দেশে নামে-বেনামে সম্পত্তি, অর্থ, ব্যবসা, জমি, বাড়ি, গাড়ি প্রভৃতি হিসাব করলে প্রকৃত কোটিপতির বহুগুনে বেড়ে যাবে। সম্পদের বৈষম্য বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, শ্রম শোষণ যেভাবে চলছে তাতে কোটিপতির সংখ্যা আরো বাড়বে।

দুই বছরে ১০ হাজার কোটিপতি

এম এম মুসা বিগত দুই বছরে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাবে বাংলাদেশে নতুন প্রায় ১০ হাজার কোটিপতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সাড়ে তিন দশকে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানতকারী কোটিপতির সংখ্যা ৫০০ গুণ বেড়েছে। স্বাধীনতার আগে ২২ পরিবার ছিল কোটিপতি, যার মধ্যে ৭ জন ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের। ১৯৭৫ সালে বিভিন্ন ব্যাংকে যাদের হিসাব বা একাউন্ট ছিল তাদের মধ্যে কোটিপতি ছিলেন মাত্র ৪৭ জন। ২০০৯ সালের শেষে ওই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১৩০ জনে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি বছর এই সংখ্যা ২৮ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। শুধু দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে আমানতকারীদের তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেউ অবৈধভাবে বেনামে একাধিক হিসাবে টাকা রাখলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন। কাজেই কোটিপতিদের প্রকৃত সংখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া দেশের এমন অনেক কোটিপতি রয়েছে যাদের ব্যাংকে কোটি টাকা নেই কিন্তু কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। তাদের নাম বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত তালিকায় স্থান পায়নি। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, দেশে নামে-বেনামে সম্পত্তি, অর্থ, ব্যবসা, জমি, বাড়ি, গাড়ি প্রভৃতি হিসাব করলে প্রকৃত কোটিপতির বহুগুনে বেড়ে যাবে। সম্পদের বৈষম্য বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, শ্রম শোষণ যেভাবে চলছে তাতে কোটিপতির সংখ্যা আরো বাড়বে। কোটিপতির তালিকায় শুধু ব্যবসায়ী নয়, সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, জমির মালিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ও তাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিভিন্ন ব্যাংকে ২৩ হাজার ১৩০ জন কোটিপতির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানতকারী কোটিপতির সংখ্যা পাঁচ হাজার ৬০১ জন। রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে এক হাজার ৮৫৪ জন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন ও বিদেশী ব্যাংকগুলোতে এক হাজার ৯৯৬ জন কোটিপতির হিসাব রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ছয় হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে ৫১ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা এবং বিদেশী ব্যাংকে ১০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। কোটিপতি আমানতকারীদের এ সংখ্যা ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতকারীর দশমিক ০৬ শতাংশ এবং তাদের আমানতের পরিমাণ মোট আমানতের এক-তৃতীয়াংশ।  ২০০৮ সালে ব্যাংকিং খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ১৬৩ জন। তাদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতকারীর দশমিক ০৫ শতাংশ এবং আমানতের পরিমাণ ছিল মোট আমানতের প্রায় ৩১ শতাংশ।

১৯৭৫ সালে বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবধারী ৪৭ জন কোটিপতির মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ১০ শতাংশ। ১৯৯০ সালে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩ জনে। আর তাঁদের আমানতের পরিমাণ ছিল ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ১২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার ৫৯৪ জনে। তাদের আমানতের পরিমাণ তখন ছিল প্রায় ব্যাংক খাতের মোট আমানতের সাড়ে ২০ শতাংশ। ২০০১ সালের শেষে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা হয় পাঁচ হাজার ৭৯৯ জন। ব্যাংক খাতে তাঁদের অবদান হয় সাড়ে ২২ শতাংশ। ২০০৬ সালের শেষে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৪৯ জন। তাঁদের আমানতের পরিমাণ ছিল ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ। আশির দশক পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে মাঝারি ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের একটা বিশেষ অবস্থান ছিল। নববইয়ের দশক থেকে ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি আমানতকারীদের আধিপত্য বাড়তে থাকে। নববই দশকে কোটিপতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় ‘৯৩-এর মাঝামাঝি থেকে ‘৯৪ সাল পর্যন্ত এবং ‘৯৬-এর মাঝামাঝি থেকে ‘৯৮ সাল পর্যন্ত। এই দুই সময়ে বছরওয়ারি হিসাবে গড়ে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৫০০ এবং ৩৯৩ শতাংশ।

কোটিপতিরাই বেশি ঋণ নিচ্ছে : সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যার চেয়ে কোটিপতি ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা বেশি। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ প্রবাহের ৬০ শতাংশেরও বেশি ঋণ কোটিপতিদের দখলে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ আমানতকারীদের অধিকাংশই ব্যাংকে টাকা রাখেন সঞ্চয়ের জন্য, অন্যদিকে কোটিপতি গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সঞ্চয়ের চেয়ে ঋণ গ্রহণের প্রবণতাই বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালে ব্যাকিং খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৩৩ হাজার ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ৮৭ লাখ ৮৩ হাজার ৫২৩ জন। এর মধ্যে এক কোটি টাকার উপরে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ২৯ হাজার ৪৫৮ জন। তাদের নেওয়া ঋণের পরিমাণ হচ্ছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৮৫৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র দশমিক ৩৪ শতাংশ আমানতকারী মোট ঋণপ্রবাহের ৬২ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছেন। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোটিপতি ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ২০৬ জন এবং গৃহীত ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণ প্রবাহের সাড়ে ৬২ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কোটিপতি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে চার হাজার ২৫২ জন। ২০০৭ সালে কোটিপতি ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২১ হাজার ২১৫ জন এবং গৃহীত ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণ প্রবাহের সাড়ে ৬০ শতাংশ। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে দেশে এক কোটি টাকার অধিক ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা ছিল মাত্র ২১২ জন। ‘৯০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১২৫ জনে এবং  গৃহীত ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণ প্রবাহের ৩৮ শতাংশ। জুন ‘৯৬ ও ২০০১ সালের শেষে মোট কোটিপতি ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা দাঁড়ায় যথাক্রমে চার হাজার ৫২৬ জন এবং ৮ হাজার ৮৪৪ জন। আর আলোচ্য দুই বছরে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণ প্রবাহের যথাক্রমে ৪৪ শতাংশ এবং প্রায় ৫২ শতাংশ।

সম্পদের বৈষম্য বৃদ্ধি : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০০৫ সালে পরিচালিত জরিপের তথ্যানুযায়ী ২০০০ সালে দেশের সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ চরম দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের আয় ছিল মোট জাতীয় আয়ের দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০০৫ সালে এই আয় দাঁড়ায় দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর বিপরীতে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ধনী পরিবারের আয় মোট জাতীয় আয়ের ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট আয়ের মাত্র ৯ শতাংশ ভোগের সুযোগ পাচ্ছে। অথচ সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ ভোগ করছে ৪৬ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে দেশে শীর্ষ ৫ শতাংশ ধনী ও সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ দরিদ্রের আয়ের ব্যবধান ছিল ২৭ অনুপাত ১। ২০০০ সালে এই ব্যবধান দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৪৭ অনুপাত ১। ২০০৪ সালে পরিচালিত সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর দারিদ্র্যসংক্রান্ত এক জরিপে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে এদেশে ধনী ও গরিবের ভেতর সাধারণভাবে বৈষম্য ছিল ২০ গুণ। ২০০৪ সালে এ বৈষম্য বেড়ে ২৪ দশমিক ৫ গুণ হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে মোট জাতীয় আয়ের ১ দশমিক ৭ শতাংশ পৌঁছেছিল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র্য ১০ ভাগ জনগোষ্ঠীর কাছে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ১০ ভাগ জনগোষ্ঠীর করায়ত্ত হয়েছিল মোট জাতীয় আয়ের ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০৫ সালে এই বৈষম্য আরো বেড়ে সবচেয়ে ধনী ১০ ভাগ জনগোষ্ঠীর কাছে কেন্দ্রীভূত হয় মোট জাতীয় আয়ের ৩৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আর সবচেয়ে গরিব ১০ ভাগ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে মোট জাতীয় আয়ের মাত্র
২ শতাংশ। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বৈষম্য বৃদ্ধির কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। বেসরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭২ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত উচ্চতম ও ন্যূনতম আয়ের অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১-এর বিপরীতে ৪০০। গত ১২ বছরে এই অনুপাত আরো বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞগণ।

বাড়ছে দারিদ্র্য : কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হতদরিদ্রে্যর সংখ্যা। দারিদ্র্যবিমোচন কৌশলপত্র, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী, এনজিও কার্যক্রম, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাসহ বহুবিধ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে ফলাফল শূন্য। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক সামাজিক অবস্থা ২০১০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে দৈনিক এক ডলার ২৫ সেন্ট অর্থাৎ ৪৪ টাকার নিচে আয় করে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থাৎ ১১ কোটি জনসংখ্যার ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৯০ হাজার লোকই দরিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ২০০৫ সালে এক ডলার ২৫ সেন্ট অর্থাৎ ৮৩ টাকার নিচে আয় করে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৩ কোটি ৭৮ লাখ জনগণের ৬ কোটি ৯৬ লাখই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বাজারভিত্তিক দারিদ্র্যবিমোচনের চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে স্বীকার করেছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক গবেষণায়ও দেখা গেছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর পরিমাণ ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন সমুন্নয় বলছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে গত এক বছরে ৬২ লাখ লোক নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এ সময় এই সংখ্যা সাড়ে চার শতাংশ বেড়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর পরিমাণ ৪৫ দশমিক ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশের গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক গবেষণায় দেখা যায়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে ২০০৭-০৮ এই দুই বছরে ৪০ লাখ মানুষ দরিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। চলতি বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আগামী বছর অর্থাৎ ২০১১ সালে দরিদ্রের সংখ্যা আরো বাড়বে। বাংলাদেশে দরিদ্র পরিস্থিতির হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই। এখন পর্যন্ত সরকারি যেসব তথ্য পাওয়া যায় তার সবই ২০০৫ সালের খানাজরিপের তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত। অন্যদিকে ২০০৫ সালের খানাজরিপ ২০০১ সালের সংগ্রহিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। ২০০৫ সালে সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশের দৈনিক মাথাপিছু ২ হাজার ১২২ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করে মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে এদেরকে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী হিসাবে ধরা হয়। ২০০৫ সালের জনসংখ্যা অনুযায়ী ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাসবাস করছে। দারিদ্র্য পরিমাপের সবচেয়ে উন্নত পদ্ধতি হলো মৌলিক চাহিদার ব্যয় পদ্ধতি অনুসারে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ দারিদ্র্য। আর ২৫ দশমিক ১০ শতাংশ হলো চরমভাবে দরিদ্র। শহরবাসী জনগোষ্ঠীর সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং গ্রামে ২৮ দশমিক ৬০ শতাংশ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি মিনিটে ৪ জন শিশু জন্মগ্রহণ করে এবং তাদের মধ্যে একজন হতদরিদ্র। দেশের ১৫ কোটি মানুষের মধ্যে ৩ কোটি খাদ্য ও পুষ্টির অভাবে ভুগছে। তারা ‘চরম দরিদ্র’ বাংলাদেশে প্রতিদিন ২০০ শিশু অপুষ্টিতে মারা যায় আর ২ কোটি ৮০ লাখ লোক প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না।

বাড়ছে মজুরি বৈষম্য : চরম মজুরি বৈষম্যের কারণে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে বৈষম্য। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের আয় বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। ২০০৯ সালে ঘোষিত সপ্তম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন পার্থক্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৯০০ টাকা। যা অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ। ২০০৫ সালে ঘোষিত ষষ্ঠ বেতন কাঠামো অনুযায়ী সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনভোগী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনের পার্থক্য ছিল ২০ হাজার ৬০০ টাকা। আয় বৈষম্য সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতে আরো প্রকট। গার্মেন্টস খাতে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৬৬০ টাকা। অথচ বেসরকারি ব্যাংক বা কোম্পানিতে কর্মরত একজন মহাব্যবস্থাপকের বেতন ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকার বেশি। এখানে আয়বৈষম্য হাজার নয়, লাখ টাকা।

দারিদ্র্য হ্রাসে নিম্ন বরাদ্দ : দারিদ্র্য না কমলেও প্রতিবছরই দারিদ্র্যবিমোচন খাতে ব্যয় বাড়ছে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। ২০১০-১১ অর্থবছরে দারিদ্র্যবিমোচন খাতে সরকারি বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। সরকারি হিসাবের সাড়ে ছয় কোটি দরিদ্র জনগণের দৈনিক মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়ায় মাত্র ৩২ টাকা। এর মধ্যে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব প্রভৃতির কারণে প্রকৃত ব্যক্তিরা প্রদত্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই খাতে খরচ হয়েছে ৬১ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমডিজির অন্যতম লক্ষ্য দারিদ্র্যবিমোচন করতে হলে বাংলাদেশকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে বছরে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ৩৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হবে। বর্তমানে ব্যয় হচ্ছে মাত্র ৫ শতাংশ অর্থ। অপরদিকে চার বছরের ব্যবধানে উন্নয়ন খাতে ব্যয় ৪ দশমিক ৬৮ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে কমেছে। অনুন্নয়ন খাতে বেড়েছে ৮ দশমিক ৮১ থেকে ১১ দশমিক ১ শতাংশ। রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের স্থিতি এরই মধ্যে ১২ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। ঋণ পরিশোধে বাজেটের বিপুল অংশ ব্যয় দারিদ্র্য হ্রাসে বরাদ্দ বাড়াতে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

ন্যূনতম ক্যালোরি গ্রহণ : ২০০৯ সালে পরিচালিত সরকারি এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে বসবাসরত ৩৯ দশমিক ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ৬ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের জীবনে নির্ধারিত ন্যূনতম খাদ্যনিরাপত্তা অনুপস্থিত। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার শিকার এসব মানুষের ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থাৎ ৮ কোটি ৬৯ লাখ অনাহার ও অর্ধাহারে দিন অতিবাহিত করে। ১৪ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তার সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। এদের ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ নিম্নমাত্রার আয়কে তাদের খাদ্য সংকটের প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে।

জাতীয় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও বৈষম্য : ১৯৭৩ সালে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১১০ ডলার। ২০০৯ সময়কালে মাথাপিছু গড় আয় বেড়ে হয়েছে ৭০০ ডলার, দৈনিক মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় ১ ডলার ৯২ সেন্ট। অন্য দিকে জাতিসংঘ বলছে, দেশের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৮ কোটি ২৫ লাখ লোকের দৈনিক মাথাপিছু আয় ১ ডলার ২৫ সেন্টের নিচে। কোটিপতির সংখ্যা এবং তাদের আয় বৃদ্ধির কারণেই জাতীয় আয় বাড়ছে। বৈষম্য হ্রাসে রাষ্ট্রের অস্পৃহা কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করলেও দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্য হ্রাসে কোনো ভূমিকাই পালন করেছে না।

বেকারত্ব : দ্য চ্যালেঞ্জ বইয়ে মালয়েশিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি মাহাথির মোহাম্মদ লিখেছেন, একজন ব্যক্তি যদি নিয়মিত কাজ করেন তবে তার পক্ষে গরিব হওয়া কখনো সম্ভব নয়। এর আয় বাড়বেই। বেকারত্ব বৃদ্ধি বৈষম্য বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রায় তিন কোটি লোক বেকার। ১৯৮১ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ। বিগত ২০০৬-০৭ অর্থবছরে পিআরএসপিতে ৩০ লাখ ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮ লাখ ৬০ হাজার। এর আগে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে পিআরএসপিতে ২৭ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ৮ লাখ ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল।

কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের সংসদ : নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ৩০০ সংসদ সদস্যের মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ অর্থাৎ ১২৮ জনই কোটিপতি। সংসদ সদস্যদের ঘোষণা অনুযায়ী ১০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে ২১ জনের। সুজন পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য পাওয়া যায়। হলফনামার চেয়ে বাস্তবে সম্পদের পরিমাণ বেশি, সম্পদের বর্ণনা দেওয়া আছে কিন্তু মূল্য উল্লেখ নেই, সেগুলো গণনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মূল্য যোগ করা হলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় কোটিপতির সংখ্যা আরো বাড়বে বলে মনে করে সংস্থাটি। ‘সুজন’ নেতৃবৃন্দরা ২০০৯ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তাতে জাতীয় সংসদ ‘কোটিপতিদের ক্লাবে’ পরিণত হবে, যা হবে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ধারণার পরিপন্থী। বেসরকারি এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫৪ সাল থেকে বর্তমান জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সংসদ সদস্যের মধ্যে আনুপাতিক হারে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, কমছে প্রকৃত রাজনীতিবিদের সংখ্যা। ১৯৫৪ সালের সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ জন, মোট সংসদ সদস্যের মাত্র ৪ শতাংশ। ১৯৭৩ সালে সেই হার বেড়ে ২৪ শতাংশ এবং ১৯৯১ সালে ৫৯ শতাংশ হয়। ১৯৯১ সালে ৩০০ সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৭৭ জনই ছিল ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ১০ জন পেশাদার রাজনীতিবিদ, ১৯ জন কৃষিজীবী, ৪৪ জন আইনজীবী ও ১৬৯ জন ব্যবসায়ী নির্বাচিত হয়েছেন।

দুর্নীতি : কোটিপতির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে দুর্নীতির বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞগণ। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। বিগত সময়ে বাংলাদেশ পর পর ৫ বছর দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান অধিকারী দেশ হিসাবে পরিগণিত হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরের তুলনায় বেড়ে ১২তম হয়েছে।

কর ফাঁকি : দ্য চ্যালেঞ্জ বইয়ে মালয়েশিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি মাহাথির মোহাম্মদ লিখেছেন, রাষ্ট্রের বিকাশ ও বৈষম্য দূরীকরণ নির্ভর করে সঠিক কর ব্যবস্থার ওপর। বাংলাদেশে সেই কর ব্যবস্থাই নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। বাংলাদেশের কোটিপতির সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেলেও আয়করে তার কোনো প্রভাবই পড়েনি। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় মোট করে ভ্যাটের অবদান সবচেয়ে বেশি এরপর আমদানি শুল্ক। বেসরকারি খাতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, কোটিপতি ও ধনী শ্রেণীর মানুষের মধ্যে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পক্ষান্তরে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে কর ফাঁকির প্রবণতা তুলনামূলক কম। কানাডা, সুইডেন, নরওয়েসহ অন্যান্য জনকল্যাণমুখী অর্থনীতির দেশগুলোতে মোট রাজস্ব আয়ে আয়করের অবদান ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট রাজস্ব আয়ে আয় করের অবদান মাত্র ২৩ শতাংশ অথচ ভ্যাটের অবদান ৪১ শতাংশ (২০০৯)।

শেষ কথা :
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রের সম্পদ কেন্দ্রীভবন হচ্ছে, বাড়ছে আরো দারিদ্র্য ও বৈষম্য। শরীরের একটি অঙ্গ শক্তিশালী এবং বাকিগুলো শক্তিহীন হলে যেমন কোনো কাজেই আসে না, তেমনি সমাজে দারিদ্র্য বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে কোটিপতি বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়ের উন্নয়ন কোনো কার্যকর অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। [ এম এম মুসা ● সাপ্তাহিক বুধবার musamiah@gmail.com ]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: