স্বাধীন মতের যারা তাদের গুরুত্ব তেমন নেই। মিডিয়ায় সেলফ সেন্সরশিপ চলছে। ধনবানরা গণমাধ্যমের কর্তৃত্ব নিয়েছে।

গণতন্ত্র ও অধিকার

ওয়ান-ইলেভেনের ভূমিকম্পেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি

মির্জা এম হাসান


আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা এখনও জবাবদিহিতার কার্যকর বাহক হয়ে ওঠেনি। নির্বাচন ৫ বছর পরপর হয়। কিন্তু কাজ না করলে কিংবা দুর্নীতি-অনিয়ম করলে ভোট মিলবে না, এমন ভয় এখনও রাজনীতিকদের পেয়ে বসেনি

দেশ কেমন চলছে, এমন প্রশ্ন অনেকের এবং উত্তর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসে নেতিবাচক। ২০০৭ সালের শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে কিছু সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করে। এ সময়ে বগুড়ায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল এভাবে ওয়ান-ইলেভেনের ‘ভূমিকম্পের’ পর দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আগের মতো থাকবে না। তারা ভেবেছিল, হয়তো কিছু লোক ভয় পাবে। কিন্তু এখন ভেবে দেখুন তো, তারা কতটা ভুল চিন্তা করেছিল? ‘ভূমিকম্প’ ঠিকই হয়েছিল। আপাতভাবে মনে হয়েছিল যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অনেক ক্ষমতাধর বিপদে পড়েছেন। তাদের ভবিষ্যতে সুপথে না চললে উপায় নেই। কিন্তু আশাহত হয়েছে জনগণ। বর্তমান সরকার দু’বছর অতিক্রম করল। কিন্তু মোটা দাগে কোনো প্রত্যাশাই তারা পূরণ করতে পারলেন না। কেন পারলেন না?
এ প্রশ্নের উত্তরে বলব, আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা এখনও জবাবদিহিতার কার্যকর বাহক হয়ে ওঠেনি। নির্বাচন ৫ বছর পরপর হয়। কিন্তু কাজ না করলে কিংবা দুর্নীতি-অনিয়ম করলে ভোট মিলবে না, এমন ভয় এখনও রাজনীতিকদের পেয়ে বসেনি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের হিসাব নিয়ে খানিকটা চর্চা করলেই দেখা যাবে, যারা যে দলকে ভোট দেন তারা মূলত আনুগত্য বদলান না। জোটের পাটিগণিতও তারা ভালো বোঝেন। নির্বাচন এলে প্রধান দুটি দল মিত্র সন্ধানে নেমে পড়ে। যারা এতে যত বেশি সফল হন, তাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল, বিএনপিও আগেরবার তেমন সফলতা পায়। জনগণের ম্যান্ডেট বিএনপির ছিল। তাদের সংসদে আসন ছিল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। আওয়ামী লীগ আরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। কিন্তু অঙ্গীকার করেও কোনো দলই নিজেদের বদলাতে পারল না। প্রকৃতপক্ষে তারা ব্যবসায়ী, আমলাতন্ত্র, দলীয় সুবিধাভোগী_ এদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয় দলীয়করণ করে নির্বাচনে সুবিধা হাসিলের জন্য। নির্বাচনে প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হওয়ায় এটা আরও বেড়েছে। এ কারণে কোনো দলই প্রশাসনকে চটাতে চায় না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যারা দায়িত্ব পান তাদের ক্ষমতা এ সময়ে অনেক বেড়ে যায়। আওয়ামী লীগ দুর্নীতি দমন কমিশনকে ক্ষমতাহীন করেছে যেসব কারণে তার অন্যতম আমলাতন্ত্রকে চটাতে না চাওয়া। নির্বাচনে যাদের কাজে লাগবে তাদের হিসাবে জনগণ পেছনের সারিতে অবস্থান করে। অথচ সবাই জোর গলায় বলে, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। নির্বাচনের সময় তাদের কাছে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন থেকে মধ্যবিত্ত সম্মিলিতভাবে ভালো কিছু প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু এ বিশ্বাসের ভিত কোথায়? অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে, সেটি স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। কিন্তু প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করেনি। উপজেলা পরিষদকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। উপজেলা চেয়ারম্যানদের হাতে অনেক ক্ষমতা প্রদানের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা দেখলেন, এ ক্ষমতা দেওয়া হলে জনগণের কাছে উপজেলা পরিষদের গুরুত্ব বেড়ে যাবে। সংসদে সদস্যরা আইন প্রণয়নে ভূমিকা কম রাখেন। তাদের কাজ মূলত হাত তোলা। এর প্রস্তুতি কাজ করে দেয় আইন মন্ত্রণালয়। তারা নিজেদের ব্যস্ত রাখতে চান বিচার-সালিশ, স্থানীয় উন্নয়ন কাজ তদারকি, সরকারি ভাণ্ডারের গম বিলি-বণ্টন প্রভৃতি কাজে। এতে নিজেদের সুবিধা থাকে, অনুগত কর্মীদের জন্যও সুবিধা আনা যায়। এ কারণে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হয় না।
তবে আমার কাছে আশার একটি দিক রয়েছে_ উপজেলা চেয়ারম্যানদের জোট। তারা সংসদ সদস্যদের অবস্থানের প্রতিবাদ করছেন। বর্তমান সরকার এ কারণেই ২০ বছর আগে বিএনপির মতো উপজেলা পরিষদ ভেঙে দিতে পারেনি। এভাবে জোটবদ্ধ থাকলে তাদের কাছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কিছুটা হলেও নতিস্বীকার করতে বাধ্য হবে।
আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হচ্ছে সেনাবাহিনী। এরাই পালাক্রমে ক্ষমতায় থেকেছে। এরা কে কী ভূমিকা আগামীতে নেবে, সেটি অনেকটা আগাম বলে দেওয়া যায়। কারণ তারা নিজেদের বদলাতে চায় না। এদের বাইরে সামাজিক শক্তি খুব দুর্বল। আর এ কারণে ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসি কার্যকর হয় না। তাদের কারণেই রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে যা চাওয়া হয়, তা মেলে না। তৈরি পোশাক শিল্পের কথা ধরা যাক। এ শিল্পের মালিকদের বিরুদ্ধে সরকার যেতে পারে না। পেশাজীবীরা শক্তিশালী হলে অনেক কিছু আদায় করে নেওয়া যেত। কিন্তু তারা তো দলীয়ভাবে বিভক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি। স্বাধীন মতের যারা তাদের গুরুত্ব তেমন নেই। মিডিয়ায় সেলফ সেন্সরশিপ চলছে। ধনবানরা গণমাধ্যমের কর্তৃত্ব নিয়েছে। অন্যদিকে সুশাসন যারা চাইতে পারেন তাদের অনেকেই রাজনৈতিক শক্তির অধস্তন হিসেবে থাকতে পছন্দ করেন।
ধনবান শ্রেণী সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের বিকাশে সরকারের ভূমিকা থাকে। কিন্তু সেখানেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বেশি বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, সরকারের দয়াদাক্ষিণ্য পেলেই বেশি লাভ। সরকারের কাছ থেকে সুশাসন আদায় করে নয়, বরং যারা দেনদরবার করে সুবিধা এনে দিতে পারবে তাদেরই সামনে আনা হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রকে শৃঙ্খলায় আনা অপরিহার্য। ধনবান শ্রেণী ও পেশাজীবীরা এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সমাজে এরা এখন পর্যন্ত আপন শক্তিতে দাঁড়াতে পারছে না। আর এসব কারণেই আমরা আইনের শাসন বলবৎ হতে দেখি না। তারা একাট্টা হলে আইন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার কমিশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হতে পারবে। অন্যথায় সরকার যেমন চাইবে, তেমন প্রতিবেদন আসবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে। কমিশন গঠনেও অগ্রাধিকার পাবে সরকারের পছন্দ।
পাশ্চাত্যে পার্লামেন্ট রাজাদের ক্ষমতা খর্ব করেছে। বাংলাদেশে রাজতন্ত্র নেই। কিন্তু ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের হাত-পা বাঁধতে হবে। এখন পর্যন্ত অভিজ্ঞতা যে, দুর্নীতি-অনিয়ম করেও ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা যায়। এমন কেউ কেউ রয়েছেন যাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সর্বজনবিদিত। কিন্তু ভোটের বাজারে তাদের বিপদ ঘটে কম। এ অবস্থায় তারা নিজেদের হাত-পা বেঁধে ফেলার মতো আইন কেন প্রণয়ন করবেন? এ ধরনের কাজ করে এমন সংস্থাকে কেন শক্তিশালী করবেন? ব্যবসায়ীরা বলতে পারেন, আমরা কর দেব তবে সুশাসন চাই। এটা হতে পারে সামাজিক চুক্তি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার লক্ষণ নেই।
তবে বাংলাদেশে এটা অলিখিত সামাজিক চুক্তি রয়েছে এবং তা হচ্ছে দুর্ভিক্ষ ঘটতে না দেওয়া। ১৯৭৪ সালের অভিজ্ঞতাই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে এ শিক্ষা দিয়েছে। এমন আরও অনেক চুক্তি যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান মিলতে পারে। এজন্য মধ্যবিত্ত, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী তাদের স্বাধীন অবস্থান থাকতে হবে। তারা ক্ষমতাসীনদের বাধ্য করতে পারেন ভালো কাজ করতে, সু-আচরণ করতে। এমন ভয় কাজ করতে হবে রাজনীতিকদের মধ্যে যে, নিজেদের বদলাতে না পারলে জনগণ ছুড়ে ফেলে দেবে।

ড. মির্জা এম হাসান : লিড রিসার্চার ব্র্যাক ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট , দৈনিক সমকাল


 

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: