বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা কত? জাতিসংঘের হিসাবের চেয়ে ২ কোটি কম !

দেশের জনসংখ্যা জাতিসংঘের হিসাবের চেয়ে ২ কোটি কম

খান এ মামুন: দেশের জনসংখ্যা জাতিসংঘের হিসাবের চেয়ে ২ কোটি কম বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা কত তা নিয়ে সরকার ও জাতিসংঘের অনুমাননির্ভর তথ্য চালাচালির মুখে গতকাল প্রকাশিত হয়েছে পঞ্চম আদমশুমারির প্রাথমিক ফল। সর্বশেষ এই হিসাবে দেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার, যা গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত জাতিসংঘের হিসাবের চেয়ে দুই কোটি ২১ লাখ কম।

জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণ বিভাগের (ইউএনএফপিএ) গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশনে উল্লেখ ছিল বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৪ লাখ। জাতিসংঘের সেই প্র্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত বলেছিলেন, জাতিসংঘের কেরানীদের নিউইয়র্কের টেবিলে বসে তৈরি করা এ প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থমন্ত্রী সর্বশেষ সরকারি হিসাবের বরাত দিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যা বলেছিলেন ১৪ কোটি ৬০ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পঞ্চম আদমশুমারি পরিচালনা করে আর সহযোগিতা করে ইউএসএইড, ইইউ এবং ইউএনএফপিএ।

রাজধানীর শেরেবাংলানগরস্থ পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলনকক্ষে গতকাল পরিকল্পনামন্ত্রী একে খন্দকার পঞ্চম আদমশুমারির যে প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করেন তা সরকারের সেদিনের দাবির চেয়েও ২১ লাখ কম, যদিও এটা প্রাথমিক ফল। পঞ্চম আদমশুমারির প্রাথমিক ফলে দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষ সাত কোটি ১২ লাখ ৫৫ হাজার এবং নারী সাত কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এ আদমশুমারির চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হলে জনসংখ্যার এই আকার হয়তো বাড়তে পারে বলে এমন কথাও বলেছেন মন্ত্রী এবং শুমারি ব্যবস্থাপনায় জড়িত কর্মকর্তারা। চূড়ান্ত ফল চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে পাওয়া যাবে। প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, বিবিএস সচিব রীতি ইব্রাহীম, ইউএনএফপিএ প্রতিনিধি ইউকি সুচিরো। অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিবিএসের মহাপরিচালক শাহজাহান আলী মোল্লা।

উল্লেখ্য, আদমশুমারির তথ্য-উপাত্ত দেশের পরিকল্পনা প্রণয়ন, নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ, সরকারি চাকরিতে কোটা নির্ধারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম প্রণয়ন প্রভৃতি কাজে ব্যবহূত হয়; পাশাপাশি পরিকল্পনাবিদ, গবেষক ও বিভিন্ন ব্যবহারকারীদেরও এটা কাজে লাগে।

অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বলেন, ফতোয়াবাজদের দৌরাত্ম্য যেসব এলাকায় বেশি সেসব এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনেক বেশি। তিনি বলেন, আদমশুমারির প্রাথমিক ফলে কিছু ভুল থাকতেই পারে তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সব সমস্যা কেটে যাবে। তবে যদি ১০ শতাংশের বেশি ভুল হয় তাহলে এটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি জানান।

১০ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ: গত ১০ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ। ২০০১ সালে চতুর্থ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৪৩ লাখ আর বিগত ১০ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। ১৯৯১ সালের তৃতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৬৩ লাখ ১৫ হাজার। ১৯৮১ সালের দ্বিতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী আট কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার আর স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি ১৪ লাখ ৭৯ হাজার।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৪ শতাংশ: দেশে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক ৩৪ শতাংশ। ১০ বছর আগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল এক দশমিক ৫৮ শতাংশ। ১৯৯১ সালের তৃতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল দুই দশমিক এক শতাংশ। আর ১৯৮১ সালের দ্বিতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ হার ছিল দুই দশমিক ৩২ শতাংশ।

জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছে: বর্তমানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯৬৪ জন, ২০০১ সালে এটা ছিল ৮৩৪ জন। জেলাভিত্তিক হিসেবে জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকা জেলায়, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে আট হাজার ১১১ জন। পরের অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ। এখানকার প্রতি বর্গকিলোমিটারে চার হাজার ১৩৯ জন মানুষের বাস। অন্যদিকে বান্দরবান জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে কম, মাত্র ৮৬ জন।

কমেছে নারী-পুরুষের অনুপাত: পঞ্চম আদমশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী পুরুষ ও নারীর আনুপাতিক হার কমেছে পাঁচ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বর্তমানে ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ১০০ দশমিক তিন। ২০০১ সালের চতুর্থ আদমশুমারি অনুযায়ী ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ছিল ১০৬ দশমিক চার। আর ১৯৯১ সালের শুমারি অনুযায়ী ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষ ছিল ১০৬ দশমিক এক। বর্তমানে নারী-পুরুষের অনুপাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবধান ঢাকায়। আর নারী-পুরুষের অনুপাতের পার্থক্য নেই খুলনায়। চট্টগ্রামে পুরুষের সংখ্যা আনুপাতিক হারে অনেক কম। প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষ ৯৬ দশমিক আট জন।

আদমশুমারি সর্বশেষ ফল অনুযায়ী সিলেটে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। প্রায় দুই দশমিক এক শতাংশ হারে বাড়ছে সিলেটের জনসংখ্যা। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম বরিশালে। বরিশালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্য শতাংশ, যা বাংলাদেশের কোনো বিভাগের জন্য প্রথম ঘটনা। এর আগে ২০০১ সালে বরিশালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল দশমিক নয় শতাংশ। সিলেটের পরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক আট শতাংশ। খুলনায় তুলনামূলক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম, মাত্র দশমিক ছয় শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রামে এক দশমিক চার শতাংশ, রাজশাহীতে এক দশমিক এক শতাংশ, রংপুরে এক দশমিক দুই শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। বরিশাল বিভাগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্য হওয়ার বিষয়ে বিবিএস বলছে, ওই এলাকার জনগণের বয়সের কাঠামো, স্থানান্তরের ধরন, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা প্রভৃতি নির্দেশকের আলোকে আরও গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পার্শ্ববর্তী থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, শ্রীলংকার তুলনায় বেশি। থাইল্যান্ডে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দশমিক সাত শতাংশ। মিয়ানমার ও শ্রীলংকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই হার দশমিক নয় শতাংশ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল। অন্যদিকে ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ভারতে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক চার শতাংশ, মালয়েশিয়ায় এক দশমিক সাত শতাংশ, নেপালে এক দশমিক আট শতাংশ, পাকিস্তানে দুই দশমিক দুই শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জনসংখ্যা
আরও বাড়ার সম্ভাবনা
পঞ্চম আদমশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বাড়বে বলে ধারণা করছেন পঞ্চম আদমশুমারির প্রকল্প পরিচালক অসীম কুমার দে। তিনি বলেন, এর আগের সব চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জনসংখ্যার আকার বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে অসীম কুমার দে সাংবাদিকদের জানান, অতি দ্রুত প্রতিবেদন প্রস্তুত করার ফলে কিছু ডামি শিট বাদ পড়তে পারে। এজন্য এ রকম হয়। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন করার সময় এসব বাদ পড়া শিট খুঁজে বের করা হয়। বিবিএস বলছে, চতুর্থ আদমশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রাথমিক প্রতিবেদন থেকে বেড়েছিল চার দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ১৯৯১ সালের তৃতীয় আদমশুমারিতে বেড়েছিল চার দশমিক ৮৩ শতাংশ। তবে ১৯৮১ সালের দ্বিতীয় আদমশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জনসংখ্যা প্রাথমিক প্রতিবেদন থেকে তুলনামূলক কম বেড়েছিল। সেখানে প্রাথমিক প্রতিবেদন থেকে জনসংখ্যা বেড়েছিল তিন দশমিক ২০ শতাংশ। আর প্রথম আদমশুমারিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বেড়েছিল চার দশমিক ৮৮ শতাংশ।

ঢাকা বিভাগের জনসংখ্যা সাড়ে চার কোটি
ঢাকা বিভাগের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে চার কোটি ৬৭ লাখ ২৯ হাজার লোক বাস করে। ২০০১ সালে যা ছিল তিন কোটি ৯০ লাখ ৪৫ হাজার। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগের জনসংখ্যা সবচেয়ে কম। দক্ষিণাঞ্চলের এ জেলায় ৮১ লাখ ৪৭ হাজার লোক বাস করে। ঢাকার পরেই সবচেয়ে বেশি লোকবাস করে চট্টগ্রামে, দুই কোটি ৮০ লাখ ৭৯ হাজার। জনসংখ্যা বেশির দিক দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে রাজশাহী। এ বিভাগে প্রায় এক কোটি ৮৩ লাখ ২৯ হাজার লোক বাস করে। রংপুর ও খুলনায় প্রায় সমানসংখ্যক লোক বাস করে। খুলনা বিভাগের লোকসংখ্যা এক কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার এবং রংপুর বিভাগের লোকসংখ্যা এক কোটি ৫৬ লাখ ৬৫ হাজার। আর

সিলেটের মোট জনসংখ্যা ৯৮ লাখ ৭০ হাজার।
সিলেট বিভাগে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেশি
সিলেট বিভাগের পরিবারের সদস্যসংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে পরিবারের সদস্যসংখ্যা সবচেয়ে কম। সিলেট বিভাগে পরিবারের সদস্যসংখ্যা গড়ে পাঁচ দশমিক পাঁচজন। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এ বিভাগে পরিবারের সদস্যসংখ্যা গড়ে পাঁচজন। বরিশালে প্রতি পরিবারে গড়ে চার দশমিক চারজন, ঢাকায় চার দশমিক তিনজন, খুলনায় চার দশমিক দুইজন লোক বাস করে। প্রাথমিক ফলে বলা হয়, বর্তমানে দেশের মোট খানার (পরিবার) সংখ্যা তিন কোটি ২০ লাখ ৬৮ হাজার এবং প্রতি খানায় গড়ে চার দশমিক ৪০ জন সদস্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, পঞ্চম আদমশুমারি এ বছরের ১৫-১৯ মার্চ পরিচালিত হয়। এর আগে দেশে ১৯৭৪, ১৯৮১, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। [বনিকবার্তা থেকে]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: