আদর্শিক ও ভাষাগত ব্যাপারে আপোসের কোনো জায়গা নেই। আপোস করা মানেই আলো জ্বালতে গিয়ে অন্ধকারকে প্রশ্রয় দেওয়া। যা আমরা করে চলেছি বিপজ্জনকভাবে।

আলো কেন আলো নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গত তিন দশকে বাংলাদেশে শিক্ষার যে উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটেছে তা লক্ষ্য করবার মতো সত্য। পরিমাণ, বৈচিত্র্য, শতকরা হার এবং বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিতান্ত হতাশাবাদীরাও অস্বীকার করবেন না। গুণ ও মান নিয়ে অবশ্য সংশয় রয়েছে এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্নতির বিবেচনায় পরিমাণের পাশাপাশি গুণ ও মানের প্রশ্নটি অবশ্যই আসবে। সেটা আসছেও। কিন্তু আরো প্রাথমিক এবং জরুরি দুটি জিজ্ঞাসা সবদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসঙ্গেও উঠে আসে; বিশেষভাবেই আসে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। প্রথম জিজ্ঞাসাটা দার্শনিক, দ্বিতীয়টি ভাষাতাত্ত্বিক।

শিক্ষা তো অবশ্যই? কিন্তু কেন, কোন উদ্দেশ্যে শিক্ষা? এই প্রাথমিক প্রশ্নটিকে বলতে পারি দার্শনিক। দ্বিতীয় প্রশ্নটি কোন ভাষায় শিক্ষা; একে বলা চলে ভাষাতাত্ত্বিক। সব দেশেই এ প্রশ্ন দুটি উঠেছে, অনেক দেশেই তার মীমাংসাও হয়েছে। আমাদের দেশে হয়নি। আমরা অনেক ব্যাপারেই এখনো সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক মীমাংসায় পৌঁছতে পারিনি; শিক্ষার সঙ্গে সংলগ্ন ওই দুটি ব্যাপারেও সেই একই ব্যাপার ঘটেছে। মনে হয় হাল ছেড়ে দিয়েছি। আর হাল ছেড়ে দিলে যা ঘটে তাই ঘটেছে। চলমান স্রোত নৌকার সঙ্গে নৌকার আরোহীদের নিয়ে চলে। পুঁজিবাদের তবু কিছু গুণ আছে, বিকৃত পুঁজিবাদ বড়ই কদর্য, লুণ্ঠনকারীরা যেমন কদর্য শিল্পোদ্যোক্তাদের তুলনায়।

শিক্ষা কেন, এই জিজ্ঞাসার জবাবটা সোজা। শিক্ষা জ্ঞানের জন্য। কিন্তু কেউ বলবেন না যে জ্ঞানই যথেষ্ট, যদিও জ্ঞান মানুষকে শক্তি দেয়। জ্ঞানের সঙ্গে অন্যান্য গুণের বিশেষ করে হৃদয়ানুভূতির বিকাশ না ঘটলে শিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না। শিক্ষা মানুষকে মানুষ করে তোলে, এ উক্তি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু মানুষ বলতে কোন ধরনের মানুষ বুঝব সে বিবেচনা তো থাকেই, থাকবেই। স্বার্থপর প্রাণীকে কি মানুষ বলব, নাকি যথার্থ মানুষের কাছ থেকে আশা করব মানবিক সহমর্মিতা? তাকে নিশ্চয়ই আমরা যথার্থ মানুষ বলতে রাজি হব না যার অনেক শক্তি আছে, কিন্তু শক্তিকে যে প্রয়োগ করে অন্যকে পীড়ন করায়। মানুষের মনুষ্যত্ব বিশেষভাবে পরীক্ষিত ও প্রতিফলিত হয় ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ব্যক্তি বিকশিত হবে, কিন্তু সে জানবে যে তার বিকাশের পেছনে অন্যের সাহায্য আছে এবং অন্য সবাইকে শত্রু করে সে স্বাভাবিক থাকবে না, টিকেও থাকবে না; তার এই জ্ঞান থাকবে যে পানির বিচ্ছিন্ন ফোঁটাটি শুকিয়ে মরবে যদি আরো অনেক ফোঁটার আশ্রয় না পায়।

কিন্তু যে শিক্ষা আমরা এতকাল পেয়ে এসেছি এবং এখনো পাচ্ছি তার মূল মন্ত্রটি হলো তুমি নিজে বড় হও, অন্যের কথা একদম ভেব না। নিজের চরকায় তেল দাও, আপনি বাঁচলে বাপের নাম, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা- এসব প্রবাদ উচ্চ নৈতিকতা তো নয়ই সাধারণ মনুষ্যত্বের কথাও বলে না; এদের উদ্ভব এক ধরনের হতাশা থেকে; শিক্ষার কর্তব্য এসবের অন্তর্গত মূল্যবোধটিকে অপসারিত করে শিক্ষার্থীদের হৃদয়বান ও সামাজিক ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এটা দেখে আশ্চর্য হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা হই না যে, অপসারণ তো অনেক বড় দায়িত্ব, শিক্ষা বরঞ্চ স্বার্থপরতার মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিকেই পুষ্ট করছে। অনবরত বলা হচ্ছে, শিল্পিত হয়ে তুমি নিজে বড় হও অন্যকে পদদলিত করে।

দীর্ঘকাল আমরা পরাধীন ছিলাম। পরাধীন অবস্থায় আমরা স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছি। লড়াইটা ছিল সমষ্টিগত; কিন্তু সমষ্টিগত মুক্তি আসেনি। সমষ্টির শ্রমে উৎপাদিত ফসল ব্যক্তির গোলায় গিয়ে উঠেছে। আর ওই যে সমষ্টির সংগ্রামে ব্যক্তির মুনাফা লাভ, ওই অর্জনের মনোভাবটা শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে। কেবল প্রতিফলিত নয়, শিক্ষা ওই মুনাফালোভী বিচ্ছিন্নতাকে পরিপুষ্টও করেছে। আমাদের শিক্ষানীতি সম্পর্কে নানা কথা বলা হয় এবং বলা যায়, কিন্তু এর মূল ভিত্তিটা যে পুঁজিবাদী সেটা অস্বীকার করবার উপায় নেই । পুঁজিবাদী সে দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবস্থাপনা উভয় দিক থেকেই। শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গিটা হচ্ছে সে নিজে বড় হবে, অন্যকে দমিয়ে রেখে। ব্যবস্থাপনাটা এ রকমের যে, তারাই কেবল শিক্ষা পাবে যাদের পরিবারের পক্ষে টাকা খরচ করা সম্ভবপর।

এ রকমটা হওয়ার কথা ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা স্বভাবতই প্রতিশ্রুতি ছিল সে হবে গণতান্ত্রিক; অর্থাৎ সেখানে সব নাগরিকের মধ্যে থাকবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য। এ ব্যবস্থারই অপর নাম সমাজতন্ত্র। কিন্তু রাষ্ট্র ওই পথে এগোয়নি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের মতোই রাষ্ট্র এগিয়েছে পুঁজিবাদী বিকাশের পথে। আর অগ্রগমনের সেই ধারাই ধরা পড়েছে শিক্ষার পুঁজিবাদী দার্শনিক ভিত্তিতে। এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্র অনেক কিছুকেই নিয়ন্ত্রিত করে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে তো অবশ্যই।

রাষ্ট্রের যারা কর্তা তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম এবং তাকে যে অবাঞ্ছিত বলা যাবে তাও নয়, কেননা প্রতিযোগিতা ছাড়া অগ্রগতি নেই। কিন্তু আমাদের শাসকশ্রেণীর ভেতর যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেটা মোটেই সুস্থ নয়, সমষ্টিগত অগ্রগতির জন্য যে সহায়ক তাও নয়। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টির নয়, লুণ্ঠনের। শিক্ষা ক্ষেত্রেও ওই একই প্রতিযোগিতা। যে যেভাবে পারে ভাল ফল করতে চায়। নকল করা থেকে শুরু করে কোচিং সেন্টারের সাহায্য নেওয়া পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপই অন্যায্য মনে করে না। শিক্ষা এখন শিক্ষালয়ের ব্যাপার ততটা নয় যতটা সে ব্যাপার ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনার।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আরেকটি কীর্তি হচ্ছে সবকিছুকে পণ্যে পরিণত করা। দেশে এখন বিনামূল্যে কিছুই পাওয়ার উপায় নেই, না সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, না আদালতে বিচার। অনুরূপভাবে শিক্ষাও পণ্যে পরিণত হয়েছে। ক্রয়-বিক্রয় চলছে। সেই কিনতে পারবে যার টাকা আছে, তাজা মাছের মতো তাজা শিক্ষাও টাকাওয়ালার থলেতেই পড়ছে, লম্ফ দিয়ে। কোচিং সেন্টার থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ওই একই ব্যবস্থা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন তুলনামূলকভাবে অবস্থাপনণ ঘরের ছেলেমেয়েরাই আসে, অজপাড়াগাঁয়ের গরিব কৃষকের সন্তানরা আসে না, আসতে পারবে বলে ভাবতেও পারে না। পুঁজিবাদী বিকাশের কল্যাণে শ্রেণীবিভাজন আজ অন্য যে কোনো কালের তুলনায় অনেক বেশি নির্মম ও আপোসহীন। ফাঁকফোকর সব বন্ধ।

পুঁুজিবাদের আরো নিয়মকানুন আছে। নিজস্ব। মানুষকে সে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে; এটা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘটে, শিক্ষার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। প্রথমত, এ ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ তৈরির ওপর জোর দেয়; ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল নিজ নিজ অধ্যায়নের বিষয়ের ওপরই চোখ রাখে, তার বাইরে যাওয়াকে অপচয়মূলক মনে করে। বলা বাহুল্য, এটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ সৃষ্টির পথ নয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীরা সেই সব বিষয়ের অভিমুখেই ধাবিত হয় যেগুলোর বাজার মূল্য অধিক। মানবিক বিদ্যা অবহেলিত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও ওই দুই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। শিক্ষার্থীরা প্রাণপণে চেষ্টা করছে বিশেষজ্ঞ হবে এবং ব্যবস্থাপনা ও কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে চাচ্ছে অন্যসব বিষয়ের প্রতি ভ্রূকুটি প্রদর্শন করে। ওদিকে আবার অনুন্নত ও কর্মসংস্থানে অক্ষম যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আমাদের বসবাস সেখানে শিক্ষা জীবিকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। আগে যতটা দিত এখন ততটাও দেয় না। ফলে ছাত্ররা লেখাপড়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ওই যে আমরা শিক্ষার মান ও গুণের নিম্নগামিতা নিয় অহরহ উদ্বেগ প্রকাশ করছি ওই কাজটা খুবই দেশপ্রেমিক বটে, কিন্তু নিম্নগামিতার কারণ না-বুঝলে প্রতিকার তো অসম্ভব। শিক্ষা যে উঠতে পারছে না তার ব্যাখ্যা ছাত্রদের অনীহায় যেমন পাওয়া যাবে তেমনি পাওয়া সম্ভব শিক্ষকদের পেশাগত আচরণের মধ্যেও।

শিক্ষকতার চরিতার্থতা যে শিক্ষাদান ও জ্ঞান সৃষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে, অর্থোপার্জনে নেই, এই বোধটা ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছে। এটা কেবল যে শিক্ষকদের বেলাতে সত্য তা নয়, সত্য চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী সবার ক্ষেত্রেই। সাফল্যের একমাত্র নিরিখ হয়ে দাঁড়াচ্ছে অর্থোপার্জন। শিক্ষকরাও ওই সোনার হরিণের পিছনে ছুটছেন। বাধ্য হচ্ছেন ছুটতে। ব্যবস্থাই বাধ্য করছে। এ ব্যবস্থা অন্য কোনো গুণ চেনে না, অর্থোপার্জনে সাফল্যের বাইরে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই আদর্শিক সমস্যাটির গুরুত্বকে কিছুতেই খাটো করে দেখা যাবে না। শিক্ষার সাহায্যে আমরা কোন ধরনের মানুষ তৈরি করতে চাই এবং কিভাবেই বা তাদের তৈরি করা যাবে এ প্রশ্নটির মোকাবিলা না-করে অন্যসব বিবেচনা কথার বাহার হতে বাধ্য।

রাষ্ট্রীয় আদর্শ পুঁজিবাদী; এবং পুঁজিবাদ স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্য সৃষ্টি করে। কেবল যে সৃষ্টি করে তা নয়, বৈষম্যে বিশ্বাসও করে। শিক্ষাক্ষেত্রেও বৈষম্য বাড়ছে, কেবল বাড়ছেই; আর সেটা যত বাড়ছে ততই নাগরিকদের মধ্যকার ঐক্যের বন্ধন শিথিল হচ্ছে; বস্ত্তত অনৈক্যই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে একটি অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হবে যার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা বাংলা- এ অঙ্গীকার বাংলাদেশের সংবিধানে ছিল, এখনো আছে। না-থেকে উপায় ছিল না। কেননা বাংলাদেশের হওয়ার কথা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিটাই হচ্ছে নাগরিকদের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য। মেধার ইতরবিশেষ থাকবে, যেমন থাকবে চেহারার; কিন্তু ধর্ম, সম্পত্তি বা বর্ণের ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, প্রতিশ্রুতি ছিল এটাই।

সংবিধানে এখন আর ধর্মনিরপেক্ষতার কথা নেই। সমাজতন্ত্রের উল্লেখও নেই; এবং কার্যক্ষেত্রে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো অনেক পরের কথা, এমনকি যথার্থ সংসদীয় গণতন্ত্রও কার্যকর করা যায়নি। রাষ্ট্র এখন নির্লজ্জরূপে পুঁজিবাদী; বৈষম্যকে সে লালন করে। স্বভাবতই দেশে এখন আর অভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতি চালু নেই। তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেছে শিক্ষা। শিক্ষা ঐক্য সৃষ্টি করেনি, উল্টো বিভাজনকেই দৃঢ়, গভীর ও বিস্তৃত করছে। এ এক কিম্ভূত ব্যবস্থা, যত বেশি শিক্ষায় অগ্রগতি, ততই বৈষম্য এবং বৈষম্যের দরুন অনৈক্য বৃদ্ধি।

বৈষম্য ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলেও ছিল। কিন্তু আমরা তো তাকে মেনে নিইনি। বৈষম্যপূর্ণ রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। তিন ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি নতুন নয়, পুরাতন বটে। কিন্তু ওই বিভাজনকেও তো আমাদের প্রত্যাখ্যান করবারই কথা; বিভাজনটা তো ছিল পুরাতন রাষ্ট্র ব্যবস্থার ন্যক্কারজনক অনুষঙ্গ। তাহলে? আসলে রাষ্ট্র বদলায়নি, বরঞ্চ আগের তুলনায় অধিক মাত্রায় ও স্পষ্টতায় পুঁজিবাদী চরিত্র ধারণ করেছে। আর তার দরুন শিক্ষাক্ষেত্রে আগে যতটা বৈষম্য ছিল এখন সে তুলনায় অধিক বৈষম্য ভৌতিক ও মর্মন্তুদ তান্ডব চালাচ্ছে। আমরা খেয়াল করছি না শিক্ষার আলো গোপনে গোপনে এবং সদর্পে কেমন অন্ধকার তৈরি ও বিতরণ করে দিচ্ছে। আলো যত বাড়ছে অন্ধকারেরও ততটাই সুবিধা হচ্ছে। এ এক আশ্চর্য বক্রাঘাত।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করবার আন্দোলন থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাটা যে এসেছে এ হিসাবটা মোটেই ভ্রান্ত নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বটে। যে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সেটা ধর্মভিত্তিক নয়, ভাষাভিত্তিক। কিন্তু মাতৃভাষা বাংলা তো মর্যাদা পাচ্ছে না শিক্ষাক্ষেত্রে। উচ্চতর আদালতে যেমন তেমনি উচ্চশিক্ষাতেও বাংলা দিয়ে কাজ চলছে না। ওদিকে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা মহোৎসবে ইংরেজি শিখছে। বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার এলাকাতেও ইংরেজি বাধ্যতামূলক হয়ে রয়েছে একেবারে শুরু থেকেই।

ইংরেজির এ জোরটা এলো কোথা থেকে? না, ভাষার ভেতর থেকে আসেনি। এসেছে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে, বাংলাদেশ যে-ব্যবস্থার একটি প্রান্তে ঝুলে রয়েছে। পুঁজিবাদী বিশ্বের রাষ্ট্রভাষা এখন ইংরেজি, তাই ওই ভাষা আমাদের জন্য এতো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিত্তবানরা যে বাংলাকে অবজ্ঞা করছে তার কারণটা কি? কারণ এই যে, তারা মনে করে, প্রকাশ্যে না বললেও তাদের মনের ভিতরে ধারণাটা রয়েছে যে, বাংলাদেশের তেমন কোনো ভবিষ্যৎ নেই। যে জন্য বাংলা ভাষা শিখে কোনো লাভ হবে না। অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে এই যে, যারা কর্তৃত্ব করে এবং দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তারা মাতৃভাষার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। যেমন নয় মাতৃভূমির বিষয়ে।

মাতৃভাষা তাই শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে না । অথচ সবাই জানেন প্রকৃত শিক্ষা লাভ সম্ভব শুধু মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই। ওই সুযোগটা আমাদের জন্য এসেছিল। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা সুযোগটি এনে দিয়েছিল। কিন্তু আমরা তাকে কাজে লাগাতে পারিনি। বই লিখতে পারিনি, অনুবাদ এগোয়নি। যেমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি, তেমনি বিফলকাম হয়ে গেছি শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষা প্রচলনের ব্যাপারেও। এককালে এদেশের শিক্ষিত মানুষ পরাধীনতার কারণে দ্বিভাষিক হবে এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এখন স্বাধীনতার পরে সমস্ত জাতিকে আমরা দ্বিভাষিক করে তুলতে চেষ্টা করছি। এটা অবশ্যই অপচয়মূলক। দেশের সব মানুষ বিদেশ যাবে না। যারা যাবে তারা যে ইংরেজি ভাষার দেশেই যাবে তাও নয়, আর গেলে যে ভাষা শিখে নিতে পারবে না এমন কোনো কথাও নেই। সেজন্যই ব্যাপারটা অপচয়মূলক। আর অপচয় করবার মতো সামর্থ্য আর যারই থাক আমাদের যে নেই সেটা নির্মম সত্য।

বাঙালি তার ভাষা নিয়ে বড়াই করে ঠিকই, কিন্তু যেমন তার মাতৃভূমির প্রতি তেমনি মাতৃভাষার প্রতিও নানা প্রকারের অবজ্ঞা ও উপেক্ষা প্রদর্শন করতে সে অভ্যস্ত। তাই দেখা যাবে, অতিউচ্চ শিক্ষিত বাংলাভাষী কথোপকথনে একধারে গ্রাম্য শব্দ ও উচ্চারণ ব্যবহার করছে এবং মুহুর্মুহু ইংরাজি শব্দ ও বাক্যাংশের ধ্বনি তুলছে। অতীতের লিখিত বাংলাকে কেউ ভারাক্রান্ত করেছে সংস্কৃত শব্দবাহুল্য; কেউবা অকারণে টানাটানি করেছেন অনিচ্ছুক আরবি-ফার্সি শব্দ নিয়ে। বাংলাভাষা সংস্কারেরও নানাবিধ অন্যায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পর হরফ বদলাবার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সহজ করবার বেসরকারি উদ্যমেরও অভাব ঘটেনি। একাত্তরের স্বাধীনতার পর আশা করা গিয়েছিল যে এইসব উৎপাত চিরকালের জন্য বিদায় নেবে। নেয়নি। অনেক আপদের মতো বাংলাভাষার ওপর হস্তক্ষেপও ঘটছে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি বানান নিয়ে ঝাড়ামোছা করে সেটা এক কথা কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও দৌরাত্ম্য চলছে। তথাকথিত প্রমিতকরণের জন্য অভিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কয়েকজন পন্ডিত ব্যক্তিকে। তারা যদৃচ্ছা স্বৈরাচার চালিয়েছেন। বাঙালির দীর্ঘত্ব খর্ব করে তাকে ‘বাঙালি’ করেছেন; ”’-কারটা অশ্লীল ছাতার মতো ধরে রাখা হয়েছে, যেন বাঙালি ঋজুভাবে মেরুদন্ড শক্ত করে দাঁড়াতে অপারগ। ‘গ্রীক’কে গ্রিক করা হয়েছে। কপালগুণে বাংলা ‘একাডেমী’ বেঁচে গেছে, কিন্তু অন্যত্র ”’কার বড়ই তৎপর। কেউ কেউ আবার বলছেন ‘ণ’ কী দরকার, বাদ দিলেই বা ক্ষতি কী? কাকে বোঝাবেন?

কাজ না থাকলেই অকাজ দেখা দেয়; চাষ না থাকলে যেমন আগাছায় ভূমি আচ্ছাদিত হয়। সর্বত্র ওটা চলছে; ভাষা সংস্কারের ক্ষেত্রেও ছাড় নেই। কিন্তু আমাদের তো কাজ দরকার। নইলে এগুবো কি করে? নানা বিষয়ে অসংখ্য বই লেখা চাই। অনুবাদ দরকার, দরকার মৌলিক রচনার। কিন্তু তার আগে স্থির সিদ্ধান্ত চাই যে, সর্বস্তরে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে এবং দেশে তিনটি নয় একটি অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

অসম্ভব? তা বাংলাদেশ যে স্বাধীন হবে এটাও তো এক সময়ে অসম্ভব ও বিপজ্জনক কল্পনা ছিল; কিন্তু তবু একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র তো আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি এটা সত্য, আসেনি যে তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ তো বাংলা ভাষার দুরবস্থা। আমাদের তো চেষ্টা করতে হবে একা নয় সমবেতভাবে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রথম বিবেচনাটা অবশ্য মাতৃভাষার ব্যবহারের চেয়েও জরুরি। সেটা হলো আদর্শিক প্রশ্ন। শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা কোন ধরনের মানুষ সৃষ্টি করতে চাই সে ব্যাপারে স্পষ্ট ও স্থির সিদ্ধান্ত না নিয়ে এগুবার চেষ্টা করা নানাবিধ বিপথগামিতাকে প্রশ্রয় দেওয়া ছাড়া অন্যকিছু হবে না । হচ্ছেও না। জ্ঞানী ও দক্ষ মানুষ চাই, কিন্তু সেই সঙ্গে চাই হৃদয়বান, দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক মানুষ। একই মানুষের মধ্যে এইসব নানাবিধ গুণ থাকা দরকার।

আদর্শিক ও ভাষাগত ব্যাপারে আপোসের কোনো জায়গা নেই। আপোস করা মানেই আলো জ্বালতে গিয়ে অন্ধকারকে প্রশ্রয় দেওয়া। যা আমরা করে চলেছি বিপজ্জনকভাবে। [ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ● সাপ্তাহিক বুধবার ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: