সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে, যার ফলে জোয়ারের পানিতে উঁচু স্থানগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা-খরা বাড়ছে। হারিয়ে যাচ্ছে এ দেশের ঋতু বৈচিত্র্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সর্বোচ্চ ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ

কু তু ব উ দ্দি ন প্র ধা ন

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরির্বতনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কয়েক দশক আগে থেকেই। দিন যত অতিবাহিত হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তত বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৭০টি দেশের ওপর জরিপ চালিয়ে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান মেপলক্রাফট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বাংলাদেশের। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, আফগানিস্তান, পাকিস্তানসহ জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি সূচক শীর্ষক সমীক্ষায় ১৬টি দেশের তালিকা করা হয়েছে, যে দেশগুলো আগামী ৩০ বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এর মধ্যে ৫টি দেশই দক্ষিণ এশিয়ার। এই দেশগুলোতে বন্যা, খরা, ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস চরমভাবে বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে সমুদ্র এলাকার আঞ্চলগুলো সাগরবক্ষে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রের তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জোয়র দেখা দেবে; এই জোয়ারের পানি আবাদি জমিতে ঢুকে ফসলের চরম ক্ষতি করবে। লবণাক্ত পানির মধ্যে উত্পাদন উপযোগী ধানের উদ্ভাবন এখনও ঘটেনি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জনসাধারণের মরণফাঁদ যশোর ভবদহের স্লুইস গেট। যা দিয়ে ২৭টি নদীর পানি প্রবাহিত হওয়ার কথা; কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে অধিক পরিমাণে পলি পড়তে থাকায় শুকিয়ে তা বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন নিঃসন্দেহে একটি আশ্চর্য স্থান। জীববৈচিত্র্যের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ স্থানটি হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আসছে। সেই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ তার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহী করে। তাতে এডিবি’র সহায়তায় জীববৈচিত্র্য প্রকল্প চালু করার পাঁয়তারা জনসাধারণের আন্দোলনের মুখে বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এটা ছিল তাদের ধ্বংসের পরিকল্পনা। মাগুরছড়ার টেংরাটিলায় বহুজাতিক কোম্পানি নাইকো, অক্সিডেন্টাল ও ইউনোকলের আগ্রাসনে বিপর্যস্ত হয়েছে জনজীবন। অতিমাত্রায় কার্বন নির্গমনের ফলে বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তর ক্ষয় হচ্ছে, গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে, যার ফলে জোয়ারের পানিতে উঁচু স্থানগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা-খরা বাড়ছে। হারিয়ে যাচ্ছে এ দেশের ঋতু বৈচিত্র্য। জাতিসংঘ আয়োজিত ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মানবসৃষ্ট প্রকৃতির বিপর্যয় থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষায় পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে প্রত্যক্ষ সমর্থন ব্যক্ত করন সব দেশের উপস্থিত প্রতিনিধিরা। জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে; প্রকৃতির এই রং বদলানোর জন্য দায়ী দেশগুলোকে বাধ্য করতে হবে ভুক্তভোগী দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে। গত ২১ অক্টোবর বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কার্যালয় ও বাংলাদেশ সরকার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে। এতে ১১টি দেশের যৌথ বক্তব্য ঢাকা ঘোষণা নামে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থাস্থ্য খাতে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ২০৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ১৪ হাজার ৬৩০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। মেক্সিকোর কানকুনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে এই হিসাব তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। কোপেনহেগেনের সম্মেলনে স্থাস্থ্য খাত উপেক্ষিত ছিল। কাজেই কানকুন সম্মেলনে স্থাস্থ্যকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে দেশব্যাপী ডায়রিয়া, আমাশয়, ম্যালেরিয়া, চোখের সমস্যা ও সংক্রামক ব্যাধির পরিমাণ বাড়ছে। স্থাস্থ্য বিষয়ক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর ৫৫ জন প্রতিনিধি, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের স্থাস্থ্যমন্ত্রী এবং বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকসহ সবার অংশগ্রহণে ঢাকায় ৩ দিনব্যাপী বৈঠক হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং অর্থ সংগ্রহ ও প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে আইলা ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলবাসীর জন্য হাসপাতাল নির্মাণ, মেরামত ও চিকিত্সা বাবত ব্যয় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে ক্ষতির দিক বিবেচনায় পৃথিবীর সব দেশকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন— উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ ও সর্বনিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ। ১৬ কোটি ৪৪ লাখ মানুষের বাস ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই ছোট দেশটিতে। এই দেশটি সর্বাধিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে রয়েছে ১১টি দেশ। তার মধ্যে নরওয়ে সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থানে। যারা নিরাপদে আছেন তারা নিরাপত্তার জন্য আরও জোরালোভাবে কাজ করছেন। তারা তাদের নিম্নাঞ্চল বাঁচানোর জন্য এখনি যথেষ্ট প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অথচ আমরা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশে বসবাস করেও জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিমুক্ত থাকতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেইনি। এ ব্যাপারে আমরা একেরারেই উদাসীন। বর্তমানে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অনেক কাজ করার প্রয়োজন, যা আমরা মোটেই করছি না। এদেশের বনভূমি থাকার কথা ছিল মোট ভূমির ৩০ ভাগ, বর্তমানে তা ১০ ভাগ আছে কিনা সন্দেহ। সব ধ্বংস ও উজাড় হয়ে গেছে। বনের কাঠ জ্বালানি, ইটভাটা ও আবাসনের প্রয়োজনে ব্যবহারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে আসছে। ক্ষমতার পালাবদলে ক্ষমতাসীনরা রাতারাতি সংরক্ষিত ও ব্যক্তিমালিকানার বনভূমি উজাড় করে গিলে খাচ্ছে। অথচ সরকার এ ব্যাপারে একেবারেই নীরব। বিগত বছরের তুলনায় বাংলাদেশে এ বছর অনেক কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জলবায়ুর প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষি, মত্স্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও স্থাস্থ্য বিভাগের ওপর। বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, সিডরের মতো ক্ষতিকারক প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা বয়ে যাবে সব সময় আমাদের ওপর দিয়ে। দিন দিন তার তীব্রতা বাড়বে, বিপন্ন হবে মানুষ। বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ শুনতে তখন প্রস্তুত থাকতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের হিসাবে দেখা যায়, একজন আমেরিকান বছরে ২০ টন, অস্ট্রেলিয়ান ১৬ টন, ব্রিটিশ ৯ টন, দক্ষিণ আফ্রিকান ৮ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন করেন। উন্নয়নশীল দেশের একজন নাগরিক, যেমন বাংলাদেশের একজন লোক মাত্র ০.৩ টন গ্যাস নির্গমন করেন। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনুন্নত দেশের মানুষ। ধনী দেশের জনগণের বিলাসী জীবনযাপনে দ্রুত জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো। বাংলাদেশের সিডর তার উপমা। এই সিডরের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেশক’টি জেলা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। তাতে হতাহতের পরিমাণও কম নয়। যে ক্ষতি হয়েছে তা দীর্ঘ কয়েক বছরেও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। তাই ধনী দেশগুলোর অঙ্গীকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিয়ায় ক্ষতিপূরণ, গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস, দুর্যোগ মোকাবিলায় মাল্টিডোনার ফান্ড গঠনসহ সিডর-পরবর্তী সাহায্য প্রদানের অঙ্গীকার অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার।
লেখক : কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: