প্রতারক চক্র শাস্তির আওতায় বাইরেঃ প্রবাসীদের জমি-জমার উপর নজর এখন জালিয়াত চক্রের

রাজধানীতে জমি দখলে তৎপর প্রতারক চক্র

 

বসতবাড়ি নিয়ে সংশয়ে প্রবীণ সাংবাদিক

রাশেদ মেহেদী
রাজধানীর এক অভিজাত এলাকার জমি প্রতারণার মাধ্যমে দখল চেষ্টার তথ্য পাওয়া গেছে। এ প্রতারক চক্রের গডফাদার হিসেবে ক্ষমতাসীন মহাজোটের সাংসদ আবদুস সাত্তার এবং দেশের একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। রাজনৈতিক নেতা, রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ও প্রশাসনের যোগসাজশে জমি দখলে জালিয়াত চক্র কীভাবে কাজ করে তার একটি চিত্র পাওয়া গেছে সরকারি এক তদন্ত প্রতিবেদনে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রতারক চক্রটি কৌশলে দেশের প্রথিতযশা এক প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রহিমের বাড়ি দখলের চেষ্টা করছে। ১৯৯৯ সাল থেকে ওই বাড়িটি দখলের তৎপরতা শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে পূর্তমন্ত্রী মীর্জা আব্বাসের কাছেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন আবদুর রহিম। বর্তমান মহাজোট সরকারের অনেক মন্ত্রীও দখল প্রক্রিয়ার বিষয়টি জানেন বলে প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রহিম দাবি করেন। এদিকে সমকালের সঙ্গে আলাপকালে সাংসদ আবদুস সাত্তার বলেন, সাংবাদিক আবদুর রহিম বাড়িটির মূল মালিক নন; তিনি সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছেন।
ঘটনার শুরু যেভাবে : সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, লন্ডনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার এবং ‘দি বাংলাদেশ অবজারভারে’র সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রহিম ১৯৬৭ সালের ২২ মে সরকারিভাবে গুলশানের তৎকালীন ১৫নং সড়কে একটি প্লট বরাদ্দ পান। একই সময়ে এবিএম মূসাসহ কয়েকজন খ্যাতনামা সাংবাদিক সে সময় প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৪ মে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট তাদের বাড়ি নির্মাণের অনুমতি দেয়। পরে সোনালী ব্যাংক এবং হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করা হয়। এদিকে ১৯৯৯ সালে এক ব্যক্তি রাজউকে গিয়ে নিজেকে আবদুর রহিম পরিচয় দিয়ে এ জমির মালিকানা দাবি করেন। মোস্তফা নামে এক ব্যক্তিকে তিনি আমমোক্তার নিয়োগ করতে চান। সাজানো আবদুর রহিমের কাগজপত্র সন্দেহজনক মনে হলে রাজউকের তৎকালীন উপ-পরিচালক (এস্টেট) মজিবুর রহমান বিষয়টি তদন্ত করেন এবং জালিয়াত চক্রকে চিহ্নিত করেন। তবে রহস্যজনক কারণে এ চক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে ভুয়া আবদুর রহিমসহ এ জালিয়াত চক্রের অন্যরা ‘উধাও’ হয়ে যায়।
২০০৬ সালে একই চক্র আবার তৎপরতা শুরু করে। আবদুর রহিম ঘটনার বিবরণ দিয়ে সমকালকে জানান, এক সন্ধ্যায় তার কাছে একটি ফোন আসে। ফোনে এক ব্যক্তি নিজের পরিচয় না দিয়েই তার কাছে জানতে চায়, তিনি তার গুলশানের বাড়িটি বিক্রি করবেন কি-না। পরিচয় জানতে চাইলে কলদাতা ফোন রেখে দেন। পরে আবার ফোন করে ওই ব্যক্তি তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী মীর্জা আব্বাসের অফিসে যেতে বলেন। আবদুর রহিম মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে জানতে পারেন, কলদাতা ওই ব্যক্তি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তা। মন্ত্রীর সামনেই ওই কর্মকর্তা আবদুর রহিমকে বলেন, তিনিই তাকে ফোন করেছিলেন। আবদুর রহিমকে মন্ত্রী মীর্জা আব্বাস জিজ্ঞেস করেন, তিনি গুলশানের বাড়ি বিক্রি করবেন কি-না। বাড়িটি বিক্রির কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান আবদুর রহিম। পরে তিনি মির্জা আব্বাসকে বলেন, তার বাসভবনের পাশেই গুলশান লেকের ওয়াকওয়েতে ওই কর্মকর্তা তার আত্মীয়ের নামে জমি দখল করেছেন। ওই জমির পাশেই তার জমি হওয়ায় এ জমিও দখলের চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতারক চক্রের জাল যেভাবে বিস্তৃত হলো : ওই রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কর্মকর্তা গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতার হয়ে জেলে যান। তবে প্রতারকদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। শাহজাহান মোল্লা নামে এক ব্যক্তি নিজেকে প্রবাসী এক আবদুর রহিমের আমমোক্তার পরিচয় দিয়ে এই জমি বিক্রির ঘোষণা দেন। শাহজাহান মোল্লা নিজেকে আমমোক্তার দাবি করলেও তার দাবিদার মালিক প্রবাসী আবদুর রহিমকে কোথাও উপস্থাপন করতে পারেননি। ২০০৮ সালের ৫ মে প্রতারক চক্রের অপর দুই সদস্য ক্রেতা সেজে বাড়ির প্রকৃত মালিক আবদুর রহিমের কাছে যান। আবদুর রহিম ঘটনা বুঝতে পেরে পুলিশে খবর দিলে তারা গ্রেফতার হন। পরে ভুয়া আমমোক্তার শাহজাহান মোল্লা ও শাহজাহান সিরাজকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা হয়। এ মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আবদুর রহিম জানতে পারেন, তার জমি দখলের জন্য এরই মধ্যে প্রতারক চক্র একটি দেওয়ানি মামলা করেছে। শুরু হয় ন্যায়বিচারের আশায় আদালতপাড়ায় ঘুরে বেড়ানো। সেই থেকে এখন পর্যন্ত আদালতপাড়ায় ঘুরছেন দেশের প্রবীণ এ সাংবাদিক।
এরই মধ্যে প্রতারক চক্র জামিনে বের হয়ে এসেছে, প্রায় তিন বছরেও মামলার রায় হয়নি। যথাযথ প্রমাণ থাকলেও প্রতারক চক্র শাস্তির আওতায় আসেনি। বরং প্রতারক চক্র চলতি বছরের জুনে একদল সন্ত্রাসী পাঠায় রাজউকের মহাখালী শাখা অফিসে। তারা সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবদুর রহিমের বাড়ির নথিপত্র দেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। এ ঘটনার পর থানায় জিডি করেন সাংবাদিক আবদুর রহিম। তিনি সমকালকে জানান, বর্তমানে সরকারি দলের সংসদ সদস্য আবদুস সাত্তার নতুন গডফাদার হিসেবে প্রতারক চক্রকে মদদ দিচ্ছেন। বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলের অনেকেই অবহিত। তারপরও আবদুস সাত্তারের নাম উল্লেখ করে প্রতারক চক্র প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে তাকে। আলাপকালে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে জানতে চান, শেষ জীবনে আর কত হয়রানির শিকার হলে প্রতারক চক্রের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হবে? ‘নিশাচরের নিশিদিন’ খ্যাত সাংবাদিক আবদুর রহিমের আক্ষেপ_ বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ প্রভাবশালী অনেকেই প্রকৃত ঘটনা জানেন, প্রতারক চক্রকেও চেনেন, তারপরও তাকে হয়রানি আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে!
সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে প্রতারক চক্রের জালিয়াতি : আদালতে মামলা থাকলেও বর্তমান সরকারের আমলে সাংবাদিক আবদুর রহিমের সেই বাসভবন এবং জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। গত ১৩ ডিসেম্বর দুটি কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়। রিপোর্টে বলা হয়, মূল বরাদ্দপত্রে প্লটের মালিকের নাম লেখা আছে আবদুর রহিম (স্টাফ করসপনডেন্ট, দি পাকিস্তান অবজারভার)। প্রস্তাবিত প্লট ২০-এ, রোড-১৫ এবং জমির পরিমাণ ১০ কাঠা ১ ছটাক উল্লেখ করা আছে। বাড়িতে বর্তমানে বসবাসরত আবদুর রহিম যে বরাদ্দপত্র দিয়েছেন তার সঙ্গে মূল বরাদ্দপত্রের হুবহু মিল রয়েছে। অন্যদিকে আমমোক্তার দাবিদার শাহজাহান মোল্লা যে বরাদ্দপত্র জমা দিয়েছেন সেখানে লেখা আছে_ বরাদ্দ প্রাপকের নাম মোঃ আবদর রহিম, এস/ও এমভি আবদুস সোবহান, ঠিকানা : প্লট ২০-এ, ডবি্লউ (সি) রোড-১৫ (পুরনো), ২৬ (নতুন)। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা ৩ ছটাক দেখানো হয়েছে। সরকারি তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, শাহজাহান মোল্লা প্রদর্শিত বরাদ্দপত্রে মূল নথির সঙ্গে কয়েকটি বড় অসঙ্গতি রয়েছে। যেমন ১৯৬৭ সালে গুলশানে নতুন রাস্তা বলে কিছু ছিল না। শুধু একটি সড়ক (নং-১৫) উল্লেখ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সড়কের নতুন নম্বর দেওয়া হয় আরও প্রায় বিশ বছর পর। অতএব ১৯৬৭ সালের বরাদ্দপত্রে ২৬নং নতুন সড়কের উল্লেখ অসম্ভব। ১৯৬৭ সালে বরাদ্দকৃত জমির পরিমাণ ছিল ১০ কাঠা ১ ছটাক। এর কয়েক বছর পর জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় জমির প্রকৃত পরিমাণ ১০ কাঠা ৩ ছটাক পাওয়া যায়। ফলে ১৯৬৭ সালের বরাদ্দপত্রে ১০ কাঠা ৩ ছটাক উল্লেখ কোনোভাবেই সঠিক নয়। এছাড়া বরাদ্দপত্রে মালিকের নামের আগে মোঃ উল্লেখ না থাকলেও প্রতারক চক্রের বরাদ্দপত্রে মোঃ উল্লেখ আছে। তৎকালীন সরকারি বরাদ্দপত্রের শিরোনামে স্যার/ম্যাডাম উল্লেখ থাকত। প্রতারক শাহজাহান মোল্লার বরাদ্দপত্রে শুধু স্যার উল্লেখ আছে, ম্যাডাম নেই। তদন্ত কমিটি এসব প্রমাণ তুলে ধরে বর্তমানে বসবাসকারী সাংবাদিক আবদুর রহিমকে প্রকৃত মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছে। রিপোর্টে শাহজাহান মোল্লার প্রদর্শন করা কাগজপত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বিধায় তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানানো হয়েছে। সরকারি তদন্ত রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ৪ নভেম্বর রাজউকে পূর্বনির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী সাংবাদিক আবদুর রহিম উপস্থিত হলেও শাহজাহান মোল্লা তার আমমোক্তারদাতা আবদুর রহিমকে উপস্থিত করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি কোথায় বাস করেন তাও জানাতে পারেননি শাহজাহান মোল্লা। মূলত শাহজাহান মোল্লার দাবি করা আবদুর রহিমের অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত কোথাও দেখা যায়নি। এই ‘অদৃশ্য’ রহিমকে পুঁজি করেই দৃশ্যমান রয়েছে এই প্রতারক চক্র।
সাংসদ আবদুস সাত্তারের বক্তব্য : বর্তমানে প্রতারক চক্রের নতুন গডফাদার হিসেবে উঠে এসেছে সরকারি দলের সাংসদ আবদুস সাত্তারের নাম। শনিবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমমোক্তার দাবিদার শাহজাহান মোল্লা তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এ কারণে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তিনি দাবি করেন, সাংবাদিক আবদুর রহিম মূল মালিক নন এবং তিনি সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছেন। তিনি শাহজাহান মোল্লাকেই আমমোক্তার সূত্রে প্রকৃত মালিক উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিক আবদুর রহিমের কাছে প্রকৃত কাগজপত্র নেই। তার বাড়ির রেজিস্ট্রেশন নেই, তিনি আদালতেও কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। সরকারি তদন্ত রিপোর্টের উল্লেখ করে শাহজাহান মোল্লার কাগজপত্রে ১৯৬৭ সালে নতুন রাস্তা উল্লেখসহ একাধিক ভুল তথ্যের ব্যাপারে জানালে তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতে আছে, সেখানেই সমাধান হবে।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: