পূঁজিবাজারের প্রবৃদ্ধি ঘটে মূলত দেশের বিনিয়োগযোগ্য অন্যান্য খাতে নজিরবিহীন স্থবিরতার পরিপ্রেক্ষিতে।

২০১০ ছিল পূঁজিবাজারের উত্থান-পতনের বছর

নাসির উদ্দিন চৌধুরী

পূঁজিবাজারের ইতিহাসে ২০১০ সাল ছিল টানা উত্থানের। লেনদেন, সূচক ও বাজার মূলধন তিন দিক থেকেই দেশের পূঁজিবাজারের ইতিহাসে এ বছর ছিল বেশ ইতিবাচক। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর যে অবস্থায় ছিল দেশের প্রধান পূঁজিবাজার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১০ সালে তার থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। এই সময়ে ডিএসই’র প্রধান সূচক বেড়েছে পাঁচ হাজার পয়েন্ট। লেনদেন পৌঁছে গেছে এক হাজার কোটি টাকা থেকে তিন হাজার কোটি টাকায়। একই সময়ে ডিএসই’র বাজার মূলধন এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকায়। পক্ষান্তরে বছরটি ছিল পূঁজিবাজারের দরপতনের সর্বকালের রেকর্ড। গত ৮ ডিসেম্বরের দরপতন ১৯৯৬ সালের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। অস্থির হয়ে ওঠে বাজার। অবশ্য পরে তা স্বাভাবিক হয়।

২০০৯ সালেও পূঁজিবাজারের প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখ করার মতো। এ বছর ২০০৮ সালের রেখে যাওয়া ডিএসই সূচক দুই হাজার ৭৯৫ পয়েন্ট থেকে চার হাজার ৫৩৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়। অবশ্য এর মধ্যে গ্রামীণফোনের তালিকাভুক্তি ৭০০ পয়েন্টের বেশি বাড়িয়ে দেয় ডিএসই’র সাধারণ সূচক। একই সময়ে গড় লেনদেন ৩২০ কোটি টাকা থেকে পৌঁছে যায় ৬০৪ কোটি টাকায়। তবে ২০১০ সাল আরো ভিন্ন মাত্রা যোগ করে পূঁজিবাজারে। এ সময় ডিএসই’র গড় লেনদেন ২০০৯ সালের ৬০৪ কোটি টাকা থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে দেয়। দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও দুই পূঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের বিশেষ কর্মসূচিসহ ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশকে বাজারের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন জেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়ে এর কার্যক্রম। এতে বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়ে যায় ব্যাপক ভিত্তিতে।

২০০৯ সাল শেষে দেশে মোট বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ, যা ২০১০ সাল শেষে ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ এই এক বছরে পূঁজিবাজারের সাথে নতুন করে যুক্ত হয় আরো ১২ লাখ মানুষ। তবে এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৯ সাল পর্যন্ত পূঁজিবাজারে যে বিও অ্যাকাউন্ট ছিল তার ৫০ শতাংশ নিষ্ত্র্নিয় ছিল। কিন্তু পরে বৃদ্ধি পাওয়া বিও অ্যাকাউন্টের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে ৭০ শতাংশের বেশি। এ বছর পূঁজিবাজারে যুক্ত হয় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং মহিলা বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ। এ বিনিয়োগকারীদের বদৌলতে বছরজুড়ে লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে রেকর্ড উন্নতি ঘটে পূঁজিবাজারে। ৩০ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে ডিএসই’র লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯৩২ কোটি টাকা। তবে ২০০৯ সালে ডিএসই’র সর্বোচ্চ লেনদেন ছিল এক হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর এ লেনদেন পৌঁছে যায় তিন হাজার ২৪৯ কোটি টাকায়। গত দুই বছরের গড় লেনদেনের তুলনা করলে লেনদেনে প্রবৃদ্ধির বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে ডিএসই’র গড় লেনদেন ছিল ৬০৪ কোটি টাকা, যা ২০১০ সালে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় যেখানে প্রবৃদ্ধি ঘটে এক দশমিক ৬৮ শতাংশেরও বেশি।

পূঁজিবাজারের এ প্রবৃদ্ধি ঘটে মূলত দেশের বিনিয়োগযোগ্য অন্যান্য খাতে নজিরবিহীন স্থবিরতার পরিপ্রেক্ষিতে। সেবা ও শিল্প খাতে এ সময় বিনিয়োগ ছিল খুবই শ্লথ। একই সাথে অন্যান্য খাতের স্থবিরতার কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও নিজেদের সীমার বাইরে পূঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতের উদ্যোক্তারা মূলধনের একটি অংশ পূঁজিবাজারে নিয়ে আসে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে নেয়া মূলধনী ঋণের একটি অংশও চলে আসে পূঁজিবাজারে। পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে পূঁজিবাজারকে। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এ সময় বাজারে ঢুকে পড়েন যা পূঁজিবাজারকে অযৌক্তিভাবে বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় নিয়ে যায়। বছরের শেষ দিকে এসে এ প্রবণতা ব্যাপকভাব বেড়ে যায়। বাড়তে থাকে বাজারের লেনদেন ও মূল্যসূচক। এ সময় কোম্পানির আর্থিক অবস্থার কোনো রকম বাছ-বিচার না করে শেয়ার কিনতে থাকেন বিনিয়োগকারীরা, যা বাজারের ঝঁুকি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। ৬ অক্টোবর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ সূচক প্রথমবারের মতো ছয় হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করে। কিন্তু এর ঠিক দুই মাসের মাথায় ৫ ডিসেম্বর এ সূচক পৌঁছে যায় আট হাজার ৯১৮ পয়েন্টে। যেখানে আগের নয় মাসে ডিএসই’র সাধারণ সূচক বেড়েছে এক হাজার ৫০০ পয়েন্ট সেখানে শেষ দুই মাসে তা বেড়ে যায় তিন হাজার পয়েন্ট।

বাজার পরিস্থিতিতে শঙ্কিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে একের পর এক পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। প্রথমে ঋণসুবিধা হ্রাস করেও কোনো ফল না পেয়ে শেষে ব্রোকার মার্জিন বৃদ্ধি, সম্পদ মূল্যভিত্তিক ঋণ ফর্মুলার মতো অস্পষ্ট নিয়ম জারি করে এসইসি। এ ছাড়া শিল্পঋণের একটি বড় অংশ পূঁজিবাজারে ঢুকে পড়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের গোচরে এলে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এ ঋণ সমন্বয়ের নির্দেশ জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে পূঁজিবাজারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয় করতে আলাদা নির্দেশ প্রদান করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডিসেম্বরের ৬ ও ৭ তারিখে পরপর দু’টি নির্দেশ জারি করা হয় এসইসি’র পক্ষ থেকে। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দু’টি নির্দেশ পূঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ৮ ডিসেম্বর পূঁজিবাজারে ব্যাপক দরপতন ঘটে। এক ঘণ্টার ব্যবধানে ডিএসই সূচক হারায় ৫৪৭ পয়েন্টের বেশি।

এরপরই পূঁজিবাজারে শুরু হয় অস্থিরতা। ১৯ ডিসেম্বর আবার ৫৫১ পয়েন্ট সূচক হারায় ডিএসই। পূঁজিবাজারের এ পতন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সরকারের ওপর মহলে ব্যাপক নাড়া দেয়। ১৯ ডিসেম্বর এসইসি তাদের চারটি সাকুêলার প্রত্যাহার করে নেয়। একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে এসইসি’র বৈঠকে শিল্পঋণ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা এক মাস করে বাড়িয়ে দেয়া হয়।

আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে পূঁজিবাজারে। এ বছরের পূঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ছিল ৭ জুলাই ডিএসই’র লেনদেন ৫০০ কোটি টাকায় নেমে আসা। তারল্য সঙ্কটের কারণে এ দিন বাজারে লেনদেন নেমে আসে ৫০৬ কোটি টাকায়। পরদিন এসইসি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউজের সর্বোচ্চ ঋণসীমা ১ অনুপাত ১ শমিক ৫ এ বাড়িয়ে দেয়। ৮ ডিসেম্বর এক ঘণ্টার ব্যবধানে ডিএসই প্রধান সূচকটির ৫৪৭ পয়েন্ট অবনতি ঘটে যা আধঘণ্টার ব্যবধানে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

তবে সবচেয়ে বড় দরপতন ঘটে ১৯ ডিসেম্বর। এ দিন ৫৫১ পয়েন্ট হারায় ডিএসই সূচক যা ছিল পূঁজিবাজারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দরপতনের ঘটনা। আবার পরদিন ৩০৪ পয়েন্ট বেড়ে যায় সূচকটি, যা ডিএসই’র এক দিনে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে রেকর্ড।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: