কেন এই ঘটনা ঘটলো এর behind the story উদঘাটন করার চেয়ে জরুরি কাজ হবে, এই নৃশংসতার ভেতর দিয়ে আমরা কোন বাস্তবতাকে দেখতে পাই, তা উদঘাটন করা, সেই সত্যকে সামনে টেনে আনা।

রুমানা : এই নীরবতার শৃঙ্খল আমরা ভাঙবোই

অভিমত

সাদাফ নূর-এ ইসলাম ● বারবার ফিরে যাচ্ছি পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোতে। কেন্টাবেরির যাইলস লেন ধরে মাথা নিচু করে চোখের পানি আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে আমি মারলো বিল্ডিংয়ের দিকে যাচ্ছি। দেশে আমি রেখে এসেছি আমার সাড়ে চার বছরের ছেলেকে। ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ওর চেহারা আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না। আমি এখনো যেন ওই বেদনা অনুভব করতে পারি। রুমানা, তুমি আমাকে আবার ফিরিয়ে দিলে ওই দিনগুলোতে। যখনি পত্রিকার পাতায় পড়েছি, তুমি নয় মাস পর মেয়েকে দেখবার জন্য কানাডা থেকে ছুটে এসেছিলে, ততবারই আমি যেন তোমার মধ্যে আমাকে দেখতে পাই। তোমার আকুলতা আমার বুকে চিন চিনে ব্যথা ধরায়। অপরাধী করে। কিন্তু এই আকুলতা কি তোমার দীর্ঘদিনের সঙ্গী বুঝেছে? তুমি এখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে জানতে চাও, ‘মা, তুমি আজ কোন রঙের জামা পরেছো? তুমি মন ভরে, চোখ ভরে তোমার মেয়েকে দেখবার আগেই, তোমার ওপর নেমে এসেছে পুরুষের ধারালো খড়গ। কারণ তুমি আরো পড়তে চেয়েছ, তোমার দায়িত্ব শেষ করতে চেয়েছ। আর এই চাওয়া তোমার স্বামীর মনে ‘স্বামীত্ব’ হারাবার ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। তুমি কি ভেবেছিলে, নীরবে সয়ে যাওয়া নয় বছরের প্রতিদান তোমার স্বামী তোমাকে দেবে? সে তোমার স্বপ্নকে সত্যি হতে বাধা দেবে না? তুমি নিশ্চয় ভাবোনি, ‘তোমার এই সয়ে যাওয়া’ তোমার স্বামীকে ইতোমধ্যে আরো দানব করে তুলেছে। সে তোমাকে নীরবে সইবার প্রতিদান দিয়েছে – চোখ দুটো উপড়ে নিয়ে। রুমানা, তুমি আমাদের ক্ষমা করো, তোমার জন্য, কোনো নারীর জন্যই আমরা অসহিংস সমাজ তৈরি করতে পারিনি এখনো। আজ অনেকেই দোষী হিসেবে তোমার দিকে আঙুল তুলছে – কেন তুমি সয়েছো? কেন তুমি এতোটা বাড়তে দিলে? অথচ তারা ভুলে যায় আমরাই শিখিয়েছি তোমাকে এভাবে সইতে। আমরাই এই দানবকে ক্ষমতা দিয়েছি, বলেছি, তুমি পুরুষ, তুমি স্বামী। স্ত্রীকে, নারীকে দখলে রাখবার জন্য তোমার যা খুশি তুমি করতে পার। যা খুশি করার তার হাতিয়ারগুলোকে আমরাই শাণিয়েছি, পাহারা দিয়ে রেখেছি, যাতে সময় গড়িয়ে গেলেও হাতিয়ারগুলো অক্ষত থাকে। আজ তোমার অন্ধত্বের দায় আমাদের নিতেই হবে। এই দায় যে আমাদের, সে সত্যকে আর নানা কথায় আড়াল করা যাবে না। নইলে আমাদের কোনো নারীরই মুক্তি নেই।

দুই.

নির্যাতনের শ্রেণী চরিত্র আছে। নিদেনপক্ষে আমরা তাই মনে করি। সকালে ছুটা বুয়ার শরীরে স্বামীর নির্যাতনের চিহ্ন দেখে আমরা অাঁৎকে উঠি। অভিসম্পাত করি পুরুষালিপনাকে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীর জীবনের নির্যাতনগুলোকে প্রাইভেসির নাম দিয়ে আড়ালে রাখি। এটা শুধু প্রাইভেসির জন্যই নয়, বিয়ে সংসার নামের প্রতিষ্ঠানের ‘পবিত্রতা’ রক্ষার জন্যও এই নির্যাতনগুলো আমরা আড়াল করে রাখি। কেননা, ‘বস্তির মানুষ একটা ছেড়ে আরেকটা ধরে, শিক্ষিতরা তো তা করে না। মেয়েদের জীবনে বিয়ে একবারই হয়।’ তাই মধ্যবিত্ত নারীর জন্য দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় মনোগামিতার পতাকাকে বহন করবার। আর ‘টলারেন্স’ তো মেয়েরা বড় হতে হতে পরিবার থেকেই শেখে। কিন্তু কতোটা সইতে হবে? কতোটুকু সহ্য করলে সংসার টেকানো যায়? আর কতোটুকু মেনে নিলে আর তাকে নেগোসিয়েশন বলা যায় না, তা কি আমরা মেয়ে সন্তানকে শেখাই, নাকি শিখতে দেই? আজ এই সত্যকে মোকাবিলা আমাদের করতেই হবে।

রুমানা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিন্তু সে এই সমাজেরই একজন। তার ওপর ঘটে যাওয়া নৃশংসতাকে ‘আলাদা’ ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কেন এই ঘটনা ঘটলো এর behind the story উদঘাটন করার চেয়ে জরুরি কাজ হবে, এই নৃশংসতার ভেতর দিয়ে আমরা কোন বাস্তবতাকে দেখতে পাই, তা উদঘাটন করা, সেই সত্যকে সামনে টেনে আনা। এই সত্য হলো, পুরুষের সহিংসতা এমনি প্রবল তা রুমানা বা রহিমাকে একই চাকার তলে পিষ্ট করে। নারীর নিজ সত্তা, ইচ্ছা, মান, মর্যাদা, ইজ্জত সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। আর আমরা এর পরও নারীকে দোষ দিয়ে বলতে থাকি, ‘মনে হয় কোথাও একটা কিন্তু আছে।’ আমরা বলতে ভয় পাই যে আমাদের এই পরিবার কাঠামো, নারীর আত্মপরিচয় গড়তে বাধা দেয়, নারীর জন্য পরিবেশকে সহিংস করে তোলে, আর নিরন্তনভাবে নারীর জন্য কন্ট্রাডিকশন তৈরি করে – ‘ওকে বাড়তে দেব কিন্তু মাথা তুলে দাঁড়াতে দেব না।’

কিন্তু নারী মাথা তুলে ঘুরে দাঁড়াতে জানে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ সংকুল, একা চলার মতো নয়। কিন্তু সে পথে আমরা দীর্ঘদিন ধরে হাঁটছি।

তিন.

রুমানা, তোমার মেয়ের পোশাকের রং তুমি আর দেখবে কিনা জানি না। কিন্তু তুমি জেনো, তোমার অন্ধত্বকে আর তোমার মতো জানা-অজানা আরো নারীর বেদনাকে, আমরা আজ নিজের বলে নিলাম। এ আমাদের নিতেই হবে। নারীর জন্য সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের শৃঙ্খল ভাঙতেই হবে।

তোমার জন্য অফুরান ভালোবাসা।

[সাপ্তাহিক বুধবার, লেখক : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: