স্বাধীন মতের যারা তাদের গুরুত্ব তেমন নেই। মিডিয়ায় সেলফ সেন্সরশিপ চলছে। ধনবানরা গণমাধ্যমের কর্তৃত্ব নিয়েছে।


গণতন্ত্র ও অধিকার

ওয়ান-ইলেভেনের ভূমিকম্পেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি

মির্জা এম হাসান


আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা এখনও জবাবদিহিতার কার্যকর বাহক হয়ে ওঠেনি। নির্বাচন ৫ বছর পরপর হয়। কিন্তু কাজ না করলে কিংবা দুর্নীতি-অনিয়ম করলে ভোট মিলবে না, এমন ভয় এখনও রাজনীতিকদের পেয়ে বসেনি

দেশ কেমন চলছে, এমন প্রশ্ন অনেকের এবং উত্তর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসে নেতিবাচক। ২০০৭ সালের শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে কিছু সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করে। এ সময়ে বগুড়ায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল এভাবে ওয়ান-ইলেভেনের ‘ভূমিকম্পের’ পর দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আগের মতো থাকবে না। তারা ভেবেছিল, হয়তো কিছু লোক ভয় পাবে। কিন্তু এখন ভেবে দেখুন তো, তারা কতটা ভুল চিন্তা করেছিল? ‘ভূমিকম্প’ ঠিকই হয়েছিল। আপাতভাবে মনে হয়েছিল যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অনেক ক্ষমতাধর বিপদে পড়েছেন। তাদের ভবিষ্যতে সুপথে না চললে উপায় নেই। কিন্তু আশাহত হয়েছে জনগণ। বর্তমান সরকার দু’বছর অতিক্রম করল। কিন্তু মোটা দাগে কোনো প্রত্যাশাই তারা পূরণ করতে পারলেন না। কেন পারলেন না?
এ প্রশ্নের উত্তরে বলব, আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা এখনও জবাবদিহিতার কার্যকর বাহক হয়ে ওঠেনি। নির্বাচন ৫ বছর পরপর হয়। কিন্তু কাজ না করলে কিংবা দুর্নীতি-অনিয়ম করলে ভোট মিলবে না, এমন ভয় এখনও রাজনীতিকদের পেয়ে বসেনি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের হিসাব নিয়ে খানিকটা চর্চা করলেই দেখা যাবে, যারা যে দলকে ভোট দেন তারা মূলত আনুগত্য বদলান না। জোটের পাটিগণিতও তারা ভালো বোঝেন। নির্বাচন এলে প্রধান দুটি দল মিত্র সন্ধানে নেমে পড়ে। যারা এতে যত বেশি সফল হন, তাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল, বিএনপিও আগেরবার তেমন সফলতা পায়। জনগণের ম্যান্ডেট বিএনপির ছিল। তাদের সংসদে আসন ছিল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। আওয়ামী লীগ আরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। কিন্তু অঙ্গীকার করেও কোনো দলই নিজেদের বদলাতে পারল না। প্রকৃতপক্ষে তারা ব্যবসায়ী, আমলাতন্ত্র, দলীয় সুবিধাভোগী_ এদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয় দলীয়করণ করে নির্বাচনে সুবিধা হাসিলের জন্য। নির্বাচনে প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হওয়ায় এটা আরও বেড়েছে। এ কারণে কোনো দলই প্রশাসনকে চটাতে চায় না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যারা দায়িত্ব পান তাদের ক্ষমতা এ সময়ে অনেক বেড়ে যায়। আওয়ামী লীগ দুর্নীতি দমন কমিশনকে ক্ষমতাহীন করেছে যেসব কারণে তার অন্যতম আমলাতন্ত্রকে চটাতে না চাওয়া। নির্বাচনে যাদের কাজে লাগবে তাদের হিসাবে জনগণ পেছনের সারিতে অবস্থান করে। অথচ সবাই জোর গলায় বলে, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। নির্বাচনের সময় তাদের কাছে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন থেকে মধ্যবিত্ত সম্মিলিতভাবে ভালো কিছু প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু এ বিশ্বাসের ভিত কোথায়? অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে, সেটি স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। কিন্তু প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করেনি। উপজেলা পরিষদকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। উপজেলা চেয়ারম্যানদের হাতে অনেক ক্ষমতা প্রদানের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা দেখলেন, এ ক্ষমতা দেওয়া হলে জনগণের কাছে উপজেলা পরিষদের গুরুত্ব বেড়ে যাবে। সংসদে সদস্যরা আইন প্রণয়নে ভূমিকা কম রাখেন। তাদের কাজ মূলত হাত তোলা। এর প্রস্তুতি কাজ করে দেয় আইন মন্ত্রণালয়। তারা নিজেদের ব্যস্ত রাখতে চান বিচার-সালিশ, স্থানীয় উন্নয়ন কাজ তদারকি, সরকারি ভাণ্ডারের গম বিলি-বণ্টন প্রভৃতি কাজে। এতে নিজেদের সুবিধা থাকে, অনুগত কর্মীদের জন্যও সুবিধা আনা যায়। এ কারণে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হয় না।
তবে আমার কাছে আশার একটি দিক রয়েছে_ উপজেলা চেয়ারম্যানদের জোট। তারা সংসদ সদস্যদের অবস্থানের প্রতিবাদ করছেন। বর্তমান সরকার এ কারণেই ২০ বছর আগে বিএনপির মতো উপজেলা পরিষদ ভেঙে দিতে পারেনি। এভাবে জোটবদ্ধ থাকলে তাদের কাছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কিছুটা হলেও নতিস্বীকার করতে বাধ্য হবে।
আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হচ্ছে সেনাবাহিনী। এরাই পালাক্রমে ক্ষমতায় থেকেছে। এরা কে কী ভূমিকা আগামীতে নেবে, সেটি অনেকটা আগাম বলে দেওয়া যায়। কারণ তারা নিজেদের বদলাতে চায় না। এদের বাইরে সামাজিক শক্তি খুব দুর্বল। আর এ কারণে ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসি কার্যকর হয় না। তাদের কারণেই রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে যা চাওয়া হয়, তা মেলে না। তৈরি পোশাক শিল্পের কথা ধরা যাক। এ শিল্পের মালিকদের বিরুদ্ধে সরকার যেতে পারে না। পেশাজীবীরা শক্তিশালী হলে অনেক কিছু আদায় করে নেওয়া যেত। কিন্তু তারা তো দলীয়ভাবে বিভক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি। স্বাধীন মতের যারা তাদের গুরুত্ব তেমন নেই। মিডিয়ায় সেলফ সেন্সরশিপ চলছে। ধনবানরা গণমাধ্যমের কর্তৃত্ব নিয়েছে। অন্যদিকে সুশাসন যারা চাইতে পারেন তাদের অনেকেই রাজনৈতিক শক্তির অধস্তন হিসেবে থাকতে পছন্দ করেন।
ধনবান শ্রেণী সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের বিকাশে সরকারের ভূমিকা থাকে। কিন্তু সেখানেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বেশি বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, সরকারের দয়াদাক্ষিণ্য পেলেই বেশি লাভ। সরকারের কাছ থেকে সুশাসন আদায় করে নয়, বরং যারা দেনদরবার করে সুবিধা এনে দিতে পারবে তাদেরই সামনে আনা হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রকে শৃঙ্খলায় আনা অপরিহার্য। ধনবান শ্রেণী ও পেশাজীবীরা এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সমাজে এরা এখন পর্যন্ত আপন শক্তিতে দাঁড়াতে পারছে না। আর এসব কারণেই আমরা আইনের শাসন বলবৎ হতে দেখি না। তারা একাট্টা হলে আইন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার কমিশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হতে পারবে। অন্যথায় সরকার যেমন চাইবে, তেমন প্রতিবেদন আসবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে। কমিশন গঠনেও অগ্রাধিকার পাবে সরকারের পছন্দ।
পাশ্চাত্যে পার্লামেন্ট রাজাদের ক্ষমতা খর্ব করেছে। বাংলাদেশে রাজতন্ত্র নেই। কিন্তু ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের হাত-পা বাঁধতে হবে। এখন পর্যন্ত অভিজ্ঞতা যে, দুর্নীতি-অনিয়ম করেও ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা যায়। এমন কেউ কেউ রয়েছেন যাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সর্বজনবিদিত। কিন্তু ভোটের বাজারে তাদের বিপদ ঘটে কম। এ অবস্থায় তারা নিজেদের হাত-পা বেঁধে ফেলার মতো আইন কেন প্রণয়ন করবেন? এ ধরনের কাজ করে এমন সংস্থাকে কেন শক্তিশালী করবেন? ব্যবসায়ীরা বলতে পারেন, আমরা কর দেব তবে সুশাসন চাই। এটা হতে পারে সামাজিক চুক্তি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার লক্ষণ নেই।
তবে বাংলাদেশে এটা অলিখিত সামাজিক চুক্তি রয়েছে এবং তা হচ্ছে দুর্ভিক্ষ ঘটতে না দেওয়া। ১৯৭৪ সালের অভিজ্ঞতাই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে এ শিক্ষা দিয়েছে। এমন আরও অনেক চুক্তি যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান মিলতে পারে। এজন্য মধ্যবিত্ত, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী তাদের স্বাধীন অবস্থান থাকতে হবে। তারা ক্ষমতাসীনদের বাধ্য করতে পারেন ভালো কাজ করতে, সু-আচরণ করতে। এমন ভয় কাজ করতে হবে রাজনীতিকদের মধ্যে যে, নিজেদের বদলাতে না পারলে জনগণ ছুড়ে ফেলে দেবে।

ড. মির্জা এম হাসান : লিড রিসার্চার ব্র্যাক ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট , দৈনিক সমকাল


 

বিনিয়োগের অন্য কোনো জায়গা না পেয়ে বর্তমান শেয়ারবাজারে মানুষজন বিনিয়োগ করছে।


কিছু লোককে ধনী বানাতে ব্যবহার হচ্ছে শেয়ারবাজার

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত

বর্তমান শেয়ারবাজারকে ‘ফটকা বাজার’ বলে উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, এখানে শেয়ার হাতবদলের মাধ্যমে কিছু লোককে বড় হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। কোনো নীতিনৈতিকতার বালাই নেই এখানে। শেয়ারবাজারে কৃত্রিম অবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে রাজনীতিকে কলুষিত করে এক ধরনের ‘যোগসাজশের’ অর্থনীতির সৃষ্টি করা হয়েছে।

বেসরকারি এই গবেষণা সংস্থা বলছে, বর্তমান পুঁজিবাজারের বুকবিল্ডিং পদ্ধতি এখন সম্পদ আহরণ করছে না, সম্পদ তছরুপ করছে। তাই এ অবস্থার সাথে জড়িতদের অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

চলতি ২০১০-২০১১ অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিপিডি’র পক্ষ থেকে এ কথাগুলো বলেছেন সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো (ডিস্টিংগুইশড ফেলো) অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গতকাল মঙ্গলবার ধানমন্ডির সিপিডি’র কার্যালয়ে এ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও এতে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্যের মধ্যে সিপিডি’র হেড অব রিসার্চ ড. ফাহমিদা খাতুন, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ারবাজার সম্পর্কে সিপিডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের অন্য কোনো জায়গা না পেয়ে এখানে মানুষজন বিনিয়োগ করছে। তাই বলে দেশের অর্থনীতির এমন কোনো উন্নয়ন ঘটেনি যাতে শেয়ারবাজার এতটা চাঙ্গা হতে পারে। এখানে বুকবিল্ডিং প্রথা চালু করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো রক্ষাকবচের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সিপিডি এই প্রথার বিরোধী নয়, কিন্তু বুকবিল্ডিংয়ের মধ্যে সম্পদ আহরণ হচ্ছে নাকি সম্পদের তছরুপ করা হচ্ছে তা আমাদের খঁুজে বের করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কেট ক্র্যাশ করবে নাকি সংশোধন হবে তা এখন বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য হচ্ছে বর্তমান বাজার অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ এখানে সুশাসনের বড় ধরনের অভাব রয়েছে। রয়েছে আর্থিক খাতের সমন্ব্বয়হীনতা। পাশাপাশি রয়েছে বাজার বিকৃতি ও অ্যাসেট বাবল (সম্পদের বুদবুদ)।

শেয়ারবাজারে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে সিপিডি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি কোম্পানি এই পদ্ধতিতে শেয়ার ছেড়ে লেনদেনের প্রথম দিনই বাজার থেকে ৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আরেক কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ারধারীরা শেয়ার লেনদেন শুরুর ১৫ দিনের মধ্যে তা বিক্রি করে দিয়ে বাজার থেকে ৮৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা অনেকটা আত্মসাৎ করে নিয়েছেন।

সিপিডি’র প্রতিবেদনে ভারতের সাথে শর্তযুক্ত ১০০ কোটি ডলার ঋণচুক্তিকে ‘প্রাগৈতাহাসিক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ভারতের সাথে যে ঋণচুক্তি করা হয়েছে তা অবশ্যই একটি সরবরাহ ঋণ বা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট। তাই একে কখনো রেয়াতি ঋণ বলার কোনো কারণ থাকতে পারে না। আর বিশ্বে এ ধরনের শর্তযুক্ত ঋণ এখন আর কেউ নেয় না বললেই চলে। ঋণের শর্ত হিসেবে ৮০ ভাগ পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশ থেকেই কিনতে হবে। এখানে আমাদের বলতে হবে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দাম সঙ্গতি রেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে হবে। ভারত থেকে সরকার যে সরবরাহকারী ঋণ নিতে যাচ্ছে তার শর্তাবলিও দেশের মানুষের কাছে প্রকাশ করা উচিত। তাহলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে ভারত আন্তর্জাতিক মূল্যে সরবরাহ ঋণ দিচ্ছে কি না। অথচ এটা অত্যন্ত চড়া সুদের ঋণ। সরবরাহকারী ঋণ অর্থনীতিকে বিকৃত করে। যা একটি প্রাগৈতাহাসিক ঋণও বটে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিপিডি’র গবেষণায় বলা হয়, দেশের অর্থনীতি নানামুখী চাপের মুখে রয়েছে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কৃষি ও সেবা খাতের চেয়ে শিল্প খাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতকে। তা না হলে সরকারের ঘোষিত জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। বর্তমান সরকার চলতি অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তবে তার জন্য বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।

সিপিডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়েনি। কমেছে বিদেশী সাহায্য। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। বিদেশে চাকরি নিয়ে শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যাও গত বছরের চেয়ে অনেক হ্রাস পেয়েছে। মালয়েশিয়া ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অনেক দেশেও জনশক্তি যাওয়া কমে গেছে। সৌদি আরবে আকামা বা কর্মানুমতি সমস্যা এখনো কাটেনি। ফলে সেসব দেশে নেপাল, পাকিস্তান ও ভারত থেকে শ্রমিক যাচ্ছে। অপর দিকে আমদানি চাহিদা বেড়েছে।

সিপিডি বলেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে তিন বছরের জন্য যে ঋণ সরকার নিতে যাচ্ছে তা নেয়ার ক্ষেত্রে আরো বিচক্ষণ হতে হবে। ঋণের শর্তাবলি পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। কারণ বিশ্বমন্দার পর আইএমএফ তার শব্দচয়নের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু চিন্তাচেতনায় এ সংস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা সব সময় কৃষিতে ভতুêকি কমানোর কথা বলে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে যা কখনো সম্ভব নয়। যে সরকার এক বছর আগেও বলেছে, তারা আইএমএফ ঋণের বলয় থেকে বেরিয়ে এসেছে। হঠাৎ এখন কী প্রয়োজন পড়ল সংস্থাটির কাছ থেকে ঋণ নেয়ার তা আমাদের বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে শিল্প প্রতিষ্ঠায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি উল্লেখ করে সিপিডি’র গবেষণায় বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে ছয় মাসে তেমন কোনো সফলতা আসেনি। ২৩টি প্রকল্প পিপিপি’র অধীনে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও অগ্রগতি হয়েছে মাত্র দু’টির ক্ষেত্রে। এর কারণ পিপিপি অব্যবস্থাপনা। আইনি কাঠামোর দুর্বলতা। এখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও রয়েছে ব্যাপক।

বিনিয়োগঃ সিপিডি বলছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু কিছু ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে, কৃষিঋণ বাড়ছে। তবে আমদানি হয়ে যে কাঁচামাল আসছে তার দিকে আমাদের লক্ষ রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কী ধরনের মূলধনী যন্ত্রপাতি এখানে আমদানি করে নিয়ে আসা হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখতে পেয়েছি, এর মধ্যে ৪০ শতাংশই রয়েছে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট। এখানে তেমন কোনো সুবিধা হচ্ছে না।
মূল্যস্ফীতিঃ সিপিডি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে ৭ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এর আগে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা জানি দেশে আমন, আউশ চালের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে কেন চালের দাম বাড়ল, এ ক্ষেত্রে দু’টি কারণ থাকতে পারে। আমরা চাহিদার ৫ শতাংশ চাল বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকি, যা কিনা দেশের অভ্যন্তরীণ চালের বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়েছে বলে এখানে চালের দাম বেড়েছে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা রয়েছে। হয় চালের উৎপাদন আমরা বাড়িয়ে বলি নতুবা এখানকার জনসংখ্যা যা বলা হয় তার চেয়ে জনসংখ্যা এখানে বেশি।

মুদ্রানীতিঃ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি একমাত্র ব্যবস্থা নয় উল্লেখ করে সিপিডি বলছে, মুদ্রা সঙ্কোচন করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। টাকা টান দিলেই মূল্যস্ফীতি কমবে এটি যারা ভাবেন তারা বাস্তবতাবিবর্জিত অবস্থায় রয়েছে।

রেশনঃ সবার জন্য রেশন চালু করা একটি সেকেলে চিন্তাভাবনা বলে মন্তব্য করেছে সিপিডি। বলা হয়েছে, এ ধরনের রেশন দিলে সরকারের সম্পদের অপচয় ঘটাবে। তাই দুস্থ জনগোষ্ঠী ও নিু আয়ের সরকারি কর্মচারীদের রেশন দেয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

দুর্নীতিতে আমরা এখন বিশ্বসেরা না হলেও যে প্রথম কাতারে আছি তা অনস্বীকার্য


সেবাখাতে দুর্নীতির জরিপ : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

 

আল-আমীন চৌধুরী

দুর্নীতি ক্যান্সারের মত আমাদের সমাজ দেহকে নি:শব্দে-নীরবে কুরে কুরে খেয়ে যাচ্ছে দশকের পর দশক। অসহায় নিরীহদের বেদনার করুণ আর্তি মাঠেঘাটে ও মুখে মুখে শোনা গেলেও এ নিয়ে সমাজে খুব একটা উচ্চবাচ্য নেই। যেন সব গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু পঙ্কিলতায় এ দুর্নীতির ব্যাপ্তির খবর বা প্রতিবেদন যখন প্রকাশ্যে পেশ করা হয় তখনই কেবল সরকারের ও সমাজের উঁচু মহলে সরগোল ও হৈ-চৈ পড়ে যায়। দশ বছর আগ থেকে যখন ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশ ক্রমাগতভাবে পাঁচবার দুর্নীতিতে সারাবিশ্বে শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল তখনও দেখেছি একই অবস্থা। সরকারপক্ষের নেতারা প্রতিবারই সরোষে রিপোর্টটি ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছিল। একবার (যতদূর মনে পড়ে ২০০৫ সালে) তো ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর কর্মকর্তাদের ধমকিয়ে যখন সরকার জানতে পারল টিআইবি শুধুমাত্র তাদের জার্মানীস্থ সদর দপ্তর কর্তৃক প্রণীত প্রতিবেদনটিই প্রকাশ করেছে তখন সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী সুদূর জার্মানীতে পাড়ি জমিয়েছিলেন এহেন প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে। অন্যদিকে বিরোধীদল প্রতিবারই একশ’ ভাগ সমর্থন দিয়ে প্রতিবেদনকে প্রশংসা করেছে। পত্রিকান্তরে এ সম্পর্কে একাধিকবার লিখেছিও। তবে বিগত ২৩ ডিসেম্বর টিআইবি সেবাখাতে দুর্নীতির যে প্রতিবেদন পেশ করেছে তা পূর্বোক্ত প্রতিবেদন প্রেক্ষিত ও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে যেমন ভিন্ন তেমনি এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ার ধরন, বরণ এবং মাত্রাও আলাদা।

১৩টি সেবাখাতে দেশের ছয় হাজার খানা বা পরিবারের উপর জরিপ চালিয়ে দুর্নীতির এ রিপোর্ট তৈরি হয়েছে টিআইবি’র নিজস্ব উদ্যোগে; ২০০৭ সালের অবস্থার সাথে ২০০৯-১০ সালের তুলনামূলক একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এতে; বিচার ব্যবস্থা ও সরকারি বিভাগের সাথে সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওদের কার্যক্রমও অন্তভর্ুক্ত হয়েছে জরিপে। প্রতিক্রিয়ার দিক দিয়ে এবার সরকার ও বিরোধীদল প্রায় অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে প্রতিবেদনে দুর্নীতির শীর্ষে বিচার বিভাগ চলে আসায় সরকারপক্ষ ও বিরোধী আইনজীবীরা একে তথ্যনির্ভর নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। শুধু তাই নয়, কুমিলস্না ও চট্টগ্রামে টিআইবি’র তিন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং চট্টগ্রামে তাদের বিরুদ্ধে সমন জারি করা হয়েছে। সর্বশেষ সুপ্রীম কোর্ট টিআইবি’র প্রতিবেদনের তথ্য উপাত্ত চেয়েছেন। এদিকে জরিপ প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশন এবং এটা বিচার বিভাগকে ধ্বংস করার কোন ষড়যন্ত্র কিনা তা তদন্ত করার দাবীও জানিয়েছে তারা। মোট কথা এবারের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত প্রবল এবং নির্দ্বিধায় বলা যায় টিআইবি তোপের মুখে পড়েছে।

দুর্নীতিতে আমরা এখন বিশ্বসেরা না হলেও যে প্রথম কাতারে আছি তা অনস্বীকার্য। সেবাখাতগুলোর পরতে পরতে দুর্নীতির যে বসতি গড়ে উঠেছে তাও কারো অবিদিত নয়। এ পটভূমিতে সেবাখাতে দুর্নীতির বিষয়ে সারাদেশের শহর-গ্রামে ছয় হাজার পরিবারের উপর পরিচালিত জরিপের নানান তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত টিআইবি’র প্রতিবেদনটি প্রকৃতপক্ষে সরকারের সর্বোচ্চ মহল, সংশিস্নষ্ট বিভাগসমূহ সরকারের আওতা বহির্ভূত বিভাগ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সকল সচেতন নাগরিকের বিচার-বিশেস্নষণ ও বিবেচনার দাবী রাখে। পরিসংখ্যান পদার্থ বা রসায়নিক তত্ত্বের ন্যায় সম্পূর্ণ নির্ভুল না হতে পারে বা তার পদ্ধতিতে কিছু ভুলত্রুটি থাকতে পারে” তবে এ প্রতিবেদনটি আলোচ্য বিষয়টির বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা দিয়েছে নি:সন্দেহে। তাই উষ্মা ও ক্ষোভের বশবতর্ী হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেটিকে প্রত্যাখ্যান না করে সেখানে প্রদত্ত ধারণা সূচক দেখে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান অবস্থার উন্নতি সাধন করাই হবে সকল পক্ষের জন্য সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কাজ।

বর্ণিত পরিপ্রেক্ষিতেই টিআইবি রিপোর্টটির কয়েকটি খাতে ২০০৭ সালের চেয়ে ২০১০ সালে তুলনা মূলক বা আপেক্ষিকভাবে কি পরিবর্তন তথা উন্নতি-অবনতি হয়েছে তা পর্যালোচনা করা দরকার। ১৩টি সেবাখাতের মধ্যে ২০০৯-১০ সালে বিচার বিভাগে গিয়ে হয়রানি, অনিয়ম, ঘুষ তথা দুর্নীতির শিকার হয়েছে ৮৮ শতাংশ মানুষ অথচ ২০০৭ সালে হয়েছিল ৪৭ শতাংশ বিচারার্থী অর্থাৎ এখাতে তিন বছর আগের তুলনায় দুর্নীতির পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণের প্রায় কাছাকাছি। আয়কর ও শুল্ক বিভাগে বেড়েছে দ্বিগুণ। বিদু্যৎখাতে প্রায় ৫০ শতাংশ ও ভূমি প্রশাসনে শতকরা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে একই সময় শিক্ষাখাতে দুর্নীতি কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি তেমনি কমেছে স্বাস্থ্যখাতে ২৫ শতাংশ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় প্রায় ২০ শতাংশ। তাহলে উপরোক্ত আটটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের মধ্যে তিন বছরের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে ৪টি তে দুর্নীতির পরিমাণ উলেস্নখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে আবার অন্য ৪টিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণে কমেছে। তাই সংশিস্নষ্ট বিভাগসমূহের ও সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের প্রয়োজন এসব তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশেস্নষণ করে দুর্নীতির এ হ্রাস-বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা। মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রধান নির্বাহী থেকে সর্বনিম্ন মাঠকর্মীর সততা, দক্ষতার জন্য, ভাল কাজের জন্য পুরস্কার আর খারাপ কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা প্রয়োগ করার কারণে অথবা কর্মপদ্ধতি সহজীকরণের এবং আইন-কানুন ও প্রশাসন ব্যবস্থার ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করে দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে আনার কারণে সংশিস্নষ্ট বিভাগসমূহে দুর্নীতি হ্রাস পেয়েছে, না কি উলেস্নখিত সবক’টি বা কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ উন্নতি অর্জিত হয়েছে তা জানা দরকার। যাতে করে অন্যাখাতেও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করে উন্নয়ন সাধন করা যায়। অন্যদিকে দেখতে হবে উপরোক্ত গুণাবলী বা উপযুক্ত ব্যবস্থা বা পদ্ধতির অভাবে বা অনুপস্থিতির কারণে অবস্থার অবনতি হয়েছে কি না। কারণ জানা গেলে সেক্ষেত্রেও দুর্নীতি হ্রাসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে। এসব কথা বলার অর্থ এ নয় যে, যেসব খাতে দুর্নীতি কমেছে তা যথেষ্ট। মোটেই তা নয়, ঐসব খাতেও দুর্নীতি সহনীয় পর্যায়ে আসতে অনেক দেরি, তবে হ্রাসের প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও শুরু হয়েছে বলতে হবে। যাক সে কথা। আগে এ সংজ্ঞা ব্যবহার করে একটি দেশের দুর্নীতির পরিমাপ করা হতো যে” সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা লাভ করাই হলো দুর্নীতি। অন্য কথায় দুর্নীতি শুধু যেন সরকারি খাতেই হয়ে থাকে, বেসরকারি খাতে সংঘটিত হয় না। টিআইবির আলোচ্য রিপোর্ট থেকে দেখা যায় বেসরকারি অর্থ লগ্নীকারী ও এনজিওখাতে জনসাধারণ দুর্নীতির শিকার হয়ে (অপেক্ষাকৃত কম হারে হলেও) থাকে। তবে বেসরকারি খাতে দুর্নীতির সবচেয়ে মারাত্মক শিকার হয়ে থাকে বিদেশে চাকরি লাভের জন্য বিদেশগামী সাধারণ মানুষ। নির্ধারিত পরিমাণ থেকে তাদের প্রত্যেককে গড়ে লক্ষাধিক টাকা পরিশোধ করতে হয়।

এবার টিআইবি রিপোর্টের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলতে হয়। প্রথমেই আসে বিচার ব্যবস্থা বা বিভাগের দুর্নীতির কথা। এটি ভিত্তিহীন ও গ্রহণযোগ্য নয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। স্মর্তব্য যে আইনসভা, প্রশাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ হলো রাষ্ট্রের তিন মৌল ভিত্তি। এর তিনটিই হলো পৃথক ও স্বাধীন। বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হয়ে যাওয়ার পর শুধুমাত্র প্রশাসন বিভাগই সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই টিআইবির প্রতিবেদনের বিচার বিভাগ সম্পকর্ীয় অংশে সরকারের পক্ষ থেকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলাকে অনেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উপর সরকারের প্রছন্ন হস্তক্ষেপ বলে মনে করতে পারে। সরকারি, বেসরকারি আইনজীবীগণ বা জুডিশিয়াল এসোসিয়েশন বিচার বিভাগের সংশিস্নষ্ট বলে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রাসঙ্গিক ও বোধগম্য। অবশ্য জুডিশিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের যে প্রতিবাদলিপি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের বিচারকরা এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যরা বিচার বিভাগের অন্তভর্ুক্ত হবেন। সংবিধান অনুযায়ী আদালতের আইনজীবী, মোহরার ও কর্মচারীরা বিচার বিভাগের অন্তভর্ুক্ত নন, অথচ টিআইবির প্রতিবেদনে তাদের অন্তভর্ুক্ত দেখিয়ে দুর্নীতির সূচক তৈরি করা হয়েছে। একথার সারবার্তা বুঝি ও মানি। কিন্তু সাধারণ জনগণ যখন বিচারের জন্য আদালতে যায় তখন বিচার বিভাগ সংশিস্নষ্ট ও সহযোগী পুরো বিচার প্রশাসনের মুখোমুখি হয়। তাই বিচার প্রার্থী হয়ে সার্বিকভাবে তাকে যে দুর্নীতির শিকার হতে হয়, আমার বিশ্বাস, তারই ধারণা সূচক প্রণয়ন করা হয়েছে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে। তাছাড়া কর শুল্কসহ অন্যান্য প্রশাসনিক বিভাগ ও তাদের স্ব স্ব ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরকে সহকারী, পেশকার, ইন্সপেক্টর বা অন্য কর্মচারীদের থেকে পৃথক করে প্রায় অনুরূপ বিবৃতি দিতে পারে কিন্তু তাতে সেবাপ্রার্থী জনগণ সেবা পেতে সার্বিকভাবে সেসব বিভাগের যে দুর্নীতির শিকার হয় তা কোনক্রমেই লাঘব হবে না বা তার পূর্ণাঙ্গ চিত্রও পাওয়া যাবে না। তদুপরি যে কোন সেবা খাতের কর্মচারী, সহযোগী বা সংশিস্নষ্টদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও সাধারণত উক্ত খাতের কর্মকর্তাদের উপর বর্তায়। বলা নিষ্প্রয়োজন যে টিআইবি বা কারো সাফাই গাইতে নয়, শুধু যুক্তির খাতিরেই উপরোক্ত কথাগুলো বলা হল। তবে এখানে একটি বিষয় উলেস্নখ করতে হয় যে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর সুষ্ঠু বিচার প্রশাসনের স্বার্থে সুপ্রীম কোর্টের অধিনে যে একটি শক্তিশালী সুপ্রীমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল বা সে মর্মে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের যে প্রস্তাব ছিল তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। সে কারণেও নানা ধরনের অনিয়ম বা হয়রানি সংঘটিত হয়ে থাকে বলে অনেকের ধারণা। কাজেই বিচার বিভাগে দ্রুত মামলার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় পদ্ধতিগত সংস্কার এবং শক্তিশালী ও কার্যকর একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা যত শীঘ্রই করা যাবে ততই মঙ্গল। শেষ কথা হল একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে চাই দুর্নীতি দমন কমিশনের মত একটি প্রতিষ্ঠানের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থাসমূহসহ সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা। কেননা দুর্নীতি দমন কমিশন যত স্বাধীন ও কার্যকরই হোক না কেন দুর্নীতি প্রতিরোধে তার চেয়ে বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল সেবাখাতসহ সকল সরকারি-বেসরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের নিজেদের। কমিশন মূলত ইতিমধ্যে সংঘটিত এবং তাদের নজরে আনীত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে এবং তাতে দুর্নীতি কিয়দাংশে নিরুৎসাহিত হয়। কিন্তু প্রত্যেকটি বিভাগে ও সংস্থায় প্রতিনিয়ত যে অসংখ্য অনিয়ম ও দুর্নীতি হয় তা প্রতিহত করতে হলে প্রধানত প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানসমূহের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা, ভাল কাজের জন্য পুরস্কারের এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তর কমানোসহ কার্যপদ্ধতি সহজীকরণ, একচেটিয়া ব্যবসা বা ক্ষমতার অবসায়ন, দুর্নীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সর্বোপরি সরকারসহ রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গসমূহের সদিচ্ছা ও ঐকান্তিকতা।

[লেখক :সাবেক সচিব, দৈনিক ইত্তেফাক]

মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে সাংগঠনিক ঈর্ষা, হিংসা ও প্রতিহিংসার আবর্তে


লসএঞ্জেলেসে মনোজ্ঞ কবিতা সন্ধ্যা

কাজী মশহুরম্নল হুদাঃ লসএঞ্জেলেসে সাহিত্যের ধারাকে বেগবান ও অব্যাহত রেখে চলেছে রাইটার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ক্যালিফোর্নিয়া। প্রতিনিয়ত কবিতার সন্ধ্যায় জমে ওঠে শব্দের ঝংকার। কবিতা এখন লসএঞ্জেলেসে জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে সাংগঠনিক ঈর্ষা, হিংসা ও প্রতিহিংসার আবর্তে। গত ২৭ ডিসেম্বর রাইটার্স এসোসিয়েশনের আয়োজিত বিজয় দিবসকে সামনে রেখে ও লিটল বাংলাদেশের সেলিব্রেট হিসাবে অনুষ্ঠিত হয় মনোরম কবিতার সন্ধ্যা। নতুনের কেতন ওড়ে। লিটল বাংলাদেশ প্রবাসে প্রাপ্ত একটি নতুন কেতন যা বিশ্বের মাঝে গৌরবের উজ্জ্বলতায় জ্বলছে এবং উড়ছে। কবিতার গায়ে নতুন প্রজন্মদের অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করার জন্য শিশুদের কবিতা আবৃত্তির অংশ ছিল প্রারম্্‌েভ। লসএঞ্জেলেসের প্রথিত যশা কবিবৃন্দ একে একে তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি করে ৩ ঘন্টা ব্যাপী অনুষ্ঠানকে মাতোয়ারা করে তোলে। প্রচন্ড বৃষ্টিকে উপেড়্গা করে জমজমাট হয়ে কবিতা সন্ধ্যা। বিশেষভাবে পরিলড়্গিত হয়েছিল কবি মহিলা ও আবৃত্তিকারদের তুলনামূলক সংখ্যায় বেশী। কবিতা প্রিয় কনসাল জেনারেল এনায়েত হোসেন স্বপরিবারে উপস্থিত হয়ে পাঠে অংশগ্রহণ করেন। এসময় তিনি বলেন যে, আমি কবিতার প্রতি অনুরাগী। এ ধরনের অনুষ্ঠান তার অত্যন্ত প্রিয়। তিনি পরবর্তী কবিতার সন্ধ্যা তার বাসভবনের করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নতুন কেতন ওড়ে’ কবিতা সন্ধ্যায় আগামী বাংলা একাডেমীর বই মেলায় প্রকাশিতব্য লসএঞ্জেলেসের ৫ জন লেখক/কবিদের অভিনন্দন জানানো হয়, রাইটার্স এসোসিয়েশনের পড়্গ থেকে । তারা হলেন, চাঁদ, সুলতানা, শবনম আমীর, কাজী মশহুরম্নল হুদা, তপন দেবনাথ, সার্টিন রহমান ও ফারহানা সাঈদ। সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রাইটারর্স এসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মশহুরম্নল হুদা। কবিতা সন্ধ্যায় যারা অংশগ্রহণ ও উপস্থিত ছিলেন তারা হচ্ছেন, তপন দেবনাথ, রায়হানা, নাসির, ফারহানা সাঈদ, ডাঃ নাসির আহমেদ অপু, পূর্বা দেবী, প্রভাতী দেবী, কাজী রহমান, চাঁদ সুলতানা, তাসনুভা সাদিয়া খান, সাজেদা ম্যাকলীন, আঃ খালেক, কাজী মাশহুরম্নল হুদা, শাহ আলম, তাবাসসুম, মার্টিন রহমান, রওনক সালাম, মুক্তা সিনহা, তারেক বাবু, ইশতিয়াক চিশতী, জসিম আশরাফী, জাহান হাসান প্রমুখ।

www.lbska.org

আবেগকে যদি ‘অনুভব করার প্রবণতা’ বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় তবে আবেগ ও স্বভাবের মধ্যে তেমন কোন ফারাক থাকে না।


আবেগ, মেজাজ এবং স্বভাব

প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হালিম

আবেগ, মেজাজ এবং স্বভাবের মধ্যকার পার্থক্যকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়। আবেগ, মেজাজ এবং স্বভাবকে অর্থ করতে সাধারণত: ‘আবেগ’ বা ‘অনুভূতি’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু, মনস্তাত্তি্বক দিক থেকে এদের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আবেগ হল অনুভূতির এক বিশেষ রূপ বা ধরন। আবেগকে অনুভূতির এক জটিল রূপ বলে আখ্যায়িত করা যায়। আবেগ-বিশেস্নষণে দেখা যায় এর উদ্ভব ঘটে কোনভাব বা ধারণার দ্বারা। বস্তু প্রত্যক্ষণ করার পর বস্তুটির একটা ভাব বা ধারণা মনে জাগরিত হয় এবং সেই ধারণাটিই আবেগের সঞ্চার করে। আবেগে অনুভূতির এক বিশেষ রূপ প্রকাশ পায় আবেগে: যেমন, ভয়-ভীতি, ক্রোধ-হিংসা ইত্যাদি। ভয় হিংসা ক্রোধের প্রভাবে মনে আবেগের সৃষ্টি হয় এবং এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু, অবস্থায় যদি এমন হয় যে মনে ক্রোধ বা হিংসার ভাব বিরাজ করছে অথচ আসলেই ক্রুদ্ধ বা হিংসা পরায়ণ হইনি তবে এই অবস্থাকে মেজাজ বা বলা হয়। মেজাজ হল আবেগের বাস্তবে পরিণত হওয়ার বা প্রকাশ পাওয়ার পূর্ব-মুহূর্ত বা প্রবণতা আবেগের সাথে মেজাজের পার্থক্য নিম্নরূপ: ক) তুলনামূলকভাবে মেজাজ আবেগের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী খ) মেজাজের ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট বস্তু থাকে না তবে এর বৈশিষ্ট্যে যে নিজ থেকে এ একটা বস্তু সৃষ্টি করে নিতে পারে এবং তা আবেগে রূপান্তরিত করতে পারে। যেমন: রাগ-ক্রোধ-হিংসার মেজাজ হলে কিংবা আনন্দ বা খুশীর মেজাজ হলে পর সে যে কোন সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে রাগের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বা আনন্দের বন্যায় ছড়াতে পারে। গ) আবেগ বাস্তব অনুভূতির পক্ষান্তরে মেজাজ হল বাস্তব আবেগ প্রকাশ পাওয়ার পূর্বাবস্থা, পূর্ব-মুহূর্ত বা প্রবণতা। একই মেজাজ নানান ধরনের আবেগ সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, সুখ-দুঃখ-বেদনা-ক্রোধ-হিংসা ইত্যাদি। আবেগ এর আনুষঙ্গিক মেজাজের উপর প্রতিক্রিয়া ঘটায়। যদি কারোর রাগের মেজাজ দেখা দেয় তবে তার মধ্যে রাগের মেজাজ তৈরি হয়ে যায় এবং পরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। তবে সাধারণত: মেজাজ এত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমরা কখনও খোশ-মেজাজে কখনও দুঃখ মেজাজে কোন কোন সময় আনন্দ-স্ফূর্তির মেজাজে, আবার কখনও বা পরিশ্রান্ত বা অবসন্ন মেজাজে থাকি।

শারীরিক বা দৈহিক অবস্থা সাধারণত: মেজাজ সৃষ্টি করে। যারা হজমজনিত সমস্যা ভোগেন তারা সাধারণত: রুক্ষ ও খিটখিটে মেজাজে হয়ে থাকেন। যারা নিদ্রাহীনতা ভোগেন তাদের মধ্যে খুব অস্থিরতা ও অস্বস্থি ও উসখুশ মেজাজ লক্ষ্য করা যায়। যারা স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত তাদের মধ্যে একটা হতাশা ও বিষন্নতার ভাব পরিলক্ষিত হয়।

স্বভাব: অনুভূতির বাস্তব প্রকাশ হল আবেগ-স্বভাব কিন্তু অনুভূতির বাস্তব প্রকাশ নয়। এ হল কোন বস্তু সম্পর্কে কোন বিশেষ অবস্থায় কোন অনুভব করার স্থায়ী মানসিক প্রবণতা। স্বভাব মেজাজের তুলনায় অধিকতর স্থায়ী প্রবণতা।

স্বভাব সহজাত বা অর্জিত হতে পারে। নারীগণ তাদের মাতৃসুলভ সহজাত স্বভাব-প্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ছোট ছোট শিশুদের আদর করা, স্নেহ করা এবং ভালবাসা তাদের সহজাত প্রবণতা। উচ্চ শব্দ শুনে ভীত হয়ে পড়া শিশুদের সহজাত স্বভাব। স্বভাব অর্জিত হতে পারে। যখন কাউকে ভালবাসা বা ঘৃণা করা হয় তখন সেই ভালবাসা বা ঘৃণা করার যে প্রবণতা তা হল স্বভাব। আবেগ এবং মেজাজের ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কে সচেতনতা থাকে- কিন্তু স্বভাবের বেলায় সব সময় সচেতন থাকা হয় না। বাবা কন্যার প্রতি দরদী-স্নেহশীল। কিন্তু এই স্নেহশীলতা সম্পর্কে বাবা সব সময় সচেতন থাকেন না। বিশেষ বিশেষ ঘটনা বা অবস্থার প্রেক্ষিতে যখন বাবার এই স্বভাবের বহিঃপ্রকাশের প্রয়োজন দেখা দেয় তখনই তার স্বভাবের আত্মপ্রকাশ ঘটে। স্নেহশীল স্বভাবের জন্যেই পিতা কন্যার সাফল্যে পুলকিত হন- ব্যর্থতায় দুঃখ-বেদনায় ব্যথিত হন।

আবেগের সাথে স্বভাবের মূল পার্থক্য হল: স্বভাব আবেগের তুলনায় অধিকতর স্থায়ী। এতদ্ব্যতীত আবেগ হল কোন অবস্থা-অনুভূতির বাস্তব প্রকাশ। স্বভাব চেতনার নিম্নস্তরে অবস্থান করে। যাকে ভালবাসা বা ঘৃণা করা হয় সেই সম্পর্কে সদা সচেতন থাকা হয় না। মনোবিজ্ঞানীগণ এ ধরনের পার্থক্যকে গুরুত্ব দেন না। তাদের মতে বিষন্নতা ‘ভালবাসা’ ঘৃণা ইত্যাদি আবেগ ও স্বভাব উভয় অর্থেই ব্যবহার করা হয়। আবেগকে যদি ‘অনুভব করার প্রবণতা’ বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় তবে আবেগ ও স্বভাবের মধ্যে তেমন কোন ফারাক থাকে না।

[লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ এম.সি. কলেজ, সিলেট]

দাম্পত্য সমস্যাও মানসিক শক্তি দিয়ে জয় করা যায়, ওষুধের প্রয়োজন নেই।


বয়স ধরে রাখতে-

বয়স ধরে রাখতে

বয়স ধরে রাখতে


 

আজ কাল অনেক রোগী পাই যারা চির তরুণ থাকতে চান। ধরে রাখতে চান বয়সের গতি। কিন্তু সৃষ্টির অমোঘ বিধান লংঘন করার কোন সুযোগ নেই। বিজ্ঞানও এখানে অসহায়। তবে বয়সের গতি নামিয়ে দিতে না পারলেও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে কর্মঠ ও অ্যাকটিভ রাখার নানা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছে। তাই কিভাবে শরীরকে সুস্থ, সবল ও অ্যাকটিভ রাখবেন তাই নিয়ে আজকের এই লেখা।

সুস্থ সবল এ্যাকটিভ জীবনের জন্য করণীয় :-

এক:অন্যতম দরকার হচ্ছে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃংখলা। তরুণ বয়স থেকেই এই শৃংখলার চর্চা করতে হবে এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। কোন ভাবেই নিজের ওপর অত্যাচার করা যাবেনা। পাশাপাশি ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার পরিহার করতে হবে। বিনা প্রয়োজনে কোন ধরনের অপচিকিৎসা নেয়া যাবেনা।

দুই: যথাসম্ভব চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে অথবা চর্বি জাতীয় খাবার কম আহার করতে হবে। পাশাপাশি সুষম খাবার যেমন; প্রচুর শাক সবজি, প্রয়োজন মত মাছ-মাংস, ডিম ও প্রচুর ফল খেতে হবে। এছাড়া প্রতিদিন ৮-১০ গস্নাস বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। পাশাপাশি কোন ধরণের ফাস্টফুড, তেলে ভাজা খাবার ও সফট ড্রিংস খাওয়া চলবেনা।

তিন: প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে। প্রতিদিন না হলেও অন্তত: সপ্তাহে ৫ দিন ব্যায়াম যেমন, হাটাচলা, জাগিং, সুইমিং করতে হবে। মনে রাখতে হবে ব্যায়াম শরীরের রক্তচলাচল স্বাভাবিক রাখে এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক সবলতার জন্য রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখা প্রয়োজন।

চার: মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মানসিক চাপ, হতাশা থেকে শারীরিক সামর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানসিক চাপ কমানোর জন্য ওষুধ নির্ভরতা কমিয়ে যে কারণে মানসিক চাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে তা নিরসনে সচেষ্ট হতে হবে। নিজের যা আছে তাই নিয়েই সুখী থাকতে চেষ্টা করুন। বিবাহিত হলে দাম্পত্য জীবন আনন্দময় করার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে সংশিস্নষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

পাঁচ: ত্বক সুন্দর রাখার চেষ্টা করুন। কারণ সর্ব প্রথম বয়সের ছাপ ত্বকে পড়ে। তাই ত্বক সুন্দর ও মসৃন রাখতে ত্বকের পরিচর্যা করুন। ভালো ক্লিনজার ব্যবহার করুন, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন এবং রোদে যাবার আগে যে কোন হালকা সানবস্নক ব্যবহার করুন। ত্বক ভালো রাখতে প্রচুর সবজি ফল ও পানি পান করুন।

ছয়: প্রতিদিন নিদিষ্ট সময়ে ঘুমাতে চেষ্টা করুন এবং প্রতু্যষে ঘুম থেকে উঠে যার যার ধর্মমতে প্রার্থনা করুন। ইয়োগা, মেডিটেশনও করতে পারেন। অন্যের কোন অনিষ্ট যাতে আপনার কর্ম-আচার-আচরণে না ঘটে তার প্রতি সতর্ক থাকবেন। পরিবারের সদস্যদেরও সেই নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষায় উজ্জীবীত করুন।

সাত: ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ওজন, থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে চিকিৎসা করুন এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। লবণ কম খান।

আট:ধূমপান একেবারেই পরিহার করুন। ধূমপান শারীরিক সামর্থ নষ্ট করে, ত্বক ও মনের তারুণ্য কমিয়ে দেয় এবং হূদরোগসহ নানা শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে। তাই ধূমপান একেবারেই নয়। পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করুন।

নয়: সব সময় পজিটিভ চিন্তা করুন এবং যে কোন সমস্যা মনের জোর দিয়ে জয় করার চেষ্টা করুন। এমনকি দাম্পত্য সমস্যাও মানসিক শক্তি দিয়ে জয় করা যায়, ওষুধের প্রয়োজন নেই।

দশ: নিজের অনেক কঠিন সমস্যা নিজের মধ্যে না রেখে আপনজন বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেয়ার করুন। প্রয়োজনে উপযুক্ত কাউন্সিলিং-এর জন্য সংশিস্নষ্ট কোন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডা: মোড়ল নজরুল ইসলাম
চুলপড়া, চর্মরোগ ও এলার্জি এবং
যৌন সমস্যা বিশেষজ্ঞ
কন্স্যালট্যান্ট ডার্মাটোলজিস্ট
ইউনাইটেড হাসপাতাল, গুলশান, ঢাকা

মানুষ শুধু নিজেকে নিয়েই বেঁচে থাকে না। তার প্রত্যাশা ভবিষ্যৎ বংশধর এবং উত্তরসূরিদের ঘিরেও।


এখন আর আশা করতে ভরসা পাই না

সিরাজুর রহমান

স্কুলের শেষের দিকে এবং কলেজেরও গোড়ার দিকে ইংরেজি নতুন বছর এগিয়ে এলে আমরা খুবই ভাবনায় পড়তাম। বন্ধুদের নতুন বছরের উপহার দিতে হবে। জানাই ছিল, সেটা হবে বই। এবং বন্ধুদের কে কী ধরনের বই পড়তে পছন্দ করেন, সেটাও মোটামুটি জানা ছিল। তবে বইয়ের দামও ধর্তব্যে আনতে হতো। পিতা সীমিত আয় থেকে যে হাতখরচের পয়সা দিতেন, সারা বছর তা থেকে কিছু কিছু জমিয়ে জমিয়ে বিশেষ উপলক্ষে বন্ধুদের উপহারের পরিকল্পনা করতে হতো।

আজকাল আর বোধ হয় তরুণ-কিশোরদের তেমন কোনো সমস্যা নেই। আশির দশকের শেষে ঢাকার এক পরিচিত বাড়িতে একটি বালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বড় হয়ে কী হতে চাও? খুবই চটপটে ছেলেটি বলেছিল, সে যে সেনাকর্মকর্তা হবে সেটা আমার জানা উচিত ছিল, কেননা টাকাপয়সা আর ক্ষমতা সবই তো সেনাকর্মকর্তাদেরই থাকে। আরো কয়েক বছর পর আরেকটি বালক বলেছিল, পড়াশোনায় তার আগ্রহ নেই, সে মাস্তান হতে চায়, তাহলে টাকাপয়সার অভাব হবে না। এখন তো সমস্যা নেই। এখন টাকাপয়সা, প্রতিপত্তি, এমনকি খুনখারাবি, ডাকাতি, ধর্ষণ যাবতীয় অপরাধেও পরিত্রাণ পাওয়ার সহজ উপায় শাসক দলের কোনো অঙ্গসংগঠনে যোগ দেয়া, না হয় ক্যাডার হওয়া।

পেছনের দিকে তাকিয়ে যত দূর মনে পড়ে আমি বরাবরই আশাবাদী ছিলাম। রাতে ঘুম আসতে দেরি হলে চিন্তা করতাম পর দিন কী কী ভালো ঘটনা ঘটতে পারে। বয়সের যে পর্যায়ে এখন পৌঁছেছি, এখন আর ব্যক্তিগত কিছু পাওয়ার কিংবা আশা করার বাসনা প্রবল নয়। শৈশব থেকে স্বদেশকে ভালোবেসেছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতায়ও কিছু ভূমিকা ছিল। এখন পাওয়ার কিংবা আশা করার ব্যাপারগুলো সবই এ দেশ আর এ দেশের মানুষকে ঘিরে।

জীবনের ৫০টি বছর কাটিয়ে দিলাম লন্ডনে এবং সাংবাদিকতায়। ইউরোপ-আমেরিকার একটা রীতি, নতুন বছর এগিয়ে এলে আসন্ন বছরটির সম্ভাবনা সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় রাজনীতিক আর সাংবাদিকদের মধ্যে। চৌকস সাংবাদিকেরা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে যান নতুন বছরে কী কী ঘটবে কিংবা ঘটতে পারে। সাধারণ মানুষের তাক লেগে যায়। এই মানুষগুলো কি ভবিষ্যতের চেহারা আগে থেকেই দেখতে পায়? আসলে সাংবাদিকেরা বছরের পর বছর ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করেন, পরে সেসব ঘটনার পরিণতিও তাদের ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়। লোকে বলে অভিজ্ঞতা থেকে গাধাও অনেক কিছু শিখতে পারে।

বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু ওই যে বয়সের কথা বললাম! এখন আশাবাদী হতে, স্বপ্ন দেখতে ভয় হয়। তা ছাড়া আমাদের অনেকের প্রিয় স্বদেশে এখন যা ঘটছে সেটাকে শুধু দুঃস্বপ্নই বলা যায়। দুঃস্বপ্নের কালরাত্রিতে সুখস্বপ্ন তো সম্ভব নয়। ইংরেজি নতুন বছরের দ্বারপ্রান্তে এসে যদি কেউ প্রশ্ন করেন পরের বছরটি বাংলাদেশে কেমন যাবে, তাহলে কী জবাব দেবো?

গ্রিক ট্র্যাজেডির কোনো কোনো নাটক পড়েছি। সোফোক্লিসের ইডিপাস রেক্স এবং আন্তিগোনি নাটক দুটো অনুবাদও করেছি। সেসব নাটকের চরিত্রগুলো আগে থেকেই জানত তাদের কপালে কী লেখা আছে। একটু ভেবেচিন্তে কাজ করলে নিষ্ঠুর নিয়তিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়তো তাদের জন্য সম্ভবও ছিল। কিন্তু অন্ধ দার্শনিক টাইরেসিয়াসের মতো জ্ঞানী-গুণীদের পরামর্শ তারা মেনে চলেনি। জেট বিমানের গতিতে তারা সর্বনাশের অতল গহ্বরে ঝাঁপ দিয়েছিল। রাজা থেইয়াসকে জ্যোতিষীরা বলেছিলেন, তার নবজাত পুত্র পিতৃঘাতী হবে, মাকে বিয়ে করবে। রাজা এক মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নবজাতককে গোপনে হত্যা করতে। মন্ত্রী নিজ হাতে সুদর্শন শিশুটিকে হত্যা করতে পারেননি, মরুভূমির এক পর্বতগুহায় রেখে এসেছিলেন­ এ আশায় যে নেকড়ে, বাঘ কিংবা শেয়াল তাকে খেয়ে ফেলবে।

কিন্তু নেকড়ে, বাঘ কিংবা শেয়াল সে শিশুকে খায়নি, এক মেষপালক তাকে উদ্ধার করে করিন্থ দেশে নিয়ে গিয়েছিল। বড় হয়ে সেই শিশু দিগ্বিজয়ী রাজা হলো, অজান্তে পিতাকে হত্যা করে তার রাজ্যও দখল করেছিল এবং মা রানী জোকাস্ত্রাকে বিয়ে করেছিল। অনেক পরে রাজা ইডিপাস যখন প্রকৃত সত্য জানতে পারেন তখন অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে, ইডিপাসের বংশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখন দেবতাদের অভিশাপ ঢুকে গেছে, সর্বনাশ ঠেকানো তখন আর সম্ভব ছিল না।

একাত্তর সাল বাংলাদেশের জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের বছর, রক্তদান, নির্যাতন ও অপমানের বছর। আঘাত যখন নেমে আসে নেতাও তখন ছিলেন অনুপস্থিত। কিন্তু জাতি হতোদ্যম হয়নি। কে কোন দলের কিংবা কোন পক্ষের সে প্রশ্ন সে দিন কেউ জিজ্ঞেস করেনি। আমরা সবাই জেনেছিলাম, আমরা সবাই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, আমাদের হাতে আছে একতার অমোঘ অস্ত্র। সুতরাং জয় আমাদের হবেই।

কিন্তু যে অমোঘ অস্ত্র বলে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল সে অস্ত্রটিই আমরা হেলায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। ঈর্ষা আর প্রতিহিংসা বাংলাদেশকে কোথায় টেনে নামিয়েছে পেছন ফিরে সে দিকে তাকিয়ে দেখার সময়ও ক্ষমতালিপ্সুদের নেই। বিধাতার সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি মানুষের মন। উত্তাল সমুদ্রের সাথে যুদ্ধ করে সে বেঁচে থাকে। বিজয় যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে মহাশূন্য বিচরণও তার সাধ্যায়ত্ত হয়। কিন্তু জাতি যদি লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে, আত্মকলহ আর গৃহবিবাদে গা ভাসিয়ে দেয়, তাহলে কে তাকে টেনে তুলবে?

আজকের বাংলাদেশ সব হারানোর দেশ। এ দেশকে সোনার বাংলা বলা এখন তাকে চূড়ান্ত বিদ্রূপ করারই শামিল। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি একটি শোষক ও অত্যাচারী শক্তির রাহুমুক্ত হতে। সে দিন যদি বলা হতো, আমরা শুধু শৃঙ্খল পরিবর্তন করছি, প্রভু বদল করে নতুন প্রভুকে ডেকে আনছি, তাহলে আপনি কিংবা আপনার পিতা-মাতা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেন?

স্বাধীনতার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা ছিল জাতির? একটি শোষণবঞ্চিত সমাজ হবে, সে সমাজের মানুষ অবাধে তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবে, দেশে আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত হবে, মানুষ শান্তিতে নিজের ও পরিবারের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে­ এটাই কি স্বাধীনতা যুদ্ধের পেছনের চালিকাশক্তি ছিল না? এই লক্ষ্য, এই প্রত্যাশাগুলোর কোনটি বিগত ৪০ বছরে অর্জিত হয়েছে? পরবর্তী ৪০ বছরেও কি লক্ষ্যগুলো অর্জিত হবে?

দুই বছর আগে দেশে একটি সরকার এসেছিল। তারা মানুষের সব প্রত্যাশা রাতারাতি বাস্তবায়িত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা বলেছিল দেশ থেকে দুর্নীতি দূর হবে, প্রতিহিংসার পরিবর্তে সমঝোতার রাজনীতি আসবে বাংলাদেশে। শুধু ১০ টাকা কেজি মূল্যের চালই নয়, সব অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি এরা দিয়েছিল। প্রতিশ্রুতিগুলো অবশ্যই উচ্চগ্রাম ও শ্রুতিমধুর ছিল। কিন্তু দুই বছরের মাথায় এসে সেসব প্রতিশ্রুতির কোনটি পালিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে, বাংলাদেশের অবশিষ্ট জমিটুকুনজুড়ে নতুন নতুন অপ্রয়োজনীয় বিমানবন্দর তৈরি হবে, বাংলাদেশ সারা বিশ্বের অনুসরণীয় দেশ হবে­ এসব বড় বড় কথার ফানুস এবং আকাশকুসুম কল্পনা দিয়ে মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা চলছে। ওদিকে শুধু সরকারেরই নয়, গোটা দেশের পায়ের তলা থেকে মাটি যে সরে যাচ্ছে সে দিকে কারো খেয়াল নেই।

বিচার যেখানে অত্যাচার মাত্র

বিচার বলতে কী বুঝি আমরা? সাধারণ মানুষ এটাই বোঝে যে, বিচার ন্যায্য হলে সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, হানাহানি দূর হবে, মানুষ শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু বিচার যেখানে দলে-দলে গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে হিংসা ও প্রতিশোধ বাসনা ছড়িয়ে দেয়, সমাজকে হানাহানি ও রক্তপাতে জর্জরিত করে, সে বিচার বিচার নয়­ অত্যাচারের চরমতম দৃষ্টান্ত। অথচ আজকের বাংলাদেশে হচ্ছে ঠিক তাই। প্রায় চার দশক পরে নতুন করে মুজিব হত্যার বিচার হয়েছে। বিদেশ থেকে মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্তদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসি দেবেন বলে আইনমন্ত্রী যে লম্ফঝম্ফ করছিলেন তার কী হলো? সাধারণ মানুষ দেখছে যে অযথা দেশে সহিংসতা ও হানাহানি বেড়ে গেছে, আর কোনো লাভ হয়নি।

তথাকথিত একটা আন্তর্জাতিক ট্রাইবুøনাল হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বাহানায়। কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া আর কোন জাতি আছে সেই আন্তর্জাতিক ট্রাইবুøনালে? কানা ছেলের পদ্মলোচন নাম একেই বলে! এখন আবার সে ট্রাইবুøনালে যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে না, বিচার হবে মানবতাবিরোধী অপরাধের। বিচার করবে কারা? সরকারের ঘাতকদের তথাকথিত ক্রসফায়ারে হাজার প্রাণ বিনাশ করাকে যারা অন্যায় মনে করে না, তারা। সাধারণ মানুষ দেখছে নানা অজুহাতে সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের ধরে ধরে জেলে পোরা হচ্ছে, জেলে তাদের স্থান করার জন্য আওয়ামী লীগের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদেরও কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সাজানো হচ্ছে, ওদিকে খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ১৫টি দুর্নীতির মামলাসহ আওয়ামী লীগ সদস্যদের বিরুদ্ধে সাত হাজারের কাছাকাছি দুর্নীতির মামলা, এমনকি প্রমাণিত কয়েকটি খুনের ও ডাকাতির মামলাও তুলে নেয়া হয়েছে। আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে নিয়মিত সরকারের প্রতিশোধ বাসনা চরিতার্থ করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মানুষ শুধু নিজেকে নিয়েই বেঁচে থাকে না। তার প্রত্যাশা ভবিষ্যৎ বংশধর এবং উত্তরসূরিদের ঘিরেও। বাংলাদেশে আজ যারা উঠতি প্রজন্ম, ভবিষ্যতে নেতৃত্ব যাদের হাতে বর্তাবে বলে আশা করা হয়, তাদের আমরা কী শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি আজ? এ প্রবন্ধের গোড়ার দিকেই দু’টি বালকের উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম। পরিস্থিতি এখন তার চেয়ে অনেক বেশি শোচনীয়। তরুণ সমাজের একাংশকে এখন শিক্ষা দেয়া হয়েছে একটি ফ্যাসিবাদী শক্তিকে গদিতে বহাল রাখার বিনিময়ে যেকোনো অবৈধ পন্থায় অর্থোপার্জন, চুরি-ডাকাতি, খুন, রাহাজানি ও ধর্ষণও গ্রহণযোগ্য বিবেচিত। এই প্রজন্ম যে দিন দেশকে নেতৃত্ব দেবে সে দিন বাংলাদেশে বাস করার অভিরুচি আপনার হবে কি?

নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে বাস্তবে কী ঘটেছে সেটা ইতিহাস নয়, ইতিহাস হচ্ছে নির্যাতন-নিপীড়ন করে, লগি-লাঠি-বৈঠা দিয়ে মানুষের মাথা ফাটিয়ে জোর করে একটা মতবাদকে জাতির ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেয়া। যে সত্য তাদের গায়ে লাগে সে সত্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার জন্য বাজার থেকে বই তুলে নেয়া হচ্ছে, বিদেশ থেকে বই ছেপে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, মিডিয়াকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

বিচারের সাহস ওদের নেই

আদালত এখন সরকারের হাতের লাঠি। সে লাঠি উদারভাবে প্রহার বৃষ্টি করে সরকারের বিরোধী দলের মাথায়, শাসক দলের সমর্থকদের দিয়ে। ভারাক্রান্ত আদালত এখন সংবিধান পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার হয়। কিন্তু সত্য ও ন্যায়নীতি বর্জিত রায়ে পরস্পর বিরোধিতা থাকবেই। আদালত পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছে, এক লাফে ফিরে গেছে বায়াত্তরের সংবিধানে। কিন্তু স্বৈরাচারী বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী, রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী তৃতীয় সংশোধনী এবং জননির্যাতক দ্বিতীয় সংশোধনী যে অন্যায় ছিল সে কথা স্বীকার করার সৎসাহস আজকের শাসকদের নেই। একই আদালত যখন বলছে যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলে কিছু নেই, আছে শুধু ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, তখন সে কথায় তারা কান দেয় না।

সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল ২৬ আগস্ট। রায়ে আরো বলা হয়েছিল যে, নির্বাচিত সরকারকে ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা হাতিয়ে নেয়ার জন্য এরশাদের বিচার করতে হবে। এরশাদ তখনই চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন হাইকোর্টকে এবং সরকারকে, বলেছিলেন কে তার বিচার করে তিনি দেখে নেবেন। এত দিন পরে সে রায়ের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু হাইকোর্টের যে রায় সরকারের স্বার্থের অনুকূলে যায় শুধু সে রায়ই সরকার গ্রহণ করে। জনসাধারণ জানে যে, এরশাদের বিচার করার সৎ সাহস এ সরকারের হবে না।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার ষড়যন্ত্রে কে কতখানি জড়িত ছিলেন আজো প্রমাণিত হয়নি। মাথায় গুলি করে জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়েছে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের সংরক্ষণ দেয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু দেশ ও জাতির সন্দেহ আছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ নেত্রী এরশাদের সামরিক অভুøত্থানকে সমর্থন দিয়েছিলেন, এরশাদের সাজানো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং ভুয়া সংসদে যোগ দিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সারা দেশ যখন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আওয়ামী লীগ নেত্রী তখন প্রধানত সে আন্দোলনে বিভক্তি সৃষ্টিরই চেষ্টা করেছেন। অন্যথায় সে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ৯ বছর স্থায়ী হতে পারত না। এরশাদের বিচার হলে শাক দিয়ে ঢেকে রাখা বহু মাছ আবার লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

সত্যকে মিথ্যা প্রচারণার আড়ালে ঢেকে দেয়ার নতুন প্রয়াস শুরু হয়েছে এখন। প্রচার হচ্ছে যে, মোশতাক আর জিয়ার কাছ থেকে এরশাদ তার সামরিক অভুøত্থানের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। এরশাদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের স্বৈরতন্ত্রে সেনাকর্মকর্তাদের প্রচণ্ড দাপট তিনি দেখেছেন। তার পরও যদি তাকে নির্বোধ শিশু বলে দেখানোর চেষ্টা হয় তাহলে সে চেষ্টার পেছনে কিছু সত্যতা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল।

সত্যবিকৃতি ও শুভঙ্করের ফাঁকি

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট অভুøত্থান করেছিল কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা। সেনাবাহিনীকে বঞ্চিত করে রক্ষী বাহিনীকে প্রাধান্য দেয়ায় সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অংশ খুবই ক্ষুব্ধ ছিল। রিপ্যাট্রিয়ট অফিসারদের নিয়েও আরো অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন ছিল সেনাবাহিনীতে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশব্যাপী কুশাসন, অর্থনৈতিক সঙ্কট, দুর্ভিক্ষ এবং দুর্নীতি নাগরিক হিসেবেও সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাকশালী পদ্ধতি জারি করে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অনুুসারী সেনাসদস্যরা মেনে নিতে পারেননি। অভুøত্থান হয়েছিল সে জন্য। সে অভুøত্থান খন্দকার মোশতাক করেননি। সে দিন সকাল ৮টায় বিদ্রোহী অফিসাররা মোশতাককে তার বাড়ি থেকে শাহবাগের ব্রডকাস্টিং হাউজে নিয়ে আসে। কিন্তু সোয়া ১১টার আগে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হননি। তার আগে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খান, বিমান বাহিনীর প্রধান এ কে খন্দকার, বিডিআর প্রধান জোনারেল খলিলুর রহমান এবং পুলিশ প্রধান ও রক্ষী বাহিনীর উপপ্রধান ব্রডকাস্টিং হাউজে এসে মোশতাককে দায়িত্ব নিতে রাজি করান। তারা তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়ার পরই মোশতাক রেডিওতে ঘোষণা দেন যে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার হাতে নিয়েছেন। উপরোল্লিখিত অফিসাররা জানতেনই না কারা অভুøত্থান ঘটিয়েছিল। তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ কখনো দাবি করেননি যে মোশতাক সে অভুøত্থান ঘটিয়েছিলেন। তা ছাড়াও মফিজ চৌধুরী ও মনোরঞ্জন ধরসহ মুজিবের মন্ত্রিসভার আটজন সদস্য মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন।

সরকারের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টির প্রচারবিদরা এ সত্যও চাপা দিতে চাইছেন যে, মোশতাক আর জিয়ার মাঝে আরেকটি সামরিক অভুøত্থান করেছিলেন ভারতপন্থী বলে বিবেচিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং সেদিন দিল্লিতে উল্লাস সৃষ্টি হয়েছিল, সাউথ ব্লকে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল। সরকারের প্রচারবিদরা আরো গোপন করার চেষ্টা করছেন যে, জেনারেল জিয়াউর রহমান কোনো অভুøত্থান করেননি। খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর তাকে গৃহবন্দী করে কড়া সামরিক পাহারায় রেখেছিলেন। খালেদ মোশাররফের হত্যার পর ৭ নভেম্বর সিপাহিরা বিদ্রোহ করে জিয়াকে মুক্ত করে এবং সেনাসদর দফতরে নিয়ে যায়। প্রকৃত সত্য এই যে, দিল্লিতে পৌনে ছয় বছর অবস্থানের পর দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ নেত্রী তার পিতার হত্যার পর যারাই সে সঙ্কটপূর্ণ সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাদের সবাইকেই (একমাত্র ভারতপন্থী খালেদ মোশাররফ ছাড়া) খুনি বলে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলেন, গালাগালি করেছেন।

আওয়ামী লীগের প্রচারবিদরা কিভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করেন এই হচ্ছে তার দুয়েকটি নমুনা। এবং সে বিকৃত ইতিহাসই তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখাতে চান। সন্দেহ নেই, যে ঘৃণা আর প্রতিহিংসা দিয়ে তারা বর্তমানের বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস বিষাক্ত করে তুলেছেন, সে হানাহানি তারা ভবিষ্যতের জন্যও পাকাপোক্ত করে রেখে যেতে চান। কথা হচ্ছে, ভুল ইতিহাস যাদের শেখানো হচ্ছে তারা ইতিহাসের প্রকৃত মূল্যায়ন করবে কী করে? এবং ইচ্ছাকৃত কতগুলো মিথ্যার বোঝা জাতির ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে রাখার পরিণতি কোনোমতেই শুভ হতে পারে না। নিমগাছ রোপণ করে আম ফল পাওয়ার আশা কিছুতেই করা যায় না।

এ জন্যই বলছিলাম, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার ভরসা এখন আর পাই না। আমার প্রজন্মের আমরা যারা এ অবস্থার প্রতিকারের সময় আর বেশি পাবো না আজ তাদের মনে বহু সংশয়। ফল যেখানে শূন্য সেখানে অন্তবিহীন ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতার কি সত্যি কোনো প্রয়োজন ছিল? তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুয়েকটা হক কথা বলে যেতে পারি। সত্যিকারের স্বাধীনতাকে ফিরে পেতে হলে আবার একাত্তরে ফিরে যেতে হবে, জাতীয় ঐক্যকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা যারা করছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

লেখকঃ বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান
লন্ডন, ০১.০১.১১ [নয়া দিগন্ত]
serajurrahman@btinternet.com

%d bloggers like this: