স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে শুরু হলো কোটিপতির মিছিল। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী বাঙালি শাসকশ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই তারা জাতিগত নিপীড়ক হিসেবে আবির্ভূত হলো। অস্বীকার করল অন্য সব জাতির অস্তিত্ব।

বাংলাদেশের ‘বুদ্ধিজীবী’ ও ‘সুশীল সমাজ’-২

আনু মুহাম্মদ
১৯৪৭ ও ১৯৭১ :
ভারত, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা বা দেশভাগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের ক্ষমতার যোগ সৃষ্টি হয়। হিন্দু জমিদাররা শুধু নন, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দেশত্যাগ করেন পূর্ববাংলার হিন্দু মধ্যবিত্তের এক বড় অংশ : স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, উকিল প্রভৃতি। জমিদার বা জোতদারের স্থান দখল কিংবা শোষক-নির্যাতক হিসেবে তার ভূমিকা প্রতিস্থাপন করা মুসলমান জোতদারদের জন্য সহজ ছিল, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ভূমিকা এভাবে দখল দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। তবুও স্থান শূন্য থাকেনি, থাকে না। প্রায় রাতারাতি, এক দশকের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক নতুন মুসলমান জনগোষ্ঠী আবির্ভূত হলেন প্রায় অপ্রস্ত্ততভাবেই; সরকারি প্রশাসন, ওকালতিতেও খুব দ্রুত এক মুসলমান জনগোষ্ঠী পাওয়া গেল, যারা এতদিন নানাভাবে বঞ্চিত ও নিপীড়িত ছিলেন। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের উদ্ভব ঘটল এভাবেই। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রস্ত্ততি, পরিশ্রম ছাড়া দ্রুত ফল পাওয়ার তাড়না সম্ভবত তখন থেকেই জোরদার।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বপ্রান্তে রাষ্ট্রের নতুন প্রয়োজনগুলোর মধ্য দিয়ে যে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর উদ্ভব, তাদের মধ্য থেকেই ভিন্ন উপলব্ধি ক্রমে নতুন ভাষা পেতে থাকে। বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির তাড়নার মধ্যে এই উপলব্ধির জন্ম। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বৈরী মনোভাব এবং সামগ্রিকভাবে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে নিরন্তর হেয় ও প্রান্তিক করে রাখার পাকিস্তানি কেন্দ্র চেষ্টাই এই উপলব্ধির বিস্তার ঘটায়। ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও রাজনীতির বিকাশ এই ভিত্তির ওপরই দাঁড়ানো।  এই সময়কালে বাঙালি পেশাজীবীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, আইনজীবী, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও তুলনায় বেড়েছিল অনেক। রাষ্ট্র অনুমোদিত চিন্তার বাইরে এদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় চিন্তা ও সক্রিয়তা দেখা যায়। বৈষম্য, সুযোগ এবং সম্ভাবনার অনিশ্চয়তা, সর্বোপরি সামরিক শাসন ও বিবিধ মাত্রার নিপীড়ন জনগণের বিভিন্ন স্তরে পাল্টা প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। এর মধ্যে সমাজতন্ত্রী চিন্তাও দানা বেঁধেছিল, সংগঠন আন্দোলন বিস্তার লাভ করেছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রায় যা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু তার পরও তা ধারাবাহিকতা রাখতে পারেনি। হোঁচট খেয়ে খেয়ে আর শক্তভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি।

ভাষা আন্দোলন থেকেই বলা যায়, পূর্ববাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তার মুক্তির পথ অনুসন্ধানে এবং স্বাতন্ত্র্যবোধে শিক্ষা-সংস্কৃতি, গবেষণা, সাহিত্য-সংগীত, দর্শনচর্চা এবং সর্বোপরি রাজনীতি ক্ষেত্রে এক নতুন যাত্রা শুরু করে। সে যাত্রায় সাধারণভাবে মুসলমান বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ হাজির হয় অসাম্প্রদায়িক তলে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের রাজনীতি এবং পাকিস্তানমুখিতা নিয়ে মধ্যবিত্তের যে অংশ বিদ্যা ও রাজনীতি জগতে সক্রিয় ছিল তারা হয়ে পড়ে মুষ্টিমেয়। ষাটের দশকে সমগ্র বিকাশ ধারায় মার্কসীয় রাজনীতি ও দর্শনচর্চা একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করলেও একপর্যায়ে এসে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সর্বব্যাপী প্রভাব প্রান্তিক করে ফেলে শ্রেণী ও সামগ্রিক মুক্তির রাজনীতিকে। শ্রেণীগত নিপীড়ন-বৈষম্য কিংবা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ইত্যাদি বিষয় ক্রমে আড়ালে চলে যায়। তার পেছনেও কথিত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কম ছিল না।

ষাটের দশকের শেষ নাগাদ বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্পষ্ট আকার নেয়। অন্য সব ধারাকে প্রায় হজম করে একটি ধারাই আধিপত্য বিস্তার করে : ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’। পাকিস্তানি শাসকদের জুলুম, প্রতারণা এবং সবশেষে পুরনো আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টায় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের লাইন পাল্টা স্লোগানে পুরো জনগোষ্ঠীকে প্লাবিত  করে : ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। বাঙালি মধ্যবিত্ত তখন প্রায় সব পর্যায়েই নেতৃত্বে। আর এর ভিত্তি নির্মাণে শক্তিশালী ও সক্রিয় বাঙালি বিদ্বৎসমাজ। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর দালাল মেরুদন্ডহীন অংশ ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আর জনশক্তির তোড় বুঝে নতুন রূপও ধারণ করেছে কেউ কেউ। বিদ্বৎসমাজে সমাজতন্ত্রী চিন্তার অনুসারীরাও তখন সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত নিপীড়ন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জনমত তৈরিতে এবং স্বাতন্ত্র্যবোধ সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তবে পরিস্থিতি সব চিন্তার শক্তিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেই যোগ করেছে। জাতিগত নিপীড়নবিরোধিতা সব তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে এলেও বাংলাদেশে বাঙালি ভিন্ন যে আরও অনেক জাতি এবং ভাষাভাষী আছে সে প্রশ্ন সমাজতন্ত্রীদের কারও কারও বাইরে কোনো মনোযোগের মধ্যেই ছিল না। শ্রেণী ও নারীপ্রশ্নও তখন মনোযোগের আড়ালে। তার ধারাবাহিকতা এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি।

একাত্তরে পাকবাহিনীর গণহত্যা এবং পরিকল্পিতভাবে জামায়াতি বাহিনীর লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিদ্বজ্জন হত্যার মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সময়কালের মতো জ্ঞানবিজ্ঞান ও সৃজনশীল জগতে আরেক দফা বড় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। বিদ্বৎসমাজের এই বড় শূন্যতার ফলাফল বোধ করা যায়, পরিমাপ করা যায় না।

পুরনো সমাজে ভাঙন ও বিত্তের নতুন বিন্যাস :
বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙালিদের প্রথমবারের মতো শাসকশ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সে সময় বাংলাদেশ ছিল সাধারণভাবে ক্ষুদে মালিকপ্রধান একটি ‘পেটিবুর্জোয়া’ সমাজ। এই সমাজে বৃহৎ বুর্জোয়া বা বিত্তবান ছিল না। সে সময় ধনী বলতে কৃষি জোতদারকেই বোঝাত। ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্পকারখানায় দুই-একটি ছাড়া কোনো ধনী পরিবার ছিল না, দুই-একটি তাও ছিল প্রধানত পাকিস্তানকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সহযোগী হিসেবেই। জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এখানেও, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালের মতোই ঘটল একটি আকস্মিক ‘শ্রেণী উত্তরণ’, এবং প্রায় একই রকম অপ্রস্ত্তত অবস্থায়। বিনাশ্রমে বিনা-প্রস্ত্ততিতে এবারো এই অংশের অনেকের হাতে এল অভাবিত সম্পদ ও ক্ষমতা। বাঙালির মধ্যে যারা বিত্তবান শ্রেণীতে ‘উন্নীত’ হলেন সম্পদের মালিকানায় তাদের অবস্থান আগে ছিল ‘মধ্য’; আইনজীবী, ভূমিমালিক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার প্রভৃতি।

জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মধ্যবিত্তের যে অংশ রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘যোগাযোগ ও চুক্তির’ সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হলেন তাদের বিত্ত অবস্থানের পরিবর্তন ঘটল স্থায়ীভাবে। এর ফলে স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে শুরু হলো কোটিপতির মিছিল। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী বাঙালি শাসকশ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই তারা জাতিগত নিপীড়ক হিসেবে আবির্ভূত হলো। অস্বীকার করল অন্য সব জাতির অস্তিত্ব। নিপীড়ন-স্বৈরশাসন আর ধর্মের ব্যবহার একসঙ্গে বাড়তে থাকল। এসব বিষয়ে নব্য স্বাধীন দেশে বিদ্বৎসমাজের পক্ষ থেকে খুব কম জনই তখন কথা বলেছেন। বেশির ভাগই ছিলেন হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। প্রভাবশালী যারা তারা ছিলেন ক্ষমতার সঙ্গে, যেমন অনেকে পাকিস্তান আমলেও ছিলেন।

এই ধাঁচের ‘বুদ্ধিজীবীদের’ ভূমিকা সম্পর্কে ১৯৭২ সালে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, ”রাজনীতি আর সংস্কৃতি আলাদা হয়ে পড়লেও বাঙলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতি এমনভাবে প্রাণস্পন্দনহীন হয়ে থাকার কথা ছিল না। যেটুকু প্রাণের লক্ষণ ছিল মার্কিন ডলার একেবারে থেঁতলে দিয়ে গেল। মার্কিন দূতাবাস বাঙলাদেশের অধ্যাপক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিকদের চড়া দাম দিয়ে কিনে নিয়ে গেল। যে লেখক একটা গল্পের বই কিংবা উপন্যাস প্রকাশ করে বছরে দু’ শো টাকা আয় করবার ভরসা করতে পারতেন না, সেই একই লেখক মার্কিন বইয়ের সের মাপা অনুবাদ করে মাসে আড়াই হাজার কামাতে লাগলেন। মার্কিন দূতাবাস বেছে বেছে সমাজতন্ত্রের বিরোধী প্রোপাগান্ডা বই-ই অনুবাদ করাতেন। বাঙলাদেশের যে সমস্ত কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সমালোচকের নাম এখন হামেশা শোনা যায়, তাঁদের শতকরা আশি ভাগই মার্কিনী প্রচারের অনুবাদ করেছেন।” [ আনু মুহাম্মদ ● সাপ্তাহিক বুধবার ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: