ডায়াবেটিস থেকে অন্ধত্ব : চর্বিতে লিভারের ক্ষতি : ডায়াবেটিস রোগীর নাস্তা

ডায়াবেটিস থেকে অন্ধত্ব

ডা. ফারহানা হোসেন
ডায়াবেটিস একটি হরমোনজনিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত হলে অনেকে চিন্তিত হয়ে পড়েন। অবশ্য চিন্তিত হওয়ার কথাও বটে, কারণ ডায়াবেটিসে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে একটু সচেতন হলেই ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারি। ডায়াবেটিসে শরীরের যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয় চোখ তার মধ্যে একটি। চোখ অমূল্য সম্পদ, সাধারণভাবেই চোখের যত্ন নেওয়া উচিত। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের যেহেতু চোখের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে তাই যত্নটা একটু বেশিই নিতে হবে ।

ডায়াবেটিসে হঠাৎ কারও দৃষ্টিশক্তি লোপ পেতে পারে, তাই তাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে সে ঝাপসা দেখছে কি-না। এই রোগে ব্লাড সুগার বেড়ে গেলে চোখের পাওয়ার বারবার পরিবর্তন হতে পারে । আপনি হয়তো ডাক্তার দেখিয়ে চশমা কিনে পরছেন, ক’দিন পরই ঝাপসা দেখতে পারেন এবং চশমা বদলাতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ডাক্তারের ওপর অসন্তুষ্ট হলেও মূলত ডায়াবেটিসের জন্যই এমনটি ঘটে। চালশে রোগ বাংলাদেশের একটি পরিচিত চোখের সমস্যা। সাধারণত চলি্লশ বছরে হয় বলে এ দেশের সাধারণ মানুষ একে চালশে রোগ বলে। ডায়াবেটিসে চোখে চালশেজনিত সমস্যা তাড়াতাড়ি হয়, অর্থাৎ কারও চলি্লশের আগেও চালশে হতে পারে। তাছাড়া ডায়াবেটিস রোগীর চোখের পাতার লোমকূপের ইনফেকশন, চোখের প্রেসার বেড়ে যাওয়া, চোখের মাংসপেশি অবশ হওয়া, চোখের ছানি, চোখের যে কোনো ঘা দেরিতে শুকানো, চোখের দূরদৃষ্টিজনিত সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে। তবে সবচেেেয় বেশি ক্ষতি হয় যখন এ রোগে চোখের রেটিনা ও ভিট্রাস আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছোট রক্তনালি সরু হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এতে রেটিনাতে অক্সিজেনের অভাবে অপুষ্টিজনিত কারণে প্রদাহ ও নতুন রক্তনালি তৈরি হয়, যা থেকে রক্তপাত হয়। রেটিনাতে পানি জমে ফুলে যায়, ভিট্রিয়াসে রক্তপাত হয় এবং পরবর্তী সময় রেটিনা আলাদা হয়ে সরে যেতে পারে। একে রেটিনাল ডিটাচমেন্ট বলে। চোখ পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় রেটিনোপ্যাথি হয়েছে, তাহলে রেটিনার ছবি এবং এনজিওগ্রাম করে নেওয়া ভালো। এতে পরবর্তী সময় রেটিনার পরিবর্তন এবং রেটিনোপ্যাথির অবস্থান নির্ণয়ে সুবিধা হয়। এনজিওগ্রামের মাধ্যমে রক্তপাত, ভঙ্গুর রক্তনালির অবস্থান এবং রক্তহীন এলাকা পরিমাপ করা যায়। রেটিনোপ্যাথির পরিমাণ যদি খুবই সামান্য থাকে তাহলে কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। যদি সমস্যা বেশি হয়, লেজার চিকিৎসার মাধ্যমে চোখের রক্তক্ষরণজনিত এ সমস্যা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটি কিছুটা ব্যয়বহুল। আবার এর মাধ্যমে যে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে, তাও নয়। রোগ যাতে আর অগ্রসর না হয় তাই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ডায়াবেটিস রোগীর চোখের অভ্যন্তরীণ প্রেসার বেড়ে গিয়ে যখন গল্গুকোমা হয় তখন তা অপটিক নার্ভকে আক্রান্ত করতে পারে, যা থেকে অপটিক নার্ভ শুকিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষতি কোনো চিকিৎসার মাধ্যমেও ভালো হয় না। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনে ওষুধ সেবন করতে হবে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ আছে কি-না তা দেখার জন্য নিয়মিত রক্তে শর্করার পরিমাণ দেখতে হবে। প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীকে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে হবে। ডাক্তার সাধারণত রিফ্রাকশন করে চোখের পাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে কি-না, স্লিটল্যাম্পের মাধ্যমে ছানি রোগ হলো কি-না এবং অফথালমোস্কোপের মাধ্যমে চোখের রেটিনা পরীক্ষা করে থাকেন। যেসব রোগী অল্প বয়স থেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অর্থাৎ যারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিননির্ভর তাদের পরবর্তী সময় রেটিনোপ্যাথি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ রোগীদের প্রতি চার-ছয় মাস অন্তর চোখ পরীক্ষা করে নেওয়া উত্তম। এভাবে নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা করানোর মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগী চোখের জটিল সমস্যা থেকে নিজেকে অনেকটাই মুক্ত রাখতে পারবেন।
চেক্ষু বিশেষজ্ঞ ও রেজিস্ট্রার
ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল, ঢাকা

চর্বিতে লিভারের ক্ষতি

ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল)
একটা সময় ছিল যখন ধারণা করা হতো, হার্ট বা ব্রেনে চর্বি জমে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো ভয়াবহ রোগ হলেও লিভারের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। কিন্তু বিগত দশকে সে ধারণায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি আজ প্রমাণিত, ফ্যাটি লিভার লিভারের অন্যতম প্রধান রোগ। পশ্চিমা বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব ব্যাপক। শতকরা ২০ ভাগ আমেরিকান ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। আমাদের দেশেও এ চিত্র বিশেষ করে শহর এলাকায় খুব একটা কম নয়।
ডায়াবেটিস রোগীর এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি। ফ্যাটি লিভারের অন্য উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বি বেশি থাকা, থাইরয়েডের সমস্যা, ক্রনিক হেপাটাইটিস-সি এবং ইনসুলিন রেজিস্টেন্স।
এটি এখন সুপ্রতিষ্ঠিত, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ ফ্যাটি লিভার। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত অনেকেরই লিভারে ক্রনিক হেপাটাইটিস দেখা দিতে পারে, যাকে আমরা বলি স্টিয়াটো হেপাটাইটিস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের পর ফ্যাটি লিভারই এদেশে ক্রনিক হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ।
বেশিরভাগ ক্রনিক লিভার ডিজিজ রোগীর মতো ফ্যাটি লিভারের রোগীদেরও কোনো লক্ষণ থাকে না। তাদের কেউ কেউ পেটের ডান পাশে ওপরের দিকে ব্যথা বা অস্বস্তি, দুর্বলতা কিংবা খুব অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ার কথা বলে থাকেন। শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাদের প্রায় ৫০ ভাগেরই লিভার বড় পাওয়া যায়। রক্ত পরীক্ষায় সিরাম ট্রান্স-এমাইনেজ বেশি থাকতে পারে। তবে এটি স্বাভাবিক থাকলেই যে লিভারে হেপাটাইটিস নেই এ কথা বলা যায় না। ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পরীক্ষাটি হচ্ছে আল্ট্রাসনোগ্রাম, যদিও সিটিস্ক্যান বা এমআরআই এক্ষেত্রে বেশি নির্ভরযোগ্য।
তবে নিশ্চিত করে ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ের পরীক্ষাটি হচ্ছে লিভার বায়োপসি।
ফ্যাটি লিভার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো, লিভারে সিরোসিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রতিরোধ করা। অতিরিক্ত মেদ কমানো ফ্যাটি লিভার চিকিৎসার একটি অন্যতম দিক। ওজন কমানোর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিকল্পিত ডায়েট কন্ট্রোল, এক্সারসাইজ, ওষুধ সেবন কিংবা প্রয়োজনে অপারেশন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারের কারণ নির্ণয় ও তার যথাযথ চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদেশেও সীমিত পরিসরে গবেষণা চলছে। শতভাগ কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত না হলেও, বাজারে কিছু ওষুধ আছে, যা ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় উপকারী। এর বেশিরভাগ বাংলাদেশেও পাওয়া যায়।
সেহকারী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বিএসএমএমইউ

ডায়াবেটিস রোগীর নাস্তা

আমাদের জানা ভালো, দিনে রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বেলার খাবার তাহলো প্রাত:রাশ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য তো বটেই।

নিউইউর্ক সিটির নিউইউর্ক প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতালে সেন্টার ফর ডায়াবেটিসের ডায়াবেটিস এডুকেটার ও ডায়েটিশিয়ান এরিকাত্ররাসিস বলেন, “বিপাকীয় বিচারে ও পুষ্টির বিচারে প্রাত:রাস রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণের বড় ভূমিকা নিতে পারে। শরীরকে এটি এমন পুষ্টি যোগায়, যাতে সারাদিন শরীরে বলশক্তি পাওয়া যায়।”

নিউইউর্ক সিটির বাথ ইসরায়েল মেডিকেল সেন্টারের ফ্রিডম্যান ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউটের অন্য এক ডায়াবেটিশিয়ান জেনিফার রেজেস্টার বলেন, ডায়াবেটিক অনেক রোগী রক্তের সুগার মান নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রাত:রাশ এড়িয়ে যান। যা ঘটে তা হলো, তাদের রক্তের সুগার মান অনেক নিচে নেমে আসে। ফলে তাঁরা খুবই ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে আর এজন্য মধ্যহ্নে অতিভোজ করে, অতিভোজন করে রাতের বেলাতেও। এতে ঘটে রক্তের সুগার মানে চড়াই উৎরাই। অথচ সেব্যক্তি ভালো করে প্রাত:রাশ খেলে এমন বিপত্তি ঘটতোনা।

যদি কোনো লোক সকালবেলা উঠে দেখেন রক্তের সুগার মান উচুতে যেমন ৩০০ মিলিগ্রাম তবু প্রাত:রাশ খেতে হবে, তবে এতে প্রোটিনের প্রাধান্য থাকবে। শর্করা সামান্য খেলে হয়, যেহেতু রক্তের শর্করা উচুতে। আর সেজন্য একে আর বাড়ানোর প্রয়োজন নাই। তবে পরের বেলার খাবারে যখন রক্তের সুগার নেমে আসবে, তখন আবার শর্করাকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ঢোকাতে পারবো খাবারে।

কি খেতে হবে ?

প্রাত:রাশে চাই সুষম খাবার। ভালো প্রাত:রাশে থাকবে প্রোটিন, মেদ ও জটিল শর্করা যেমন আটার রুটি বা ঢেঁকিছাটা লাল চাল বা ওটমিল্ । ফল খেতে হয়। জার ফলের জুসের চেয়ে গোটা ফল অনেক ভালো। ফলের জুস খেলে রক্তের সুগার মানের যে উঠানামা হয়, গোটা ফল খেলে তা হয়না। তাই কমলার রসের চেয়ে গোটা কমলা, নাসপাতি বা আপেল অনেক ভালো। প্রাত:রাশের জন্য অনেকগুলো ভালো বিকল্প আছে যেমন-
০০ ১ টি ডিমের শ্বেত অংশের ওমলেট, একসস্নাইস আটার রুটি, এক টুকরো ফল।
০০ একটি ডিমের স্যান্ডউইচ, আটার রুটি আর এক টুকরা ফল।
০০ প্রতিসপ্তায় ৪টি ডিমের বেশি খাওয়া ঠিক হবেনা সেজন্য ডিমের শ্বেত অংশের স্যান্ডউইচ নিলে ভালো, অথবা একটি ডিমের সঙ্গে দুটো বা তিনটি ডিমের শ্বেতঅংশের ক্্রাম্বল করে খেতে পারেন।
০০ এক বাটি ওটমিল তৈরি করুন। অর্ধেক বাটি ওট বাজইচূর্ণ নিয়ে। শস্যখাদ্য বেশি খাওয়া হয়ে যায় সহজেই, তাই কতখানি নিলেন তা বেশি গুরতি্বপূর্ণ।
০০ দুই সস্নাইস গমের রুটি এবং পিনাট মাখন দিয়ে তৈরি স্যান্ডউইচ খাওয়া যায়।
০০ দধি, বাদাম ও ফল। টকদই, বাদাম এবং ফল।
০০ খই/মুড়ি/পপকর্ন এবং ননীহীন দুধ।
০০ আশযুক্ত শস্য খেলে রক্তের সুগার থাকে সুনিয়ন্ত্রণে।

অধ্যাপক ডা: শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক
ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: