পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন দ. এশিয়ায় দ্বিতীয়

মধ্য আয়ের দেশের পথে বাংলাদেশ :
 তারিক হোসেন খান

অবরোধ, হরতাল আর দুর্নীতির দেশে অনেকটা নীরবে ঘটে চলছে অর্থনৈতিক বিল্পব। বিশ্বের মাত্র ২৪টি রাষ্ট্রে এক দশকজুড়ে গড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ফিবছর খরা, বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় দারুণ পারঙ্গম এ দেশের অসীম সাহসী মানুষ এই বিপ্লবের কারিগর। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনীতিবিদরা হয়তো আমাদের কল্পনার স্বর্গ দিতে পারেননি; তবে নিশ্চিতভাবে তা সেনাশাসনের নরক থেকে মঙ্গলজনক ছিল। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হলেও গণতন্ত্রের কল্যাণে বিকোশিত হয়েছে বেসরকারি খাত। সাড়ে তিন কোটি টন শস্য ফলাচ্ছেন কৃষকরা। ব্যক্তি উদ্যোগে বিদেশ গেছেন প্রায় ৬০ লাখ বাঙালি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে তিন লাখ ৭৩ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও (এফডিআই) বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। সারা বিশ্বে এফডিআইর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় ধাপ এগিয়েছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন দ. এশিয়ায় দ্বিতীয়। এ সবই স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন দেখছে এক দশকের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে।
বাংলাদেশে গত দুই বছরে প্রায় এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ২৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে তিনটি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা অনেকাংশে কেটে যাবে। ২০১৫ সাল নাগাদ মহাজোট সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুণ করার রূপকল্প ঘোষণা করেছে। মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে এ রূপকল্প কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে অনেকেই আশা করছেন।, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৮৩ শতাংশ কম। আশার কথা, জনশক্তি রপ্তানি কমে গেলেও এখন পর্যন্ত রেমিটেন্সের ওপর তার তেমন প্রভাব পড়েনি। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রেমিটেন্স প্রবাহ ৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯ হাজার ৭৮৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে (২০১০-১১) জিডিপির আকার সাত লাখ ৮৭ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল চার লাখ ১৫ হাজার ৭২৮। পাঁচ বছরের ব্যবধানে জিডিপির আকার প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। যদিও ২০০৫-০৬ থেকে ২০০৮-০৯ টানা তিন অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমেছিল। এ সময়ের মধ্যে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের মেয়াদকালও ছিল। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, গেল দুই অর্থবছরে জিডিপির আকার বেড়েছে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।


মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে বাংলাদেশের প্রধান শক্তি তার জনগণ। ১৫ কোটি জনগণের দেশে রয়েছে বিশাল এক শ্রমবাজার। চীনের মতো এ শ্রমশক্তি কাজে লাগতে পারে অর্থনৈতিক উন্নয়নে। ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত ফরেন অ্যাফেয়ার্স জার্নাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রো-এশিয়া-ল্যাটিন আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে মূলত বিশাল শ্রমশক্তির কারণে। উপরন্তু বাংলাদেশের অবস্থান চীন-ভারত অর্থনৈতিক জোনে। এ অঞ্চলের বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার অনেক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিকাশমান পোশাক শিল্প মূলত বদলে দিয়েছে এ দেশের অর্থনীতি। বিশ্ব অর্থনীতিতে পাটের ফিরে আসা বাংলাদেশের জন্য আরেক সুসংবাদ।


তবে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে এখনো বাংলাদেশকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। অসংখ্য আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে লাল-সবুজের পতাকা খচিত বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ-ভোমরা আসলে জনশক্তি রপ্তানি। বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক মন্দায় দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি কমে গেছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের প্রধানতম খাত রেমিটেন্সে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সদ্য প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১১ মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জনশক্তি রপ্তানি কমেছে ৪.৮৩ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে রেমিটেন্স প্রবাহও বৃদ্ধি পেয়েছে ৪.৮৩ শতাংশ।
হরতাল-অবরোধ-রাজনৈতিক সংঘাত বিনষ্ট করে দিতে পারে বাংলাদেশের মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন। বাংলাদেশের এখন মাথাপিছু আয় ৮১৮ ইউএস ডলার। মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে দেশটিকে আরো প্রায় ২০০ ডলার মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে। বিষয়টি অর্থনীতির চলমান ধারায় খুবই সম্ভব। তবে রাজনৈতিক সংঘাত বিশেষত হরতাল সংস্কৃতি দেশের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্যে অবদান রেখেছে দেশের সেবা শিল্প ও কৃষি খাত। চলতি অর্থবছরে স্থির মূল্যে কৃষি খাতের অবদান ১৯.৯৫ শতাংশ। শিল্প খাতের অবদান ৩০.৩৩ শতাংশ। আর ৪৯.৭২ শতাংশ অবদান সেবা খাতের। পাঁচ বছর আগে ২০০৫-০৬ অর্থবছরের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ২১.৮৪ শতাংশ। এরও আগে ২০০০-০১ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ২৫.০৩ শতাংশ। অর্থাৎ ১০ বছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমেছে ৫.৩৫ শতাংশ। একইভাবে গত ১০ বছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান কমেছে ৪.১৩ শতাংশ। তবে এ সময়ে সেবা খাতের অংশগ্রহণ বেড়েছে .৯৫ শতাংশ।


গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপি বেড়েছে পাঁচ হাজার ৭০০ টাকা। গত চার বছরে মাথাপিছু জিডিপি চার হাজার টাকা করে বাড়লেও এ বছর ইতিমধ্যেই তা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের জিডিপিতে মাথাপিছু পরিমাণ ৭৫৫ ইউএস ডলার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৪৪৭ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এই পাঁচ বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু জিডিপি বেড়েছে ৩০৮ মার্কিন ডলার। এ সময়ে মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়েছে ২৫ হাজার ৭৩৭ টাকা। চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় ৮১৮ মার্কিন ডলার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ৪৭৬ ইউএস ডলার। পাঁচ বছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়েছে ৩৪২ ডলার ।


অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে, দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি কমার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে বেশ কয়েক মাস ধরে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় চলমান রাজনৈতিক সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে এর ব্যাপ্তির ফলে জনশক্তি রপ্তানির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এর ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরই বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করেছেন খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাঁর বাজেট বক্ততায় তিনি কোনো কূপমণ্ডুকতার আশ্রয় না নিয়ে এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।


অর্থনীতি সমীক্ষা অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই_এপ্রিল) তিন লাখ ৪২ হাজার জনশক্তি বিদেশ গমন করেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৮৩ শতাংশ কম। আশার কথা, জনশক্তি রপ্তানি কমে গেলেও এখন পর্যন্ত রেমিটেন্সের ওপর তার তেমন প্রভাব পড়েনি। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রেমিটেন্স প্রবাহ ৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯ হাজার ৭৮৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।


মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতিও। ফলে সার্বিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতি খিছুটা নাজুক অবস্থায় আছে। বিষয় দুটি মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে সরকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আন্তরিক বলেই মনে হচ্ছে।


সত্যিকার অর্থে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দাবস্থা কাটিয়ে ওঠার পর বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্য-মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিটেই রয়েছে। গত প্রায় এক বছর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০.৮০ শতাংশ থেকে ১৩.৮৭ শতাংশে রয়েছে। রপ্তানি আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও আমদানি ব্যয় বাড়ায় বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই_মার্চ মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪২.২০ শতাংশ। রপ্তানির তুলনায় আমদানি ভিত্তি বড় হওয়ার কারণে আমদানি-রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে।


আগামী অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি পুরোপুরি অর্জিত না হলেও সমস্যা নেই। কেননা এ ধরনের সাহসী স্বপ্ন বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে এগিয়ে দেবে মধ্য আয়ের দেশে। বাংলাদেশ মুছে ফেলবে তার দীর্ঘদিনের দারিদ্যের কলঙ্ক তিলক।
লেখক : প্রভাষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: