কথা চোর নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের মৃত্যু

মিডিয়ার কিছু খবর ও ফোন হ্যাকিং কেলেংকারি

বৃটেনে নিউজ কর্পোরেশন কোম্পানির কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের ফোন হ্যাকিংয়ের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় সংবাদ মাধ্যম জগতের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে খ্যাত রূপার্ট মার্ডকের পেশাগত সততা ও নৈতিক বিশ্বস্ততা বিপর্যস্ত হয়েছে। মিডিয়া মোগল মার্ডক তার মিডিয়া সাম্রাজ্যের জোরে অনেক দেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
মার্ডক অস্ট্রেলিয়ায় একটি ছোট দৈনিক পত্রিকার মালিক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এরপর তিনি দেউলিয়া হয়ে পড়া কয়েকটি ছোট সংবাদপত্র কিনে বিভিন্ন পন্থায় সেগুলোকে লাভজনক করে তুলেন। পরবর্তীতে বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে আরো অনেক সংবাদ ও গণমাধ্যমের মালিক হন মার্ডক। তার মালিকানাধীন সংবাদ ও গণমাধ্যমগুলো জনমত গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখছে। অনেকগুলো রেডিও, টেলিভিশন, ম্যাগাজিন ও সংবাদপত্রের ক্ষমতাধর মালিক মার্ডক একজন জায়োনিস্ট বা ইহুদিবাদী। তিনি ১৯৮০ সালে নিউজ কর্পোরেশন নামে একটি গণমাধ্যম কোম্পানি গঠন করেন।

বহুল প্রচারিত অনেক সংবাদপত্র, বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় টেলিভিশন ও কয়েকটি ফিল্ম নির্মাতা কোম্পানি কিনে নেয় নিউজ কর্পোরেশন। ২০১০ সালে এই কোম্পানির আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩০০ কোটি ইউরো। স্কাই উপগ্রহ নেটওয়ার্কের শতকরা ৩৯ ভাগ শেয়ারও কিনেছে নিউজ কর্পোরেশন। কিন্তু স্কাই নেটের বাদবাকি শেয়ার কেনার প্রস্তুতি নেয়ার সময় নিউজ কর্পোরেশনের আওতাধীন নিউজ অব দ্যা ওয়ার্ল্ড পত্রিকাটির ফোন হ্যাকিং কেলেংকারি ফাঁস হওয়ায় মার্ডকের ওই ইচ্ছা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে । সাপ্তাহিক এ পত্রিকাটির সাংবাদিকরা কয়েক হাজার ব্যক্তির টেলিফোনে অবৈধভাবে আঁড়ি পেতেছিলেন। এ ঘটনার কলংকে বন্ধ হয়েছে ১৬৮ বছরের পুরনো এ পত্রিকা। আঁড়ি পাতার ঘটনা ফাঁসকারী ওই পত্রিকার একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন নিজ বাসভবনে। বৃটেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে মার্ডকের সমর্থক ও বিপক্ষের শক্তিগুলো পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে বৃটিশ পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর অযোগ্যতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পত্রিকাগুলোর সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছে এসব বাহিনী।

হ্যাকিং কেলেংকারি ফাঁস হওয়া বৃটেনের গোটা মিডিয়া জগতের প্রতি জনগণের আস্থায় ধ্বস নেমেছে। বৃটিশ মিডিয়াগুলোর প্রচারণার জোয়ারে গত কয়েক দিন আগেও জনমত প্রভাবিত হত গভীরভাবে। এমনকি বৃটিশ প্রচার মাধ্যমের প্রতি আস্থার কারণেই ইরাক ও আফগানিস্তানে আগ্রাসন আর দখলদারিত্বের মত অবৈধ কাজগুলোকেও বৃটিশ জনগণ গ্রহণযোগ্য মনে করেছিল। বৃটিশ জনগণ এখন মনে করে, তাদের সরকার এমন এক ব্যক্তির অশেষ অর্থ লালসার হাতে বন্দি যে তার ওই ক্ষুধা মেটানোর জন্য যে কোনো অপরাধে জড়িত হতে দ্বিধা বোধ করে না। মার্ডকের মিডিয়া সাম্রাজ্যের পত্রিকাগুলো বুশের যুদ্ধকামী নীতিকে সব সময়ই সমর্থন করেছে। মার্ডক নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ” বিশ্ব আমাদেরকে ভালবাসবে-এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, বিশ্ব আমাদেরকে সমীহ করবে।” যুদ্ধের সমর্থক এই জায়োনিস্ট ইহুদি এখন নিজেই এমন এক যুদ্ধে আটকা পড়েছেন যে এ যুদ্ধের পর কি ঘটবে তা স্পষ্ট নয়। মার্ডক আইনের কাছে নতজানু হবেন, না পর্দার আড়ালের লবির মাধ্যমে এবারও সত্যকে বলির পাঠা করবেন-সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এবারে মিডিয়া সংক্রান্ত কয়েকটি খবর। গত কয়েকদিন আগে সাংবাদিকদের ওপর দমন নীতির প্রতিবাদে জর্দানের রাজধানী আম্মানে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে। ওই প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়েছে দেশটির জাতীয় কিছু গ্রুপ ও যুব সংগঠন। তারা সাংবাদিকদের মারধোরের ঘটনাকে সন্ত্রাস ও অগ্রহণযোগ্য কাজ বলে উল্লেখ করেছে। সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি এমন সমর্থন বা ভালবাসা নজিরবিহীন।
মিশরের সাম্প্রতিক গণবিপ্লবের পর দেশটির সংবাদমাধ্যম খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। স্বৈরাচারি একনায়ক হোসনি মোবারকের পতনের পর মিশরে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা শতকরা ত্রিশ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে মোট ১৬ টি নতুন টেলিভিশন চালু হয়েছে এবং এর ফলে রেডিও ও টেলিভিশনের নতুন নতুন স্টুডিও নির্মাণের কাজও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সম্প্রতি নরওয়ে এন্ডার্স বেহরিং ব্রিইভিক নামক এক উগ্র খৃস্টান মৌলবাদী যুবকের বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে। এ ঘটনার কয়েকদিন পর নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্টে লেখা হয়েছে, হামলাকারী যুক্তরাষ্ট্রের ব্লগারদের একটি ছোট গ্রুপের মাধ্যমে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। সে কয়েক বছর ধরে তাদের সাথে যোগাযোগ রেখেছিল। ব্রিইভিক ১৫০০ পৃষ্ঠার একটি নোট প্রকাশ করে। এই নোটের বেশির ভাগ জায়গা জুড়েই স্থান পেয়েছে ওই ব্লগারদের বক্তব্য। ব্রিইভিক ইংরেজি ভাষার ওই বক্তব্যগুলো ইন্টারনেটে প্রকাশ করে। এই রিপোর্টের প্রেক্ষাপটে চিন্তাবিদরা বিশ্বজুড়ে উগ্র ব্লগারদের বিস্তারের পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ব্লগার ও ওয়েব সাইটগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার করা না হলে নরওয়ের গণহত্যার মত ঘটনা আরো ঘটতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

শুধু কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা নয়, সরকারও ইন্টারনেট মাধ্যমের অপব্যবহার করতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি “কৌশলগত যোগাযোগে সামাজিক মাধ্যম” শীর্ষক একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। সোশাল নেটওয়ার্কগুলোতে যেসব কথপোকথন হয় সেগুলোর ওপর মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং এসব বিতর্কের স্থান বা উৎসগুলো চিহ্নিত করা এই পরিকল্পনার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে যেসব অঞ্চলে মার্কিন সেনা রয়েছে সেসব অঞ্চল গুরুত্ব পাবে। এসব অঞ্চলে মার্কিন বিরোধী মনোভাব কেমন তাও মনিটর করা হবে। এই কাজে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রথম পর্যায়ে ফেস বুক, ইউ টিউব, টুইটার প্রভৃতি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবে।

সম্প্রতি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় “বিড়াল ও সামরিক অভ্যুত্থান বা ক্যুদেতা” শীর্ষক একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেছে। ৫০’র দশকে ইরানের জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতা ও তেল শিল্প জাতীয়করণের নায়ক মোঃ মোসাদ্দেকের উত্থান এবং বৃটিশ ও মার্কিন সরকারের হস্তক্ষেপে তার সরকারের পতনকে এ গেমে তুলে ধরা হয়েছে। এ খেলায় বৃটিশ ও মার্কিন সরকারকে বিড়াল হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওই সামরিক অভ্যুত্থান ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ’র হস্তক্ষেপে প্রথম সফল ক্যুদেতা এবং এ জন্যই এ নিয়ে কম্পিউটার গেম তৈরি করা হয়েছে বলে এর নির্মাতা দাবি করেছেন!

অন্য দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের মত অপকীর্তির জন্য গর্ব করার মার্কিন সংস্কৃতির আরো নজির রয়েছে। ইরাকে বেসামরিক ও নিরপরাধ নাগরিকদের হত্যার সাথে জড়িত ব্ল্যাক ওয়াটার কোম্পানির ভাড়াটে সেনাদের অপকীর্তিকে জনমতের কাছে পবিত্র করার জন্য ব্ল্যাক ওয়াটার নামে একটি কম্পিউটার গেমও নির্মাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই গেমে ব্ল্যাক ওয়াটারের মাধ্যমে নিরপরাধ ইরাকিদের হত্যার সত্য ঘটনাকে কল্পিত ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা ইরাকিদের প্রতি অবমাননার শামিল। উল্লেখ্য, কেবল ২০০৭ সালেই ব্ল্যাক ওয়াটার ১৭ জন বেসামরিক ইরাকিকে হত্যা করেছিল। বিশ্বজুড়ে নিন্দিত ও ঘৃণিত ভাড়াটে সেনা কোম্পানি ব্ল্যাক ওয়াটারের অপরাধযজ্ঞগুলোকে এভাবে পবিত্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।

কথা চোর নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের মৃত্যু

পলাশ রহমান

ঠিক এই মুহূর্তে যদি একটি ‘ইথার জরিপ’ করা হয় তবে কি ফল বেরিয়ে আসবে তা সবার জানা। ফল আসবে গত দুই সপ্তাহে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে দুটি নাম। নাম দুটির একটি হলো ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। সদ্য গত হওয়া ব্রিটেনের সবচেয়ে বেশি কাটতির সাপ্তাহিক পত্রিকা এটি। পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা ছিল ৭০ লাখেরও বেশি। বর্তমানে বা অতীতে এর চেয়ে বেশি কাটতির কোনো সাপ্তাহিক পত্রিকা বিশ্ব বাজারে ছিল বলে আমার জানা নেই। গত ১০ জুলাই ১৬৮ বছর বয়সের এই পত্রিকাটির মৃত্যু হয়। বয়সের গণনায় ১৬৮ কম নয়। এই মৃত্যুটি ১৬৮ বছর বয়সের পত্রিকা না হয়ে যদি কোনো মানুষের মৃত্যু হতো তাহলে বলা যেত পরিণত মৃত্যু। শুধু পরিণত না। মানুষের গড় আয়ুর তুলনায় অনেক বেশি পরিণত। কিন্তু একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকার ক্ষেত্রে কি ‘পরিণত’ শব্দটি যায়? একটি সংবাদপত্রের জন্য ১৬৮ বছর বয়স কি খুব বেশি? প্রতিদিন সকালে আমরা যে সংবাদপত্রটি হাতে পাই বা এক মলাটে গোটা সপ্তাহ দেখি এর প্রতিটি সংখ্যা এক-একটি ইতিহাস। এক-একটি দিনের সাক্ষী। সপ্তাহের সাক্ষী। এভাবে কাল থেকে কালান্তরের সাক্ষী। যুগের সাক্ষী। এই সাক্ষী বা ইতিহাসের বয়স যদি হয় ১৬৮ বছর তা খুব বেশি কিছু নয়। ১০ জুলাই নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের মৃত্যকালে তার বয়সের সাক্ষী হিসাবে ১৬৮ পাতায় প্রকাশিত হয় এর শেষ সংখ্যা। প্রধান শিরোনাম করা হয় ‘ধন্যবাদ এবং বিদায়’।

দ্বিতীয় যে নামটি বেশি উচ্চারিত হয়েছে তিনি একজন মানুষ। বয়স ৮০ বছর। জন্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়ান এবং নাগরিক সূত্রে আমেরিকান। তিনি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিডিয়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ইংরেজি ভাষায় বিশ্ব মোড়ল মিডিয়াগুলোর এক বিরাট অংশের মালিক তিনি। তার মালিকানাধীন ‘নিউজ করপোরেশন’ থেকে প্রকাশিত হতো ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। আমেরিকার ‘ফক্স নিউজ নেটওয়ার্ক’ অস্ট্রেলিয়ার দৈনিক ‘টেলিগ্রাফ’ ব্রিটেনের ‘সান’ ‘টাইমস’ দ্য সানডে টাইমসসহ গোটা ইউরোপ আমেরিকাজুড়ে তার আছে এক বিশাল মিডিয়া সাম্রাজ্য। বিশ্বজুড়ে তার সা¤্রাজ্যে কাজ করেন ৫৩ হাজার সংবাদ কর্মী। এই মিডিয়া সাম্রাজ্যের প্রভাবে তিনি দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য শক্তিধর হয়ে উঠেন। বিশ্ব মোড়ল দেশগুলোর রাজনীতিতে তিনি হয়ে উঠেন অঘোষিত ‘গড ফাদার’। তার মালিকানাধীন মিডিয়াগুলো উন্নত বিশ্বের জনমতের উপর এত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে যে তিনি যে কোনো সময় এসব দেশের সরকারের মূল ধরে হেঁচকা টান দেয়ার মতো ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটেনের রাজনীতিতে শক্তিধর হিসাবে তিনটি পক্ষকে গণ্য করা হয়। এগুলো হচ্ছে লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি ও নিউজ করপোরেশনের সাপ্তাহিক প্রকাশনা ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। ব্রিটেনের রাজনীতিকরা সে দেশের সরকার গঠনে বা পতনে এই ব্যক্তিকে এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন যে তার কর্মকা- নিয়ে কেউ কখনো ঘাঁটার চেষ্টা করেননি। বরং সমীহ করে চলতেন। যেমন সমীহ করা হয় ব্রিটেনের রাজ পরিবারকে। তেমনি সমীহ করা হয় এই মিডিয়া রাজকে। যার নাম রুপার্ট মারডক।

কেন মরতে হলো?
সাধারণত পত্রিকা বন্ধ হয় দুটি কারণে। এর একটি হলো অর্থনৈতিক জোগান না থাকা এবং অপরটি হলো সরকারি রোষানল। সংবাদপত্র সরকারি রোষের শিকার হয়ে বন্ধ হয় বেশির ভাগ তৃতীয় বিশ্বের দেশে। এ দুটির কোনো কারণে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের মৃত্যু হয়নি। তার মৃত্যু হয়েছে চুরির দায় মাথায় নিয়ে। কাগজটির বিরুদ্ধে চুরির প্রমাণ মিলেছে। সে বছরের পর বছর ধরে মানুষের ‘কথা’ চুরি করেছে। রাজনীতিক ও সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী পর্যন্তÑ প্রায় সব শ্রেণীর মানুষ চুরির শিকার হয়েছে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের দ্বারা। বছরের পর বছর ধরে পত্রিকাটি মানুষের টেলিফোনে আড়িপেতে ‘কথা’ চুরি করেছে। সেই সব চুরি করা কথা ছাপার অক্ষরে তুলে ধরেছে পাঠকের সামনে। এভাবে পত্রিকারটির প্রতি সংখ্যায় ছাপা হয়েছে পিলে চমকানো সব খবর। যা চরমভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। অথচ নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড সেই কাজটিই করেছে বছরের পর বছর ধরে। মানুষের গোপনীয়তা চুরি করে একদিকে ‘মানবাধিকার’ থোড়ায় কেয়ার করেছে, অপরদিকে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার আদর্শের সঙ্গে চরম বেইমানি করেছে। সম্প্রতি পত্রিকাটির এ অনৈতিক খবরের প্রমাণ প্রকাশ হয়ে গেলে মারডকরা পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এ ভাবেই গত ১০ জুলাই মৃত্যু হয় ১৬৮ বছর বয়সের একটি সংবাদপত্রের। যার প্রধান শিরোনাম করা হয়েছিল ‘ধন্যবাদ এবং বিদায়’।

যেভাবে চোর ধরা পড়ল!
প্রবাদ আছে ‘চোরের শত দিন আর গৃহস্থের একদিন’। নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড শত শত দিন ধরে প্রায় ৪ হাজারেরও বেশি মানুষের ফোনে আড়িপেতে কথা চুরি করেছে। মানুষের গোপনীয়তা রক্ষার সকল অধিকার পদদলিত করে সেই কথা পাঠকের সামনে প্রকাশ করেছে। ২০০৭ সালে তাদের এই অনৈতিক কাজের কথা প্রথম প্রকাশ পায়। বোমাটি ফাটান নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের একজন সাবেক কর্মী সিন হোয়ার। তখন আড়িপাতার অভিযোগে দুইজন সংবাদ কর্মীর সাজাও হয়। নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের কয়েক জন প্রধান সাংবাদিক পদত্যাগ করেন। চুরির ঘটনার পূর্ণ তদন্তের দায়িত্ব বর্তায় ব্রিটেনের পুলিশ প্রশাসনের উপর। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সে তদন্ত আর আলোর মুখ দেখে না। ধামাচাপা পড়ে থাকে। গত জানুয়ারিতে ঘটনার তদন্ত কাজ নতুন করে শুরু হয়। এবার আর রক্ষা হয় না নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের। এক এক করে বেরিয়ে আসতে থাকে থলের বড় বড় বিড়াল। উল্লেখ্য, ব্রিটেনের ন্যাশনাল ইনফরমেশন কমিশন সংবাদপত্রের অনৈতিক কর্মকা-ের উপর ২০০৩ সালে ‘অপারেশন মোটরম্যান’ নামে একটি তদন্ত চালিয়েছিল। সেসময় ডেইলি মেল, সানডে পিপল ও ডেইলি মিররসহ ব্রিটেন মুল্লুকের প্রায় ৩১টি সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজের খোঁজ পাওয়া যায়। এদিকে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের ফোন হ্যাকের তথ্য ফাঁস করে দেয় সাংবাদিক সিন হোয়ারের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। হার্টফোর্ডশায়ারের বাড়ির উঠানে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ তার মৃত্যুর বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

থলের বিড়াল
নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের থলের বিড়ালের সংখ্যা কত তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, বিড়ালের সংখ্যা যাই হোক না কেন বিড়ালের সাইজ বিশাল বিশাল। যাকে বলে হুলো বিড়াল। ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারির অভিযোগ মাথায় নিয়ে পত্রিকাটির প্রধান নির্বাহী রেবেকা ব্রুকস পদত্যাগ করেন। এর পর লন্ডনের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ১২ ঘণ্টার এক দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পরে জামিনে মুক্তি দেয়। রেবেকার জামিন অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে। একই অপরাধে নিউজ করপোরেশনের মালিক রুপার্ট মারডক এবং তার ছেলে জেমস মারডককে সংসদীয় কমিটি জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওয়েস্টমিনিস্টারের ভেতরে এই জিজ্ঞাসাবাদের সময় রুপার্ট ও তার ছেলে জেমস সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রুপার্ট বলেন তিনি ফোন হ্যাকিং-এর সঙ্গে জড়িত নয়। তার সাংবাদিক কর্মীরা তাকে ফাঁসিয়েছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ কলে রুপার্টকে কঠিন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন ব্রিটিশ সাংসদরা। অপর দিকে মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রধান পল স্টিফেন ও সহকারী পুলিশ কমিশনার জন ইয়ার্ট পদত্যাগ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো তারা ঘটনাটির তদন্তে গড়িমসি করেছেন। নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ারও অভিযোগ উঠেছে ঐ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। বিরোধী দল লেবার পার্টি থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের দিকে আঙ্গুল তোলা হয়েছে। তারা দাবি করেছে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের অনৈতিক কাজের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহ থাকতে পারে। কারণ নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের একজন সাবেক সম্পাদক কুলসনকে ক্যামেরন তার শীর্ষ মিডিয়া উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দেন। এন্ডি কুলসনের বিরুদ্ধেও ফোনে আড়িপাতার অভিযোগ রয়েছে। রেবেকার আগে তিনিও একই ভাবে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। রাজনীতি এবং মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে মারডক বাহিনীর ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারির সঙ্গে আরো বড় বড় রাঘব-বোয়ালরা জড়িত থাকতে পারে। যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে।

রাজনৈতিক ও মিডিয়া সঙ্কট
কঠিন রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। বিরোধী শিবির থেকে সরাসরি তার দিকে আঙ্গুল তোলা হয়েছে। কারণ এন্ডি কুলসন নামের একজন শীর্ষ সাংবাদিককে ক্যামেরন তার প্রেস অফিসের প্রধান হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। কুলসন নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের একজন সাবেক সম্পাদক। তার বিরুদ্ধেও ফোনে আড়িপাতার অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হন। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বা কমন্সসভার এক বিশেষ অধিবেশনে সাংসদরা আড়িপাতা কেলেঙ্কারি বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তুমুল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন। বিরোধীদলীয় সাংসদ এবং সরকারদলীয় কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেন। এ সময় ক্যামেরন কমন্সসভায় দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, কুলসনকে নিয়োগ না করলেই ভালো হতো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ বিতর্কই তার জন্য সবচেয়ে বড় এবং কঠিন রাজনৈতিক সঙ্কট। এদিকে সদ্য বিলুপ্ত নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের ৭০ লাখ পাঠককে আকৃষ্ট করতে ব্রিটেনের অন্যান্য পত্রিকার মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। লন্ডনের গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ সংস্থা এন্ডার্স এ্যানালাইসিসের একজন পর্যবেক্ষক ডগলাস ম্যাককেন জানান, প্রতিযোগিতার দৌড়ে এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছে ‘সানডে’ পত্রিকা। এছাড়া মধ্যম মানের দৈনিক ‘মেইল’ আগে দুই লাখ কপি মুদ্রণ করা হতো। গত দুই সপ্তাহ থেকে এই পত্রিকা ৩০ লাখ কপি ছাপানো হচ্ছে। ডেইলি স্টার ছাপানো হয়েছে ২২ লাখ। সানডে এক্সপ্রেস, পিপল ও মিররও তাদের মুদ্রণ সংখ্যা বাড়িয়েছে। মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্রিটেনের সংবাদপত্র শিল্পে এক বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য কিছু কিছু পত্রিকার কাটতি বাড়লেও তা দীর্ঘ হবে না। আড়িপাতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক পাঠক সংবাদপত্রের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা ব্রিটেনের সংবাদপত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

সতর্কতা ও মতামত
নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের ফোনে কথা চুরি কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বড় বড় দেশগুলো নড়েচড়ে বসেছে। ইতোমধ্যেই তারা তাদের এ বিষয়ক আইন পর্যালোচনা করে দেখতে শুরু করেছে। আমেরিকাও তার দেশের জনপ্রিয় মিডিয়াগুলোর প্রতি গোয়েন্দা মনিটরিং বাড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়া তাদের সংসদে আলোচনা করে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার আইন আরো কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছে। সেদেশের মন্ত্রীরা মারডকের মালিকানাধীন সিডনির ডেইলি টেলিগ্রাফের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ায়ও মারডকের পত্রিকা মানুষের গোপনীয়তা চুরি করতে পারে। তারা পত্রিকাটির বিরুদ্ধে সরকার পতনের প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকারও অভিযোগ তুলেছেন।

ইউরোপের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মারডকের সংবাদপত্রের আড়িপাতা কেলেঙ্কারিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন। তারা শুধু সংবাদপত্রের কাটতি বৃদ্ধি বা পাঠক আকৃষ্ট করতে ফোনে আড়ি পাতার কথা মানতে নারাজ। তাদের মতে ইউরোপের মধ্যে ব্রিটেন একমাত্র ধনী দেশ যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে ব্রিটেন ইউরোপের চাইতে সবসময় আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করে চলে। বিশ্ব অর্থনীতিতে ইউরোর প্রভাবকে বাধাগ্রস্ত করতে পাউন্ড ও ডলার একাট্টা হয়ে কাজ করে। এসব কারণে আমেরিকা ব্রিটেনকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মারডককে ব্যবহার করেছে। তার পত্রিকার অস্বাভাবিক জনপ্রিয়তা অর্জন এবং জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য সব ধরনের অনৈতিক কাজকে গোপনে সমর্থন জুগিয়েছে আমেরিকা। আর ইংল্যান্ডের রাজনীতিকদের মধ্যে প্রায় ৩ যুগ ধরে মারডক ভীতি সৃষ্টি করে রেখেছে। এ কাজের সঙ্গে সৌদি রাজাদেরও যোগাযোগ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড বা নিউজ করপোরেশন
প্রায় বছর দুই আগে গ্লোবাল পিটিশন ও আমেরিকার ক্রনিকল পত্রিকায় ভারতীয় সাংবাদিক সুনীত পালের এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘হোয়েন দ্য মিডিয়া টার্নস ইনটু এভিল’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয় ঢাকার দুটি পত্রিকায় বিনিয়োগ করেছে আসাম রাজ্যের স্বাধীনতাকামী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম বা উলফা। তখন এ খবরে রাজনৈতিক এবং মিডিয়া পাড়ায় বেশ শোরগোল পড়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার বা প্রশাসনকে বিষয়টির তদন্তে গা করতে দেখা যায়নি। সুনীত পাল তার প্রতিবেদনের শুরুতে লিখেছিলেন, সাধারণত মিডিয়া জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। কোনো কোনো দুষ্টুচক্র একে জাতি ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করে। সামাজিক শান্তি, মানুষের অধিকার ও কল্যাণের পথে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসাবে ঢাকার ট্রান্সকম মিডিয়া গ্রুপকে দেখানো হয়। উল্লেখ্য, এই মিডিয়া গ্রুপে রয়েছে ডেইলি স্টার, দৈনিক প্রথম আলো, সাপ্তাহিক ২০০০, সাপ্তাহিক আনন্দধারা, আয়না ব্রডকার্স্টিং ও এবিসি রেডিও স্টেশন।

প্রতিবেদনে মূলত মালিকপক্ষ কিভাবে পত্রিকাকে ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করে এবং অনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে তা তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ওয়ান ইলেভেন’ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় মদদ প্রদান, মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টসহ এই মিডিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। এত কিছুর পরেও আমাদের সরকার এবং প্রশাসন অজানা কারণে এই মিডিয়া গ্রুপকে না ঘেঁটে যেন আপস করে চলতেই বেশি পছন্দ করে বলে মনে হয়।
palashrahman@yahoo.com

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: