোহীদের পরে সফল অভ্যুথান করেছিলেন দু’জন­ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ আর লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

সেনা অভ্যুথান কে করে আর দুর্নাম কার হয়

সিরাজুর রহমান

ছোটবেলা স্কুলে পড়ার সময় বাংলা ছায়াছবি দেখেছিলাম। ব্যর্থ প্রেমিক ইলেকট্রিক মিস্ত্রির দুই সহকারী নারী-চরিত্র বিশ্লেষণ করছিল। একজন অন্যকে বলছিল : ‘বুঝলি সালা (শালা, অমার্জিত ভাষায় বন্ধুদের মধ্যে সম্বোধন), মেয়েছেলে হলো গিয়ে ইলেকটিরি­ এসি কারেন্ট আর ডিসি কারেন্ট। দূরে গেলে কাছে টানে, আর কাছে এলে মারে সট্‌ (শট)।’

আওয়ামী লীগেরও হয়েছে সে অবস্খা। গত কিছু দিনে বিরোধী বিএনপিকে সংসদে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে প্রধানমন্ত্রী আর স্পিকার থেকে শুরু করে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফ প্রমুখ ছোট-বড় নেতার মুখে ফেনা উঠছে। পরমুহূর্তেই আবার তারা হুঙ্কার ছাড়েন, হরতাল করলে বিএনপিকে কী শিক্ষা দেবেন, সেটা নিয়ে গলাবাজি শুরু করেন।

মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতি নাকি দুর্বল, কিন্তু এত দুর্বল নিশ্চয়ই নয় যে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার কোনো কোনো মন্ত্রী যে ভাষায় বিরোধী দলের নেত্রী তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তার স্বামী স্বাধীনতার ঘোষক এবং মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তাদের পরিবারকে গালিগালাজ করেছেন, যেসব খিস্তিখেউড় তারা করেছেন, কোনো ভদ্রজন সেসব কথা মুখে আনতে চাইবেন না। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা জলজ্যান্ত অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জিয়াউর রহমান অভ্যুথান করে ক্ষমতায় আসেননি। এমনকি খোন্দকার মোশতাকও অভ্যুথান করেননি। ১৫ আগস্টের বিদ্রোহীদের পরে সফল অভ্যুথান করেছিলেন দু’জন­ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ আর লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তা ছাড়া ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের অনুপ্রেরণায় জেনারেল নাসিমও একটা ব্যর্থ সামরিক অভ্যুথান করেছিলেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ক্ষমতা গ্রহণও প্রকৃতপক্ষে একটা বর্ণচোরা সেনা অভ্যুথান ছিল। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনেরা আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল, আর ক্ষমতা পেলে সে চক্রের সব কাজকে তিনি বৈধতা দেবেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী এদের সমালোচনা করেন না, গালিগালাজ করেন জিয়াউর রহমান আর (মাঝে মাঝে) খোন্দকার মোশতাককে। আমার মনে হয়, কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হলে গোটা রহস্যটা উদঘাটিত হবে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সেনা অভ্যুথানে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর বিদ্রোহী অফিসারেরা আগামসি লেনের বাড়ি থেকে খোন্দকার মোশতাক আহমদকে শাহবাগের বেতার ভবনে আনে। মুজিবকে তো হত্যা করা হলো, কিন্তু পরের পরিস্খিতি সামাল দিতে বিদ্রোহীরা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল। তারা মুজিব সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার সময় থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী (শামসুল হক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আর খোন্দকার মোশতাক ও শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক) খোন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হাতে নিতে চাপ দিতে থাকে। ১৯৮৬ সালে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মোশতাক নিজের মুখে আমাকে বলেন, প্রথমে তিনি মোটেই রাষ্ট্রপতি হতে রাজি হননি। তারপর তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে সবগুলো সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের আনুগত্য না পেলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেবেন না।

আনুগত্যের শপথ : আওয়ামী লীগ সরকার
বিদ্রোহী অফিসারেরা কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এ এইচ খান, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খোন্দকার, বিডিআর প্রধান জেনারেল খলিলুর রহমান, পুলিশের আইজি এবং রক্ষীবাহিনীর উপপ্রধানকে (প্রধান কর্মকর্তা তখন দেশের বাইরে ছিলেন) বেতার ভবনে নিয়ে আসেন। তাদের সবার সম্মিলিত অনুরোধে এবং তারা সবাই তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়ার পরই বেতার ভবনে তিন ঘন্টা অবস্খানের পর খোন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছিলেন। খোন্দকার মোশতাকের এ সাক্ষাৎকারটি ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতার পনেরো বছর‘ নামে বিবিসির অনুষ্ঠানমালায় প্রচারিত হয়েছিল। একই নামের প্রকাশিত বইতেও এ সাক্ষাৎকারটি সঙ্কলিত হয়েছে।

খোন্দকার মোশতাকের এ সরকার সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য দেশের মানুষের জানা থাকা দরকার। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর, ড. মোজাফফর চৌধুরী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর প্রমুখ শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার আটজন আওয়ামী লীগ সদস্য সে সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী সে সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। সুতরাং কার্যত সে সরকারকে আওয়ামী লীগ সরকারই বলতে হবে। মোশতাক ৩ অক্টোবর রাতে বেতার ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, ৫০ দিনের মধ্যেই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২ নভেম্বর রাতে বঙ্গভবনে সে নির্বাচনের প্রস্তুতি করার লক্ষ্যে বৈঠক হয়। সে বৈঠকে উপস্খিত ছিলেন সংসদের স্পিকার (আওয়ামী লীগ দলীয়) আবদুল মালেক উকিল, ড. মোজাফফর চৌধুরী, মনোরঞ্জন ধর, জেনারেল ওসমানী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর প্রমুখ। বৈঠক চলে রাত ১টা পর্যন্ত। রাত আড়াইটার দিকে মোশতাক জানতে পারেন যে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ একটা অভ্যুথান করেছেন। ভোরে ক্যাপ্টেন নূর এসে খালেদ মোশাররফের চিঠি দেন রাষ্ট্রপতি মোশতাককে। চিঠিতে বলা হয়েছিল, মোশতাক রাষ্ট্রপতি থাকবেন, তবে তাকে কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে। না পড়েই মোশতাক সে চিঠি ক্যাপ্টেন নূরকে ফেরত দেন এবং বলেন যেকোনো শর্তেই তিনি আর রাষ্ট্রপতি থাকতে রাজি নন।

গৃহবন্দী জেনারেল জিয়া : সেনাবাহিনীতে গৃহযুদ্ধ
তার আগেই, রাত ২টার দিকে (২ নভেম্বর দিবাগত) খালেদ মোশাররফের অনুসারীরা এসে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে। তারা বাড়ির ফটক বন্ধ করে দেয় এবং বাড়িতে সামরিক পাহারা বসায়। সাত নভেম্বর রাত প্রায় বারোটা পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। মাঝে একবার খালেদ মোশাররফ এসে তার সাথে দেখা করে যান। সাত নভেম্বর রাত বারোটার দিকে একদল সিপাহি এসে ফটক ভেঙে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। তারা তাকে কাঁধে তুলে সেনাসদর দফতরে নিয়ে যায়। পরে জানা গিয়েছিল, সিপাহিদের সে গোষ্ঠী কর্নেল তাহেরের প্রভাবাধীন ছিল। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে সেনা অভ্যুথান জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘটাননি, ঘটিয়েছিলেন খালেদ মোশাররফ। সামরিক পাহারায় গৃহবন্দী অবস্খায় সেনা অভ্যুথান ঘটানো জিয়ার পক্ষে কী করে সম্ভব হলো, একমাত্র শেখ হাসিনাই সেটা বলতে পারবেন।

মাঝের কয় দিনে বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যা ঘটেছে তাতে নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিলোপ পেতে বসেছিল। খালেদ মোশাররফ ভারতপন্থী বলে জানাজানি হয়ে যায়। সাধারণ সৈনিকেরা তার শাসন মেনে নিতে অস্বীকার করে। তারা খালেদ মোশাররফের অনুসারী অফিসারদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। ক্যান্টনমেন্টের ভেতর উভয় পক্ষে ব্যাপক গোলাগুলি চলে, বহু অফিসার ও সৈনিক মারা যান। ফেব্রুয়ারি মাসে (১৯৭৬) জনৈক অফিসারের বাড়ির দেয়ালে অজস্র গোলাগুলির গর্ত আমি নিজের চোখে দেখেছি। গোলাগুলির শব্দের একটা বিবরণ আমাকে দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৩ সালের ১৫ নভেম্বর। (বাংলাদেশ স্বাধীনতার পনেরো বছর দ্রষ্টব্য)। বিরোধিতার মুখে খালেদ মোশাররফের সমর্থকরা টিকতে পারেননি। খালেদ মোশাররফ ৭ নভেম্বর ভারতের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাধারণ সিপাহিরা গুলি করে তাকে হত্যা করে। উল্লেখ্য, ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুথানের সংবাদে নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে (পররাষ্ট্র দফতরে) উল্লাস দেখা দিয়েছিল এবং মিষ্টি বিতরণ করা হচ্ছিল বলে খবর আমরা লন্ডনেও পেয়েছিলাম।

নীতির দিক থেকে খোন্দকার মোশতাক আহমদ আর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সামঞ্জস্য এখানে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। তারা উভয়েই ছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী। খোন্দকার মোশতাক ১৯৭১ সালে নির্বাসিত বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু দিল্লির সাথে তার মতবিরোধ দেখা দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। উভয় দেশের চাপে অক্টোবর মাসে মোশতাকের স্খলে আবদুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়, মোশতাককে দেয়া হয় বাণিজ্য দফতর। (বিস্তারিত লেখকের এক জীবন এক ইতিহাস বইতে)। মোশতাক যত দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তত দিন নয়াদিল্লি বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতা দান থেকে বিরত থাকে।

ভারতের জিয়া বিরোধিতা
জিয়াউর রহমান সম্পর্কেও দিল্লির মনোভাব ছিল একই রকম। দিল্লি জিয়াকে ভারতের স্বার্থের অনুকূল বিবেচনা করেনি। খালেদ মোশাররফের অভ্যুথানের ব্যর্থতায় সাউথ ব্লক নিশ্চয়ই হতাশ হয়েছিল। বিশেষ করে জিয়াউর রহমান যখন সার্ক (দক্ষিণ এশিয়া উন্নয়ন সহযোগিতা সমিতি) গঠনের উদ্যোগ নেন তখন বহু সরকার-সমর্থক ভারতীয় ভাষ্যকার লিখেছিলেন যে জিয়াউর রহমান ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভারতের বিরুদ্ধশক্তি হিসেবে সংগঠিত করতে চান। খাল ও নদী খননসহ বহু উন্নয়নমূলক কাজ, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ইত্যাদির ফলে স্বদেশে রাষ্ট্রপতি জিয়ার জনপ্রিয়তা যত বাড়তে থাকে, পাশের দেশে উদ্বেগও ততই বেড়ে যাচ্ছিল।

বাংলাদেশের বহু মানুষের উক্ত এবং প্রায় সকলের অনুক্ত একটা সন্দেহ ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যা এবং পরের বছর জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুথানসংক্রান্ত ষড়যন্ত্রে কারা সংশ্লিষ্ট থাকতে পারেন সে সম্পর্কে। বিশেষ করে মাথার পেছন দিকে মাত্র একটি গুলি করে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের হত্যা থেকে সন্দেহ জোরালো হয়ে উঠেছে যে, কাজটি করা হয়েছিল জিয়া হত্যার প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে। জিয়া ও মঞ্জুরের হত্যা সম্পর্কে কোনো তদন্ত হয়নি এবং তদন্ত যাতে হতে না পারে সে জন্য বহু সুপরিকল্পিত চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কতগুলো লক্ষণ স্পষ্ট। শেখ হাসিনা এখন ‘অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের‘ সমালোচনায় পঞ্চমুখ। কিন্তু ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুথানকে তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন, হাসিনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্র নয় বছর টিকে থাকতে পারত না। একটু লক্ষ করলে এখনো এরশাদ আর হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চোখে পড়বে।

নব্বইয়ের আন্দোলন, আজকের আন্দোলন
বিএনপি ও বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সংসদে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের পীড়াপীড়ির কারণ বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। খালেদা জিয়া এরশাদের পতন ঘটানোর জন্য আন্দোলন যখন জোরদার করেন বর্তমানের পরিস্খিতি অনেকটা সে রকম। সরকারের এখন টালমাটাল অবস্খা। সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে ক্ষমতা চিরস্খায়ী করার আয়োজন তারা অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছেন। বস্তুত বর্তমান সরকারের এখন মধ্যমেয়াদ। এত দিন দেশবাসীর সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টার পরিবর্তে তারা ‘আখের গুছাতেই’ ব্যস্ত ছিলেন। এখন তারা চোখে অন্ধকার দেখছেন।

আখের গোছানোর চেষ্টার কিছু আলামত টেন্ডার সন্ত্রাস, ভর্তিবাণিজ্য ইত্যাদি বাবদ সরকারের ‘পেশিশক্তি’কে প্রচুর সম্পদদান, বিনা টেন্ডারে হাজার হাজার কোটি টাকার কনট্রাক্ট দিয়ে একটি গোষ্ঠীকে টাকার পাহাড় গড়ার সুযোগদান এবং শেয়ারবাজারে ৩৫ লাখ বিনিয়োগকারীর সর্বস্ব লুট করার সুযোগদান একটি শক্তিশালী মহলকে। উল্লেখ্য, লগি-লাঠি-বৈঠাধারীদেরও ভাড়া করে আনা হয়েছিল কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে। ‘রাজনৈতিক উপায়ে‘ হরতালের মোকাবেলা করার হুমকিরও রহস্য এখানে। কিন্তু খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্রকামী জনতা এখন আবার ১৯৯০ সালের মতোই অস্খির হয়ে উঠেছে। সরকারের সর্বাত্মক নির্যাতন-নিপীড়ন সত্ত্বেও ৫ জুনের হরতাল আর গত রোববার ও সোমবারের ৩৬ ঘন্টা হরতালের স্বত:স্ফূর্ত সাফল্যের মধ্যে তারা ১৯৯০ সালের নভেম্বরের শেষার্ধের ছবি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। বস্তুত নব্বই সালের শেষের দিকে লে. জে. এরশাদ যেমন হিংস্রতা চালিয়েছিলেন গণতন্ত্রের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সরকারও সে রকমই হিংস্র হয়ে উঠেছে বর্তমান সময়ে।

সরকার চায় কোনো মতে বিএনপিকে সংসদে টেনে এনে ফাঁদে ফেলতে। যে আলোচনা-আলোচনা খেলা তারা খেলতে চায় তার উদ্দেশ্য : হয় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই নির্বাচনে রাজি হোক, নইলে বিচারপতি খায়রুল হককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে রাজি হোক বিএনপি। তারা এক দিকে বলছে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর আর তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি চালু রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু সেটা অবশ্যই মিথ্যা কথা। কেননা, সুপ্রিম কোর্ট দেশের বর্তমান সাংঘর্ষিক পরিস্খিতি বিবেচনা করে এ কথাও বলেছেন যে পরবর্তী দু’টি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়াই ভালো হবে।

বিচারপতির দশ লাখ টাকার অর্থযোগ
বিচারপতি খায়রুল হক যেভাবে বর্তমান সরকারের মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন রায় দিয়েছেন গোটা বিশ্ব তাতে ভ্রূকুটি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে তার ১০ লাখ টাকা গ্রহণ থেকে সব রহস্য স্পষ্ট হয়ে গেছে। নৈতিক দিক থেকে এর পরে সরকারের কর্তব্য হওয়া উচিত বিচারপতি খায়রুল হক এ যাবৎ যত রায় দিয়েছেন (মুন সিনেমা থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল পর্যন্ত) সেসব রায় পুনর্বিবেচনার ব্যবস্খা করা। তার অধীনে কোনো নির্বাচন কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সেটা আওয়ামী লীগ নেতারাও সম্ভবত জানেন। কিন্তু তারা বেপরোয়া ও মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর শেষ ধাক্কা কোনো মতে ঠেকিয়ে রাখতে। তারা আশা করছেন, তাদের নির্যাতন, গ্রেফতার, অবৈধ ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয়ে এবং মাঝে মাঝে হরতালের একঘেয়েমিতে সাধারণ মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়বে এবং ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য (প্রয়োজনবোধে বাকশালী পদ্ধতিতে হলেও) কিছু সময় তারা হাতে পাবেন। আওয়ামী লীগের এ ফাঁদে পা দিলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামীরা মারাত্মক ভুল করবেন।

সংবিধান নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যেসব অপকর্ম করছে তার থেকে গণতন্ত্রকামীদের সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বজায় রাখতে রাজি হয়েছিলেন। কয়েক দিনের মাথায় ডিগবাজি খেয়েছেন তিনি। ঘোষণা করা হয়েছিল, সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু প্রায়ই সে বিষয় নিয়ে উল্টোপাল্টা কথা শোনা যাচ্ছে। সেক্টর কমান্ডার ফোরামের জেনারেল সফিউল্লাহ (যিনি পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্ট রাতে শেখ মুজিবকে পালিয়ে যেতে বলেছিলেন) বলছেন যে সংবিধানে বিসমিল্লাহ আর ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম রাখা হলে ‘বঙ্গবন্ধুর প্রতি বেইমানি’ করা হবে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংখ্যালঘুদের রুখে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সাম্প্রতিক রণহুঙ্কার থেকে মনে হতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশ শাসন করছে সংখ্যালঘুরা এবং শেখ হাসিনা এখন আর বাংলাদেশের কার্যকর প্রধানমন্ত্রী নন।

ওদের সময় দিলে বাংলাদেশ কী হারাবে
বিএনপি, সমমনা দলগুলো এবং সাধারণভাবেই বাংলাদেশের মানুষকে এখন মাত্র একটা লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে। সেটা হচ্ছে অবিলম্বে বর্তমান স্বৈরতন্ত্রী ও নির্যাতক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করা। তাদের মনে রাখতে হবে এ সরকার যদি আরো কিছুকাল গদিতে থাকার সুযোগ পায় তাহলে নির্বাচন আদৌ হবে না, হলেও সে নির্বাচন হবে অর্থহীন। তারা আরো কিছু দিন সময় পেলে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিল হবে, সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ পড়বে, বাদ পড়বে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্খা ও বিশ্বাস, অভিন্ন নদীগুলোর পানি থেকে বাংলাদেশ চিরতরে বঞ্চিত হবে এবং বাকশালী কিংবা অনুরূপ কোনো পন্থায় আওয়ামী লীগ চিরস্খায়ীভাবে গদি আঁকড়ে থাকার ব্যবস্খা করবে। বাংলাদেশে প্রকল্প বাবদ এখন যে অর্থ বরাদ্দ হয় তার ৪০ শতাংশও সে প্রকল্পে ব্যয়িত হয় না। বাকি অর্থে সরকারের পৃষ্ঠপোষকদের পেট মোটা হচ্ছে। এ সরকার আরো কিছুদিন সময় পেলে এ প্রক্রিয়া জোরদার হবে। শেয়ারবাজার থেকে আরো বেশি অর্থ চলে যাবে লগি-লাঠি-বৈঠার জোগানদারদের পকেটে।

বিগত প্রায় আড়াই বছরে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের সড়ক, রেলপথ, নদীর পানি ও নদীপথ এবং সামরিক গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো বলতে গেলে ভারতকে দান করেছে। এসব বাবদ বাংলাদেশ কোনো আর্থিক সুবিধা পাবে কি না সে সম্পর্কেও সরকার পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা বলছে, ক্রমান্বয়ে ও সুপরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে চলেছে। আরো আড়াই বছর যদি তারা গদিতে থাকে তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাও ভারতকে দান করবে না কে বলতে পারে?
serajurrahman@btinternet.com

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: