ভালো স্থাপত্যের পূর্বশর্ত এবং অবধারিত ফল হলো ভালো ‘ইন্টেরিয়র স্পেস’

আলো এবং দৃশ্য ব্যবহারে অন্দর সজ্জা

স্থপতি সুরাইয়া জাবীন ও স্থপতি মুসলিমা নাজনীন খন্দকার

আলো এবং দৃশ্য ব্যবহারে অন্দর সজ্জা স্থাপত্যকলায় ইন্টেরিয়র স্পেস একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যা ব্যক্তির মেধা, মনন ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে রাখে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা। দৈনন্দিন যাপিত জীবনের ইফিসিয়েন্সি বা দক্ষতাও অনেকাংশে নির্ভর করে ইন্টেরিয়র স্পেসের দক্ষতার ওপর। তাই যথাযথ ইন্টেরিয়র স্পেস পেতে ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কর্মকাণ্ডটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমাদের দেশে এখনো ব্যাপকভাবে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনকেই ইন্টেরিয়র ডিজাইন বলে সাধারণ মানুষ ভুল করছে।

ইন্টেরিয়র ডিজাইন হলো বাড়তি বা সংযোজিত জিনিসপত্র দিয়ে অস্থায়ীভাবে ইন্টেরিয়র স্পেসকে সজ্জিত করা। অপরদিকে ইন্টেরিয়র ডিজাইন হলো ইন্টেরিয়র স্পেসে কী কাজ করা হবে, কী কী ঘটনা ঘটবে, কারা থাকবে— কাজের ধরন আর মেজাজ বুঝে একটি ছাঁচ বা স্পেস সৃষ্টি করা, যাতে সেই কাম্য ঘটনাগুলো যথাযথ দক্ষতার সঙ্গে ঘটতে পারে। এমনকি ফাংশন বা কর্ম অনুযায়ী স্পেসে কাম্য ইমোশন বা মুড তৈরি করাটাও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেমন ধরা যাক, একটি বাচ্চার ডে-কেয়ার সেন্টারের ইনডোর প্লে-কেয়ারের ইন্টেরিয়র স্পেসটি এমন হওয়া উচিত যাতে বাচ্চারা প্রচণ্ডভাবে উত্ফুল্ল হয়। কখনোই নিজেদের বন্দি বা বদ্ধ মনে না করে। প্রচুর ছোটাছুটি করতে পারে। কোনো কোনাওয়ালা অংশ যাতে তৈরি না হয় যেখানে বাচ্চারা ব্যথা পেতে পারে বা পড়ে গেলেও যাতে ব্যথা না পায়। সর্বোপরি শিশুরা যেন কোনোভাবেই একঘেঁয়েমি বোধ না করে এবং অবশ্যই শিশুমনের বিকাশের জন্য অতি আবশ্যক প্রকৃতি সাহচর্য থেকে যেন কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতা বোধ তৈরি না হয়। এই যে দৃশ্যমান, কিছু অদৃশ্য। কিছু ধরা যায়, কিছু ধরা যায় না, মূলত ব্যবহারকারীর বস্তুগত, অবস্তুগত চাহিদা এবং চাহিদাগুলোর আঁকো ও অনুভূতিগুলো পূরণ করার উপযোগী একটি ইন্টেরিয়র স্পেস তৈরি করাই হলো ইন্টেরিয়র ডিজাইন। ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ক্ষেত্রে সাধারণত স্থপতিরা দুই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।

প্রথমত, যখন পুরো ভবনটি স্থপতি নিজেই ডিজাইন করছেন, তখন ইন্টেরিয়র স্পেস পেতে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ অনুযায়ী তিনি ভবনে শেপ, স্পেস ভলিউম তৈরি করেন। প্রয়োজনমতো অবস্থানে রেখে দেন পাঞ্চ বা জানালা।

অনেক ক্ষেত্রে রিনোভেশন কাজেও স্থপতি পুরনো ভবনটিতেই চালান ব্যাপক কাটাছেঁড়া তার কাঙ্ক্ষিত ইন্টেরিয়র স্পেসটি পেতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, উত্তরার আড়ংয়ের শোরুমটি এবং রিনোভেশনের উদাহরণ হিসেবে ধাম-৫-এর।

দ্বিতীয়ত, যখন একটি ভবনের স্পেসে এ কাজ করতে হয় এবং স্পেসটিতে আউটডোরের সঙ্গে সংযোগ বা কোনো কাটাছেঁড়া করে আলো আনার সুযোগ নেই, সেক্ষেত্রে কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফাংশন এবং মুড অনুসারে নির্বাচিত ম্যাটেরিয়াল, রং ও টেক্সচার দিয়ে সৃষ্টি করা হয় কাঙ্ক্ষিত ইন্টেরিয়র স্পেসটিকে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে রাইফেল স্কয়ারের ৪র্থ তলায় লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি শোরুমটি বা মেট্রো শপিংমলের ৪র্থ তলায় ওপেনটি বায়োস্কোপের শোরুমটি। প্রথমটিতে ব্যবহূত হয়েছে শ্বেত কিছুটা কুল স্কিমে, অপরদিকে প্রোডাক্ট লাইন এবং সার্ভিসের সঙ্গে মিল রেখে দ্বিতীয় শোরুমটি করা হয়েছে ‘ডার্ক’ এবং ‘ওয়ার্ম স্কিম’-এ।

ইন্টেরিয়র স্পেসে কাঙ্ক্ষিত ইম্প্যাক্ট পেতে যে বিষয়গুলো স্থপতিরা সবসময় মাথায় রাখেন তা হলো—
১. আলো
২. ভিউ বা দৃশ্যপট
৩. স্কেল এবং প্রপোরশন
৪. ফিলোসফি বা কনস্পেট

১. আলো
সূর্যের আলোকে নানাভাবে ইনডোরে ঢুকিয়ে ইন্টেরিয়র স্পেসে নানা ধরনের ইমপ্যাক্ট বা আবহ তৈরি করা স্থপতিদের একটি প্রিয় কাজ। প্রাচীন রোমান ‘প্যানথিয়ন’ মন্দির থেকে শুরু করে লুই কানের সংসদ ভবনেও দেখা যায় সেই যত্নশীল প্রচেষ্টা। সংসদ ভবনের মূল ‘অ্যাসেম্বলি হল’ বা হলের চারপাশে বৃত্তাকার সার্কুলেশন ধরে হাঁটলে যে কেউই আচ্ছন্ন ও মোহিত হবেন সূর্যের আলো নিয়ে খেলা করা এই ইন্টেরিয়র স্পেসটির ইম্প্যাক্টে।

২. ভিউ বা দৃশ্যপট
ইন্টেরিয়র স্পেসটিকে প্রাণবন্ত করতে স্পেসটিতে বসে ভেতরে এবং বাইরে কী দেখছি, কতটুকু দেখছি তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৩. স্কেল এবং প্রপোরশন
মূলত ইন্টেরিয়র স্পেসের ভলিউম এবং প্রপোরশনের ওপরই নির্ভর করে ব্যক্তি কতখানি ইন্টিমেট অনুভব করবে বা কতখানি বদ্ধ অনুভব করবে। আবার দেখা যায়, গির্জা ডিজাইনের ক্ষেত্রে ইন্টেরিয়র স্পেসে উচ্চতা বাড়িয়ে স্পেসে একটা স্পিরিচুয়াল অনুভূতি আনা হয়।

৪. ফিলোসফি বা কনসেপ্ট
ইন্টেরিয়র স্পেসটি ডিজাইনার তার কোনো আইডিয়া বা কনসেপ্টকে প্রকাশ করেন আলো, ভিউ বা টেক্সচার, স্পেসের ভলিউম ইত্যাদির মাধ্যমে। যেমন সংসদ ভবনের মূল হলের বাইরের যে বৃত্তাকার পথটি তার ইমপ্যাক্ট বা এক্সপেরিয়েন্সের মাধ্যমে লুই কান পুরান ঢাকার অলিগলি সরুপথ আর আরবান ফেব্রিকের একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট রিপ্রেজেন্টেশন করতে চেয়েছিলেন, যা কি না ৪০০ বছর ধরে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে উঠা ঢাকা শহরকেও রিপ্রেজেন্ট করে।

বাসগৃহের ইন্টেরিয়র ডিজাইন

বাসগৃহ যেহেতু একটি ছাঁচ বা সিস্টেম, যেখানে প্রতিনিয়ত ব্যক্তির ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ছাঁচ তৈরি হচ্ছে এবং জোগান দিচ্ছে ‘দক্ষতা’ ও ‘অনুপ্রেরণা’। তাই এর ইন্টেরিয়র স্পেস ব্যক্তির জীবনে অতীব তাত্পর্যপূর্ণ। আর তাই তো মফস্বল এবং শহরের বক্স বা ‘স্লট’ বেড়ে উঠার একজন মানুষের চিন্তা, চেতনা, দক্ষতা এমনকি মানবিকতায়ও দেখা যায় পার্থক্য।

বাসগৃহে যেখানে পরিবারের সবাই মিলিত হবে, সেই স্থানগুলোকে বিশেষ যত্ন নিয়ে উপরের বিষয়গুলোকে (আলো, ভিউ, প্রপোরশন ইত্যাদি) মাথায় রেখে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা উচিত, যাতে পরিবারের সবাইকে সে স্থানটি টেনে রাখতে পারে ও গল্প বা ইন্টরেকশনে অনুপ্রাণিত করে। ফাংশন আর ফার্নিচারগুলো এমনভাবে বিন্যাস হওয়া উচিত, যেন গল্প করতে করতেই সবাই মিলে বাড়ির কাজগুলো ভাগাভাগি করে সম্পাদন করতে পারে। আর এভাবেই ইন্টেরিয়র স্পেসটি পারিবারিক বন্ধনটিকে শক্ত ও উত্পাদনশীল করতে রাখতে পারে ভূমিকা।

মূলত স্থপতি ও সমাজ দুটি মিলে একটা সিস্টেম। তাই স্থপতির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থাপত্যের সমঝদারি ও কদর বাড়লেই আমাদের চারপাশে ভালো স্থাপত্যের সংখ্যা বাড়বে। আর ভালো স্থাপত্যের পূর্বশর্ত এবং অবধারিত ফল হলো ভালো ‘ইন্টেরিয়র স্পেস’। [বনিকবার্তা থেকে]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: